হালদা পাড়ের অসমাপ্ত গল্প ।। ফজলুল কবিরী

ধপ করে একটা শব্দ হয় আর বৃদ্ধ মুনাফ আলি নৌকার গলুইয়ে ভারসাম্য রাখতে না পেরে গড়িয়ে পানিতে পড়ে যায়। তখন তুমুল বৃষ্টি আর বজ্রপাতের নিনাদে প্রমত্তা হালদা গজরাচ্ছে। নৌকায় থাকা মানুষগুলো থিকথিকে জলের আস্তরণ থেকে পোনা সংগ্রহে এতটাই মত্ত যে মুনাফ আলির পড়ে যাওয়া খেয়ালই করতে পারে না।
মুনাফ আলি শীর্ণ শরীরের সবটুকু বলপ্রয়োগ করে প্রাণপণে নৌকার গলুই আঁকড়ে ধরার চেষ্টা করে ঠিকই, কিন্তু শেষরক্ষা হয় না। বাতাসের তীব্র ধাক্কায় নৌকা দুলে উঠলে গলুই থেকে ছিটকে পড়ে পানিতে তলিয়ে যায় সে।
নৌকায় সাকল্যে চারজন। বাকি তিনজনের সবাই নৌকার অন্য প্রান্তে গভীর মনোযোগ নিয়ে পোনা ধরতে ব্যস্ত থাকায় এ দৃশ্য তাদের চোখ এড়িয়ে যায়। দৃশ্যের বাইরে থাকা মুনাফ আলিও পোনা ধরাকে কেন্দ্র করে উতলা হালদায় তৈরি হওয়া উত্তেজনায় মনোযোগ রেখে যৌবনের স্মৃতি হাতড়ে বেড়াচ্ছিল আর ক্ষণে ক্ষণে বড় ছেলে শমসের আলি ও নৌকায় থাকা বাকি দুজনের ব্যস্ত হাতগুলোর নড়াচড়ার দিকে নজর রাখছিল। এসব করতে গিয়েই তার পা ফসকে যায়। নৌকা বাতাসে দুলছিল এবং তীব্র বৃষ্টির ছাঁটে উদোম শরীর সঁপে দিয়ে তারা চোখে-মুখে ‘এলাহি ভরসা’ ভাব ফুটিয়ে নৌকার ভারসাম্য রাখার চেষ্টা করছিল।
মুনাফ আলির পড়ে যাওয়া ঠেকাতে না পারলেও বাপকে চোখে চোখে রাখার চেষ্টা তার বড় ছেলে শমসেরের যে ছিল না, তা নয়। তক্কে তক্কে সে বাপের দিকে চোখ রাখছিল আর বাপকে দু-চার কথা শুনিয়ে যাচ্ছিল। একে তো বাপের শরীরের এই মরা অবস্থায় তাকে আনাটাই এক যন্ত্রণা, তার ওপর নৌকায় আসার জন্য বাপের গোঁ ধরে বসাটা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছিল না সে।
বাপের পানিতে তলিয়ে যাওয়ার বিষয়টা প্রথমে সে-ই খেয়াল করে এবং হঠাৎ করে তার নিশ্বাস ছোট হয়ে আসে। তারপর সে জোরে একটা চিৎকার দিয়ে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে নৌকা থেকে প্রায় লাফিয়ে বাপ নৌকার যে প্রান্তে বসেছিল সেদিকে যায়। অন্যদের মনোযোগও মুহূর্তের মধ্যে দিক পরিবর্তন করে মুনাফ আলির খোঁজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে অসতর্কতাবশত শমসেরের ডান হাতের বুড়ো আঙুলের নখটা পলকের মধ্যে হাওয়া হয়ে যায়। কেউ টেরই পায় না। ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরোলে তা বাকিদের নজরে আসে। কীভাবে নখটা খোয়া গেল তা নিয়ে ভাবার সময় তারা পায় না। ততক্ষণে অনেক রক্ত আঙুল বেয়ে নৌকার তক্তা ভিজিয়ে হালদার জলে মিশে যায়।
নৌকার মাঝখানে ছোট করে কাটা কাঠের তক্তা আর কাদামাটি দিয়ে বানানো হয়েছে ‘গুদি’ (নৌকায় মাছ রাখার জায়গা)। গুদিতে পানি জমিয়ে মিহি সুতি কাপড় বিছিয়ে পোনা রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। সেখান থেকে এক টুকরা কাপড় ছিঁড়ে নিয়ে কেউ একজন শমসেরের আঙুলটা বাঁধতে গেলে এক ঝটকায় সেটা ফেলে দিয়ে পানিতে ঝাঁপ দেয় শমসের।
ততক্ষণে খবরটা হালদায় নোঙর করা সবগুলো নৌকা হয়ে ডাঙায়ও রটে যায়। কাছেপিঠে থাকা নৌকার মাঝিরাও কী হতে কী হয়ে গেল এটা ভাবতে ভাবতে জাল ফেলে রেখে মুনাফ আলির খোঁজে পানিতে ডুব দিতে এগিয়ে আসে।
মুনাফ আলি ৩০ বছর বয়সেও একবার একই রকম ভুল করে পাকিস্তানি সেনাদের হাতে ধরা পড়ে যেতে যেতে বেঁচে গিয়েছিল। নিশ্চিত বেয়নেটের খোঁচার সামনে পড়েও সেই যাত্রায় বেঁচে যাওয়ার ঘটনা তার কাছে অলৌকিক ব্যাপার হয়ে টিকে ছিল এত দিন। বেয়নেটের খোঁচায় মুনাফ আলির লুঙ্গির গিঁট খুলে পাকিস্তানি সেনারা যে তার উদালা ছতর দেখে মুসলমান কি না পরখ করেছিল, সে ঘটনা তার খোঁজে হালদায় ডুব দিতে নামা মানুষগুলোর স্মৃতিতে না থাকলেও বুড়ো লোকটার এমন টুপ করে পানির তলে নাই হয়ে যাওয়ার কথা কেউ ভাবতে পারে না।
পাকিস্তানি সেনাদের সামনে পড়ে গিয়েও কোনো রকমে প্রাণ নিয়ে ফিরে সে দৌড়ে পালাচ্ছিল আর বুকের মধ্যে বারবার আয়াতুল কুরসি পড়ে ফুঁ দিয়ে আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করছিল। হালদার জলরাশি সেই রাস্তাটিকে এখনো বিলীন করতে পারেনি।
জ্যৈষ্ঠের শুরুর দিকের ঘটনা। গোলমাল শুরু হওয়ার কারণে মানুষের মধ্যে অশান্তি বিরাজ করছিল। তখন হালদার ভরা জোয়ার, দেহে যৌবন ফুলে-ফেঁপে উঠেছে। ডিমে টইটম্বুর বিশাল সাইজের মাছগুলো ভাসছিল। তবে সেদিকে নজর দেওয়ার ফুরসত গ্রামবাসীর ছিল না। কিন্তু পুর্বপুরুষের হাত থেকে পাওয়া অভ্যাস ছাড়তে না পেরে প্রতিবছরের মতো হালদায় নৌকা ভাসাতে আয়োজনের কমতি ছিল না যুবক মুনাফ আলির। হালদায় ভেসে আসা মাছেরা তাকে উজাড় করেই দিয়েছিল।
তবু মরতে মরতে বেঁচে যাওয়া সেসব স্মৃতি—যুদ্ধের বছরেই জন্ম নেওয়া শমসের আলির বয়সের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে—সময় যত গড়িয়েছে তত বেশি বয়সের কালি লেগে ঝাপসা হয়েছে।
আকস্মিকভাবে গ্রামে পাকিস্তানি সেনা নামার খবর যেদিন রটে, সেদিনও হালদার জনপদে মুনাফ আলির পদচারণ স্বাভাবিকই ছিল। কিন্তু প্রথম দিনই তাকে পাকিস্তানি সেনাদের সামনে পড়তে হয় আর লুঙ্গির গিঁট খুলে মুসলমান কি না তা প্রমাণ করতে পাকিস্তানি সেনাদের সামনে ছতর দেখাতে হয়। খুলতে দেরি দেখে বেয়নেটের খোঁচা লুঙ্গিতে লাগে আর মুনাফ আলিকে অপমান ও ক্ষোভে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিয়ে—তার লুঙ্গির গিঁট লাগানোর জন্য অপেক্ষা না করেই তারা স্কুল ঘরের অস্থায়ী ক্যাম্পে ফিরে যায়। বেয়নেটের খোঁচায় লুঙ্গিটা যদি খসে না পড়ত কিংবা আরেকটু দেরি হতো, হয়তো সেদিনই তাকে স্কুল মাঠের ক্যাম্পে ঢুকে যেতে হতো, এ কথা ভেবে মুনাফ আলি মনে মনে প্রায়ই সান্ত্বনা খোঁজার চেষ্টা করে।
সে যাত্রায় বেঁচে গেলেও এ যাত্রায় নিজেকে পানিতে তলিয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করতে পারে না মুনাফ আলি। সারা দিন প্রায় একনাগাড়ে ঘন কালো মেঘের বর্ষণ আর বজ্রপাতের মধ্যেও নদীতে জড়ো হওয়া শত শত নৌকা আর অপেক্ষমাণ মানুষগুলো মাছের পোনা ধরায় ব্যস্ত।
পোনা ছাড়ছে মা-মাছেরা। হালদার তীব্র গর্জন বাতাসে ভর করে ভেসে যাচ্ছে কাছের জনপদগুলোর ওপর দিয়ে। নদীর জলরাশি নৌকায় থাকা মানুষদের উৎকণ্ঠাকে দীর্ঘ করে। মুনাফ আলি নিমেষে কোথায় তলিয়ে গেল তারা কোনোভাবেই আন্দাজ করতে পারে না। শমসের পাগলের মতো বাপকে পানির মধ্যে খুঁজতে থাকে আর ক্ষণে ক্ষণে হালদার ঘোলা জলে ডুব দিতে থাকে। অন্যান্য নৌকা থেকেও অনেকেই পানিতে নেমে পড়ে এবং একই কায়দায় ডুবে যাওয়া মানুষটাকে খোঁজার চেষ্টা করে। যারা পানিতে না নেমে নৌকার গলুইয়ে দাঁড়িয়ে এদিক-ওদিক চোখ রেখে খোঁজার চেষ্টা করছে, তাদের কপালে একটা দুশ্চিন্তার ভাঁজ বসিয়ে দিয়ে হালদার পানি ক্রমেই ফুলতে শুরু করে।
এই দুর্যোগে নিজের আঙুলের দুর্গতি নিয়ে শমসেরের বাড়তি চিন্তা আসে না। একটু পর সে মাথা তুলে বাকিদের কাছে কান্নাজড়িত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে বাপের কোনো খোঁজ পাওয়া গেল কি না। কিন্তু নখটা উড়ে যাওয়ায় তার ডান হাত প্রচণ্ড টনটন করে। মুনাফ আলিকে খুঁজতে থাকা বাদবাকিদেরও দুশ্চিন্তা কমে না। পানি আরও বেশি ঘোলা হতে শুরু করে। বজ্রপাতসহ বৃষ্টির দমক গায়ে হুল ফুটিয়ে যাচ্ছে ক্রমাগত। জোয়ারের পানি ফুলতে ফুলতে থম মেরে আসছে ধীরে ধীরে।
স্থানীয়রা এই সময়কে ‘জো’ বলে। পানি যখন ঘোলা হতে থাকে, ফেনায় ফেনায় ভরে ওঠে, তখন মাছের ডিম ছাড়ার মোক্ষম সময়।
খলিফার ঘোনার বাঁকে তারা নোঙর করেছে। চারদিকে শত শত নৌকা ভিড় করেছে। আজ অমাবস্যার তিথি। হালদা নদীতে মাছের পোনা ছাড়ার সময় ঘনালে এই জনপদে একটা অদ্ভুত ব্যস্ততা শুরু হয়। পোনা শিকারিরা খলিফার ঘোনা ছাড়াও নৌকা নিয়ে বসেছে নানা জায়গায়। আমতোয়া, অংকুরি ঘোনা, মাছুয়াঘোনা, কাগতিয়ার টেক, নাপিতের ঘাট, গড়দুয়ারাসহ নাজিরহাট ও ফটিকছড়ির নানা টেকে মানুষ নৌকা নিয়ে পাহারা দেয়। ফটিকছড়ি, রাউজান ও হাটহাজারীর জনপদকে স্পর্শ করে হালদা নদী কর্ণফুলীতে গিয়ে মিশেছে। যেসব লোক সারা বছর লুঙ্গিতে গোছ মেরে নদীর পাড়ের চায়ের দোকানে বসে দেশের গরম বাতাস নিয়ে আলাপে সময় কাটায়, তাদের মধ্যেও একটা আলগা উত্তেজনা শুরু হয়ে যায়। বছরের শুরুর দুই মাস অর্থাৎ বৈশাখ আর জ্যৈষ্ঠ মাসে তাদের ঘরের চালার বয়স বাতাসের তোড়ে কিংবা ঝড়ঝাঁপটার প্রকোপে প্রায় অর্ধেকটা চলে যায়। সেদিকে খুব বেশি নজর দেওয়ার অবসর তারা পায় না। প্রমত্তা হালদার ফেনিল জলকে ঘিরে তাদের নানা রকম ছক কষা চলতে থাকে। এই সময় হালদার জলে সোনা ফলে। অমাবস্যা আর পূর্ণিমা তিথিতে দূর-দূরান্ত থেকে আসা অতিথি মাছেরা ডিম ছাড়ে। রুই-কাতলা-মৃগেল আর কালবাউশসহ নানা জাতের মাছের ডিমে ঘোলা হয়ে ওঠে হালদার পানি। রুপালি সোনা কুড়িয়ে নিতে এই অঞ্চলের হাজার হাজার মানুষ নদীতে নৌকা ভাসায়। মাছের গা ঘেঁষে জাল ফেলে ডিম শিকারিরা। নৌকার দুই পাশে নোঙর ফেলে অশান্ত জলের ঢেউ বশে আনে।
বাপকে নৌকায় না তোলার সব রকম চেষ্টাই শমসের করেছে। কুমারখালী ঘাটে এসে যখন সবাই নৌকায় ওঠার তোড়জোড় শুরু করে, তখনো সে বাপকে বোঝানোর চেষ্টা করেছে। কিন্তু একরোখা মানুষটাকে কিছুতেই থামানো যায়নি। যা বোঝে তা-ই করে। ভোর থেকে নৌকা পাহারা দিয়ে রেখেছে। বাপকে যে রেখে আসবে সে উপায় ছিল না। এই জলের নাড়ি-নক্ষত্র বাপের চেনা।
ছোটবেলা থেকে এই জলের বুকে সাঁতার কেটেছে। পোনা ধরার মৌসুমে মেঘ গর্জে উঠলে বাপের শরীরে যে অসুর ভর করে তাকে সামলানোর ক্ষমতা শমসেরের ছিল না।

২.
কান্নার তরঙ্গ বাতাসে চক্কর খেতে খেতে মুনাফ আলির মাটির ঘরের জীর্ণ দেয়ালের চারপাশে আলোড়ন তোলে। আর মাটির ঘরের সামনে চালা টেনে বানানো বারান্দায় শায়িত মুনাফ আলির লাশের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়া তার স্ত্রী ও পুত্র শমসেরের বিলাপ থামানোর জন্য কারও কারও তৎপরতা বাড়ে। বিষয়টা আচমকাই ঘটে এবং এ রকম একটা দুর্যোগের জন্য মৃতের পরিবার যে প্রস্তুত ছিল না, এ কথা সবাই বলাবলি করে।
মৃতের বাড়িতে এত মানুষ ভিড় করে আছে অথচ কারও মুখে কোনো দোয়া-দরুদ নেই দেখে হঠাৎ মসজিদের ইমাম সাহেব বিরক্তি প্রকাশ করেন, ‘মওতাবাড়িত এদুগ্গান মানুষ ঠেলাঠেলি গইল্লি অইব্যুও না? কিয়্যর মুখঅত দোয়া-কালাম ত কিছু ন ফুনির।’
তারপর তিনি সমবেত হওয়া নারীদের লক্ষ করে ধমকের সুরে ঘরের ভেতরে যেতে বলেন, ‘বেগানা মাইপোয়া অক্কল বেডার ভেতর ঠাসাঠাসি ন গইয্যু। তোঁয়ারা ভেতরে যওগো।’
ইমাম সাহেবের কথায় ধীরে ধীরে নারীরা ঘরের ভেতর ঢুকে পড়ে। কিন্তু ভেতর থেকেও তাদের ফিসফিসানির আওয়াজ ঘরের বাইরে লাশের বিছানার আশপাশে ভিড় করা মানুষের কানে ধাক্কা মারে।
অসুস্থ মানুষটা কী মনে করে এমন গোঁ ধরেছিল তা কেউ বুঝতে পারে না। এমন ঝড়-তুফানের দিনে হালদায় যাওয়ার বায়না ধরাটা একেবারেই যে উচিত হয়নি, এ বিষয়ে কেউ দ্বিমত করে না। প্রতিবছর এই দিনে মুনাফ আলির শরীরের রোগ অর্ধেক সেরে যায়, তার স্ত্রী ও পুত্র-কন্যা এ রকমই বলে আসত। তবু এবার তাকে নৌকায় না তুলতে তার ছেলে শমসের তো একপায়ে খাড়া ছিল। মুনাফ আলির স্ত্রী রমিজারও সাফ মানা ছিল। কিন্তু লোকটার জেদ ও গোঁয়ার্তুমির কাছে সবাই হার মানে। তার ওপর ভেবেছিল বেলা গড়ালে বাপকে কারও নৌকা কিংবা সাম্পানে করে ঘাটে তুলে দেওয়ার ব্যবস্থা করবে। কিন্তু কী হতে কী হয়ে গেল!
নৌকা থেকে পড়ে যাওয়ার পর প্রায় কয়েক ঘণ্টা ধরে তন্নতন্ন করে তাকে নদীতে খুঁজে বেড়িয়েছে সবাই। কী করে এত দ্রুত লোকটা পানিতে তলিয়ে গেল, তা কেউই বুঝতে পারে না। বহু বছর আগে একবার মহাজনের বাড়ির ছেলে প্রিয়তোষ মহাজন স্লুইসগেটে আটকা পড়ে পানিতে তলিয়ে গিয়েছিল। এরপর অনেক বছর ধরে হালদায় ডুবে মরার কথা শোনা যায়নি।
সারা জীবন হালদার জলে গা ধুয়ে পাকপবিত্র হয়ে সংসারধর্ম পালন করেছে মুনাফ আলি। জোয়ারের পানি কখন ফোলে, কখন ভাটার টান পড়ে—মৃত্যুর আগ অবধি তার নখদর্পণে ছিল। সারা দিন খেতখামারে খেটে দিনশেষে হালদায় গা ধুয়ে ঘরে ফিরতে না পারলে তার মনে শান্তি আসত না—এমনকি এই বুড়ো বয়সেও। শেষ কয় মাস তার শরীরে নানান রোগব্যাধি বাসা বাঁধে এবং রোগ-শোকে ভুগে কাবু হয়ে পড়ে। তার ওপর বার্ধক্যও ভর করে। ফলে ঘরের বাইরে খুব একটা যেতে পারত না। ঘরে বসে থাকতে থাকতে তার মেজাজ খিটখিটে হয়ে থাকত আর সারাক্ষণ বউয়ের সঙ্গে নানান বিষয়ে হইচই করত।
উঠানে মৃত বাড়ির শোকে শরিক হতে ভিড় করেছে অনেক লোক। ছেলে-বুড়ো অনেকেই। তাদের শোক ও কৌতূহলের মধ্যে একটা চাপা উত্তেজনা বিরাজ করে। অনেকগুলো বিষয় একই সঙ্গে ঘটে চলেছে। হঠাৎ করে এই দুর্ঘটনা পুরো গ্রামেই শুধু গুরুত্বপূর্ণ হয়ে পড়েছে তা নয়। দেখতে দেখতে ইউনিয়ন পরিষদের চৌকিদার থেকে শুরু করে মেম্বার ও চেয়ারম্যানকেও এ ব্যাপারে নাক গলাতে দেখা যায়।
চৌকিদার হন্তদন্ত হয়ে এসে জানায়, মৃতের দাফন নাকি সরকারি লোকজনের সহায়তায় হবে। তার মুখেই জানা যায় চেয়ারম্যান হাশেম মোল্লা সরকারি লোকজনের সঙ্গে কথাবার্তা বলে সবকিছু ঠিকঠাক করতে ব্যস্ত সময় পার করছে। বিষয়টা সবার কাছে খানিকটা কৌতূহলের। কারণ এই বুড়ো লোকটা মরার আগ পর্যন্ত একরোখা মুজিবের ভক্ত ছিল। এ কথা সবাই জানে। শেখ মুজিবের মার্ডারের পর মুনাফ আলির শোক ও ক্ষোভের কথা গ্রামের কোনো কোনো প্রবীণ ব্যক্তি হয়তো এখনো স্মরণ করতে পারে। এরশাদ পিরিয়ড পর্যন্ত তার এই নেতাপ্রীতির কথা সবাই জানত। তখন অবধি তাকে অনেকেই ‘খাই-ন-খাই শেখ মুজিবের’ চ্যালা বলে ঠাট্টা করত। বহু বছর আগে খোদ চেয়ারম্যান হাশেম মোল্লা একবার ঠাট্টা করে কথাটি বলায় মুনাফ আলি নাকি চেয়ারম্যানের ওপর ভীষণ খেপে গিয়েছিল। তলিয়ে যাওয়ার আগের দিন পর্যন্ত লোকটা ইউনিয়ন পরিষদে যায়নি, চেয়ারম্যানের সঙ্গে দহরম-মহরম হওয়া তো দূরের কথা।
কিন্তু এমন সাধারণ একটা লোকের মৃত্যুতে তার দাফন-কাফন নিয়ে খোদ চেয়ারম্যানসহ সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়তে দেখে অনেকেই অবাক হয়। এমন কারবার এলাকায় আগে কখনো ঘটেনি।
মানুষের কৌতূহলের ঘোমটা ধীরে ধীরে খুলতে থাকে। সরকারি অফিসারসহ পুলিশ বাহিনীর লোকজন এসে মুর্দাকে স্কুল মাঠে নিয়ে যাওয়ার এন্তেজাম করার কথা তারা শোনে।
জমায়েত হওয়া পাড়াপড়শিরা একে অপরের মুখে শোনে, যুদ্ধের সময় মুক্তিবাহিনীর হয়ে অংশগ্রহণ করায় মুনাফ আলিকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা হবে।

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!

Discover more from

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading