home গল্প সাড়ে তের শ বছর পিছিয়ে গল্পটি ।। আশরাফ জুয়েল

সাড়ে তের শ বছর পিছিয়ে গল্পটি ।। আশরাফ জুয়েল

‘আটটি হাত। ডানে চারটি। বামে চারটি। ডানের উপরের হাতে একটি তূণী। নিচের হাতের বস্তুটি অজ্ঞেয়। বাম দিকের প্রথম হাতে একটি পদ্মফুল। তৃতীয় হাতে একটি ধনুক। বাম দিকের পা ছুঁয়ে আছে পাদভূমি। ডান পা একটি পশুর পিঠে।’ এ কোন রূপ? এ কে? কার চেহারা?

স্বর্ণা এসেছিল। স্বর্ণা চলে গেছে। রাগ করে। মুডে ছিলো। খুব অফেন্ডেড হয়েছে। জাহিদ ইতালি গেছে। প্রায়ই যায়। তখন স্বর্গ হয়ে ওঠে এই ফ্ল্যাট। না, সারকাজম নয়? স্বর্ণার দোষ কোথায়?  জোড়া লাগবার জন্য যে কোন এডহেসিভের দুইটা সার্ফেস প্রয়োজন হয়। সেই ক্ষেত্রে একত্রিশের এগেইনস্টে তেত্রিশ বেশী মানানসই, ছেচল্লিশ নয় নিশ্চয়? হয়ত মানানসই। স্বর্ণা চেষ্টা করেছে।

ফুলের ঘ্রাণ! মদে ডুবে থাকা তের তলার ফ্ল্যাটে? অসম্ভব। ঘ্রাণটা আসে। সুররিয়ালিস্টিক? আসে তো! এসে ব্রেনের স্লিপ সেন্টারে ঝড় তোলে। কোন দিক থেকে আসে, ফুলের ঘ্রাণটা?

‘ছেচল্লিশ খুব বেশি বয়স?’ কী মনে হয় তোমার?’ মাত্রই লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে ইমিগ্রেশন শেষ করেছে জাহিদ। রোম তার পছন্দের শহর। না, রোম নয়, তার পছন্দ অন্য কিছু।

গত প্রায় তের শ’ বছর একটানা শুয়ে আছে। এবার সে উঠবে। কেউ ডাকেনি। সিদ্ধান্তটা তাই নিতেই হয়। রাধাকান্তপুরের চৌধুরী বাড়ির সমাধিস্থল থেকে উঠে বসবে ন্যানি। আর ভালো লাগছে না।

 ‘না। ছেচল্লিশ তেমন বয়স না। পুরুষের বয়স আরম্ভ হয় বত্রিশ থেকে।’ ঘণ্টাখানেক আগেই নেমেছে নাসু। জারাগোজা, স্পেন থেকে। একটা সম্পূরক সম্পর্ক টিকে আছে। এগারো বছর। কম সময় তো নয়।

ব্যবসাটা আপাতত বন্ধ। সিদ্ধান্তটা সিজারের। বিষয়টা কী তাই? মনে হয় না। গুলশানের এই ফ্ল্যাটের স্বপ্ন। ঘুমোতে দিচ্ছে না। চোখ বন্ধ করলেই, ঘুরে ফিরে সেই চেহারা।

‘কী হয়েছে তোর? কার বুকে জমা দিয়ে এসেছিস নিজেকে? নিশ্চয় এই জন্য আসিনি তোর ফ্ল্যাটে? ব্লাডি ফাকার।’ শীৎকারের আতিশয্যে কাঁপছে এসি রুমের বাতাস। সিজারের বুকে ঘোড়সওয়ারী- ক্ষিপ্ত, তার রাগ- নির্লিপ্ত জিনের প্রতি। ঘোড়া ছুটছে না- কিছুতেই ছুটছে না ঘোড়া।

হোটেল ম্যান্ডারিন ওরিয়েন্টাল থেকে রিসিভ করার জন্য অ্যান্টনিও-র আসার কথা। জাহিদের পছন্দের ‘স্টুডিও সুইট’ না, নাসুর পছন্দ। বরাবরের মতোই আগে থেকেই বুক করা।

ন্যানি ঠিক বুঝে উঠতে পারে না। ঘুম থেকে উঠে কী দেখবে সে? আর তাকে দেখে মানুষ কি ভাববে? তবে কী ঘুমিয়ে থাকাই শ্রেয়? অসম্ভব। ন্যানিকে জাগতেই হবে।

‘হেই। হেই। হেয়ার ইজ মিস্টার অ্যান্টনিও।’ জাহিদের ডান হাতটা জড়িয়ে রেখেছে নাসু। তার গায়ে হালকা দুধের সাথে মধু মেশানো রঙের ব্লেজার, নীচে অফ হোয়াইট গ্যাবাডিন। গলায় উলের মাফলার- ক্রস করে ঝুলানো। পায়ে রিবকের কেডস।

‘হিউয়েন সাঙ, সুদূর চীন দেশ থেকে ভারতবর্ষে এসেছিলে, এসেছিলে বুদ্ধের জন্মস্থান দেখতে এসেছিলে- নালন্দায় বৌদ্ধ ধর্ম সম্পর্কে বিস্তারিত শিক্ষা লাভের উদ্দেশ্যে। কিন্তু কেন এই মিথ্যাচার?  হর্ষবর্ধনের আনুকূল্য পেয়ে কি যা তা বলে গেছো? হর্ষবর্ধন তোমাকে কি এমন উপঢৌকন দিয়েছিলো?  কথা বলো?’ সিজার ঘুমের মধ্যেই গোঙানির মতো শব্দ করে।

কয়েকদিন ধরে বারবার একই স্বপ্ন দেখছে সিজার।

ঘুম ভেঙে যায় তার, বিছানা ছেড়ে উঠার এতোটুকু শক্তি নেই সিজারের। তার শক্ত-সুঠাম দেহ ঘামের ভেতর ডুবে থাকে। তবুও কোনমতে বিছানা ছেড়ে ওঠে সে। উঠেই জানালার দিকে তাকায়- ভেসে আসা ফুলের গন্ধটার দিকে এগুতে থাকে সে।

এমতাবস্থায় গল্পকার এবং গল্পসূত্র মুখোমুখি বসে পড়ে- তাদের ভেতর বোঝাপড়ার অনুপস্থিতি তীব্রতর। নিজেদের মধ্যে বাক্য বিনিময় স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত রাখে তারা। বাক্যবিনিময় ব্যতীত কথা বলা সম্ভব নয়? সম্ভব। কথা হয়।

ভবিষ্যৎ স্বয়ম্বর, অতীত- সেও; ততোধিক।

প্রারম্ভ তত্ত্ব-

ঝড় তোলার অপেক্ষায় সওয়ারী, ঘোড়া ছুটছে না, ঘোড়া ছুটছে না। সওয়ারীর হাতে কামনার চাবুক। সওয়ারী চাবুক চালায়। ঘোড়া পোষ মেনে নিয়েছে? চাবুকের অনুভূতি ঘোড়ার শরীরে আগুনের গান বাজাচ্ছে না! সওয়ারী নিজের সক্ষমতা নিয়ে দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়ে।

স্বর্ণা- সওয়ারী, সিজার- ঘোড়া। 

‘যে রমণী তির্যক পুরুষের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘামের পরিশ্রম তুলতে পারে না সে আবার রমণী?’ নিজের প্রতি নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে স্বর্ণা- নিয়ন্ত্রণ হারালে শরীরের উপর কামনা ঘষলেও আগুন জ্বলবে না। কিন্তু সিজারের কী হলো আজ?   

‘ইউ ব্লাডি! আমাকে ক্ষ্যাপিয়ে দিয়ে নিজে বরফ হয়েছ? জানো না, আমি বরফের শরীরেও আগুন জ্বালাতে পারি।’ স্বর্ণা সিজারের বুকে, মুখে নিজের মাখন ঘষতে থাকে, বুকের মাখন। তার শরীরে সে নিজে ছাড়া আর কেউ নেই। আর আছে ঢেউ, বিস্তীর্ণ ঢেউ। বুকে, পিঠে, মুখে, পেটে- ঢেউ। তারপর সমুদ্র। সমুদ্র খুঁজে পাবার আগে নদী যেমন হঠাৎ সরু হয়ে আসে- তারপর বিস্তৃতি, অবাধ বিস্তৃতি। সিজার ছাড়া এই অবাধ বিস্তৃতি আর কে দেখেছে? নদীর বাঁক এগিয়ে যায় অজানা উতুঙ্গ মহাসমুদ্র অভিমুখে।

স্বর্ণা- নিজেও জানে না, কোন লাভার আগুনে সে পুড়িয়ে মারে পুরুষের কাম-সক্ষমতাকে। ‘সিজার, সিজার?’    

জাহিদ? না- সবার সব কিছু দেবার সক্ষমতা থাকে না। সবার সব কিছু নেবার সক্ষমতাও থাকে না। জাহিদের দেবার সক্ষমতা নেই। স্বর্ণাকে নেবার সক্ষমতাও জাহিদের নেই। সিজারের ছিল- এখনও আছে।

‘ঠা-স! ঠাস-? ঠাস?-ঠা!- – স!- – – ঠাস, ঠাস!’ উত্তেজিত স্বর্ণা- ‘মৃত’। সিজারের গালে, বুকে আঘাতের বহিঃপ্রকাশ দেখা যায়। না, এ সিজারের উপর রাগ করে নয়। সব রাগ ওই ঘ্রাণের উপর। ওই বেলি ফুল! তবুও সিজার, ঘুম, ঘুম, ঘুম…

‘আর মূর্তিটা? ওই মূর্তিটা- যেটা বসে পড়েছে সিজারের মনের মুখে। হায় মূর্তি, হায়- ‘আটটি হাত। ডানে চারটি। বামে চারটি। ডানের উপরের হাতে একটি তূণী। নিচের হাতের বস্তুটি অজ্ঞেয়। বাম দিকের প্রথম হাতে একটি পদ্মফুল। তৃতীয় হাতে একটি ধনুক। বাঁ দিকের পা ছুঁয়ে আছে পাদভূমি। ডান পা একটি পশুর পিঠে।’ কিছু ভাবতে পারে না স্বর্ণা, ‘হায় সিজার?’  

গল্পের উপর থেকে সমস্ত নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন গল্পকার। গল্পটি নিজেই নিজের অস্থিকক্ষে রুহ বপন করেছে- গল্প এখন বুঝে গেছে কোথায় তার রক্তকুঠুরী, কোথায় বায়ুথলী, বুঝে গেছে- নিজের ভার বইতে সে সক্ষম। গল্পকারই বাধ্য হয়েই পাঠক হয়ে গল্পটির সাথে এগোতে থাকেন।

অস্বস্তিনামা-

ন্যানি সিদ্ধান্ত থেকে দূরে সরে আসে অথবা সিদ্ধান্তই দূরে সরে পড়ে। শুয়ে থাকাকেই শ্রেয় মনে করে সে। তবে কবরস্থানে নয়, বরং রাধাকান্তপুরের চৌধুরী বাড়িতে তার জন্য নির্ধারিত শয়নকক্ষের উত্তরের জানালা জুড়ে যে আকাশ- ঠিক তার পাশের জায়গাটা পছন্দ তার।

একটা বেলি ফুলের গাছ পৃথিবীর ইতিহাস দখলের উদ্দেশ্যে বেড়ে উঠতে থাকে। সন্তর্পণে। মাটির দেহ ফুঁড়ে বের হয় দুইটা পাতা। পাতা দুইটা পৃথিবীর শরীরে বাতাস তোলে। পৃথিবীর বাতাসে খেলা করে বেলি ফুলের ঘ্রাণ। আপাতত ঘ্রাণের গন্তব্য- গুলশান দুই এর ১৫১ নাম্বার রোডের ‘শান্তিবাড়ি।’   

 ‘তুমি স্বর্ণাকে ফ্রড করছ? আই অ্যাম আস্কিং ইউ, জাহিদ। আর ইউ লিসেনিং?’ এগারো ডিগ্রী টেম্পারেচারের রোমে; এখন এই মুহূর্তে এই স্যুইটের টেম্পারেচার তেইশ দশমিক সাত। 

‘উ ম ম মা’ নাসুর ঠোঁটকে দীর্ঘ চুম্বনের ফাঁদে ফেলে জাহিদ। নাসুর কাছে এলেই সে অন্য জাহিদ হয়ে ওঠে। নাসুর আবেগ নাসুর ইচ্ছাবন্দী।

‘না। স্বর্ণাকে বিয়ে করেছিলাম শুধু তোমার জন্য। এ ছাড়া কোন উপায় ছিলো না।’ ওকে তো আমি ছেড়েই দিয়েছি- দ্যাট ব্লাডি বুল শিট, সি-জা-র।’ নাসুর ঠোঁটে জমে থাকা নিঃশ্বাস ছাড়ার স্বস্তি পুরোপুরি উপভোগ করে জাহিদ। তারপর জানালার গ্লাসে দৃষ্টি বিভ্রমকে ছুঁড়ে মারে সজোরে।   

রোম শহরের অলিতে-গলিতে ‘সিজার’র মূর্তি। জাহিদ তীক্ষ্ণ কটাক্ষবাণে জর্জরিত করতে থাকে দৃষ্টি-সক্ষমতায় সেঁটে থাকা সিজার’র মূর্তিগুলোকে। যেন স্বর্ণার সিজার তার সামনে কোন মহাপুরুষ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। 

‘স্বর্ণার সাথে কথা হয়েছে। আমি রোম আসছি স্বর্ণা এটা জানে।’ বিছানার নরম আদরে নিজেকে সঁপে দেয় নাসু। এই ঘরে ওরা চারজন- নাসু, জাহিদ এবং বাকি দুই জন নাসু ও জাহিদ। এই স্যুইটের তিন দিকের দেয়াল, রুফ পুরোটাই ঝকঝকে আয়নায় মোড়ানো। প্রতিবিম্বকেই তাই সত্যি ভাবতে ইচ্ছা করে। এত সুন্দর!

স্বর্ণা সামলে নেয় নিজেকে। একটা কিছু হয়েছে। এই সিজারকে সে চেনে না। ফুলের গন্ধ আর একটা আট-হাতা মূর্তি সিজারকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে। কিছুতেই স্থির থাকতে দিচ্ছে না। ব্যবসাটা বন্ধ- যারা স্টাফ তারা সময়মত অফিসে আসছে, বেতন তুলছে- যেটা যার দায়িত্ব তা ঠিকঠাক পালন করছে। সিজার অফিসে যাচ্ছে না। সে না গেলেও তার ব্যবসার ক্ষতি হবে না, কিন্তু যে উচ্চতায় সিজার যাচ্ছিল তা হয়ত সাময়িক সময়ের জন্য আটকে থাকবে। কিন্তু সিজারের কাছে উচ্চতার ডেফিনেশান কী তা সে নিজেই জানে।

ন্যানি বুঝতে পারছে কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে- গুলশানের তের তলার ফ্লাট অবধি উদ্বায়ী হতে হবে না তাকে। লেবু গাছের উত্তর জানালার টুকরো আকাশটুকুকে ধুয়ে-মুছে সাফ করে সে। বেলি ফুলের গাছটা দ্রুত প্রতিপত্তি ছড়াচ্ছে। এটা সুখের- সব ঝঞ্ঝাট মিটে গেলে সে পুনরায় চৌধুরী বাড়ির পারিবারিক বিশ্রামাগারে চিরনিদ্রায় ঢলে পড়তে পারবে। ততদিনে বেলির গন্ধে নেশাগ্রস্থ হয়ে পড়বে পৃথিবী।

 

ক্লান্তি মঙ্গল-

করুণা পিহাড়ি খেলহু নঅবল।

               সদ্গুরু-বোঁহে জিতলে ভববল।

                                  -কাহ্নপা। (১০-১২ শতক)

 

পৃথিবী দাবার মাঠ, মানুষ ঘুঁটি- রাজা, মন্ত্রী, নৌকা, ঘোড়া, হাতি, সৈন্য…  ঘুঁটিগুলোকে পরিচালনাকারী হাতগুলো অদৃশ্য, অথচ শক্তিশালী।

আরও  কয়েকশো বছর  পিছিয়ে  গিয়ে গল্পটি –    

‘কেউ যদি মহাজ্ঞানী হিউয়েন সাঙকে আঘাত করে বা ছুঁয়েও দেখে, তাহলে তাঁকে ফাঁসিতে ঝুলানো হবে। এমনকি কেউ তাঁর বিরুদ্ধে একটা শব্দ উচ্চারণও করে তাহলে জিহ্বা বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হবে, কিন্তু যারা হিউয়েন সাঙ- এর হিতোপদেশ মেনে চলবে এই আইনে তাদের ভীত হবার কোন কারণ নেই।’  সিজার এপাশ-ওপাশ করে। ‘তোমার দ্বারা হর্ষ, হর্ষবর্ধন কতটা প্রভাবিত হয়েছিলো তা কি ভারতবাসী জানে না?’ তার গোঙানি বেড়ে যায়- কিন্তু কিছু বলতে পারে না, ‘বান ভট্ট, তুমিও আদ্যোপান্ত মিথ্যাচার করেছো। হর্ষবর্ধনের আপন মানুষ তুমি, এ কথা কে না জানে। কিন্তু কেন এই মিথ্যাচার? কোন অবস্থাতেই তোমরা চাওনি বাঙালিরা মাথা উঁচু করে দাঁড়াক।’ সিজার বিছানায় এপাশ-ওপাশ করে, ’তুমি কী শোনোনি, বিক্রমাদিত্যের পরাক্রমশীলতার কথা?’ স্বপ্নটা ক্রমশ অজানা আলোর দিকে এগোচ্ছে।

কারও সাথে কথা বলতে ইচ্ছা করে না সিজারের। বরং সেই আট-হাতা মূর্তি আর বেলি ফুলের গন্ধ দিনে দিনে তার আত্মা হয়ে উঠছে-  অস্থির হয়ে পড়ে সিজার। ‘স্বর্ণা, আমার ফ্ল্যাটে আসবে একবার- না, শেষবার। আসবে?’

ফোন কাটে না। কেটে দেয় সিজার। স্বর্ণা জানে। কোনদিন কারও উত্তরের অপেক্ষা করেনি।  

খুব বেশী সময় লাগে না স্বর্ণার। ফ্লাটের এক্সট্রা একটা চাবি স্বর্ণার কাছে সবসময় থাকে। এর মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়েছে সিজার। ঘুমন্ত মাথাটাকে কোলে তুলে নেয় স্বর্ণা – যেন এক নিষ্পাপ  দেবশিশু। ডাকে না সে, ‘ঘুমাক- যতক্ষণ ইচ্ছা ঘুমিয়ে নিক। বেচারা কতো যুগ ঘুমায় না।’  

এক ব্যাখ্যাতীত স্বপ্নে নিজেকে আবিষ্কার করে সিজার- ‘বুদ্ধের পদচিহ্ন গঙ্গার জলে নিক্ষেপ করিনি আমি। যুদ্ধে প্রতিপক্ষ বৌদ্ধ না কে এটা দেখার সময় থাকে না। বোধিবৃক্ষ কেটে ফেলার আদেশ দিইনি। বৌদ্ধবিহারের নিকট অবস্থিত বুদ্ধ মূর্তি সরিয়ে নেইনি। তুমি যখন কর্ণসুবর্ণে আসো তার বেশ কয়েক বছর পূর্বেই আমার মৃত্যু হয়েছিলো, তুমি কি দেখেছিলে আমাকে? তবে কেন এই মিথ্যাচার! হিউয়েন সাঙ, তুমি তো মিথ্যাবাদী নও!’ 

ঘুম এক মৃত্যু। ঘুম এক জন্মও। চোখ খোলে সিজার। নিজেকে স্বর্ণার কোলে আবিষ্কার করে। কিছুটা স্বস্তি খুঁজে নেবার চেষ্টা করে এবার।  

দীর্ঘক্ষণ ধরে শাওয়ার নেয় সিজার। হালকা কিছু পানীয় ছাড়া কিছুই খায় না সে। না, মদ নয়, বরং এক গ্লাস আপেল জুস খায়।

‘কী হয়েছে তোর?’ উত্তর না দিয়ে সিজার একাগ্রচিত্তে জুসের গ্লাসের দিকে তাকিয়ে থাকে।

‘এদিকে আয়।’ আচমকা হ্যাঁচকা টানে কাছে টেনে নেয় স্বর্ণাকে। সিজার যখন স্বর্ণাকে কাছে টানে তখন বাধা দেবার কোন সুযোগ দেয় না। স্বর্ণার ভালো লাগে।

এ এক তাপতপ্ত দৃশ্য। অথচ কোন উত্তাপ ছড়ায় না। আগুন-রঙা শরীর-লাভা এঁকে অপরকে জড়িয়ে ধরছে। কোন শিখা দৃষ্টিগোচর হয় না। আগুন দিয়ে আগুন কাটার এ দৃশ্য ভাগাভাগি শেষ হলে সিজারের পাথর বুকে মাথা রাখে স্বর্ণা, ‘এতদিন কী হয়েছিলো তোর?’

‘আমি নরেন্দ্রাদিত্য। আমিই মহারাজা শশাঙ্ক। আমিই তৈরি করেছি, রক্তমৃত্তিকা মহাবিহার। আমার বাঙলাদেশ?’ 

‘নরেন্দ্রাদিত্য? শশাঙ্ক? রক্ত মৃত্তিকা মহাবিহার? কি বলছিস এগুলো? তোর মাথাটা কি সত্যি খারাপ হল এবার? শান্ত হ।‘

‘না। যা কিছু করেছি কজঙ্গল, পুণ্ড্রবর্ধন, তাম্রলিপি, সমতটের জন্যই করেছি। কোথায় আমার কর্ণসুবর্ণ? কোথায় গৌড়-বাঙলা? আমার মগধ-বুদ্ধগয়া, কোথায় উৎকল, কঙ্গোদ?’ এ কোন পুরুষকে দেখছে স্বর্ণা। এ সিজার অচেনা- যেন পৃথিবীর তাবৎ শক্তি তার শরীরে। এক প্রবল ব্যক্তিত্ব গ্রাস করে নিচ্ছে সমস্ত অপ্রাসঙ্গিকতা। পৃথিবীর সমস্ত অশুভ শক্তি যেন এ মুখ্য পুরুষের দৃষ্টির ঐশ্বর্যে ভস্মীভূত হয়ে যাবে। 

স্বর্ণা ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকে সিজারের দিকে। মাথামুণ্ড কিছু উদ্ধার করতে পারে না সে। কোলকাতা থেকে বন্ধু প্রমোদের মাধ্যমে বেশ কিছু বই আনিয়ে নিয়েছিলো সিজার। পড়ার আগ্রহ সিজারের সবসময়- প্রচুর বই পড়ে, মদ খায়- কিন্তু নেশা করে না। আর স্বর্ণা।

কথা না শুনলে তুলকালাম ঘটিয়ে ফেলতে পারে সিজার। স্বর্ণা চুপ করে সব শুনে যায়। ‘আচ্ছা তুই নরেন্দ্রাদিত্য-তুই শশাঙ্ক। কিন্তু এঁরা কারা? আর কর্ণসুবর্ণ?’

প্রোজ্জ্বল হয়ে ওঠে সিজারের মুখমণ্ডল। ‘তুই যাবি, যাবি আমার সাথে?’

‘তার আগে আমার সাথে তোকে এক জায়গায় যেতে হবে। যাবি?’

‘যাবো, তাহলে কথা দে তুইও যাবি আমার সাথে…’ 

সিজারের কোন সমস্যা নেই। প্রখ্যাত সাইকিয়াট্রিস্ট প্রফেসর হোসেন আলি দেখেছেন তাঁকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের প্রধানের সাথেও দুইটা সেশন হয়েছে। তিনিও কোন সমস্যা দেখছেন না। ‘কিন্তু সমস্যা আছে’, এটা সিজার ব্যতীত কেউ জানে না।

 

যাত্রা বিগ্রহ-

ঢাকা থেকে রাজশাহী- সেখান থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ হয়ে রাধাকান্তপুরের চৌধুরী বাড়ি। 

‘মেঘেদের সীমান্ত আছে? রাষ্ট্র? অথচ আকাশে সীমান্ত এঁকে দিয়েছে রাষ্ট্র ধারণা।’ মাঝেমাঝে মেঘ হয়ে যেতে ইচ্ছে করে স্বর্ণার। উইন্ডো সিটে বসে অন্য পৃথিবীর মুখ দেখছে সে। ঘাড় ঘোরাতেই হঠাৎ চোখ পড়ে সিজারের দিকে।

‘সিজার কি মেঘ? কখনও কখনও তাই মনে হয়।’ স্বর্ণা আর সিজারের সম্পর্কটা ঠিক মেঘ আর আকাশের মতো। ‘কখনও সিজার আকাশ, কখনও স্বর্ণা। ঝড়- বৃষ্টি- রোদ কখনও শরতের মত উন্মুক্ত, স্বচ্ছ, কখনও কুয়াশাবৃত।  গত দুই মাসে অনেক পাল্টে গেছে সিজার। এখন অক্ষরের সাথেই তার বসবাস।’   

মিনিট পঁচিশের ফ্লাইং টাইম। বাজ পাখির চেয়ে কিছুটা বড় এয়ারক্রাফট কংক্রিট ছোঁয়ামাত্রই একটা ঝাঁকুনি খেলো। অনিয়মিত এয়ারপোর্টের অনিয়মিত রানওয়ে। কেঁপে উঠলো সিজার, ‘ক-র্ণ-সু-ব-র্ণ!’ এর মধ্যে ঘুমিয়ে পড়েছিল সে। স্বপ্নটা আবার… ঘুম ভেঙে গেছে। 

‘পৌঁছে গেছি?’ স্বর্ণার স্বগতোক্তি।

‘ডেসটিনেশন?’

‘না।’

‘তবে?’

‘পৌঁছুবো।’

‘অবশ্যই।’

‘আমার চেয়েও রাজশাহী তোর কাছে প্রিয়?’

‘তোদের এই এক সমস্যা।’

‘মেয়েদের?’

‘কনফিডেন্স লেভেল দেখে ভালো লাগল।’

‘জানো, ইতিহাস আমাকে ভুলভাবে উপস্থাপন করেছে।’

‘আমরা রাজশাহীতে থাকব আজ?’

যাত্রীরা উদগ্রীব। সিজার আর স্বর্ণা চুপচাপ বসে আছে। সবাই নামুক। তারা পরে নামবে। বাড়ি পৌঁছুতে পৌঁছুতে সন্ধ্যা হয়ে যাবে। রাতটা বাড়িতে কাটিয়ে খুব সকালেই বেরিয়ে পড়বে। সোনা মসজিদ বর্ডার দিয়ে ইমিগ্রেশন। সেখান থেকে মুর্শিদাবাদ। বহরমপুর হয়ে সেদিনই রাজবাড়িডাঙা। সোনা মসজিদ স্থলবন্দর থেকে একশো সাতান্ন কিলোমিটারের মতো। দূরত্বটা মেপে দিয়েছে গুগল। 

ন্যানি খুব উৎফুল্ল। কয়েকদিন থেকেই সে বুঝতে পারছিল কিছু একটা হবে। সাড়ে তেরো’শ বছর ধরে ঘুমিয়ে আছে সে। এই জায়গায়। মাটিতে। মাটির শরীরে। কিন্তু সে কোন রূপে উঠবে, ‘রাজ্যশ্রী, রাজ্যশ্রী?’

 

পরম্পরা-

‘বেটি জি, ক্যামন আছো?’ একশ এগারো বছরের ইতিহাসের সামনে বসে আছে সিজার। সিজারের ফুপু। আব্বারা সব মিলিয়ে তের ভাইবোন। তাঁদের সবার বড় এই ফুপু। অল্পই শোনেন। তা প্রায় চিৎকার করে কথা বলতে হয়। এক কথা দুই-তিনবার করে বলতে হয়।

বাড়ি এসে পৌঁছুতে পৌঁছুতে সন্ধ্যা। গ্রামে সন্ধ্যা বলে কোন বেলা নেই- অতএব এখন রাত।

‘কে? কে উটা?’ বৃদ্ধা তাঁর কাঁপা কাঁপা হাতের শতবর্ষী অভিজ্ঞতাকে শব্দের উৎসমুখের দিকে বাড়িয়ে দেন।

‘হামি! সিজার। বেটি।’ বৃদ্ধার হাতের তালুর দিকে নিজেকে এগিয়ে দেয় সিজার।

‘কে?’ সিজার নিশ্চিত ফুফু তাকে চিনতে পারেননি। ঠিকমত দেখতেও পান না। সে স্থির থাকে।

ফুফু স্মৃতি হাতড়ে বের করেন সিজারকে। ‘ও বুড্ডা?’ আব্বা, বুকে আয় আব্বা।’ বলেই কাঁদতে আরম্ভ করেন তিনি। কয়েকশত বছরের অতীত স্মৃতিকে নবায়ন করার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায় এই কান্নায়। সিজার নিজের চিন্তাচক্ষুকে সজাগ রাখে।

ফুফুকে জড়িয়ে ধরে সিজার। কান্না থামানোর কোন প্রচেষ্টা করে না। কোন লাভ নেই।

‘ক-দ্দি-ন পর আলি, বাপ হামার? মরণ হামাকে দেখ্যা ভয় প্যায়াছে। হামি কি কোত্তে পারি কহ্যা?’ ফুফুর কুঁচকে যাওয়া মুখে বসে আছে সমস্ত পৃথিবীর মানচিত্র। সে তো জানে না, তাঁর মৃত্যু মানেই পৃথিবীর মৃত্যু।

‘ফুফু, তোমার দাদোর নাম মনে আছে?’ সিজারের অনুসন্ধানী মন খুঁজে বেড়াচ্ছে তার পূর্বপুরুষকে।

‘দ্যাখো তো কি কোহছে ছোঁড়া! কেনে রে বুড্ডা? হ্যাঁর দাদোর না দিয়া কি করবি? ওই বুড়হ্যাঁর নাম ছিল হারেন চৌধুরী।’ সিজার জানে তাঁর বড় আব্বার নাম, তবুও অজানাকে নতুন করে জানতে চায় এই অস্থির মন।

স্বর্ণা পাশে দাঁড়িয়ে দেখতে থাকে ওদের দুইজনকে।

‘উটা কে? তোর পাঞ্জরে? স্বর্ণা লই?’ সিজার মোটেও অবাক হয় না। স্তম্ভিত হয়ে যায় স্বর্ণা।

‘ তুমি কিভাবে বুঝল্যা, ফুফু?’

‘ বুড্ডা, চোখ কান নাক মোর‍্যা গেলেও মানুষের মন মরে নারে ব্যাটা।’

‘তোমার দাদার বাবার নাম মোনে আছে তোমার?’

‘আয় বেটি বস হ্যাঁর পাঞ্জরে। কত্তদিন পরে আলি।’ হাত বাড়িয়ে দেয় ফুপু। ফুপুর পাশে বসে পড়ে স্বর্ণা।

‘ তোমার দাদার দাদার নাম?’

‘ বেটি হামার বুড্ডার কি হোয়্যাছে? এতো অস্থির কেনে উঁ।’

‘ ফুফু, হামাকে কহো না।’

‘ আয় এখ্যানে আয়।’ খাটিয়ায় বসে আছে ফুপু। তাঁর ডান পাশে সিজার, বাম পাশে স্বর্ণা। ‘শান্ত হ, একটা জিনিশ দিবো তোকে।’

এ বাড়ীর পরতে পরতে কয়েক শ’ বছরের থেঁতলে যাওয়া ইতিহাস। এই ইতিহাসের পেছনের ইতিহাস জমিদারী। বিস্তৃত ভূসম্পত্তির মালিক এই চৌধুরী পরিবার। এখনও শত শত বিঘা ধানী জমি আর আমের বাগান। এক সময়ের জমিদারী ফুরিয়ে গেলেও তার রেশ স্পষ্ট।

রাধাকান্তপুরের এই চৌধুরী বাড়িতে অতীত ঐতিহ্য আর ফুফু ছাড়া কেউ থাকে না। ফুপু বিয়ে করেননি। চৌধুরী বাড়ির একমাত্র মেয়ে। ভীষণ স্বাধীনচেতা। বিয়ে করে কারও অধীনস্থ হতে চাননি তিনি। বিয়ের জন্য কেউ তাঁকে রাজী করাতেই পারেনি। 

 

স্বেচ্ছাব্রতী-

নাসুকে এয়ারপোর্টে ড্রপ করে হোটেলে ফিরে আসে জাহিদ। আরও কয়েকদিন সে থাকতে চায় এখানে। কয়েকদিন? না আজীবন! ঢাকার জীবন ভাল লাগছে না।

কিছু কিছু চেষ্টা সফলতার মুখ দেখে না- স্বর্ণার সন্তান নেবার চেষ্টাও তেমনি এক চেষ্টা। বিয়ের শুরুর দিকে সে কোনভাবেই মেনে নিতে চায়নি আপন খালার প্রাক্তন প্রেমিককে। একসময় সেগুলো ভুলে গিয়ে মানিয়ে নেবার চেষ্টা করেছে। উর্বর ভূমিতে অক্ষম বীজ কোন জীবন ফলাতে সক্ষম নয়, একথা দ্রুত বুঝে নিয়েছিলো স্বর্ণা। জাহিদ তখন থেকেই গৌণ।

মোবাইলটা বের করে জাহিদ। বেশ কয়েকটা মিসড কল। নাসুর কল। কয়েকবার চেষ্টা করে না পেয়ে এসএমএস করেছে নাসু। ‘জাহিদ জীবনের একেক মুহূর্ত একেক রহস্য নিয়ে আমাদের সামনে এসে দাঁড়ায়। কিছু কিছু মুহূর্তের জন্য আমরা কোনভাবেই নিজেদেরকে প্রস্তুত রাখি না বা রাখতে পারি না। তোমার জন্য একটা চিঠি লিখেছি। বালিশের নীচে হাত দাও, পেয়ে যাবে। আজ থেকে প্রায় বত্রিশ বছর আগে তুমি আমাকে প্রথম চিঠি দিয়েছিলে। আজ আমিই তোমাকে লিখলাম, হয়ত এটাই শেষ চিঠি। এমনকি হয়ত এটাই আমাদের শেষ দেখা।’

সম্পূরক সম্পর্ক থেকে নিজেকে উইথড্র করে নিয়েছে নাসু। এর কারণ জিজ্ঞেস করবে না জাহিদ। ভেনিস যাবার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করে সে।

বিমানে বসে নাসু এক বিপ্রতীপ জিজ্ঞাসার মুখোমুখি হয়। নিজেকে আয়না বানিয়ে নিজেকেই মেলে ধরে সেই আয়নায়। উত্তর কি আসবে তা নাসুর জানা। জাহিদের সাথে নাসুর সম্পর্ক প্রায় তিন যুগ। খুব কষ্ট হচ্ছে। না জাহিদের জন্য নয়, নিজের জন্যও নয়। কষ্ট হচ্ছে স্বর্ণার জন্য।

ভেনিসে পৌঁছেই বেরিয়ে পড়ে জাহিদ। হয়ত আর কোনদিনই ফিরবে না- স্বর্ণার কাছে না, নাসুর কাছে না, এমনকি নিজের কাছেও না।  

উত্থান পর্ব

প্রায় তের’শ বছর পর ঘুম ভাঙে ন্যানির। কাগজি লেবুর গন্ধে নিজের বর্তমান খোঁজে সে। আস্তে আস্তে এগিয়ে যায় উত্তর জানালার দিকে- তারপর বেলি ফুলের গন্ধ হয়ে উড়ে বেড়ায়। আজ বড় আনন্দের দিন। কথাগুলো বলা খুব জরুরী- বলা হয়ে গেলে হয়ত সে আবার ঘুমিয়ে যাবে। ঘুমিয়ে পড়তে মন চায় না। তবুও ঘুমাতেই হবে।

সিজারের জানালাসংলগ্ন ঘরে জোছনা বইছে। চন্দ্রালোকিত রাত। ঔৎসুক এ রাতে অদ্ভুত বিস্ময়ে মোহাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে চতুর্দিক। উত্তরের জানালায় স্থির ন্যানি- সে চাইলেই যেখানে ইচ্ছা সেখানে ঢুকে পড়তে পারে। ফুলের ঘ্রাণকে বাঁধা দেবার ক্ষমতা কার?

বাতাসের ইঙ্গিতে কোথায় চলে যায় ন্যানি- পুনরায় ফিরে আসে।  

অনেক দিন এমন নিশ্চিন্তের ঘুম আসেনি। কোন এক অচেনা কণ্ঠের ডাকে ঘুম ভেঙে যায় সিজারের। বেলি ফুলের তীব্র ঘ্রাণ তাকে অস্থির করে তুলছে। ছিটকিনিতে হাত দেবার পূর্বেই দরজার কপাট খুলে যায়। সিজার টলমল পায়ে হাঁটে। হাঁটতে হাঁটতে আঙিনা পেরিয়ে দাঁড়ায় ডালিম গাছটার পাশে। তারপর এগিয়ে যায় দরজার দিকে- যেটা বাড়ির পেছনের ফুলবাগানের দিকে গেছে। ফুলবাগানের একপাশে সমাধিস্থল।

লেবু গাছটার তলায় এসে দাঁড়ায় সিজার। বেলি ফুল আর লেবুপাতার ঘ্রাণ- পাতাদের ফাঁক-ফোকর গলে নেমে আসা জোছনা এক অপার্থিব পরিবেশ তৈরি করেছে। ‘কেন এলাম এখানে!, এটা তো ন্যানির কবর!’ ঘুম এবং জাগরণের মাঝামাঝি স্তরে দাঁড়িয়ে নিজেকেই জিজ্ঞেস করে সিজার। ‘ন্যানি, তুমি ভালো আছো?’ অস্ফুট স্বরে বলে সিজার। তেইশ বছর পূর্বের স্মৃতিতে ফিরে যায় সিজার। ন্যানি, সিজারের ম্যাটারনাল কাজিন। প্রায় সময় তাদের বাড়িতেই থাকত। তখন সিজার সবে ক্লাস নাইনের ছাত্র। ন্যানি আপা সিজারের প্রায় ছয়-সাত বছরের বড়। হঠাৎ একদিন তাকে খুঁজে পাওয়া যায় না। পাওয়া যায়। মৃত। ধরে নেয়া হয় এই মৃত্যুর জন্য দায়ী সিজারের বড়দা- জাহিদ।

আলোর শরীর কেটে বেলি ফুলের ঘ্রাণ ধীরে ধীরে মানুষীর আকার ধারণ করতে থাকে। নিজেকে দেখে অবাক হয়ে যায় ন্যানি নিজেই।

‘শশাঙ্ক! শশাঙ্ক? ওরা মিথ্যেবাদী, তোমাকে নিয়ে মিথ্যা বলেছে ওরা।’ ন্যানি অবাক হয়ে দেখে তাঁর ভেতর থেকে বেরিয়ে এসেছে এক রহস্য মানুষী। যিনি নিজেকে ‘রাজ্যশ্রী’ পরিচয়ে পরিচিত করে তুলতে চেষ্টা করছে। ‘আমি রাজ্যশ্রী। আমিই রাজ্যশ্রী।’ ন্যানি বাতাসের শরীরে ছুঁড়ে মারে শব্দগুলো। কিন্তু এ তো ন্যানি নয়! তাহলে? রাজ্যশ্রী?’   

সিজার অবাক হয়ে শোনে কথাগুলো। ‘এ কে? ন্যানি? রাজ্যশ্রী! হায়, এই তো রাজ্যশ্রী। রাজ্যবর্ধন আর হর্ষবর্ধনের ভগিনী। কান্যকুব্জের রাজা গ্রহবর্মার অর্ধাঙ্গিনী, রাজ্যশ্রী। কিন্তু ন্যানি? অস্ফুট স্বরে কিছু একটা বলতে চাইছে… কিন্তু কিছুতেই কথাগুলো বোঝা যাচ্ছে না।’

এই শব্দশূন্য জোছনালোকিত আলো আবছায়ার মায়ায় একি দেখছে সিজার। সে লক্ষ্য করে, তার তাঁর নিজ শরীরের ভেতর থেকে এক আলোকোজ্জ্বল ছায়া-কাঠামো রাতের মায়ামোহ রশ্মিকে পরাজিত করে বেরিয়ে আসছে। ‘ কে এ? এ বেরিয়ে এলো তার শরীর ভেদ করে?’ স্তব্ধ হয়ে যায় সিজার।

‘শশাঙ্ক- তুমি শত্রু, তবুও মুক্ত করেছিলে আমাকে। তারপর সসৈন্য এগিয়ে গিয়েছিলে। আমার ভ্রাতা রাজ্যবর্ধনের সাথে সম্মুখ যুদ্ধে পরাজিত করেছিল, হত্যা করেছিলে তাকে। এটাই যুদ্ধের নিয়ম। রাজ্য বাঁচাতে, রাজ্য বাড়াতে এটাই করতে হয়। অথচ বান ভট্ট তোমাকে নিয়ে মিথ্যাচার করেছে। চিনতে পারছো আমাকে?’

হাত বাড়ায় সিজার। বেলি ফুলের ঘ্রাণে মোড়ানো নারী মিলিয়ে যায় মুহূর্তেই- ন্যানি অথবা রাজ্যশ্রী।

ফুফুকে নিয়ে এক পা দুই পা করে ন্যানির কবরের দিকে এগিয়ে আসে স্বর্ণা। দুইজন মানুষের অদ্ভুত কথোপকথন শুনে ঘুম থেকে জেগে উঠেছিল স্বর্ণা। খুব ভয় পেয়েছিল। সিজারের ঘরে গিয়ে সিজারকে না পেয়ে আরও আতংকিত হয় সে, ফুফুকে ডেকে তোলে। তারপর দুইজনে এগিয়ে আসতে থাকে কবরস্থান সংলগ্ন লেবুতলার দিকে।

শিশিরসিক্ত ঘাসের ভেতর জবজবে শরীরে পড়ে আছে সিজার। চিৎকার করে ওঠে স্বর্ণা।

‘থাম বেটি, চেচ্যাঁস ন্যা। থাম…’ ভেজা ঘাসের উপর উবু হয়ে বসে পড়েন ফুফু। সিজারের মাথাটা কোলে তুলে নেন।

স্বর্ণা অবাক হয়ে যায়। ফুফু ঠিকমতো দেখতেই পায় না। তাহলে, কিভাবে এতদূর, এই আলো আঁধারীর মায়াজঙ্গল পেরিয়ে হেঁটে এলেন? স্বর্ণা অবাক বিস্ময়ে লক্ষ্য করে ফুফু তার মাজায় বেঁধে রাখা একটা থলে থেকে ছোট্ট মুদ্রার মতো কি একটা জিনিস বের করে সিজারের হাতে দিলেন। ধিমে আলোতেও জ্বলজ্বল করছে মুদ্রাটি, ‘এটিই কি সেই সুবর্ণমুদ্রা? যার কথা মাঝেমাঝেই বলত সিজার!’

কুয়াশার ভেতরেই হাঁটু গেঁড়ে বসে পড়ে স্বর্ণা। ফুফুকে সরিয়ে সিজারের মাথাটা তুলে নেয় নিজের কোলে। এই তীব্র শীতেও সিজারের শরীরে আগুনের প্রবাহ। তার বাম হাত থেকে সুবর্ণমুদ্রা মুদ্রাটা নিয়ে উল্টে-পাল্টে দেখতে থাকে। এই তো সেই মুদ্রা, সুবর্ণমুদ্রা।

মুদ্রাটার এক পিঠে শুয়ে থাকা একটি ষাঁড়ের উপর হেলান দিয়ে রাজা অর্ধেক ঘুরে আছেন। রাজার ডান হাতের কনুই ষাঁড়ের ঝুঁটির উপর। বাঁ হাত তোলা উপরে। ষাঁড়ের ঘাড়ের উপর একটি চাঁদ। জয়ের প্রতীক। ডানদিকে একটি ‘শশ’ বা খরগোশ।

উলটো পিঠে পদ্মর উপর বসে আছেন দেবী। ডান হাত খালি। বাঁ হাতে ধরে আছেন ফুল। তাঁর ডান এবং বাম দিকে আছে হাতি। ধারে লেখা, ‘শ্রীশশাঙ্ক’, খরগোশ অস্পষ্ট। চাঁদটাও।

অজ্ঞান সিজার স্বর্ণার কোলে মুখ ঘষতে ঘষতে অস্পষ্ট উচ্চারণে সে বলতে থাকে, ‘তুই আমার কর্ণসুবর্ণ। আমার কর্ণ- সু-ব-র্ণ। তুই কর্ণ।’

গল্পকারের চোখ মুদে আসে, তিনি হঠাৎ দেখতে পান, একটি মূর্তি, যার- আটটি হাত। ডানে চারটি। বামে চারটি। ডানের উপরের হাতে একটি তূণী। নিচের হাতের বস্তুটি অজ্ঞেয়। বাম দিকের প্রথম হাতে একটি পদ্মফুল। তৃতীয় হাতে একটি ধনুক। বাঁ দিকের পা ছুঁয়ে আছে পাদ ভূমি। ডান পা একটি পশুর পিঠে।

লেখা সম্পর্কে মন্তব্য

টি মন্তব্য