সুখপাখি | কিযী তাহ্‌নিন

মূল নগরের আশপাশ জুড়ে কাঁচুমাচু কিছু মফস্বল অঞ্চল লুকিয়ে থাকে – মসুরি তেমন এক স্থান। মূল নগর পপৌরির বর্ডার পার হয়ে আর ২৫-৩০ কিলোমিটার পর মসুরি। পপৌরি নগর তিন রঙা ফুল, রসালো ডালিম, আর সুঘ্রাণের জন্য প্রসিদ্ধ। সেই সুঘ্রাণে তীব্রতা আছে রাতের ঝলমলে উৎসবের মতন।

উল্টোদিকে, মসুরি কেমন নিজের মতন গুটিশুটি লুকিয়ে থাকা ছিমছাম। মসুরিতেও সুঘ্রাণ আছে, তবে তা স্নিগ্ধ, হালকা তিরতিরে। মসুরির মতন লুকিয়ে থাকা সাদামাটা জায়গাগুলো থাকে বলেই, তার বিপরীতে পপৌরির মতন মূল নগরীকে এতো আকর্ষণীয় মনে হয়। আর তাই মসুরির মতন ছোট্ট সময়ের মফস্বল থেকে বড় হতে তরুণেরা ছোটে পপৌরিতে। আর যারা থেকে যায়, তারা শুধু থেকেই যায়, বেঁচে থাকার মতন।

যেমন আছেন ইসমত অলকানন্দা। তবে তিনি আর সবার মতন থেকে যাবার জন্যই শুধু থাকেননি। তার চোখ দুটো পাখি যেন, আশার পালক ঝাপটি দেয় প্রতি পলকে। সেই শিশুকালে একঢাল রেশম চুলগুলোকে তার মা বেঁধে দিতো বিশেষ কায়দায়। সামনের চুলগুলোকে গোছা করে তুলে পেঁচিয়ে আধাঢিলে একটা খোঁপা করে ঝিনুকের কাঁটা গেঁথে দিত। আর পেছনের চুলগুলো খোলা, হাওয়ায় ঝাপটাতো। ইসমত অলকানন্দার বাহারি চুল আর পাখির পালকের মতন আশার চোখ এই অঞ্চলে কেউ যেন কখনো দেখেনি আগে। সেই ছোট থেকে এখনো। বয়স আশি পার হয়েছে। সাদা চুলগুলো এমন করেই বাধে। আশার চোখ ঝকমকে এখনো, আগের মতনই। আর এ অঞ্চলের মেয়েরা সেই কবে থেকে তার মতন করে চুল বাঁধে। মেয়েরা তার নাম দিয়েছে অলকা খোঁপা।

মসুরি শান্ত, তাতে আলাদা কোনো চটক ছিলো না যার আকর্ষণে অন্য অঞ্চলের মানুষ এখানে ঘুরতে আসবে। প্রকৃতি আছে, তাতে আলাদা উল্লাস ছিলো না যে পর্যটকের দল প্রকৃতি দেখে, উৎসব করে তারপর ফিরবে। তবে যারা মসুরির মতন নিজের কাছে লুকিয়ে থাকতে চায় এমন কিছু মানুষজন সারাবছরই আসতো মূল নগর পপৌরি আর আশেপাশের অঞ্চল থেকে। সেটা ইসমত অলকানন্দার ছোটবেলার কথা।

ইসমত অলকানন্দার ছোটবেলা কেটেছে আর বাকিদের মতনই। ভোরবেলা উঠে বাবার সাথে কৃষিশিক্ষা আর সাথে জীবনশিক্ষার পাঠ নিতো। হাতেকলমে বাঁধাকপি ফুলকপি টমেটো আর সোনালি লেবুর গাছগুলোকে ফলফলান্তি করবার কাজ করতো, সার-পানি দিতো। আর বাবার কাছে শিখতো হাত গুণে গুণে অংক, যাতে বাজারে গেলে ঠিক দামে ফল ফসলের বেচাকেনা করতে পারে। কবিতা, অক্ষরজ্ঞানের পাঠ চলতো, গাছের ডাল দিয়ে মাটিতে দাগ কেটে কেটে। বেঁচে থাকার জন্য যতটুকু দরকার, সে শিখে নিয়েছে বাবার কাছ থেকে। এ নতুন কিছু নয়। এ অঞ্চলের ছেলে-মেয়েরা এমন করেই শেখে। কাজের ফাঁকে পাঠশালা যায়। ঘর কাজ সবটুকু জুড়েই তারা শেখে সহজ করে, আলাদা আয়োজন নেই তাতে। ইসমত অলকানন্দার জীবনও আর বাকিদের মতন। মসুরির মানুষদের কাছে ইসমত অলকানন্দা এক আকর্ষণ। তাকে দেখলে যেন মনে হয়, অন্য কোথাও বাড়ি। অন্যরা ইসমত অলকানন্দাকে দেখে আকর্ষিত হয় এটা সে বুঝতে পারে। তবে ইসমত অলকানন্দার এ অঞ্চলের মানুষের কাছে যেমন ইসমত অলকানন্দা আছে, ইসমতের নিজের জীবনে এমন আকর্ষিত হওয়ার মতন কোনো বাড়তি অনুষঙ্গ নেই। তাঁর নিজের জীবন ছিমছাম, একইরকম।

এই একই ধরনের প্রতিদিনে ইসমত অলকানন্দার আরেকটি কাজ ছিল। ওই যে অল্প যে ক’জন পর্যটক নিরিবিলি থাকার জন্য এখানে আসতো, তাদের খরচের হিসাব-নিকাশ করা, দেখভাল করা। ইসমত অলকানন্দার বাবার ছিলো পৈতৃকসূত্রে পাওয়া বাড়তি এক দোতলা বাড়ি। সেই বাড়তি বাড়ি ব্যবহার করা হতো পর্যটনের কাজে। যে গুটিকয়েক মানুষ আসতো বছর জুড়ে মসুরিতে তাদের থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা হতো ওই বাড়িটিতে। সেখান থেকে যা টাকা পাওয়া যেত, ৬০ শতাংশ পেত ইসমত অলকানন্দার বাবা, আর বাকিটা মসুরির প্রধানের তহবিলে যায় অঞ্চল উন্নয়ন খাতে। বড় হতে হতে এই পর্যটন ব্যবসাকে পুরোপুরি আয়ত্ত করে ফেলল ইসমত অলকানন্দা। ভাইয়েরা ক্ষেতের কাজ করে, আর ইসমত অলকানন্দা মনপ্রাণ ঢেলে পর্যটন ব্যবসা সামলায়, হিসাব-কিতাব রাখে।

ইসমত অলকানন্দা তখন কৈশোরের শেষ দিনগুলোতে। পপৌরি নগরের নগরকবি এসেছিলন সেই পর্যটন বাড়িটিতে থাকতে, নিরিবিলি কাব্য রচনা করবে বলে। ইসমত অলকানন্দা কবির চারপাশ ঘুরে ঘুরে দেখে যায়, সব ঠিক আছে কিনা। কবির যত্নে যেন ফাঁক না থেকে যায়।  ইসমতের বিনয়, আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব আর দৃঢ়তায় মুগ্ধ হয়েছিলেন নগরকবি। এমন ডানা ঝাপ্টানো পাখির মতন চোখের মানুষ তিনিও আগে দেখেননি। শোনা যায়, তাঁর লেখা মহাকাব্যে ইসমত অলকানন্দাকে ভেবে  কবি কয়েকটি পংক্তিও লিখেছেন, যেমন –

“ডানা ঝাপ্টানো পাখির আলো,

তোমার চোখেতে খোঁজে আশ্রয়।”

মসুরি থেকে চলে যাওয়ার আগে অনেক উপহার দিয়ে গিয়েছিলন ইসমত অলকানন্দাকে, আর সাথে দিয়েছিলেন পপৌরির বিখ্যাত কয়েকটি ডালিম। ইসমত অলকানন্দার হাতে সোনার মতন ফসল জেগে ওঠে।  ডালিমের কিছু বিচি শুকিয়ে রেখেছিলো মনের খেয়ালে। এক গরমের দিনে খেলার ছলে ডালিমের বিচি আর মসুরির  বিখ্যাত সোনালি লেবুর বিচি গুঁড়ো করে মিশিয়ে গেঁথে দিয়েছিলো বাড়ির পেছনের খালি জমিতে। ভুলেও গিয়েছিলো। সেইবার শীতের আগে, ইসমতের বাবা যখন ভাবলো অনেকদিনের পরে থাকা জমিতে বাঁধাকপির চাষ করবেন, ততদিনে হলুদ রেশমি পাতায় ভরা গাছ পুরো জমি জুড়ে।  এমন গাছ কেউ দেখেনি আগে। এতো নতুন যে ভয় হয়।

ইসমত অলকানন্দার বাবা বলে, “কেটে ফেলি এ অচেনা গাছ।”

-“না না এগুলো আমার বোনা গাছ। কেটো না।”

পাখির পালকের মতন কথা বলে ওঠা চোখের ইসমত অলকানন্দার অনুরোধ উপেক্ষা করা সম্ভব না। তাঁর বাবা গাছগুলো কেটে ফেলেনি। রেশমি হলুদ পাতার গাছে জেগে ওঠে জমি।  সেবার বসন্তে ডালিম রঙা ফলে ভেঙে পড়ে জমি।  ডালিম ভেবে ভেঙে দেখে ভেতরে লেবুর মতন শাঁস, টলটলে সোনালি। আর কেমন এলাচদানার গন্ধে মৌ মৌ। কেউ কামড় দিতে সাহস করে না। যদি বিষ হয়, তেতো হয়? কী নতুন, কী ভয়। এক ভোরে ইসমত অলকানন্দা ঘুম থেকে জেগে দেখে সূর্য উঠি উঠি আলোয় পুরো জমি যেন সোনা। সোনারঙা আলো  ঠিকরে বেরুচ্ছে সূর্যের সাথে রেশম পাতার মিলেমিশে। সেই রং উপেক্ষা করেনি ইসমত অলকানন্দা। দৌড়ে যেয়ে একটা টসটসে ফলে কামড় বসালো। এমন স্বাদ, এমন ঘ্রাণ আগে কখনো কেউ জানেনি। টলটলে শাঁসের এলাচের ঘ্রাণ মাখা মিষ্টি ফল। শ্বাসের সাথে যেন মিশে যায়। ইসমত অলকানন্দা তার নাম দিয়েছিলো – এলাচি ফল।

এরপর বদলে গিয়েছিলো মসুরি। কিংবা বদলে দিয়েছিলো ইসমত অলকানন্দা। প্রতি বসন্তকালে মসুরি জেগে উঠতো উৎসবে। লোকে তার নাম দিয়েছিলো প্রভাত উৎসব। এলাচি ফলে মাখামাখি জমি, যা অন্য জমিতে জন্মে না, তাতে যখন সূর্যভাঙ্গা প্রথম আলো পড়ে, যেন সোনা। এমন সকাল দেখেনি কেউ আগে। পর্যটকে ভরপুর হয়ে ওঠে মসুরি বসন্তকালে। প্রভাত উৎসবে ভোরের আলো শরীরে মাখিয়ে, নেচে গেয়ে, ঝুড়ি ভর্তি এলাচি ফল কিনে উৎসব করে পর্যটকদল ফিরে যেতো। আরো পাঁচটি দালান ভাড়া করে অতিথিদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা হয়।  পর্যটন ব্যবসা জমে ওঠে বসন্তে। সব সামলায় ইসমত অলকানন্দা। সেবার পপৌরি নগর থেকে নগরকবিও এসেছিলেন স্বয়ং সে উৎসব দেখতে। তখন তিনি বৃদ্ধ, ক্লান্ত। আর কবিতা লেখেন না। গল্পের আসর জমেছিলো মসুরিতে সেদিন। নগরকবি বলেছিলেন কেমন করে তাঁর উপহার দেওয়া ডালিম থেকে জন্ম নিলো এলাচি ফল। সবই ইসমত অলকানন্দার গুণে। সেদিন রাতে ফিরে যাওয়ার আগে, নগরকবি আলাদা করে খুঁজে নিয়েছিলেন ইসমত অলকানন্দাকে।

বলেছিলেন, “তুমিই পারবে অলকানন্দা, এবার খোঁজো।”

অবাক ইসমত – “কী খুঁজবো কবি?”

“সুখপাখি।”

-“সুখপাখি?”

নগরকবি থেমেছিলেন।  তাঁর থেমে যাওয়াটুকুতে বিষণ্ণতা, তিনি বলেছিলেন, “ছোট্টবেলায় বাবার মুখে গল্পটা শুনেছিলাম। বাবা শুনেছিলেন তাঁর বাবার কাছে। ভোর হবে হবে মুহূর্তে, একটা পাখি উড়ে বেড়ায়, ঘুরে বেড়ায়, গান গেয়ে ওঠে। তার নাম সুখপাখি।

– “আপনি তাকে পেয়েছেন কবি?” ইসমতের কণ্ঠে বিস্ময়, চোখে জাদু।

” অত সহজ তো নয়। সে নিজেকে লুকিয়ে রাখে, সহজে কারো সামনে আসে না। তবে কোনো মানুষ যদি একবার কোনভাবে এই পাখির দেখা পায় বাকি জীবন তাকে আর কোন দুঃখ-কষ্ট স্পর্শ করে না, সে সুখী হয়। হাতে গোনা অতি সৌভাগ্যবান কিছু মানুষই শুধু তার দেখা পায়। কাকে দেখা দিবে সেটা একান্তই নির্ভর করে সুখপাখির নিজের মর্জির উপরে। সে না চাইলে হাজার খুঁজেও কেউ তার দেখা পাওয়া সম্ভব নয়। আমি সারাজীবন খুঁজেছি। এমন খুঁজতে খুঁজতে কেমন কবি হয়েছি দেখো। সুখপাখি পাইনি। এ এক নেশার মতন।”

-“আপনি খুঁজে পাননি। আমি কী করে পাবো?”

“চেষ্টা করো ইসমত। তুমি সোনার সকাল তৈরী করেছো। তুমি চেষ্টা করো। সোনার এ পাখি খুঁজে দেখো। পারলে তুমিই পারবে। আমার তো বয়স শেষ। চোখের আলোও কমে আসছে। তুমি খোঁজো।”

-“কিন্তু আমি যে সুখী। আমার তো আর সুখের প্রয়োজন নেই।”

কবি হেসেছিলেন। তিনি এখন আর বিষণ্ণ নন। তার কণ্ঠে আশার ফুল ফোটে, “ইসমত তুমি তো তোমার জন্য সুখী। তুমি সুখপাখি খুঁজে পেলে, মসুরিও যে সুখী হবে। চারদিকে সুখ হবে, তবেই তো তুমি পূর্ণ হবে। তুমি কি সুখপাখির খোঁজ করবে না? “

নগরকবি বহুদিন আর কবিতা লেখেন না। তবু নিয়ম ভেঙে ভালোবেসে চলে যাওয়ার আগে ইসমত অলকানন্দাকে কবিতার টুকরো পংক্তি লিখে দিয়ে গিয়েছিলেন। ইসমত অলকানন্দা তা পরম যত্নে গুছিয়ে রেখেছে। আর খুঁজে গেছে সুখপাখি। নগরকবি ঠিকই বলেছেন, সুখপাখি খোঁজা যেন এক নেশা, ধ্যানের মতন ঘোর জাগানিয়া।

সেই তারুণ্যে ডুবিডুবি ইসমত অলকানন্দা আজও তাঁর আশি পার করা জীবনে খুঁজছেন। প্রতিদিন ভোর সেচে ফেলেছেন, তাঁর পালকের মতন দুচোখে। সুখপাখির খোঁজে। কতকিছু এসেছে জীবনে, এলাচি ফল ঘিরে বসন্তের প্রভাত উৎসব ফুলে ফলে ভরে উঠেছে। ইসমত অলকানন্দা স্ত্রী হয়ে, মা হয়ে জীবনের কত রূপ ধারণ করেছেন। তবু সুখপাখির নেশা তার কাছে সবচেয়ে সত্য। আশি পার করে আরো তিন বছর বেঁচে ছিলেন। শেষ দিনেও চোখের শেষ আলোতে, সবটুকু দিয়ে সুখপাখি খুঁজেছেন।

ইসমত অলকানন্দা চলে যাবার পর, এলাচি ফলের বাগানেই তার সমাধি বানিয়েছে পরিবার আর মসুরির মানুষেরা। এলাচি ফলের সুঘ্রাণে মেখে থাকে সমাধি। সমাধির এক পাশে ছোট্ট টিলা করে রঙিন ফুলের জংলা তৈরী করেছে মসুরির স্থপতি। খুব ভোরে আশেপাশের পাখিরা টিলার উপরে এসে বসে। হু হু একটা গুনগুন সুর ভেসে আসে সব পাখিদের মাঝ থেকে। সবাই খোঁজে। কেউ সুরের ঠিকানা খুঁজে পায় না।

সেই যে নগরকবি লিখে দিয়েছিলেন কবে ক’লাইন ইসমত অলকানন্দার জন্য, তাঁর সমাধির পাশের সেই টিলায় টুকটুকে সোনালী রঙে খচিত,

“দিয়েছো টান

পেয়েছো জীবন?

খুঁজেছো কি সময়

জীবনের চেয়েও দামি?

আহা সুখপাখি।”

আর মসুরির মানুষেরা বলে, “এখানেই আছে সুখপাখি, নিশ্চিত।”


কিযী তাহ্‌নিন

জন্ম ১৩ জানুয়ারি, ঢাকায়। পেশায় তিনি একজন উন্নয়নকর্মী। বাংলাদেশের সংস্কৃতি এবং ক্রিয়াটিভ ইন্ডাস্ট্রির প্রচার প্রসারে কাজ করে যাচ্ছেন নিরলস।

কিযী তাহ্‌নিনের আলোচিত গল্পগ্রন্থ ‘ইচ্ছের মানচিত্র’ (২০১৯), ‘আছে এবং নাই’ (২০২০) এবং ‘বুধ গ্রহে চাঁদ উঠেছে’ ( ২০২১) এবং দেড় নম্বরি (২০২২), ইতি হেকমালন্তি (২০২৪)। দেশের এবং দেশের বাইরে তার লেখা গল্প অনূদিত হচ্ছে ইংরেজি ভাষায়।

তিনি তার গল্পগ্রন্থ বুধ গ্রহে চাঁদ উঠেছে’র জন্য ব্র্যাক ব্যাংক সমকাল সাহিত্য পুরস্কারে ২০২১ এ ভূষিত হয়েছেন।

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!

Discover more from

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading