কুকুরের জীবন ও মহাত্মা চ্যাপলিন ।। মিতুল আহমেদ

একটা কুকুরের জীবন আসলে কেমন হইতে পারে এই বিষয়ে পৃথিবীর মানুষের ভালোই ধারণা থাকার কথা। কারণ কুকুর প্রাণিটির সাথে মানুষের সখ্যতা বহু দিনের। কুকুরের প্রজনন থেইকা একেবারে বেড়ে ওঠা, তার শৈশব, কৈশোর এমনকি যৌবনপ্রাপ্ত হয়ে মেলামেশার বিষয়টাও ঘটে মানুষের চোখের সামনে। একটা কুকুরের এইসব ব্যাপারগুলান মানুষের জীবনাচরণের প্রায় কাছাকাছি বলা চলে। কুকুরের সাথে নানান দিক দিয়া মানুষের এতো মিল যে, প্রায়শই তারা কুকুরের সাথে নিজেদের তুলনা কইরা থাকে। যদিও সেই তুলনাটা নেতিবাচক অর্থেই! কুকুর হয়তো কারো কারো কাছে অতি মাখামাখির কিন্তু তারপরও মানুষের জীবন জুড়ে ‘কুকুর’ শব্দটি অনাকাঙ্ক্ষিত; যেনবা অভিশাপেরই নামান্তর!

কুকুর হয়তো কোনো অভিশপ্ত প্রাণি নয়, কিন্তু কোনো মানুষের জীবন যখন কুকুরের জীবন হিসেবে সমাজে চাওর হয় তখন সেইটা অভিশপ্ত জীবন হিসেবে গণনা হয়। কুকুরের জীবন নিয়া এইসব তেনা পেচানো কথার চেয়ে বরং মোটাদাগে ‘কুকুরের জীবন’ বলতে একটা সিদ্ধান্তে আসা যাইতে পারে। আক্ষরিক অর্থেই চোখের সামনে যেসব কুকুরের যাপন আমরা দেইখা আসছি সেগুলোর কোনো নির্দিষ্ট রুট থাকে না আসলে। নিজেকে নিয়া তাকে স্ট্রাগলের মধ্য দিয়াই যাইতে হয় জীবনভর। খাদ্যের জন্য স্ট্রাগল, থাকার জন্য স্ট্রাগল, সেক্সের জন্য স্ট্রাগল, ঘুমানোর জন্য স্ট্রাগল। মানে জীবনের সমূহ স্ট্রাগলের সমষ্টিই আসলে ‘কুকুরের জীবন’। এইরকম স্ট্রাগলপূর্ণ সেম্পটম থাকে মানুষের মধ্যেও। পৃথিবীতে অসংখ্য মানুষকে সারা জীবন কুকুরের মতোই স্ট্রাগল করে বাঁচতে হয়। বিতাড়িত হওয়ার প্রপঞ্চ যেহেতু মানুষের জীবনেও সেই অনাদিকাল থেকে, ফলে কুকুরের এই বৈশিষ্ট্য খুঁজে পাওয়া যায় পৃথিবীর মানুষের মধ্যেও। এবং তা নির্ভেজালভাবেই পাওয়া যায়।

একটা মানুষের জীবনরে যখন কেউ নির্দ্বিধায় ‘কুকুরের জীবন’ হিসেবে চিহ্নিত করে তখন একটা স্পষ্ট ইমেজ সবার চোখের সামনে দাঁড়ায়ে যায়। মনে হয় অর্থ নাই, বিত্ত নাই, স্বচ্ছলতা নাই এবং ঠোকর খাইতে খাইতে একটা পুরো জীবন যার পার হয়ে যায় এমন জীবনই বোধয় কুকুরের জীবন। পাড়া-মহল্লার কুকুরগুলার আচরণ লক্ষ্য করলে একটা পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায় এ ব্যাপারে। সারারাত রাস্তায়, কারো ঘরের কোনায় কিংবা কোনো টঙ দোকানের কিনারে বিস্কুটের গন্ধ পাইতে পাইতে ঘুমায়। আবার গভীর রাতে অপরিচিত কারো আভাস পাইলে অন্তত ‘ঘেউ’ করে একটা শব্দ হলেও করে। অথচ সকাল হইলেই সেই মহল্লার মানুষের হাতে তাকে প্রতিদিনই অকারণে তাড়া খাইতে হয়, মাইর খাইতে হয়। রাতের বেলা যে জায়গাটারে আপন মনে করে শুয়ে ছিলো সেইখান থেকেও বিতাড়িত হওয়া লাগে। আসলে এসবই হয় সে ‘কুকুর’ বইলাই! আমাদের চারপাশের অসংখ্য মানুষের জীবন এই রকম। বস্তি, স্টেশন চত্বর কিংবা শহরে উদ্বাস্তু মানুষের দিকে তাকালে কুকুরের এই যাপন আঁচ করা যায় গভীরভাবে। ‘কুকুর’ শব্দটির জায়গায় শুধু ‘দরিদ্র’ শব্দটি পরস্পর স্থানান্তর করলেই সমাজে মানুষের ‘কুকুরের জীবন’ ধারণাটি পরিষ্কার হয়।

মানুষের জীবন আর কুকুরের জীবনের মধ্যে যে খুব একটা তফাৎ নাই এ বিষয়টা আজ  থেকে প্রায় একশ’ বছর আগে ‘এ ডগস লাইফ’ নামের ঊনচল্লিশ মিনিটের একটা সিনেমায় অসাধারণ ভাবে দেখাইছেন বিশ্বসিনেমার সবচেয়ে প্রভাবশালী নির্মাতা, চিত্রনাট্যকার ও এক মহান শিল্পী স্যার মহাত্মা চার্লি চ্যাপলিন। এখন যেহেতু ‘কুকুরের জীবন’ বিষয়ক সিদ্ধান্ত আমাদের মাথায় আছে, এই সুযোগে মহাত্মা চ্যাপলিনের ‘এ ডগস লাইফ’ নিয়া কিঞ্চিৎ বলা যাইতে পারে, যে সিনেমা শুধু একটা সিনেমা না। আরো বেশি কিছু।

‘এ ডগস লাইফ’ চ্যাপলিনের ক্যারিয়ারের প্রথম দিককার সিনেমা। যখন ছোট-ছোট সিনেমায় অভিনয় করে বিশ্বব্যাপী খ্যাতি পাওয়া শুরু করছেন তিনি। একের পর এক হিট সিনেমা উপহার দিয়া সবার আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু তখন তিনি। অবশ্য এর প্রধান কারণ তার পরিবেশনার কৌশলটাই ছিল ভিন্ন। তার ট্রেডমার্ক ভ্যাগাবন্ড লেবাস মানুষকে দুর্দান্ত আকর্ষণ করতো। তবে চ্যাপলিনকে শিক্ষিত, অশিক্ষিত শ্রেণি নির্বিশেষে লুফে নেওয়ার প্রধান কারণ তিনি জীবনের রূঢ় বাস্তবতাকে হাস্যরসাত্মক করে পরিবেশনের অসম্ভব ক্ষমতা রাখতেন। সমান্তরালে আনন্দ ও বেদনার সফল ব্যবহার থাকতো তার প্রায় সব সিনেমায়। ‘এ ডগস লাইফ’ তেমন ক্যাটাগরির’ই একটি সিনেমা।

ক্যারিয়ারের প্রথম দিককার সিনেমা হওয়ায় ‘এ ডগস লাইফ’-এ ‘দ্য ইমিগ্রান্ট’ বা ‘দ্য মডার্ন টাইমস’ কিংবা তার পরবর্তী সিনেমাগুলোর মতো রাজনৈতিক দর্শনের উপস্থিতি লক্ষ্য না করা গেলেও শেষ পর্যন্ত সেই সময়ের সামাজিক প্রেক্ষাপটই আসলে উইঠা আসে প্রতিটি ফ্রেমে। একজন উদ্বাস্তু, বেকার, ভ্যাগাবন্ড সর্বোপরি একজন দরিদ্র মানুষ যে সমাজে কুকুরের চেয়ে অথর্ব- অবমূল্যায়নের সে ছবিই একটি কুকুর ও মানুষের মধ্য দিয়ে সমান্তরালভাবে ‘এ ডগস লাইফ’ সিনেমায় তুইলা ধরছেন মহাত্মা চ্যাপলিন। একমুঠো খাবার যোগাড় আর মাথা গোজার ঠাঁই কইরা নিতে এই সমাজে একজন দরিদ্র মানুষ কতোটা অসহায় সেই চিত্র আমরা দেখি ছবিটিতে। ছবিতে চ্যাপলিন তার সার্বক্ষণিক সঙ্গী কুকুরটিকে যখন মগভর্তি দুধ খাওয়াতে ব্যর্থ হয়ে লেজ ভিজিয়ে তা তার মুখে পুরে দেয় এবং কুকুরটি নিজের লেজটি চেটে খেতে থাকে- এই দৃশ্যের মধ্য দিয়া চ্যাপলিন কী সমাজের দরিদ্রতার একটি করুণচিত্র আঁকেননি! তার চেয়ে সাবলীল আর দুর্দান্তরূপে আর কেইবা পারছে মানুষের জীবন এভাবে আঁকতে?

আপাদমস্তক স্বাপ্নিক এক মানুষের নাম চ্যাপলিন। মানুষের অভাব-অনটন বিষন্ন করতো তাকে। কারণ জন্ম থেকেই অসীম দারিদ্রের মধ্য দিয়ে যেতে হইছে তাকে। জন্মের পর মায়ের সঙ্গে দক্ষিণ লন্ডনের বার্লো স্ট্রিটের একটা বস্তিত বাইড়া ওঠেন তিনি। বস্তির অসংখ্য ছেলে মেয়েই ছিল তাঁর নিত্য দিনের সঙ্গী। খাবার চুরির অপরাধে বহুবার ধরাও পড়ছেন তিনি। তাঁর মা সন্ধ্যার পর একটি থিয়েটারে নৃত্যগীতের মাধ্যমে লন্ডনের খেঁটে খাওয়া মানুষদের বিনোদিত করতেন। সেখান থেকে পাওয়া অর্থ দিয়া টেনেটুনে সংসার চালাতেন কিন্তু তা ছিল চাহিদার তুলনায় খুব সামান্য। তার উপর বেশির ভাগ সময় অসুস্থ হয়ে পইড়া থাকতেন তিনি। মায়ের এই অসুস্থতা একদিন মহা সুযোগ আইনা দেয় চ্যাপলিনরে। মায়ের মঞ্চে একদিন অসংখ্য মানুষের সামনে অভিনব কৌতুক দিয়া মাত্ করে দেন চ্যাপলিন! এবং তা মাত্র পাঁচ বছর বয়সে! সেই শুরু। এরপর আর থামেননি চ্যাপলিন।

নানা সংকটের মধ্য দিয়ে ঠোকর খাইতে খাইতে একদিন ঠিকই নাম কইরা ফেলেন চ্যাপলিন। লন্ডন থেকে পাড়ি দেন সুদূর আমেরিকায়, হলিউডের পথে। যে মানুষগুলো চ্যাপলিনকে দেখলেই সকাল-বিকাল দূর দূর করতো তারাই আপন কইরা নিলো চ্যাপলিনরে। প্রযোজকরাও কড়া মূল্যের বিনিময়ে চাইতে লাগলেন তারে। যে থিয়েটারে সপ্তাহে মাত্র পঞ্চাশ ডলারে কাজ করতেন তারাই সপ্তাহে পাঁচ হাজার ডলার প্রস্তাব দিতে শুরু করলেন। ধীরে ধীরে মহা সেলিব্রিটি হয়া যান চ্যাপলিন। কিন্তু তাই বইলা ইংল্যান্ডের বস্তিজীবনের সংকট আর দৈন্য যাপন ভুইলা যাননি তিনি। আর এই জন্যই তিনি যখন সিনেমায় অভিনয় আর পরিচালনা শুরু করলেন তখন তার সিনেমাতেও তাকে তাঁর বাস্তব চরিত্রেই দেখা গেছে, যে জীবন তিনি লন্ডনের বার্লো স্ট্রিটে যাপন করছেন, স্বচক্ষে দেইখা গেছেন প্রচুর মানুষের মধ্যে; যাকে সভ্য সমাজ ‘এ ডগস লাইফ’ বইলা চিহ্নিত করে।

প্রকৃতপক্ষে, নিজস্ব ক্ষতের ছবিই চ্যাপলিন তাঁর সিনেমাগুলোতে আঁকছেন। জন্মভূমি ইংল্যান্ড ছেড়ে যাওয়ার পর দীর্ঘজীবন বাস করছেন আমেরিকায়। সেখানকার সিনেমাকে দুহাত ভইরা দিছেন তিনি। বিনিময়ে আমেরিকাও তাকে অর্থ,সম্মান আর তুমুল জনপ্রিয়তা দিছে। কিন্তু এতোকিছু দেওয়ার পরেও চ্যাপলিনরে আপন ভাবতে পারে নাই আমেরিকা। কারণ উঠতি ধনতান্ত্রিক আমেরিকা চ্যাপলিনরে কমিউনিস্ট সন্দেহ করতো। তাঁর দর্শনরে নব্য পুঁজিবাদী আমেরিকা ভয়ঙ্কর হুমকিই মনে করছিল। কৌতুকের ছলে চ্যাপলিন যে পৃথিবীর তাবৎ জটিলতা দেখায়ে ফেলতে পারেন তাঁর সিনেমায়, এইটা ভালো ভাবেই জানতো আমেরিকানরা। আর তাই বিশ্বসিনেমার ইতিহাসে অন্যতম স্মরণীয় ছবি ‘দ্য মডার্ন টাইমস’ দেইখা আৎকে উঠছিল পুঁজিপতিরা। শ্রমিক-মালিকের দ্বন্দ, নব্য পুঁজিবাদী অবকাঠামোর গঠন প্রক্রিয়া এবং শোষণ আর নিপীড়নের যে ফাঁদ মালিক শ্রেণি তৈরি করছে তা রঙ্গরসের ভেতর দিয়া চ্যাপলিন যেভাবে তুইলা ধরলেন তাতে ভয়ঙ্কর অস্তিত্ব সংকট অনুভব করলো শোষক শ্রেণি। আঁতে ঘা লাগলো তাদের। চ্যাপলিন দেখালেন পুঁজিবাদী সমাজে শ্রমিক ভেড়া’র সমতূল্য। ফলে চ্যাপলিনকে নানাভাবে হেনস্তার স্বীকার হইতে হলো। শাসক শ্রেণির কাছ থেকে একের পর এক প্রশ্ন তেড়ে আসতে লাগলো যে, চ্যাপলিন কমিউনিস্ট কিনা? বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে অবশ্য এ প্রশ্ন এড়াইছেন তিনি। জানাইছেন, রাজনৈতিকভাবে কোনও দলের বা মতবাদের ওপর দীক্ষিত না তিনি, তবে একজন শিল্পী হিসেবে মানুষের অধিকার নিয়ে বলার অধিকার তাঁর আছে।

একাগ্রচিত্তে সিনেমায় মনোযোগ দিছিলেন চ্যাপলিন। কিন্তু ভেতরে ভেতরে ষড়যন্ত্র চলতে থাকলো। ষড়যন্ত্রের কাছে শেষ পর্যন্ত হেরেও গেলেন তিনি। জন্মভূমির চেয়ে যে দেশকে আপন কইরা নিছিলেন সেই আমেরিকা থেকে কুকুরের মতোই বিতাড়িত হলেন চ্যাপলিন। নাগরিকত্ব তো দেওয়া হইলই না বরং আমেরিকায় প্রবেশ নিষিদ্ধের সমন জারি হইলো। ত্রিশ বছরের বেশি সময় ধইরা যাকে আপন ভূমি ভাবলেন, সেই আমেরিকাই যখন তার সাথে সব সম্পর্ক ছিন্ন কইরা দিলো তখন মুহূর্তেই যেন নামহীন-গোত্রহীন হয়া গেলেন তিনি। সারাজীবন সিনেমার পর্দায় যে উদ্বাস্তু, ভালোবাসার কাঙাল এক ভ্যাগাবন্ডকে দেখাইছেন, যেন বাস্তবে এক মুহূর্তে তেমন ছিন্নমূল এক মানুষে পরিণত হলেন চ্যাপলিন। যেন সত্যিকার অর্থেই ‘এ ডগস লাইফ’-এর গোলক ধাঁধায় মোড়ানো তাঁর জীবনটা।

বার্লো স্ট্রিটের সেই বস্তির ছেলেটির অর্থ সম্পদের অভাব হয়তো আর ছিল না। তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্টের চেয়েও সাতগুণ বেশি আয় ছিল তাঁর। কিন্তু তারপরও অদৃষ্ট তাকে কুকুর-জীবনের বৃত্ত থেকে বের হইতে দেয় নাই। বাকি জীবন প্রিয় আমেরিকায় ফেরা হয় নাই চ্যাপলিনের। আর টিকতে পারেন নাই জন্মভূমি ইংল্যান্ডেও। জীবনের শেষ দিনগুলো ঘর বাঁধেন সুইজারল্যান্ডে, একটা দলছুঁট কুকুরের মতো!

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!

Discover more from

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading