home কার্টুন সংখ্যা সম্পাদকীয় ।। কার্টুন সংখ্যা ।। রাজীব দত্ত

সম্পাদকীয় ।। কার্টুন সংখ্যা ।। রাজীব দত্ত

যতদুর জানি, বাংলাদেশের কার্টুন নিয়ে অইভাবে কাজ হয় নাই। নব্বইয়ের দশকে বিচিত্রা পত্রিকায় একটা কার্টুন সংখ্যা হয়েছিল। এর আগে-পরে আর অত বিস্তৃত পরিসরে, বাংলাদেশের কার্টুন আর আসে নাই। নাকি? অন্তত আমাদের জানা নাই। অথচ কার্টুন অনেক জনপ্রিয় একটা মাধ্যম।সামাজিক-রাজনৈতিক নানান দিক থেকে জনসংযোগের জন্য সিনেমা-গানের পর সবচেয়ে শক্তিশালী একটা মাধ্যম।

তখন হাইস্কুলে পড়ি আমরা। জনকণ্ঠে টোকাই ছাপা হয়। খুব যে মজা পেতাম, তা না। টোকাইয়ের উইট ধরার বুদ্ধি তখনো হয়নি। আমরা খুঁজতাম শিশিরের কার্টুন, ভোরের কাগজে। সাদাকালো ছিল। রাজনৈতিকও। অই রাজনীতিও ঠিকঠাক না বুঝলেও, শিশিরের ড্রয়িংয়ের গুণেই মজা পেতাম। রঙ্গব্যাংকও (ভালো মনে নাই। এরকম একটা নাম) খুঁজতাম। এ পাতায় পিওর কার্টুন হতো এমন না। ফান পেজ যা হয় তা। এরপর আলপিন। এইভাবেই সম্ভবত, আমরা যারা অই সময়ের উঠতি কিশোর, আমাদের কার্টুন ভালোবাসা শুরু। আমরা যারা গ্রামে থাকতাম, আমাদের প্রিন্টেট পত্রিকা-জীবনে তখনো ডিশ-এন্টেনা ঢুকে নাই। আমরা তখনো টম এন্ড জেরি চিনি না। কিন্তু রনবীকে চিনি, শিশিরকেও। ও হ্যাঁ, রনবীকে তখন একজন নারী শিল্পী ভাবতাম। নামের কারণে। আর ‘উন্মাদ’ দেখেও পাগল হয়েছি আরো পরে।

রনবী-শিশিরের আগেও বাংলাদেশে কার্টুন ছিল। কার্টুনিস্ট ছিল। যখন বাংলাদেশ হয়নি, পূর্ব পাকিস্তান, তখনও। তখন আমাদের ছিল দোপেয়াজা।দোপেয়াজা ছিল তার ছদ্মনাম। আসল নাম কাজী আবুল কাশেম। তিনি আমাদের প্রথম মুসলিম কার্টুনিস্টও। আজকের দিনে কার্টুন আঁকা কতো সহজ। শেখার-আঁকার কতোরকম উৎস। কিন্তু তখন? তারপরও কার্টুন আঁকা হতো। অই সময়ের প্রায় সব শিল্পীই কার্টুন আঁকতেন। কি জয়নুল, কি কামরুল হাসান, সকলেই কার্টুন আকঁতেন। নামে-বেনামে। তখনকার কোনো জন-আন্দোলন কার্টুন ছাড়া ভাবাই যেত না। আজকে আমাদের সবার পরিচিত ‘এই জানোয়ার হত্যা করতে হবে’ যে পোস্টারটা, তাও তো কার্টুনই। কামরুল হাসানের আঁকা, ইয়াহিয়ার বিরুদ্ধে। ইয়াহিয়ার ক্যারিকেচার। তখন শিল্পীরা দেয়ালের পর দেয়াল ভরে দিতেন কার্টুন-লেখা-ছবিতে। আজকের জনপ্রিয় শিল্পী রনবীরা তখন ছাত্র। তাঁর কার্টুনের হাতেখড়ি অইসময়ে। নব্বইয়ের এরশাদ-বিরোধী আন্দোলনে কার্টুন আবার হাতিয়ার হয়ে উঠে। কার্টুনের জন্য ইস্যু লাগে। এরশাদ জনপ্রিয় ইস্যু তখন। বিচিত্রার একটা সংখ্যা নিষিদ্ধ হয় কার্টুনের জন্য। তখন অনেকেই কার্টুন আঁকতেন। কিন্তু কার্টুন আঁকা কোনরকম পেশা হিসেবে তখনো দাঁড়ায় নাই। রনবী-শিশির-আহসান হাবীব বাদ দিলে মোটা দাগে বাংলাদেশের কার্টুনের স্বকীয়তাও অইভাবে তখনো দাঁড়ায়নি। আজকে এ সময়ের কার্টুনের সাথে তুলনা করলে তখনকার কার্টুনকে বলা যেতে পারে বাংলাদেশের কার্টুনের কিশোরকাল। আর এখন তরুণকাল। অনেকটাই।এখনো অনেকেই কার্টুন আঁকেন। স্বকীয়তাও দাঁড়াচ্ছে।শিশিরের পরে শিশিরের মতোন করে যে বিপুল পরিমাণ কার্টুন আঁকা হতো, তা থেকে সরে এসেছেন মেহেদী হক-তন্ময়রা। নারী শিল্পীরাও আসছেন। পেশাদারিত্বও তৈরি হচ্ছে। সবচে মজার বিষয় যেটা, যারা আঁকছেন তাদের বড় একটা অংশই চারুকলার যে প্রাতিষ্ঠানিক গণ্ডি, তার বাইরে। তবে বাংলাদেশের কার্টুনের আজকের এ জায়গায় আসার পেছনে, যার অবদান খুব গুরুত্বপূর্ণ, তিনি আহসান হাবীব। ‘উন্মাদ’ দিয়ে উঠতি কিশোর-তরুণদের কার্টুনের উন্মাদনায় মাতান তিনি। তিনি একাই একটা প্রতিষ্ঠিান, এন্টি-প্রতিষ্ঠানও। যারা হাত পাকাতে চান, এঁকে ছাপাতে চান তাদের প্রত্যেকের জন্য অবারিত উন্মাদের দরজা। হাতে-কলমে শেখান অ-আ-ক-খ। যেখানে কার্টুন আঁকা জাস্ট একটা ফান-সময় কাটানো এরকম ছিল, তখন কার্টুনটাকে পেশাদারিত্বের জায়গায় নিয়ে যান আহসান হাবীবই, নানানভাবে নানাকিছু করে।তার স্বকীয়তাও চমৎকার।

শিরিষের ডালপালা আর সব অনলাইন ম্যাগের মতোই কবিতা গল্প এসব ছাপাচ্ছিল। তো সম্পাদক তার সবান্ধব মিলে ভাবতেছিল আর কি কি করলে, এ আর সব থেকে বেরোনো যাবে। তখন আরো আরো আইডিয়ার সাথে সাথে এ কার্টুন সংখ্যার কথা মাথায় আসে। কিন্তু সহজ ছিল না। কারণ কবিতা-গল্প চাইলেই পাওয়া যায়। গদ্য তেমন নয়। আর তা যদি হয় কার্টুনের মতোন বিষয়, তখন আরো কঠিন হয়ে পড়ে। তারপরও আমরা উদ্যোগ নিই। কার্টুনিস্ট-কার্টুনপ্রিয়দের নক করতে থাকি। ইন্টারভিউ নিতে থাকি। রেডি করতে থাকি অল্প অল্প। নিজেদের ব্যস্ততা, সাথে আলসেমিতো আছেই। তারপরও স্বীকার করতেই হবে, অনেকেরই আন্তরিকতা মুগ্ধ করেছে খুব। তার মধ্যে একজন কার্টুনিস্ট মেহেদী হক। এত এত ব্যস্ততার পরও তিনি সর্বোচ্চ সহযোগিতা করেছেন। তার প্রতি কৃতজ্ঞতা। কৃতজ্ঞতা রনবী-আহসান হাবীব ভাইয়ের প্রতিও। একবারেই রাজি হয়ে গেছেন ইন্টারভিউ দিতে। আমাদের নির্দিষ্ট সময় থেকে দেরিতে পৌঁছাবার পরও নিজেদের কাজ রেখে সময় দিয়েছেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা।তাদের প্রতি অনেক কৃতজ্ঞতা। কৃতজ্ঞতা কার্টুনিস্ট সাদাত-নাসরীন সুলতানা মিতু (নাম ভুল করার পরও এতটুকু বিরক্ত হন নাই)-আরাফাত করিম- মিশু-মামুন হুসাইন এবং বলাকা প্রকাশনীর শরীফা বুলবুল লাকী আপাসহ আড়ালের সবাইকে কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসা। এরকম আরো আরো কাজে এরকমই সাথে চাই।

                      – রাজীব দত্ত

 

লেখা সম্পর্কে মন্তব্য

টি মন্তব্য