শহীদ কাদরী : এক অভিমানী কবির নাম ।। রেজওয়ানুল হাসান

শহীদ কাদরী এক অভিমানী কবির নাম। পঞ্চাশ দশকের উত্তাল সময়ে উত্থান। সমসাময়িক কবিদের তুলনায় তার কবিতাগ্রন্থ খুব কম; সর্বসাকুল্যে চারটি। সংখ্যা বিচারে অল্প হলেও গুণ বিচারে মোটেই অল্প নয়। চারটি গ্রন্থই বোদ্ধা পাঠকদের দৃষ্টি আকর্ষণে সমর্থ হয়েছে। রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা কবি শহীদ কাদরীর জ্ঞানকে ঋদ্ধ করেছে। দেশভাগ, ভাষা আন্দোলন ও স্বাধীনতা অর্জন সবই ঘটেছে চোখের সামনে। স্বাধীনতা অর্জন করার পরেও কোন অভিমানে মাতৃভূমি ছেড়ে পরবাসী হতে হয়েছে কবিকে? মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তার সেই অভিমান বহাল ছিল। প্রবাসে বসেই মাতৃভাষা ও মাতৃভূমির প্রতি ছিল অকৃত্রিম ভালোবাসা।

কবি শহীদ কাদরীর কবিতার সমালোচনা করার মতো বিদ্যা-বুদ্ধি আমার নাই। পাঠকগণ এই লেখাকে পাঠপ্রতিক্রিয়া হিসাবে দেখলেই সর্বকূল রক্ষা হবে। কবির ‘উত্তরাধিকার’ কবিতাগ্রন্থটি বেছে নিয়েছি আলোচনার বিষয় হিসাবে। কবি নিজেই ঘোষণা করেছেন আত্মীয়তার সম্পর্ক যার সাথে, তাকেই স্বত্বাধিকারী দান করবেন। কবির অভয়েই তার সৃষ্টিকর্মে ঢোকার সাহস পেয়েছি। পাঠকদের শহীদ কাদরীর ‘উত্তরাধিকার’ কবিতাগ্রন্থটি থেকে কাব্যের আনন্দকে উসকে দেবার চেষ্টা থাকবে। সফলতা-ব্যর্থতা পাঠকরাই নির্বাচন করবেন।

‘সুগোল তিমির মতো আকাশের পেটে/ বিদ্ধ হলো বিদ্যুতের উড়ন্ত বল্লম।’

আমরা সাধারণত দেখে থাকি আকাশ থেকে বিদ্যুৎ ছুটে আসে মর্তে। কবি দেখিয়েছেন বিদ্যুৎ বিদ্ধ করছে আকাশকে। আকাশ অসীম, সেই বিশালত্ব বোঝাতেই প্রাণীকূলে সর্ববৃহৎ প্রাণীকে বেছে নিয়েছেন। কবির আশংকা শহর মড়কে উজার হবে। নগরবাসী যারা ঘুমন্ত ছিল তারা শহর ছেড়ে ছুটে পালাচ্ছে। শহর জুড়ে বজ্র শিলা বৃষ্টি। লক্ষ লক্ষ করাতকল ও লেদ মেশিন ঘুরলে যেরকম বিকট শব্দ হয়। প্রকৃতি তার থেকে ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে। এই কর্কষ শব্দকে নান্দনিকতা দিতে ব্যবহার করেছেন। ‘ মেঘ, জল, হাওয়া, / ময়ূরের মতো তার বর্ণালী চিৎকার-’

প্রলয়ঙ্কারী হাওয়ায় শহরবাসী ভেসে যায়। সুন্দর ঝলমলে এভিনিউ তার জৌলুস হারায়। যানবাহনে যেসকল যাত্রীরা ছিল তারা উৎকন্ঠায় নিস্তব্ধ হয়ে যায়। ইস্রাফিলের শিঙ্গার সাথে ‘ওঁ’ জুড়ে দিয়ে ইসলাম ও সনাতনের মেলবন্ধন সৃষ্টি করেছেন। যা বর্তমান সময়ের জন্য অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। ধর্মীয় কোন্দলের সুরাহা করেছেন প্রথম বন্ধনীতে আটকিয়ে।

এক সময় প্রলয়ঙ্কারী বৃষ্টি থেমে যায়। জল ভাসিয়ে নিয়ে যায় হিংস্রতা। কবির হৃৎপিণ্ড কান্নার আওয়াজ আর বর্ষার উষর বন্দনা শোনে। রাজত্ব করে রাত্রি লক্ষ্মীছাড়া, উদ্বাস্তু বালক, ভিক্ষুক, চোর আর অর্ধ-উন্মাদের। বজ্র বৃষ্টির ভয়ে শহর ছেড়ে পালিয়েছে রাজস্ব আদায়কারী, সৈন্য, মহাজ্ঞানী, মহাজন ও মোসাহেবের দল। কবি ভেসে যেতে দেখেন সিগারেটের টিন, ভাঙ্গা কাঁচ, সন্ধ্যার পত্রিকা, স্কার্ফ, ছেঁড়া তার, খাম, নীল চিঠি। ছোট ছোট সভ্যতার চিহ্ন বাদ দেয়নি। কবি কল্পনার জগৎ থেকে পাঠককে নামিয়ে আনেন বাস্তবতায়। এই জনপ্রাণহীন পরিষ্কার শহরে কবি প্রভুর মতো দাড়িয়ে থাকেন, নূহ যেভাবে প্রলয় থেকে সভ্যতা রক্ষা করেছিলেন। কবির সেই গরজ নেই বরং সে পাঠকের কাছে প্রশ্ন রেখে গেছে। এত কথা বলার পড়ে মনে পড়ল কবিতার নামটিই বলা হয়নি। ‘উত্তরাধিকার’ কবিতাগ্রন্থের প্রথম কবিতা ‘বৃষ্টি, বৃষ্টি’।

“নপুংসক সন্তের উক্তি” কবিতায় কবি বর্ণনায় উঠে আসে কবিদের চালচিত্র। কিভাবে তারা কবিতাচর্চা করবে তার দিক নির্দেশনা? সমসাময়িক বন্ধু-বান্ধব সামাজিক দিক দিয়ে কতটুকু অগ্রসর? কবিরা সামাজিক ও ধার্মিক পরিবেশে বেমানান।

কবিবৃন্দের কথা বলতে বলতে আত্মকথন শুরু হয় শেষ পঙ্তিগুলিতে। কবির মনের কথা পড়তে গিয়ে পাঠক উপলব্ধি করতে বাধ্য এই কথাগুলি পাঠকের অব্যক্ত উক্তি। কবির মতো আমরা সবাই অন্ধকার টানেলে বসবাস করছি সত্য অনুসন্ধানী।

ডিজিটাল যুগে এনালগ যোগাযোগ মাধ্যম সামনে নিয়ে আসেন তার লেখনিশক্তি দিয়ে। পাঠকের মন কল্পনাকে বাধ্য করে অতীতের স্মৃতির দিকে। “টেলিফোনে, আরক্ত প্রস্তাব” কবিতাটি শুধু যন্ত্রটিকে ঘিরে রচিত হয়নি। গল্পছলে বলেছেন কত দৃশ্য। চিত্রে চিত্রে ভরিয়ে ফেলেছেন কবিতার শরীর,

“আমি জানি চড়ুই পাখির মত ঠোঁট জোড়া কাঁপছে।”

“আমি কিছুই কিনবো না” কবিতাটি এক অভিমানী কবির বয়ান। কবি এখানে স্বপ্নতাড়িত বলেই হয়ত উপেক্ষা করতে পারছেন বাস্তব জগতকে। বিজয়ী পতাকার নীচে একা দাড়ানোই তার শক্তি। আর এই শক্তি দোকানে সাজানো রঙ-বেরঙের জিনিসের প্রতি তার অবজ্ঞা। ছোট অভিমানী শিশুর মতো বলে ওঠে “আমি কিছুই কিনবো না।”

ক্লার্কের আঙুলে কালির দাগ আর টাইপরাইটারে ছাওয়া সারা দেশ। পরাধীনতার গ্লানি নিয়ে আজ জনসংখ্যার বেশিরভাগই ক্লার্ক আর টাইপরাইটার হয়ে আছে। এই সকল কর্মচারীদের উপার্জিত অর্থ হাতিয়ে নেবার জন্য বণিকশ্রেণি দোকান সাজিয়ে রেখেছে রঙ-বেরঙের পোষাকসহ নিত্য প্রয়োজনীয় বস্তুতে। কবির পকেট ভর্তি স্বপ্নের ঝনৎকার।

“উদ্ধত পতাকার নীচে একা, জড়োসড়ো –

-আমি কিছুই কিনবো না।”

“নশ্বও জ্যোৎস্নায়” কবিতাটিতে কবি জ্যোৎস্নার গুনগান গেয়েছেন। শুধু জ্যোৎস্নার জয়গান গেয়েই ক্ষান্ত হননি। মধ্য বিশ শতকের দিকে চেয়ে আছেন। বিষাদ আর হতাশা বিলিয়েও শেষ করতে পারেননি। কবি একাকী শিল্প জগৎটাকে বদলাতে পারেননি, তাই ক্লান্ত শিল্পের দিকে তাকিয়ে হতাশ।

“- এই মতো নির্বোধ বিশ্বাস নিয়ে আমি

ঊসে আছি আজ রাত্রে বারান্দার হাতল-চেয়ারে

জ্যোৎস্নায় হাওয়ায়।”

কবর শান্তির জায়গা কিন্তু জীবিতরা সাধারণ কবরকে এড়িয়ে চলেন। কবি এই কবিতায় তার অন্তিম ইচ্ছা পাঠকদের জানাচ্ছেন। তার শবদেহের ভার নিজেই বহন করতে চান।

“নিজেই বাঁচাতে যেন পারি ওহে, নিজেরই নেহাৎ, ব্যক্তিগত অপচয়।”

“মৃত্যুর পরে” কবিতার মাধ্যমেই শেষ করলাম। যদিও জানি অল্প কয়েকটি কবিতার সারাংশ পাঠকের তৃপ্তি মিটবে না। অতৃপ্তিকে উসকে দিতেই আমার ক্ষুদ্র প্রয়াস।

কবি শহীদ কাদরীর যেকোন একটি কবিতা ধরে প্রচলিত বিচার বিশ্লেষণ করে ভরিয়ে ফেলা যাবে দশ-বিশ পাতার গদ্য। সেখানে “উত্তরাধিকার” গ্রন্থের প্রতিটা কবিতাই অনন্য।

কবিতাগুলির রস আস্বাদন করতে পাঠককে ডুবতে হবে “উত্তরাধিকার” কবিতাগ্রন্থে। কবি শহীদ কাদরী নিজগুণেই উজ্জ্বল। তাকে পাঠকের সামনে তুলে ধরার মতো যোগ্যতা আমার নেই। বাংলা সাহিত্যেও তিরিশ পরবর্তীদের মধ্যে অন্যতম তার কবিতা ও কবিতাগ্রন্থগুলি ব্যাপক পঠন পাঠন দরকার।

রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলকে মাথা থেকে নামিয়ে আমরা যেভাবে ত্রিশের কবিদের মাথায় তুলে রেখেছিলাম, সময় হয়ত এসেছে ত্রিশিদের মাথা থেকে নামাবার। জীবিত অবস্থায় তার মূল্যায়ন আমরা করতে পারিনি। মৃত্যুর পরে যদি কিছুটা ঋণ শোধ করতে পারি।

বুদ্ধিজীবি থেকে শুরু করে সাধারণ জনগণের কাছে পৌঁছাতে হবে কবি শহীদ কাদরীর লেখা। কবি শহীদ কাদরী মিডিয়ার তাবেদার ছিলেন না। জীবনের বেশীরভাগ সময় প্রবাসে কাটিয়েছেন। দেশের সাধারণ জনগণের কাছ থেকে তিনি দূরে ছিলেন। সেই দূরত্ব ঘোচানোর দায়িত্বটা পাঠক ও লেখকদেরই।

প্রবাসীদেরকে আমরা টাকা কামানোর মেশিন মনে করে থাকি। তাদের আত্মত্যাগের কথা আমরা বেমালুম ভুলে যাই। দেশের আলো-বাতাস, মাটি ও পানি থেকে তারা বঞ্চিত। কতটুকু কষ্ট ও দুঃখ নিয়ে পরবাসী হতে হয়েছে কবিকে। যেখানে কবিরা অন্য জগতের মানুষ। বাস্তব জগতে বসবাস করেও অন্য জগতের লোক। মুনি-ঋষি না হয়েও একাকিত্ব বরণ করা দুঃসাধ্য।

আমরা যেখানে সামান্য কষ্ট বা দুঃখ পেলেই প্রিয়রা ছুটে আসে সমবেদনা জানাতে, সেখানে কবি মৃত্যু পর্যন্ত থেকে গেলেন অন্য রাষ্ট্রে। কবি দেশের সকল সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়ে প্রমাণ করে গেলেন কবিদের কোন রাষ্ট্র নেই। পৃথিবীর যে কোন জায়গাই তার আপন। গোটা বিশ্ব জগৎটাই তার দেশ।

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!

Discover more from

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading