বব ডিলানের পাঁচটি গান ।। অনুবাদ : মোশতাক আহমদ

“ যে কজন আমেরিকান শিল্পী হুইটম্যান কথিত বহুমাত্রিকতাকে (Do I contradict myself? Very well, then, I contradict myself; I am large — I contain multitudes– Walt Whitman) আত্মস্থ করেছেন তাদের মধ্যে পুরোধা হচ্ছেন বব ডিলান।“ ১৯৯৭ সালে লেখক ও সঙ্গীত সমালোচক টম পিয়াজা এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে বব ডিলান সম্পর্কে এ কথা বলার কুড়ি বছর পর তিনি যখন সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেলেন, সুইডিশ একাডেমি তাঁর সম্পর্কে বললো, তিনি আমেরিকান সঙ্গীত ঐতিহ্যে নতুন এক কাব্যিক দ্যোতনা এনে দিয়েছেন।

শিল্পী ও গীতিকবি হিসেবে বব ডিলানের উত্থান ষাটের দশকে। তিনি ক্রমশ নিজেকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন এবং অনুসরনীয় হয়ে উঠেছেন। সঙ্গীতে ধারন করেছেন আমেরিকার বহুমাত্রিক সাঙ্গীতিক ঐতিহ্য, সোচ্চার হয়েছেন মানবিকতায়, যুদ্ধবিরোধিতা ও মানবাধিকারের প্রশ্নে। তাঁর লিরিকে আছে সামাজিক, রাজনৈতিক, দার্শনিক ও কাব্যিক প্রভাব। তিনি কালক্রমে হয়ে উঠেছেন প্রজন্মের কণ্ঠস্বর।

বব ডিলানের ১০০ মিলিয়নের বেশি গানের রেকর্ড বিক্রি হয়েছে এবং তিনি বেশ কিছু সম্মানজনক পুরস্কারেও ভূষিত হয়েছেন। তিনি একজন চিত্রশিল্পীও বটে। তাঁর কয়েকটি বিখ্যাত গান হচ্ছে- ব্লোয়িং ইন দা উইন্ড, দা টাইমস- দে আর আ চেঞ্জিং, লাইক আ রোলিংস্টোন, এ হার্ড রেইনস আ-গনা ফল ইত্যাদি। তাঁর প্রকাশিত বইয়ের মধ্যে আছে টারানটুলা, ক্রনিকলস, লিরিকস, দা লিরিকস ইত্যাদি। 



কীর্তিনাশা বৃষ্টি এল ওরে

( A Hard Rain’s A –Gonna Fall: Bob Dylan)

আহা, মায়াভরা চোখের ছেলে আমার, কোথায় ছিলে তুমি?

আহা, কোথায় ছিলে সোনা?

কুয়াশাঢাকা দ্বাদশ পর্বতে পা হড়কে গিয়েছিলাম

হেঁটে আর হামাগুড়িতে পেরিয়েছি তোবড়ানো রাজপথ

বিষাদমগ্ন সপ্ত অরণ্যে হারিয়ে গিয়েছিলাম

পৃথিবীর সবগুলো মৃত সমুদ্রের সৈকতে হেঁটেছিলাম

কবরের মুখে নেমে গিয়েছি দশ সহস্র মাইল

এ যে কীর্তিনাশা, কীর্তিনাশা, কীর্তিনাশা বৃষ্টি এল ওরে!

 

আহা, মায়াভরা চোখের ছেলে আমার, কী দেখলে তুমি?

আহা, কী দেখলে সোনা?

আমি দেখেছি নতুন শিশুকে ঘিরে আছে নেকড়ের পাল

দেখেছি জনহীন হয়ে আছে হীরে ঢাকা রাজপথ

দেখেছি কালো বৃক্ষ শাখা থেকে রক্ত ঝরছে টপ টপ

দেখেছি ঘরভর্তি পুরুষের হাতে রক্তাক্ত মারণাস্ত্র

আমি দেখেছি এক জলমগ্ন স্থির শাদা সিঁড়ি

দেখেছি দশ সহস্ত্র জিবহীন মানুষের কোলাহল

 

দেখেছি শিশুদের হাতে বন্দুক আর তরবারি

এ যে কীর্তিনাশা, কীর্তিনাশা, কীর্তিনাশা বৃষ্টি এল ওরে!

 

আহা, মায়াভরা চোখের ছেলে আমার, কী শুনলে তুমি?

আহা, কি শুনলে সোনা?

আমি শুনেছি বজ্রপাতের সতর্ক সঙ্কেত

আমি শুনেছি বিশ্বডুবান সুনামির গর্জন

শুনেছি হাজার ড্রামবাদকের লেলিহান ছন্দ

শুনেছি শ্রোতাহীন দশ হাজার ফিসফিসানির শব্দ

শুনেছি এক ক্ষুধার্তকে দেখে হাসছিল অনেকেই

শুনেছি খুপড়িতে মরে পড়ে থাকা কবির সঙ্গীত

শুনেছি গলিতে ক্রন্দনরত ক্লাউনের হাহাকার

এ যে কীর্তিনাশা, কীর্তিনাশা, কীর্তিনাশা বৃষ্টি এল ওরে!

 

আহা, মায়াভরা চোখের ছেলে আমার, কার সাথে দেখা হল তোমার?

আহা, কার সাথে দেখা হল সোনা?

দেখা হল মৃত ঘোড়ার পাশে বসে থাকা শিশুটির সাথে

আর কালো কুকুরটাকে মাড়িয়ে যাওয়া শাদা লোকটার সাথে

দেখা হল শরীরে আগুন লাগা এক তরুণীর সাথে

আর আমাকে রংধনু উপহার দেওয়া কিশোরীর সাথে

দেখা হল ভালবেসে কষ্ট পাওয়া যুবকের সাথে

দেখা হল বুকে ঘৃণা পুষে রাখা আরেক জনের সাথে

এ যে কীর্তিনাশা, কীর্তিনাশা, কীর্তিনাশা বৃষ্টি এল ওরে!

 

আহা, মায়াভরা চোখের ছেলে আমার, কী করবে গো এখন?

আহা, কী করবে এখন সোনা?

বৃষ্টি আসার আগেই আমি ফিরে যেতে চাই

গহীন কালো অরণ্যের মাঝে হেঁটে যেতে চাই

যেখানে বিশাল জনতা দাঁড়িয়ে আছে শূন্য হাতে

যেখানে বিষের ছররা ছড়িয়ে যাচ্ছে জলে

উপত্যকার ঘরগুলো নোংরা কয়েদখানা সোঁদা

যেখানে খুনীর মুখ ঢাকা মুখোশের আড়ালে

ক্ষুধারা কুৎসিত, হৃদয়ের দাম নেই কোনো

যেখানে কালোই একমাত্র রং, নম্বরহীনতাই চিহ্ন

এটাই শুধু বলব আমি, ভাববো আর থাকব অটল বিশ্বাসে

পর্বতচূড়ায় ঝুলাব সেই ছবি, দেখবে সবাই

তারপর ঝাড়া হাতপায়ে সাগরের জলে বসব

যতক্ষণ না ডুবে যেতে থাকি

তবে যাবার আগে গেয়ে যাব নিজস্ব গানটুকু

এ যে কীর্তিনাশা, কীর্তিনাশা, কীর্তিনাশা বৃষ্টি এল ওরে!!

 

 

স্বপ্ন 

(Bob Dylan’s Dream by Bob Dylan )

পশ্চিমের পথ ধরে ট্রেনে যেতে যেতে
ঘুমিয়ে পড়েছিলাম ক্লান্ত হয়ে
ছোট্টবেলার বন্ধুরা স্বপ্নে দেখা দিয়ে
বিষাদে ভরে দিল এ যাত্রা।

আধবোঁজা চোখে দেখতে পেলাম দিব্যি
কত না বিকেল কাটিয়েছি বন্ধুদের সাথে
কত না ঝড় বাদলে সাথ দিয়েছে তারা
রাত্রি ভোর করেছি হেসে গেয়ে।

আমাদের ঝোলানো টুপিগুলো স্বাক্ষী রেখে
গল্পগাছা আর গান চলতো ধুন্ধুমার
চাওয়া-পাওয়া ছিল না কিছুই, তৃপ্তি ছিল তবু
বাইরের দুনিয়া নিয়ে নিত্য নতুন কৌতুকে।

শীত গ্রীস্ম জুড়ে ছিল হৃদয়ের উচ্ছ্বাস
কখনো বুড়ো হব এ কথা ভাবিনি স্বপ্নেও
সারা জীবন কাটবে বুঝি এমনি হল্লায়
কিন্তু জীবন সে সুযোগ কী দিল!

কালোকে কালো বলতাম শাদাকে শাদা
ভুল বা শুদ্ধের ছিল না বিসংবাদ
কখনো ভাবিনি পথগুলো ভিন্ন হয়ে যাবে
হেঁটে যাব একদিন যে যার গন্তব্যে।

কত না ঋতু এল গেল পৃথিবীতে
কত না বাজির দেখলাম হারজিত
বন্ধুরা হেঁটে গেল ভিন্ন ভিন্ন পথে
কখনো হল না দেখা কারো সাথে।

স্বপ্ন দেখি তবু মিথ্যে আশায়
টুপিগুলো স্বাক্ষী রেখে আড্ডা দেব আবার
সে জীবন ফিরে পেতে বিলিয়ে দিতে পারি
জীবনের যা কিছু অর্জন!

 

 

উত্তর গ্রামদেশের কন্যা

( Girl From The North Country: BOB DYLAN)
উত্তরের গ্রামদেশে মেলা দেখতে গেলে

অস্থির বাতাস ঝাপটা দেবে চুলে –

একদিন যাকে প্রকৃতই ভালবেসেছিলাম

সে কী এখনও থাকে ঐ জনপদে!

 

তুষারঝড়ের দিনে যাও যদি

গ্রীষ্ম শেষে শুকিয়ে বরফ নদী,

একটু খেয়াল করে দেখো

কোট আছে কীনা তার প্রবল শীতে!

 

দেখে এসো তার চুলগুলো এখনও দীর্ঘ কীনা

দেহের দুপাশে বেয়ে নামছে কীনা ঝর্নার মত;

চোখ বুঁজলেই এসে দাঁড়ায় এই রূপে!

 

জানি না আদৌ আমাকে তার মনে পড়ে কীনা –

কত না অন্ধকার রাতে

কত না উজ্জ্বল দিনে

প্রার্থনা করেছি তাকে!

 

উত্তরের গ্রামদেশে মেলা দেখতে গেলে

অস্থির বাতাস ঝাপটা দেবে চুলে –

একদিন যাকে প্রকৃতই ভালবেসেছিলাম

সে কী এখনও থাকে ঐ জনপদে!

 

যখন আকাশ থেকে রাত্রি নেমে আসে
(When The Night Comes Falling From The Sky: BOB DYLAN)

প্রান্তরের দিকে তাকিয়ে দেখ ফিরছি আমি
তোমার চোখে ধোঁয়াশা অথচ মুখে হাসি
তুমি কী দু দণ্ড ভাবছ বসে
আমার পোড়ানো চিঠিগুলোর কথা!

দুশো মাইল হেঁটেছি আমি, দেখ-
দৌড় শেষ হয়ে গেল, চাঁদ অধরা।
কী আসে যায় কে কাকে ভালবাসে
যখন আকাশ থেকে রাত্রি নেমে আসে।

দেয়ালের ওপাশ থেকেও তোমার বেদনার্ত মুখ দেখি
অন্তরীপের মত দুঃখ ঘিরেছে তোমাকে,
যে দুর্যোগ থেকে বেঁচে গিয়েছিলে
তাকে নিয়েই তোমার মৃদু পরিহাস!

তোমার জন্য নেই কোনো সহজ সমাধান
মিথ্যে কথা বলব কেন শুধু
দস্তানার মতো লাগসই হবে ভালবাসা
যখন আকাশ থেকে রাত্রি নেমে আসে।

নদীর তরঙ্গ তোমার হৃদস্পন্দনে
তাকেই রক্ষা করছ যাকে ডেকেছিলাম!
আমি তো চাইনি অদেয় কোন কিছু
আমি তো চাইনি তোমার সমূহ পতন।

দেখেছি সহস্র অন্ধকার জয়ী মানুষ
সামান্য মুদ্রার মোহে অন্ধকারে ডুবে যায়,
কাছে থাকো এই ক্রান্তিলগ্নে
ভেবো না আমার জন্যে, ঠিক থাকব আমি
যখন আকাশ থেকে রাত্রি নেমে আসে।

তোমার অশ্রুবিন্দুতে আমার ছায়া ভাসে
সে কোন সীমান্তের পথ পেরিয়েছিলাম!
শুধু প্রেমের জন্য বোকার মত বসে নেই আজ
অন্য কারো মদের গ্লাসে ডুবতে চাই না আমি।

শাশ্বত সময় ধরে মনে রাখব
তোমার চোখে আছড়ে পরা ঠাণ্ডা হাওয়াটুকু।
তোমার মনের পোড়োজমিতে খুঁজে নিও আমাকে
যখন আকাশ থেকে রাত্রি নেমে আসে।

তোমাকে আমি লিখেছিলাম বটে
তুমি ছিলে কোন সে জুয়ার তালে!
তোমাকে এবার জানব ভাল করে
স্মৃতি যদি না করে বঞ্চনা।

এবার আমি মুক্তি চাই পৃথিবী থেকে-
যে পৃথিবী অস্বীকার কর তুমি।
আমাকে দিয়ে দাও সমুদয়
বয়ে বেড়াব যে করে হোক
যখন আকাশ থেকে রাত্রি নেমে আসে।

 

 

মুক্তি পাব আমি

( I Shall Be Released: BOB DYLAN)

ওরা বলে সব কিছুকেই বদলে নেয়া চলে

তবু দূরত্বে থেকেছে অধরা,

যারা আমাকে ধরে এনেছিল

সবার মুখই মনে পড়ে যাচ্ছে;

পশ্চিম থেকে পুবে ফুটছে আমার আলো

আজ সেই দিন-

মুক্তি পাব আমি।

 

ওরা বলে সব কিছুরই সুরক্ষা দরকার

ওরা বলে সবার আছে পতন,

এই কারাপ্রাচীরের ঊর্ধে

দেখছি নিজের ছবি –

পশ্চিম থেকে পুবে ফুটছে আমার আলো

আজ সেই দিন-

মুক্তি পাব আমি।

 

আমার পাশে বিহ্বল জনতার ভিড়ে

শপথ করে এড়াচ্ছে তার দায়

চিৎকার করে বলছে দিনমান

সে নাকি ষড়যন্ত্রের শিকার।

পশ্চিম থেকে পুবে ফুটছে আমার আলো

আজ সেই দিন-

মুক্তি পাব আমি।

 

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!

Discover more from

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading