কে হায় হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে ভালোবাসে ।। অলোকপর্ণা

হিন্দু মতে এই ধারণা বহুল প্রচলিত যে, দেবতার “ডাক” না এলে ভক্ত তাঁর কাছে গিয়ে পৌঁছোতে পারেন না। আমার যেকজন দেবতা,- তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন সাদত হাসান মান্টো, এবং তিনি “ডাক” পাঠিয়েছিলেন, তাই মান্টো রিলিজ করার ১৫ দিন পরে অনেক খুঁজে বাসা থেকে ১৫ কিমি দূরে শহরের একটিমাত্র প্রেক্ষাগৃহ পাওয়া গেল এবং আমি পৌঁছোলাম তাঁর কাছে। আর বুঝলাম এই চলচ্চিত্র দর্শকের জন্য নয়, পাঠকের জন্য তৈরি হয়েছে।

পড়তে গিয়ে টের পেয়েছি মান্টো ও মান্টোর গল্পরা গলা জড়াজড়ি করে মত্ত পা ফেলে অন্ধকার থেকে আরো অন্ধকারে তলিয়ে যেতে থাকে। একের পর এক গল্পে মান্টো আয়না কারিগর, চকচকে আয়না তৈরি করেছেন যাতে আমরা ওতে নিজেদের উলঙ্গ কুৎসিত বিকৃত দেহের ছবি স্পষ্ট দেখতে পাই। আজও। নন্দিতা দাশের “মান্টো”য় তারই কয়েক ঝলক দেখতে পেলাম, পুরো চেহারা ওতে স্পষ্ট হল না। তবু যতটুকু নজরে এসেছে চোখ ঝলসে দেওয়ার জন্য ততটুকুই যথেষ্ট। হয়তো নন্দিতা এটাই চেয়েছিলেন। কারণ সূর্যগ্রহণের দিকে চেয়ে থাকলে চোখ পুড়ে যেতে বাধ্য। সাদত হাসান মান্টোর গল্পরা পুর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণের মত গ্রাস করে আমাদের এমনকি স্বয়ং লেখক মান্টোও সেই ছায়ায় ঢাকা পরে যান।
মান্টো আমার কাছে একটা চিন্তা। একটা বড় প্রশ্নচিহ্ন সমেত একটা চিন্তা যা রাতে সহজে ঘুম আসতে দেয় না, ভাবায়, ক্রমাগত স্তম্ভিত করে রাখে। নওয়াজউদ্দিনও রাখলেন। অন্ধকারের চোখে চোখ রেখে নিজের সাথে ডুয়েল লড়ে যাওয়া এক মান্টোকে আমাদের চোখের সামনে দাঁড় করিয়ে রাখলেন গোটা সময়টা। কপালের ভাঁজে জ্যন্ত করে দিলেন র‍্যাডক্লিফ লাইনকে। আর ছায়ার মত পাশে থাকলেন রসিকা দুগাল।

তবে আরেকটু বেশি ইসমত আশা করেছিলাম। মান্টোর মত তিনিও প্রিয়তমা বলেই কি? বিশেষত গায়ের লোম খাঁড়া করে দেওয়া ‘লিহাফ’এর জন্য লাহোরের কোর্টে হাজিরা দিতে আসা ইসমত চুঘতাইকে দেখার আশা হয়েছিল। তা হয়তো ভবিষ্যতের কোনো পরিচালকের ‘ইসমত’- এর জন্য তোলা থাকল। গঞ্জে ফেরেশতে-তে ঠিক যেভাবে বলিউডকে দেখেছিলাম, নন্দিতা ‘মান্টো’তেও সেভাবেই শ্যাম, অশোককুমারকে প্রাণ দিয়েছেন। ওতে কোনো ঘাটতি পাইনি।

মান্টোর যে সব গল্পরা নন্দিতাকে বেছে নিয়েছে, তাদের মধ্যে অন্যতম দস রুপয়, খোল দো, টোবাটেক সিং এবং অবধারিত ভাবে ঠাণ্ডা গোস্ত। এর মধ্যে খোল দো- র নাটকীয় দৃশ্যরূপ সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের ‘রাজকাহিনী’র অতিনাটকীয় মুখবন্ধ হিসেবে আগেও দেখেছি। নন্দিতা দাশ মেদবহুলতা সম্পর্কে যথেষ্ট সচেতন আর সেই কারণে ‘বাড়তি’ একটা দাড়ি- কমাও ছাড় পায়নি তাঁর নির্মেদ “মান্টো”য়। তবু খোল দো পড়ার যে অভিজ্ঞতা, দেখার অভিজ্ঞতায় ঘাটতি থেকে গেছে, তা কি দেখার চোখের অগভীরতার কারণে? বরং দস রুপয়- এর চিত্ররূপে সমুদ্রকে জীবন্ত হতে দেখলাম, সরিতার চরিত্রের কমনীয়তা কোঁকড়ানো দশ টাকার নোটের মত প্রেক্ষাগৃহের আসনে আমায় অবশ করে রাখলো।

পরেশ রাওয়াল ঠিক ততটাই সজাগ করে দিলেন মুখের সামনে দেশলাই কাঠি জ্বালিয়ে। বোধ হল দ্বিমাত্রিক নয়, ত্রিমাত্রিক এক দৃশ্য চোখের সামনে জ্যান্ত হয়ে উঠেছে, গল্পের নায়ক হয়ে উঠেছে ত্রিমাত্রিক দেশলাই কাঠিটা, নাকের ঠিক সামনে।

ঠাণ্ডা গোস্ত- এ দিব্যা দত্ত কৃপাণ চালালেন যেন আমার গলার ওপর দিয়েই, রক্তে লাল হয়ে গেল সমগ্র ভারত, ঠিক যেভাবে লাইন কেটে টুকরো টুকরো করে ফেলা হল একটা দেশকে, ঠিক সেভাবেই চলে উঠল দিব্যা দত্তের হাতে ধরে থাকা কৃপাণ। রনবীর শোরের শিকারী থেকে শিকার হয়ে যেতে এক মুহূর্তও লাগল না। এবং এখানে ২০১৮ এ দাঁড়িয়ে কোথাও বিন্দুমাত্র অশ্লীলতা খুঁজে পাওয়া গেল না ধর্মাবতার! যা পাওয়া গেল তা হল আপাদমস্তক শিহরণ।

বৃথাই মুম্বই বা মান্টোর ‘বোম্বাই’ থেকে লাহোর যাওয়া। চরণ সিং সমাধান দিয়েছে মান্টোকে। টোবাটেক সিং- এর চিত্ররূপে নো ম্যানস ল্যান্ডে টোবাটেক সিং- এর পাশে এসে শুয়ে পড়লেন মান্টো স্বয়ং। তাঁদের দাফন হল সেখানেই।

এই যে মান্টোর সাথে মুখোমুখি হয়ে সব শেষ, এর জন্য বিশেষ ধন্যবাদ নন্দিতাকে। নওয়াজউদ্দিনের ওই চোখ মান্টোর চোখ হয়ে থাকবে বহুদিন। হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগানো দেবদর্শন আমার সার্থক হল। জয় হিপতুল্লা!

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!

Discover more from

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading