home ই-বুক, কবিতা, ফিচার ৪০টি কবিতা ।। মাসুদ খান

৪০টি কবিতা ।। মাসুদ খান

কুড়িগ্রাম

কোনোদিন আমি যাইনি কুড়িগ্রাম।

 

রাত গভীর হলে আমাদের এই প্রচলিত ভূপৃষ্ঠ থেকে

ঘুমন্ত কুড়িগ্রাম ধীরে ধীরে আলগা হয়ে যায়।

অগ্রাহ্য করে সকল মাধ্যকর্ষণ।

তারপর তার ছোট রাজ্যপাট নিয়ে উড়ে উড়ে

চলে যায় দূর শূন্যলোকে।

 

আমরা তখন দেখি বসে বসে আকাশ কত-না নীল

ছোট গ্রাম আরো ছোট হয়ে যায় আকাশের মুখে তিল।

 

অনেকক্ষণ একা-একা ভাসে নিখিল নভোভারতের রাজ্যে রাজ্যে।

দক্ষিণ আকাশে ওই যে একনিষ্ঠ তারাটি,

একসময় কুড়িগ্রাম তার পাশে গিয়ে চিহ্নিত করে তার অবস্থান।

তখন নতুন এই জ্যোতিষ্কের দেহ থেকে মৃদু-মৃদু লালবাষ্প-ঘ্রাণ ভেসে আসে।

 

সেই দেশে, কুড়িগ্রামে, ওরা মাছরাঙা আর পানকৌড়ি দুই বৈমাত্রেয় ভাই

কুড়িগ্রামের সব নদী শান্ত হয়ে এলে

দুই ভাই নদীবুকে বাসা বাঁধে

স্ত্রীপুত্রকন্যাসহ তারা কলহ করে।

 

নদী শান্ত হয়ে এলে

শাস্ত্রবাক্যে বাঁধা যত গৃহনারী

প্রাচীর ডিঙিয়ে এসে নদীকূলে করে ভিড়

প্রকাণ্ড স্ফটিকের মতো তারা সপ্রতিভ হয়।

 

হঠাৎ বয়নসূত্র ভুলে যাওয়া এক নিঃসঙ্গ বাবুই

ঝড়াহত এক প্রাচীন মাস্তুলে ব’সে

দুলতে দুলতে আসে ওই স্বচ্ছ ইস্পাত-পাতের নদীজলে।

কুড়িগ্রাম, আহা কুড়িগ্রাম!

 

পৃথিবীর যে জায়গাটিতে কুড়িগ্রাম থাকে

এখন সেখানে নিঃস্ব কালো গহ্বর।

 

কোনোদিন আমি যাইনি কুড়িগ্রাম।

আহা, এ-মরজীবন!

কোনোদিন যাওয়া হবে কি কুড়িগ্রাম?

 

ডালিম

যুগের যুগের বহু বিষণ্ণ বিবর্ণ মানুষের দীর্ঘনিঃশ্বাসের সাথে

নির্গত কার্বন-ডাই-অক্সাইড–

তা-ই থেকে তিলতিল কার্বন কুড়িয়ে

জমাট বাঁধিয়ে, কাষ্ঠীভূত হয়ে

তবে ওই সারি-সারি দিব্যোন্মাদ ডালিমের গাছ।

বৃক্ষের যতটা সাধ্য, তারও বাইরে গিয়ে

তবেই-না ওই টানটান বেদানাবৃক্ষ, ব্যাকুল বেদনাকুঞ্জ,

মায়াতরু…রূপাঙ্কুর…রূপসনাতন…

পাতার আড়ালে ফাঁকে-ফাঁকে ফলোদয়

থোকা-থোকা গুপ্ত রক্তকুপিত উত্তপ্ত বিস্ফোরণ

রামধনুরঙে, মগ্নছন্দে

ফলিয়ে ফাটিয়ে তোলে ডালে-ডালে লালাভ ডালিম।

 

বসে আছি ম্রিয়মাণ…বেদনাবৃক্ষের নিচে, পড়ন্ত বেলায়।

সামনে খুলে মেলে-রাখা একটি ডালিমফল, তাতে

প্রভূত বেদানা-দানা, নিবিড় বেদনাকোষ…আর,

বেদানার দানারা তো আর কিছু নয়, জানি–  

টলটলে করুণ চোখে রক্তজমা চাবুক-চাহনি…

 

ভাবি,

এতসব ডালিমকোষের মধ্যে, ঠিক কোন কোষটি রচিত 

আমারই সে ন্যুব্জ ব্যর্থ বিষণ্ণ পিতার বাষ্পঠাসা দীর্ঘশ্বাসের কার্বনে!

ঘনীভূত হয়ে ওই বায়ব অঙ্গার, তিলে-তিলে, অনেক বছর ধ’রে…

 

 

হোমাপাখি

পড়তে থাকা শুরু হলে একবার, জানি না কতটা পতনের পর সূচিত হয় উত্থান আবার-

ভাবছি তা-ই আর মনে পড়ছে সেই হোমাপাখিদের কথা যারা থাকে আকাশের অনেক উঁচুতে। আকাশেই ডিম পাড়ে। পড়তে থাকে সেই ডিম। কিন্তু এত উঁচু যে পড়তে থাকে দিনের পর দিন। পড়তে পড়তেই ডিম ফুটে বাচ্চা হয়। তখন বাচ্চা পড়তে থাকে। পড়তে পড়তেই বাচ্চার চোখ ফোটে, ডানা হয়, পালক গজায়। একদিন দেখতে পায় সে পড়ে যাচ্ছে। অমনি চোঁ করে উড়ে যায় মায়ের দিকে। উঠে যায় অনেক উঁচুতে। এত উঁচুতে যে পাখিরা আকাশের গায়ে ইতস্তত ভাসমান তিলচিহ্ন হয়ে ফুটে থাকে।

ওই পক্ষিকুলে জন্ম পুনর্জন্ম আমাদের, ওই পক্ষিকুলেই পালন-পোষণ-পতন-উত্থান-উড্ডয়ন…

 

কৌতুকবিলাস

ঈশ্বর ছুড়েছে ঢিল ঈশ্বরীর দিকে, কৌতুকবিলাসে।

 

গ্রহটিকে মাটির ঢেলা বানিয়ে ব্রহ্মাণ্ডের এক প্রান্ত থেকে

ক্ষেপণ করেছে ভগবান, অন্য প্রান্তে থাকা ভগবতীর প্রতি।

 

মহাকাশ জুড়ে প্রসারিত মহাহিম শূন্যতা, লক্ষ-ডিগ্রি নিস্তব্ধতা–

তারই মধ্য দিয়ে একপিণ্ড ছোট্ট শ্যামল কোলাহল হয়ে

ধেয়ে যাচ্ছে এই ঢিল।

 

ঢিল নয়, মহামিসাইল–

মহাকাশের জোনাক-জ্বলা ঝোপঝাড়ের ভেতর দিয়ে

একের পর এক যমজাঙাল পেরিয়ে মিথ্যা-ইথারে অস্থির

ঢেউ তুলে ছুটছে ঢিল অযথা আহ্লাদে

গোঁয়ার ক্ষেপণাস্ত্রের মতো একদিকে টাল হয়ে চক্কর খেতে খেতে

ঘোর-লাগা লাটিমঘূর্ণনে

আহ্নিকে বার্ষিকে ধোঁয়াজটিল বেগব্যঞ্জনায়–  

যে বেগ উদ্ভ্রান্ত, যেই গতি একইসঙ্গে ঋজুরেখ বক্র চক্রাকার

ঘূর্ণ্যমান নাটকীয় একরোখা দুর্ধর্ষ ও ওলটপালট…

 

ছুটতে ছুটতে হয়রান ঢিলখানি।

ওদিকে ঈশ্বরী, ওই রাঘবরহস্যে-ঘেরা উত্তুঙ্গ রহস্যরাজ্ঞী,

সর্বনাশা এক ভাব-আলেয়ার ভাব ধ’রে অজ্ঞাত স্থানকালাঙ্কে ব’সে 

থেকে-থেকে ছিনালি-হাতছানি একটু দিয়েই সরে যাচ্ছে দূরে।

 

মুহূর্তে মুহূর্তে ফুলে-ফেঁপে ওঠে মহাকাশ।

বেঁকে-যাওয়া, বাঁকতে-থাকা, ক্রমপ্রসারিত

এক দেশকালের ভেতর দিয়ে ঘটতে থাকে

ঢেলাটির উদ্ভ্রান্ত উন্মাদ ছুটে-চলা। আর

ছিটকে পড়ার ভয়ে ভয়ার্ত শিশুর মতো ছুটন্ত ঢেলার গা আঁকড়ে ধ’রে

চাম-উকুনের মতো চিমসা দিয়ে পড়ে থাকে প্রাণপণ

তটস্থ ও অসহায় প্রাণিকুল।

 

খেলা করে ভগবান ভগবতী– বিপদজনক ঢিল-ক্ষেপণের খেলা।

আর রোমাঞ্চে ও ত্রাসে শিউরে-শিউরে কেঁপে ওঠে তাদের শিশুরা।

 

 

জ্বরের ঋতুতে

তখন আমাদের ঋতুবদলের দিন। খোলসত্যাগের কাল। সুস্পষ্ট কোনো সর্বনাশের ভেতর ঢুকে পড়তে চেয়েছিলাম আমরা দুজন। তার আগেই তোমার জ্বর এল। ধস-নামানো জ্বর। তুমি থার্মোমিটারের পারদস্তম্ভ খিমচে ধরে ধরে উঠে যাচ্ছ সরসর করে একশো পাঁচ ছয় সাত আট…ডিগ্রির পর ডিগ্রি পেরিয়ে…সর্বোচ্চ ডিগ্রিধারী তাপের সহগ হয়ে উতরে উঠছ তরতরিয়ে সেইখানে, যেখানে আর কোনো ডিগ্রি নাই, তাপাঙ্ক নাই…তাপের চূড়ান্ত লাস্যমাত্রায় উঠে ঠাস করে ফারেনহাইট ফাটিয়ে বেরিয়ে আসছে থার্মোমিটারের ফুটন্তঘন তরল আগুন…

তীব্র, ধসনামানো জ্বরেও নারীরা ধসে না। হয়তো কিছুটা কদাকার দেখায়, এবং কিছুটা করালীর মতো। যত রূপসী তত করালিনী, জ্বরে…

একসময় মাথা-ফেটে-যাওয়া থার্মোমিটারকে ব্রুমস্টিক বানিয়ে তাতে চড়ে উধাও উড়ালে অস্পষ্ট অঘটনের দিকে হারিয়ে যাচ্ছ হে তুমি, প্রিয়তরা পিশাচী আমার।

জীবনে প্রথম মুখোমুখি এরকম সরাসরি স্পষ্ট বিপর্যাস…

মিটারের জ্বালাখোঁড়ল থেকে ঝরছে তখনো টগবগ-করে-ফোটা ফোঁটা-ফোঁটা লাভানির্যাস।

 

 

দমকল

উন্মাদ উঠেছে গাছে, তরতর করে, ছাড়া পেয়ে পাগলাগারদ।

 

নামে না সে কিছুতেই, যতক্ষণ-না ওই বেঁটেখাটো নার্সটি এসে

মিনতি করে না-নামায় তাকে।

 

নার্স আসে দ্রুত, দমকলের মতন

কী-কী যেন বলে হাত নেড়ে নেড়ে,

তাতে খুশি হয়ে নেমে আসে উঁচু ডাল থেকে বিমুগ্ধ পাগল–  

ঝোলের উল্লাসে নেমে আসে যেইভাবে কইমাছ পাতে

কানকো টেনে টেনে  

ক্রমিক সংখ্যার মতো সহজ স্বাচ্ছন্দ্যে।

 

ঝিলমিল করে বয়ে যায়, সেবিকার বোধে, পাগলের বিকল বিবেক।

 

উন্মাদ আবার ফিরে যাবে আজ উন্মাদ-আশ্রমে

ধর্মগণ্ডিকায় মাথা রেখে নির্বিকার নিয়ে নেবে

তেরোটি ইলেকট্রিক শক

তেরোবার স্বীকারোক্তি, স্বাস্থ্যযাজকের শান্ত সুধীর নির্দেশে।

 

 

ব্লিজার্ড

আকাশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত দাপিয়ে ফিরে

সমগ্র নীলিমা তছনছ করে দিয়ে

কোটি-কোটি দুষ্ট দাপুটে শিশু খেলছে হুলুস্থুল বালিশ ছোঁড়ার খেলা।

 

অজস্র কার্পাস ঝরছে

লক্ষকোটি বালিশফাটানো তোলপাড়-করা অফুরন্ত তুলা।

যেন তুলারাশির জবুথবু জাতক হয়ে পড়ে আছে ধীরা ধরিত্রী, বিব্রত বেসামাল। 

সাথে উল্টাপাল্টা ঝাড়ি একটানা বেপরোয়া বাবুরাম পাগলা পবনের।

আবার কোত্থেকে এক নির্দন্ত পাগলিনীর আকাশ-চিরে-ফেলা ওলটপালট অট্টহাসি

মুহুর্মুহু অট্টালিকায় প্রতিহত হয়ে ছুটছে দিশাহারা দিগবিদিক

ঘরবাড়ি মিনার-ময়দান বাহন-বিপণী আড়ত-ইমারত গাছপালা বন বন্দর বিমান

সবকিছুর ওপর এলোপাথাড়ি থার্ড ডিগ্রি চালিয়ে বের করে আনছে

তুলকালাম গোপন তথ্য, তুলাজটিল শীৎকার।

 

 

প্রলাপবচন

নদ এসে উপগত হবে ফের নদীর ওপর

দুই পারে জমে উঠবে কপট কাদার ঘুটঘুটে কেলেংকারি

মাঝখানে চোরাঘূর্ণি চোরাস্রোত  

এলোমেলো এলোমেলো বাউরি ভাবনা এসে

পাক খেয়ে ঢুকে পড়বে বৃষ থেকে মিথুনের অধিক্ষেত্রে।

 

মাকাল ফলের মৃদু মনস্তাপ

করলা-লতার শ্যামলা আক্ষেপ

কোকিলস্য প্রবঞ্চনা, কাকের বাসায় উপঢৌকন

ভরা বিলের ওপর দিয়ে ভেসে আসা ভেজা-ভেজা সুর

হুদহুদ পাখির অস্থিরতা, অসমাপিকার লঘু তঞ্চকতা

ঘাড়-ত্যাড়া অশ্বের অস্মিতা, উগ্রবসনা আগুনের চঞ্চল রসনা…

আলগোছে সবকিছু পাশ কেটে গিয়ে

ওইদিকে বর থাকবে কনের বশে

খলনায়কের দাঁতের নিচে পড়বে কট্টরপন্থী কাঁকর

চার্জ করা হবে পশ্চিমের ব্লাস্ট ফার্নেসে

আর ঝাপটা এসে লাগবে পূর্বেরটা থেকে

খামাখা দিওয়ানা হবে রঙিলা বিড়ালিনী

ঘনঘন গণ-হাইপ উঠবে মামুলি ঘটনা ঘিরে এমনি-এমনি

হিস্টিরিয়ায় কাঁপতে থাকবে দেশকাল 

সাত সাধু এক হবে, এক শয়তান সাত

দোষযুক্ত আলু নামবে হিমাগারের শ্রোণিচক্র থেকে…

 

এবং হয়তো আমি একদিন ঠিকই

পড়ো-পড়ো ঘরকে যোগাতে পারব

গাঁট-অলা তিন-বাঁকা শালকাঠের সমর্থন

নিশ্চিহ্নকে দেখাতে পারব কিছু লুপ্তপ্রায় চিহ্নের ইশারা

বিশেষকে কোনো ভ্রান্তিকর নির্বিশেষের আভাস

বেদিশাকে দিশার বিভ্রম…

 

আর দুম করে লিখে ফেলব এমন এক কবিতা একদিন,

যা পড়ে ভৌতিক সুর তুলবে একসঙ্গে সাধু ও শয়তান

সাপ-আর-অভিশাপে-গড়া মতানৈক্যে-ভরা গামারিকাঠের গিটারে

আর ‘চলে আয়’ বলে খোদ খোদাতালা টুইট পাঠাবেন দিব্য টুইটারে।  

 

 

নির্বাসন

অ্যালুমিনিয়াম ফয়েলে আকাশ ঢাকা

গায়ে তার জ্বলে কোটি-কোটি প্ল্যাংক্টন

তারই মাঝে একা একটি শ্যামলা মেঘে

সহসা তোমার মুখের উদ্ভাসন।

 

হয়তো এখন আকাশ নামছে ঝেঁপে

মেঘ ও মেঘনার ছেদরেখা বরাবরে

ঝাপসা একটি মানুষীর ছায়ারূপ

ঝিলিক দিয়েই মিলাচ্ছে অগোচরে।

 

দূর গ্রহে বসে ভাবছি তোমার কথা

এতটা দূরে যে, ভাবাও যায় না ভালো

ভাবনারা হিম-নিঃসীম ভ্যাকুয়ামে

শোধনে-শোষণে হয়ে যায় অগোছালো।

 

অথচ এখানে তোমারই শাসন চালু

তোমার নামেই বায়ু হয়ে আমি বই

তোমারই আবেশে বিদ্যুৎ জাগে মেঘে

তোমার রূপেই ময়ূর ফুটেছে ওই।

 

মধুকর আজ ভুলে গিয়ে মাধুকরী

রূপ জপে তব কায়মনোগুঞ্জনে।

মনন করছে তোমারই বিম্বখানি

ধ্যানে ও শীলনে, স্মরণে, বিস্মরণে।

 

গন্ধকের এই গন্ধধারিণী গ্রহে

তটস্থ এক বিকল জীবের মনে

ক্ষার, নুন, চুন, অ্যাসিড-বাষ্প ফুঁড়ে

চমকিয়ে যাও থেকে-থেকে, ক্ষণে-ক্ষণে।  

 

 

একজন বর্ণদাসী ও একজন বিপিনবিহারী সমাচার

বনের কিনারে বাস, এক ছিল রূপবর্ণদাসী

আর ছিল, বনে বনে একা ঘোরে, সেই এক বিপিনবিহারী।

কন্যা তো সে নয় যেন বন্য মোম, নিশাদল-মাখা, বন্য আলোর বিদ্রুপ

রাতে মধ্যসমুদ্রে আগুন-লাগা জাহাজের রূপ

অঙ্গে অঙ্গে জ্বলে–

দূর থেকে তা-ই দেখে কত রঙ্গে, কতরূপ ছলে ও কৌশলে

বেহুঁশ হয়ে যে যায়-যায়-প্রায় কত যে বামন গিরিধারী

আর যত অন্য-অন্য অর্বাচীন বিপিনবিহারী।

 

কন্যা তো সে নয়, বুনো সুর, বুনো তান, আর উপমান, অরণ্যশোভার।

আঁচলে কূজন আঁকা তার, আমাদের সেই বহুবল্লভার।

 

বনের কিনারে বাস, ছিল এক রূপবর্ণদাসী

আর ছিল বনে বনে একা ঘোরে সেই এক বিপিনবিহারী।

অসবর্ণ তারা, অসমান, অসবংশের জাতক

একসঙ্গে তবু দোঁহে একই বুনো বাদলে স্নাতক।

তবু সেতু গড়ে ওঠে সন্ধ্যাকালে দূর দুই তটে

সেতু, দেহকথনের গোধূলিভাষ্যে তা ফুটে ওঠে।

 

 

ছক

দশটি পথ এসে যেখানটায় কাটাকাটি হয়ে চলে গেছে দশ দিগন্তের দিকে, সেইখানটায় গিয়ে বসে থাকেন আমার মা। পথের ধারে বসে মা আমার মানুষ দ্যাখেন, মানুষের আসা-যাওয়া দ্যাখেন। কোনো পথ দিয়ে আসে হারিয়ে যাওয়া মানুষেরা। কোনো পথ দিয়ে আসে গ্রহণ-লাগা, ক্ষয়ে-যাওয়া, নিভু-নিভু সব বনি-আদমের দল। আবার মেঘ ও মিথুন রাশির ছায়ায় তুমুলভাবে বাঁচতে থাকা মানব-মানবীদের যাতায়াত কোনো কোনো পথে।

একদিন আসা-যাওয়ার পথের ধারে মা কুড়িয়ে পেলেন আমার ভাইকে (আমি তখনো আসিনি আমার এই মায়ের কাছে)। কিন্তু কিছুকাল পর আমার সেই ভাই হঠাৎ গেল হারিয়ে। তারপর থেকে মা আমার ওই পথমোহনায় বসে তীব্র পুত্রশোকে লুকিয়ে লুকিয়ে কাঁদেন।

একবার, গোধূলিরঙের লম্বা-লম্বা চুলদাড়িঅলা এক বুড়ো পথিক ক্ষণিকের জন্যে থামালেন তার পথচলা। মা-র কাছে সব শুনে বললেন, ‘কোথাও তো কিছু হারায় না মা এই মহাবিশ্বে! যাও খুঁজে দ্যাখো।’ তারপর থেকে মা আমার উড়ে উড়ে বিশ্বসংসার তোলপাড় করে খুঁজে ফিরেছেন তার সন্তানকে। শেষে সপ্ত-আকাশের পরপারে আমাকে কুড়িয়ে পেয়ে, এবং তার সন্তানকেই পেয়েছেন মনে করে, উড়িয়ে নিয়ে এলেন এই মর্ত্যের  ধুলায়। আমি তখন সাত আসমানের ওপারে অনন্ত নক্ষত্রকুঞ্জের ঝাড়জঙ্গলের ধারে সোনালি খড়ের গাদায় বসে অনাথ শিশুর মতো কাঁদছিলাম একা একা, মাকে হারিয়ে।

দিন যাবে, মাস যাবে, ঘুরে আসবে বছর…

একদিন হয়তো আবার হারিয়ে যাব আমি এই নতুন পাওয়া মায়ের কাছ থেকে আর আমাকে খুঁজে পাবেন অন্য এক মা। তারও হারিয়েছে সন্তান। আমাকে পেয়ে ভাববেন, খুঁজে পেয়েছেন তারই হারানো ছেলেকে।

 

এইসব অনন্ত বিভ্রম আর বন্ধন

এই যে নিখিল ভুলবোঝাবুঝি

লুকিয়ে লুকিয়ে কাঁদা আর হারানো-পাওয়া খেলা

এইসব নিরন্তর মায়া ও ম্যাজিক…

সবকিছু অমীমাংসিত রেখে দিয়ে,

 

কাটাকুটি ময়লা ডুপ্লিকেট নকশা একখানা জগৎসংসারের,

তা-ই মেলে ধরে অবাক উদাস হয়ে বসে আছেন জরিপকর্তা।

 

নকশাটাতে একপাশে লেখা– স্বাক্ষর/- অস্পষ্ট

নিচে তার চেয়েও অস্পষ্ট একটা সিল… 

 

 

শৈবালিনী

স্রোতে শুধু ভেসে চলো তুমি ওগো শৈবালিনী, শৈবালিকা, জলজা আমার

তুমি, তুমি ধর্মে মৎস্য, জাতিতে শৈবাল, আর স্বভাবে যে সৌদামিনী তুমি…

 

তুমি ঊর্মি-রাশির জাতিকা

ঊর্মিসঙ্গে ভেসে চলাতেই হয় তব ধর্ম, আনন্দ তোমার।

 

তুমি মাছ হয়ে যাবে, নাকি

হবে কোনো জলজ উদ্ভিদ–

এতকাল পর এই দ্বিধা আজ, শৈবালিনী, জাগছে তোমাতে

মুহুর্মুহু বিজলিবিলাসে।

 

ফোটে ফুল, আস্তে আস্তে, ফোটে তার বিবিধ ব্যঞ্জনা

আবার হারিয়ে যায় জলে সেই ফুল, সেই জলজ রচনা

জল থেকে জলান্তরে…বহু নাম জাগে পথে পথে,

সর্ব নাম ফের বদলে বদলে যায় স্রোতে।

 

বহুলনামিনী তুমি বহুলচারিণী বহু-আকারিণী জলজা আমার

তুমি, তুমি ধর্মে মৎস্য, জাতিতে শৈবাল,

স্বভাবে বিদ্যুৎ-লতা তুমি…

 

তুমি ঊর্মি রাশির জাতিকা, ঊর্মিসঙ্গে ভেসে চলাতেই হয় তব ধর্ম ও সাধনা

তোমাতে ক্ষণেই জাগে মাছের স্বভাব, ক্ষণেই তো ফের শিকড়বাসনা…

 

 

ইতিহাস

কী করে সম্ভব তবে পৃথিবীর সঠিক ইতিহাস? কারণ, যিনি লিখেছেন, তিনি কে এবং কোথায়? কোন্ সময়ে, কোন্ অবস্থানে দাঁড়িয়ে কী উদ্দেশ্যে লিখছেন, সে-সবের ওপর নির্ভর তার ইতিহাস। আর তা ছাড়া বিষয়টি বিষয়ীগত। সাবজেকটিভ।

তবে কি সত্যিই অসম্ভব সঠিক ইতিহাস?

—না। ভূমণ্ডল হতে এ যাবৎ যত আলো বিকীর্ণ হয়ে চলে গেছে সে-সবের মধ্যেই মুদ্রিত হয়ে আছে পৃথিবীর ইতিহাস, কালানুক্রমিক। অর্থাৎ পৃথিবী হতে বিচ্ছুরিত আলোর ইতিহাসই পৃথিবীর ইতিহাস। আর তা-ই হচ্ছে প্রকৃত ইতিহাস, কেননা তা লিখিত প্রাকৃতিকভাবে। এই নিখিল নভোভারতের রাজ্যে রাজ্যে বসে দুরবিন দিয়ে সেগুলো টুকে নিচ্ছে হয়তো কেউ কেউ— আমরা জানি না।

তবে সে-ও কি হবে সঠিক ইতিহাস? কেননা, ইতিহাসের সেই সব অধ্যায়, যেগুলো কালো এবং অন্ধকার? সব আলো শুষে নিয়ে নিয়ে যেগুলো কালো ও কলঙ্কিত হয়ে পড়ে আছে? যেগুলো থেকে কোনোকালেই আর বের হয়নি এবং হচ্ছে না কোনো আলো? সেইসব?

তা ছাড়া সেই সব মানুষদের ইতিহাস, যারা কালো এবং কালচে তামাটে?

—হয়তো-বা দুরবিনে ঝাপসা হয়ে ধরা পড়ছে তাদের ইতিবৃত্ত, ঝাপসা মুদ্রিত হচ্ছে তাদের ইতিহাস— যেহেতু তারা যথাক্রমে কৃষ্ণ এবং ঊনকৃষ্ণ, যেহেতু তারা খুবই সামান্য আলো দিতে পারে বলে পৃথিবীতে প্রচারিত, বিচ্ছুরণে তারা প্রায় অক্ষম বলে প্রচারিত।

তাহলে কি কালো ও তামাটে মানুষদের ইতিহাস নিরন্তর ঝাপসাই থেকে যায়!? পৃথিবীতে!? এবং প্রকৃতিতে!?

আলো নেই, তাই ইতিহাসও নেই?!

 

 

বীতকৃত্য

যেদিন গাছেরা ত্যাগ করবে তাদের বৃক্ষধর্ম

মিষ্ট নয়, ফল হবে কটু বা কষায়

আর সোজা না ফেলে সে ফল ফেলবে তির্যক ভঙ্গিতে

যেদিন আমের গাছে জাম হবে, এবং তামার গাছে সিসা…

 

দস্যুকে তো শীলাচারী হলে চলে না

তবুও যেদিন সে ডাকাতি ছেড়ে দিয়ে

হয়ে উঠবে সুশীল, পাদ্রি ও পরার্থপর

বকেরা যেদিন মশগুল হবে মাছেদের মঙ্গলচিন্তায়

সাপেরা অহিংস হবে, হরিণেরা তাড়িয়ে বেড়াবে সিংহদের…

 

যেদিন আয়না পরিত্যাগ করবে তার আর্শিধর্ম

দেবে না তো আর কোনো প্রতিবিম্ব

পাহাড় দেবে না প্রতিধ্বনি…

 

আর যত শীল ও দুঃশীল গতি অগতি কুশল অকুশল

আর যত অভিজ্ঞা ও সমাপত্তি, বারো রকমের বন্ধনযাতনা

সংসার সন্ন্যাস মোক্ষ মোহ কাম কৃত্য ঘাম মূত্র

ঔরস ও ধর্মাধর্ম পুরীষ পৌরুষ

সব একাকার হবে যেইদিন

সেদিন কোথায় কোন দূরে নিয়ে যাবে গো আমায়

ধর্মহারা বীতকৃত্য সূত্রহীন পুরীষবিহীন…

 

 

বৃষ্টি-১

এখন বিদেশে বৃষ্টি হচ্ছে, অতিদূর আর নিকট-বিদেশ।

ঠাণ্ডা হাওয়া এসে লাগে থেকে থেকে অপর দেশের।

এ গ্রীষ্মসন্ধ্যায় আহা এমন বিষাদ আর রূপের অনুশীলন আজ

বিদেশি আকাশে!

 

কী যে ঠাণ্ডা হাওয়া বয়ে যায়

আর

পরধর্মে সাধ জাগে ধীরে ধীরে এমনই সন্ধ্যায়।

 

দূরে রূপশাসিত নদীর কিনারায়

বিদেশ অপূর্ব বৃষ্টিময়

মুহুর্মুহু বিজলিপ্রতিভায়।

আর

পররূপে কাতরতা জাগে মৃদু-মৃদু 

এমনই সন্ধ্যায়।

 

তাজা হাওয়া বয়

খুঁজিয়া দেশের ভুঁই,

ও মোর বিদেশি জাদু

                কোথায় রহিলি তুই ॥

 

 

বৃষ্টি-২

বৃষ্টি হচ্ছে

বিদেশে

আরো কত-কত আবছা ব্রহ্মদেশে, রঙ্গপুরে,

ব্যাপিত বগুড়াবর্ষে,

অনেক নিম্নের দেশে, ম্লেচ্ছাবর্তে,

বৃষ্টিতে বৃষ্টিতে ঝাপসা হয়ে আসা

বিকেলের ব্রহ্মদেশে,

বৃষ্টি হচ্ছে।

 

এবং একটানা এই বিজলিশাসনের নিচে

এই বৃষ্টিনির্ধারিত তৃতীয় প্রহরে

দেশে দেশে কত রাঙা ও রঙিন জাতি

অস্পষ্ট গঠন নিয়ে ফুটে উঠছে উৎফুল্ল ভেকের মতো

অজানা উৎক্ষেপে।

 

বৃষ্টি আর বিদ্যুতের এই সহিংস প্ররোচনাক্রমে

চূড়ান্ত প্রশ্রয়ে

প্রলোভনে

বৃষ্টির প্রবল ঘোর আর

ঘূর্ণির ভেতর

বাতাসের অন্ধকারে

পূর্বাঞ্চলে

আকাশের নিচে

একাংশে, বিশাল ফাঁকা মাঠে

বিস্তারিত কচুখামারের আড়ালে আড়ালে

প্রায় অবিশ্বাস্যভাবে জায়মান নতুন-নতুন সব রাষ্ট্র।

 

ডানাভাঙা উত্থানরহিত কত ক্ষুদ্র-ক্ষুদ্র রাষ্ট্র

তাদের ময়লা মানচিত্র

এবং অস্থির কাঁপা-কাঁপা ক্ষেত্রফল

অশোধিত আইন এবং সব অসহায় খর্বকায় ন্যায়পাল

এবং অপরিষ্কার কিছু কুচকাওয়াজসমেত জেগে উঠছে শুধুই

শুধু যমনির্দিষ্ট নিয়তি নিয়ে।

 

এইবার রাত্রি সমাপ্তির দিকে প্রবাহিত। এখন বৃষ্টিও নিভুনিভু-প্রায়।

ওইসব কথিত উল্লাসশীল জাতি আর বিকাশচঞ্চল রাষ্ট্র আর

তাদের শরীরে

গ্রন্থিতে গ্রন্থিতে স্ফুটমান আর সদ্যফোটা কত-না বর্ণাঢ্য ধর্মরাজি

সবসহ অচিরে মিলিয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে

ভোরের আলোয়। বিস্তারিত কচুপ্রান্তরের আড়ালে আড়ালে।

 

 

সেতু

কোন-বা জাতির জাতক তুমি

কোন-বা প্রাণের প্রাণী

আঁধারতমা আলোকরূপে

তোমায় আমি জানি।

 

কোন-বা জলের জলজ আহা

কোন ঝরনায় বাস,

কোন অম্লজানের হাওয়ায়

নিচ্ছ তুমি শ্বাস?

 

কোন ঘটনার অনুঘটক

কোন জারণের জারক,

কোন উল্কার গতি তুমি

কোন কৃত্যের কারক?

 

ভাব-উচাটন পুরুষ হলে

প্রকৃতিস্থ হও।

কিংবা যদি হও প্রকৃতি,

পুরুষরত রও।

 

কোন ধর্মের ধর্মী ওহে

কোন-বা রূপের রূপী,

রূপ থেকে রূপ-রূপান্তরে

ফিরছ চুপিচুপি।

 

জন্মান্তর ঘুরে আসি

তোমায় দেখার ছলে,

কোন রূপে ফের আকার পেলে?

কোন মন্ত্রবলে?

 

কোন মেঘেদের বিজলি তুমি

কোন-সে কুলের কেতু,

কেমন করে তুলব গড়ে

যোগাযোগের সেতু?

 

 

প্রত্যাখ্যান

হঠাৎ মায়ের স্তন্য থেকে, আজই, উৎখাত হয়েছে শিশু

ঘুরে ফিরে বারে বারে যায় তবু মায়ের নিকট

বকা খায়, কিছুটা অবাক হয়, তবু শিশু যায়…

 

অবুঝ কী আর বোঝে কী-বা অর্থ হয় এই উৎখাতলীলার!

কী-বা এর বিন্দু- ও বিসর্গ-ভাব

কিছুই পারে না বুঝতে মায়ের স্বভাব

শুধু ভাবে– মায়ের কৌতুক তবে এতটা নিষ্ঠুর!

মাতা কেন হয় আজ এতটা বিমাতা

এই খরাঋতুতে হঠাৎ?

 

ভেবে একা কষ্ট পায়, নিঃসহায়, ফের তবু যায়

শিশু ফের বকা খায়, আবার অবাক হয়, তবুও সে যায়…

 

কেঁদে কেঁদে অবশেষে বোবা অভিমানে

অবশ ঘুমিয়ে পড়ে মাটির শয়ানে।

 

শুধু তার পিপাসার ধ্বনি এসে লাগে কানে

থেকে থেকে, এই মহিমণ্ডলের এখানে ওখানে।

 

নামহারা, বাক্ ও বাক্যহারা…

মেঘের ডাকের মধ্যে গচ্ছিত আছে জগতের সমস্ত ধ্বনি, জমাট হয়ে, এক জটিল প্রকারে। ওই যে মেঘ ডাকছে আর মনোযোগ দিয়ে তুমি শুনছ, মনে হচ্ছে না কি, একসঙ্গে ধ্বনিত নিখিলের সমস্ত স্বর ও ব্যঞ্জন? ঘোষ?  অঘোষ? এবং নির্ঘোষ?

একদিন ওই মেঘই মেদিনীর বুকে ছিটিয়ে দিয়েছিল ধ্বনির বীজ। আজও মেঘ থেকে ঝরে রকমারি ধ্বনির পরাগ– ঝরে বিজলির সঙ্গে ব্যঞ্জন, বৃষ্টি ও বাতাসের সঙ্গে স্বর।

অতঃপর ওই বীজ অঙ্কুরিত হলো ঝড়ের নিস্বনে, ঝরনার কলস্বরে, শঙ্খের নিনাদে, ঢেউয়ের চ্ছলচ্ছলে…। ফিনকে উঠে ছড়িয়ে গেল ধ্বনির ফুলকি সবখানে– কেকায় কুহুতে, কূজনে গুঞ্জনে, হ্রেষায় বৃংহণে…

এই যে আজ পাখি ডাকছে আবার এতকাল পর, তার ওই কূজনের মধ্যেও জটপাকানো বিশ্বের সমস্ত স্বর ও ব্যঞ্জন। পাখির কূজন আর পতঙ্গগুঞ্জন– সে-এক আশ্চর্য ধ্বনিপ্রপঞ্চ যার মধ্য থেকে শনাক্ত করা অসম্ভব একক কোনো ধ্বনি। সব ধ্বনি যেন এসে মিলেমিশে টালমাটাল একাকার।

স্মরণে আনো একবার সেই দূর-দূরতর দিনের স্মৃতি (অতীত দিনের স্মৃতি, কেউ ভোলে না কেউ ভোলে), যখন কোথাও ফোটেনি কোনো ভাষা, কেননা ধ্বনিই তখন ফোটা-অফোটার দোলাচলে…। অসহ্য সুন্দর সেই ভাষাহীন নিঃশব্দ নির্বাক্ অথচ কী অপূর্ব আধো-আধো ধ্বনিগন্ধময় জগৎ! সমস্ত বস্তু বৃক্ষ প্রাণী, সমস্ত ক্রিয়া প্রবাহ ঘটনা, সবকিছুই কী বিশুদ্ধ কুমার-কুমারী! নামের কোনো দূষণ, প্রতীকের কোনো কেলেঙ্কারি তখনো ছোঁয়নি তাদের।

মনে কি পড়ছে তোমার, সেই নামপূর্ব ভাষাপূর্ব অবাক্ অমলিন অকলঙ্ক নিসর্গের ভেতর দিয়ে, খুলে রেখে আমাদের নামের খোলস, কালাকালহীন তুমি-আমি হেঁটে চলেছি সমান্তরাল– নামহারা, বাক্ ও বাক্যহারা, ভাষাহীন, বাকলবিহীন…

 

দীক্ষা

পথ চলতে আলো লাগে। আমি অন্ধ, আমার লাগে না কিছু।

 

আমি বাঁশপাতার লণ্ঠন হালকা দোলাতে দোলাতে চলে যাব চীনে, জেনমঠে

কিংবা চীন-চীনান্ত পেরিয়ে আরো দূরের ভূগোলে…

ফুলে-ফুলে উথলে-ওঠা স্নিগ্ধ চেরিগাছের তলায় বসে মৌমাছির গুঞ্জন শুনব

নিষ্ঠ শ্রাবকের মতো, দেশনার ফাঁকে ফাঁকে।

মন পড়ে রইবে দূরদেশে। সাধুর বেতের বাড়ি পড়বে পিঠে,

দাগ ফুটবে সোনালু ফুলের মঞ্জরীর মতো শুদ্ধ সালঙ্কার… 

 

দীক্ষা নেব বটে মিতকথনের, কিন্তু

দিনে-দিনে হয়ে উঠব অমিতকথক,

নিরক্ষর হবার সাধনা করতে গিয়ে আমি হয়ে উঠব অক্ষরবহুল

এই হাসাহাসিভরা ভুঁড়িটি ভাসিয়ে গল্প বলে যাব

কখনো প্রেমের ফের কখনো ভাবের…

অথবা ধ্যানের, কিংবা নিবিড়-নিশীথে-ফোটা সুগভীরগন্ধা কোনো কামিনীফুলের

 

ঝিরিঝিরি বৃষ্টি ঝরবে মঠের মেঘলা আঙিনায়

ওদিকে অদূরে লালে-লাল-হয়ে-থাকা মাঠে পুড়তে থাকবে ঝাঁজালো মরিচ

সেই তথ্য এসে লাগবে ত্বকে ও ঝিল্লিতে।

আমি সেই মরিচ-পোড়ার গল্প বলব যখন–  

উত্তেজিত হয়ে তেড়ে গিয়ে যুদ্ধে যাবে এমনকি বৃদ্ধরাও।

যখন প্রেমের গল্প– কমলায় রং ধরতে শুরু করবে সোনাঝরা নরম আলোয়।

আবার যখন গাইব সে-গন্ধকাহিনি, সেই ভেজা-ভেজা রাতজাগা কামিনীফুলের–  

ঘ্রাণের উষ্ণতা লেগে গলতে থাকবে মধুফল দেহের ভেতর।

 

মৌসুম

গাছগাছালিরা আবার প্রকাশ করবে পত্রপত্রিকা।

কীটাক্ষরে ছাপা হবে তাতে কথা ও কথিকা, কবিতাও…

মহোৎসব লেগে যাবে বানানভুলের, কাটাকুটি,

নিরক্ষর পাতায় পাতায়।

 

“আমার লাইন হয়ে যায় আঁকাবাঁকা, ভালো না হাতের লেখা…”

গাইতে গাইতে এই তো এখনই ছুটে যাচ্ছে কাঠবিড়ালির শিশুকন্যা।

তার ফোকলা দাঁতের খিলখিল হাসির হিল্লোলে

আগাম চেয়ার উল্টে পড়ে যাচ্ছে ওই

দ্যাখো সাপ্তাহিক কলাকাণ্ডের ঘোড়েল সম্পাদক।

রসিক পাঁকের মধ্যে খাবি খাচ্ছে সম্পাদনা, মৌসুমি আহ্লাদে।

 

অপরের ভাব ভাষা চুরি করে পাইকারি চালান দিতে গিয়ে

ধরা খেয়ে জব্দ বসে আছে বর্ণচোরা দুই চতুর চড়–ই।

শরমে স্থগিত করে দিচ্ছে পত্রপ্রকাশনা আপাতত

কতশত ধোঁকা-খাওয়া মাটি-ঝোঁকা রাংচিতা-ঝোপ,

আলাভোলা আশশ্যাওড়ার ঝাড়।

 

আর ক-টা দিন পর

উড়াল কটাক্ষ ছুড়তে ছুড়তে গাছ থেকে গাছে

উড়ে যাবে উড়–ক্কু শেয়াল, গিরগিটি বহুরূপী… 

আর প্রকাশিত পত্রপত্রিকা ছিঁড়ে ছিঁড়ে খাবে বলে

দুড়দাড় গাছে উঠে পড়বে

আরোহসক্ষম বেশ কিছু বন্য বেল্লিক ছাগল।

 

তারা খুদে পত্রগুলি খাবে আগে।

 

গভীর রাতে মানুষের একাকী কান্নার মতো…

যে-আঁধার সন্ধ্যাবেলা থাকে বায়বীয়,

রাত্রিতে তরল হয়ে আসে তা-ই।

আরো পরে ধীরে ধীরে জমাট কঠিন।

 

রাতের তৃতীয় যামে মানুষের একাকী কান্নার মতো,

রাগরেচনের মতো জ্বলে ওঠে যবক্ষার, গন্ধকবাক্যসকল।

জ্বলে ওঠে আর জ্বালিয়েও দেয় একইসঙ্গে কত রূপাতীত

গীত ও সংগীত, রতি ও আরতি, আগুনগান্ধার…

 

ওইসব উজ্জ্বলন্ত বাক্য আর বাচনের অবশেষ,

রুপালি ভস্ম ও রেশ, ওড়ে ভোরের বাতাসে।

 

ভোর:

রাত এসে আছড়ে পড়ে লীন হয়ে যায় দিনের শরীরে

জন্ম হয় বালুফেনাময় সূক্ষ্ম তটরেখা

আমরা তাকেই ভোর বলে ডাকি

ভোর বলে ভ্রম হয় শুধু আমাদের।

 

এই সেই ভোরবেলা, যখন কুয়াশা দেখা যায় গুরু গন্ধবিজ্ঞপ্তির মতো

ব্যান্ডেজ-পোড়ানো বাষ্প, ছাই

ওগুলি তো আর কিছু নয়, ওগুলি মূলত তা-ই–

মানুষের জ্বলে-ওঠা বাক্য, রতি ও রক্তের অবশেষ, ক্ষারকভস্মের তেজ।

 

বৈশ্যদের কাল

ধীরে ধীরে এই ভূমিপৃষ্ঠে ফিরে এল বৈশ্যদের কাল।

 

সার্থবাহ নিয়ে আসে ঝলমলে বাসকপাতার কোলাহল

দুঃখ সেরে যায়, অসুখ সারে না।

প্রতিদিন লাল রং ভালোবেসে অনূঢ়া অনল

খেয়ে নেচে নেচে বেঁচে যায় ছেলে।

অসুখের ওই পার থেকে ছোটমাসি পুরো নাম ধরে ডাকে–

‘আয় দ্যাখ্, বৃক্ষেরা কর্তব্য করে না

কেবলই কলহ করে মেঘেদের সাথে।’

অমনি মাথাভর্তি ঝিলিমিলি হিলিয়াম নিয়ে, নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে

ওই উঁচু-উঁচু মেঘ থেকে তিনচক্রযানে চেপে ছুটে আসে ছেলে।

 

বাতাসে বাতাসে ঘর্ষতড়িৎ জ্বলে ওঠে।

চকচকে নিকেলের মতো তারাবাজি পোড়ে।

তারপর একদিন ঘুমন্ত স্ত্রী আর পুত্র রেখে ঘন রাতে নিরুদ্দেশে যায়

নিরঞ্জনা নদীকূল শুধু কাঁপে অকূল তৃষ্ণায়।

 

প্রকৃতি অলস ঢঙে এসে উপগত হলো ওই পুরুষের

পিঠের ওপর

কালচক্রে জন্ম নিলো জন্তু

অর্ধেক জলজ আর অর্ধ ঊর্ধ্বচারী প্রাণীর মতন।

রক্তচক্ষু, শিরদাঁড়া কাঁটাঙ্কিত, অসম্ভব বর্ণাঢ্য যুগল ডানা

নিম্নাঙ্গে জলজ পিচ্ছিলতা, লেজ

মুখ দিয়ে অবিরল তেজ বের হয়ে ভাসালো ভূখণ্ড

কী যে কাণ্ড হলো! ডাকো বৈদ্য। আহা, ডাকো না বুদ্ধকে।

সে তো বোধিপ্রাপ্ত, সে এসব জানে, তাকে ডাকো।

 

তারপর ধূলিঝড় হলো, হিমবাহ গেল শতযুগ,

ধীরে ধীরে এই ভূমিপৃষ্ঠে ফিরে এল বৈশ্যদের কাল।

 

ওইখানে হইহই রইরই পঞ্চকাণ্ড মেলা বসতো

হাজার বর্ষ আগে

আজ শুধু একজোড়া নিরিবিলি জলমগ্ন বৃক্ষ বাস করে।

দূরে ওই বৃক্ষমিথুনের থেকে, থেকে-থেকে মিথেন জ্বলে উঠলেই

ছেলেরা ও মেয়েরা একালে বলে ওঠে, ওই যে ভূতের আলো দেখা যায়

 

নীল-নীল আলো দেয় ছেলেটির শরীর, অশরীর। 

 

বৈকুণ্ঠের তরে বৈষ্ণবীর গান

‘গৌর ব’লে বাহির হবো, গৃহেতে আর রবো না গো…  

যেই দেশেতে গৌর পাই, সেই দেশেতে চলিয়া যাই

এই দেশ তো আর ভালো লাগে না’-

গাইতে গাইতে দেশ-দেশান্তর পার হয়ে

চলেছে সে, স্নাতকিনী, বৈষ্ণবী আমার…

 

সে-কোন অজ্ঞাত পূত এক স্নানসত্রের সন্ধানে

বহু দিন বহু তিথি বহু দেশ বহু পথ ভ্রমণের শেষে

স্নাতকিনী এসে আজ দাঁড়িয়েছে এমন এক তারিখরেখায়,

যেইখানে একই দিনে একইসাথে আসে রবি- আর শশীবার

একইসঙ্গে জাগে কৃষ্ণ প্রতিপদ আর দ্বিতীয়ার গোরা বাঁকাচাঁদ

গোলার্ধপ্রতিম দূরে, বৈষ্ণবী দাঁড়িয়ে আছে সেই দ্রাঘিমায়

যেইখান থেকে দূর বৈকুণ্ঠ-গোলোক,

কৈলাস ও অলিম্পাস, জান্নাত এবং জাহান্নাম…

সবকিছু ঝাপসা দেখায়। 

 

বিমোক্ষণ

আজ

এই পূর্বাহ্নেই

সমস্ত ঘটনাতরঙ্গের

চূড়া-বিন্দু-বিন্দুতে পুঞ্জিত ছিল হলাহলফেনা

দিগবিদিক বেপরোয়া বিষের উত্থান–

 

তোমার শরীর থেকে বিচ্ছুরিত স্বর্ণধূলি গিয়ে

মিশছে রশ্মির রবিশস্যীয় প্রতিভায়

এতে যে সর্বপ্লাবী বিষরসায়নের বন্যা

তাতে বুঁদ হয়ে ডুবে ছিল আজ সমগ্র নিখিল।

 

এখন, এই সন্ধ্যাক্ষণে,

রাঙা আলো-অন্ধকারের এই মৃদু-মৃদু ঘর্ষণমুহূর্তে

বিষের সকল দিগবিদিক সম্ভাবনা

দপ করে স্তব্ধ হয়ে আসে

সাপও অহিংস হয়ে যায় এই ধীর কমলাপ্রবণ সন্ধ্যায়।

 

নিঃসঙ্গ

লক্ষ-লক্ষ মাইল উঁচুতে, মহাকাশে,

জনমানববিহীন ভাসমান একটি স্পেস-স্টেশনে পোস্টিং পেয়ে

এসে জয়েন করেছে এক স্টেশনমাস্টার।

 

একদিন একটি রকেট এসে প্রচুর বোঁচকা-বুঁচকিসহ তাকে নামিয়ে দিয়ে,

ফুয়েল-টুয়েল নিয়ে কোথায় যে চলে গেল কোন আসমানের ওপারে…

সে-ও কতদিন আগে!

 

মৃত্যুরও অধিক হিম আর নির্জনতা…

মানুষটি একা-একা থাকে, খায়, ঘুমায়– ওজনহীন, নিঃসাড়, নির্ভার…

মাঝে মাঝে নভোপোশাক পরে বাইরে সাঁতার কেটে আসে শূন্যে,

তখন সে বাঁধা থাকে ধাতুরাংতারচিত এক লম্বা লাঙুলে, স্টেশনের মাস্তুলের সঙ্গে।

 

কাছে-দূরে কোত্থাও কেউ নাই,

কোনো প্রেত-প্রেতিনী, অথবা কোনো যম-যমী, জিন-পরি, ভগবান-ভগবতী,

ফেরেশতা-ইবলিশ কাঁহা কিচ্ছু নাই, কেউই ঘেঁষে না কাছে, যে,

তার সঙ্গে একটু কথা বলবে, কফি খাবে…

এমনকি মানুষটা যে একটু ভয় পাবে, তারও উপায় নাই…

নিজের সঙ্গেই তাই নিজেরই মিথুন ও মৈথুন, খুনসুটি, হাসাহাসি, সাপলুডু খেলা…

 

কেবল রজনীস্পর্শা, ভীষণবর্ণা এক গন্ধরাজ্ঞী ফুটে থাকে অবাধ, অনন্তরায়…

বহুকাল দূরে…

 

বহুদিন পর আবার প্রেমের কবিতা

মেঘ থেকে মেঘে লাফ দেবার সময়

তূরীয় আহ্লাদে দ্রুত কেঁপে-বেঁকে

একটানে একাকার যখন বিজলিসূত্র, ওই ঊর্ধ্বতন

মেঘের আসনে এক ঝলক দেখা গেল তাকে

আলোকিত ঘনকের আকারে।

 

তাকে ডাক দেব-দেব, আহা কী বলে যে ডাক দেই!

জন্ম এক রুদ্ধভাষ জাতিতে আমার–

মুহূর্তে মিলিয়ে গেল অপর আকারে।

 

দূর মহাকাশে

ছড়িয়ে ছিটিয়ে ফুটে আছে কত ফুয়েল-স্টেশন–

সেইসব এলোমেলো নৈশ নকশার মধ্যে তাকে, প্রিয় তোমাকেই,

ঘোর মধ্যরাতে

এইভাবে দেখে ফেলি আমিও প্রথম।

সর্ববায়ু আমার সুস্থির হয়ে যায়।

 

যেই দেখি আর ডাক দিতে যাই প্রিয়, অমনি

তোমার সমস্ত আলো, সকল উদ্ভাস

হঠাৎ নিভিয়ে নিয়ে চুপচাপ অন্ধকার হয়ে যাও।

আবার উদ্ভাস দাও ক্ষণকাল পরে–

 

এইরূপে খেলা করো, লুকোচুরি, আমার সহিত।

আমি থাকি সুদূর রূপতরঙ্গ গাঁয়, আর তোমার সহিত

তোমারই সাহিত্যে আহা এভাবে আমার বেলা বয়ে যায়।

 

এরপর থেকে একে একে এক উচ্চতর জীবের বিবেক

প্রথমে প্রয়োগ করে দেখি,

মিলিয়ে যাচ্ছেন তিনি আকারে ও নিরাকারে।

এক অতিকায় জট-পাকানো যন্ত্রের

আগ্রহ সাধন করে দেখি,

তা-ও তিনি ছড়িয়ে পড়েন সেই আকারে নিরাকার;

আকাশে আকাশে মেলে রাখা তার কী ব্যাপক কর্মাচার,

একটির পর একটি গ্রহ আর জ্বালানি-জংশন সব

অতর্কিতে নিভিয়ে নিভিয়ে প্রবাহিত হন তিনি।

 

একদা মণ্ডলাকার ছিলে জানি

আজ দেখি দৈবাৎ ধর্মান্তরিত, ঘনকের রূপে!

ঘনক তো গোলকেরই এক দুরারোগ্য সম্প্রসার।

তবুও তো ধর্ম রক্ষা পায়। রক্ষিত, সাধিত হয় তবু।

 

গোলকত্ব পরম আকার

গোলকতা যথা এক অপূর্ব বিহেভিয়ার,

প্রায়-নিরাকারসম এক নিখুঁত আকার।

 

শৈশবের কালে, এক আশ্চর্য মশলা-সুরভিত

গুহার গবাক্ষপথে আচম্বিতে ভেসে উঠেছিল মেঘ,

যার বাষ্পে বাষ্পে কূটাভাস।

কিছুতেই পড়তে পারি নাই সেই মেঘ

আমরা তখন।

 

বিব্রত বাতাস তাকে, মেঘে মেঘে সংগঠিত ক্ষণ-ক্ষণ-আকৃতিকে,

ধাক্কাতে ধাক্কাতে নিয়ে যাচ্ছে কত বিভিন্ন প্রদেশে।

নিরাকৃত হতে হতে প্রায়, ওই তো ব্যক্ত হচ্ছেন ফের আকারে আকারে।

ধর্মচ্যুত হতে হতে প্রায়, ফের প্রচারিত হন ধর্মে ধর্মে।

আহা, ধর্ম হারালে কী আর থাকে তবে এ ভুবনে!

ঘনক যে গোলকেরই এক নিদারুণ তাপিত প্রসার।

 

বৃহৎ, অকল্পনীয় এক জড়সংকলন। বড় বালিপুস্তকের মতো–

তারই মধ্যে অকস্মাৎ একটু প্রাণের আভা। মাত্র তার একটি পৃষ্ঠায়।

এই সংকলনের ভূমিকাপত্রটিও নেই। ছিন্ন। সেই প্রধান সংঘর্ষে।

 

নিষ্ক্রান্তিদিবসে, অতঃপর, ওই গুহামুখে পড়ে থাকে

এ বিপুল জড়সংকলনের ছেঁড়া ভূমিকাপৃষ্ঠাটি,

অর্থাৎ সেই যে প্রথম ক্যাজুয়াল্টি, নিখিলের–

ওই গুহাপথে, নিষ্ক্রমণকালে।

 

একবার মাত্র দেখা হয়েছিল কায়ারূপে

ঝাপসা, ছায়া-ছায়া!

তা-ও বিজলির দিনে, তা-ও মেঘের ওপরে

উল্লম্ফকালীন।

এরপর থেকে শুধু ভাবমূর্তি…

যেদিকে তাকানো যায়

কেবলই, উপর্যুপরি ভাবমূর্তি ঝলকায়।

 

মাঠে মাঠে স্প্রিং স্ক্রু আর নাটবোল্ট ফলেছে এবার সব জং-ধরা।

সে-সব ভূমিতে হাঁটু গেড়ে গলবস্ত্র হয়ে পরিপূর্ণ দুই হাত তুলে

যাচ্ঞামগ্ন সারি সারি সম্প্রদায়– তারা অসবর্ণ, তারা

লঘিষ্ঠ– কলহরত বিড়ালের আধো-আলো-আঁধারি বাচন ও কণ্ঠস্বর

কেড়ে নিয়ে দ্রুত নিজ কণ্ঠে কণ্ঠে গুঁজে দিয়ে সারিতে দাঁড়িয়ে যায় তারা।

 

তেজের অধিক তেজ

বাক্-এর অধিক বাকস্ফূর্তি তুমি,

গোলকে স্ফুরিত হয়ে এসো পুনর্বার

পূর্বধর্ম ধারণ করে সরাসরি উত্তম পুরুষে।

 

আর

কত অর্থ যে নিহিত করে রাখো বীজাকারে

সেইসব ভাসমান বাক্যের অন্তরে,

দৃশ্যত যা অর্থহীন অতি-অর্বাচীনদের কাছে।

 

সংকটে সংকটে, সর্ব-আকারবিনাশী

দহন দলন আর দমনের দিনে

আদিগন্ত কুয়াশা-মোড়ানো সেই তৎকালীন রৌদ্রের মধ্যেই

চতুর্দিক থেকে একসঙ্গে আর

বৃক্ষে বৃক্ষে আর দ্রব্যে দ্রব্যে আর ভূতে ভূতে সর্বভূতে

মুহুর্মুহু উদ্ভাস তোমার, এক অবধানপূর্ব রহিমের রূপে।

ঘনক তো গোলকেরই এক অপূর্ব অপিনিহিতি।

 

এইরূপে লীলা করো, লুকোচুরি, আমার সহিত।

আমি থাকি দূরের রূপতরঙ্গ গাঁয়, আর তোমার সহিত

তোমার সাহিত্যে দ্যাখো এভাবে আমার বেলা বয়ে যায়।

 

প্রহ্লাদপুরের জঙ্গল

(শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস…)

রামশরণ ব্যাধ গিয়েছিল শিকার করতে, প্রহ্লাদপুরের জঙ্গলে। শিকার মিলেছে প্রচুর। শিয়াল, শজারু, শকুন, গোধিকা, গন্ধগোকুল, ফেজান্ট, কাছিম…। মেলেনি কেবল কাক আর বক; ওদেরকে তো আগেই ভস্ম করে দিয়েছে তপস্বী। দুপুরের দিকে পশুপাখিগুলিকে কেটেকুটে মাংসের ভাগা দিয়ে বসেছে ব্যাধ, পাকুড় গাছের নিচে। সাতমিশালি মাংস, বিক্রি হচ্ছে খুব। শব হয়ে শুয়ে আছে শিব। কালী লীলা করছে তার বুকের ওপর, যেভাবে প্রকৃতি লীলা করে পুরুষের ওপর; জীব, পরমের। বালিতে মেশানো চিনি, নিত্য-র সাথে অনিত্য যেমন। এসো পিঁপড়া দলে-দলে, সিরিজে-সিরিজে, বালি রেখে চিনি বেছে খাও…

ফেরার পথে একটি ঘাসখেকো বাঘের শাবকও সাথে করে এনেছে রামশরণ। জন্মের পরপরই মেষেদের সঙ্গে চলে গিয়েছিল আলাভোলা ব্যাঘ্রশিশু। সে এখন ঘাস খায় বটে, কিন্তু রাগ আছে ঠিকই, ক্ষাত্রতেজ অব্যাহত…ঠাস-ঠাস করে থাপড়ায়, দাবড়ায় বড়-বড় নিরীহ ভেড়াদের।

 

সাবানতরু

নদী দিয়ে কত কী যে ভেসে আসে! আমাদের নদী দিয়ে।

নানান দেশের ওপর দিয়ে বয়ে আসা আমাদের নদী।

 

একবার উজান দেশের এক ভূমিকম্পে ভেসে এসেছিল শয়ে শয়ে শালগাছ…

সেগুলি ধরে ধরে আমাদের পূর্বপুরুষেরা দমাদম বানিয়ে নিয়েছে

বাস্তুঘরের খুঁটি। এখনো টিকে আছে।

একবার ভেসে যাওয়া এক শালপ্রাংশু মরদেহ ধরে এনে

পুঁতে দেওয়া হয়েছিল। কিছুই গজায়নি।

 

আরও আসে ভেসে জলজ্যান্ত মানুষ-মানুষী–

সাপে-কাটা, অজ্ঞান, মাকড়ে-কাটা, গুম-হওয়া,  ঘুম-পাওয়া,

এবং মাঝে মাঝে ঘুমন্ত মানুষ।

ওই যে আমাদের ছোটকাকি, হলদে পাখি হয়ে উড়ছে এঘর ওঘর,

একদিন তিনিও এসেছিলেন ভেসে, ভেলায় ঘুমন্ত শিশু, আমাদের নদী দিয়ে। 

ওই যে রাজপুরুষের মতো উপচানো ঢেউ-জাগানো মেজফুফা,

তিনিও তো নদী-ভাসা, তাকেও তো পাই এই নদীটি থেকেই…

নদীতে মানুষ পাই আর ধরে এনে জুড়ে দিয়ে সংসারে লাগাই।

 

আর ভেসে আসে বিচিত্র সব ফল ও বীজ।

একবার এক অচেনা বীজ এনে পুঁতে দিলেন আমার বাবা।

ভেবেছিলেন, হবে হয়তো কোনো সুমিষ্ট ফল, বিরল জাতের।

বীজ ফুটে গজায় গাছ। গাছ বাড়ে দিনে দিনে।

ফল হয়। পাকে। পাকা ফল থেকে,

এ কী! সাবানের ফেনার মতো শুধু ফেনা!

কোথায় সুমিষ্ট ফল, কোথায় কী!

বৃক্ষ, তোমার নাম?

–ফল-এ পরিচয়।

ফলে, গাছটির নাম হলো সাবানগাছ।

 

কাক যখন দ্যাখে যে, কী! তারই বাসার ডিম থেকে ফোটা বাচ্চারা

দিনে দিনে হয়ে উঠছে কেমন ভিন্ন আদলের, কণ্ঠে ফলছে ভিন্নরকম স্বর,

তখন যে বিরক্তি, বিস্ময়, ও অসহায়ত্ব নিয়ে সে তাকিয়ে থাকে বাচ্চাদের দিকে–

বাবাও সেরকম তাকিয়ে থাকতেন ওই সাবানতরু আর সাবানফলের দিকে

বহুদিন, বহুবছর। আবার গুনগুন করে গাইতেনও–

‘বাঞ্ছা করি সুমিষ্ট ফল পুঁতলাম সাধের গাছ

ফাঁকি দিয়া সে গাছ আমায় ঝরায় দীর্ঘশ্বাস

মনে দুঃখ বারোমাস…’

 

তারপর একদিন তো তিনি নিজেই গত হলেন;

নদী থেকে পাওয়া সেই অদ্ভুত ফলের গাছ

একদিন নদীই ভাসিয়ে নিয়ে গেল।

 

তবে ওই সাবানফলেরা বহুবছর ধরে আমার বাবার ময়লা সন্তানদের

ততোধিক ময়লা পোশাকগুলিকে ঋতুতে ঋতুতে কিছুটা হলেও

ফর্সা ও উজ্জ্বল করে দিয়ে আসছিল…

 

সেতু ও সম্পর্ক

প্রাণ আর অপ্রাণের মাঝখানে যেইটুকু গোধূলি-অঞ্চল

জীবন ও মৃত্যুর মধ্যে যেটুকু ধূসর ব্যবধান

সেইটুকু এক নদী, আমাদের মাঝখানে–

ছোট্ট, কিন্তু কুয়াশাধূসর, পারাপারাতীত, হেঁয়ালিবিধুর।

 

শাস্ত্রে বলে–

দুই পারে, পরস্পরে, সম্পর্ক হলেই তবে গড়ে ওঠে সেতু।

আরো বলে-বস্তুত কোনো সেতুই সম্ভব নয় সম্পর্কবিহীন।

অথচ কতটা ধ্রুব, সুস্থির সম্পর্ক আমাদের!

তবু জেগে উঠছে না কোনো সেতু

কোনোদিন জাগবে না যেন আর।

সাড়াহীন, পারাপারহীন পড়ে আছি যার যার পারে।

 

ব্যর্থ হয়ে যায়

কেবলই তোমার আর আমার বেলায়

সম্পর্কশাস্ত্রের যত মৌল নীতিমালা

কোনো এক ভৌতিক খেলায়।

 

মায়া

সাগরকিনারে দেখা প্রথম মিনার তাতে মেঘ তাতে পর্বতের মাথায় রাগ

রাগিনী ও বজ্রচেরাগ পাহাড়ের বগলতলায় বাষ্প, কুহু ও কামিনী রোদ

কুসুমকর্ণিকা সুরবল্লী রিঠাফল দলকলসের ঝোপে একাকী মৌমাছি

ঝাপসা হয়ে আসা পথহারা মেষ ও মালিক অস্তরাঙা চিল উঁচু চিমনিচূড়ায়

ইতস্তত ঢোলকলমি অশোক বাসক– প্রকৃতির প্রতিটি সঞ্চয় থেকে

তিল-তিল অর্থ আহরণ করে আনি সে তো তোমাদেরই জন্যে

যদিও জেনেছি বেশ– জ্যামুক্ত তির তো আর কখনো আসবে না ফিরে

কখন কোথায় কবে কাকে যে ঘায়েল করে চলে গেছে দূরে

টলে ওঠে ধানুকীর একাগ্রতা যদি তির ফিরে আসে বুমেরাঙের গতিপথে

কোনোদিন– সেই আশা-নিরাশায় বসে থাকা…

আমি নিশিপাগলার বেশে কী এক অদ্ভুত চোরাটানে অনন্তকাল ধরে চলেছি

অরণ্য পাহাড় নদী সম- ও মালভূমির অন্তহীন অলিগলি চোরাপথ থেকে

কারা যেন খালি মায়া ছুড়ে মারে এমনকি আমি যখন বকফুল আর

ভেরেণ্ডা গাছের নিচ দিয়ে যাই তখনো কে যেন কেবলই মায়া মাখিয়ে দেয়

 

তুমি, তোমার সরাইখানা এবং হারানো মানুষ

একটি দিকের দুয়ার থাকুক খোলা

যেইদিক থেকে হারানো মানুষ আসে।

মাংস-কষার ঘ্রাণ পেয়ে পথভোলা

থামুক তোমার সরাইখানার পাশে।

 

আজও দেশে দেশে কত লোক অভিমানে

ঘর ছেড়ে একা কোথায় যে চলে যায়!

কী যাতনা বিষে…, কিংবা কীসের টানে

লোকগুলি আহা ঘরছাড়া হয়ে যায়!

 

এ-মধুদিবসে আকাশে বাতাসে জাগে

ঘর ছাড়বার একটানা প্ররোচনা।

হারিয়ে পড়তে নদী মাঠ বায়ু ডাকে

ঘরে ঘরে তাই গোপন উন্মাদনা।

 

জগতের যত সংসারছাড়া লোক

ঘুরে ফিরে শেষে সরাইখানায় স্থিত।

এ-স্নেহবর্ষে তুমি কি চাও যে, হোক

ঘরছাড়া ফের ঘরেই প্রতিষ্ঠিত?

 

হারানো মানুষ সেই কত কাল ধ’রে

স্বজনের ভয়ে দেশ থেকে দেশে ঘোরে।

স্বজনেরা তবু নানান বাহানা ক’রে

বৃথাই খুঁজছে কালে ও কালান্তরে!

 

স্বজন যখন খোঁজে উত্তরাপথে

হারানো তখন দাক্ষিণাত্যে যায়।

স্বজন যখন নিরাশাদ্বীপের পথে

হারানো খুঁজছে নতুন এক অধ্যায়।

 

নলজাতক

যদি আমি অর্জন করে থাকি দশপারমিতা, তবে এই নলবনে যত নল আছে সমস্তই গাঁটহীন, একচ্ছিদ্র হোক, যাতে নলের ভেতরে জাতকদের জন্ম, বর্ধন ও বিচরণ হয় অতি অনায়াস। তারপর, একদিন দুপুরে, নুইয়ে ফেলে মোটা-মোটা নলখাগড়া অগণন, নলের ভেতর থেকে হামাগুড়ি দিয়ে বেরিয়ে আসুক সারা গায়ে নালঝোলমাখা কালো-ধলো সরল- ও কোকড়া-চুলো গমরঙা তামাটে কপিশ অগণিত রৌদ্রদিগম্বর ন্যাংটা নলজাতক। ভরে যাক নিস্তরঙ্গ এ-অরণ্য অক্ষৌহিণী দাপুটে দামাল শিশুবাহিনীর উত্তাল তরঙ্গরঙ্গে…

 

আবর্ত

অবেলায় এসে আবর্তে পড়ে গেছ হে দিগভোলা। 

এ আবর্ত মনুষ্যজন্মের। 

 

এ বড় কঠিন চক্র– 

একবার পড়েছে যে, নিস্তার নাই আর তার। 

এই যে দুর্দান্ত জাদুজটিল ফাঁদ, 

এই যে মহামেঘলা গোলকধাঁধা–

কী করে বেরুবে হে 

মণিরত্ন-ভরা এই গুহার ভেতরে আটকে-পড়া আতঙ্কিত আলিবাবা? 

অভিজ্ঞান ভুল মেরে বসে থাকা উপর্যুপরি ভাগ্যহত!? 

প্রকোষ্ঠ থেকে প্রকোষ্ঠে ছুটে মরবে শুধুই 

জন্ম থেকে জন্ম পার হয়ে যাবে কেবলই লাফিয়ে লাফিয়ে… 

বেরুতে পারবে না। 

 

বাইরে দীর্ঘ দাবানল, পুড়ে যাচ্ছে কত মধু ও মশলার বন। 

দাহিত মধু-মশলার মিশ্র ঝাঁজালো গন্ধ,

সেইসাথে বহু বহু যুগের ওপার থেকে ধেয়ে আসা 

যত সমাধানহীন সমীকরণের ঝাঁজ 

ঝাঁৎ করে এসে লাগছে একযোগে চোখে-মুখে। 

দুষ্পাঠ্য মুখের রেখা হয়ে উঠছে আরো জটিল,

জন্মচক্র আরো প্রহেলিকাময়। 

 

এইবার, এই মহাচক্রাবর্ত 

ঘোরাতে ঘোরাতে কোন দিকে, কোন জাহান্নামে তবে নিয়ে যাবে যাক…

 

মা

এই ধূলি-ওড়া অপরাহ্ণে,

দূরে, দিগন্তের একেবারে কাছাকাছি

ওই যে খোলা আকাশের নিচে একা শয্যা পেতে শুয়ে আছেন– 

তিনি আমার মা।

দূর্বা আর ডেটলের মিশ্র ঢেউয়ে, ঘ্রাণে রচিত সে-শয্যা।

নাকে নল, অক্সিজেন, বাহুতে স্যালাইন, ক্যাথেটার–  

এভাবে প্লাস্টিক-পলিথিনের লতায় গুল্মে আস্তে-আস্তে

জড়িয়ে যাচ্ছেন তিনি।

 

শয্যা ঘিরে অনেকদূর পর্যন্ত ধোঁয়া-ধোঁয়া

মিথ্যা-মিথ্যা আবহাওয়া।

 

মনে হলো, বহুকাল পরে যেন গোধূলি নামছে

এইবার কিছু পাখি ও পতঙ্গ

তাদের উচ্ছল প্রগলভতা

অর্বাচীন সুরবোধ আর

অস্পষ্ট বিলাপরীতি নিয়ে

ভয়ে ভয়ে খুঁজছে আশ্রয় ওই প্লাস্টিকের ঝোপঝাড়ে,

দিগন্তের ধার ঘেঁষে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠা প্রাচীন মাতৃছায়ায়।

 

সাব-জিরো সাইলেন্স

জিম্মি-হওয়া মানুষ জানে না ঠিক কোন মুহূর্তে

কী কারণে গুলি এসে লাগবে ঠিক কোথায় কোথায়।

অচেনা রোমাঞ্চে, রোমহর্ষে, ত্রাসে, সর্বোচ্চ সংরাগে

শরীরের প্রতি ইঞ্চি তাই প্রতিস্পর্ধী, টানটান।

যেমন ‘দেহের সবচেয়ে সংরক্ত জায়গা

পোশাকের ফেলে-রাখা ফাঁকা স্থান।’ 

 

একদিকে তোমাতে সঞ্চার করা হবে

অনন্ত বাকতৃষ্ণা, চিৎকারের উদগ্র তাড়না, উদ্গার

অন্যদিকে নিষেধ বাকস্ফূরণ। নিষেধ চিৎকার।

কোন দিকে যাবে?

 

কোন দিক থেকে তেড়ে আসবে কোন ধারালো ছোবল,

কোন কোপ, কোন কার্তুজ, লেলিহ ফিসফাস–

এই গা-ছমছম ভূতবান্ধব জ্যোৎস্নায়

বুঝতেও পারবে না আর, ওরে নিরুপায়।

শুক্লপক্ষে শুনবে বহু ঘোলাটে ভয়ের ঘোলতরঙ্গবাদন।

কৃষ্ণপক্ষে, উচ্চনাদী নীরবতা। 

 

কতশত সশব্দ উচ্চার, ঘুরে-দাঁড়ানো চিৎকার,

অন্তরাত্মা-কাঁপিয়ে-তোলা কান্না, আর্তি, আহাজারি,

বহুমাত্র বিচিত্র আওয়াজ–

স্রেফ দ্বিমাত্রিক কালো টোটেম-অক্ষর হয়ে তারা

একদম খামোশ মেরে থাকে নিঃসহায়…

কখনো তা ভাবদোষে কখনো-বা রাজরোষে

স্তরে-স্তরে-রাখা কল্পপুথির ঘোর-গুমসুম নিঝুম পাতায়।  

 

অতিরিক্ত অবদমনের অবশেষ

দোষযুক্ত স্বপ্নে ভরে যায় দেশ।

স্বপ্নের ভেতর থেকে ঘটে যায় তার

লাভাভর্তি পিচকারির ঘন পিচিৎকার।

 

আতাফল

এই সেই ফল

সেই মিরাকল

রূপকের মতো ঝুলে আছে পৃথিবীর বহু ছায়াচ্ছন্ন দেশে দেশে।

দেখতে যেন-বা এক সবুজ গ্রেনেড

আবার কিছুটা বটে হৃৎপিণ্ডের মতো—

অভ্যন্তরে বারুদের তোলপাড়-করা ঘ্রাণ, আর

সুস্বাদ! অচিন্তনীয়।

শৈশবে যেখানে থাকতাম, নিকটেই ছিল এক পরিত্যক্ত ভিটাবাড়ি। প্রাচীন উদ্ভিদ আর লতাগুল্মে ভরা। একদিন গোধূলিবেলায়, পিতামহ, ঘুম থেকে সহসাই জেগে উঠে, অনেকটা রহস্যের নায়কের মতো গেলেন আমাকে সঙ্গে নিয়ে সেই ভিটায়। হাওয়ায় আন্দোলিত পোড়ো ভিটা। বহু গাছগাছালির মধ্য থেকে গোপনে একটি গাছকে দেখালেন। সাধারণ একটি গাছ। কিছু ফল ঝুলে আছে তাতে। দেখতে অনেকটা গ্রেনেডের মতো। মেওয়াফল। আতা-মেওয়া। পিতামহ বললেন— এগুলা বেহেশতের ফল। একমাত্র স্বর্গজাত ফল, যার নমুনা দেখানো হয়েছে দুনিয়ায়। চুপচাপ দেখে নে। বলামাত্র আমার এবং পিতামহের সর্বাঙ্গ হাউই তুবড়ির মতো একসঙ্গে শিহরিত।

পিতামহের বিরল-বসন্ত-চিহ্নিত ফর্সা অবয়ব আর লম্বা-লম্বা গোধূলিরঙের দাড়ি, আমাকে, আমার শিহরনগুলোকে আচ্ছাদিত করে দিয়ে বয়ে যাচ্ছিল একটানা প্রবল হাওয়ার ভেতর।

সূর্য ডুবে যাচ্ছে পরিষ্কার হারাবতী নদীর ওপার।

অস্তরেখা বরাবর ওই যে উঠছে জেগে সুদূর কদলীবন। তারই ফাঁকে ফাঁকে

একা-একা রূপকথা হয়ে ওই ঘুরছে এক গেরিলা কিশোর— সহযোদ্ধারিক্ত,

পরিবার-পরিজন থেকে চিরতরে বিচ্ছিন্ন,

পাক খেয়ে খেয়ে শুধু হারিয়ে হারিয়ে

একেবারে একা হয়ে যাওয়া এক গেরিলা কিশোর—

ডান হাতে আতাফল, বাঁ-হাতে গ্রেনেড,

বাম কানে ছোট্ট রিং, কাঁধে কালাশনিকভ, গায়ে ইস্পাতরঙের

জ্যাকেট, গলায় বুলেটের মালা, মাঝখানে হৃৎপিণ্ড—

সব আলপিনে আলপিনে গাঁথা।

 

অস্তমাখা দূরের কদলীবনে ভিনদেশী গেরিলা কিশোর।

কথা বলে ঝটপট, অবিকল সন্ত্রাসের বাগবিধিতে।

অন্য কোনো ভাষা নেই, কোনো বিধি নেই বনভূমে ওই বাগবিধি ছাড়া—

আর সন্ত্রাসের বিপরীতে মুহুর্মুহু অপরূপ সন্ত্রাস…

প্রতিটি সন্ত্রাস প্রণয়নশেষে, বারবার, আঁজলা ভরে জল খায়

আর পাক খেয়ে খেয়ে হারিয়ে হারিয়ে

একদম একা হয়ে যায় এই গেরিলা কিশোর,

সন্ত্রাসশিল্পের রচয়িতা।

 

আর এই সেই ফল

সেই মিরাকল

রূপকের মতো ঝুলে আছে পৃথিবীর বহু ছায়াচ্ছন্ন দেশে দেশে

অস্তমাখা কাতর গ্রেনেডফল। অভ্যন্তরে বারুদের মৌ-মৌ ঘ্রাণ, আর

সুস্বাদ! অচিন্তনীয়।

 

পক্ষান্তরে, গ্রেনেড— অপূর্ব এক ইহফল।

গ্রেনেড— কিছুটা উগ্র কিন্তু চমৎকার এক ইহফল।

রূপকের মতো ঝুলে আছে পৃথিবীর বহু রৌদ্রোজ্জ্বল দেশে দেশে।

অভ্যন্তরে কোনো এক দুর্লভ ফলের মাতাল-করা ঘ্রাণ।

 

বিদেশী অরণ্য আজ আতায় গ্রেনেডে তোলপাড় এই গোধূলিবেলায়।

 

ভিনদেশী গেরিলা কিশোর

তার ডান হাতে আতাফল, বাঁ-হাতে গ্রেনেড এবং

মাঝখানে হৃৎপিণ্ড— এভাবে ভারসাম্য রেখে রেখে

টালমাটাল পায়ে স্বর্গসড়কের সেই মহাবিপদজনক সাঁকো

পার হয়ে সর্বাগ্রে, দুর্লভতর এক ইহফলের স্মারকবার্তা নিয়ে

স্বর্গদ্বারে করাঘাত…

অনেক পেছনে পড়ে থাকে পুণ্য যাত্রীদল।

তারা আতঙ্কজনকভাবে পেছনে।

 

আর এই সেই ফল

সেই মিরাকল

রূপকের মতো ঝুলে আছে পৃথিবীর বহু রৌদ্রচ্ছায়াময় দেশে দেশে।

 

দ্য শো মাস্ট গো অন

বিষয়ীরা মত্ত হয়ে আছে কামিনী-কাঞ্চনে। বাইরে টালির ঘরের ওপর দিয়ে ধীর গতিতে হাওয়ায় ভেসে যাচ্ছে এক বিশাল বুদ্বুদ। ভাঙা ছাদে বসে তাকে ধরবার চেষ্টা করছে একটি বানর। বানরের চোখে রঙিন সানগ্লাস, মাথায় রঙিন ক্যাপ। মাটির দেওয়ালে ঝুলছে বিড়াল-হারানোর বিজ্ঞপ্তি– ভেজা বিড়াল। হারিয়ে গেছে। মোল্লাবাড়ির বিড়াল– দু-চার হরফ আরবিও জানত। মাটির দাওয়ায় বসে ছোটভাইকে নজরফোঁটা লাগিয়ে দিচ্ছে একটি মেয়ে। মেয়েটির নাম সম্ভবত হৈমবালা, তবে আয়শাও হতে পারে। রোদেলা আকাশ, তার মধ্যেই ফের বৃষ্টি ঝরছে। বাচ্চারা ছড়া কাটছে-রোদ হচ্ছে বৃষ্টি হচ্ছে, খেঁকশিয়ালের বিয়ে হচ্ছে। বড়রাও যোগ দিয়েছে তাতে। রোদ বাড়ছে, তাই রোদের চশমাও বাড়ছে-এটা না-হয় বোঝা গেল; কিন্তু টুপিও বাড়ছে, শুঁড়িখানাও বাড়ছে– এটা কিছুতেই বুঝতে পারছেন না বিশেষজ্ঞরা। মাথা ঘামাচ্ছেন, কিন্তু কূলকিনারা হচ্ছে না। এদিকে আনারস পচে যাচ্ছে অতিবর্ষণে। দুর্নীতি কিংবা দেশপ্রেম-কোনোটাই কারো একচেটিয়া নয় বলে ফতোয়া দিচ্ছেন কেউ কেউ। কী এক অচেনা আকর্ষণে পর্বতের দিকে ধেয়ে চলেছে মেঘেরা, আর শেরপারা। মেঘেরা আকাশ দিয়ে, শেরপারা নিচের এবড়োথেবড়ো জমিন দিয়ে। পেছন-পেছন ছুটে আসছে তাদের বউবাচ্চারা। যেতে দিতে চাইছে না তারা। কিন্তু কে শোনে কার কথা! রাজার প্রিয় কবুতরটির ভীষণ অসুখ। কবুতরের জানের ছদকা হিসাবে জোড়া মহিষ কোরবানি দিচ্ছেন রাজা। একেই কি বলে ‘কবুতরের কল্যাণে মোষ বলি?’ হয়তো-বা। প্রচুর বাতাসা উড়ছে আজ খরখরে বাতাসে। ছেলেটির মন ভেঙেছে মেয়েটি। মন ভাঙা তো মসজিদ ভাঙার শামিল। কীভাবে পারল সে!– মনভাঙা ছেলেটি ভাবছে  সেটাই। বিদেশ-বিভূঁইয়ে কাজ করতে গিয়ে বিপাকে পড়ে ছেলে মারা গেছে। খবর আসেনি, তবে খবর হয়ে গেছে ঠিকই মায়ের মনে। ‘বিদেশে বিপাকে যার পুত্র মারা যায়, পাড়াপড়শি জানার আগে জানে তার মায়।’ এই যে আমি মরে গেছি বিদেশ-বিভূঁইয়ে, মা-র মন হয়তো জানছে ঠিকই। আচ্ছা, কবরে মা-র মনও কি পচে যাচ্ছে ধীরে-ধীরে? মা শূন্য হয়ে গেছেন, আমিও মিলিয়ে যাচ্ছি শূন্যে। হয়তো নতুন এক মা, নতুন এক আমি এসে যাচ্ছে পৃথিবীতে। প্রকৃতি তো শূন্যতা সহ্য করে না বেশিক্ষণ। পূজারির কী এক কথায় খুব চটেছে পুরোহিত। রাগে তার টিকি আস্তে-আস্তে কেমন খাড়া হয়ে উঠছে। ভোটপ্রার্থীরা পাড়ায়-পাড়ায় তো বটেই, এমনকি বেপাড়ায় গিয়েও ভোট না চেয়ে দোয়া চাইছে। ভিড়ের মধ্য থেকে কেউ একজন টিপ্পনি কেটে উঠল– ‘মজা মারবে ফজা ভাই/ আমাগো খালি ঘুম কামাই।’ সাধুস্বভাব একজন লোক বারবার ট্যারা চোখে তাকাচ্ছে তরুণী বারবণিতার লক্ষ্মীট্যারা মেয়েটির দিকে। বণিতাটি বিরক্ত হয়ে বিড়বিড় করে বলছে, ‘মানুষে খালি নজর দেয়। বালাই ষাট!’ আবার বলছে, ‘যার-যার বাচ্চা, তার-তার কাছে আচ্ছা।’ আর ওই যে প্রেমিক-প্রেমিকা-যুগল, ওদের  প্রেম কিছুতেই মেনে নিচ্ছে না সমাজ। সমাজ বড় কড়া। তাই ওরা এক মরণে দুইজন মরবার পরিকল্পনা করছে। ওদের নিয়েই তো গান বেজে চলেছে যুগ-যুগ ধরে-‘এক মরণে দুইজন মরে/ এমন মরা মরে কয়জনে//’। মরার পরে তাদের লাশ নাকি কেউ সৎকার করবে না, নদীতে ভাসিয়ে দেবে। দিক। নদী তো সর্বগ্রাহী, সর্বংসহা, সর্বসাক্ষী। তবে পানিতেও ওরা ভাসতে থাকবে, ভেসে চলবে যুগ-যুগান্তর। প্রেমের প্লবতাশক্তি খুব তীব্র। ফের বেজে উঠবে গান, ঢেউ তুলে আকাশে-বাতাসে-প্রেমের মরা জলে ডোবে না…/ ও প্রেম করতে একদিন, ভাঙতে দুইদিন, এমন প্রেম আর কইরো না দরদী//। ওই যে একজন গ্রহণ-লাগা নারী, নিদারুণ অর্থকষ্টে ভুগছে, ভুগছে নিকষ-কালো অন্ধকারে। সুখী ও স্বচ্ছল মানুষেরা উঁকি দিচ্ছে তার ঘরে। তারা অর্থকষ্টে ভোগা দেখছে। কে যেন বলেছিলেন, অর্থকষ্ট এমনই এক কষ্ট, যা অন্যসব কষ্টকে কাছেই ভিড়তে দেয় না। কে বলেছিলেন যেন! এরই মধ্যে আবার সমস্ত ভোগবিলাসের চূড়া দেখা শেষ হয়েছে কারো কারো! চূড়ান্ত বিবমিষা জেগেছে এখন তাদের। রাজা হওয়ার পর যেমন সন্ন্যাসী হতে ইচ্ছা করে, তেমনই ইচ্ছা করছে তাদের। ভোগবৃক্ষের মূল হচ্ছে প্রবৃত্তি; আর ফল, নিবৃত্তি। প্রবৃত্তির নিবৃত্তি ঘটে ভোগ সম্পন্ন হলে। শোনা যায়, ভোগ তার চূড়ান্ত চরিতার্থতা পেয়ে আসছে পরাক্রমীদের মাধ্যমে। মাইট ইজ রাইট। আদিকাল থেকেই নাকি তা-ই। আগে ক্ষমতা ভোগ করত ক্ষত্রিয়রা, ব্রাহ্মণদের সহযোগিতায়, তাদেরই সাথে মিথোজীবিতায়। এখন বৈশ্যদের ভোগের কাল। আর ভোগের ভাগাভাগি? ক্ষত্রিয়দের সাথে। তবে যুগ পাল্টে দেবার চেষ্টা হয়েছিল। শুদ্রযুগ কায়েমের চেষ্টা। সফল হয়নি। পরে হবে হয়তো-বা। তখন কি আবার সহজীবিতা হবে বৈশ্যদের সঙ্গে? কি জানি! তা কী করে হয়? কিন্তু কেমন যেন ওরকমই একটা গন্ধ, ওরকমই একটা আলামত! যেটাই হোক, হোক গিয়ে। আপাতত কারখানার প্রোডাকশন লাইনে এক বিপুল কনভেয়ার বেল্টে চড়ে দ্রুত ভেসে আসছে নাটবোল্টবিজড়িত একেকটি কিম্ভূত-কিমাকার গিয়ার। শ্রমিকেরা ঠুলি-আঁটা চোখে আফিম-খাওয়ানো বলদের মতো ঠায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে একেকজন একেক নাটে টাইট দিয়ে চলেছে ক্রমাগত। ওইসব বিচিত্র গিয়ার একসাথে জোড়ামোড়া লেগে কী-না-কী-এক অতিকায় অদ্ভুতকিম্ভূত কলকব্জা হয়ে না-জানি কোথায়-না-কোথায় চলে যাচ্ছে, মানুষগুলি জানে না কিছুই। জানার দরকারও নাই। টাকাই আসল কথা। কে বলেছে ‘অর্থই অনর্থের মূল’? কত টাকা, কেন টাকা, কী টাকা, কেমন টাকা, রং কী, জাত কী, অতশত জানার টাইম কোথায়? টাইম ইজ মানি, মানি ইজ গড, অ্যান্ড ইন গড উই ট্রাস্ট; দ্যাট্স অল। এমনিতেই টাকা এক কাগজি প্রতীক, এক প্রায়-ভার্চুয়াল-রিয়ালিটি, তার ওপর ফের তা নাকি আরও প্রতীকী হচ্ছে, আরও ভার্চুয়াল হচ্ছে। শালার প্রতীকস্য প্রতীক, ভার্চুয়ালের ভার্চুয়াল! হাতে-হাতের বদলে অনলাইনে– টাকার চলাচল, লেনদেন, বলাবল যাচাই, সবকিছু। শিগগিরি নাকি অদৃশ্য হতে যাচ্ছে টাকা। ভুতের মতো, জিনের মতো, কিংবা ঈশ্বরের মতো। ঈশ্বরের মহিমা পাবার জন্যেই নাকি এরকম বেপরোয়া ও অদ্ভুত হয়ে উঠছে সে। অদৃশ্য, কিন্তু অসীম ক্ষমতাধর। খেল দেখাবে, লীলা চালাবে, আড়াল থেকে। অবশ্য দুর্জনদের, দুর্যোধনদের কেউ-কেউ বলছে, ‘ওরকম তো গুয়েরও অসীম ক্ষমতা; এই যে গু, কেমন নরম (মাঝে-মাঝে অবশ্য কর্কশও হয়), ক্ষীরের মতো, অথচ পারা দিলে পা কেটে যায়; গুয়ে বাড়ি দিলে গুজব ছিটকায়, এমনভাবে যে, ঘটবার আগেই ঘটনা রটে যায় তামাম দুনিয়ায়। (ঘটনা ঘটনা হয় যখন তা ঘটে/ রটনা রটনা বটে যখন তা রটে//)। একমাত্র গুয়ের প্রভাবই স্থায়ী ও নিত্য, আর সব অনিত্যপ্রায়।’ তো? তাতে হলোটা কী? ধ্যাত্তেরি, ভাল্লাগে না আর। একদম ফেড-আপ। একেবারে ৩৬০ ডিগ্রি ফেডআপ। এত যুক্তি-তর্ক-আর্গুমেন্ট! কী হয় এত যুক্তি-তর্কে? এশেকে মেলায় বস্তু, তর্কে বহুদূর। ওদিকে লীলাকারগণ চালিয়েই যাচ্ছে নিত্যলীলা। নিত্য ধরে ধরে লীলা, ফের লীলা ধরে ধরে নিত্য…। আড়বাঁশি বাজিয়েই চলেছে কলির কৃষ্ণকুল। সুরের সম্মোহে উদ্ভ্রান্ত হয়ে পড়িমরি ছুটছে গোপ-গোপিনীরা। ধাবনধর্মই নাকি এ-যুগের ধর্ম। টাকাই এ-জমানার ঈশ্বর (দুঃখিত, কথাটা বোধহয় আগেও বলা হয়েছে একবার)। সকাল হতে-না-হতেই নানা জাতের সব ইঁদুর বাঁশির চুম্বকটানে মন্ত্রচালিতের মতো বিচিত্র বাক্স ও খোঁড়ল থেকে, খোপ ও খুপড়ি থেকে, গর্ত ও গহ্বর থেকে, চতুর্দিক থেকে বেরিয়ে নানান পথ ধরে হুলুস্থুল করে ছুটে এসে শেষে হুড়মুড় করে ঢুকে পড়ছে ইতস্তত ছড়িয়ে রাখা জালে, ফাঁদে। কৃষ্ণের হাজার গোপিনী, রাধার কৃষ্ণ ভিন্ন আর কেউ নাই। মুরলিধরেরা ইতোমধ্যেই বলতে শুরু করেছে, ‘উই আর আলফা, অ্যান্ড উই আর ওমেগা, উই আর অল।’ প্রলেতারিয়েতেরও নাকি রূপান্তর ঘটছে এই জমানায়। ধারণ করেছে বাহারি এক নাম– প্রিক্যারিয়েত। পাচ্ছে অদ্ভুত-বিচিত্র-বাহারি সব কাজ। মানুষ পর্যবসিত হচ্ছে রকমারি সংখ্যায়। সংখ্যাদের নির্বিকার বুকে ধরে থাকছে বিচিত্র সব কার্ড, হরকিসিম সব দলিল। সংখ্যার নিরঙ্কুশ শাসন, সংখ্যার অকহতব্য অত্যাচার… সংখ্যা ও কার্ডের কাঁটাতারে একেবারে জড়িয়ে-মড়িয়ে আচ্ছামতো আটকা-পড়া নিস্তারহারা প্রাণ-জেরবার মানুষ। সারা জাহানকে পুরাদস্তুর কয়েদখানা বানানোর প্রকল্প প্রায় শেষ। কয়েদির সারা শরীর ও মন জুড়ে ঝুলছে খালি নম্বর আর নম্বর, কার্ড আর কার্ড। কয়েদি খালাস পাবে ওই একবারই… তখন ওই নম্বর-টম্বর, কার্ড-ফার্ড সব খুলে ফেলে পুরো দিগম্বর হয়ে দে দৌড়, ঝেড়ে দৌড়, দৌড় দৌড় দৌড়… দিগন্তের পানে… তো ওইখানেও আরেক জ্বালা, ভূগর্ভস্থ আরেক কারাগার! তবে রগড় আছে। সেখানে আরেক ‘মনোমোহন বশীকরণ রাধারমণ রায়/ মদ্যসহ আড্ডা মারে, অট্টহাস্যে বলে,/ রগড় যদি বুঝতে চাস, মাটির তলে আয়//।’ কাঁটাতারের এত-এত জটাজটিল জট, গিঁট ও গিটঠু… মাঝে-মাঝে অতিচালাক শিয়ালও ফাঁদে পড়ে, ছাড়ে উপর্যুপরি ত্রাহি আওয়াজ। সেরকম কিছু আর্তনাদ শোনা যাচ্ছে। কেউ-কেউ বলছে, শিয়াল হচ্ছে হাইপার-অ্যানিম্যাল, আবার কেউ বলছে, হাইপো-…। ক্যারক্যার আওয়াজ উঠছে। ও কিছু না, ইতিহাসের ব্যাকল্যাশের শব্দ। থার্মোমিটার, ব্যারোমিটার, জ্বরাঙ্ক, প্রেষাঙ্ক সব ওঠানামা করছে একযোগে। রক্তমোক্ষণ হচ্ছে। ঘোরতর। ধস নামবে নাকি একেবারে! শোনা যাচ্ছে সাজ-সাজ রব, থেকে-থেকে মারণকলের কলরব। মহাহুলুস্থুল। কৃতশপথ শত্রুরাও মিত্র হচ্ছে, আবার পরম মিত্রদেরও কেউ-কেউ শত্রু। ওদিকে মার্ক্স-মুহাম্মদ নাকি একযোগে লড়বার পরিকল্পনা করছেন, লড়তেও নাকি শুরু করে দিয়েছেন এক অতিকায় একচক্ষু আজদাহা দৈত্যের বিরুদ্ধে। শোনা কথা। শ্রীকৃষ্ণও নাকি যোগ দেবেন লড়াইয়ে, তবে এখন নয়, পরে। ইতিহাসের কিছু অস্থির কালখণ্ডে পশ্চিম উপকূল জুড়ে হঠাৎ-হঠাৎ হিড়িক পড়ে যাচ্ছে কখনো ডাস ক্যাপিটাল কখনো আল-কোরান পাঠ করবার। সমস্ত রেকর্ড ভেঙে ব্যারোমিটারের পারদস্তম্ভের মতো বিরতি দিয়ে কাঁপতে-কাঁপতে তারা ঠেলে উঠে যাচ্ছে বেস্ট সেলারের শীর্ষে। শোনা কথা। শ্রীমৎভগবৎ গীতাও নাকি চলে আসছে শিগগিরি। শোনা কথা। রেড মার্ক্স একটু একটু গ্রিন হচ্ছেন। গ্রিন মার্ক্স ধীরে ধীরে পরমাপ্রাকৃতিক… মাইল রূপান্তরিত হচ্ছে মাইক্রোসেকেন্ডে। মনে তো হয় সংগীতের মতো কবিতাও এক গুরুমুখী ডিসিপ্লিন, এক দীক্ষাপেক্ষ ব্রতাচার। সে-গুরু হতে পারে রক্তমাংশের, হতে পারে প্যাপিরাসের। কবিতাভুবনেও তাই নানা ঘর, ঘরানা। আমি যখন ঘরে থাকি না তখন আমার টেবিলটা কি থাকে? নাকি না? বাকশোর ভেতরকার বিড়ালটি নাকি একইসঙ্গে জ্যান্ত ও মৃত। তা কী ক’রে সম্ভব!? একটি কণা নাকি একইসঙ্গে থাকতে পারে এই এখানে এবং ওই যে ওইখানেও। এটাও-বা কীভাবে! এই যে সব আজগুবি যৌগপত্য… এগুলি কি লৌকিক, নাকি দৈবিক? নাকি ডাহা ভৌতিক? শাকাহারীরা কি হয়ে উঠছে বেঘোর মাংসাশী? আর মাংসাশীরা নীরব নিরীহ তৃণভোজী? কে জানে! তবে এই যে শো চলছে, অভিনীত হয়ে চলেছে এই যে নাট্যমালা, তামাশাপ্রবাহ, এ নাকি চলতেই থাকবে নিরন্তর। কোনো দাঁড়ি-কমা-বিরামচিহ্ন নাই নাকি এর। মনে হচ্ছে, কে যেন নেপথ্য থেকে বলছে– দ্য শো মাস্ট গো অন। ইট ওন্ট স্টপ। নো ওয়ে, নেভার। এইসব গায়েবি আওয়াজ নাকি আগে শোনা যেত, কেউ-কেউ বলেন সেমেটিক, কেউ-কেউ বলেন আর্যভাষায়। এখন শোনা যাচ্ছে পরিষ্কার ইয়াংকি জবানে। ভরকেন্দ্র সরে সরে যাচ্ছে আওয়াজের, ওঙ্কারের। পূর্ব থেকে পশ্চিমে। তবে আস্তে-আস্তে কি আবার সরে যাবে পশ্চিম থেকে সুদূর পূর্বে, কালের আহ্নিক-বার্ষিকের নিয়ম মেনে?

 

মুখোমুখি

(কবি সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ, শত্রুতর বন্ধু, বন্ধুতর শত্রুবরেষু)

 

কে হে তুমি প্রতিবাক্য ছুড়ে দিচ্ছ বারবার ওইপার থেকে

প্রতিপদ স্থানাঙ্কে দাঁড়িয়ে আমার?

তোমার তিরের হালকা টঙ্কার আর ধনুকের মন্দ-মন্দ জ্যা-নির্ঘোষ

বায়ুর প্রথম স্তরে আলোড়ন তুলেছিল ভোরের বেলায়–  

আয়ত-চৌকো, ত্রিকোণ-বর্তুল…

 

এখন এ অপর বেলায়,

ওইসব শব্দের বুদবুদ বহুগুণিত হয়েই ফেটে পড়ছে

ঠা-ঠা মেঘনাদের ভাষায়–

আচমকা কোনো বোমা ফাটলে

যেমন সহানুভূতিবশে আশেপাশে পুঁতে-রাখা

সব বোমা ফাটতে থাকে এক-এক করে, সেইরূপ…

সেইরূপ বিস্ফোরক সহানুভূতির লীলা

লীলাচ্ছ হে গুপ্ত লীলাকর।

 

ভিন গোলার্ধের কোনো নাম-না-জানা

মর্কটে-কর্কট-লাগা এক জম্বি-প্রজাতন্ত্র থেকে ছুটে আসছে

মারণজীবাণু-মাখা জং-ধরা একাঘ্নী হারপুন।

পৃথিবীতে এত প্রাণী, তা থুয়ে কেবলই খুঁজে-খুঁজে

আমার দিকেই ধেয়ে আসে

হারপুনের দাঁত-খেঁচা হিংস্র আস্ফালন।

 

বীজাণুব্যসনে ন্যুব্জ এই নবদ্বার দেহ, এ-ব্যাধিমন্দির, এই ভূতাবাস, একে

উপলক্ষ করে আর কত ছুড়ে দেবে কল্প-ঔষধ, প্রবোধ, প্রতিবাক্যরাশি?

এমনিতেই তোমার জ্ঞানাঙ্কুশের খোঁচা খেয়ে হয়েছি কাহিল

তার ওপর এতসব প্রবোধ, ঔষধকল্প,

এই যে উপর্যুপরি সিমপ্যাথেটিক ডেটোনেশনের খেলা,

উড়াল পাখির ঝাঁকে ছুড়ে দেওয়া ভেলকিজাল,

হারপুনের ভানুমতি খেল,

জ্ঞেয় দিয়ে অজ্ঞেয় ধরার লীলা… 

অসহ, অসহ্য লাগছে সব

কিন্তু কখনোই বার্তা পাঠাব না থামাতে এসব।

 

থেকে-থেকে অবমাননার মতো গায়ে এসে বেঁধে

বিরামচিহ্নিত ধোঁয়াচিৎকার, তর্জন আর কেরদানিধ্বনি।

প্রত্যুত্তরে পাঠাই তোমার প্রতি উচ্চকিত যত

ভাবনা আমার।

কিন্তু কী যেন কী ঘটে যায়

আমারই সশব্দ ভাবনারা হায়

আমাকেই ফাঁকি দিয়ে নিঃশব্দে মিলায়

হোগলা আর কাঁকড়াভরা হিজিবিজি জলায়, জংলায়।

 

জ্বরান্তক বটিকা পাঠাই,

পাল্টা পাঠাও হে তুমি পাতলা সিরাপ।

অর্শে যে সিরাপ, মধুমেহতেও তা-ই…

বড় আতান্তরে পড়ি বারবার।

 

আসলে কে হে তুমি? নেপথ্যে, বহুদূর যবনিকার আড়াল থেকে

বারবার হেঁকে যাচ্ছ সেই একই হিতেচ্ছা হিমেল…

“পূতি ঘেঁটে ঘেঁটে পূত হয়ে ওঠ

পুঁথি ঘেঁটে ঘেঁটে হয়ে যা রে তুই ত্রিপণ্ড পণ্ডিত

ময়লা-ঘাঁটা কীট হয়ে কাটিয়ে দে ঝকঝকে একটি জীবন।”

 

এক ঘোড়া একাই ধারণ করে তিন হর্স-পাওয়ার–  

আমার সে-তুফানাশ্ব একদা ছুটত

মত্ত হারিকেনের উচিত ঘূর্ণি তুলে। 

আজ অশ্বধর্মে মতিগতিহীন আমার সে-ঘোড়া 

ব্যাটারি-ফিউজ হয়ে পড়ে আছে আস্তাবলে।

 

অন্তিম-গাঁজলা-ওঠা প্রিয়তম সে-ঘোড়ার

নিবিড় নিতম্বে কষে চাবুক দাগিয়ে

জলবিছুটির পাতা ঘষে দিয়ে গুহ্যপ্রদেশে, উঠিয়ে নিয়ে

যাব ঠিকই রিচার্জ করাতে।

জিল্লিক পাড়তে পাড়তে সোজা ছুটে যাবে

জিল্লিকপাড়ার সেই বেঘোর ব্যাটারি-ময়দানে। 

 

বুস্ট চার্জ দেব

জং-পড়া টেংরি আর খুরে খুরে দেব কেরাটিন ট্রিটমেন্ট।

নিজের মেরুদণ্ডেও সেরে নেব টুকিটাকি মেরামত, রাংঝালাই।

তারপর, চূড়ান্ত চার্জিত ওই ঘোড়াকে ছোটাব 

তুফানতরঙ্গ তুলে তোমার দ্রাঘিমা বরাবর।

 

পথিমধ্যে বাড়বাগ্নি, জলে ও জঙ্গলে, সাগরে, ভূধরে, গিরিকন্দরে…

বারুদবাতাসে ঠাসা আবহবলয়–  

তারই মধ্য দিয়ে ক্ষিপ্র চৌকশ চকমকি ঠুকতে ঠুকতে ছুটতে থাকব আর

আমার সে-তুফানাশ্বের উড়তে-থাকা ধাবন্ত ধারালো

কেশরের ঘষা-লাগা-মাত্র

হাওয়ায় লাফিয়ে উঠবে লকলকে রোহিতাশ্বের শিখা।

 

পথে ঘনঘন-রং-বদলানো গোয়েন্দা গিরগিটি, কুতক্ষক,

কাঁটার সাঁজোয়া পরে হঠাৎ হাজির হওয়া শজারুবাহিনী,

জলে তিমি, তিমিঙ্গিল, ডাঙায় খাটাশ,

তিরিক্ষিমেজাজ কৃশ কাকলাস, বৃশ্চিকের ক্যামুফ্লাজ,

মৌমাছির মাধুকরী, পায়রার কপোতবৃত্তি আর

উভচর ঘোড়েলের বেতালা ঘোড়েলকাণ্ড ঠেলে ঠেলে

উজিয়ে এগিয়ে যেতে হবে, তা-ও জানি…

 

পর্বতের ভাঁজ থেকে খসে গিয়ে অভিযাত্রীদল

টুপটাপ ঝরে পড়বে সরু গিরিপথ-দিয়ে-চলা চোরাই মাল আর

মালের কারবারিবাহী খচ্চরের কাফেলার ওপর।

 

পুলসেরাতের মতো সরু পুল– তার ওপরে

ভল্ল-হাতে নাঙ্গা পুলিশের মতো সার-সার দাঁড়ানো

একচক্ষু হিংস্র ঊনমানব, বামনপ্রজাতির।

তাদের কিনার দিয়ে তুরন্ত তাড়িয়ে

উড়িয়ে নিয়ে যাব ঘোড়াকে আমার।

ছুটতে ছুটতেই ছোঁ মেরে উঠিয়ে নেব

দু-একটি শস্ত্রপাণি বিচ্ছুটে বামন।

 

ওদিকে নটখটে কিছু হনুমান নিজ-নিজ লেজে

আগুন লাগিয়ে নিয়ে ডাল থেকে ডালে

চিল্লাতে চিল্লাতে ধোঁয়া-মাখা হুতাশন দিয়ে যাবে ভিমরুলের চাকে।

লেগে যাবে মহা-ভজঘট, শুরু হবে ভেলকিনাচ

উল্লুক-ভল্লুক-সিংহ-শুয়োর-তরক্ষু-অধ্যুষিত ওই জঙ্গল-সাম্রাজ্যে। 

জাঁকান্দানি শুরু হয়ে যাবে রীতিমতো

পরাক্রান্ত স্বরাট সিংহের একচ্ছত্র পরাক্রমে।

 

বেলাশেষে অ্যাশফল্টের ঘোর ধোঁয়াভস্মের মতন

মিশিকৃষ্ণ অমানিশা নামবে এক আয়ামে জাহেলিয়ার।

শতশত চেরাজিভ সরীসৃপ-চমকানো আঁধার আকাশ… 

ছিঁড়ে-যায়-যায়-প্রায় শনি ও রবির মাঝখানকার

সঘন বুনটবদ্ধ সুদীর্ঘ সেলাই… 

 

অবশ্যই দেখা হবে একদিন। এবং অচিরেই।

তারপর লড়াই হবে মুখোমুখি সেয়ানে সেয়ান…

 

আড়াই প্যাঁচের চালে, গণেশ-উল্টানো গ্যাংনাম তালে

ফণা-তোলা ফানাফিল্লা ছন্দে, ফোস্কা-ফোটা অশ্বগন্ধে

তিন্তিড়ি গাছে জোনাকির ঝাঁকে তিড়িংবিড়িং ভেলকির ফাঁকে

দ্যাখো-না হে খালি বিতিকিচ্ছিরি

কী-কী ঘটে আর মহা-ধুন্ধুমার ধুলান্ধকারে আ-কারে ই-কারে

হ্রস্বলিদের উল্টাপাল্টা উল্লম্ফনে

ফাটাফাটি আর মারকাটারি শর্ট-সার্কিটে

তামাশা খামোশ-করা পাল্টা-তামাশায়

সার্কাস উল্টে-দেওয়া অ্যান্টিসার্কাসে 

গজব-জাগানো কেয়ামত যেন ব্লাডার-ফাটানো গেণ্ডুয়া খেলা…

দ্যাখো-না হে খালি,

কী-কী ঘটে আর মহা-ধুন্ধুমার ধুলান্ধকারে আকারে বিকারে

হ্রস্বলিদের চিল্লাপাল্লা নাচনে-কুঁদনে

ব্লাডার-ফাটানো গেণ্ডুয়া খেলা…দুর্যোধনে দুঃশাসনে…

খুন ও জখম শকুন শকুনি অশ্বত্থামা…

তোমাদের ওই আরাম-আরাম তুলতুলতুলে তাসের রাজ্যে

ঘটিয়ে দেবই মৌলিক হাঙ্গামা…

 

দেখো, বৃথা যেন নাহি যায় কিছুতেই

আমাদের অনচ্ছ অথচ উচ্চ-ভোল্টের সমরনীতি, যুদ্ধরঙ্গ

এবং এ জঙ্গসমীকরণে সুমেরুপক্ষ হও যদি তুমি

আমি হব নিশ্চিত বিষুবপার্শ্ব তবে।

 

যুযুধান আমরা দু-পক্ষ মিলে, পরস্পরে,

মেটাব গায়ের ঝাল

গরমাগরম।

কেবলই ঘটিয়ে যাব লাগাতার

প্রভূত ক্ষয়ক্ষতি আর

বলাই বাহুল্য, সব ক্ষতিই অবধারিতভাবে কোল্যাটারাল…

 

সখাসংগীত

উদ্গান।

এই উদ্গান সখার উদ্দেশে।

 

অদেখা অচেনা এক সখার জন্যে আকাঙ্ক্ষা–

যে রঙিন। যে বহুদূর।

দূর কোনো অজানায় যার অবস্থান।

এবং যার কাছ থেকে, থেকে থেকে, অনিয়মিতভাবে, ভেসে আসে

কখনো সন্দেশ, কখনো সন্ধ্যাবাতাস,

কখনো উস্কানি, কখনো সমর্থন,

কখনো আনুগত্য, কখনো-বা অভিভাবকত্ব, মৃদু;

কখনো-বা রৌদ্রঢালা দিগন্তবিস্তৃত ঔপনিবেশিকতা।

 

আর কিছু বাক্য কিছু গান

কিছু রূপ কিছু প্রাণ–

এইসব আর যা যা ভেসে আসে…

সুরশলাকার মসৃণ কাঁপনের মতো করে কেঁপে কেঁপে

বাতাসে মিহি তরঙ্গ তুলে ভেসে আসে…

 

আমার সখারা দূরের, অনেক দূরের শহরে থাকে।

শুধু

একটি সখার নদীর কিনারে বাস

বিদেশী নদীর রাংতা-মোড়ানো বাঁকে

আমার বন্ধু নদীর কিনারে থাকে।

 

দূরে তার দেশ কাঁপা-কাঁপা রূপকাহিনির মতো কাঁপে

সখাটি আমার নদীর কিনারে থাকে।

 

এবেলা আমার গৃহ নাই কোনো সখা,

কী যে ঘোর গৃহতৃষ্ণা জাগছে তাই। 

মনে করি, যাব তোমাদের দেশে চলে

নাকি

তুমিই আমাকে অধীনে তোমার ধীরে ধীরে টেনে নেবে?

 

তোমার অধীনে, অধিগ্রহণে আর শাসনের নীচে

একদিন জানি আমাকেও তুমি ধীরে ধীরে টেনে নেবে।

আমাকে তোমার পালনের, অভিভাবনের ছায়া দিয়ে

পুরোপুরি দেবে ঢেকে।

আহা

এমন সোনালি বন্ধুর খোঁজ পেলাম যে কোত্থেকে!

 

তোমাদের দেশে সন্দেশক্ষেত থেকে

হাওয়া এসে লাগে থেকে থেকে এই দেহে।

অচেনা পুলক শিহর তুলছে পালকে।

সন্ধ্যার কালে বার্তা পাঠালে রূপকে ও সংকেতে;

কিছু তার পাই ডাকে

আর কিছু আসে হঠাৎ দমকা তথ্যপবনে ভেসে।

তথ্যপবনে বন্ধু আমার সন্দেশ পাঠিয়েছে।

 

বোধ করি এই হাওয়াটা প্ররোচনার।

হঠাৎ খেয়ালে বদলে ফেলে দি’ এসো

পরস্পরের আগুন আর অঙ্গার–

প্রেরিত বার্তা উস্কিয়ে যায় এইসব অভিলাষ।

আমার সখার নদীর কিনারে বাস।

 

অদেখা অজানা বন্ধু আমাকে

জড়িয়ে ফেলছে অচেনা স্মারকে…

 

এবেলা আমার কেউ নেই পৃথিবীতে

কী যে আত্মীয়-পিপাসা জাগছে প্রাণে!

টানায়, পড়েনে, লীলায়, অবলীলায়

অমান্য করি প্রকাশ্যে ভেদরেখা

তোমাকেই তবে করে ফেলি আত্মীয়

আজিকে আমার বন্ধুর গায়ে রঙিন উত্তরীয়।

 

তোমার অধীনে, অধিগ্রহণে, আর শাসনের নীচে

একদিন জানি আমাকেও ঠিক ধীরে ধীরে টেনে নেবে।

আমাকে তোমার পালনের, অভিভাবনের ছায়া দিয়ে

পুরাপুরি দেবে ঢেকে।

তার আগে সখা নিজে

খুব অনুগত আর দ্রবীভূত থাকুক একটি দিন

আমার এই রচনায়

এই প্রশাসনে, প্রহারে এবং আজ্ঞা-অনুজ্ঞায়।

 

শুধু

একটি দিবসে সুশীল বালক থেকো,

পরদিন থেকে ধীরে ধীরে তুমি অবাধ্য হয়ে যেয়ো।

কিংবা না হয় হয়ে থেকো তারও পরে

জটিল আর দুর্বোধ্য অনেক দিন।

শুধু একদিন

আমার বন্ধু আমারই প্রভাবে আমার এই রচনায়

ছায়াসহ উড্ডীন।

 

ভিন্ন ভুবনে ভিন্ন নদীর বাঁকে

সখাটি আমার নদীর কিনারে থাকে।

দূরে তার দেশ কাঁপা-কাঁপা রূপকাহিনির মতো কাঁপে

আমার বন্ধু নদীর কিনারে থাকে।

 

উৎসভূমিতে ভূমিধস নামে, আর

একে একে সব অবলম্বন হচ্ছে প্রত্যাহার।

বাকল লুপ্ত, ভাঙা-ভাঙা ডাল, মরিচাপ্রাচীন দেহ,

পাখিপল্লবহারা–

তবুও যে এই দারুণ দূষণদিনে

দাঁড়িয়ে রয়েছি ধুধুতর নির্জনে–

শুধু তোমারই সমর্থনে।

তোমার পাঠানো এই ধরনের বিরল সমর্থনে।

এ রচনাটিও পুনর্বাসিত তোমারই উদ্ভাসনে।

 

আমার বন্ধু নদীনির্দেশ করে।

থমকে-যাওয়া অনেক প্রকার নদীকে সচল করে।

 

তোমার আমার সরল সূত্র, সহজ বাক্যগুলি

চাপা পড়ে আছে নিস্তারহীন তথ্যজটের নিচে।

ফুরিয়ে যাবেই একদিন ঠিক আবর্জনার দিন–

তেড়েফুঁড়ে যত জট আর জঞ্জাল

আমাদের কথা আলো দিয়ে যাবে জোনাকি-পরিভাষায়।

 

ঠিক একই দিনে একই ক্ষণে

তুমি আমি মিলে উধাও উড়ালে

চলে যাব এই দেহ ছেড়ে, এই যৌথরচনা ফেলে।

আশেপাশে কত জরুরি ভাণ্ড, মহান কীর্তি,

গুরুত্ববহ স্থাপনাসমূহ আর,

কথিত সিভিল দুনিয়ার।

 

ভাণ্ড ভেঙে ফেলে, স্থাপনা উল্টিয়ে, যত

কীর্তি একাকার কীর্তি গড়াগড়ি যাবে…

মারণে উচাটনে কালের সন্ত্রাসে, যত

বিরামচিহ্নের প্রভাবে প্রটোকলে প’ড়ে

ঊহ্য হয়ে যাব আমরা একদিন ধীরে

সন্ধ্যানদীতীরে সন্ধ্যাভাষাকূলে

রঙিন মেঘেদের সন্ধ্যাচ্যানেলের ভিড়ে।

 

তুমি আমি মিলে, প্রস্থান থেকে প্রস্থানে যাওয়া-কালে

পাল্টিয়ে যাব এক এক করে

রং-রূপ-ভাষা, ঘটনার–

দৃশ্যের থেকে দৃশ্যের।

রেডিও ঢেউয়ের চূড়ায় চূড়ায় চেপে,

হোক হঠকার, তবু একদিন ডানা

ভাসাব বহির্বিশ্বে।

 

ঠিক একই দিনে একই ক্ষণে

তুমি আমি মিলে উধাও উড়ালে

চলে যাব এই দেহ ছেড়ে, এই যৌথরচনা ফেলে।

 

অদেখা অচেনা বন্ধু আমাকে

জড়িয়ে ফেলছে রঙিন স্মারকে…

 

তুমি আমি মিলে, প্রস্থানকালে, চলো

যথাযথভাবে নদীনির্দেশ করে যাই

থমকে রয়েছে অনেক প্রকার নদী।

বড় বড় সব উত্থানগুলি আজ

স্তব্ধ নদীর কিনারে অবস্থিত।

স্তব্ধ নদীকে করে দিয়ে যাই চলো

একটি তুড়িতে সচল, কল্লোলিত।

 

ভিন্ন ভুবনে ভিন্ন নদীর বাঁকে

সখাটি আমার নদীর কিনারে থাকে।

দূরে তার দেশ কাঁপা-কাঁপা রূপকাহিনির মতো কাঁপে

আমার বন্ধু নদীর কিনারে থাকে।

 

যুগ যুগ ধরে আড়ালে আড়ালে

নদীর সূত্রে, মেঘের চ্যানেলে

বিছিয়ে চলেছি আমাদের যোগাযোগ।

এই কবিতাটিসহ

সখাকে, আমাকে, নদীর আলোকে বিবেচনা করা হোক।

 

সার্কারামা

আজ এক রুগ্ন অগ্নিকুণ্ডের কিনারে বসে আছি জবুথবু

চারদিকে চলমান সার্কারামা

ছবিগুলি খুব দ্রুত নাচতে নাচতে আসে আর যায়।

 

বহু লক্ষ বর্ষ আগে প্রকৃতির লোহিততন্ত্রে-তন্ত্রে তীব্র দাহ

অণ্ড-আত্মা থেকে দ্রুত প্লাবনের বেগে ঢেলে ফেলে জন্মশুক্র

এত বাঁধ, এত যে বিন্যাস,

শুক্রগতি থামছে না তবু

উর্ধ্ব থেকে প্রতিহত হয়ে আসে প্রতিনিধি, অগ্নিকোণে।

রেতঃস্রোতে অবিরল তাপ ঢালে সপ্তবহ্নিজাল

অসহ্য অসহ্য এত বর্ণবিকিরণ, এত বহুতল হীরকের সন্ত্রাস

এত বাষ্প, গন্ধ, পঞ্চভূতের এতটা পচন ও মন্থন!

স্রোতে ঘোরে মহাচক্র

চক্রে চক্রে পাপ, পুঞ্জীভূত ফেনা

ফেনা থেকে প্রাচীন ডুবোপাহাড়ের মতো

তীব্র জলধ্বনিসহ ঘুরে ঘুরে উঠে আসে নতুন কিরণ

গনগনে নতুন কীটাণু

সদ্যোজাত তেইশ-জোড়া লাল ক্রোমোজমের উল্লাস।

 

বনবৃক্ষে বাড়বাগ্নি জ্বলে

ধুম্রপাকে হারিয়ে ফেলে পথ

উচ্চ স্বরে কাঁদতে থাকে ব্যাঘ্র ও ম্যামথ।

 

নদীর জলে ওড়ে ভস্ম, ওরে মৎস্য, কোথায় যাবি তুই

বাইসনেরা ধুলায় গড়ায়

পক্ষীরা সব পক্ষ গুটায়

দিসনে ঠোকর, পুড়বে কেবল পুড়বে রে চঞ্চুই।

 

হিংস্র নখরা বিকট দন্তুর

অতিকায় সব প্রাচীন জন্তুর

চিৎকার শোনা যায়

কাতরায়, তারা কাতরায়

শুধু আলকাতরার জলাশয়।

 

অরেঞ্জ নদীর তীরে নামল রাঙা প্রমিথিউস

মৃত্তিকা-স্তর কাঁপল মৃদু-মৃদু

অরেঞ্জ নদীর তীরে

ধীরে ধীরে অঙ্কুরিত রঞ্জিত সব মানুষ।

 

রাত্রিগস্ত দুই ঈশ্বর মাদুরে ঝিমাতে থাকে

মাটির পাত্রে অস্থিপোড়ানো অঙ্গার, কার্বন

বিনিয়ে বিনিয়ে কাঁদে এক নারী বৈতরণীর বাঁকে

ওই অবিনাশী পৃথিবীর মতো আইবুড়ো, কার বোন?

 

হাম্মুরাবি ভেসে ভেসে আদিকৃত্যে যায়

উঁচিয়ে রাখা তর্জনীতে তার

একটি ফড়িং উড়ে উড়ে শুধু বসতে চায়।

 

ঝাঁক বেঁধে মাঠে ভ্যান্ডালদল নামে

দষ্ট ফসল চিৎকার ছোঁড়ে দীর্ঘে এবং বামে

সাদা হিংসায় গতি থমকায়

প্রবাহিত মানুষের।

শস্যকীটের লাল থেকে ঝরে তেজ

পানকৌড়ির দিকে তেড়ে আসে বন্যবহ্নিলেজ।

 

সহসা শূন্যে সালফার-মুঠি উড়ে যায় ক্রীতদাস

বায়ুমণ্ডল পুড়ছে খুব তখন

আকাশে আকাশে রক্তকাণ্ড, হঠাৎ বিস্ফোরণ

ক্রীতদাস ফেটে বীজাণুর মতো অসংখ্য ক্রীতদাস

আকাশের থেকে হাঁস ভেসে আসে হাঁস।

 

আকাশের থেকে হাঁস নেমে আসে হাঁস

মধ্যরাত্রে বুদ্ধ জড়ায় গাত্রে

পশমীর মতো ছাইরঙা সন্ন্যাস।

আকাশের থেকে হাঁস ভেসে আসে হাঁস।

 

সার্কারামায় আসে উপসংহার

স্থিত গৌতমও গতির আহার, বোধির পাশেই অগ্নিপাহাড়

জ্বালামুখে জ্বলে মানুষের স্নায়ু, মগজ এবং স্নেহ

নিথর রেটিনা ধরে রাখে সাত রশ্মির মৃতদেহ।

 

গড়িয়ে নেমে আসে খঞ্জ লুসিফার

কাঁধের ডানে বামে আণব শীতকাল

চুলের হিসহিসে পতিত ইতিহাস

অন্ধকার দিয়ে গঠিত প্রস্তর।

জাগছে কালে কালে ইচ্ছা অদ্ভুত

ধাতব মুদ্রার, বিরামচিহ্নের।

 

মেঘের কশ বেয়ে গড়িয়ে নেমে আসে

গড়িয়ে নেমে আসে খঞ্জ লুসিফার

অন্ধকার দিয়ে গঠিত শিলাকাল

প্রতিদ্বন্দ্বিতা টোটেম ও মনীষার।

 

এইবার এই অবেলায়, হে জ্ঞাতি, হে রহস্যের উপজাতি,

অন্তহীন শিবলিঙ্গের প্রহরী,

গলমান গ্রাফাইট-স্তরের ওপর গড়াগড়ি দাও

পুনর্বার পাপ করে ফিরে এস

পুনর্বার মুদ্রণযন্ত্র ভেঙে ভূমিসাৎ করে দাও হে অর্জুন

স্মৃতিভ্রষ্ট ব্যাধ, স্মরণকালের হে অবিস্মরণীয় ব্যাধি।

 

পঞ্চভূতের শাসিত নিয়তি

পৃষ্ঠদেশের ক্ষত আর ক্ষতি

তীব্র ক্ষুধা ও খাদ্যের গতি

বিস্মৃত হও, বিস্মৃত হয়ে যাবে।

 

বৃত্ত ঘোরে মহাবৃত্ত

বিনাশ, মহামারী নৃত্য

মনুকুলের শেষকৃত্য

প্রাণী এবং পতঙ্গের সাথে।

 

শ্রবণ বধির করে দিয়ে বয় মহাবৃত্তের হাওয়া

বস্তুর থেকে বিকশিত ফের বস্তুতে ফিরে যাওয়া!

শ্রবণ বধির করে দিয়ে বয় মহাবৃত্তের হাওয়া

শ্রবণ বধির করে দিয়ে বয় মহাবৃত্তের হাওয়া

শ্রবণ বধির করে দিয়ে বয় …… ……. …..

শ্রবণ বধির …… ……. ……. ……. …….

শ্রবণ …… ……. ……. ……. ……. ……



 

M Khan

মাসুদ খান

কবি, লেখক, অনুবাদক। জন্ম ২৯ মে ১৯৫৯, জয়পুরহাট জেলার ক্ষেতলালে। পৈতৃক নিবাস সিরাজগঞ্জ। প্রকৌশলবিদ্যায় স্নাতক, ব্যবসায় প্রশাসনে স্নাতকোত্তর। তড়িৎ ও ইলেকট্রন প্রকৌশলী। প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয় বুয়েটের হল ম্যাগাজিনে, ১৯৭৯-তে। জাতীয় পর্যায়ে লেখা প্রকাশিত হতে শুরু করে মধ্য-আশি থেকে, বাংলাদেশের বিভিন্ন লিটল ম্যাগাজিন ও সাহিত্যপত্রিকায়। পরবর্তীকালে বাংলাদেশের জাতীয় দৈনিকসমূহে এবং বাংলাদেশ ও ভারতের বিভিন্ন সাহিত্য-পত্রিকায় ও কবিতা-সংকলনে। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ : পাখিতীর্থদিনে (১৯৯৩) নদীকূলে করি বাস (২০০১) সরাইখানা ও হারানো মানুষ (২০০৬) আঁধারতমা আলোকরূপে তোমায় আমি জানি (২০১১) এই ধীর কমলাপ্রবণ সন্ধ্যায় (২০১৪) দেহ-অতিরিক্ত জ্বর (২০১৫)

ই-মেইল : masud_khan@yahoo.com

লেখা সম্পর্কে মন্তব্য

টি মন্তব্য