যেখানে ঝরাপাতা নিজের শব্দে বন | হাসান রোবায়েত | পর্ব ৯

যেখানে ঝরাপাতা নিজের শব্দে বন

 

৯     

নতুন নতুন বই আসে আবার পুরনোও হয়ে যায়। আগের স্কুল ড্রেস পরতে পারি না আর। বইয়ের পাতার এক কোণা বেঁকে যায়, চকচকে বইয়ে ধুলা পড়ে। এরই মাঝে অনেক কিছু পড়া হয়। কবিতাই বেশি পড়তাম আমি। নানান রঙের কবিতা। রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে মনে হয় আমিও যদি রবীন্দ্রনাথ, নজরুলের মতো অমন লিখতে পারতাম! কিন্তু পরক্ষণেই ভুলে যাই। স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে কত রকমের গাছপালা আমাকে পাতার ইশারা দিয়ে ডাকে! ইনছান ভাইদের বাড়িতে ছিল হরেক ফুলের গাছ। তার আব্বা কোথায় থেকে যেন নিয়ে আসে সেসব। গোলাপ আর সূর্যমুখী ছিল প্রিয়। অনেকবার ইনছান ভাইয়ের কাছ থেকে গোলাপের চারা চেয়েছি, দেয় নি। রাগ হতো। ভাবতাম সুযোগ পেলেই চুরি করবো। কাসেম মাস্টারের বাগানে যে দুইটা লিচুগাছ ছিল মুখোমুখি, তাদের সবচে ভালোটায় কলম করতাম। কিন্তু আমার কলমগুলো নষ্ট হতো। বাড়ি থেকে পাউশ আর মাটি এনে ব্লেড দিয়ে লিচুর ডালের ছাল কাটতাম, মুঠ ভরে চারদিকে পাউশের মাটি জড়িয়ে বেঁধে রাখতাম, তবুও শেকড় গজাতো না। প্রতিবারই মন খারাপ হতো। জমজ সেই কবরের সামনে ছিল একটি রঙ্গন ফুলের গাছ। ঝিরিঝিরি ফুল ফুটতো থোকায়। মন খারাপ হলে ওই গাছের নিচে দাঁড়িয়ে থাকতাম। মা বকলে, আব্বু মারলে, ভাইয়ের সঙ্গে ঝগড়া হলে রঙ্গন আর গন্ধরাজই সঙ্গ দিত আমাকে। 

 

সেবার নতুন বই এলো স্কুলে। দল ভাগ করে দেওয়া হতো বইটা। অদ্ভুত লোভ হয়েছিল তার উপর। নাম সম্ভবত ‘চয়নিকা’। বাংলা বইয়ের বাইরেও গল্প আর কবিতা থাকতো। পুব-পশ্চিমমুখী ঘরগুলোর একটাতে ক্লাশ হতো তখন। পাশেই টয়লেট। ভয়ে আমি এই টয়লেটে যেতাম না। ছুটির ঘণ্টা সিনেমার গল্প শুনে ওই ভয় ঢুকেছিল। ভাবতাম আমাকেও যদি ওভাবে তালা মেরে রেখে যায়। একদম কোণার ঘরটাতে হুট করেই কবিতা আবৃত্তির অনুষ্ঠান হচ্ছিল সেদিন। আগেই ঘোষণা দিয়েছিল হয়তো, আমি খেয়াল করি নি। আমরা সবাই বেঞ্চে বসে আছি, নাম ডাকলে এক এক জন স্যার-ম্যাডামের সামনে গিয়ে আবৃত্তি করেছে ‘লিচু চোর’। হাত নাড়িয়ে নাড়িয়ে সুর করে পড়ছে তারা। খুব উত্তেজনা হচ্ছিল ছড়াটা শুনে। মনে হচ্ছিল, আমিও যদি পড়তে পারতাম ওইভাবে! কিন্তু স্যার-ম্যাডামের সামনে লজ্জা পাবো ভীষণ। সবার পড়া শেষ হলে একজন স্যার বললেন—’তোমাদের মধ্যে থেকে কেউ পড়তে চাও?’ আমি দোনোমনো করতে করতে হাত তুললাম। শুনতে শুনতে ততক্ষণে মুখস্থ হয়েছে ছড়াটা। সবার সামনে দাঁড়িয়ে পড়ে ফেললাম। কোনো প্রশংসাই পাই নি সেদিন। 

 

কিন্তু কোথাও যেন একটা সরোদ বেজে উঠেছিল আমি তার সুর বুঝতে পারি নি সেদিন। তন্দ্রাতুর সেই নক্ষত্রের পাশে বিজন গুল্মের ছায়া হঠাৎ ঘ্রাণের আদর দিয়ে ফুটিয়ে যাচ্ছিল ফুল। দূরে, সমুদ্র-সৈকতে, যে গাঙচিল ঝাউবনের আকাশ জুড়ে ফেলে গেল স্তম্ভিত ডাক, আমি যেন তার পিছে পিছে সুরমণ্ডলের পথ ধরে হাঁটতে চেয়েছিলাম সমুদ্রের অব্যবহৃত নীল, পর্যটকের ছেড়ে আসা ঘোড়ায় বাঁধতে চেয়েছিলাম ফেনার ঘূর্ণি-স্বাদ। এখানে সরাইখানা কেবল এক হতকায় বাড়ি। গরাদের আকর্ষণে প্রতিদিন কতগুলো মুখ অনুজ্জ্বল ছাঁচের ভেতরে ঢুকে যাচ্ছিল। 

 

কী এক বদলে যাওয়া বাতাস গাঁয়ের কেয়া গাছটিকে চিরকালের জন্য রুয়ে দিল খরগোশবনে। বুঝতে পারি, যে আমি গতকালও সূর্যাস্তকে ভেবেছিলাম বাড়ির দুয়ার, আজ সে কপাট অপস্রিয়মান হতে হতে মিইয়ে যাচ্ছে আলেয়ায়। মার আঁচলের গিঁট খুলে দেখতাম, অজস্র মাছরাঙা উড়ে যাচ্ছে নীলে। স্কুলের সেই ঘর আর ছেঁড়া স্যান্ডেলের গার্হস্থ্য ছায়ায় লুকিয়ে ছিল আমার কবিতা।  


৮ম পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!

Discover more from

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading