হাসান রোবায়েত-এর ছোটগল্প ‘তু সো, তু, পুরু আমর’

আলকাতরায় মাখা নৌকার মতো একটা রাত ভেসে যাচ্ছে পৃথিবীপাড়ের বক্রতা ধরে, সম্ভবত তখনি আরেকবার বউয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে সে ভাবতে থাকে—প্রত্যেকটি সম্পর্কই আসলে একেকটি ইলিউশনের খোয়ার।



শিমুলিয়ার উত্তর দিকে যেখানে দুধখাল গর্ভিণীর পেটের মতো বক্রতায় অতিরিক্ত নদী হয়ে উঠেছে, স্রোতহীনতার সন্ধ্যায় বহুদূর থেকে ভেসে আসা কচুরিপানার দাম সেই জলাঙ্গীর সুডৌল বাঁকে আটকে গিয়ে বেগনী ফুলের স্বচ্ছতায় ছলকে দিচ্ছে অন্ধকার, ঢোল কলমির উদ্ভিন্ন ডাল এসে ছড়িয়ে পড়েছে পানির উপর তার ঘনবদ্ধ নিচেই হয়তো যাবজ্জীবন নির্বাসনে পচে আছে সারিসারি পত্রঢেউ, একদিন সেসব পাতার আকাশ ছিল নীলান্তরের মতো সজল, মেঘ আর বৃষ্টির ভূমুখীন অবসরে মুহুর্মুহু কেঁপে উঠতো তারাও, অথচ আজ, ক্লিয়োপেত্রার শহর যেমন নিলের অন্ধকারে হাজার বছর যাবৎ ঢেউ আর ক্ষয়িষ্ণু লাবণ্য নিয়ে ডুবে আছে পানির তলায়, আইসিসের শিরস্ত্রাণও ধ্বংসের অব্যবহিত যোগাযোগ থেকে বাঁচাতে পারে নি তাকে, সেইভাবে দুধখালের এই বিষণ্ন বক্রতার তীরে একটি প্রাচীন কবর আর তার পেয়ারাবাগানে ঝরা পাতা বহুদিন ছড়িয়ে আছে যুগপৎ মাটি ও ঘোলাটে পানির নিচে, হয়তো হিজলগাঙের শেষে বাঁশঝাড়ের ভেতরে গুমড়ে ওঠা সপ্তদশ শতাব্দীর হাওয়া ব্লেডের মতো রাত্রির শিরা কেটে কেটে নিস্তরঙ্গ দেখেছিল দুধখাল। শিমুলিয়ার অভিন্ন হৃদয়ের বৃদ্ধরাও আজকাল আর মনে করতে পারে না সেসব। প্রায় তিনশ’ বছর আগের সেই রাত-দিন কবেই ভূ-মণ্ডলের মহাপথ পাড়ি দিয়ে নক্ষত্রের অন্তর্লীন আলো ও ধুলায় মিশে গেছে চরাচরে। তবু এপিটাফহীন একটি কবর মানুষের দিগন্ত-বিদারী কল্পনার সক্ষমতাকে আরো প্রবল দৈবতায় যুগ থেকে যুগে সাজিয়ে তুলেছে, যেন আশ্চর্য এক চারুবন সারাগ্রামের রংঝিলমিল হাওয়ায় উড়ে বেড়ায় প্রতিদিন। যদিও সেসব কথা ইতিহাসের নথিপত্রে লিখিত হয় নি কোনোদিন।

একজন পর্তুগিজ হার্মাদ তার দস্যুজীবনের ইতি টেনে রাতের অন্ধকারে বড় খোলের নৌকা থেকে নেমে আসে দুধখালের তীরে। সঙ্গে ছিল সুলতান চাঁপার উপর নুয়ে পড়া শিশির-ঘ্রাণের মতো আরাকানী এক নারী। তার নৌকায় না ছিল বিক্রির মতো ক্রীতদাসী না ছিল লুটের সম্পদ। যেহেতু, তারই বাড়ির সামনে পেয়ারা আর আনারসের বাগান দেখা যাবে বহুদিন পর তাই গ্রামের মানুষেরা আঙুলের কড়া পড়ে যাওয়া দাগ গুনে গুনে বের করেছিল কত প্রকারের ফলের বীজ ছিল সেদিন তার কাছে। সম্পূর্ণ কপর্দকহীন অবস্থায় যে সে এখানে আসে নি তার অকাট্য প্রমাণ হিসেবে মানুষেরা তাদের গল্পে হাজির করে এমন একটি বাড়ি যার ছাদ ছিল মাছের আঁইশের মতো সাজানো থরে থরে টালি, সেসব টালির ভগ্নাংশ অনেক দিনতক এ গাঁয়ের কিশোরদের খেলার অনুষঙ্গ ছিল। বারান্দায় ষড়ভুজাকার চারটি পিলার—পুবের খয়েরি বিল থেকে মনে হবে, উদাসীনতার দূরত্বে দাঁড়িয়ে এই যে পরস্পর যোগাযোগবোধ, ক্লান্ত বিচ্ছিন্নতা, শূন্যতার মর্মজুড়ে নিখিল বিষাদ যেন সবই লেপ্টে আছে সুরকির গায়ে গায়ে। দরজার দুই পাশে দুইটি জানালা প্রায় মেঝে অব্দি বিস্তৃত গরাদ, উপরের দিকে অর্ধবৃত্তাকার খিলান।

কয়েক বছর পর থেকেই ঘটতে থাকে সেই অদ্ভুত ঘটনাগুলো, গ্রামের লোকেদের চোখ এড়িয়ে রাতের পর রাত নিরবিচ্ছিন্নভাবে সেই পর্তুগিজ আর তার আরাকানী স্ত্রী কী সব উদ্ভট দৃশ্যের মুখে জীবনের তামাম বিপন্নতা দিয়ে অনুভব করে ছায়া আর মানুষের অন্তর্লীন বক্রবাস্তবতা! তার অনুপুঙ্খ বিবরণের অনেক কিছুই হারিয়ে গেছে এতদিনে, তবু সেইসব রাত্রির ভয়ার্ত চিৎকার আর ‘ওস লুসিয়াদাস’ থেকে পড়া পঙ্‌ক্তির পর পঙ্‌ক্তি যেন এখনো উড়ে বেড়ায় শিমুলিয়ার খয়েরি বিলে। ষষ্ঠদশ শতাব্দীর এই পর্তুগিজ মহাকাব্যের অনেক ক্যান্টোই পড়ে আছে দুধখালির স্রোতহীন পাড়ে—যেন, এখনো দক্ষিণের স্টেশনে যখন ঢং ঢং করে ঘন্টা বেজে ওঠে মনে হয় ইউরেনাসের কন্যা ভবিষ্যদ্বানী করছে পর্তুগীজদের জয়ের। সেদিনও তেমনই ঘটে।

তখন, সন্ধ্যা নামছে প্রায়, মোরগের ফুলানো কেশরের মতো রঙে হালকা কালোর ছাঁচ ভেসে বেড়াচ্ছে পুবে, যেভাবে পুরনো বাড়ির ঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়ে বহু দিনের বৃষ্টির পর, সূর্যাস্তের নিচে সারা পেয়ারাবাগান একটু একটু করে আলগা হচ্ছে শিমুলিয়ার মাটি থেকে। প্রতিদিন এমন সন্ধ্যার পূর্বে পেয়ারাবাগানের সামনে একটি লোহার চেয়ারে বসে থাকে সে। প্রাক্তন পর্তুগিজ নাবিক। ছেলেবেলায় কেবল পাদ্রি হওয়াকেই যৌক্তিক মনে হতো যার। কিন্তু মশলার বন আর উপহাসের মতো সমুদ্রঢেউ বারবার তাকে মনে করিয়ে দেবে—এলাচ ফুলের ঘ্রাণ আর সদ্য স্ফীতকায় মাংসপিণ্ড দুটির মধ্যে খুব বেশি পার্থক্য নেই আদতে, স্তন-বিষয়ক নানান ফ্যান্টাসির মধ্যে সবচে আক্রান্ত করে যা তা হলো—চোখের বিশ্বাসই এই রাজকীয় ত্বককে করতে পারে গভীর ফুটোন্মুখ, কেবল তখনই তালুর ঠিক মধ্যবিন্দুতে টের পাওয়া যাবে রসে ভিজে ওঠা টুইটুম্বুর দুইটি বাদামী কিসমিস। এইসব গোলককেন্দ্রিক ধারণাই তাকে ঠেলে দেবে সমুদ্র-বিদ্যার দিকে, যদিও মগ আর পর্তুগিজ দস্যুদের সাথে পৃথিবীর নানান রাত্রিতে তাকেও দেখা যাবে কর্ণফুলির নৌ-বহরে, উপকূলীয় অঞ্চলের বিবিধ অভিযানে; তবু সে তার অপরিপক্ক মুদ্রাদোষের কারণেই পুরোদস্তুর দস্যু হয়ে উঠবে না কখনোই। তবুও, শামুকে কেটে যাওয়ার মতন পচা পা যে তারও ছিল সে ব্যাপারে নিঃসন্দেহ থাকাটাই বরং সবদিক থেকে উত্তম।


দুই চার ছয় এভাবে অজস্র স্তন ডাইনির চোখের মতো তাকিয়ে আছে লোকটির দিকে। এক অধিবাস্তবতার থেকে এই ঘর এই রাত্রি ঢুকে যাচ্ছে আরেক বাস্তবতার মধ্যে, যেন পৃথিবীর প্রসঙ্গকাঠামো বদলে যাচ্ছে বারবার।


পেয়ারা বাগানের সামনে বসে থাকতে থাকতে শূন্য ডিগ্রি কোণে তার দৃষ্টি চলে যায় সরু সরু পেয়ারা ডালের দিকে এবং আরো আরো দৃশ্য উবে যাওয়ার মুহূর্তে দেখতে পায় চিকন ডালের উপর পাতার পরিবর্তে যেন অজস্র দুই ডানার সবুজ প্রজাপতি বসে আছে, ক্ষণকাল পরেই পাল্টে যায় সে ছবি, হঠাৎ সেই প্রজাপতিগুলো একসঙ্গে উড়াল দেয় আপাত সন্ধ্যার আকাশে, কোটি কোটি সবুজ প্রজাপতি ছেয়ে ফেলে ঊর্ধ্বাকাশ, সারাটা বাগান তখন পত্রহীন খাঁ খাঁ, পাতাগুলো সবই উড়ে যাচ্ছে নভোমণ্ডলে। ন্যাড়া গাছগুলো হা করে তাকিয়ে থাকে দিগ্বিক, এমন পত্রশূন্যতায় আচমকাই লক্ষ্য করে একটি স্তনকাটা নারী কোলে মৃত শিশু নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে বাগানের মধ্যে, শিশুটির গা চুইয়ে পানি পড়ছে, ছোট্ট হাতের কব্জিতে জং ধরা বালা। নারীটি তাকিয়ে আছে পর্তুগিজ লোকটার দিকে। এই অদ্ভুত দৃশ্যের শুরুতে কিংকর্তব্যবিমূঢ় শুকনা পাতার মতো বাতাসে ভাসার প্রতিভায় অবাক হয় লোকটি। কেননা ভয় বা ওই দারুণ দৃশ্য দেখার লোভ কিছুতেই তাড়া করে না তাকে এবং তার মনে হয় একমাত্র বিভ্রমই সত্য পৃথিবীতে আর সবই আপেক্ষিক। এই বিভ্রমজনিত সন্ধ্যা আরেকবার নারী ও মৃত শিশুটির দিকে তাকাতে প্ররোচনা দেয় তাকে—যেন প্রতিটি প্ররোচনায় সাবলীল প্রতিক্রিয়া দেখানো মানুষের চিরন্তন উত্তরাধিকার। পুনরায় তাকানোর ফলে নতুন করে যে ব্যাপারগুলো তার চোখে পড়ে এবার যথেষ্ট অভিনিবেশের দাবী রাখে সেসব—স্তনকাটা নারীটির পুরো শরীর ভেজা, তার শাড়ির থেকে মিনমিন করে পানি ঝরছে যেন সে নিজেই পানিতে ডুব দিয়ে উদ্ধার করেছে শিশুটিকে। চোখের পাতা খোলা, কোটরে অক্ষিগোলকের পরিবর্তে হেজে যাওয়া ঘোলা পানি আর যে কণ্ঠনালী দিয়ে চিৎকার করে দৃষ্টি আকর্ষণ করতো মায়ের, তরুণাস্থির সেই নালীটির পচে গেছে অনেক খানিই আর ছোট ছোট মাছেরা সেই প্রবেশপথ পেয়ে অন্ত্রে পৌঁছেছে বহুবার এবং ঠুকরে খেয়েছে ফুসফুস। আর নারীটির বুকের ক্ষতস্থান থেকে গলে পড়ছে নীল রক্ত, যেভাবে স্যাঁতস্যাঁতে দেয়ালের উপর শেকড়ের মতো ছড়িয়ে পড়ে উঁইপোকার ঘর। সবচেয়ে আশ্চর্যজনক বিষয় হলো তাদের শরীর থেকে উড়ে আসছে কর্ণফুলির ঘ্রাণ আর দুই জনের শরীরেই পর্তুগিজ জলদস্যুদের করতলের ছাপ উপচে পড়ছে, যেভাবে জেব্রার চামড়ায় লাফ দেয় অজস্র ডোরা। এবার আকাশের দিকে তাকায় সে—পাতার প্রজাপতিগুলো ঝাঁক ধরে নেমে আসছে পত্রশূন্য বাগানে। সেই নারী আর ঘোলাটে পানির চোখঅলা শিশুটি ধীরে ধীরে ঢাকা পড়ছে পেয়ারা পাতায়। একটা লীন শূন্যতার ভেতর বলকে উঠছে সবুজ অন্ধকার। স্ত্রী ডাক দেয় তাকে। রাতে খাওয়ার সময় তার সমস্ত মনোযোগ থাকে স্ত্রীর দিকে, আলোর প্রতিটি শিখাই যেন আদর করে আরাকানী মেয়েটার হাতের বালাকে। তুলার বলের মতন নরম সেই আলোর বুদবুদ অন্ধকারের সান্দ্র গায়ে ধাক্কা খেয়ে উড়তে থাকে ঘরময়। স্ত্রীর মুখের দিকে চেয়ে তার মনে হতে থাকে—মানুষ আদতে কোনো মুখকেই মনে রাখতে পারে না। কেবল একটা মুখের ধারণা আর তার অবয়বের ভাঙা ভাঙা রেখা-সংবলিত স্কেচ নিয়েই আজীবন কাটিয়ে দেয়, যে রেখা আবার তারই আঁকা, সম্ভবত সেই জন্যেই কখনো আদুরে, কখনো রাগী, কখনো উষর-নিস্পৃহ মুখমণ্ডলের ছবি তৈরি করে নিতে পারে অনায়াসে। হেরাক্লিতাসের সেই নদীতত্ত্বের মতো—একজন মানুষ সারা জীবনে একটি মাত্র পরিবর্তনহীন মুখ নিয়ে বাঁচতে পারে না, কালপ্রবাহের সঙ্গে সঙ্গে বদলে যেতে থাকে মুখের ধারণাও। বাইরে পেয়ারা পাতায় হেলে পড়ছে বাতাস, বালতির পানিতে একটি ফড়িং তার মরণাপন্নতাকে বারবার মিথ্যা প্রমাণ করতে সরু লেজটিকে উঁচিয়ে ধরছে শূন্যে, হাওয়ার ফিসফাসের মধ্যে মহাসময়ের এক পাল ঘোড়া নেমে এসেছে মাঠে এখুনি তারা নামতে শুরু করবে দুধখালের নিঃস্রোতা পাড়ে—সব কিছুই যখন প্রায় মহাজাগতিক মর্মরের মতো সুনসান, আলকাতরায় মাখা নৌকার মতো একটা রাত ভেসে যাচ্ছে পৃথিবীপাড়ের বক্রতা ধরে, সম্ভবত তখনি আরেকবার বউয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে সে ভাবতে থাকে—প্রত্যেকটি সম্পর্কই আসলে একেকটি ইলিউশনের খোয়ার। এই যে সকাল ৯.৩৭ মিনিটে লেবু গাছটির পরিচর্যা করার সময় যখন হুলো কাঁটা তার ঘ্রাণ ফুটিয়ে দিল হাতে, তখন মনে হয়েছিল আরাকানী এই নারীকে ছাড়া এক মুহূর্তও কাউকে ভালোবাসে না সে—আর কাউকে ভাবার সম্ভাবনা যেহেতু শূন্যের কাছাকাছি প্রায় তাই কুয়াশাগ্রস্ত হাওয়ায় বহুবার কেবল তারই মুখের আদল আঁকতে থাকে সে—যেন আগস্টের একটি দুপুরে দোজখের পানিও যখন ক্যালরিমিতির নিয়মে ঠান্ডা হতে পারে, সেই ঝিমধরা আগুনে-শ্রান্তির দিনে স্ত্রী-মেয়েটিই হতে পারে নিশ্চুপ জলাধার। অথচ এখন মনে হচ্ছে কোনো সম্পর্কই আসলে স্বস্তিদায়ক নয়, আর তেমনটা ভাবলেই কেউ অসৎ হয়ে যায় না। এমন টানাপোড়েনের মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়ে সে। দখিন দুয়ারি ঘর। স্টেশনের দিকে খোলা জানালা। তখনো অবশ্য স্টেশন হয় নি কেবল হয়ে ওঠার শূন্যস্থান ছিল মহাকাল জুড়ে।

দিনের পরে দিন চলে যায়। শিমুলিয়ায় তাদের আগমনের হেতু কেউই বুঝতে পারে না ঠিকভাবে। যদিও মানুষেরা ভেবে নেয় তারা পালিয়ে এসেছে, কিন্তু সেই পালানো-পথের অভিযান সম্পর্কে কিছুই জানে না কেউ। এমনও ভাবার সুযোগ তৈরি হয় যে, এরা মূলত খ্রিস্টধর্ম প্রচারের জন্যই এতটা দূরের কোনো গ্রাম বেছে নিয়েছে। কিন্তু গির্জার মতো কোনো স্থাপনা বানানোর কোনো পরিকল্পনার খবরই পায় না গ্রামের মানুষেরা । পর্তুগিজ লোকটি আর তার স্ত্রী কারো সঙ্গেই মেশে না তেমন। এমন কি লোকটির দস্যুতার যে গল্প চাউড় হয়ে আছে গ্রামময়- সেসবও মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে অতিলৌকিক ঘটনা ঘটনার পর। তখন পুরো গ্রাম ফাঁকাই ছিল বলা যায়। মাত্র ৫টি বা ৬টি পরিবার ছিল সাকুল্যে। গভীর রাতে মাঝেমধ্যে যখন ওস লুসিয়াদাস থেকে নানান স্তবক ভেসে আসতো শুধু তখনই গ্রামের মানুষদের মনে পড়ত পর্তুগিজ লোকটির কথা এর বাইরে তার অস্তিত্ব ছিল কেবল একজন বহিরাগতের।

সেদিনও গভীর রাতে ঘটতে থাকে সেই ঘটনাগুলোরই একটি; গত কয়েক বছর যাবৎ মোটামুটি বিরতি নিয়ে যেসব ব্যতিব্যস্ত করে রেখেছে পর্তুগিজ লোকটিকে। যদিও নিয়মিতভাবেই তাকে মুখোমুখি হতে হয় নানান ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার এবং মাঝে-মধ্যেই মনে হয়, এ্যাতো দিনে সব ধরণের আতঙ্কের সঙ্গেই অভ্যস্ত হয়ে ওঠা উচিৎ ছিল তার, কিন্তু পরক্ষণেই মনে পড়ে—’যেকোনো ভয় আদতে ঋতুস্রাবের মতো প্রতি মাসে হলেও তার কষ্টের সঙ্গে অভ্যস্ততা তৈরি হয় না কোনো নারীরই’। চাঁদের ত্বক ফেটে সে রাতে পুঁজের মতো আলোয় থিকথিক করছে চারিদিক। আনারসের ঝোঁপে কয়েকটা বেজি দৌড়ে বেড়াচ্ছে। দূরের গোয়ালঘরে মশা তাড়ানোর জন্য গরুরা লেজ নাড়ছে, মনে হচ্ছে বাতাসের নির্মেদ চামড়ায় লেজের বাড়ি লেগে থেকে-থেকে কেঁপে উঠছে চাঁদ। বিছানায় তার স্ত্রী গভীর ঘুমের মধ্যে ডান হাতের বুড়ো আঙ্গুল মুখের মধ্যে নিয়ে শিশুদের মতো চুষছে, অনেকক্ষণ পানিতে ভিজলে হাত পায়ের আঙুল যেমন ভিজে শাদা হয়ে যায়, ফ্যাকাশে চামড়া ভাঁজ হয়ে আসে আরাকানী মেয়েটির আঙুলের অবস্থাও এখন তেমন। হাঁটু ভাঁজ করে ডান কাঁতে ঘুমিয়ে আছে সে। ঘরের দেয়াল বেয়ে লাল পিঁপড়ারা উঠে গিয়ে যেখানে বিন্দু-বিন্দু চাঁদের আলো জমে আছে সেখানে ভীড় করছে—যেন সুতার মতো আলোর আভা দিয়ে এক সারি পিঁপড়া হেঁটে যাচ্ছে যাচ্ছে চাঁদে। একটা শিশুর কান্নায় ঘুম ভাঙে পর্তুগিজ লোকটার। প্রথমে তার মনে হয় দুধখালের দক্ষিণপাড়ে যে বাড়ি, হয়তো সেখান থেকেই অপুষ্টিতে ভোগা এক শিশুর কণ্ঠ রাতের বায়ুস্তরে ধাক্কা দিয়ে এখানে আসছে। কিছুক্ষণ পরেই ভুল ভেঙে যায়, মাটিতে গড়াগড়ি দিয়ে শিশুটির মায়ের কান্না সেদিন পুরো শিমুলিয়াকেই স্তব্ধ করে দিয়েছিল। এইসব ভুলভাঙা রাতে পুনরায় ঘুমিয়ে পড়ে সে—পাখির গায়ের মতো উষ্ণ অন্ধকারে আবার স্পষ্ট শিশুর কান্না শুনতে পায় লোকটা। এবার খুব কাছে। ক্রমশঃ ঘরের ভেতরে আসতে থাকে কান্নার আওয়াজ। এমন কি ছলাৎ ছলাৎ পানির শব্দও প্রবল হতে থাকে ধীরে ধীরে সঙ্গে অনেক মানুষের আর্ত হাহাকার। লোকটি আচমকাই দেখতে শুরু করে অক্ষিকোটরে ঘোলা পানিঅলা সেই শিশুটি ঘরের শূন্যস্থানে দুটো কাটা স্তনের পেছনে পেছনে উড়ে বেড়াচ্ছে। দুই চার ছয় এভাবে অজস্র স্তন ডাইনির চোখের মতো তাকিয়ে আছে লোকটির দিকে। এক অধিবাস্তবতার থেকে এই ঘর এই রাত্রি ঢুকে যাচ্ছে আরেক বাস্তবতার মধ্যে, যেন পৃথিবীর প্রসঙ্গকাঠামো বদলে যাচ্ছে বারবার। দীর্ঘ হচ্ছে কাল, পৃথিবীর সমস্ত ঘড়ির কাঁটা শ্লথ হতে হতে অসীমের মাঝগাঙে আছড়ে পড়ছে সময়। কান্না থামিয়ে বাচ্চাটি কিট কিট করে হাসতে থাকে। আর সেই কাটা স্তনের দিকে তার মা দৌড়ে বেড়াচ্ছে। ভয়ে লোকটি তার স্ত্রীর দিকে তাকায়, ঘুম থেকে জাগানোর জন্য যখনই তার কাঁধের উপর হাত রাখে ভয়ে নিজের অস্তিত্বকেও আবছা মনে হয় তার। একটা গলে যাওয়া মুখ, দুই ভাগ হয়ে যাওয়া কাটা গলনালী নিয়ে উপহাস করছে তাকে। মেয়েটার বুকের উপর হাত দিয়ে সে খেয়াল করে স্তনহীন একটি নারী, বুকে থকথকে নীল রক্ত, যোনী থেকে কী এক গাছের শেকড় বের হয়ে খাট থেকে নেমে গেছে মাটির দিকে। লোকটির হাতে তখন পচা মাংসের গন্ধ। শিশুটি হাওয়ায় ভাসতে ভাসতে নেমে আসছে মেয়েটির বুকের দিকে। ঘরের প্রতিটি আসবাব মাটি থেকে আলগা হয়ে উড়তে শুরু করছে—যেন মহাশূন্যের এক গভীর বাস্তবতা পুরো ঘরটির দখল নিয়েছে অনায়াসে। এমন ভয় আর শরীর পাথর হওয়া নৈঃশব্দ্যের মধ্যেও তার মনে হয়, তবে কি এতদিন মৃত নারীটির সঙ্গেই ঘর করছিল সে! একজন মানুষের মৃত্যুর মধ্য দিয়েই কি তার অস্তিত্বের সমাপ্তি ঘটে? হয়তো এমন কোনো পরমবিন্দুর অপেক্ষায় মানুষের দিন কাটে যা কেবল শরীর আর রক্তবীজের মধ্যেই নিহিত নয়, কোথাও এমন কোনো স্পর্শের দিন আছে যেখানে মানুষ এইসব বাস্তবতার বাইরেও তার অস্তিত্বের প্রতিটি বিন্দুকে অনুভব করতে পারে—এমন প্রত্যাশার অব্যবহিত পরেই লোকটির মনে পড়ে কর্ণফুলির সেই রাত্রির কথা যে রাতে কেবল সম্পদ ও জীবনই লুণ্ঠিত হয় নি বরং তার চেয়েও বেশি কিছু হারিয়েছে মানুষেরা। ফেননিভ জলের সেদিন প্রায় সবটুকুই কালো হয়েছিল মানুষের জাত্যাভিমান আর দস্যুতার প্রবল পরিচয়ে।


অনেক কাল পরে জানা যাবে সে ছিল যুগপৎ দস্যু ও ধর্মযাজক। এবং তার প্রলাপ বকার দিনগুলিতে চিৎকার করে ওস লুসিয়াদাস পড়ার ফাঁকে ফাঁকে উচ্চারণ করতো দুই শব্দের একটি মাত্র বাক্য—পর্তুগিজের পাপ!


সে রাতে সোপানশ্রেণির মতো পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে নামছিল অন্ধকার। যেন এক বহুদূরের উপকথার মতো ছিল সেই রাত। কোথাও আলো নেই শুধু পর্তুগিজ আর মগ জলদস্যুদের নৌকায় জ্বলছিল মশাল। কর্ণফুলিতে তারা অপেক্ষা করছিল সাধারণ যাত্রীবোঝাই কোনো নৌকার। এর আগেও কতবার এই জলপথেই বহু নৌকাকে লুট করেছে তারা, পুরুষ আর নারীর হাতে ফুটা করে সেই ক্ষতস্থানে বেতের নলাকার ফালি ঢুকিয়ে বেঁধে রেখেছে খোলের নৌকায়। তারপর ক্রীতদাস-ক্রীতদাসী করে বেচে দিয়েছে ভারতবর্ষেরই নানান জায়গায়। হত্যা ও ধর্ষণ তাদের হাতের ময়লার মতো। যে নারী কোনোভাবে মুক্তি পেত সারাজীবন তাকে বয়ে বেড়াতে হতো ধর্ষিতার অপবাদ, কেউই ঘরে নিত না শুধু পরিবারের অপমানের ভয়ে। একটি বিবাহযাত্রীর নৌকা দেখা যাচ্ছিল দূরের তরঙ্গে ভেসে তাদের নতুন বঁধুটিকে নিয়ে বাড়ি ফিরছে। এ পথে দস্যুদের বিভৎস কর্মকাণ্ডের ব্যাপারে মাঝিরা ছিল ওয়াকিবহাল। নানান সতর্কতাও তারা গ্রহণ করেছিল আগে থেকেই। সেইমতো নৌকাও চলছিল—যেভাবে সাপেরা ঝরাপাতার মধ্যে দিয়ে এঁকে বেঁকে চলে গেলেও বুঝতে পারে না পথিক সেভাবেই তরঙ্গের শব্দলুণ্ঠিত সেই রাতে বিবাহের নৌকাটিও প্রকৃত সতর্কতায় এগিয়ে যাচ্ছিল গন্তব্যে। হঠাৎ বাঁধ সাধে কয়েক মাস বয়সী একটি শিশু। ঘুম থেকে জেগে তার মাকে কাছে না পেয়ে হঠাৎ ইথার কাঁপিয়ে চিৎকার করে ওঠে। সে চিৎকার যেকোনো মশালের প্রকাণ্ড আলোর চেয়েও আরো বেশি বার্তাবাহী। তখনি পর্তুগিজদের নৌকা শয়তানের জিভের মতো লকলক করে এগিয়ে যায় বিবাহযাত্রীদের দিকে। বিয়েতে মেয়েরা কাঁচি দিয়ে যেমন রঙীন কাগজ কাটে, সেভাবেই সে রাত্রির নৌকাটিকে ফালাফালা করে ডুবিয়ে দেয় তারা। মাঝিরা আগেই কর্ণফুলির পানিতে ঝাপ দিয়ে বাঁচার চেষ্টা করে। দুই একজন হয়তো বেঁচেও যায়। বর আর কনের ভাগ্যে কী ঘটে কেউই জানতে পারে না। নারী আর পুরুষদেরকে খ্রিস্ট ধর্মে ধর্মান্তরিত অথবা বিক্রির জন্য এমনভাবে বেঁধে ফেলা হয় তাদের নৌকায়—যেন জবাই করা ছাগল ঝুলে আছে। জীবনের ভিন্ন রূপান্তরের সম্মুখে দাঁড়িয়ে তারা সে রাতে কী ভেবেছিল জানা যাবে না আদৌ তবু হয়তো, যে ছেলেটি তার বৃদ্ধ বাবাকে সন্ততির ভালোবাসায় সেবা করতো তার জন্য প্রতিদিন নামাজে বসে দোয়া করতো সে হয়তো ভাবছিল, জীবন তার অস্তিত্বময়তার বাইরে এসে অন্তত সেই রাত্রির জন্য যেন রহম হয়ে ডেকে আনে পিতার মরণ, যেন একলা পিতাকে আর বন্দী পুত্রের জন্য অপেক্ষা করতে না হয়, যেন প্রতিবেশীর করুণায় তাকে বাঁচতে না হয় আর। তারা কেউই হয়তো জানতো না কী কী জিল্লতির জীবন অপেক্ষায় আছে তাদের। তবুও, অবধারিত দাসত্ব জেনেও মানুষ যেমন তার পায়ের শেকলে টান পড়ে ব্যথা না পায় সে জন্য আরেকটু নমনীয় হয়ে দাঁড়ায়, মাংসের ক্ষত থেকে সরিয়ে দেয় মেরুনাক্ষির কীট, স্বৈরাচারের কারাগারে থেকেও কোকিলের ডাকে মনে পড়ে শিমুলবনের দুপুর—জীবন এমন। পর্তুগিজ নৌকাটি যখন সমস্ত বন্দীকে নিয়ে আরাকান রাজ্যের দিকে যাত্রা করবে তখনই সেই ঘটনা ঘটতে থাকে শিমুলিয়ায় বসবাসরত সেই পর্তুগিজ লোকটির জন্য যা হয়ে উঠবে কাচের গ্লাসের মধ্যে থকথক করে তাকিয়ে থাকা বিষাক্ত দ্রবণের মতো—স্বচ্ছ অথচ নৃত্যরত মৃত্যুর মতো তরল। বিবাহযাত্রীর মধ্যে সে রাতে যে শিশুটি প্রথম কান্নার মতো চিৎকার করেছিল, সেই শিশুটিকে কর্ণফুলির পানিতে ফেলে দেওয়ার জন্য একজন দস্যু তার দুই হাত শূন্যে উদ্যত করলে তারকামণ্ডলি কাঁপিয়ে দেওয়া কান্নায় তার আনগ্ন মা অনুনয় করতে থাকে, শিশুটি তখন শব্দহীন চিৎকারে মহাশূন্যতার দিকে হা করে তাকিয়ে আছে তার সমস্ত আতংক আর কান্না যেন তারারা জমিয়ে রাখছে আদরের বিষণ্নতায়। সহসা একজন পর্তুগিজ দস্যু তার মার বুকের সমান্তরালে চালিয়ে দেয় তলোয়ার এবং যে স্তন দুটি তার শিশুর ঠোঁটের মধ্যে এতকাল দুধের নহর হয়ে বয়ে যেত, সেই দুই স্তনের মায়াবী মাংসপিণ্ড নৌকার পাটাতনে কাঁপতে কাঁপতে গড়িয়ে যায় পানিতে আর তৎক্ষণাৎ শিশুটিকেও ছুড়ে দেয় কর্ণফুলির গহীন জলে। যে দস্যুটি সেদিন সন্তশিশুটিকে ছুড়ে মেরেছিল ফিরিঙ্গির কূট নখর সমেত কিছুকাল পরে সে-ই আরাকানী মেয়েটির সঙ্গে বহু পথ পাড়ি দিয়ে বসবাস করতে থাকে শিমুলিয়ায়। অনেক কাল পরে জানা যাবে সে ছিল যুগপৎ দস্যু ও ধর্মযাজক। এবং তার প্রলাপ বকার দিনগুলিতে চিৎকার করে ওস লুসিয়াদাস পড়ার ফাঁকে ফাঁকে উচ্চারণ করতো দুই শব্দের একটি মাত্র বাক্য—পর্তুগিজের পাপ!

শিমুলিয়ার সেই রাত্রিতে স্ত্রীর গা থেকে ভেসে আসছে কর্ণফুলির ঘ্রাণ, দূরের বাঁশঝাড় যেন এদিকেই আসছে শোঁ শোঁ অন্ধকার নিয়ে। শিশুটি তখনো ভাসছে ঘরের শূন্যতায় আর ভাসমান স্তন ধরতে চাচ্ছে তার আমূল ছোট্ট দুই হাতে, তার ঠোঁট পচে গেছে, বোঁটা আঁকড়ে ধরার গোল জিভ দুই চির নিয়ে ঝুলে আছে মুখগহ্বরে। এমন সময় অতর্কিতে উঠে আসে মৃত মেয়েটি, হাত বাড়ায় উড়ন্ত শিশুর দিকে আর পর্তুগিজ লেকটির দিকে তাকিয়ে কণ্ঠহীন ভয়ংকর শব্দে কী যেন বলতে থাকে—লোকটি ভয়ের বিমূর্ততায় মেয়েটির গলা চিপে প্রাণপনে কাঁপতে থাকে খাটের উপর এবং মনোলীন বেদনার পাশে দাঁড়িয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলতে থাকে—‘তু সো, তু, পুরু আমর’। একটা ক্লান্ত হাওয়া যেন চৈত্রদেশের ওপার থেকে রোদতপ্ত মাঠের শূন্যতার উপর বয়ে যায়, যেখানে দুঃখ ও ভয়, শ্রান্তি ও হতাশা, নিজের মৃত্যুর মতো রোমান্টিকতা এক সময় সব কিছুকেই শান্ত করে দেয়। তার হাতের মধ্যে গলে যেতে থাকে স্ত্রীর মাংস, উড়ন্ত শিশু আর কাটা স্তন দুটি ভাসতে ভাসতে নক্ষত্রের দিকে হারিয়ে যায়। যেন, হাজার হাজার তারাবীথিকার রেণু ম ম করছে নৈঃশব্দ্যে।

পরদিন সকাল। পাশের স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে লোকটা বুঝতে পারে অনন্ত বিভ্রমের ফলে সে-ই হত্যা করেছে তার স্ত্রীকে। গভীর বিষণ্ণতা খামচে ধরে তাকে, কাঁদতে কাঁদতে চিৎকার করতে থাকে—‘তু সো, তু, পুরু আমর’, ‘তু সো, তু, পুরু আমর’। দূরের বাড়ির মানুষেরা কিছুই বুঝতে পারে না। কেবল ওস লুসিয়াদাসের সেই বাক্যটির অনন্ত অর্থহীনতায় পাক খেতে খেতে এক সময় বুঝতে পারে মানুষের সাথে সাথে যেকোনো বন্ধনের উপরও ক্লান্তির ছায়া পড়ে বিমর্ষ হয়ে যায় সব। সেই মৃত দেহটি নিয়েই তার দিন কাটতে থাকে। কোথাও দেখা যায় না আর। পেয়ারা বাগানের সম্মুখে লোহার চেয়ারটি ফাঁকা পড়ে থাকে। ভয়ে সেদিকে কেউই যায় না। মানুষের সংস্রবহীন প্রতিবেশ ধীরে ধীরে অপ্রকৃতস্থ করে তোলে পর্তুগিজ লোকটিকে। গভীর রাত্রিতে একা একাই কী সব কথা বলে লোকটা। যখন রাত্রির তারাগুলো শিশুর শূন্য থালার মতো বাজতে বাজতে নেমে আসে দুধখাল নদীটির তীরে, গোয়ালে মাটির পাত্রে সন্ধ্যায় জ্বালিয়ে দেওয়া খড়ের বিচালি যখন শেষ হয়ে আসে, মানুষের ঘুমন্ত মুখের উপর ফেরেশতারা লিখতে থাকে আল্লার করুণা, এমন সময় পর্তুগিজ লোকটি তার চারদিকে অনুভব করে ওস লুসিয়াদাসের কবি লুইস ক্যামোয়েসকে—যেন সে তার অন্ধ ডান চোখটির উপর হাত রেখে সটান দাঁড়িয়ে থাকে সেই ঘরে আর তার মহাকাব্য থেকে বিড়বিড় শুনতে থাকে—

 

‘দু রোশতো খেশপিরাভা উম আর দিভিনো,

কে দিভিনো তরনারা উম করপু উ’মানু;

কম উমা করোয়া ই সেপত্রো খুতিলান্ত,

দি অত্রা পেদ্রা মাইশ ক্লারা কে দিয়ামান্ত।’

 

কখনো—

 

‘দা লুয়া উশ ক্লারুশ রাইয়ুশ রুতিলাভাম

পেলাশ আরজেন্তিয়াশ অন্দাশ নেপতুনিয়াশ,

আজ এশত্রেলাশ উস সেউশ আকমপানইয়াভাম,

কোয়াল কাম্পো খিভেশতিদো দি বুনিনাশ;

উজ ফুরিওজুজ ভেনতুশ খিপউজাভাম

পেলাশ কুভাশ শকুরাশ পেরেগ্রিনাশ।

পরেইঁ দা আরমাদা আ জেন্ত ভিজিয়াভা,

কমো পর লংগো তেমপো কশতুমাভা।’

 

এইসব মহাক্যবিক পঙ্‌ক্তিগুলো রাতের সরের উপর ভেসে ভেসে তৈরি করতো এক আধোবাস্ততার রূপনীল পরিবেশ যেন অনেক পাখি তাদের অর্থময়তার বাইরেও উড়ে বেড়াচ্ছে বহুদিন।

 

‘অন্দে পদ আকোলিয়ের-ছে উম ফ্রাকো উমানো,

অন্দে তেরা ছেগুরা আ কুরতা ভিদা,

কে নাও সে আর্ম, ই ছে ইনদিগন(এ) উ ছেউ ছেরেনো

কন্ত্রা উম বিশু দা তেখা তাঁউ পিকেনু?’

 

‘কান্তান্দো এশপালইয়ারেই পর তোদা পার্ত,

ছে আ তান্তো মি আজুদার ও এনজেনইয়ো ই আর্ত’

 

তারপর, একদিন রাতে পৃথিবীর তামাম বাস্তবতাকে কুহুলি পাখির মতো শূন্যে ছুড়ে দিয়ে লোকটা নিজেই নিজেকে হত্যা করে। এবং অস্তিত্বের থেকে মুক্তি পেতে থাকে ধীরে। তার সমুদ্রযাত্রার ইতিহাস, ঢেউয়ের অবনীল চূড়া, দস্যুতার দিনগুলি, আরাকানী মেয়েটির ডালিমত্বকের কথা রাত্রির হাওয়ায় হাওয়ায় উড়ে লীন হয় নক্ষত্রের আভায়। হয়তো অস্তিত্বের ছায়া থেকে বেরিয়ে আসার সময় বারবার তার মনে পড়ে—

‘তু সো, তু, পুরু আমর’

‘তু সো, তু, পুরু আমর’

প্রেমিক আর দস্যু সেই লোকটিকে গ্রামের মানুষেরা কবর দিয়েছিল তারই বাড়ির উত্তর-পূর্ব কোণে খয়েরি বিলের পাশে। সেদিন তার ঘরে পাওয়া গিয়েছিল সমুদ্র ও জাহাজের কয়েকটি তৈলচিত্র, নাবিকের পোশাক, তলোয়ার, বন্দুক, পুরনো সংস্করণের একটি ওস লুসিয়াদাস, পর্তুগিজ বাইবেল। আর পর্তুগাল থেকে ভারতবর্ষে আসার একটি মানচিত্র। সেই প্রথম গ্রামের মানুষ মানচিত্রের দিকে অবাক হয়ে পেয়েছিল তাকিয়ে থাকার ফুরসৎ। এবং পর্তুগিজ লোকটির একটিমাত্র বাক্যই তারা এখনো মনে রেখেছে—’সেই নারীই বেশি ভালোবাসতে পারে খেতে বসলে যে ঠিক সময়ে লেবু কেটে দেয়’।

শেয়ার করুন

লেখা সম্পর্কে মন্তব্য

টি মন্তব্য

%d bloggers like this: