কথ্য-অকথ্য ও নানা পথ্য | মোস্তফা হামেদী

বাংলা কবিতার ভাষা বদলে হালে বেশ চাউর একটা বিষয়, কাব্যভাষায় কথ্যরীতির ব্যবহার। এই বিষয়ে আলাপ পাড়ার আগে একটু ইতিহাসের দিকে নজর ফিরাই। আমাদের চর্চিত ভাষার যে গণগ্রাহ্য আদল, তার কিছু হালচালও জানা যাক।

 

পুরান কথার জের ধরে

আধুনিক কালে ভাষা-বিতর্কে প্রতিষ্ঠানের মাতবরি দেখলে সুলুক নিতে ইচ্ছা করে ভাষা নিয়ে তাদের ভাজা মাছ উল্টে খেতে না পারা নিরাপদ ভূমিকার। বস্তত এই দেশে ভাষা নিরীক্ষায় বা ভাষা বিতর্ক নিষ্পন্নে প্রতিষ্ঠান প্রভাবশালীর-ই পোষক হয়েছে। নিজে কিছু সৃষ্টি করে নি। তাদের ভূমিকা মূলত পশ্চাৎবাহিনীর। সামরিক কাঠামোতে এমন কোনো বাহিনী আছে কিনা জানি না, তবে অগ্রবাহিণীর পিছে পিছে ধায় বলে এমন একটা নাম আমি দিলাম। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের কথা অনেকে বলবেন, কিন্তু অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান (সংবাদপত্র, সাহিত্য একাডেমি, বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজের সাহিত্য বিভাগ) মূল ধারার বাইরে গিয়ে নিজেদের প্রতিপত্তি জাহির করছে বলে জানা যায় না। বঙ্কিম কিংবা প্রমথের ভাষাচিন্তা ও সাহিত্য উদ্যোগ  ব্যক্তিগত সাহিত্যিক উদ্যোগ-ই অনেকটা। তাতে প্রতিষ্ঠানগুলি পরে এসে সায় দিয়েছে। ফলে এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ নজির আমাদের এখানে যে, ব্যক্তি সাহিত্যিকের উদ্যোগ ছাড়া এইখানে অন্য পক্ষগুলোর কাছ থেকে নতুন কিছু পাওয়ার আশা কম। গঁতে বাঁধা থাকতেই তাদের পছন্দ। তো কথ্যরীতি, যেটাকে আমি বলবো ভাষার ‘সহজাত চেহারা’, প্যারীচাঁদ মিত্র যেটাকে সাহিত্যের বাহন করলেন, পরবর্তীযুগের সাহিত্যভাষা সেই দিকে না যেয়ে এগিয়েছে ঈশ্বরচন্দ্রের ভাষার অনুগামী হয়ে। প্রথম কালের এই চিহ্নগুলা খেয়াল না করলে বোঝা যাবে না আমাদের আধুনিক মন কীভাবে কাজ করে। ‘লিখিত’ ব্যাপারটাকে ব্রিটিশ ভারত বা তার পরবর্তী যুগে সম্ভবত অভিজাত ব্যাপার বলেই ভাবা হয়েছে। ফলে সাহিত্য ভাষা সবসময় সমাজের ঐ অভিজাত শ্রেণিটাকে মান্য করে করে এগিয়েছে। প্যারীচাঁদ, দীনবন্ধু বিষয়ের খাতিরে বেশ নমনীয় হয়েছেন, সনেটে মধুসূদনও। কিন্তু সেটা মূলধারা হিসাবে গড়ে ওঠে নি। গীতিকাব্যের দাবির কাছে বিহারীলাল কাব্যভাষাকে স্বাদু করেছেন, যেটা রবীন্দ্রনাথের কাজকে বেশ সহজ করেছে। কিন্তু লোকের মুখের দিকে কান পাতার চেষ্টা সেখানে প্রবল ছিল বলে মনে হয় না। এ কারণে ‘লোক কবি’ বলে আরেকটা শ্রেণি সৃষ্টি হয়েছে কিংবা একাডেমিক জগতের জাত ঠিক রাখার জন্য এই বর্গ তৈরি করা হইছে। নাম যাই হোক, লোকের মুখের বুলি-কে সবচেয়ে আদর করেছে ‘লোক’ কবিরাই। এই কারণে আধুনিক বাংলা কবিতাভাষাকে বা সাহিত্যভাষাকে কৃত্রিমতার দোষ, মানুষের সাথে বিচ্ছিন্নতার অভিযোগ শুনতে হয়েছে— হচ্ছে আজিও। ফলে বাংলা সাহিত্য চর্চার জমিনে কথ্য ও অকথ্যের একটা লড়াই ভিতরে ভিতরে জারি আছে পুরা আধুনিক সময় জুড়েই।

 

ভাষা ব্যবহারকের শ্রেণি তল্লাশ

আধুনিক সমাজ যত সংগঠিত হইছে, মধ্যবিত্ত শ্রেণি বিকশিত হইছে তত বিপুল বিক্রমে। ব্রিটিশ ভারত যুগ, পাকিস্তান যুগ পার হয়ে বাংলাদেশ যুগেও মধ্যবিত্ত শ্রেণিই মূলত কলা-শিল্পের নিয়ন্ত্রক। এই শ্রেণির সাথে উৎপাদনের সম্পর্ক নাই। এরা ফাটকা পুঁজির সুবিধাভোগী। বেশিরভাগই দেখা যাবে কাজ করে সেবাখাতে। কিংবা কায়িক শ্রমের প্রয়োজন হয় না এমন জায়গাগুলিতে। আর ব্রিটিশরা যে লাইফস্টাইল শিখাই দিছে, তারা সেটাকেই মোক্ষ করেছে। ফলে তার আমদানি করা পরদেশি লাইফস্টাইলের অনুষঙ্গ সাহিত্যও হয়েছে পরজীবি সদৃশ, কৃত্রিম বা আড়ষ্ট। ব্যক্তি কবির জীবনের যোগ আছে বটে, কিন্তু সমাজের ভাষা সেখানে গরহাজির থেকেছে। বড়লোক মন দিয়েছে বিলাসিতায়, মধ্যবিত্ত পরজীবীতায় আর নিম্নবিত্ত সৃষ্টি করে নিয়েছে নিজের স্বভাবের শিল্পী, কবি, নাট্যকার।

মধ্যবিত্ত শ্রেণি হিসাবে বড় ও ক্ষমতাবান হওয়াতে আধুনিক সাহিত্যে তাদের যোগান ও  ভোক্তা বড় দেখা যায় ৷ কিন্তু ঝামেলা বেধে গেল যখন গরীব লোকেরা শিক্ষা নিল, বিদেশে শ্রম দিয়া টাকা আনলো কাড়ি কাড়ি। দুনিয়াকে দেখার ফুসরত পাইলো তারা। সুযোগ পাইলো নিজের হিসাব বুইঝা নেওয়ারও। ফলে তারা দেখলো সাহিত্যে তারা নাই। তারা পয়সা কামাক আর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুক তথাকথিত ‘খ্যাত’ ভাষাটাকে ছাড়তে পারলো না। কারণ তাদের রক্তে ময়ূরপুচ্ছ পড়ে কাক হয়ে ময়ূর সাজার চল নাই। তারা যা তাই। ভনিতা নাই ৷ লুকানি নাই।

তাদের দ্বিতীয় প্রজন্ম পড়াশোনা শিখেই ক্ষান্ত হয় নাই কবিতাও করতে চায়। ফলে সংকটটা দানা বাঁধা শুরু হইলো। পঞ্চাশ এবং ষাটে আমাদের সাহিত্য-ভাষার ক্রাইসিস ছিল জাতীয়তাবাদী, তার কিছু আগে স্বাতন্ত্র্যবাদী। কিন্তু শ্রেণি ব্যাপারটা ঐখানে কাজ করে নাই। বা ফ্যাক্টরও ছিল না। এইটা মূলত তৈরি হইছে নব্বইয়ের অর্থনৈতিক উদারনীতির কারণে (আরও আরও কারণও আছে, সমাজতত্ত্বের লোকেরা সে ওয়াজ করবেন), যখন আমাদের মধ্যবিত্তের পুরাতন চেহারা বদলাই গেছে। ভাঙন ধরছে তার মধ্যে ৷ তার যে প্রথাগত আভিজাত্য, দৃঢ় গড়ন সেটা নড়বড়ে হয়ে গেছে। প্রচুর ছোটলোক সেখানে ঢুকে বদলাই দিছে বাংলাদেশের ভাষা পরিস্থিতি। ফলে এখন আর কারো থেকে ছিনিয়ে আনার ব্যাপার না থাকলেও, নিজের শ্রেণির শব্দ, ভঙ্গি সাহিত্যে তারা খুঁজতে শুরু করেছে। আমার ধারণা, আমাদের সমকালীন কথ্য ভাষা বিতর্কের এইটা গোড়ার দিক। এর পাশাপাশি  আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক ভাষা যা বাংলা ভাষার পুরাতন রাজধানী কলকাতার রীতি বা প্রমিত রীতিকে মান্য করেছে, মুক্তিযুদ্ধের পরে নতুন রাজধানী ঢাকায় সে ভাষা বাস্তব কারণেই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।

কথ্য ভাষার সাথে মানুষের শরীরের যোগ আছে। পুস্তকী বা প্রাতিষ্ঠানিক ভাষায় শরীরের লগে সম্পর্ক না রাখলেও চলে। আর কথ্য ভাষা চিরচঞ্চল। সজীব। এই কারণে কবিতার ভাষাকে সমকালীন করতে চাইলে মানুষের মুখের লগে সম্পর্ক থাকার জরুরত আছে। কিন্তু কবিতার কি মানুষের লগে থাকার দায় আছে? এই ব্যাপারটাতো একাডেমিক পর্যায়ে সারলেই হয়। সেখানে বেশ পরিশীলিত মেজাজে শিল্প সারা যাবে। এইরকম একটা হাবভাব একাডেমিক লেভেলে সম্ভবত আছে।

কিন্তু সাহিত্যে একাডেমি বরাবরই পশ্চাতে চলে। কবি চলে তারও আগে ৷ কবিকে শেখান তার ভোক্তা ও নিজের শ্রেণি। ফলে জৈবিক ও আর্থ সামাজিক সব জায়গা থেকেই সাহিত্য ভাষার বদল অনিবার্য হয়ে উঠছে।

নব্বই দশকের কবিদের অনেকেই পুরাতন কাব্যভাষাকে আঘাত করা শুরু করলেন। এ সময় বাক্যগঠন আর ক্রিয়াপদের গতানুগতিক ব্যবহারের বাইরে আঞ্চলিক বা কথ্যভঙ্গিকে কবিতায় প্রয়োগ করতে চাইলেন তারা ৷ এই প্রবণতাকে কেউ বললেন প্রমিত বিরোধী, কেউ বললেন কলকাতাই বিরোধী পুববাংলার ভাষা। কিন্তু শ্রেণি ব্যাপারটাকে সম্ভবত কেউই বিবেচনায় আনেন নাই। কলকাতাই প্রীতি তো ঢাকায় কম নাই, বরং আমাদের শিক্ষিত সুশীল গ্রুপটা কলকাতাই আর প্রমিতও বটে। এখন এদের বিরোধী কারা? ধাপ করে একদল ‘ভুষিমাল’ বলে বসবে এরা সাম্প্রদায়িক। ফলে আলাপ ফোকাস হারায়ে চলে যাবে সাম্প্রদায়িক-অসাম্প্রদায়িক বাইনারিতে। বস্তুত এই কলকাতাই বিরোধিতা-প্রমিত বিরোধিতা একটা শ্রেণি বিষয়ক মামলা, যেটা রুজু করা হইছিল বঙ্গের ইতিহাসের বড় উকিল ফজলুল হক সাবের নেতৃত্বে। সেই যে জমিদারতন্ত্র উচ্ছেদ করতে চাওয়া কৃষক শ্রেণি, তারা পাকিস্তান বানাইয়া সাচ্চা মুসলমান হইতে গিয়া দেখলো আইডেন্টিটি নাই। তারপর ভাষার লড়াই কইরা ‘আইডেন্টিটি’ জাগাইতে জাগাইতে নয়া দেশ বাঁনল। কিন্তু ঘুইরা-ফিইরা হেই কইলকেতা, হেই পরমিত। ফলে আবার তারা তলানিতে গেল ৷ পুকুরে পানির তলে দম নেওয়ার জন্য ছোটকালে আমরা তলানিতে গিয়া শক্তি নিয়া ভাইসা উঠতাম। বেশ জোর পাওয়া যাইতো তাতে। ঐ ব্রিটিশ আমলের কৃষকশ্রেণি তলানিতে গিয়া জিরাই নিয়ে আবার শক্তি জোগাইয়ে উঠে দাঁড়াতে লাগছে ৷

খেতের কাজে না পোষানোয়/দিন মজুরি কাজের সংকটে এই শ্রেণি মধ্য আশি থেকে বিদেশে পাড়ি দিল। বেশিরভাগই গেল ‘মিডলইস্টে’। আরেকটা অংশ ঢাকা আসলো গার্মেন্টসে কাজ করতে ৷ আমাদের অর্থনীতির যে সাইজটা- তা এই শ্রেণিটাই যে বড় করছে, তা সকল অর্থনীতিবিদরা আজ গাইতেছেন। এদের পূর্ব পুরুষরাই আগে পাটের ক্ষেতে কাম করতো। এরা সংখ্যায় বিপুল। এক দশকের মধ্যে মধ্যবিত্তের মূল অংশ হয়ে উঠলো এরা। এদের ভাষা অপ্রমিত, অকলকেতাই। এদের চোখজোড়া সবুজ বাংলা। শিক্ষাও নিতে থাকলো এরা। এই যে নতুন অর্থনীতি, মফস্বল শহরের বাড়বাড়ন্ত, ঢাকার উপচেপড়া ঢমক— তাতে এদের অবদান সবচাইয়া বেশি। ফলে সমস্ত কিছুতেই প্রভাব ফালাইতে লাগলো এরা। গ্রাম ছেড়ে আসা এইসব লোকের স্রোত ঢাকার চিরাচরিত আইলের  বাঁনকে আলগা করে টালমাটাল করে দিল। আর তার সবচেয়ে বড় প্রকাশ হিসাবে দেখা দিল ঢাকার লোকের নতুন ভাষাভঙ্গি। পুরাতন প্রমিত বিনাশ হয়ে, জনস্রোতে খাবি খেয়ে উঠলো একাডেমির হলঘরে, সংবাদপত্রের পাতায়, সংবাদ পাঠক/পাঠিকার  দাঁতচিবানো জবানে, অনুষ্ঠানাদির উপস্থাপনায়, আবৃত্তিশালায়। পথে পথে চায়ের দোকানে- আড্ডায় আঞ্চলিক বুলি মিশানো নতুন এক ভাষা জেগে উঠলো। নাটকে এবং কবিতায় সেই বুলিকে ব্যবহার করার চেষ্টা দখো গেল বেশ জোরেসোরে। যদিও কবিতায় সেটা ছিল নিরীক্ষারই ব্যাপার । কেননা উপরের ভোক্তাশ্রেণি তখনও ঐভাবে গড়ে ওঠে নাই। ফলে তখনকার শিল্পভোক্তাদের গড়রুচি আশির উল্লম্ফনের অনুগামী কোলকাতার রুচির মাপেই গড়া। যদিও নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, প্রচেষ্টাগুলি একটা ভিন্নতর ভবিষ্যতের চিহ্নবাহী হয়ে উঠতে পারছিল।

সেইসব চেষ্টা পরে প্রবলভাবে বাস্তবতা আকারে হাজির হইছে দ্বিতীয় দশকে ৷ যে শ্রেণিটা নব্বইয়ে দানা বাঁধতেছে, সেটা এখন আরও বড় আরও পোক্ত। তাদেরই একটা অংশ এখন সাহিত্যের ভোক্তা। লেখকও বটে ৷ ফলে বাংলা কবিতায় ভূমি ও ভূমিপুত্রদের স্বর আবার ফিরে আসছে। নব্বইয়ে যেটা ছিল বৈচিত্র্যসন্ধানী আন্দোলন। দ্বিতীয়ে সেটা আত্মসন্ধানী অভিক্ষেপে পরিণত হইছে বহির্বাস্তবতার প্রবল চাপে ৷ ভূমিকেন্দ্রিকতার সাথে যোগ হইছে নিত্য ব্যবহৃত সচল-সজীব ভাষায় কবিতা লেখার চল । সকলেরই কাজ একরকম নয়। বা দ্বিতীয়’র আত্মানুসন্ধানী, জনসংস্কৃতিলগ্ন কবিদের সকলের ভাষা, ভঙ্গি, কাজের ধরন এক নয়। কিন্তু একটা সাধারণ ব্যাপার বেশ দেখা যায়, সেটা হইলো নতুন ভোক্তাশ্রেণির রুচি ও চাহিদাকে আমলে নেওয়ার চেষ্টা। এই সময়ে একটা প্রতিরোধী ব্যাপারও বেশ দেখা যায়।

 

কথ্যের সীমা

যদিও কথ্যকে একমাত্র পথ্য ভাবার ব্যামোও হালে বেশ প্রকট। যেটা কখনো কখনো উৎকটও হয়ে ওঠে। ভাবখানা এমন যে, কথ্য বাগবিধি হুবহু না মানলে কবিতা আর পাতেই তোলা যাবে না। এই রকম একটা ‘চরমপন্থা’ আছে অনেকের বিচারে। আমার কাছে মনে হয় এই গুঁয়েমি নতুন কোনো পথ হয়তো দেখাইতে পারে। কিন্তু মূলস্রোত হয়ে উঠতে পারবে না। কেন?

১) কথ্যভাষা নিত্য চঞ্চল। দশক যাইতে না যাইতেই তার রূপ বদলাই যায়। কবিতাভাষা সেই গতির সাথে চলতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে না।

কারণ কবিতাভাষা হইলো অনেকটা পলির মতো, বন্যা শেষ হয়ে গেলে পরে যেটা রয়ে যায় সরের রূপে।

সর হইলো জাল দেওয়ার পরের ঘটনা। কথ্যভাষার কাকলি হইলো বন্যা চলাকালীন। খানিকটা উপদ্রবের মতো। গরমজাল দুধের মতো। জুড়াইলে কেবল খাওয়া যায়।

২) কবিতাভাষা পূর্বতন লিখিত টেক্সটসমূহের ভাষার লগে পরম্পরা মাইনা আগায়। এইখানে কবিতাজ্ঞানের সিলসিলার ব্যাপার আছে। কবিতাকে চেনার যে রুচি থাকে, সেই রুচির একটা ধারাবাহিকতা আছে। নতুন চিন্তা খাপ খাওয়ানোর উপযুক্ত পরিবেশ তৈরির জ্ঞান অর্জন করার ব্যাপার আছে। ফলে ধুপ করে কথ্যভাষা থেকে টুকে নিয়ে কবিতায় বসাই দিলেই চলবে না। কবিতাকে বোঝার যে তরিকা বর্তমান, বা যে তরিকা চলমান সেসবের লগে খাপ খাওয়ানোর ব্যাপার আছে। কবিতার ভাব ও বিষয়ের জুতমতো মেলার ব্যাপার আছে। সুরের মামলা আছে। ফলে কথ্যভাষাকে কাব্যচর্চার সাথে আপোষ-মীমাংসা করে আগাইতে হয়। নইলে কেবল বিপ্লবের রঙে যা ভাইসা উঠবে তার নাম হবে- ‘নৈরাজ্য’। নৈরাজ্যবাদীরা সুখি হইতে পারে, কিন্তু আমার কাছে মনে হয় নৈরাজ্য ভাষাবিক্রিয়ায় মধ্যবর্তী অবস্থা মাত্র। উৎপাদ নয়।

৩) কথ্যভাষা আর লিখিত ভাষার তফাত সব কালেই বর্তমান। লিখিত ব্যাপারটাই আদতে পরিশীলন, পরিমার্জন। কথ্যভাষা হইলো আকাঁড়া, কবিতাভাষা কাঁড়া। কেননা সেটা নির্মাণ। কবি তা বানান ৷ আর কথ্যভাষা প্রাকৃতিক। এই দুই বিভাজন অবধারিত সত্য। সে সত্যের বরখেলাপ যতই করা হোক না কেন, কবিতায় কবির হাত পড়া মাত্রই ভাষা নতুনরূপ লাভ করলো। ফলে তা আর কথ্য থাকলো না।

৪) কথ্যভাষার কোনো সার্বজনীন চেহারা নাই। অঞ্চল এবং ব্যক্তি বহু বৈচিত্র্য নিয়ে কথ্যরূপকে শাসন করে। ফলে সেখানকার সূক্ষ্ম ও স্থূল সমস্ত পার্থক্যকে ঘুচিয়ে দিতে পারে কেবল একটা ‘মিশালী সাধারণ ভাষা’। এই ভাষা আধা প্রমিত, আধা প্রাতিষ্ঠানিক, আধা নাগরিক, আধা গ্রাম্য।

 

কথ্য নহে যা

কথ্য নহে যা, তা কী? প্রথম যে উত্তর লোকের মাথায় আসবে তা হইলো—প্রমিত। কিন্তু এই বাইনারির বাইরে একটা ধুমল এলাকা আছে, সেটার নাম আমি দিছি—অকথ্য। এইটারে লোকেরা খারাপ ভাষা বা গালি হিসাবে জানে অনেকখানি। মূলত যে ভাষা সে কইতে চায় কিন্তু লোক-লজ্জায় বা লোকভয়ে/রাজভয়ে কইতে পারে না অথবা যে ভাষাকে ঘৃণা করে অস্তিত্ব সংকটের আশঙ্কায়, সেই ভাষাটাই অকথ্য ভাষা। কথ্য ও প্রমিতের বাইরে এই গুমরানো-অস্পৃশ্য ভাষার সম্ভাবনা নিয়া আলাপ পাড়তে চাই এইবার, যা অবশ্য ঘুরায়ে-প্যাঁচায়ে আমার ভাষা প্রস্তাবনার দুয়ারে গিয়ে হাজিরা দিবে শেষে।

এটা অনেকটা দেশাইল। এই ভাষা অগোচর ভাষা।  কিন্তু তাতে বিদেশি ভাষা, প্রাচীন ভাষা, ধর্মীয় ভাষা মিশতে পারে। মেশামিশি নিয়ে তার সমস্যা নাই। যতক্ষণ কান ও ভাব ‘পারমিট’ করে ততক্ষণ সব চলতে পারে। এইটা চলতি বুলির সাথে তাল রাখে, কিন্তু পুরাপুরি হেলে পড়ে না। কারণ প্রথার প্রতি, পরম্পরার প্রতি তার পক্ষপাত আছে। এই ভাষা অবদমিতের ভাষা। অকথ্য মানেই প্রমিত না। আবার কথ্য বিরোধীও না। এটা কথ্য-অকথ্য বাইনারির বাইরের বিশেষ এক ব্যাজস্তুতিমূলক অবস্থা। ভাষার সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম পর্দা পার হলে এক ধরনের অব্যক্ত এলাকাকেও আমরা এই রূপের মধ্যে চিহ্নিত করতে পারি। আরও কয়েক কাঠি সরেস হয়ে এটাকে বলতে পারি নীরবতার ভাষা। সেই এলাকার ভাষিক ফর্ম কথ্য-অকথ্যের ধার ধারে না, কবিব্যক্তিত্বের  মধ্যে তা নিষিক্ত হয়ে থাকে। পর্বতের পাথর প্রাকৃতিক। ইমারতে ব্যবহার করার কালে স্থপতির কল্পনা তাতে যুক্ত হয়। ফলে তা আর প্রাকৃতিক থাকে না। নতুন রূপ দাঁড়ায় তখন। ভাষার ক্ষেত্রেও এমন ঘটে। প্রায় প্রত্যেক কবি প্রাকৃতিক পাথররূপী কথ্যভাষার শব্দকে নিজের কল্পনা ও ভাব মিশিয়ে সাহিত্যের ইমারত তৈয়ার করেন। তিনি অবচেতনেই পুরাপুরি কথ্য নয় এমন একটা বিধিব্যবস্থার মধ্যে গিয়ে পড়েন। এই সূক্ষ্ম ভেদের জায়গাটা না বুঝলে কবিতার লিখিত ফর্মকে ধরা মুশকিল।

 

কথ্য নয় একমাত্র সত্য

প্রাতিষ্ঠানিক চর্চা, পূর্বতন নানা ধারা মানুষের চিন্তা ও কল্পনা তৈয়ার করে। কারণ আধুনিক কবিতা মাত্রই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার উপজাত। ফলে কেবল কথ্যকে একমাত্র সত্য ধরলে, এই বিরাট বলয়টা বাদ পড়ে যায়। যেটা কথ্য নয়। কথ্যভাষা থেকে কিছুটা দূরে থাকলেও তা অবোধ্য নয়, অচর্চিত নয়। মানুষের প্রতিদিনকার ব্যবহারে এই অ-কথ্য ভাষা প্রমিতের নাম ধরে আরেক সাধারণ ভাষা আকারে জারি আছে সমাজে। সে ভাষার বাক্য, পদক্রমকেও নানাভাবে খেলানো যায়। লোকেরা নিজের প্রাতিষ্ঠানিকতার লগে ব্যক্তিগততা, শিষ্টতার লগে অশিষ্টতা মিশায়ে নতুন নতুন ভাষারূপের আদল দিয়ে সেই সাধারণ ধোপধুরস্ত প্রমিতকে বাজারি করে তুলছেন। আমার প্রস্তাবিত ‘মিশালী সাধারণ ভাষা’য় তার থেকে রসদ হরেদরেই জুটবে।

 

ভাষার নগর-গ্রাম

শহর আর গ্রাম এই দুই ধরনের পরিবেশ মোটাদাগে আমাদের ভাষা চর্চার জায়গা। শহরের মিশালি সাধারণ বাংলা আর গ্রামের মিশালি সাধারণ বাংলা এক নয়। গ্রামেরটায় আঞ্চলিক বুলির অধিকার বেশি। মফস্বল শহরে (জেলা এবং কোন কোন বিভাগ) পাশ্ববর্তী অঞ্চলের বুলির মিশ্রণ থাকে। মূলত রাজধানী ঢাকা, যা আমাদের শিল্প-সাহিত্য চর্চার কেন্দ্র হিসাবে গড়ে উঠেছে বহুর শ্রমে, সেখানটায় পুরা দেশের প্রাণপ্রবাহ এসে যুক্ত হইতেছে, হৃদযন্ত্রে যেমন সারা শরিলের রক্ত এসে জমা হয়। নদীর মোহনায় যেভাবে পলি এসে পড়ে চর হয়, ঠিক তেমন করে একটা নতুন ভাষার চর সদা জেগে উঠতেছে সেখানে। সেইখানে ব্যক্তি তার অঞ্চল, পরিবার, ধর্মের বুলি নিয়ে নিত্য নিজের ভাষা রচনা করে চলে। এই ভাষা পুরা কথ্য নয়, আঞ্চলিক নয়, কলকেতাই ধরনের প্রমিত নয়। দেশের সকলে তাতে সাড়া দিতে পারে। বুঝতে পারে।

 

আমার বাছাই

মেটামুটি সকলে বোঝে সেই  ‘কমন’ শব্দগুলিকে ব্যবহার করার পক্ষে আমি। আঞ্চলিক এমন শব্দ আছে, যেটা ঐ অঞ্চলের লোক ছাড়া অন্যদের বোঝানো খুবই কসরতের ব্যাপার তা ব্যবহার করার জন্য ঐ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে, যতক্ষণ না তা দেশের সকলের বুলি হয়ে ওঠে। ধর্মীয় কেনো শব্দ যা ধর্মচর্চার পরিসরে বেশ প্রচল, কিন্তু সাধারণে অপ্রচল, তেমন শব্দে অপ্রয়োজনে কবিতায় ঠেসে দেওয়া জবরদস্তি ছাড়া কিছু না। তৎসম শব্দ যা তথাকথিত গাম্ভীর্য তৈরি করে, সেসব শব্দ যদি নতুন কোনো সুর তৈরি করতে না পারে, তাহলে চলিত বুলির ভাণ্ডারে খোঁজ নেওয়াই সমাধান।

আঞ্চলিক ভাষায় প্রচুর বিশেষ্যবাচক শব্দ আছে, যেগুলি খুবই শ্রুতিমধুর। ব্যঞ্জনা আনার ক্ষেত্রে সেসব ব্যবহার করলে নতুন স্বাদ তৈরি হইতে পারে।

শহর তৈরি করে গ্রামের লোকেরাই। কিন্তু অনেকের মধ্যে গ্রাম্য ভাষাকে ‘খ্যাত’ মনে করার অভ্যাস আছে। ইংরাজিকে, কারও কারও আরবিকে স্মার্ট মনে হইতে পারে। আবার অনেকে বলার সময় ব্যবহার করে যে বুলি, অর্থগত কোনো বিন্দুমাত্র পার্থক্য না থাকলেও, এবং চলতি শব্দটি মিষ্টি হওয়ার পরেও পুরানা অভ্যাসবশত লেখার ক্ষেত্রে কলকাতাই রূপ ব্যবহার করেন। যেমন, ‘বিকাল’ মুখে বলে সকলেই। কিন্তু লিখতে গেলে তার সেই ন্যাকা ভাবটা চলে আসে। ফলে লিখেন, ‘বিকেল’। একইভাবে পুরানা, পুরান বা পুরাতনকে ‘পুরনো’। ধুলি বা ধুলাকে ‘ধুলো’। বহুবচনবাচক শব্দ গুলি বা গুলাকে ‘গুলো’। টুকরাকে ‘টুকরো’। সাধারণত ও-কারান্ত উচ্চারণ হয়, এমন অনেক শব্দই এখনকার দিনে বাংলাদশে আ-কারান্তে বেশ প্রচলিত হয়ে উঠছে, ঐসব শব্দের ন্যাকা ও-কারান্ত প্রয়োগের চেয়ে আ-কারান্ত প্রয়োগরেই যথাযথ মনে করি। যেমন: জুতো>জুতা; মুলো>মুলা; তুলো>তুলা।

এই কারণে আমার প্রস্তাব হইলো, আমাদের চলতি বাংলা, গ্রাম্য ভাষা, যা দেশাল, সেই স্থানীয় রূপের সাথে যদি ভাবের মিল ঘটে, তাহলে কলিকেতা রূপ বা বিদেশি ভাষাকে এত খাতির করার অভিসন্ধি কী!

নোট: যদিও হালে ইংরাজি-আরবি কিছুকিছু শব্দ লৌকিক ব্যবহারে—সাধারণের জিবলার ঘষায় ঘষায় স্থানীয় হয়ে উঠছে, সেগুলার যথাব্যবস্থা করা যাইতে পারে। যেমন: স্ক্র্যাব> এসকেরাপ (বাজে লোক অর্থে; তরজমা।

 

শেষ কথার আগের কথা তথা সার কথা

আলাপ কেন্দ্র থেকে সরে গিয়ে বহুদূর ছড়ায়ে পড়ছে মূলত শ্রেণির ব্যাপারটা ধরার জন্য ৷ এখন রাশ টানা যাক। আমার মূল কথা বলার ছিল কবিতায় কথ্যভাষা ব্যবহার নিয়া যে চাউর উঠে থেকে থেকে সেইটারে বোঝা। এই চাউর এখন ধীরে ধীরে আলাপের কেন্দ্রে চলে আসতেছে। মূলত ফেসবুকে সম্পাদনাহীন লেখা প্রকাশ করার সুযোগ বাংলা ভাষা চর্চার পুরাতন রীতিকে ঠেলে দিছে চ্যালেঞ্জের মুখে । ফেসবুকে ভাষাচর্চার অবাধ সুযোগে লোকে প্রথমে হামলা দিছে চিরাচরিত গদ্যের ওপর। লাখো মানুষ লাখো ঢংয়ে প্রতিদিন নিজেরে প্রকাশ করতেছে এই নতুন মাধ্যমে। ফলে এইখানে বিভূতির মডেল, কী হুমায়ুনীয় মডেল বা রবীন্দ্র মডেল —কোনো কিছুই একাধিপত্য ফলাইতে পারতেছে না। লিটলম্যাগীয় মাস্তানদের ভাষারীতি ধরাই দেওয়ার মাতবরি ম্লান হয়ে শতফুল ফোটা-ই যেন অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠতেছে। এই অভিঘাত ধীরে কবিতাভাষাকেও করছে বদলের মুখামুখি। একই সাথে শ্রেণি ও মাধ্যম নির্ধারক হয়ে উঠতেছে নয়া কাব্যভাষার। এই নতুন বাস্তবতায় কথ্যভাষা কীভাবে কবিতাকে প্রভাবিত করতে পারে বা কতটা দখল নিতে পারে কবিতাভাষার, তার কিছু আন্দাজ করা যাক। সামগ্রিক জায়গা থেকে এগুলি ‘আন্দাজ’ হিসাবে ডিফাইন করলেও ব্যক্তি কবির জায়গা থেকে আমি মূলত আমার ভাষিক জগতেরই পক্ষ নিলাম। ফলে আমার তরফ থেকে এটা এক ধরনের কোমল চালাকি, যার ভিতর দিয়ে আমি আমার ভাষা বিষয়ক প্রস্তাবনাকে গণগ্রাহ্য চেহারাই দিতে চাইতেছি আদতে। এটাকে বিচারসভায় কেউ আত্মপক্ষ সমর্থন হিসাবেও দেখতে পারেন।

 

আন্দাজ-১

আমি তলায়ে দেখলাম, কথ্যভাষাকে কবিতার গন্তব্য ধরা একটা ‘অতিকল্পনা’ ছাড়া কিছুই না। লেখার ভাষার সাথে কথা বলার ভাষার বেশ খানিকটা দূরত্ব আছে ৷ এই দূরত্ব চিরায়ত এবং এটা বোধ করি থেকেই যাবে। তার গূঢ় কারণ—কথ্য ভাষার চাঞ্চল্য, বড় অস্থির তার মন। কথ্যভাষার রূপ অজস্র। এক ঘরেই অনেক রূপ। সমাজ আর রাষ্ট্রে তো গণনা করাও মুশকিল। ফলে কবিকে একটা আপোষের জায়গায় যেতেই হবে। এই আপোষ হবে চলমান লেখার ভাষার সাথে-চলমান লেখ্য মানবাংলার, যা প্রমিত নামে লিঙ্গুয়াফ্রাঙ্কা হিসাবে গৃহীত ও ব্যবহৃত।

আপোষ হইলে পরে যে ধরনটা দাঁড়াবে, সেইটা নিয়া আলাপে যাইতে চাই। তবে তার আগে আমাদের বিবেচনার কিছু নোক্তা দেওয়া যাক। যথা:

১. আমরা সাধারণত ধরে নিই বাক্যে ক্রিয়াপদের কথ্যরূপ থাকলেই তা অপ্রমিত। কিংবা ক্রিয়াপদের কথ্যরূপ ব্যতিরেকে প্রথাগত ভাষাকে আক্রমণ করার সুযোগ নাই।

২. ব্যঙ্গ বা ক্রিটিক না থাকলে বুঝি তা অপ্রমিত বা অ-কলকেতা হওয়া হইবে না।

অথচ কথ্যভাষা বা আঞ্চলিক ভাষা তো আরও বড় ব্যাপার ৷ সেটা কেবল ক্রিয়াপদ দিয়া পরিচালিত না। বা সেখানে কেবল রঙ্গ-ব্যঙ্গ-তামশা চলে না। সেই ভাষায় দরবার-কারবার, বিয়াশাদী, ধ্যান-জ্ঞান, ধর্ম-কর্ম সবই সমাধা হয়। অজস্র শব্দ আছে যেগুলি আমাদের ভারী ভারী প্রমিত কিংবা গম্ভীর তৎসম শব্দের পরিবর্তে ব্যবহার হইতে পারে ৷ আবার প্রচল প্রমিতের ভিতরেও বহু মিষ্টি, সহজ, স্বাদু শব্দ রহিয়া গিয়াছে ৷ তাদেরও আমি বাদ দিতে রাজি না। আমার আপোষের জায়গা হইলো এই। আমি যেমন সাহিত্যের নতুন ভোক্তা শ্রেণির আলাপে কান পাততে চাই। আঞ্চলিক ভাষা থেকে শব্দ নিতে চাই, প্রথাগত কাব্যভাষার গভীরতা থেকেও রসদ নিতে নারাজি হইবো না।

 

আন্দাজ-২

ফলে কথ্য-অকথ্য না, আমাদের নতুন কাব্যভাষার রূপ সহজিয়া ঘরানার। এই কারণে ভবিষ্যতের কবিতায় দুই মাত্রা বা তিন মাত্রার পদের ব্যবহার বাড়বে। যুক্ত ব্যঞ্জনঅলা শব্দ পরিহার করা হবে অনেকখানি। বড় বড় ও শক্ত উচ্চারণের তৎসম শব্দ ব্যবহার কমবে। সমাজে-লোকমুখে ব্যবহার হয় না এমন পুস্তকবাহিত শব্দ অভিধানেই ঠাঁই নিবে কেবল। কিছু ইংরাজি শব্দ ঢুকবে নতুন মিউজিক আনার কামে, পুঁজিবাদের দোসর হয়ে, গোলকায়নের গলি দিয়ে।  আর সমাজে ব্যবহৃত হয়ে নতুন ব্যঞ্জনা দিতে পারছে বলে। নতুন শ্রেণির রেমিট্যান্সের থ্রুতে আসা কিছু মুসলমানী ব্যাপার-স্যাপার ( শব্দ, আকিদা) নতুন করে যুক্ত হবে, তবে তাও জনসংস্কৃতির রুচির ছাঁকনিতে ছাঁকন হয়ে। শুদ্ধবাদীদের বারোটা বেজে যাবে, সে ধর্মীয় হোক আর অধর্মীয় হোক ৷ মোদ্দা কথা হইলো, আমাদের কবিতার বাঁকবদলে লেখ্য ভাষার কাঠামোর মধ্যে যেমন ঢুকে পড়বে কথ্যভাষার বহু শব্দ আর স্টাইল, পাশাপাশি অকথ্য বহু বিষয়-আশয়, যা বলা যাইতো না ভাষার একটা ‘রুচিসম্মত ও আধুনিক প্রমিত বিধি ব্যবস্থার’ কারণে, সেইটা এখন চাউর হইতে থাকবে। যাদের কান জনসমাজ থেকে দূরে থাকবে তাদের খুব বেশি আশা নাই ৷ একটা ঢিলাঢালা, সাধারণ, গাঁইয়া, সহজ ভাষা যেন কবিতায় নতুন ভোক্তা শ্রেণির পেয়ারের হয়ে উঠতেছে। এরা নিজের জীবনের যোগ চায় সাহিত্যে। ভাগও কি চায়? তারা নিজের প্রতিরোধকে দেখতে চায়। নিজের গালিবুলিকে পড়তে চায়। নিজের জলাঙ্গলার হাওয়ায় ভিজা কবিতা চায়। তার অবদমনকে খোলাসা করতে পারে, চায় তেমন মুক্ত ভাষা । সেটা কথ্য হল না অকথ্য হল বিষয় না, তার লগে নিজেগোরে মিলাইতে পারতেছে কিনা তারা সেইটাই বিবেচ্য!


মোস্তফা হামেদী

কবি, প্রাবন্ধিক

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!

Discover more from

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading