যেখানে ঝরাপাতা নিজের শব্দে বন | হাসান রোবায়েত | পর্ব ৩

যেখানে ঝরাপাতা নিজের শব্দে বন

 

৩.

অনন্ত শূন্যতার ভেতর যেতে যেতে একদিন হঠাৎ করেই শিশুরা দেখতে পায়—পৃথিবীর ঘাসের উপর ছোট ছোট ফুল। মাটিতে রোদের গন্ধ। নক্ষত্রের থেকে যে আভা হাজার হাজার ছায়াপথ পার হয়ে লেগে আছে পেয়ারা-পাতায়, কুণ্ডুলী পাকিয়ে ধাতব খেলনার গায়ে আছড়ে পড়ছে রাতে, একটা কি দুইটা দাঁতে সে তারার আলোও কামড়ে ধরে শিশুরা। সে তখন ধীরে ধীরে টের পায় মায়ের অশ্রুত ঘ্রাণ। হামাগুড়ি অথবা প্রথম পায়ে হাঁটার দিনগুলো মনে না পড়ার মধ্য দিয়েই কোথায় যেন হারাতে থাকে। এর আগে সেও শূন্যের শিশু। যেন এক মহাস্তব্ধতার ঢেউয়ে সাঁতরে সাঁতরে এই রূপনারানের কূলে জেগে ওঠা তার। আলোমে-আরওয়ার দিনশেষে মাটি ও কাদার দুনিয়ায় চারদিকে নানান পাখির ছায়া, পাতায় লিখিত খেলাঘর। মা’র স্তনে মুখ লাগিয়ে মাঝে মধ্যে বিস্ময়ে তাকানোর চোখ। শুয়ে শুয়ে হলুদ পাখির ডাকটাকে খুঁজে আবার ক্লান্ত হয়ে নিঝঝুম ঘুমের মধ্যে সেইসব পাখি ওড়া হাওয়াও যখন শিশুটির স্বপ্নে ডেকে যায়—সে হয়তো ভাবে, মা হারিয়ে গেছে কোথাও দোলনায় আলোর দোল দিয়ে। ফুঁপিয়ে কান্নার সহসায় নিথর করে তোলে বন। 

 

এইসব মনে পড়া ও না পড়ার দিনগুলিতেই মা’র কাঁধে ঘুমিয়ে চলে আসি ধরমপুরে। ভাই আমি আব্বু আর মা। আমার বোনটা তখনো আলোছায়ার সন্ধিতে ভেসে ভেসে আমাদের বাড়ি আসে নি। আল্লার ফুল হয়ে ফুটে ওঠে নি নিখিল হাওয়ায়। 

 

মানুষের স্মৃতি ঠিক কখন থেকে শুরু হয়? কখন সে বুঝতে পারে এই তার সারা জীবনের পথ। হঠাৎ কোনো কোনো সন্ধ্যায়, আমর্ম দুপুরে এই রাস্তায় হাঁটতে আসবে সে, বসবে তার ছায়ায়। অস্তগোধূলির দিকে তাকিয়ে দেখতে পাবে অপরাহ্ণের সব পাতা এক এক করে পচে যাচ্ছে পুকুরের তলায়। তারপর কুটো হয়ে মাছেদের খাদ্য হয়ে আবার ফিরে আসছে কাদায়। সে কাদায় পা রেখে আচমকাই কেউ হয়তো অনুভব করবে তার সারা শরীর আটকে যাচ্ছে শ্যাওলায়। আমিও জানি না কবে থেকে এইসব কুহকের দেখা পেতে শুরু করি। আজ অনেক অনেক দিন পর আমার জানালার থেকে যখন ভেসে আসছে ফেরিঅলাদের কণ্ঠ। যখন একটা রিক্সার বেল টুংটুং করে সতর্ক করছে কাউকে। মনে পড়ছে, একদিন আমিও এমন ঘণ্টার পেছনে দৌড়ে গেছি শত শত পা। কেউ একজন কাঁধে আইস্ক্রিমের বাক্স নিয়ে পেরিয়ে যাচ্ছে ধানখেত, কাঁচা আইলের ঘাস, চকচকে বিশ্বরোড। আমি খুব ডাকছি তাকে মুঠোয় আট আনা নিয়ে। আমার হাতের পয়সা তখন দাউদের ধাতব হয়ে গলে গলে চুয়ে পড়ছে মাটিতে। তবুও শুনছে না সে। এক অসীম দিগন্তের রঙ তাকে নিয়ে যাচ্ছে আমার সমস্ত বিস্মৃতির ওই পারে। 

 

*

 

ধরমপুর। হালকা গ্রাম। মফস্বলীপনাই বেশি তার। ভূতের জিহবার মতো খসখসে একটা বিশ্বরোড এক পাশ দিয়ে কোথায় যেন চলে গেছে। ছোট ছোট পিচের রাস্তা, ইটের আধোপথ পেঁচিয়ে আছে ধরমপুরের শরীর। এলোমেলো বাড়িঘরগুলো কেবলই মনে করিয়ে দেবে এখানে ভাগিদাদিদের মধ্যে প্রায় সময়েই উথলে ওঠে কলহ। প্রায়ই মাটির দেওয়ালের বাড়ি। খুব অল্পই ইটের। ভূশাস্ত্র মতে এখানকার মাটি জাতে এঁটেল। লোহার জঙের মতো লাল। কাফেরের অন্তরের মতো ভীষণ। গ্রীষ্মে মাঠ ফেটে চৌচির। তখন মনে হবে, সীতার পাতালপ্রবেশ যেন এই মাটিতেই ঘটেছিল। ভাঙা ভাঙা দেয়ালের সীমানা। পলেস্তরা ঝরে পড়েছে কবেই। ইটের ক্ষয়ে যাওয়া ধুলা লেগে আছে তাতে। আয় ছেলেরা আয় মেয়েরা’র দল এমন দেয়াল থেকেই জোগাড় করে তাদের হলদির গুঁড়া। পুবের দিকেই বেশি ধরমপুর। এক চিলতে সুবিল সেই কবেই করতোয়ার থেকে একা হয়ে বয়ে যাচ্ছে। এখানে বউ-ঝিয়েরা বড় কাঠের তক্তা নিয়ে কাপড় কাঁচতে আসে। পুরুষেরা ডুব দিয়ে কাজে চলে যায়। এই নদী সবচেয়ে আনন্দের ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের কাছে। এপার থেকে ওপারের দূরত্ব একটি গানের। গামছায় মাছ ধরে। মুঠ মুঠ বালু নিয়ে গোসল করে ওঠা সঙ্গীর দিকে ছুড়ে দেয়। গরুর লেজ ধরে সাঁতরে বেড়ায়। উত্তর থেকে দক্ষিণে চলে গেছে সুবিল। নদী-গবেষকেরা হয়তো সুবিলকে বলবে খাল। কিন্তু এখানকার মানুষেরা সে রায় মেনে নেবে না কিছুতেই। 

 

পুবের দিকেই ধরমপুর বেশি। সুবিলের পাড় ঘেঁষেই গড়। কী উঁচু! মোনামুনির গাছ। প্রাচীন সাপেদের ভিঁটা। নানান প্রকারের ঝাউ। গোলগোল মধুতে ফুলে থাকা আটাশরির জঙ্গল। অজস্র অ্যাাকাশিয়ার বৃক্ষ। পেঁচানো হলুদ ফুল। দুই গড়ের মধ্য দিয়ে সরু খাল। চুলবুল করে পানি আসছে কোথাও থেকে যেন। দাড়কে মাছের ঝাঁক সেখানে হইহল্লা করে মেতে রাখছে পানি। পাশেই ঈদ গা। এক কোমড় প্রাচীর দিয়ে ঘেরা। ভেতরে কার একটা কবর। নাম মুছে গেছে। সময়ের সাথে সাথে সাল তারিখও বৃষ্টিতে ভেসে ভেসে চিকন নালা কেটে গড়িয়ে গেছে সুবিলের দিকে। উত্তরে তালগাছ। বাঁশঝাড়ে অনেক অনেক গোর। এখানে গোরু আলগা করে গাছের ছায়ায় বিশ্রাম নেয় অনেকেই। কখনো ঘুমিয়েও পড়ে। গোরুগুলো সারা টিলায় ঘাস খায়। তারপর শুধু ধানক্ষেত। পিচের রাস্তা। দুই একটা ট্রাকের ঘর্ঘর আওয়াজ। 

 

বড় কুমড়া ছোট কুমড়ার দিকে যে রাস্তাটা চলে গেছে সেখানে ছোট্ট একটা মোড়। দুই একটা ছোট দোকান। টিন দিয়ে বানানো। বসার টং থাকে। বাস থামে এখানে। তারপর সোজা পূর্ব দিকে মাটির সরু রাস্তা। বামে পাকা করা লম্বা একটা বাড়ি। উপরে টিনের চাল। খুব কৌতুহল ছিল আমার বাড়িটাকে ঘিরে। কিন্তু কোনোদিনই ঢুকতে পারি নি। তারপরেই ঘন জঙ্গলে ঠাঁসা একটা আড়া। আমরা বলতাম খরগোশ বন। কোনোদিন স্বপ্নে অথবা বাস্তবে এই জঙ্গলের ভেতর থেকে কানখাড়া করা একটা খরগোশ বেরিয়ে আসতে দেখেছিলাম। কী এক ফুলের লতার নিচে বসে ছিল সে। কচুর মতো গুল্ম। তলোয়ারের মতো লম্বা পাতা। সবুজ। গর্ভ চিড়ে শাদা ঝির ঝির ফুল সাপের মতো দুলছিল। ঐ ঝোপেই বসে ছিল সে। আমরা এগুতেই কোথাও হাওয়া হয়ে গেল। তারপর থেকেই ওটা খরগোশ বন। অন্যরা হয়তো আলাদা নামে ডাকতো। বনের পরেই উঁচু গড়। সুবিলের মতো অতটা উঁচু নয়। সামনে একলা একটা আকাশমণি গাছ। আরেকটু পূবে এগিয়ে ডাইনে একটা পরিত্যক্ত জমি। কেল্লে ঘাসের মাঠ, কলমির বেড়া দিয়ে ঘেরা। তারপরেই আমাদের বাড়ি। তখনো অবশ্য মইনুল ভাইদের বাড়ি। আমরা ভাড়ায় থাকি। চারটা ঘর। দুইটা পূবদুয়ারি একটা দক্ষিণ। মেইন গেটটা পুব দিকে। সাথে রাস্তা। একটা পেয়ারার গাছ। রান্নার ছাপড়া। তার দক্ষিণে গোসলখানা। আমরা থাকতাম পূবদুয়ারি একটা ঘরে। দখিনদুয়ারি ঘরটাতে মইনুল ভাইয়ের মা। আমাদের ঘর আর দখিনদুয়ারি ঘরের মধ্যেখানের ঘরে থাকতো মইনুল ভাই। ওই ঘরে দুইটা চৌকি। একটাতে আমি আর ভাই। আরেকটাতে মইনুল। চাচাও থাকতো আমাদের সাথেই। বাড়িটা মাটির। কোঠাঘরঅলা। বাড়ির উত্তর দিকে কাসেম মাস্টারের আমবাগান।  


প্রথম পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন

দ্বিতীয় পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!

Discover more from

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading