হাসান রোবায়েত’র কবিতা

মায়ের চিঠি কেমন হয়?

আমি যখন মাদরাসায় পড়তাম তখন প্রতি বৃহস্পতিবার আসরের নামাজের পরে একজন পিয়ন আসতেন হাতভর্তি চিঠি ও মানিঅর্ডার নিয়ে—তাকে গোল হয়ে ঘিরে ধরত প্রায় সমস্ত তালেবে এলেম—যেন হাজার বছরের দুর্ভিক্ষের পর কেউ একজন এসেছেন বেহেশতি আঙুর নিয়ে—যে সপ্তাহে আমার চিঠি আসত না আমি তরুণ ডালিমের দানার মতো রসহীন হয়ে যেতাম, খুব মন খারাপ হতো আমার—

আব্বা চিঠিতে খুব বেশি কিছু লিখত না, এই যেমন—অদ্যই তিন শত টাকা পাঠাইলাম, আমরা বাড়ির সবাই ভালো আছি। মন দিয়ে লেখাপড়া করো—এমন—

কিন্তু এইটুকু কথায় আমার মন ভরত না। যেন গাঙের শুকিয়ে যাওয়া তলানিতে যে জিয়ল মাছ পানির অভাবে খলবলায় আমার অবস্থাও হতো তেমন। আমি খালি ভাবতাম আমার ক্লাস থ্রি পাস মা যদি আমাকে চিঠি লিখত তাহলে কী কী লিখত মা! আমি খালি ভাবতাম, মায়েদের চিঠি কেমন হয়! মায়েরা কী লেখে বহুদিন দূরে থাকা তার সন্তানকে—!

মাদরাসায় সেই ছোট বয়সের আমি কল্পনায় মা’র চিঠি পড়তাম—মা লিখেছে—‘তালতলা থেকে তোকে যখন ধরমপুর নিয়ে আসি তুই কেমন হেমন্তের সরু সরু বাতাসের মতো ঘুমিয়ে পড়তি, আমি তোকে দেখাতাম ধইঞ্চার বনে বাতাস কেমন ডালিম ফুলের মতো রাঙা হয়ে আছে—সুবিলের ওই পাড়ে তুই যখন মোনামুনির খোঁজে চলে যেতি হাঁটুপানি পার হয়ে তখন পাখির মরণের মতো শ্বাস ছোট হয়ে আসতো আমার যেন কোনো বিজন দিঘির রাক্ষস তোকে লুকিয়ে ফেলবে তালপুকুরের গহিন পানির তলায়—’

আমি ভাবতাম, মা আমার ছোট বোনের কথা লিখবে, কীভাবে তরতর করে সজনা পাতার মতো ঝলমল হয়ে উঠছে আমার ছোট বোন! লাল পেয়ারার গাছে বুলবুলি পাখির বাসার কথা লিখবে—আমাদের কাকরোল গাছের ফুলে সকালের রোদ কীভাবে আলস্যে ঘুমিয়ে পড়ে সেসব লিখবে—

আমি মনে মনে পাতার পর পাতা মা’র চিঠি ভাবতাম—কিন্তু মা আমাকে কোনোদিন তার ভাঙা ভাঙা হাতের লেখায় কিছুই লিখে নি—আচ্ছা, মার কী আমাকে কখনো লিখতে ইচ্ছা করত না যে ‘কাসেম মাস্টারের আম বাগানে যে লিচুর গাছে তুই সারাদিন খেলতি কারা যেন সেই গাছ নিজাম ডাকাতের মতো কেটে ফেলেছে—!’

আমার মায়ের চিঠি আমার কোনোদিন পড়া হয় নি—আমিও কোনোদিন বলতে পারি নি, ‘মা, চিঠি লিখো—’

খালি ভাবি, মায়ের চিঠি কেমন হয়?


আব্বা

ইদানীং আব্বা ফোন করলেই
অভিযোগ করেন
তার কোমরের শক্তি কমে আসছে—

একদা প্রতাপশালী আমার পিতার শরীর যেন
বনের ধূসর হাওয়ার মতো
দিনদিন জুবুথুবু হয়ে আসছে—

আমি আব্বাকে নিয়ে কবিতা লিখি
কিন্তু জানি, এসব কবিতা তিনি
ভুলেও ছুঁয়ে দেখবেন না—

আর আমি বাতাসে রঙ্গন ফুলের মতো
কাঁপতে কাঁপতে
তার সামনে দাঁড়াতে ভয় পাবো চিরকাল—


মা-কে

বাড়ি থেকে ঢাকা ফেরার সময়
মা রাস্তা পর্যন্ত এগিয়ে দিতে আসে—
ফ্রিজ থেকে বরফ করা গোশতো, খেতের সবজি
আর কত কিছু ব্যাগভর্তি করে বেঁধে দেয়—
আমার সাথে হাঁটতে হাঁটতে মার কোমরে
নিশ্চয়ই অনেক ব্যথা হয়—মা তা-ও হাঁটে—

ঢাকায় ফিরে আমি যখন সেই ব্যাগ খুলি
মনে হয় কয়েক শ মাইল দূরে থাকা
আমার মায়ের কান্নারত মুখ, নির্জন চোখ
এক এক করে ভাসতে থাকে প্রতিটা আনাজের গায়ে—

রাস্তা পর্যন্ত এগিয়ে দেওয়া আমার মাকে
আমি কোনোদিন পেছন ফিরে দেখি না

আমার ভয় হয়—


মায়ের কাছে লেখা চিঠি

আমাদের তখন বেহিসাবী গরিবি—তুমি জানো, গরিবিতে কখনো জুঁই ফুল ফোটে না প্রান্তরের সন্ধ্যায়—আমি ছিলাম লা জবাব জেদী আর বৈশাখের বৃষ্টির মতো রাগী—আমার খাবার নিয়ে মা দুঃশ্চিন্তা করত দিনমান—কিন্তু আব্বার নিরুদ্দেশ হওয়ার পর মা কিছুতেই আমাকে ভালো ভালো খাবার দিতে পারত না—আর আমি হয়ে উঠতাম হেমন্তের মাঠজুড়ে ঝরে যাওয়া হরবোলা পাতার মতন—

আমার বড় চাচা থাকতেন রাজশাহীতে—মা চাইত আমি যেন সেই সুবিলে সাঁতার শেখা বয়সে বড় চাচার বাসায় চলে যাই—সেখানে নাকি ডালিম ফুলের পাঁপড়ির মতো মেঘ দেখা যেত দুই তলার ছাদ থেকে—একদিন ধরমপুর, মোনামুনি বন, মীর আলম, আমার সজনে ডাঁটার মতো ছোট বোন, আর ভাইকে রেখে চলে গেলাম রাজশাহী—

আমাকে দেখে আমার বড় চাচি মোটেও খুশি হলেন না—বানের উটকো পানির মতো মনে করলেন আমাকে—যেন অসময়ে বৃষ্টি এনে তার ঘরের মধ্যে এক হাঁটু পানি নিয়ে ঢুকে পড়েছি আমি—বড় চাচা যখন বাসায় থাকতেন না চাচি আমার গাল আর পিঠকে মনে করতেন বনের সেই খয়েরি বৃ¶ের মতো যাকে কেটে ফেললেই সাফ হয়ে যাবে বনপথ—আমি বাথরুমে একা একা কাঁদতাম, সে কান্না কেবল শুনতে পেয়েছিল বাড়ির শান্ত পেঁপে গাছ—

ভাবতাম, মা’র কাছে চিঠি লিখবো—কিন্তু খাম কেনার পয়সা কই—! একবার এক বন্ধু আমাকে খাম কেনার পয়সা দিয়েছিল—আমি টিকাপাড়ার সুমসাম গোরস্থানে বসে আমার মায়ের কাছে চিঠি লিখেছিলাম, ‘মা, এখান থেকে আমাকে নিয়ে যাও, আমি আর ভালো খাবারের জন্য জেদ করবো না কোনোদিন, তুমি যা-ই দেবে আমি তা-ই খাবো’ আরও অনেক সবুজ ও নীল রঙের কথা—এমন কি ট্রাকের চাকার নিচে মরে যাওয়ার কথা অব্দি—

তারপর ঠিকানা লিখে সেই হলুদ খাম আমি পোস্ট করি। যেন শান্ত দুপুরের স্থবিরতায় উড়ে আসছিল অজস্র শেফালির ফুল—আমার মায়ের হাতে সেই চিঠিটা কোনোদিনই পৌঁছায় নি—

খামের উপরে লেখা ঠিকানাটা ছিল ভুল—

 ♣
নিজের কথা

মাকে নিজের কথা বলতে পারি নি কিছুই
খয়েরি পাতার মতো বিষণ্ণতা,
সুইসাইডের ইচ্ছা—কিছুই না—

যদি মাকে সবকিছু খুলে বলতে পারতাম
যেভাবে বনের কাছে
বসন্ত বলে দেয় সব—

মাকে কিছুই বলতে পারি নি
কেন সুইসাইড নোটের পাশে
রোজ আমি রেখে দিই পথের বকুল—

 ♣
ফোনকল

বাড়ি থেকে অসময়ে কোনো ফোন আসলেই
আমি ভয়ে তটস্থ হয়ে যাই
মনে হয় আমার বুকের মধ্যে কে যেন
মেরে দিয়েছে শোকসভার সীল-মোহর—

মনে হয় আমার মায়ের কিছু হয় নি তো!
আব্বা কি ঠিকঠাক জেগে উঠেছে
রাত্রির মেরুণ ঘুমশেষে—?

হঠাৎ এইসব ফোনকলে আমি
এতটা ভয় পাই যেন
আমার এতিম হওয়ার সম্ভাবনায় কেঁদে উঠছে তুঁতবন—

আমার মা আর আব্বা যেন রোহিত মাছের মতো
সন্তরিত থাকে সারাক্ষণ
আমি সেই দোয়ায় হাত তুলে রাখি দিনমান—

বাড়ি থেকে অসময়ে ফোন আসলে
আমি ভয়ে বরফ হয়ে যাই
মনে হয়, এই তো আমার স্বজনের চলে যাওয়ার বার্তা
ঘোষিত হবে মসজিদের মাইকে মাইকে—



ঋণ

মা’র কাছ থেকে টাকা ধার চাইলে
মা হাসে—
এটা সেটা বলে তারপর টাকা দেয়
আমি সেই ধার কখনোই শোধ করতে পারি না—

ঝরা পাতা কি
হেমন্তের ঋণ শোধ করতে পারে কখনো—?


জিজ্ঞাসা

মাকে ফোন করে যখন জিজ্ঞাসা করি—
‘তোমার শরীর কেমন মা?’
এই প্রশ্নের পরেই আমার হাত-পা হিম হয়ে আসে—
মা’র কণ্ঠে তখন বিপন্ন বাতাসের ঢেউ
গলায় শান্ত সমুদ্রের লবণাক্ততা—

সন্তানেরা বড় হওয়া মানেই
মায়ের শরীরে হলুদ বনের ঝরাপাতার বিষণ্ণতা
সারি সারি অসুখের ক্লেদ—

‘মা, তোমার শরীর কেমন—?’
এই ভয়ংকর জিজ্ঞাসার কোনো জবাবই দিতে পারে না মা—  


আলো

কবিতার কাছে আমি কী চাই—
দুধভাত?
ইলিশ মাছের তরকারি?

এসব কিছুই না—

গভীর রাত্রিতে আমার মা যখন
কোমরের ব্যথা নিয়ে হেঁটে যায় কলপাড়ের দিকে
আমার প্রতিটা কবিতা যেন তখন জ্বলে ওঠে
তার সমস্ত পথ জুড়ে—

আমার মাকে

আমি আমার মাকে কোনোদিনই
বলতে পারি নি ‘ভালোবাসি’—
আমি আমার মাকে কোনোদিনই
জড়ায়ে ধরতে পারি নি
হেমন্তের পুরানা পাতার মতো—

খালি দূর থেকে মার কথা মনে পড়লেই ভাবি
সারাটা বাড়ি জুড়ে প্রতিদিনই ফুটে ওঠে
কৃষ্ণচূড়ার ফুল—


হাসান রোবায়েত

জন্ম ১৯ আগস্ট, ১৯৮৯; বগুড়া।

প্রকাশিত বই — ঘুমন্ত মার্কারি ফুলে [কবিতা; চৈতন্য, ২০১৬ ঘুমন্ত মার্কারি ফুলে [ভারতীয় সংস্করণ, বৈভাষিক, ২০১৮ মীনগন্ধের তারা [কবিতা; জেব্রাক্রসিং, ২০১৮ আনোখা নদী [কবিতা; তবুও প্রয়াস, কলকাতা, ২০১৮ এমন ঘনঘোর ফ্যাসিবাদে [কবিতা; ঢাকাপ্রকাশ, ২০১৮ মাধুডাঙাতীরে [কবিতা; ঐতিহ্য, ২০২০], তারাধূলিপথ [ঐতিহ্য, ২০২১], মুসলমানের ছেলে [ঐতিহ্য, ২০২২], রুম্মানা জান্নাত [তবুও প্রয়াস, ২০২২]

ই-মেইল : hrobayet2676@gmail.com

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!

Discover more from

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading