ক্যাপিটালিজম অ্যা গোস্ট স্টোরি ।। অরুন্ধতী রায় ।। ভূমিকা ও অনুবাদ: মূর্তালা রামাত ও শারমিন শিমুল ।। প্রথম পর্ব

“দ্য জাজেজ”
পাবলো নেরুদা

তোমার রক্ত জিজ্ঞাসা করে, ওরা কীভাবে ধনী
হলো? কোন সে সালফারাস ধাতবের জামায়
ঢুকে জড়িয়ে গেলো আইনের সাথে? আর
কেমন করে গরিবেরা একের পর এক এসে
পড়তে লাগলো বিচারের ভেতর?

জমিন কীভাবে এতো তিতা হয়ে উঠলো
যে গরিবের বাচ্চাগুলো বেড়ে ওঠার জন্য
পেলো শুধু কষ্ট আর পাথর? অথচ এটাই
হয়েছিল, আর আমি তাই লিখে রেখে যাচ্ছি
লিখে রাখছি আমার কপাল পেতে তাদের জীবন।

…………………………

প্রেসিডেন্ট স্যালুট নিলেন

মন্ত্রী বললেন, ভারতের খাতিরেই মানুষের গ্রাম ছেড়ে শহরে চলে যাওয়া উচিত। মন্ত্রী হাভার্ডে লেখাপড়া করেছেন। তিনি বোঝেন গতি, বোঝেন সংখ্যা। তার মতে, পঞ্চাশ কোটি গ্রামছাড়া মানুষ একটি ভালো ব্যাবসায়িক মডেল হতে পারে।

গরীব মানুষ দিয়ে শহর ভরার আইডিয়াটি সবাই যে পছন্দ করলো তা কিন্তু নয়। বোম্বের এক বিচারক বস্তিবাসীদেরকে নগরের জমি ছিনতাইকারী হিসেবে আখ্যা দিলেন। অবৈধ বস্তি বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেয়ার আদেশ দিয়ে আরেকজন বললেন, যারা শহরে বসবাস করার ক্ষমতা রাখে না তাদের শহর ছেড়ে চলে যাওয়া উচিত।

শহর থেকে উৎখাত হওয়া মানুষেরা যখন গ্রামে ফিরে গেলো তখন তারা দেখলো বড় বড় বাঁধ আর ধূলো ভরা খাদের নিচে তাদের গ্রামগুলো হারিয়ে গেছে। তাদের ঘরে ঘরে ক্ষুধা আর পুলিশের লোকজন। জঙ্গলগুলো সশস্ত্র গেরিলায় ভর্তি। তারা দেখলো, কাশ্মীর, নাগাল্যান্ড, মনিপুরসহ ভারতের এ কোণা ও কোণা থেকে যুদ্ধ একেবারে তাদের গ্রামের হৃৎপিণ্ডে এসে হাজির হয়েছে। ফলে তারা আবার শহরে ফিরে এল। শহরের রাস্তায়, ফুটপাতে, নির্মানাধীন এলাকাগুলোর ময়লা ভরা খুঁপরিতে কোনমতে মাথা গুঁজে তারা আবাক হয়ে ভাবতে লাগলো, এত্তো বড় এই দেশটির কোন জায়গাটি আসলে তাদের জন্য বরাদ্দ।

মন্ত্রী ঘোষণা দিলেন, গ্রাম ছেড়ে শহরে আসা মানুষের বেশির ভাগই অপরাধী এবং “তারা যে ধরণের আচার ব্যবহারে অভ্যস্ত তা আধুনিক নগরে একেবারেই অগ্রহণযোগ্য।” মধ্যবিত্ত শ্রেণী মন্ত্রীর এই নায্য ঘোষণাকে, সাদাকে সাদা কালোকে কালো বলার এই সাহসকে সাধুবাদ জানালো। মন্ত্রী বললেন, আইন শৃঙ্খলার উন্নতি ঘটাতে তিনি আরো পুলিশ স্টেশন বসাবেন, আরো পুলিশ নিয়োগ দেবেন এবং রাস্তায় আরো বেশি পুলিশের টহল গাড়ির ব্যবস্থা করবেন।

কমনওয়েলথ গেমসের জন্য দিল্লীর শোভা আরো বাড়াতে নানারকম আইন পাস করা হলো। এইসব আইন কাপড়ের ময়লা দাগ দূর করার মতো করে গরীব মানুষকে ভ্যানিশ করে দিলো। রাস্তার হকারেরা হাওয়া হয়ে গেলো। রিক্সায়ালারা তাদের লাইসেন্স হারালো। ছোট ছোট দোকান আর ক্ষুদ্র ব্যবসাগুলো একেবারে বন্ধ হয়ে গেলো। ভ্রাম্যমান আদালতের ভ্রাম্যমান ম্যাজিস্ট্রেটরা ভিক্ষুকদের ধরে ধরে শহরের সীমানার বাইরে পাঠিয়ে দিলেন। বস্তি টস্তি যা থাকলো সেগুলো ভিনাইল বিলবোর্ড দিয়ে ঢেকে দেয়া হলো। বিলবোর্ড জুড়ে লেখা হলো, DELHIciously Yours.

নতুন ধরনের পুলিশ রাস্তায় রাস্তায় টহল দিতে থাকলো। তাদের হাতে অত্যাধুনিক অস্ত্র, গায়ে দামী পোশাক। তাদেরকে এমনভাবে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে যে শরীরের কোথাও একটু চুলকালেও সবার সমানে তারা তা স্পর্শ করবে না। যতোই চুলকাক না কেনো তারা তা অগ্রাহ্য করবে। কারণ, চারিদিকে ক্যামেরা, সবকিছুই রেকর্ড হচ্ছে।

***
দুজন বাচ্চা অপরাধী পুলিশের ঘেরটোপ থেকে পালালো। তাদের চালচলন আধুনিক শহরের সঙ্গে বেমানান। পালিয়ে তারা এক মহিলার দিকে এগিয়ে গেলো। মহিলা ট্রাফিক ক্রসিংয়ে তার চকচকে গাড়ির রোদ আটকানো গ্লাসের ভেতর চামড়ার সিটে আয়েস করে বসে ছিলেন। অপরাধী দু’জনের মাথা তার গাড়ির জানালার চেয়ে লম্বা নয়। তাদের একজনের নাম রুকমিনি আরেকজন কামলি। অথবা খুব সম্ভবত মেহেরুন্নিছা আর শাহবানু। (কে অত দেখতে যায়।) মহিলাটি তাদের কিছু টাকা দিলেন, সাথে মাতৃসুলভ খানিকটা উপদেশও। কামলি (অথবা শাহবানু) এর হাতে দশ রুপি দিয়ে তিনি বললেন, দুইজনে ভাগাভাগি করে নিস। তারপর সিগন্যালের আলো বদলালে তার গাড়ি দ্রুতবেগে এগিয়ে গেলো।

মহিলাটি চলে যাওয়ার পর, রুকমিনি ও কামলি (অথবা মেহেরুন্নিছা আর শাহবানু) দু’জন দু’জনের উপর গ্লাডিয়েটর এর মতো, জেলখানায় যাবজ্জীবন কারাদন্ড ভোগকারীর মতো ঝাঁপিয়ে পড়লো। প্রতিটি ঝাঁ চকচকে গাড়ি যেগুলো বিদ্যুৎবেগে ওদের পাশ কাটালো, যেগুলো ওদেরকে প্রায় পিষেই দিচ্ছিলো, সেগুলো তাদের ঝকমকে দরজায় ওদের যুদ্ধের, ওদের আমরণ কামড়াকামড়ির প্রতিফলন বয়ে নিয়ে ছুটে চললো।

শেষতক, দুটো মেয়েই দিল্লীর হাজার হাজার শিশুর মতো কোনরকম হদিস ছাড়াই লাপাত্তা হয়ে গেলো।

আর এভাবেই সফল হলো কমনওয়েলথ গেমস।

***
দুই মাস পর ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবসের বাষট্টিতম বার্ষিকীতে সশস্ত্র বাহিনী প্রজাতন্ত্র দিবসের কুচকাওয়াজে তাদের নতুন অস্ত্রশস্ত্র প্রদর্শন করলো। অস্ত্রগুলোর মধ্যে ছিল ক্ষেপনাস্ত্র উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা, রাশান মাল্টি-ব্যারেল রকেট লাঞ্চার, যুদ্ধবিমান, হালকা হেলিকপ্টার, এবং নৌবাহিনীর জন্য পানির নিচে ব্যবহার করা যায় এমন অস্ত্রপাতি। নতুন টি-৯০ ট্যাঙ্কের নাম রাখা হলো “বিষ্ণু”। (পুরোনো ট্যাঙ্কটির নাম ছিল “অর্জুন”।) নতুন হেভিওয়েট টর্পেডোর নাম দেয়া হলো “ভারুণাস্ত্র”। আর ছুটে আসা টর্পেডোকে ধ্বংস করার সিস্টেম কে ডাকা হলো “মারিচ” নামে।(কাশ্মীরের বরফজমা নিরব রাস্তায় টহল দেয়া সামরিক যানগুলোর গায়ে “হনুমান” এবং “বজ্র” নাম দুটো লেখা থাকে।) ভগবত গীতা, রামায়ণ, ও মহাভারত থেকে নাম নেয়াটা হয়তো নিছক কাকতলীয় ব্যাপার।

অনুষ্ঠানে আর্মির সিগন্যাল কোরের “ডেয়ার ডেভিল” শাখার সদস্যরা মোটর সাইকেল চালিয়ে রকেটের মতো আকৃতি বানিয়ে দেখালো, তারপর তারা বানালো উড়ন্ত পাখির ঝাঁক, সবশেষে তারা তৈরি করলো মানুষের পিরামিড।

সামরিক বাহিনীর ব্যান্ড দল জাতীয় সঙ্গীত বাজিয়ে শোনালো। প্রেসিডেন্ট স্যালুট গ্রহণ করলেন।

তিনটি সুখোই ফাইটার জেট আকাশে ত্রিশূল আঁকলো। শিবের ত্রিশূল। আচ্ছা, ভারত কি একটি হিন্দু রাষ্ট্র? উত্তরে বলা যায়, ব্যাপারটা হয়তো কেবলই দূর্ঘটনাবশত।

রোমাঞ্চিত জনতা শেষ শীতের সূর্যের দিকে মুখ করে ফাইটারগুলোর নানা কসরতে হাততালি দিয়ে প্রশংসা জানালো। আকাশের অনেক উঁচুতে বিমানের রুপালি ঝিলিক মারা শরীরে প্রতিফলিত হলো রুকমিনি আর কামলি (অথবা মেহেরুন্নিসা আর শাহবানু) এর আমৃত্যু সংগ্রাম।

…………………………..

পুঁজিবাদ: এক ভৌতিক কাহিনী

এটা কি একটি বাড়ি না ঘর? এই কি নতুন ভারতের মন্দির, না পুরনো ভারতের ভুতের আড্ডাখানা? যেদিন থেকে মুম্বাইয়ের আল্টামাউন্ট রোডে বিপদের হুমকি আর রহস্যের জাল বিছিয়ে অ্যান্টিলা’র আবির্ভাব ঘটেছে, সেদিন থেকেই পরিস্থিতি আর আগের মতো নেই। “এইতো আমরা এসে গেছি”, যে বন্ধুটি আমাকে অ্যান্টিলার কাছে নিয়ে গিয়েছিল সে বলে উঠলো, “আমাদের নতুন শাসনকর্তাকে তোমার শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করো।”

অ্যান্টিলা ভারতের সবচেয়ে ধনী মানুষ মুকেশ আম্বানির নিজের সম্পত্তি। এ যাবত বানানো সবচেয়ে দামী এই আবাসটির কথা আমি পত্রপত্রিকায় পড়েছিলাম। সাতাশ তলার এই বাড়িটিতে তিনটি হেলিপ্যাড, নয়টি লিফট, ঝুলন্ত বাগান, নাচের জন্য বলরুম, প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগের ঘর, ব্যায়ামাগার ছাড়াও আছে ছয় তলা জোড়া পার্কিং আর ছয়শত চাকর-বাকর। বাড়ির গা বেয়ে খাড়া উঠে গেছে বাগান, এই ধরনের দৃশ্য দেখার জন্য আমি একেবারেই প্রস্তুত ছিলাম না। ঘাসের বাগানটিকে দেখে মনে হচ্ছিল, সাতাশ তলা সমান উঁচু দেয়ালের সাথে লাগানো ধাতব তারের উপর ঘাস গজিয়েছে- পুরো বাগানটি যেন উড়ছে। চোখে পড়লো, কিছু কিছু ঘাস শুকিয়ে গেছে; নিঁখুত চতুর্ভুজ অংশ থেকে কিছু ঘাস খসে পড়ে গেছে। পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছিল যে, এতো সব কলাকৌশল করেও সবকিছু ঠিকমতো কাজে আসেনি।

কিন্তু ধন সম্পদের “রাতারাতি ফুলে ফেঁপে ওঠা” নিশ্চিতভাবে কাজ করেছে। সেজন্যই ভারতের ১.২ বিলিয়ন মানুষের মধ্যে মাত্র একশ জন ধনী মানুষের কাছে যে সম্পদ আছে তা পুরো জাতির জিডিপির চারভাগের এক ভাগ।

বাজারে এ কথা চালু রয়েছে (নিউ ইয়র্ক টাইমস ও একই কথা বলেছে) অথবা চালু ছিল যে, এতোসব চেষ্টা আর বাগান বিলাসের পরেও আম্বানিরা অ্যান্টিলায় থাকে না। এ ব্যাপারে কেউই আসলে নিশ্চিতভাবে কিছু বলতে পারে না। তবে মানুষজন এখনও এই বাড়িটিকে ঘিরে দূরাত্মা, দূর্ভাগ্য, বাস্তু, আর ফেং সুই এর জাদুটোনার নানা গল্প ফিসফিসেয়ে বলে। হয়তো এ সব কিছুই কার্ল মার্ক্স এর দোষ।(সবই তার অভিশাপ।) তিনি বলেছিলেন, পুঁজিবাদ, “ভেল্কিবাজির দ্বারা উৎপাদন এবং বিনিময়ের এমন এক বিশাল পদ্ধতি তৈরি করেছে যেন এক জাদুকর জাদু দিয়ে প্রেতলোক থেকে অশুভ শক্তিকে নিয়ে আসার পর সেই শক্তিকে আর নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না।”

আমরা ভারতের ৩০০ মিলিয়ন মানুষের জনগোষ্ঠী। আমরা আর্ন্তজাতিক অর্থ সংস্থা (আইএমএফ) এর “সংস্কারের” ফলে গড়ে ওঠা নতুন, সংস্কার-পরবর্তী মধ্যবিত্ত শ্রেণীর অন্তর্ভূক্ত। আইএমএফ এর দৃষ্টিতে এই আমরা- বেশ বড় একটি বাজার। প্রেতলোক থেকে উঠে আসা অশরীরী আত্মা, মরে যাওয়া নদীগুলোর উপদ্রবকারী ভূত, শুকনো খটখটে কুয়ো, ন্যাড়া পাহাড় আর নগ্ন বনভূমির পাশে আমাদের আবাস। আত্মহত্যায় বিলীন হয়ে যাওয়া ২৫০,০০০ ঋণগ্রস্থ কৃষকের ভূত, এবং আরো ৮০০ মিলিয়ন নিঃস্ব হয়ে যাওয়া, অধিকার হারানো মানুষ যারা আমাদের বর্তমান পরিচয়টুকু সৃষ্টির জন্য তাদের সবকিছু হারিয়েছে, যাদের মাথাপিছু আয় দিনে ভারতীয় ২০ রূপিরও কম আর এই দিয়েই তাদের বেঁচে থাকতে হয়- তাদের সাথেই আমাদের নিত্য ওঠাবসা।

মুকেশ আম্বানির নিজেরই ২০ বিলিয়ন ডলারের সম্পত্তি রয়েছে। তিনি রিলায়েন্স ইন্ড্রাসট্রিজ লিমিটেড (আরআইএল) এর সিংহভাগ শেয়ারের মালিক।

সারা বিশ্বে পেট্রোক্যামিকাল, তেল, গ্যাস, পলিস্টার ফাইবার, বিশেষ অর্থনৈতিক জোন, তাজা খাবারের কেনাবেচা, উচ্চ বিদ্যালয়, জীব বিজ্ঞান গবেষণা, এবং স্টেম সেল সংরক্ষণ খাতে কোম্পানিটির বাণিজ্যিক স্বার্থ রয়েছে।

এবং বাজারে এর পুঁজির পরিমাণ ৪৭ বিলিয়ন ডলার। আরআইএল সম্প্রতি ইনফোটেলের ৯৭ ভাগ শেয়ার কিনে নিয়েছে। ইনফোটেল হলো একটি টিভি কনসোর্টিয়াম যা ২৭ টি টিভি নিউজ এবং বিনোদন চ্যানেল নিয়ন্ত্রণ করে। এই চ্যানেলগুলোর মধ্যে রয়েছে সিএনএন-আইবিএন, আইবিএন লাইভ, সিএনবিসি, আইবিএন লোকম্যাট, এবং প্রায় সমস্ত আঞ্চলিক ভাষায় প্রচারিত ইটিভি। দেশের একমাত্র ফোর জি ব্রডব্যান্ডের লাইসেন্স এর মালিক হলো এই ইনফোটেল। যদি প্রযুক্তি ঠিকঠাকমতো কাজ করে তবে এই উচ্চগতিসম্পণ্ন তথ্যের পাইপলাইনকেই তথ্য আদানপ্রদানের ভবিষ্যত বলে ধরা যেতে পারে। আম্বানি সাহেব একটি ক্রিকেট দলেরও মালিক।

ভারতকে চালায় এমন কয়েকটি মুষ্টিমেয় কর্পোরেশনের একটি হলো- আরআইএল। অন্যগুলোর মধ্যে রয়েছে টাটা, জিন্দাল, ভেদান্ত, মিত্তাল, ইনফোসিস, এস্সার এবং অন্য রিলায়েন্স- রিলায়েন্স অনিল ধিরুভাই আম্বানি গ্রুপ (এডিএজি)। এডিএজি’র মালিক হলো মুকেশ আম্বানির ভাই অনিল। সারা ইউরোপ, মধ্য এশিয়া, আফ্রিকা, এবং ল্যাটিন আমেরিকা জুড়ে এইসব কর্পোরেশনগুলোর বাণিজ্য বিস্তারের প্রতিযোগীতা ছড়িয়ে পড়েছে। তাদের জাল সবদিকে ছড়ানো; মাটির উপর থেকে নিচ পর্যন্ত এই জাল দৃশ্যমান এবং অদৃশ্য। উদাহরণস্বরূপ টাটাদের কথা বলা যায়। টাটারা সারা বিশ্বে একশোটিরও বেশি কোম্পানি চালায়। তারা ভারতের সবচেয়ে পুরোনো এবং বড় ব্যাক্তিমালিকানাধীন জ্বালানী কোম্পানিগুলোর একটি। তাদের মালিকানায় খনি থেকে শুরু করে গ্যাসক্ষেত্র, ইস্পাত কারখানা, টেলিফোন কোম্পানি, এবং টিভি ও ব্রডব্যান্ড নেটওয়ার্কস রয়েছে।

এমনকি তারা পুরো একটি শহরের প্রশাসনিক কাজকর্মও পরিচালনা করে। তারা গাড়ি বানায়, ট্রাক বানায়। তাজ হোটলের সমস্ত শাখার মালিকানা তাদের। জাগুয়ার, ল্যান্ড রোভার, ডেইউ, টেটলি চা এর মালিকানা ছাড়াও তাদের রয়েছে প্রকাশনা কোম্পানি, বইয়ের দোকানের শাখা। আয়োডিনযুক্ত লবণের প্রধান একটি ব্র্যান্ড তাদের, নামকরা কসমেটিক ব্র্যান্ড লেকমিও তাদের। বলা যায়, “আপনি আমাদের ছাড়া থাকতে পারবেন না”- এই বাক্যটি খুব সহজেই তাদের বিজ্ঞাপনের ট্যাগলাইন হতে পারতো।

ধন-সম্পদের রাতারাতি ফুলে ফেঁপে নহর হয়ে ওঠার যে নীতিকাহিনী প্রচলিত তার নিয়মানুযায়ী আপনার যতো বেশি ধন সম্পদ থাকবে, আপনি ততো বেশি ধনসম্পত্তি বানাতে পারবেন। এখনকার, ব্যাক্তিমালিকনায় সবকিছু ছেড়ে দেবার এই যুগটি ভারতের অর্থনীতিকে বিশ্বের অন্যতম দ্রুতবর্ধমান অর্থনীতিতে পরিণত করেছে। যাই হোক, যে কোন সুপ্রতিষ্ঠিত পুরোনো ফ্যাশনের কলোনির মতোই খনিজ সম্পদ হলো ভারতের অন্যতম প্রধান রপ্তানী পণ্য। খনিজ সম্পদের কল হলো সেই কল যা কীনা মাটির গভীর থেকে উঠিয়ে আনা খনিজরূপী টাকাকে উদগিরণ করে। ভারতের নতুন নতুন কর্পোরেশন যেমন টাটা, জিন্দাল, এসসার, রিলায়েন্স, স্টেরলাইট- এরা শক্তি প্রয়োগ করে এই কলের মাথায় উঠতে পেরেছে। যা কিনতে হয় না তা বিক্রি করতে পারাটা ব্যবসায়ীদের জন্য স্বপ্ন সত্যি হওয়ার মতোই একটা ব্যাপার বটে।

জমি জিরাত হলো কর্পোরেট সম্পদের আরেকটি প্রধান উৎস। সারা বিশ্ব জুড়েই দূর্বল দুর্নীতিবাজ সরকারগুলো- ওয়াল স্ট্রিটের দালাল, কৃষিব্যবসার কর্পোরেশন, আর চাইনিজ ধনকুবেরদের হাতে জমির পাহাড় জমতে দিয়েছে। (এর ভেতর অবশ্যই পানির মালিকানাও আছে।) ভারতে মিলিয়ন মিলিয়ন মানুষের জমি “জনগণের স্বার্থে” হুকুম দখল করে প্রাইভেট কর্পোরেশনগুলোর কাছে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। জনগণের স্বার্থেই এসব জমিতে গড়ে তোলা হয়েছে স্পেশাল ইকোনমিক জোন (এসইজেডস), নানা অবকাঠামো, বাঁধ, মহাসড়ক, গাড়ি তৈরির কারখানা, রাসায়নিক গবেষণাগার, এবং ফর্মুলা ওয়ান রেসের মাঠ। (এইসব ব্যক্তিগত সম্পত্তির পবিত্র ঘেরটোপের ভেতর গরিবদের কোন স্থান নেই।) বরাবরের মতোই স্থানীয় লোকজনকে এই বলে স্বান্তনা দেয়া হয়েছে যে, নিজের জমি থেকে তাদের সরিয়ে দেয়া এবং নিজের সহায় সম্পত্তির দখল থেকে তাদের বিচ্যুত করাটা হলো আসলে কর্মসংস্থানের উদ্যোগ। কিন্তু এখন আমরা জানি, জিডিপি বৃদ্ধির সাথে কর্মসংস্থান বাড়ার যোগসূত্র একটি কল্পকাহিনী ছাড়া আর কিছুই নয়। আর তাই, “বেড়ে ওঠার বিশ বছর পর আমরা দেখতে পাই, ভারতের কর্মশক্তির ৬০ ভাগই স্বকর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছে, আর কর্মশক্তির ৯০ ভাগই অসংগঠিত সেক্টরগুলোতে কাজ করে।”

স্বাধীনতার পর, ১৯৮০ সাল পর্যন্ত নকশাল আন্দোলন থেকে জয়প্রকাশ নারায়ণের “সম্পূর্ণ ক্রান্তি”- গণমানুষের সব আন্দোলনের মূলেই ছিল ভূমি সংস্কার, অর্থাৎ ভূস্বামী গোষ্ঠীদের কাছ থেকে জমি নিয়ে ভূমিহীন কৃষকদের মধ্যে তা পুণঃবন্দোবস্ত করা। বর্তমানে জমি কিংবা সম্পদের পুণঃবন্টন সম্পর্কিত যে কোন কথা শুধু অগণতান্ত্রিকই নয় বরং পাগলামি বলে বিবেচিত হবে। এমনকী সমস্ত বিপ্লবী সশস্ত্র আন্দোলনও মানুষের কাছে যে সামান্য জমিটুকু আছে তাই ধরে রাখার যুদ্ধে সংকুচিত হয়ে পড়েছে। লক্ষ লক্ষ ভূমিহীন মানুষ যাদের অধিকাংশই দলিত এবং আদিবাসী, যারা তাদের গ্রাম থেকে বিতাড়িত হয়ে ছোট ছোট শহর এবং মেগাসিটিগুলোতে বস্তি আর ঘিঞ্জি কলোনিতে বাস করছে, প্রগতিবাদীদের বক্তৃতায় তাদের কোন খোঁজ এখন আর পাওয়া যায় না।

যেহেতু “রাতারাতি ফুলে ফেপে ওঠা”র কৌশলটি একটি চকচকে পিনের মাথায় সব সম্পদ জড়ো করে, এবং এর ওপর আমাদের ধনকুবেররা সার্কাস নৃত্য করে আর জলোচ্ছ্বাসের ঢেউয়ের মতো টাকাপয়সা গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে চূর্ণবিচূর্ণ করে দেয়, সেহেতু আদালত, সংসদ- এমনকি মিডিয়া পর্যন্ত তাদের যা দয়িত্ব কর্তব্য পালন করার কথা তার সাথে সত্যিসত্যিই সমঝোতায় নেমে যায়।

নির্বাচনকে ঘিরে কার্নিভাল যতোই জমে উঠতে থাকে ততোই আমরা প্রকৃত গণতন্ত্র নিয়ে সন্দিহান হয়ে পড়ি।

ভারতের প্রতিটি নতুন দুর্নীতি কেলেঙ্কারি প্রকাশিত হলেই তার আগের কেলেঙ্কারির খবর নিষ্প্রাণ হয়ে যায়। ২০১১ এর গ্রীষ্মে টু-জি স্পেকট্রাম স্ক্যান্ডালের খবর বের হয়। তখন আমরা জানতে পারি যে, এই স্ক্যান্ডালের সাথে সংশ্লিষ্ট কর্পোরেশনগুলো জনগণের সম্পদ থেকে ৪০ বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ অর্থ পাচার করেছে। কাজটি সফল করার জন্য ঐসব প্রতিষ্ঠানগুলো যোগাযোগ ও তথ্যমন্ত্রীর পদে নিজেদের এক বন্ধুকে বসিয়েছিল। ঐ মন্ত্রী টু-জি টেলিকম তরঙ্গের লাইসেন্সের মূল্য একেবারেই কমিয়ে দিয়েছিলেন এবং অবৈধভাবে নিজের বন্ধুদের কাছে ঐ সব লাইসেন্স নিলামে বিক্রি করেছিলেন। সংবাদমাধ্যমে ফাঁস হয়ে যাওয়া ফোনালাপ থেকে আমরা জেনেছি যে দিনে দুপুরে এতোবড় চুরির কাজকে সফল করার পেছনে ছিল কয়েকজন শিল্পপতি ও তাদের প্রধান প্রতিষ্ঠান, মন্ত্রী, প্রবীণ সাংবাদিক, এবং একজন টেলিভিশন উপস্থাপক। এমআরআই এর সাহায্যে যেমন রোগ নির্ণয় করা যায় তেমনি এই ফোনালাপটিও একটি নির্ণায়ক পরীক্ষা যা জনগণের দীর্ঘদিনের সন্দেহকে সত্য বলে প্রমাণ করেছে।

টেলি যোগাযোগ তরঙ্গকে বেসরকারিকরণ এবং সেটি অবৈধভাবে বিক্রি করায়- কোন যুদ্ধ বা বড় ধরনের স্থানচ্যুতি বা প্রাকৃতিক বিপর্যয় ঘটেনি। কিন্তু ভারতের পর্বতমালা, নদী, বা বনভূমির বেসরকারিকরণের ফলে উপরের বিপর্যয়গুলো ঘটতে পারে। হয়তো এসব বেসরকারিকরণ সকলের বোধগম্য, সোজাসাপ্টা অর্থনৈতিক কেলেঙ্কারির মতো সরল ও স্বচ্ছ নয়। অথবা হয়তো এগুলো সবই ভারতের তথাকথিত “অগ্রগতি”র দোহাই দিয়ে করা হয়ে থাকে বলে মধ্যবিত্ত সমাজের পক্ষ থেকে ততোটা প্রতিবাদ শোনা যায় না।

(চলবে)

 

গ্রন্থ: ক্যাপিটালিজম অ্যা গোস্ট স্টোরি
লেখক: অরুন্ধতী রায়
অনুবাদক: মূর্তালা রামাত ও শারমিন শিমুল

[বইটি বাংলা ভাষায় ধারাবাহিক প্রকাশ হতে থাকবে; প্রতি শুক্রবার।]

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!

Discover more from

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading