আলাপচারিতা ।। হাসান রোবায়েত ও ওরা দশজন (দ্বিতীয় পর্ব)

শুধু সাহিত্য নয় প্রায় ক্ষমতাকাঠামোর সব ক্ষেত্রেই এই মাস্তানি চলছে। মধ্যযুগকে আমার সব দিক দিয়েই শ্রেষ্ঠ মনে হয়। ইউরোপের মধ্যযুগ আর আমাদের মধ্যযুগের মধ্যে আকাশ-পাতাল ফারাক আছে।


জয়: সংস্কৃত তো মৃত ভাষা। একটা মৃত ভাষার ছন্দ নিয়ে এত মাতামাতি কি যৌক্তিক?

রোবায়েত: সেইটা যে কেউই করতে পারে জয় ভাই। যদি ভালো কাজ হয় তবে কেন করবে না! যে যার মতো করে স্বাধীন ভাবে কাজ করবে। সেটাই যৌক্তিক। তবে সমালোচনা থাকা ভালো। তাতে সাহিত্যই আগায়।

হামেদী: কিন্তু ধরেন, ভাষার অনেক ধরনের অভিমুখ থাকে একটা নির্দিষ্ট সময়ে। এখন বাংলা ভাষা ঐরকম সম্ভাবনা ক্রিয়েট করতেছে কি-না এই সময়ে?

রোবায়েত: নিশ্চয়ই ক্রিয়েট করতেছে। বিচিত্র রকমের লেখা হচ্ছে। একেকজন একেক ভাবে ট্রাই করতেছেন।

হামেদী:

আপনি একটু ক্রোনলজি দেখেন মধ্যযুগীয় বাংলা ভাষার,

চন্ডীদাস :

কে না বাঁশী বাএ বড়ায়ি কালিনী নইকুলে
কে না বাঁশী বাএ বড়ায়ি এ গোঠ গোকূলে
আকুল শরীর মোর বেআকুল মন
বাঁশীর শবদেঁ মো আউলাইলোঁ রান্ধন

 

বিদ্যাপতি :

এ সখি হামারি দুখের নাহি ওর।
এ ভরা বাদর                     মাহ ভাদর
শূন্য মন্দির মোর 

 

ময়মনসিংহ গীতিকা :

কোথায় পাব কলসি কইন্যা কোথায় পাব
দড়ি
তুমি হও গহীন গাঙ, আমি ডুব্যা মরি

 

ভারতচন্দ্র :

প্রণমীয়া পাটুনী কহিছেন জোড় হাতে
আমার সন্তান যেন থাকে দুধে -ভাতে

এবার আপনি দেখুন বাংলা ভাষার প্রথম ‘আধুনিক কবি’র ভাষা :

রুষিলা বাসবত্রাস ! গম্ভীরে যেমতি
নিশীথে অম্বরে মন্দ্রে জীমূতেন্দ্র কোপি

সুর,ছন্দ ও কল্পনার আন্তরিক মিলমিশে যে বাংলা ভাষা ভারতচন্দ্র পর্যন্ত স্বাদু ও স্বচ্ছল ছিল, সেটা মধুসূদনে এসে দুর্বোধ্যতা ও আভিধানিক শব্দের আলখাল্লা পড়লো, যেটা ভেদ করে কাব্যের মর্মে পৌঁছাতে গলদঘর্ম হওয়ার দশা, এটাকে কি আপনি আধুনিকতা বলবেন? নাকি ইতিহাস-বিচ্ছিন্নতা বলবেন? কেন বলবেন?

রোবায়েত: এইগুলা হইছে ফোর্ট উইলিয়াম ঘরানার বেরাদারিতে। মানে, কলোনির প্রভাবে। আর  মধ্যযুগকে বলা হইছে ব্যাকডেটেড। শুধু সাহিত্য নয় প্রায় ক্ষমতাকাঠামোর সব ক্ষেত্রেই এই মাস্তানি চলছে। মধ্যযুগকে আমার সব দিক দিয়েই শ্রেষ্ঠ মনে হয়। ইউরোপের মধ্যযুগ আর আমাদের মধ্যযুগের মধ্যে আকাশ-পাতাল ফারাক আছে।

তো, মাইকেল সাহেবের ঐ কাজগুলোকে আমার বিরাট বিপ্লব মনে হয় বাংলা কবিতার ক্ষেত্রে। সে  জন্য বাংলাভাষী হিসেবে আমি গর্বিত। কিন্তু আমাদের মূলধারার সাহিত্যকে যেভাবে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে বা হচ্ছে সেইটা থেকে বের হবার সময় আসছে হয়তো। আমাদের কবিতা হয়তো মধ্যযুগের থেকেই তার নতুন নতুন টুলস পাইতে পারে।

হামেদী: তার সময়ের প্রেক্ষিতে তিনি গ্রেট। কিন্তু বাংলা ভাষার স্বাভাবিক প্রবাহরে রুদ্ধ কইরা দিসেন তিনি।

রোবায়েত: তিনি গ্রেট। গ্রেটরা আগের সাহিত্যের যে কোনো প্রবাহকেই রুদ্ধ করে দেন।

হামেদী: শেষ প্রশ্ন আমার। রবীন্দ্র-বিরোধিতার নামে তিরিশের কবিরা যে ইউরোপের দিকে কেবলা রোখ করলেন, এইটা কতটা যুক্তি ও বুদ্ধি প্রসূত? রবীন্দ্রনাথের কাব্যভাষা ও কাব্য-চিন্তা থেকে বেরিয়ে আসার আর কি বিকল্প তারা বেছে নিতে পারতেন? তাদের এই প্রচেষ্টা বাংলা কাব্যের সম্ভাবনা না সর্বনাশ হিসাবে দেখবেন?

রোবায়েত: এইটাও হইছে কলোনি হবার ফলে। তবে, তারা কোন দিকে যাইতে পারতেন সেটা আমার কনসার্ন না। জীবনানন্দ তো বাংলার টুলস নিয়েই বেশি কাজ করছেন। বাংলাকে তার মতো করে আর কে পারছে এক্সপ্লোর করতে? ‘অবসরের গান’ তো সে কথাই বলে। আমি এইটাকে এই সময়ে, গ্লোবাল ভিলেজের নাগরিক হিসেবে নিতে চাই। অন্তত আমার সময়ে। তবে, নিজেদেরই সাহিত্য যখন এত সমৃদ্ধ তখন সেখান থেকেই বেশি করে নেবো আমি।

শোয়েব: শুভ মধ্যরাত রোবায়েত। এই সময়ের তিনজন পছন্দের কবির নাম বলো এবং কারণগুলো বলো। আশা করি নাম এড়িয়ে যাবা না।

রোবায়েত: তুমি তো মধ্যরাতরে অশুভ কইরা দিলা। হা হা। শাহ মাইদুল ইসলাম, হাসনাত শোয়েব, অনুপম মণ্ডল। কারণ সম্ভবত, এদের ভাষাভঙ্গি।

শোয়েব: আচ্ছা । তোমার কি মনে হয় এই শহরে কবি হয়ে টিকে থাকতে গেলে কোন বিশেষ সার্কেল বা সিন্ডিকেট মেন্টেন করতে হয়?

রোবায়েত: না। ভালো কবিতা লিখতে হয়।

জয়: ভাল কবিতার সংজ্ঞা কি?

রোবায়েত: আমার কাছে যে কবিতা ভালো লাগে সেটাই ভালো কবিতা জয় ভাই।

শোয়েব: তুমি কি মনে কর শুধু ভালো কবিতা লিখে সারভাইভ করা সম্ভব?

রোবায়েত: তুমি কি রাজার মতো সারভাইভ করতে চাও নাকি কবিতা লিখে! সেটা তো সম্ভব না। কবি সারভাইভ করে টেক্সটে।

জয়: এইটা কোন অর্থপূর্ণ সংজ্ঞা হলো না

রোবায়েত: হলো না হয়তো। যেহেতু ভালোর কোনো ইউনিট নাই। তাই আমার ভালো লাগাই আমার ইউনিট।

শোয়েব: ভালো কবিতা যদিও আমি গুনি না। ঐটা আমার দরকার নাই। তবে কি আমি ধরে নেবো রোবায়েত তুমি কোন গ্রুপইজমের বাইরেই আছো? কিংবা যেটুকু তুমি মেন্টেন করো বা আমরা ধারণা করি, সেটা কিসের ভিত্তিতে? নাকি এটা তুমি মানোই না যা তুমি আসলে কোন গ্রুপে আছো?

রোবায়েত: আমি কোনো গ্রুপে নাই। যেসবে আমাকে হামেশাই দেখা যায় তাদেরকে ব্যক্তি আর কবি হিসেবে আমি পছন্দ করি।

শোয়েব: আচ্ছা। তুমি বলছিলা বাংলা একাডেমি নিবা না। এটা কি বিশেষ কোন পুরস্কার নিয়ে নাকি ওভারল পুরস্কার নিয়ে ধারণা?

রোবায়েত: যে পুরস্কার পাইলে আমারে রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় মানুষ চিনতে পারবে সেই পুরস্কার নিয়ে না। হা হা

শোয়েব: বাংলা একাডেমি পাইলে ত আরো বেশি মানুষ চিনবে। রাষ্ট্রীয় পুরস্কার বলে কথা

রোবায়েত: ধুর! কেউ চেনে না। আমিই জানি না গতবার কে পাইছিলেন।

শোয়েব: আসলে কোন পুরস্কার মানুষ চেনায় নাকি মানুষের কারণে পুরস্কারকে চেনা হয়

রোবায়েত: দুইটাই হয়। যেমন ধরো নোবেলের ক্ষেত্রে এইটা অনেক ঘটছে। আবার ধরো, কুন্ডেরা। উনি পাইলেই কি আর না পাইলেই কি! উনারে তো খুব ভালো করেই চেনে পাব্লিকে!

শোয়েব: আচ্ছা। আচ্ছা তোমার ছন্দে লেখার যে প্রবণতা সেটা কি হীনমন্যতা থেকে। মানে অমুক তমুককে দেখিয়ে দেয়ার জন্য? যে আমিও পারি?

রোবায়েত: না। ভাষার হারমোনিটাকে বুঝতে চাইছিলাম বলে চেষ্টা করছি।


একজন মুচি আর কবির মধ্যে আলাদা কোনো মাহাত্ম নাই। মুচিও তার ফাইনেস্ট ফিনিশিং দিতে চায় চামড়ায় আর কবি দেয় তার ভাষায়।


শোয়েব: কিন্তু তুমি একবার আমাকে বলছিলা সম্ভবত যে কিছুটা দেখানোর ইচ্ছাও ছিলো।

রোবায়েত: শুরুর দিকে অমনটা মনে হইছিল। পরে ব্যাপারটা আরো গভীরভাবে ভাবতে চেষ্টা করছি।

শোয়েব: আচ্ছা। তোমার কি এইসব ছন্দে লেখার চেয়ে নতুন ছন্দ তৈরির চেষ্টা করা যায়? এগুলো যথেষ্ট ক্লিশে হয়ে পড়ছে?

রোবায়েত: ঠিক বলছো। আমি এই ব্যাপারটা নিয়ে ভাবতেছি অনেক দিন হলো। হয়ত একদিন করেও ফেলতে পারবো। দোয়া কইরো।

শোয়েব: দোয়া দরুদে বাংলা কবিতার লাভ নাই। আমাদের এখানে ছন্দ নিয়ে এত মাতামাতির কারণ কি বলে তোমার ধারণা?

রোবায়েত: আমি মাতামাতিকে পজেটিভ হিসেবেই নিই। এতে করে কবিতার অনেক উইন্ডোই খুলে যাবে বলে আমার বিশ্বাস। তবে ছন্দ নিয়ে মৌলবাদীতা বা আজাইরা বিরুদ্ধতা কোনোটাই আমার কামের কাম বইলা মনে হয় না।

শোয়েব: আমারো তাই মনে হয়। আচ্ছা, তুমি বানানো কবিতার কথা বলছিলা; আমার মনে হয় আলাদা হওয়ার একটা চাপ তুমি কবিতার ওপর এভাবে আরোপ কর। তোমার কি মত?

রোবায়েত: না। আমার তা মনে হয় না। কবিতা তো ওহী না। কবি সেইটারে বানায়-ই তার সাধ্য অনুযায়ী। এইসব ওহী টাইপের কথা-বার্তার জন্যই কবিরা আলাদা মূল্য হাজির করতে চায় সোসাইটিতে। একজন মুচি আর কবির মধ্যে আলাদা কোনো মাহাত্ম নাই। মুচিও তার ফাইনেস্ট ফিনিশিং দিতে চায় চামড়ায় আর কবি দেয় তার ভাষায়।

শোয়েব: সেইটা ঠিক আছে। আমি আসলে বলতে চাচ্ছি, বানানোর সময় তুমি আলাদা হওয়ার কোন চাপ বোধ কর কিনা? চাপ না বলে আখাঙ্ক্ষাও বলতে পারো।

রোবায়েত: না। চাপ বোধ করি না। আমার মাথায় কবিতা ওভাবেই ফাংশন করে। আমি এর বাইরে কিছু লিখতেও পারবো না। আমি যা পারি সেভাবেই লিখি । আলাদা হওয়ার কোনো আকাঙ্ক্ষা আমার ভেতর কাজ করে না। এইটা বলতে পারো, আমার টাইপ হয়ে গেছে।

রোবায়েত: আচ্ছা। কলকাতার সাম্প্রতিক কবিতা নিয়ে তোমার ভাবনা জানতে চাই। সেই সাথে বাংলাদেশের কবিতার সাথে একটা তুলানমূলক আলোচনাও। কারা কেমন করছে?

রোবায়েত: কারা কেমন করছে সেইটা আমি বলতে পারবো না। তবে কোলকাতায় আমার অনেক প্রিয় কবি আছে। মূলত তরুণদের কথাই আমি বলছি। আর তূলনামূলক আলোচনা যেইটা সেটা করাই যায়। বাংলাদেশের কবিতায় যে প্রাণ আছে সেইটা কোলকাতার কবিতায় বেশ কম।

শোয়েব: কয়েকজনের নাম বলো যারা ভালো করছে। তাইলে পাঠক উপকৃত হবে আর কি

রোবায়েত: সব্যসাচী সান্যাল, অস্তনির্জন দত্ত, নীলাব্জ চক্রবর্তী, অনিমিখ পাত্র, অর্জুন বন্দ্যোপাধ্যায়, ইন্দ্রনীল ঘোষ, বাপি গাইন আরও নাম আছে। এই মুহূর্তে মনে পড়ছে না।

শোয়েব: আচ্ছা। রবীন্দ্রনাথের কবিতা নিয়ে তোমার মত জানতে চাই?

রোবায়েত: মত নাই।

শোয়েব: তোমার কাছে কি তার কবিতা এখনো প্রাসঙ্গিক?

রোবায়েত: না।

শোয়েব: আচ্ছা। আমার শেষ প্রশ্ন, সুন্দরবনের রামপালে বিদ্যুৎকেন্দ্র বসানো নিয়ে তোমার বক্তব্য শুনতে চাই?

রোবায়েত: সুন্দরবন কোনোভাবে আক্রান্ত হোক এইটা আমি চাই না।

জয়: রোবায়েত, ভাল কবিতা বিষয়ে তোমার উত্তরে আমি সন্তুষ্ট হতে পারিনি। তোমার কাছে যে কবিতা ভাল, আরেকজনের কাছে সেটা খারাপ হতে পারে তো? সেক্ষেত্রে কবিতায় কি কি থাকলে তা ভাল কবিতা?

রোবায়েত: কী কী থাকলে ভালো কবিতা হবে এইটা সম্ভবত আমারও আত্মজিজ্ঞাসা। এখন পর্যন্ত আমি এইটা জানি না। তবে, নিউ ল্যাংগুয়েজে কোনো কবিতা যদি আমার ক্রিয়েটিভিটিকে উসকে দিতে পারে, মানে যে কবিতা পড়ার পর আমি কবিকে ঈর্ষা ও সমীহ করতে পারি আমার কাছে তাই ভালো কবিতা। আর যেকোনো ভালো কবিতার ক্ষেত্রে সুরের হারমোনি খুব ইম্পর্ট্যান্ট মনে হয়। যে কবিতাগুলো আমাদের কাছে গ্রেট কবিতা মনে হয় সেগুলোতে ভাষা তার ফাইনেস্ট হারমোনি নিয়েই হাজির হয়।

জয়: আচ্ছা, সেই হারমোনিটা ঠিকঠাক আনতে একজন কবিকে কতখানি পরিশ্রম করতে হয়? এখন ধরো এফএম রেডিওর আরজেরা যে ভাষায় কথা বলে, তা নতুন। ওই ভাষায় কি ভাল কবিতা হতে পারে?

রোবায়েত: পরিশ্রম তো করতেই হয়। ব্যাপক ভাবেই লেগে থাকতে হয়। তবে যেইটা প্রথম দরকার সেটা হলো, পূর্ববর্তী কবিতা-অভিজ্ঞতাকে ব্যাপক ভাবে অধ্যয়ন। এবং সেখান থেকে বেরিয়ে আসার সাধনা। আর সমসাময়িক এবং অগ্রজ কবিদের ঐতিহ্যকে স্বীকার করেই তাদের কবিতাবিষয়ক পরামর্শকে মাথায় না রাখা। নিজের কবিতা নিয়ে কনফিডেন্ট হওয়া। রাতারাতি খ্যাতিমান হইতে চাইলেই কবির নিজের ভাষার বারোটা বাইজা তেরোটার কাঁটা কাঁপাকাঁপি শুরু করে দেবে।

এফএমের ভাষায় অবশ্যই কবিতা হইতে পারে। মেধাবী কারো হাতে পড়লে হয়ত হয়েই যাবে। কোনো বিশেষ টাইপের ভাষার প্রতি আমার কোনো বিরাগ নাই আপাতত।

জয়: সত্তরটা ইংরেজি শব্দ আর তিরিশটা বাংলা শব্দের একটা কবিতা কেমন হতে পারে তাই ভাবছি! হা হা হা

রোবায়েত: ঐ যে ফাইনেস্ট সিন্ট্যাক্স হইতে হবে। হলেই দেখবেন ভালো লাগতেছে।


সমালোচকেরা কবি তৈরী করে না। কবি নিজেই তৈরী হয়। সমালোচনা সাহিত্যের আলাদা শাখা। এইটা না থাকলেও কবির যায় আসে না। হোমার কি ইলিয়াড ওডিসি  সমালোচকদেরকে পড়ে, শিক্ষিত হয়ে, তারপর লিখছিলেন?


জয়: রোবায়েতের কাছে ভাষা কী এখনও বৈমাত্রেয়?
রোবায়েত: অবশ্যই বৈমাত্রেয়। ‘তারে ধরি ধরি, মনে করি, ধরতে গেলে আর মেলে না।‘ এমন।

জয়: আচ্ছা। তুমি লিখেছ,

‘কত ফুল জেরক্স করছে ঘ্রাণ
হিংসার দূরত্বে দাঁড়িয়ে”

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক কবিতায় এই মুহূর্তের জেরক্স প্রবণতা নিয়ে তোমার মন্তব্য কি?

রোবায়েত: বই হাতে আসলে বলা যেত। তবে এই জেরক্সপ্রবণতা বহু আগে থেকেই ঘটে আসছে। কেবল অমেধাবী আর শর্টকাটে সাফল্য চানে-অলারাই এমন করতে পারেন। আর সমসাময়িকেরা যদি হুবহু বা আংশিক আইডিয়াও মেরে দেয় সেইটা হবে ফালতু ব্যাপার। প্রভাবিত তো হইতেই পারে কিন্তু চোর হওয়াটা বোধ হয় লজ্জার।

জয়: ফেসবুকে সাহিত্যচর্চার কারণে সাম্প্রতিক সময়ে এটা বেশি ঘটছে মনে হয়? আর এই জেরক্স সাহিত্যকে অনেকে পৃষ্ঠপোষকতা করছে। এর ক্ষতিটা কেমন?

রোবায়েত: অবশ্যই। তবে সব সময়ই এমন ছিল। মেধাবীরা এইসব নিয়ে ভাবে না। নজরুল মনে হয় এমনটা বলছিলেন, সাগর থেকে এক বালতি পানি চুরি হইলে সাগরের কিছু যায় আসে না। পৃষ্ঠপোষকতা তো তাদেরই বেশি দরকার। হা হা!

জয়: কোন কবিতাটা লেখার পর মনে হয়েছে তুমি কবি?

রোবায়েত: এখনো তেমন কবিতা লিখতে পারি নি। তবে কারু কারু কবিতা পড়ে মনে হয়েছে আমি কবি।

জয়: ব্যাখ্যা করবে?

রোবায়েত: আমার প্রথম পড়া কবিতার বই রূপসী বাংলা। আজ থেকে প্রায় ১২ বছর আগে পড়া। ঐ লেখাগুলো পড়তে পড়তে আমার ভেতর এমন অদ্ভুত অনুভূতি হয়েছিল যে আমি কল্পনা করতে পারছিলাম আমার গ্রাম ধরমপুরে চুরি করে যে গোলাপ গাছটি লাগিয়ে ছিলাম, যার ফুল আমি দেখতে পারিনি, কেন যেন রূপসী বাংলা পড়ার সময় ঐ না দেখা ফুলগুলো আমার ভেতর ফুটতে শুরু করেছিল। ঐ সময়ই মনে হয়েছিল আমি কবি। যদিও লিখতে শুরু করি তারও প্রায় ৯ বছর পর।

জয়: সমালোচকদেরকে তোমার ‘অন্ধদের স্কুল ঘরে বসে থাকা সিরিয়াল কিলার’ মনে হয় কেন?

রোবায়েত: হা হা। সমালোচকেরা তো অন্ধস্কুলেরই ছাত্র। ইনারা অধিকাংশই সিরিয়াল কিলার। সৃষ্টিপ্রক্রিয়ার যন্ত্রনা ইনারা অনুধাবন করতে ব্যর্থ হন প্রায়শই। আমি কিন্তু ভালোবসেই তাদের সিরিয়াল কিলার বলেছিলাম।

জয়: কিন্তু সাহিত্যের উৎকর্ষের জন্যই তো সমালোচক দরকার। অবশ্যই সৎ সমালোচক। সৎ সমালোচকের অভাবের কারণে কি আমাদের সাহিত্য পিছিয়ে নেই?

রোবায়েত: না। সমালোচকেরা কবি তৈরী করে না। কবি নিজেই তৈরী হয়। সমালোচনা সাহিত্যের আলাদা শাখা। এইটা না থাকলেও কবির যায় আসে না। হোমার কি ইলিয়াড ওডিসি  সমালোচকদেরকে পড়ে, শিক্ষিত হয়ে, তারপর লিখছিলেন?

জয়: ‘আয়ু কি অকস্মাৎ নড়ে ওঠা পাতা!’ তোমার এই লাইনটা আমাকে খুব ভাবায়। মৃত্যুটা অকস্মাৎ না আসলেও পারতো। হঠাৎ নড়ে ওঠা পাতা না হলে কি মৃত্যু ঠিক শিল্পের পর্যায়ে যায় না?

রোবায়েত: মৃত্যু আমার কাছে সেলিব্রেশনের বিষয়। আমি এইটাকে উদযাপন করতে চাই। অকস্মাৎ নড়ে ওঠা পাতার সৌন্দর্য আমি দেখেছি, এক মূহূর্ত পরেই যে স্থির হয়ে যায়। তো ঐ আনডিফাইন্ড বিউটিকে আমার ভালো লাগছিল। মৃত্যুও আনডিফাইন্ড বিউটি। একটা বিয়ের মতোন ব্যাপার আর কি! পরমের সাথে অন্তর্লীন হবার সুযোগ।

জয়: ‘লোকটা কোনদিন পার হতে পারছে না কলিংবেল’ যদি এই লাইনটা আর পুরো ‘এনট্রপি’ কবিতাটা উদাহরণ হিসেবে নেই, দেখা যায় যৌনতার সংশয় এবং তীব্রতা দুটোই আছে। আবার যৌনতা অনেক শীতলও মনে হইছে। এত শীতল-গীতল কেন তোমার কবিতার যৌনতা?

রোবায়েত: যৌনতার সংশয় ও তীব্রতা ঐ কবিতা দুইটাতে আছে কিনা আমি জানি না। প্রশ্নটাকে আলাদা ভাবেই নিলাম আর কি! আসলে যৌনতা একটা বিরাট ফাঁদ। সাহিত্যে এইটার ব্যবহার সবচে জটিল। খুব সহজেই স্লিপ করে। আমার লেখায় যৌনতা হয়ত এই জন্যই খুব চালাকি ভাবে আসে।

জয়: যে রকমভাবে আসছে, গৃহবন্ধনকালে প্রতিদিন ছোট হয় জামা?

রোবায়েত: এইটা আসলে যৌনতা না। অন্য কিছুকে ইন্ডিকেইট করতে চাইছিলাম আমি।

জয়: মেয়েদের চিরকালীন বড় হওয়া ইন্ডিকেট করে হয়তো। কিন্তু যৌনতা থাকে এখানে। একটা ব্যক্তিগত প্রশ্ন করি?

রোবায়েত: হয়ত থাকে। হয়ত থাকে না। ঐ লাইনটা মেবি নেগেটিভ ইনিফিনিটির দিকে যাত্রা হইতে পারে।

হ্যা। করতে পারেন।

জয়: তুমি যখনই প্রাইভেট টিউটর, তখনই নিজেকে সম্পাদ্যভর্তি জাহাজ মনে হয়, নাকি শুধু রোশনি আক্তারের বেলাতেই হতো। সরি…একটু স্টুপিড প্রশ্ন।

রোবায়েত: সত্যিই জানি না আমি। ‘রোশনি আক্তার’ কবিতায় এমন লিখেছিলাম। এগুলো কিংডম অব ফ্যান্টাসি। আইডিয়াল নারীকে দেখতে চাওয়ার একটা মাধ্যম।


সিকদার আমার কাছে সেই কবি যার নিজের জগৎ আছে। এইটাই বাংলা কবিতার প্রধান সংকট। অনেক ভালো কবিতা লেখা হইছে কিন্তু অনেকেরই নিজের জগত নাই। যেখানে ঢুকলে আপনার সহজেই মনে হবে এইটা একান্ত তারই।


জয়: তোমার ‘ঘুমন্ত মার্কারি ফুলে’ বইয়ে ময়ূর এবং ‘রাইপথ’ বারবার এসেছে। এই রিপিটেশন কি দরকার ছিলো?

রোবায়েত: রাইপথ শব্দটা ঠিক সে অর্থে রিপিটেশন নয়। উৎসর্গে একবার আর কবিতায় একবার। ময়ূর শব্দটি প্রায় ৬ বার ব্যবহার করেছি এইটাকে মেটাফোর হিসেবে আনার জন্য। আর আমার বইয়ের নামটাও তো রাখতে চেয়েছিলাম ‘সামান্য ময়ূর’ সেইটাও একটা প্ল্যান ছিল। যদিও পরে নামটা চেঞ্জ হয়ে যায়।

জয়: ‘নীল উড়ন্ত মাছের চোখ’ আব্দুল মান্নান সৈয়দকে মনে পড়ায়।

রোবায়েত: মনে পড়ানোটা স্বাভাবিক। মান্নান সৈয়দ আমার প্রিয়দের একজন।

জয়: যদি বাংলা সাহিত্যের একজন কবির নাম বলতে বলি, যার কবিতা নিয়ে অনেক আলাপ হওয়া দরকার – কে সেই কবি, কেন তাকে নিয়ে আলোচনা হওয়া দরকার?

রোবায়েত: অবশ্যই জীবনানন্দ। কিন্তু সেইটা অলরেডি হইয়া গেছে। আমি বরং সিকদার আমিনুল হকের নাম বলতে চাই। আপনি হয়ত খেয়াল করে থাকবেন মধ্যযুগের কবিতা তার মেটাফোর ব্যবহারের মাধ্যমে অনেক কিছুকেই মিথ বানিয়ে ফেলেছিল। যেমন ধরেন বড়ু চণ্ডিদাসের বাঁশি শব্দটা। এইটা পরবর্তীতে এত ভাবে বাংলা কবিতায়, গানে, সিনেমায় এসেছে যে সেইটা অভাবনীয়। ঠিক সেভাবেই রবীন্দ্রনাথও প্রচুর মেটাফোর তৈরী করেছেন। এরপর জীবনানন্দ তো মহান এই ব্যাপারে, আজো নক্ষত্র হেমন্ত শিশির পেঁচা এইগুলো জীবনানন্দকেই স্মরণ করায়া দেয়। অর্থাৎ যেটাকে আমি বলতে পারি কবির নিজের জগৎ সেইটা কিন্তু মেটাফোরের মাধ্যমেই গড়ে ওঠে।

সিকদার আমার কাছে সেই কবি যার নিজের জগৎ আছে। এইটাই বাংলা কবিতার প্রধান সংকট। অনেক ভালো কবিতা লেখা হইছে কিন্তু অনেকেরই নিজের জগত নাই। যেখানে ঢুকলে আপনার সহজেই মনে হবে এইটা একান্ত তারই। সিকদার আমিনুল হকের সেই বৈকুন্ঠ আছে। এই জন্যই তিনি গ্রেট। আর তার লেখার বৈচিত্র, সাহস তো অদ্ভুত!

জয়: বাংলা কবিতায় কলোনিয়াল হ্যাঙওভার না কমে দিন দিন বাড়ছে। এটা কেন হচ্ছে বলে মনে হয় তোমার?

রোবায়েত: এটা হবেই। আমরা যে ওয়ার্ল্ড অর্ডারের মধ্যে বসত করি সেইটাই প্রধান কারণ। তবে, আমাদের কবিতা কিন্তু ধীরে ধীরে অনেকটাই নিজদের জায়গায় চলে এসেছে কনটেন্টের দিক থেকে।

জয়: তোমার কাছে বাংলা কবিতার ইতিহাসে কোন সময়টাকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং বৈচিত্রময় মনে হয়, কেন?

রোবায়েত: অবশ্যই মধ্যযুগ। প্রচুর কাজ হয়েছে এই সময়ে। এবং সেগুলো আমাদের সম্পদে পরিণত হয়ে গেছে অলরেডি। কিন্তু আক্ষেপ হইলো, পরবর্তীতে বাংলা কবিতার সিলেবাস শুরু তিরিশের দশক থেকে।

জয়: আর বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্মের পর?

রোবায়েত: আশির দশক। ৭০ এর মনোটোনাস কবিতা থেকে তারাই আমাদের কবিতাকে মুক্তি দিয়েছে। আমাদের সময়ের অনেকেই ২য় দশক বলেন। কিন্তু আমি সেটা সময়ের উপর ছেড়ে দিতে চাই। আরো আরো অনেক অনেক দিন পর কেউ যদি ২য় দশককে সবচে বৈচিত্র্যময় মনে করেন সেইটা হবে আসল মূল্যায়ন।

জয়: আরেকটা প্রশ্ন করার লোভ সামলাতে পারছি না। আশি, নব্বই আর প্রথম দশক থেকে একজন করে কবির নাম বলো, যাদের তোমার কাছে সেরা মনে হয়।

রোবায়েত: প্রথম দশকে এক জনের নাম বলতে পারবো না।

৮০ এর দশকের মাসুদ খান
৯০ এর দশকের মজনু শাহ

জয়: একজনের নাম বলতেই হবে, রোবায়েত!

রোবায়েত: ১ম দশকের সোহেল হাসান গালিব। তার কাজের বৈচিত্র্যের জন্য। (চলবে)


প্রথম পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!

Discover more from

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading