সাবলাইম ।। ইফতেখার মাহমুদ

আল আমিনের দোকানে অদ্ভুত সব লোক আসে, ততোধিক অদ্ভুত গল্প নিয়ে। আমাদের বাড়ির পাশে যে পোস্ট অফিসটা আছে, দোকানটা সেটারই লাগোয়া।

সন্ধ্যেয় মাঝে মাঝে চা খেতে যাই। কাঠের টুলে বসে বসে লোকের গল্প শুনি। রিকশাওয়ালা আর সিএনজিওয়ালারাই বেশি আসে। নানান কথা তাদের। যদিও খিস্তি খেঁউড়ে ভরা, তবুও শহুরে ছেলেমেয়েদের মতো উপর-চালাকি নেই, শুনতে অসহ্য লাগে না।

এক বয়স্ক সিএনজিওয়ালা কথা বলছিল। এমন করে বলেছিল লোকটা, ভুলতে পারা যায় না তার কথা বলার ভঙ্গি। চা খেতে খেতে মাঝখান থেকে তার কথা শুনছিলাম-

‘আরে না না, সে রোজ একেক ঘটনা বানায়। আমি নিজেই তো অনেক জায়গায় দেখছি। নানান গল্প তার, এটা ওটা বলে টাকা চায়। মালিবাগেও যায়। এই তাজমহল রোডে দেখছি। বেইলি রোডেও একদিন দেখছি।

মাঝে মাঝে দেখি এক মেয়েরে সাথে আনে। একদিন কয় কন্যা, একদিন কয় বউ। একটা লাঠি নিয়ে কানার ভান করে। কেউ কেউ টাকা দেয়। কেউ তাকায়ই না।

বড়লোকেরা বেশি একটা টাকা দেয় না। একটু যারা কম টাকার লোক, দশ টাকার জন্যে দশ মিনিট ক্যাচাল করে, বেশি টাকা তারাই দেয়। আজব দুনিয়া।

একদিন একলোক তো, আসাদ গেটের আড়ংয়ের কাছে সিগনালে আছি, দরোজা খুলে এক থাপ্পড় দিছিল। কেন যে থাপ্পড় দিল। যাই হোক, সেও উল্টা চড় মারছে। আমি ঘাড় ঘুরাইয়া তাকাই আছি। সে তো দৌড় মারছে। লোকটাও দৌড় দিছিল। ধরতে পারছে কিনা জানা নাই। সিগন্যাল খুইলে দিছিল। গাড়ি বাধ্য হইয়ে টান দিছি। বামে দাঁড়াইছিলাম খানিক। আর কি আসে। দৌড়ানি দিতে দিতে যাত্রী কই গেছে তার খবর আছে?

একদিন দেখি শেরাটনের সামনে। হুইল চেয়ারে। পা নাই, দুইটাই। দুঃখ পাইছিলাম। পরে আরেকদিন দেখি, হাঁটতেছে। পা কেমনে লুকাইছিল কে জানে।

সিগন্যালে দাঁড়াইলেই আমি তারে খুঁজি। কিছু না কিছু সে করবেই। মাঝে মাঝে কথাও বলে টিভির মত কইরে।

কথা কই নাই কোনদিন। প্যাসেঞ্জার থাকে, কথা কওয়া ঠিক না। ইচ্ছাও হয় নাই। নয়ন মেলে দেখি খালি। কত কিছু পারে হে।’

আরও নানান কথা বলতে থাকে সিএনজিওয়ালা। চায়ের কাপটা দোকানে রেখে আমরা একটু দূরে সরে যাই।
আমার বন্ধুরা নানান গল্প করতে থাকে।
আমি ঐ ভিক্ষুকের কথা ভাবতে থাকি।

নিখুঁত মায়া জাগানিয়া কোন ভিক্ষুককে দেখলে তার কথা মনে পড়ে যাবে।

মনে পড়বে, লোকটা হয়তো অভিনেতা হতে পারত। বড় নামকরা, মঞ্চ কাঁপানো অভিনেতা। কিংবা হয়তো সে অভিনেতাই। আমরা বুঝি না, হয়তো তাই তাকে ভিক্ষুক বলে ডাকি।

শুধু তো শিল্পী চিনি, শিল্প আর কতটুকুই বা বুঝি।

 

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!

Discover more from

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading