একজন রাজীব দত্ত’র মুখোমুখি সাত কবি

কেউ কেউ বলে, এখন সাহিত্যের আড্ডা একদমই হয় না। আবার অনেকে বলে, দেশের আনাচে-কানাচে প্রচুর আড্ডা হয়। ঢাকা নগরীতেই শ’খানেক সাহিত্য আড্ডা হয়। নিয়মিত। তবে সেসব আড্ডায় সাহিত্য বিষয়ে আলাপের চেয়ে পরচর্চা বেশি হয়। আমাদের – বন্ধুদের মধ্যে সাহিত্য নিয়ে আলাপ হয়। পরচর্চাও যে হয় না, তা না। মাঝেমাঝেই আমরা এখানে-সেখানে মিলিত হই। একটা সময় এসে আমাদের সবাই একমত হলাম যে, আমরা নিজেরা নিজেদের সমালোচনা কেন করছি না? নিজেদের লেখা, কাজের খুঁতগুলো নিয়ে তর্ক-বিতর্ক করা জরুরী। আমরা সেটা শুরু করেছি। কিছুদিন হলো হাসান রোবায়েতের সঙ্গে সাক্ষাৎকার বিষয়ে আমার আলাপ চলছিল। দুজনেই একটা বিষয়ে একমত হয়েছিলাম, সাক্ষাৎকারে কোন বৈচিত্র নাই। প্রাণখুলে কথা বলা নাই। আমরা তো আড্ডা দিতে পারি। অনেকে মিলে একজনের সাক্ষাৎকার নিতে পারি। যে সময়টাকে ফেসবুক নিয়ন্ত্রণ করছে, সেখানে একজনের সঙ্গে অনেকের আলাপ জমানো কোন ব্যাপারই না। গত শুক্রবার ২০ জানুয়ারি রাসেল রায়হানও কথাটা বলে ফেললো! লোকটা মনে হয় টেলিপ্যাথি-ট্যাথি জানে। সবাই সম্মতি দিলাম। এবং এও সিদ্ধান্ত হলো – শুরু করবো রাজীব দত্তকে দিয়ে। কবি, চিত্রশিল্পী রাজীব দত্ত আমাদের আহ্বানে সাড়াও দিয়েছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছি আমরা সাতজন। হাসান রোবায়েত, হাসনাত শোয়েব, মোস্তফা হামেদী, রাসেল রায়হান, ফারাহ্ সাঈদ, হুজাইফা মাহমুদ ও আমি রুহুল মাহফুজ জয়। চলুন, আমাদের সঙ্গে আড্ডা দিন আপনিও…


অার্ট মাত্রই মাস্টারবেশন। একেকজন একেকভাবে করে।


জয়: রাজীব, কবি-শিল্পী – কোন পরিচয়ে আপনি বেশি মজা পান?

রাজীব দত্ত: একেক সময় একেকটা।

জয়: কোনটা আগে শুরু করেছিলেন, আঁকা না লেখা?

রাজীব: সবাই-ই অাগে অাঁকে। পরে লিখে। একদম সবাই। কারণ অাঁকা বাদে লেখা শেখা যায় না।

রাসেল: যদি কোনো কারণে একটাকে বেছে নিতে বলা হয়?

রাজীব: বলা কঠিন। একেক জায়গায় একেক পরিচয়ে যাইতে চাই। তবে রিলেটেড। একটাতে অারেকটা ইনটারফেয়ার করে। অার এখনকার অার্ট সংকর।

হুজাইফা: কবিতার সাথে এই আর্টের সম্পর্কটা অনেক গাঢ় বলে মনে হয়। আপনি কি মনে করেন?

রাজীব: সব অার্টই রিলেটেড।

রোবায়েত: বাংলা কবিতাকে আর্ট কি প্রভাবিত করতে পারছে বলে মনে হয় আপনার?

রাজীব: সব অার্টই সব অার্টকে প্রভাবিত করেছে। সব দেশে। অার ছবি কবিতা মিউজিক তো সবচে পুরান অার্ট। প্রেমটা গাঢ়।

রোবায়েত: আমি বাংলা কবিতার কথা বলতে চাইছিলাম রাজীব দা!

রাজীব: করেছে প্রভাবিত। কিন্তু প্রভাবটা এতো মিশে অাছে অালাদা করা যাবে না। ধরেন কোন কবি যখন বলে অামফুলের ঘ্রাণ লাল, তখন সে ছবিই অাঁকে। ইমেজ হিসেবে। এখানে অার্টিস্ট – নন অার্টিস্ট বেরিয়ার নাই। কবিমাত্রই ইমেজ তৈরি করে। ইমেজ বাদে ছবি হয় না।

রোবায়েত: কিন্তু বাংলা কবিতায় বিশেষ করে সাম্প্রতিক কবিতায় ইমেজ এত ইন্দ্রীয়ঘন যে আর্ট সেইটারে কানেক্ট করতে পারতেছে বলে মনে হয় না আমার। আপনার কি তেমন হয় ?

রাজীব: ব্যখ্যা করেন তো প্রশ্নটা

রোবায়েত: ওকে, একটু দাঁড়ান তাইলে, কবিতা থেকেই কোট করি। আচ্ছা ধরেন উৎপল লিখতেছেন, ‘খেয়া-পারাপার করো চিরকাল তুমি পূরবীর সুর।’ এইটাতে যে পূরবীর সুর খেয়া পারাপার করে সেইটা কি আর্টে আঁকা সম্ভব ?

রাজীব: এটা পড়ার পর কি অাপনার কোন ইমেজ মনে অাসে নাই?

রোবায়েত: আসছে। সেইটা আসলে পূরবীর সুর। কিন্তু সেইটারে কি আঁকা সম্ভব?

রাজীব: সম্ভব তো

রোবায়েত: সুরটা কিন্তু পূরবীরই হইতে হবে!

রাজীব: একেকজনের পূরবীতো একেক রকম

রোবায়েত: তাইলে হয়তো সম্ভব! হা হা


♣অার্টিস্ট তার গু কৌটায় ভরে অার্ট ওয়ার্ক দাবি করার ইতিহাস অাছে।♣


রাজীব: পিকাসো বলছিলেন সম্ভবত, মানুষ যা যা ইমাজিন করতে পারে সবই রিয়েল।

রোবায়েত: আমারও তাই মনে হয়। মানে, নিজের মতো করে রিয়েল আর কি!

রাজীব: হুম। বাস্তবতা জনে জনে অালাদা

রাসেল: ধরেন কোনো কারণে আপনি কবি না। মানে হতে পারেন নি। তাতে কি আজকের রাজীব দত্তকে পেতাম। মানে এমন রাজীব দত্ত, যার মে বি মোর দ্যান এইট্টি পারসেন্ট বইয়ের কভার কবিতার? কিংবা রমিজের স্রষ্টা রাজীব দত্তের পেছনে কবিতার ভূমিকা কতখানি?

রাজীব: কবিতার ভূমিকা অনেক তো…

রাসেল: আমি আরো উদাহরণ ভাবতেছিলাম। আচ্ছা, রাজীবদা, আমি কিছু হালকা প্রশ্নই করি। সমস্যা মনে হলে উত্তর দেবেন না। আপনি যে প্রচ্ছদ করেন, এইটা আর্টকে কতখানি ধারণ করে? কিংবা আপনি একটি পেইন্টিং আর একটি প্রচ্ছদ আঁকার মধ্যে কোনো পার্থক্য করেন?

রাজীব: পার্থক্য করি অাবার করি না। কিছু কিছু কাজ অাছে ভালো দিলেও নেয় না। তখন সে যা চায় তা করে দিই। কিছু অাছে অামি পেইন্টিং যেভাবে অইভাবেই করি। কার বই, কি রকম চাচ্ছে, স্বাধীনতা কতটুক দিচ্ছে তার উপর নির্ভর করে। তবে যেহেতু প্রচ্ছদ মিনিমাম রুলস ফলো করতেই হয়। যেটা পেইন্টিং এ দরকারি না। উদাহরণস্বরূপ বইয়ের ফিক্সড সাইজ অাছে। অই মাপেই করতে হবে। যেটা পেইন্টিংয়ে নাই। যাই করি তাই অার্ট।অাবার ধরেন লেখকের নাম বইয়ের নাম এসবও চাইলে সব জায়গায় বসাইতে পারি না। নিয়মের মধ্যে করতে হয়। যেটা অামার অার্ট ওয়ার্কের বেলায় জরুরি না

রাসেল: কিন্তু যা-ই করি তা-ই আর্ট কি হয়? মানে মাপ-টাপের বিষয় না। ধরেন কালোর মধ্যে এক ফোঁটা লাল রঙ ঢেলে বললেন, এটা সন্ধ্যাকালীন হিন্দু রমণী। মানে এমন বলা যায়?

রাজীব: অার্ট জিনিসটা অাপেক্ষিক। অামার বাধ্য হয়ে করা বাজে প্রচ্ছদটাই হয়তো লেখকের কাছে ভালো অার্ট। অার অার্টের জন্য রুলস হুমকি। যেটা প্রচ্ছদে ফলো করতে হয়। এটা অামি করতেই পারি। লেখক বা প্রকাশকের মনে হলো কিনা, সেটা বেশি জরুরী

রাসেল: না না, আমি অন্য অর্থে যেমন খুশি তেমন করার কথা বলছি। উদাহরণ দিলাম। মানে যেহেতু বিষয়টা আপেক্ষিক, এখান থেকে আর্টিস্টরা সুবিধা নেয় কি না!

রাজীব: নেয় তো। অার্টিস্ট তার গু কৌটায় ভরে অার্ট ওয়ার্ক দাবি করার ইতিহাস অাছে।

জয়: ইতিহাসটা একটু জানতে পারি?

রাজীব: ইতিহাস বলতে দাদাইজমের পর কি অার্ট না, তাই প্রশ্ন ছিল। তো একজন এরকম করেন। এরকম অনেক অাছে। একটা কমোডও গ্যালারীতে অার্ট হিসেবে পাঠানো হয়েছিল। তখন রিজেক্টও হয়েছিল। কিন্তু পরে অইটাই একটা অাইকনিক অার্টের স্বীকৃতি পায়।

হুজাইফা: বিশ্বের বিভিন্ন দেশে, বিশেষত ইউরোপে নানান সময়ে বিভিন্ন ইজম কেন্দ্রিক শিল্পের চর্চা হয়েছে।বাংলাদেশে কি এরকম কোন ইজম কেন্দ্রিক শিল্পের চর্চা হয়েছে কখনো? যা একেবারেই স্বাতন্ত্র, প্রভাবিত নয় কারো দ্বারা!

রাজীব: ইজম কেন্দ্রিক অার্ট হয় না। ক্রিটিকরা পরে, তাদের সুবিধার্থে ক্যাটাগরাইজ করে। বেশিরভাগ ইজমের নাম কৃটিকদের দেয়া।

হুজাইফা: কিন্তু বিশেষ একটা প্রবণতা নিয়ে ওনারা কাজ করেছেন। নাম নাহয় নাই দিলেন! বিশেষভাবে দালির কথা মনে পড়ছে আমার!

রাসেল: উলটা কমোডের সেই আর্ট? যদ্দুর আমার মাথায় আছে! মাথায় মানে কিন্তু স্মৃতিতে…

রাজীব: সময়ের কিছু প্রভাব-প্রবণতা থাকে। অই প্রবণতাগুলাকে কৃটিকরা অাইডেনটিফাই করে। অার্টিস্ট তো তার মতো করে করেন। দালিও সেইম।

হুজাইফা: কিন্তু একই সময়ে যখন বহু ইজম গড়ে ওঠে! সবগুলোকে একই সময় প্রভাবিত করে!

রাজীব: এসময়ে অনেকজন লিখতেছে না? কেউ ছন্দ মানতে বলতেছে। কেউ মানবে না বলতেছে। তারপরও অনেকের মধ্যে কিছু কমন প্রবণতা থাকে। যেগুলাকে পরে চিহ্নিত করা হয়। হ্যাঁ একই সময়ের ভিতর দিয়েই অনেক সময় প্রবাহিত হয়।

হুজাইফা: একটা কবিতা বা একটা গান, মানুষের মনকে যেভাবে আচ্ছন্ন করতে পারে, যেভাবে বিষন্ন করে তুলতে পারে রং তুলির রেখায় সেটা কতটুকু সম্ভব? সেরকম দুয়েকটা শিল্পকর্মের নাম বলবেন?

রাজীব: একেক মিডিয়ার একেক রকম প্রভাব।

রাজীব: কোন রকম?

হুজাইফা: যেমন ধরুন একটা ছবি আপনাকে বিষণ্ন করে তুলতে পারে, সেরকম একটা।

রাজীব: আমার রবীন্দ্রনাথের পেইন্টিং খুব পছন্দ। ফ্রিদার (ফ্রিদা কাহলো) ছবিও। কিংবা অমৃতা শেরগিল। উনার ছবি অদ্ভুত বিষণ্ণ।


কবিতা প্রচ্ছদের চেয়ে বড় শিল্প। কবিতা কোন মেয়ে হলে, প্রচ্ছদ বড় জোড় তার পায়ের অালতা। পড়লেও চলে, না পড়লেও।


হুজাইফা: আচ্ছা, এটা ফিল করতে হলে কি পেইন্টিংয়ের গ্রামার জানাটা জরুরী?

রাজীব: কোন গ্রামার নাই ছবিতে। কবিতাতে ধরেন মিনিমাম পড়তে-জানতে হয়। ছবিতে তাও দরকার নাই।

হুজাইফা: রেখা-টেখা থাকে, ওগুলোতেই নাকি শিল্পের মূল রহস্য! সৈয়দ আলী আহসান রেখার বিষয়টায় খুব জোর দিয়েছেন এবং এ্যাঙ্গেল।

রাজীব: একেকজন একেকভাবে দেখে অার কি। কবিতাতে একেকজন একেক জিনিস দেখে না? অইরকম।

জয়: আচ্ছা, কারো সিনেমা কি আপনার পেইন্টিংয়ে প্রভাব ফেলতে পেরেছে? সিনেমাও তো ইমেজনির্ভর শিল্প।

রাজীব: অইভাবে সরাসরি প্রভাব হয়তো ফেলে নাই। কিন্তু একটা প্রভাব নিশ্চয় থাকে। অবচেতনে।

জয়: কার কার সিনেমা?

রাজীব: ফিক্সড সিনেমা বলতে পারবো না অইভাবে।

জয়: ডিরেক্টর যদি বলি?

রাজীব: যা ভালো লাগে, তার প্রভাবই থাকে। ডিরেক্টরও ফিক্সড বলতে পারবো না। মানে সুনির্দিষ্টভাবে।

জয়: কখনো কারো ছবি দেখে কি মনে হইছে, ইশ! এরকম যদি আঁকতে পারতাম! কবিতার ক্ষেত্রেও।

রাজীব: অইরকম হয় নাই। মনে হইছে অামি বানাইতে পারতাম এমন ছবি।

জয়: প্রচ্ছদশিল্পে, বিশেষ করে কবিতায় আপনাকে সমসাময়িকরা ঈর্ষা করেন। কেমন লাগে ব্যাপারটা?

রাজীব: ঈর্ষা করার কি অাছে। দুইটাতো অালাদা মিডিয়া। কবিতা প্রচ্ছদের চেয়ে বড় শিল্প। কবিতা কোন মেয়ে হলে, প্রচ্ছদ বড় জোড় তার পায়ের অালতা। পড়লেও চলে, না পড়লেও।

জয়: মানে প্রচ্ছদশিল্পীর ঈর্ষা।

রাজীব: অইটা অামার নিজেরও হয়। অামি যদি এরকম প্রচ্ছদ করতে পারতাম। বা এটা অামার বইয়ে থাকতে পারতো।

হুজাইফা: আপনি যখন দুইটা শিল্পেই জায়গা দখল করে ফেলেছেন, তখন ঈর্ষার পাত্র হওয়াটাই স্বাভাবিক।

রাজীব: অার একটা দুইটা কোন বিষয় না। একাধিক মিডিয়ায় যায় মানুষ অতৃপ্তি থেকে। যার দরকার নাই সে যায় না।

রাজীব: বলতে পারবো না কি কারণে।

জয়: আপনার কবিতায়, সাবানের বন বইটার কথাই যদি ধরি – ইমেজের একটা নিবিড় প্রবাহমানতা আছে। নদীর ঢেউয়ের মতো। এটা কি ছবি আঁকার কারণে তৈরি হয়েছে?

রাজীব: অামি তো অইভাবে অালাদা করতে পারি না। নদী, জল কিছুই মনে হয় না অামার। অার্ট মাত্রই মাস্টারবেশন। একেকজন একেকভাবে করে।

রোবায়েত: আপনি কি কখনো নিজের কবিতা বা অন্য কারো কবিতা উল্টা করে পড়ছেন?

রাজীব: পড়ি নাই।

রোবায়েত: মানে ধরেন শেষ লাইন থেকে শুরু করে প্রথম লাইনের দিকে যাওয়া আর কি! এমন?

রাজীব: অামি কবিতা পড়ি না মেলা দিন। মানে ভালোভাবে। চোখ-টোখ বুলাই জাস্ট। পড়ি নাই।

রোবায়েত: এইবার আসি আপনার বইয়ের উৎসর্গ পত্রের দিকে। সেইখানে আপনি লিখছেন, ‘সে; যে কৌটোয় মাছি পুরে কোমলগান্ধারের দিকে বেণী খুলে রাখে’। এইটা। আপনার বইয়ের একটা কবিতার লাইন। সেইখানে কিন্তু আপনি সে শব্দের পরে কোনো সেমিকোলন দেন নাই। এইটা কি যারে উৎসর্গ করছেন তারে আলাদা করে বোঝানোর জন্য করছেন? মানে, তারে ইন্ডিকেইট করার জন্য?

রাজীব: অইটা মে বি কনশাসলি না। শিওর না। তবে কাউকেই ইন্ডিকেট করি নাই। ঠিক অইভাবে প্রেমিকাদের উৎসর্গ কি না, হয়তো কিংবা পৃথিবীর সকল প্রেমিকাদের। যারা বেণী করে বা করেনা সবাই যাদের চুল নাই তাদেরও।


অার্ট নিজেই মে বি ধ্বংসাত্মক জিনিস। জীবনানন্দকে যে বোধ ক্লান্ত করতেছিল, তা হয়তো কারুবাসনা।


হুজাইফা: প্রেমিকাকে গান গেয়ে শুনাইছেন কখনো? ফোনে বা সরাসরি? অথবা আপনার গানের গলা কেমন?

রাজীব: গানের গলার রেঞ্জের ভেতর কেউ ঢুকে নাই।

রোবায়েত: আপনি লিখছেন, ‘ অন্ধ যে সে জানে না; অন্ধ যে সে দেখে না।’ আমার তো মনে হয় এখনকার কবিরা অন্ধ টাইপের। খালি নিজের ভেতরের ইমেজটাই বেশি দেখে। সো কল্ড বাস্তবতারে তারা এড়াইয়া যায়। আপনার বইয়ে বেশ কয়েক জায়গায় অন্ধ আছে। সেইটা কি সাম্প্রতিক কবি বলে?

রাজীব: সিনেমা প্রভাব ছিল। ‘দ্য সাইলেন্স’ এবং ‘উইলো ট্রি’ মে বি। দুইটাতেই দুজন অন্ধ ছিল।

রাজীব: আমার ব্রেইল শেখারও ইচ্ছা ছিলো।

রোবায়েত: কিয়ারোস্তমি?

রাজীব: একটা মাজিদ মাজিদি। অারেকটা মহসিন মাখমালবাফ বোধহয়।

রোবায়েত: তাহলে শিখলেন না কেন?

রাজীব: ধৈর্য নাই

রোবায়েত: আপনি লিখছেন,’একখণ্ড পুলিস’ এইটা কি মান্নান সৈয়দের ‘পুলিশ একটি নক্ষত্র’ এর প্রভাবে?

রাজীব: পড়ি নাই অইটা

রোবায়েত: জন্মান্ধ কবিতাগুচ্ছের কবিতায় এমনটা ছিল

রাজীব: অামার কবিতা পড়ে নির্ঝরদা (নির্ঝর নৈঃশব্দ্য) বলছিল জহরসেনের প্রভাব অাছে। কিন্তু তখনো জহরসেন পড়ি নাই। অাপনার কি কাছাকাছি মনে হচ্ছে ইমেজ দুইটা? অামি তো পুলিশ কই তাও মনে নাই।

রোবায়েত: না। আমার তেমন মনে হয় না। তবে পুলিশ শব্দটার অমন ভিন্ন ব্যবহার সম্ভবত সৈয়দ সাহেবই প্রথম করছিলেন। তাই জিজ্ঞেস করা আর কি! এইটা কেমন ধরণের ব্যাপার বলে মনে হয়? আমার নিজের ক্ষেত্রেও এমনটা আছে। একটা ইমেজ হয়তো ভেবে রাখলাম, পরে গিয়া দেখি ট্রান্সটোমার সেইটা ব্যবহার করছে। এমন কেন হয়, আপনের কী মনে হয়?

রাজীব: যৌথ অবচেতন মন বলে বা এজাতীয় কিছু একটার কথা মনোবিজ্ঞানীরা বলেন। অইরকম কিছু হবে। অার অাসলে নতুন কিছু নাই। সবই কোন না কোনভাবে হয়ে গেছে।

হাসান: এইটা অবশ্য ঠিক কইছেন। ঐ নতুন করে প্রেজেন্ট করা আর কি! একই খাবার। উপরে একটু লেটুস পাতা, সাইডে দু একটা টমেটো কেটে রাখার মতোন। হা হা।

ফারাহ্ সাঈদ: গ্রাফিত্তি কি শিল্প না ধ্বংসাত্মক ব্যাপার বলে মনে হয়?

রাজীব: অার্ট নিজেই মে বি ধ্বংসাত্মক জিনিস। জীবনানন্দকে যে বোধ ক্লান্ত করতেছিল, তা হয়তো কারুবাসনা।

রোবায়েত: আমারও তাই মনে হয় রাজীব দা। কারুবাসনা মে বি ধ্বংসাত্মক!

রাজীব: এটা সিসিফাসের অভিশাপের মতোন। একবার অাক্রান্ত হইলে অার রেহাই নাই।

জয়: ক্লান্তিকরও। খুবই ক্লান্তিকর। কারণ, কারুবাসনার কোন শেষ নাই। হাঁপড়ের মতো পোড়ায় মনে হয়।

ফারাহ্: আর্টরে যারা মাইরা ফেলে তাদেরকে আপনি কিভাবে নেন?

রাজীব: কারা আর্টরে মারে?

ফারাহ্: মৌলবাদীরা?

রাজীব: আর্টকে কি মারতে পারে? অার যে লোকটা ধরেন ছবি অাঁকা পছন্দ করে না, সেও হয়তো অন্যকিছু একটাতে খুব মুগ্ধ হয়। হতে পারে এটা একটা গোলাপ ফুল। বা ধর্মীয় একটা ছবি। বা কাস্তে হাতুড়ি। তারও একটা অার্টসেন্স অাছে।


সেক্স তো প্রাণীকুলের বিকাশের মাধ্যম। ইভেন গাছপালাকেও সেক্স করতে হয়। তাই প্রাণীকুল- গাছপালা সবারই সব এটিচুডে তার সেক্সুয়াল লাইফের একটা ইমপ্যাক্ট থাকে।


জয়: আর্ট, সাহিত্য ব্যাপারগুলা কি লেননের ইমাজিন গানটার মতো?

রাজীব: গানটা তো নিজেই একটা আর্ট।

ফারাহ্: নারীকে সাবজেক্ট না অবজেক্ট – আপনার চিত্রকর্মে কোনটা বেশি ইম্পর্টেন্ট, কেন?

রাজীব: নারী মনে হয় তুলনামূলক কম অাসছে অামার কাজে। হিউম্যান ফিগার অাসে, বাট অামি ট্রাই করি পলিটিক্যালি ডিল করার। ছবিতে অামি ক্রিটিক্যাল থাকার চেষ্টা করি

ফারাহ্: আপনি যে আর্টে মেয়েদেরর মাথা এদিক ওদিক কইরা সেট করে দেন, কবিতাতেও কি এমনটা করেন? বা স্কার্ট, বুট? হা হা হা্

রাজীব: কবিতার ব্যাপারে বলা কঠিন, অামার জন্য। বেটার হয়, অাপনার পড়া থাকলে অামার লেখা কি মনে হয়েছে, তা বলা। এক কড়া নারীবাদী ফ্রেন্ড অবশ্য অামার বইটাতে অইরকম কিছু নাই বলে রায় দিছিলেন। অাপনাদের কী মনে হয়?

ফারাহ্: আমি আপনার বইয়ে এরকম কিছু খুঁজবো। এখনও পাই নাই।

হুজাইফা: “A portrait of a artist as a young man” জেমস জয়েসের এই বইটা পড়েছেন? সেখানে একটা অদ্ভুত প্রশ্ন আছে।

” কেউ যদি ক্রোধোন্মত্ত অবস্থায় কাঠ খোদাই করে একটা ষাঁড় এঁকে ফেলে তাহলে কি সেটা শিল্প হবে? যেহেতু সে এটা চিত্তবৃত্তির জন্য করে নাই!”

আপনি কি বলবেন এর উত্তরে?

রাজীব: বইটা পড়ি নাই। তবে কি অাঁকলো অইটা জরুরি। রেগে অাঁকলো নাকি কান্না করতে করতে তা ইম্পর্টেন্ট না মে বি।

শোয়েব: একটা প্রশ্ন হচ্ছে – আপনি প্রেম করেন?

রাজীব: প্রেম মে বি সবাই করে। অামারেও করতে হয়।

শোয়েব: আচ্ছা। আপনার কি মনে হয় না আমাদের যত সমস্যা তার মূল হচ্ছে সুস্থ যৌনতা এবং টাকার অভাব? যা ঠিক হলে অনেক সমস্যা কমতে পারে?

রাজীব: জাজমেন্টাল হয়ে যাবে এইভাবে বললে। টাকা-যৌনতা সবকিছুর পরও মানুষ অসুখী হয়। জীবনানন্দের অাট বছর অাগের একদিনের লোকটার মতোন। অর্থ-কীর্তি-স্বচ্ছলতা সব থাকার পরও মৃত্যুর কাছেই যেতে হয়।

শোয়েব: নাহ। সেইটা ঠিক আছে। অসুখী একটা বিষয় অবশ্যই হতে পারে। আর একটা হলো সামাজিক নৈরাজ্য। নানা সোশ্যাল ডিজর্ডার। এগুলার ক্ষেত্রে জানতে চাইছি। মানে আমার মনে হয় আর কি! যে এগুলা সলভ করা গেলে অনেক সমস্যা কমে যেত।

রাজীব: ইউরোপের ধনী দেশগুলাতে টাকা যৌনতা সবকিছু থাকার পরও যে পরিমাণ নৈরাজ্য, তা অনেক গরীব দেশের চেয়ে বেশি। সমস্যা দুইটা কারণে হয়। সব পাইলে অার কিছুই না পাইলে। নৈরাজ্য সবকালে ছিল। প্রমিথিউসের অাগুন চুরি নিশ্চয় দেবতাকুলে নৈরাজ্যকর ঘটনা।নৈরাজ্য লাগবেই।এইটা মানুষের এক্সপ্রেশনের পার্ট। অাপাত সমাধান সম্ভব হয়তো। বা কিছুটা। পুরাপুরি পসিবল না। নিয়ম নিজেই নৈরাজ্য তৈরি করে।

শোয়েব: আচ্ছা। আমি অবশ্য সুস্থ শব্দটা ইউজ করছিলাম ইউরোপ এড়াইতে। যদিও সেটা হয়তো ইউটোপীয়ওও হতে পারে। যাই হোক, আপনার লেখা বা আঁকায় যৌনতার প্রভাব কেমন? বা আদৌ আছে কিনা?

রাজীব: অাঁকায় অাছে। লেখায় তো নাই নাই লাগে। তোমার কি মনে হয়?

শোয়েব: আমি লেখায় প্লেটোনিক প্রেম বেশি পাইছি। শরীর তেমন পাইনি। আঁকাতে আছে কিনা মনে করতে পারছি না। আপনার আঁকার মধ্যে বাচ্চাসুলভ একটা ব্যাপার আছে এটা কি ইন্টেনশনাল?

রাজীব: ইন্টেনশনাল বটে। প্রথমে স্কিল এপ্লাই করার চেষ্টা করতাম। শুরুতে। পরে মনে হল এটা অামার কাছে ফ্লুয়েন্ট না। নিজেকে এক্সপ্রেস করতে পারতেছি না। তখন কিভাবে কিভাবে এ ল্যাঙ্গুয়েজটা টানে। বাচ্চাদের অার্ট তো অযৌক্তিক হয়। অন্তত অামাদের শিক্ষা পাবার অাগে। এটা গুরুত্বপূর্ণ লাগে।

জয়: আমার একটা সম্পূরক প্রশ্ন আছে। শিল্প-সাহিত্যের সাথে সেক্সুয়াল ডিজায়ারের সম্পর্ক কতখানি গভীর?

রাজীব: সেক্স তো প্রাণীকুলের বিকাশের মাধ্যম। ইভেন গাছপালাকেও সেক্স করতে হয়। তাই প্রাণীকুল- গাছপালা সবারই সব এটিচুডে তার সেক্সুয়াল লাইফের একটা ইমপ্যাক্ট থাকে। যেমন ধরেন যেসব ফুল রাতে ফোটে সচরাচর তার শাদা এবং গন্ধযুক্ত হয়। কারণ অই শাদা ফুলঅলা গাছের সেক্সের জন্য গন্ধটা জরুরী। মানুষেরও অইরকম।

শোয়েব: যখন আমরা বড়রা সেটাকে গ্রহণ করি। সেটাকি কখনো কখনো স্টান্টের মতো দেখায় কিনা?

রাজীব: শোয়েবের প্রশ্নটা বুঝি নাই।

শোয়েব: মানে আপনার আর্টের ধরন বা ফর্ম কখনো কখনো স্টান্টের মতো দেখায়। যেমন কোথাও কোথাও টেক্সট ইমেজকে ওভারল্যাপ করে। যেমন রমিজ। সেটা সম্পর্কে বলুন।

রাজীব: স্টান্ট মনে হতে পারে। এটার একটা কবিতায় অামি যতোটা অাড়াল হই। অামার অার্টে ততটাই প্রকাশ্য হতে চাই। কমুনিকেট করাকে গুরত্ব দিই। তার একটা কারণ কবিতা তো একা একাই পড়ে সচরাচর। নিজের ঘরে। একান্তে। ছবির অই সুযোগ নাই। ছবি গিয়ে দেখতে হয়। দর্শকের সাথে অামার যোগাযোগ যা তৈরির দ্রুতই করতে হবে। প্রথমে এট্রাক্ট করতে হবে। তারপর দাঁড় করায় রাখতে হবে। যতক্ষণ পারা যায়। তো দ্রুত কমিউনিকেট করার জন্য টেক্সট অানি। অার একটা যেটা হয় ফ্লুয়েন্টলি অাসে। লিখি বলে, লেখা এসে অাঁকাকে সঙ্গ দেয়। অার অামার ছবি রাজনৈতিক। তাতে গ্রাফিতির প্রভাব অাছে। বাচ্চাদের অাঁকারও। বাচ্চারা গরু এঁকে পাশে লিখে দেয় গরু। এটা কনফিডেন্সের অভাব না। এটা তার ল্যাঙ্গুয়েজ। অামি এ বিষয়টা অানার চেষ্টা করি। অার লেখায় যে অামি অাড়াল পছন্দ করি অার ছবিতে যে উল্টাটা, এটা অামার পারসোনালিটিরও প্রকাশ। অামি একসাথে ইন্ট্রোভার্ট এবং এক্সট্রোভার্ট। তো এটা প্রকাশ পায়। অার টেক্সটও তো ইমেজ। ভিজুয়ালি। এখনকার অার্টে ব্যারিয়ারও কমে গেছে। মিডিয়া মিডিয়াকে ওভারল্যাপ করতেছে। সিনেমা সবচে অাধুনিক মিডিয়া। সিনেমায় দেখেন সব অাছে। একেক সিনেমায় একেকটা মুখ্য।

শোয়েব: অনেকের ধারণা এইসব আর্ট করা সহজ। একটা ফর্মে ঢুকলে আসতেই থাকে। যেমন টানা গদ্যের কবিতা নিয়েও বলা হয়। ব্যপারটা এত সহজ কিনা?

রাজীব: সহজ অার্ট অামার ভালো লাগে। অারো যতো সহজ করে দেয়া যায়। অামি বাচ্চাদের মতোন লিখতে চাই। বাচ্চাদের অাঁকতে চাই। কিংবা তার চে অারো বেশি সহজ যদি হওয়া যায়, তা-ই চাই। জেন গল্প জেন কবিতা এ কারণে অামাকে টানে। কিংবা জাতকের গল্প। অাসলে মানব সভ্যতা তো ক্রমশ জটিল থেকে জটিলতর হয়ে উঠতেছে। মানুষও তা-ই। তাই সে জটিলতা দাবি করে।

হামেদী: আমি অন্য লাইনে যাই।রাজনীতি আমার পছন্দের একটা বিষয়।আর্টের সাথে রাজনীতি কোন কনফ্লিক্ট তৈরি করে কিনা? একজন আর্টিস্ট রাজনৈতিক দলের সদস্য হইতে পারেন কিনা?

রাজীব: না- রাজনীতির সাথে রাজনীতির কনফ্লিক্ট হয়। অার মানুষ তো রাজনৈতিক প্রাণী। এরিস্টটল বলছিলো মে বি এটা। তো, মানুষ নিজেই যেহেতু রাজনৈতিক প্রাণী, তার সব অাচরণই রাজনৈতিক। অার্টতো বটেই।

হামেদী: কিন্তু বাংলাদেশে লেখকরা কোনও দল বা আদর্শের পক্ষে কথা বললে এইটারে সহজভাবে নেওয়া হয় না, এবং লেখকদের একটা বড় অংশ বা বেশিরভাগই দল-মতের বাইরে থাকতে চান।মানুষও মনে হয় এই রকম প্রত্যাশা করেন। এইটার কোন ধরনের মনঃস্তত্ত্ব কাজ করে বলে মনে করেন?

রাজীব: রাজনীতি অার রাজনৈতিক দল অাবার অালাদা জিনিস। দল মানেই তো সংগঠন। সংগঠনের একটা কাঠামো থাকে। রুলস-রেগুলেশন থাকে। যা মানতে হয়। অার্টিস্টের পক্ষে অই রুলস রেগুলেশনের সাথে মার্চ করা কঠিন অার কি। তবে দলের সাথে ইনভলভড অার্টিস্ট একদম ছিল না বলা যাবে না। ছিল। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত পার্টি করে গেছেন এমন কেউ কেউ অাছেন। কেউ কেউ বলতে কতিপয়। কতিপয় তার কারণ, কাজটা কঠিন। সবাই পারে না।

হামেদী: আপনাকে যদি কখনও এমপি পদে নমিনেশন দেওয়া হয় আপনি অংশগ্রহণ করবেন কি না? মন্ত্রী বা এই ধরনের পদে যাওয়ার স্বপ্ন বা আগ্রহ আছে কিনা আপনার?

রাজীব: বাংলাদেশে দেখেন, একটা দেশ স্বাধীন হবার কয়েক বছরের মাথাতেই অই দেশের একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা সপরিবারে খুন হবার গ্রাউন্ড তৈরি হয়ে গেছে। তো এরকম দেশে রাজনীতি স্বভাবিকভাবেই ধান্ধাবাজি বিবেচ্য হতে পারে। তবে পাবলিক রাজনীতি না বুঝলে অালটিমেট শাসকেরই লাভ। তবে দল করা অার রাজনীতি সচেতন হওয়া অালাদা অালাদা বিষয়। পারবো না। কারণ অামি মাস এরিয়াতে কথা বলতে অানইজি ফিল করি। সামনে ১০ জন থাকলেও না। এটা স্বভাবে নাই মে বি অামার।


অামার কবিতার নামগুলো নির্ঝরদার দেয়া। তাই নাম দিয়ে বলতে পারবো না। তবে কবিতা এমনিতেই মনে থাকে না। নিজেরও না। অন্যেরও না।


হামেদী: জাতীয় সংকটকালে লেখকদের ভূমিকা কেমন হওয়া উচিত বলে মনে করেন? মানে তারা কি কেবল কলম সৈনিক হিসাবে থাকবেন নাকি অন্য কোনো ভূমিকা নেওয়া উচিত?

রাজীব: এটা তো যার যার মতো করে সে ঠিক করবে। লেখকরা তো ঘড়ির কাটা না, যে ১২টা বাজলো অার সব সাথে নড়ে উঠলো। এটা সম্মিলিত কিছু না।

হামেদী: আচ্ছা,এবার আসি লেখালেখির রাজনীতি নিয়ে। লেখালেখি মধ্যে বিশেষ ধরনের কোনও রাজনৈতিক ব্যাপার আছে কিনা?

রাজীব: এটার উত্তর অন্যভাবে অাগে এসেছে বোধহয়। এটার এক কথায় প্রকাশ হবে: মানুষ যেহেতু রাজনৈতিক প্রাণী, তো তার সব এটিচুডে রাজনীতি প্রকাশ পাবে। প্রকাশভঙ্গিমাটা ভিন্ন হবে জাস্ট। লেখকরা চাইলে ফোরাম বানাইতে পারেন। তবে সেটা নাপিত সমিতির চেয়ে ভিন্ন কিছু না।

হামেদী: মানুষের মধ্যে একটা ধারণা আছে লেখকদের চুল-দাঁড়ি বড় থাকতে হয়। আপনারও দেখি চুল-দাঁড়ি বড়। এটার সাথে আর্টের সম্পর্ক আছে কিনা? সময় পান না? নাকি টাকা বাঁচান?

রাজীব: অনেক নন অার্টিস্টও চুল দাড়ি রাখেন। অার অাপনি খালি ঠাকুর কিংবা গুণের দিকে কেন তাকাবেন, বুদ্ধদেব বসু জীবনানন্দ বা অারো অনেকের দিকে তাকান। চুল দাড়ি পাবেন না। অাপনারও তো নাই। অাপনি কি খুঁজতেছেন, কি দেখতে চান, অইটাই বিষয়। দাড়ি খুঁজলে খালি দাড়িই চোখে পড়বে।

জয়: রাজীব, আমার ওই সম্পূরক প্রশ্নের উত্তর থেকেই আসি। শিল্পী-সাহিত্যিকরা বেশি সেন্সিবল বলেই কী তারা একটু বেশি সেক্স ড্রিভেন? সাধারণত তারা সবকিছুতে যোগসূত্র হিসাবে সেক্সকে দেখেন। এ ব্যাপারে আপনার মতামত কি?

রাজীব: সবাই-ই বোধহয় সেক্স ড্রিভেন। যেহেতু অামরা লেখক শিল্পীদের মনস্তত্বের সাথে বেশি ডিল করি, তাই অইটা সামনে পাই। ধরেন একজন সেতার বাদক কি কম সেন্সিটিভ? নিশ্চয় নয়। তো তার সেক্সুয়াল মেন্টালিটিটা অাপনি কিভাবে বুঝবেন। পারসোনালি না মিশলে পাবেন না। কারণ সেতারের সুর কবিতার মতো না।

জয়: শিল্পী রাজীব দত্ত কবি রাজীব দত্তকে অনেকটা খেয়ে ফেলছে। আপনার খারাপ লাগে না?

রাজীব: অামার উল্টাটাও লাগে, অামার ছবিতে যখন টেক্সট ঢুকে যায়, তখন।

জয়: আপনার কবিতা যেন ইউটোপিয়ায় যাইতে চায়। যেমন ‘কাফকার না লেখা গল্প’ কবিতাটার কথাই যদি ধরি, তা কল্পনার স্বর্গরাজ্যেই সম্ভব। আবার বিষাদগ্রস্ততাও আছে। প্রায় প্রতিটা কবিতাতেই এই স্টাইলটা আছে। আপনি কি এটা ইচ্ছে করেই করেন?

রাজীব: অামি বেসিক্যালি মরবিড টাইপ।

জয়: ‘অন্য কারো’ কবিতাটায় একটা তীব্র বার্তা আছে। মনে হয়, কাউকে আপনি বলতে চেয়েছেন কথাগুলো। সে কে?

রাজীব: মনে নাই। অামার কবিতার নামগুলো নির্ঝরদার দেয়া। তাই নাম দিয়ে বলতে পারবো না। তবে কবিতা এমনিতেই মনে থাকে না। নিজেরও না। অন্যেরও না।

জয়: আপনার বইয়ের সব কবিতার নাম কি নির্ঝর দা দিয়েছেন? এরকম তো হয় না সাধারণত…

রাজীব: হুম। সেটাপের সময়। সুচীর জন্য নাম দরকার হয়। তো উনাকে দিয়ে দিতে বলি।

জয়: আপনার বইয়ের সব কবিতার নাম আরেকজন দিয়ে দিলো। এটা জরুরী ছিলো? নাম ছাড়াও কি সূচি হয় না?

রাজীব: দিলো অার কি। কি অাসে যায়। থাকলেও যা। না থাকলেও তা। সমস্যা মনে হয় না। কবিতার নামই তো দিল।

জয়: আপনার নাম রাজীব দত্ত। কেউ একজন এই নামের বদলে আরেকটা নাম দিলে মানবেন?

রাজীব: অামি তো অার কবিতা না।

অন্য কারো, নামের কবিতাটা দেখলাম। অইটা কোন প্রেমিকা মিন করে না। অাসলে এটা প্রেমের কবিতাই না। এটা এরকম ভেবে লেখা: অামি অাদতে অন্য কারো স্মৃতি। বা অন্য কেউ অামার এ জীবনকে স্বপ্নে ভেবে যাচ্ছে হয়তো।

রোবায়েত: রাজীব দা, বুনুয়েলের An Andalusian Dog দেখছিলেন?

রাজীব: দেখছিলাম মুভিটা।

রোবায়েত: আপনার ‘কাঠের গোলাপ’ কবিতাটা আমাকে ঐ মুভিটার কথা মনে করায়। যেমন ধরেন, হাত ফুঁড়ে পিঁপড়ে বের হয়ে আসা, চোখ কেটে ফেলা এমন। আপনার কবিতাতেও এই ‘চোখের গর্ত বানাচ্ছে’, তারপর পিঁপড়ের প্রসঙ্গ আসা; এইগুলো দিয়ে। আপনার এই লেখাটায় কি মুভিটার কোনো প্রভাব ছিল?

রাজীব: না না অইটা থেকে না।

রোবায়েত: আপনার ‘অন্য কারো’ লেখাটা নিয়ে আমার একটু ভিন্ন অবজারভেশন আছে। আমার ছোট বেলায় সেলুনে একটা লেখা দেখতাম। গীতার কিছু কথা। ঐ যেমন, তুমি কী নিয়ে এসেছিলে যে তার জন্য পরিতাপ করছ? মানে, কিছুই তোমার নয়; এমন একটা বাণী দিতে চায় আর কি! আপনার লেখাটাও তেমন।’কিছুই তোমার নয়’, ‘তাও অন্য কারো’। এইসব।

এইটা পড়ে কি আপনার এখন মনে হচ্ছে যে লেখাটা গীতার ওই শ্লোকের মতো?

রাজীব: পরে পড়ে দেখবো অাবার। অাপনার সেন্স থেকে।

রোবায়েত: যদিও, এই লেখাটা নিয়ে আমার হালকা অভিযোগ আছে, সেইটা অবশ্য ব্যাপারও না। তাও বলি আর কি!

রাজীব: বলেছিলেন একবার। মহাদেব সাহার কবিতার মতো অইটা কি?

রোবায়েত: আপনি শুরু করতেছেন, ‘মিথ্যে করে হলেও ভাবো’ এমন করে। যা আমাকে মহাদেব সাহার ‘করুণা করে হলেও চিঠি দিও’ কে মনে করায়। তবে এই অন্য বাক্যগুলো নিয়ে আমার কোনো অভিযোগ নাই।

রাজীব: বলছিলেন অাগে।

রোবায়েত: রাজীব দা, কবিতার ভাষা নিয়ে আপনার কোনো ভাংচুড় আমি দেখতে পাই না। খুব স্ট্রেইট। কিন্তু ছবিতে আপনি ভীষণ ভাংচুড়-প্রবণ। এইটা কেন?

রাজীব: পারি না হয়তো। কিন্তু ইমেজগুলা এজ ইউজুয়াল না রাখার চেষ্টা করি। হয়তো ইউজুয়ালই।

রোবায়েত: আপনার কি মনে হয় না যে আপনার কবিতার অধিকাংশ ইমেজই শিশুদের কল্পনার কাছাকাছি? মানে, শিশুরা যেমন নিজের মতো করে আনপ্রেডিক্টেবল কিছু চিন্তা করে অমন?

রাজীব: মনে হয় না। শিশুরা অারো সরল করে ভাবতে পারে। বিনয় মজুমদারের কবিতায় এটা অাছে লাগে। অসুস্থ অবস্থায় লেখা। শেষের দিককার।

রোবায়েত: আমি তাইলে শেষ করি রাজীব দা। এইটা আমার নেয়া প্রথম ইন্টারভিউ। আমি খুব এনজয় করছি। আর হ্যা, আপনার কবিতাই আমার বেশি প্রিয় আপনার ছবির চাইতে।

রাজীব: ধন্যবাদ। 🙂

রোবায়েত: আপনাকেও ধন্যবাদ রাজীব দা।

ফারাহ্: কবিতার কোন ব্যাকারণ মানেন কি ? কেন / কেন নয়?
 
রাজীব: ব্যাকরণ ফলো করে কি অইভাবে কোন অার্ট হয়? শিওর না। বোধহয় জানি না বলেই মানা হয় না। কিংবা মানি হয়তো। জানি না বলেই বুঝি না, মানতেছি কি না।
ফারাহ্: অনেকেই মনে করেন হয়তো আছে।
 
রাজীব: কবিতার কি কি ব্যাকরণ অামি জানি না।
 
ফারাহ্: আমিও না। গার্সিয়া মার্কেস নিয়ে কিছু কথা হতে পারে? প্রশ্ন ছিলো একটা।
 
রাজীব: হতে পারে। শুনি তো..
 
ফারাহ্: জনশ্রুতি আছে গার্সিয়া মার্কেসকে অপ্রকৃতিস্থ বলা হয়েছে কোথাও কোথাও । মন্তব্য করুন।
 
রাজীব: জানা নাই অামার। তবে অামাদের এখানেও তো কবি শিল্পীমাত্রই ধরে নেয়া হয় পাগল।
 
ফারাহ্: গার্সিয়া মার্কেসের ফ্যান্টাসি আর কল্পনার জগতকে নিয়ে…
 
রাজীব: আচ্ছা
 
ফারাহ্: আপনাকে আমাদের ভীষণ আপন মনে হয়। ছবিতে, ভাষায়, কবিতায়। অপ্রকৃতিস্ত কবি চাই। হা হা হা

জয়: ইন্টারভিউটা শেষ করবো। তার আগে জানতে চাই, কয়বার প্রেমে পড়েছেন এখনো পর্যন্ত? সবশেষ কার প্রেমে পড়েছেন, তার নাম বলা যাবে?

রাজীব: সব সময়েই প্রেমে পড়ে থাকি তো। একসাথে কয়েকজনের প্রেমেও পড়ি। নাম বলাটা অামার চে যার নাম তার জন্য বেশি বিব্রতকর।

জয়: আর যদি একদিনের জন্যে হলেও সর্বান্তকরণে কারো প্রেমিক হতে চান, সেই নারীটি কে? থাকে না, স্বপ্নের নায়িকা…

রাজীব: যার নাম বলব সে বিব্রত হবে।

জয়: আচ্ছা। আমরা চাই না সে বিব্রত হোক। সে কি জানে, তিনিই আপনার সে?

রাজীব: শিওর না।

জয়: আমাদের এই প্যারা নেবার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। আরেকটা কথা, আমি আপনার কবিতা মিস করি। সম্ভবত কবিতা থেকে দূরে আছেন। কবিতায় পুরোদমে ফিরে আসুন। এই চাওয়া রইলো।

রাজীব: হাসির ইমো।

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!

Discover more from

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading