সমগ্রে বিসর্গের হাওয়া | কাজী ওয়ালী উল্লাহ

ফিকে একটা দার্শনিক ভাব নিয়ে জানাবো, গল্পে নায়ক-নায়িকার সংস্কৃত ন্যাকা নাম আমার অপছন্দ


এখানে ফ্যানের বাতাসে মাথা ভার হয়ে আছে৷পর্দারা কাঁপতে কাঁপতে চমকে উঠতেছে। রোদ আরেকটু ডিটেইল হচ্ছে, ঘুম খুচরা হচ্ছে। সিঁড়িগুলা একইসাথে উর্ধ্ব এবং নিম্নমুখী জ্ঞানে পটু। আমি এরই মধ্যে ছাদে যাচ্ছি বিকাল হচ্ছে বলে। সেখানে একটা গল্পের অবয়ব কয়েকদিনের বৃষ্টিতে পাতা ফুটাইছে। এক প্যাকেট ম্যাচের কাঠি ইতোমধ্যে পুড়ানো শুরু হলো, আর ধীরে ধীরে রূপ নিতে দেখা গেলো নির্বাসিত জীবনের৷ সিটি কর্পোরেশনের পুরানা গলি দিয়ে যাতায়াত করতে করতে, হসপিটালের পাশ ঘেঁষে হাঁটতে হাঁটতে প্রমিতভঙ্গীর একটা মৃত্যুসম্পর্কিত পঙক্তির ভাবোদয় হবে, এবং বয়ে যেতে দেবে সবিশেষ অনুভূতি।

 

যেনো আমাকে ছাদে যেতেই হয়, একটা মিউজিকসংক্রান্ত আড্ডা দানা বাধবে বলে। আর আমি সেই ছেলেটাকে জিগেস করবো, যার উচ্চারণে আঞ্চলিক টান নাই, বাউল সঙ্গীত শুনে কিনা। ফিকে একটা দার্শনিক ভাব নিয়ে জানাবো, গল্পে নায়ক-নায়িকার সংস্কৃত ন্যাকা নাম আমার অপছন্দ। দেখেন, মেঘের ভিতর দিয়ে বিকালের আলো কেমন তেরছা ভঙ্গীতে আসতেছে৷ শুরুর দিকে একটু দ্বিধা হয়তো হইছে, ছাদে পা গুনে গুনে হাঁটছি; ছেলেটা আসছে কিনা। আমরা আলাপের বিষয় খুঁজে পেতাম না, খানিক পরপর কেবল ‘ভাল্লাগে না’ বলে আড্ডার আবাস ভেঙে দুই পা চালায়ে আসতাম। তার মধ্যে আবার বাংলা সিনেমা, নায়িকার বাবার একই ডায়লগ, নায়কের মাইর খাওয়া, এইসব ঢুকে গেলো৷ বলি, জীবন যে কি, বাংলা সিনেমা দেখলে বোঝা যায়।

 

ভোর হয়ে যাওয়াটা ব্যাপার না, যদিও নিশাচর পোলাপান কিছুটা সন্ত্রস্ত ফিল করে। আধেকদিন বাঁদুড়ের মতোন চোখ বুঝে কাটায়ে দেয়, অবশিষ্ট আলোও হাই তুলতে গিয়ে গত হয়। একদিন বিকালে ছাদে কতগুলা শুকায়া যাওয়া জামা ঝুলতেছে দেখে ভাবছি, আল্লাহ বিষ্টি আসুক! স্লিপিং পিল খেয়েও অনেকে মরে না, আবার গাছের নড়ানি দেখে বিরক্ত হয় দুনিয়ায়, রিকশায় যাইতে যাইতে বন্ধুর সঙ্গে ঝাপসা ছবি তুলে। অনেকের থাকে ছবি তোলার অস্বস্তি, আমি ছেলেটাকে কোনোমতেই একটা ছবি তুলে দেয়ার কথা বলতে সঙ্কোচ কাটায়ে উঠতে পারি না। একদিন বললো, বাসা থেকে কাগজ আনিয়েন, বিমান উড়াবো। আরেকদিন আমি উৎপলের ছন্দ কবিতাটা আউড়াচ্ছি, সে বললো, নতুন লেখলেন নাকি!

 

পৃথিবী সামান্য অস্থির এবং গভীর। প্রকৃতি সামান্য উত্তেজিত। পাখিরা একটু বেশি ডাকতেছে, গাছ একটু বেশি নড়তেছে। ছাদে উঠতেই এইসব আমি বুঝতে পারি। ছেলেটাকে একদিন বললাম, দেখেন কবুতরের হাঁটানি কি সুন্দর। বললাম, দেখেন পাতারা পতিত হয়। তখনই সে আরম্ভ করলো পতনোন্মুখের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা। একটা সরল প্রশ্ন, যার উত্তর জানি না, একটা জটিল প্রশ্ন, উত্তর আমি জানি। এবং আমরা ঝিম ধরা রোদ বিষয়ে বৈজ্ঞানিক ও সাহিত্যিক বিশ্লেষণে মগ্ন হই। একত্রে সিনেমা দেখার ব্যাপারটা খোলাসা হয় না৷ আবার জনগণ বিষয়ক আপত্তি জমাট বাঁধে। এভাবে রসায়ন তৈরি হয়। একে অপরের দিকে অপেক্ষা ও যুগপৎ উপেক্ষা নিয়ে আগাইতে থাকি। বলি, কোনো কোনো বাড়িতে আমার ছোটবেলা লুকায়ে আছে, কোনো কোনো বাড়িতে আপনার। আর যৌবন এইখানে, এক প্যাকেট ম্যাচের কাঠির মতো জ্বলতেছে৷ বাতাস আমাদের চেয়ে কোনো লম্বা ছাদে আটকায়ে গেছে। আমরা ধীরে ধীরে মেয়েদের নিয়ে কথা বলতে পারার মতো ঘনিষ্ঠ হই। প্রবারণা পূর্ণিমায় চাঁদের চাইতে ফানুস নিয়ে অধিক উৎসব হয়, বুঝতে পারি। আমরা হাওয়ায় বিশেষ স্বস্তি বা গুমোট পরিবেশে খুব অস্বস্তি বোধ করি না৷ ছেলেটার এবং যুগপৎ আমার আত্মীয়েরা আমাদের ভিতর দিয়ে নিজেদের সাথে ক্রমশ আত্মীয় হইতে থাকে৷ স্মৃতিচারণের ভিতর দিয়ে পুরানা ঘটনাগুলা একইরকম উত্তেজনা আর আতঙ্ক নিয়ে পুনরায় ঘটতে থাকে৷ আমরা রোমান এবং গ্রীক মিথলজি নিয়ে সংশয়প্রবণ আলোচনায় মেতে থাকি। নার্সিসিজম বুঝাইতে গিয়ে টাংকির ধারণ-ক্ষমতাক্ষম পানিতে নিজেদের অবয়ব প্রতিফলিত করি। কচি লেবুপাতা হাতে ঘষে নিয়ে বলি, শুঁকে দেখেন তো!


দুই লাইন গাওয়া কত কত গান এখানে-ওখানে ছড়ায়ে আছে, কোথাও কেবল একটা টান, কোনো লিরিক নাই৷


আমাদের মনে হঠাৎ বিড়ালের প্রতি উদ্বেলতা জেগে ওঠে। চোখে ভাসে প্রাণীটার নিদ্রাজড়িত চাউনি আর দুই পা টানা হাই। চশমা খুলে কেতুর মুছতে আরম্ভ করি৷ একটা অজ্ঞাত পাখি বসে থাকে এমন তামার তারে, যে তার মাগরিবের অন্ধকারে দর্শনাতীত হয়ে উঠতেছে। একটা চিত্রকল্পময় আবহাওয়া গোচরীভূত হচ্ছে। ছেলেটা এদিকওদিক আরো কিছুক্ষণ থাকার অভীপ্সায় তাকায়, নাকি যেতে চাওয়ার ফুরসত খোঁজে, বুঝতে পারি না। সাবধানে নিজেদের বয়স ও রুচি পরখ করতে থাকি। মাথা ঝুঁকাই দেখতে, নিক্ষিপ্ত থুতু অধোগত হইতে হইতে কতটুকু ছড়ায়ে পড়ে। কোন রাস্তা দিয়ে হেঁটে কোন রাস্তায় বাইর হওয়া যাবে, তার নকশা তৈরি করি। বলি, চলেন ভূতের বাড়ি যাই, যে বাড়িটার মিথের সংখ্যা ভূতের সংখ্যাকে ছাড়ায়ে গেছে। আমরা কেউ কাউকে ঠিকঠাক বুঝাইতে পারি না, দুইজনই চুপ করে থাকি অথবা একত্রে কথা বলে উঠি। মনোগত অস্বস্তিগুলা নিঃশ্বাস ছাড়ে, তখন রাস্তার জ্যামের কথা ভাবানি আসে, পলিথিনে করা বমির গন্ধ গুলায়ে ওঠে, আর আমাদের বিহ্বল ও অবসন্ন লাগে।

 

অবরুদ্ধ দশাটা এখন ধীরে ধীরে ছাদে এসে খুলে যেতে শুরু করছে, দুইজন মানুষের ভিতরই জমা হচ্ছে ফুটপাতের অগণিতের কথাবার্তা আর হট্টগোল, বাদামবিক্রেতার ডাক, গাড়িঘোড়ার ধুলা। নিজেদের হয়তো শিশু মনে হয়, প্রকাশ্য সংসার ভুলে গিয়ে ছোট ছোট পুতুলের পৃথিবী তৈরিতে যাদের লোভ। একটা পরিত্যক্ত সবুজ শ্যাওলার সরোবরে প্রেতের অবশ আহবানে ডুব দিতে ইচ্ছা করে। নারিকেল গাছে কাক বসে না, এমন শহর কোথায় পাই! গাল ফুলায়ে মুখ গোল করে হয়তো ছাড়ি। দেখি, আরো আরো ছাদসমূহে মাঝবয়সী মহিলারা স্থিতিশীল হাঁটা হাঁটতেছে, বালকেরা দৌঁড়াচ্ছে। এবং শুধুমাত্র দুই লাইন গাওয়া কত কত গান এখানে-ওখানে ছড়ায়ে আছে, কোথাও কেবল একটা টান, কোনো লিরিক নাই৷ পাশাপাশি বসেই আমরা গানগুলার আলাদা আলাদা অর্থের ভিতর প্রবেশ করি, আলাদা আলাদা ইমোশনে আমাদের বিকালগুলা ঘটতে থাকে। যেনো উঠবো না; এমন ভঙ্গীতে ধীরলয়ে উঠে পড়ি।

শেয়ার করুন

লেখা সম্পর্কে মন্তব্য

টি মন্তব্য

%d bloggers like this: