রেন হাঙ-এর জার্নাল ও ছবি (১৮+) । জার্নাল ভাষান্তর : তন্ময় হাসান

রেন হাঙ

রেন হাঙ চাইনিজ কবি ও আলোকচিত্রী। ১৯৮৭’র ৩০ মার্চ তার জন্ম। আর নিজের জীবন নিজে কেঁড়ে নেন ২০১৭’র ২৪ ফেব্রুয়ারি। মাত্র ২৯ বছরের জীবন, কিন্তু খ্যাতি বিশ্বজোড়া। কবিতার জন্যে যতটা খ্যাতি, তারচেয়েও বহুগুণ পরিচিতি আলোকচিত্রশিল্পী হিসেবে। মূলত ন্যুড ফটোগ্রাফার ছিলেন। রেন হাঙ তার ন্যুড ফটো দিয়ে চাইনিজ সোসাইটির জেন্ডার আইডেনটিটি ডিজঅর্ডারকে কষাঘাত করতে চেয়েছিলেন। এবং সফলও হয়েছেন। মূলত বন্ধুদেরই মডেল করে ছবি তুলেছেন তিনি। কাজের জন্যে কয়েকবার গ্রেফতারও হয়েছেন। রেনকে বরাবর সাপোর্ট দিয়ে গেছেন আর্টিস্ট ও অ্যাক্টিভিস্ট আই ওয়েইওয়েই। ২০১৩-তে নেদারল্যান্ডসে আই তার প্রদর্শনী ‘ফাক অফ টু দ্য সিক্যুয়াল’-এ রেনের ছবিকে জায়গা দেন। পরের বছর প্যারিসে রেনের একক প্রদর্শনীর কিউরেটরও ছিলেন আই।  তার কবিতার একটি সংকলন ইংরেজির অনুবাদ নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশ হয়েছে। আর ফটোগ্রাফির বই আছে কয়েকটি। বিষণ্ণতা রোগে পেয়ে বসেছিল এই প্রতিভাবানকে; যার মূল্য চুকিয়েছেন সুইসাইড করে।

ডায়েরির মতন করে তিনি অনলাইন জার্নাল লিখতেন। শিরিষের ডালপালার পাঠকদের জন্যে রেন হাঙ-এর সেসব জার্নাল থেকে কয়েকটি অনুবাদ করেছেন তন্ময় হাসান। আর রেন হাঙ-এর ছবিগুলি নির্বাচন ও কিউরেট করেছেন রুহুল মাহফুজ জয়।


১৭.১১.২০১৪

 

আমি কী উট না ক্যাকটাস? সোফার ঠিক মাঝখানে বসে আছি। ক্রিম কালারের সোফার কভারগুলো হচ্ছে জনশূন্য প্রান্তর। এরকম মনে হয় নাই অনেক দিন। কুঁজ ছাড়া উট নাকি কাঁটা ছাড়া ক্যাকটাস? বাইরে যাইতে ইচ্ছা করতেছে না। বাইরে যারা আছে, হাঁটাচলা করছে, সবাই আমার চেয়ে নম্র, ভদ্র, ভালো।  মানুষের আসরে যাইতে ইচ্ছা করছে না। চাঞ্চল্যপূর্ণ চারিদিকের মধ্যে হয়তো আমি চুপচাপ বসে থাকবো, এইটা আমার ভয়। আর চুপচাপ থাকলে আমি চিল্লায় উঠবো। কোন ড্রিংকস হাফ গ্লাস খাইলেই মনে হয় আমি পিছলাই যাইতেছি। আর এই অনুভূতি এতোটাই তীব্র যে মনে হয় সিড়ি দিয়ে পিছলায় পড়ে যাবো দেখে যেনো লাগবে যোগব্যায়াম বা এরোবিকস করতেসি। এইসব মুহূর্তে শরীরে কালসিরার চেয়ে আরামদায়ক কিছু মনে হয় না।  প্রত্যেক দাগ বা ক্ষতই একটা ঔষুধ। ব্যথাগুলো যখন কনক্রিটের মত শক্ত হয়ে যায়, আমি আর ভয় পাই না।

 

এইখানে কেনো বসে থাকি না? টিভির সাথে (বন্ধ করা), রিমোট দিয়ে পায়ের ম্যাসেজ করতে করতে? কেনো শুয়ে পড়ছি না?  বিছানায় ১৫-২০ ঘণ্টা কাটিয়ে দিতে পারি আরামেই।  মাঝে মাঝে মনে হয় তোষকের উপর শুয়ে আছি , মাঝে মাঝে মনে হয় তোষকের নিচে আবার কখনো মনে হয় তোষকের মধ্যেই। তোষক সম্পর্কিত এই গোলকধাঁধা থেকে বাইর হইতে পারবো না মনে হয়। বিছানা থেকে ওঠা আর ঘুমাতে যাওয়া, দুইটাই আমার জন্য ভীষণ কঠিন।

 

আমার সবসময় একটা জিনিস ভেতরে কাজ করে যে দরজাটা আলগা আর কেউ কলিং বেল বাজাচ্ছে। কিন্তু আমার বাসায় কলিং বেল নাই। কখনো লাগাই নাই। সবসময় শুনি মোবাইল ফোনটা ভাইব্রেট করতেছে। একবার হাতে নিয়ে দেখলাম যে আসলে ভাইব্রেট করতেছে না,  কিন্তু তখনও আমার আঙ্গুলে কাঁপন অনুভব করলাম। আমি কারো কল ধরি না কিন্তু যেটা সত্যি, কেউ আমাকে কল করে না। কিচ্ছু হচ্ছে না। কখনো কিচ্ছু হয় নি। আকুলতা আর হিস্টিরিয়া একটা কয়েন এর দুইটা পাশ।

 

 

২৩.০৩.২০১৫

 

পরশু দিন, সুপারমার্কেট থেকে একটা টুথপেস্ট চুরি করছি।

পরশু দিনের আগের দিন চুইংগাম দিয়া পাশের বাসার তালা নষ্ট করে দিছি।

গত সপ্তাহে আমি দুই-তিন গলি পরে পাড়ার সব ময়লার বাক্সগুলাকে লাথি দিয়া ফালাই দিছি।

প্রত্যেকবার খারাপ কিছু করলে মাত্র মনে হয় জীবন সুন্দর।

 

 

১৯.০৫.২০১৫

 

একবার বন্ধুর বাসায় রাতে ছিলাম, তো কোনভাবেই ঘুমাতে পারছিলাম না। প্রথমে বিছানায় শুইলাম, পরে ফ্লোরে। শেষে একটা চেয়ারে বসে দুই ফালি পর্দার দিকে তাকায়ে চোখ বন্ধ করলাম।  আমার মন হইতে থাকলো গলায় কেউ দড়ি বেঁধে দিছে আর হাত দিয়ে গলা টিপে ধরতে চাইতেছে। আমি শ্বাস নিতে পারছিলাম না, পুরো শরীর থরথর করে কাঁপছিলো। তবে কোনো ঘাম ঝরে নি, এক ফোঁটাও না। আমার চামড়া তখনও জাগ্রত চেতনার মতই শুষ্ক আর প্রশান্ত ছিলো, যদিও জাগ্রত যেই চেতনার কথা বলছি তা আমার অজান্তেই গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ছিলো।

 

আমি কখনো যুক্তি দাড় করানোর ক্ষমতা থেকে সরে আসি নি। কিন্তু পর্দাগুলো সরায়ে জানালার উপর দিয়ে দাঁড়ালাম, যেকোন মুহূর্তে ঝাপ দিতে রাজি। এইটা ছিলো মৃত্যুর সাথে সবচেয়ে কাছাকাছি আর অন্য যেকোন কিছু থেকে সবচেয়ে দূরে আমার অবস্থান। চিন্তা করা অসম্ভব, হাতে যা আছে এই ক্ষণে তা হচ্ছে মৃত্যু এবং মৃত্যুর একমাত্র কারণ জীবনকে বহুমুখীকরণ: আমি আমার সব ডিমগুলারে একটা ঝুড়িতে রাখতে চাই না। কি নিশ্চিন্ত আর শক্ত মনে হইলো এই যুক্তি। কোনকিছুই ভয় লাগছিলো না তখন। রাস্তার বাতিগুলা এতো উজ্জ্বলভাবে জ্বলছিলো আর তাকাইলে রাস্তার শেষ পর্যন্ত দেখা যায়,  ভয় পাওয়ার আর কিছু ছিলো না। শুধু একটা তাড়না ছিলো যে তাদের কাছে হেঁটে যাওয়ার, বিনা দ্বিধায়।

 

 

আমার বন্ধু দরজা ঠেলা দিয়া বাহির হইতেই দেখলো আমার অর্ধেক শরীর জানালার বাইরে। আমারে নাইমা আসার অনুরোধ করতে করতে সে কেঁদে ফেললো। আর তার কান্না দেখে আমিও। প্রত্যেকবারের মত, একবার কাঁদতে শুরু করলে আমি আর থামতে পারি না। নিজেরে উৎসাহ দিতে থাকলাম। নিজেরে বুঝাইতে থাকলাম যে কতটা স্বাভাবিক দেখানো সম্ভব; নিজেরে বললাম যে অস্ত্র হিসেবে শরীরের ব্যবহার উচিত না আর জীবনের অভিযান যে সত্যিকারের ঝুঁকি তা মাথা ছাড়া মুরগীর মত দৌড়ানোর মধ্যে নাই।

 

কিছুদিন পরে, আমি বন্ধুর সাথে কথায় কথায় যখন এই ঘটনার কথা বলি তখন সে বলে যে সেদিন সে ঘুমের মধ্যে একবারও উঠে নাই আর আমার আত্নহত্যার চেষ্টার মধ্যে তো আমাকে অবশ্যই দেখে নাই। এইটা আমার হ্যালুসিনেশন হবে হয়তো। আর বারবার বলতে লাগলো যে “তুমি কি বলতেছো তার কোনো ধারণাই নাই আমার “।

অনেকটা সময়ের জন্য আমি নীরবতা, নিঃসঙ্গতার সাথে জীবন যাপনের চেষ্টা করছি যেটা সব মানুষ করে থাকে।ওই সময়ই আমি ডাক্তারের পরামর্শ নেয়া শুরু করি। আমি ডাক্তারকে বললাম কখনো কখনো আমি উড়তেছি, উপরের দিকে, কখনো মনে হয় ডুবে যাচ্ছি নিচের দিকে। এই মনে হয় উপরে, এই মনে হয় নিচে, কোন অবস্থাই বেশিক্ষণ টিকে না। সে আমারে দুই ধরনের ওষুধ দিলো। সর্ব্বোচস্থানে থাকলে লাল ক্যাপসুল আর নিম্নবর্তীতে শাদা।

 

 

সত্যি কথা বলতে এটা আমাকে ক্যামনে সাহায্য করলো সেইটা আমি দেখতে পাই না। তবে সাময়িক একটা ভারসাম্য দিতো। কিন্তু এমনও সময় গেছে যখন আমি ভুল রঙের ওষুধ খাইছি। একবার ভুলবশত মনে হইলো আমি তলায় যাইতেছি কিন্তু আসলে ছিলো উল্টা। তো লাল ওষুধ খাওয়ার পর মনে হলো আমার বিছানা উড়ে যাচ্ছে আর সেখানে বসে আমি ফুটবল ম্যাচ দেখছি। শুধু এটা না, প্রতিপক্ষ দলের দিকে থুতু দিতেছি আর লাইটার দিয়ে তাদের জার্সি পুড়াইতেছি। এসব মনে হতে থাকলো যদিও কোনোদিন আমি কোনো খেলাই দেখি নাই তাও।

 

লাইট জ্বললে মনে হইতো তীব্র উজ্জ্বল কিন্তু লাইট বন্ধ থাকলে ঘুটঘুটে অন্ধকার, হিটার চালু থাকলে প্রচণ্ড গরম ও শুষ্ক, বন্ধ থাকলে মনে হয় তুষারের মত ঠান্ডা। আমার মনে চাইতো নিচে হাটতে যাইতে, কিন্তু লিফটের জন্য অপেক্ষা করতে ভয় ভয় লাগতো। যদিও আমি লিফটের জন্য অপেক্ষা করতাম না, তবে ভয় ছিল দরজা খুললেই মানুষ দেখতে পাবো। আমার ভয় করতো যে এরা হয়তো আমাকে দেখে ফেলবে, তারচে বেশি ভয় করতো এদের আমি দেখে ফেলবো ভেবে। গুনতি ছাড়াই ঘণ্টা পার হয়ে যেতো, আমি কি করতাম কিছুই বুঝতাম না। আমি কিছুই করতাম না, তবুও সবকিছু নিয়ে ভয় পাইতাম।

 

 

বন্ধুর বাসার ঘটনার পনের দিন মত পরে, বিকাল বেলা ঘুম থেকে উঠেই প্রথম কাজ যেটা করতাম সেইটা হলো ওষুধগুলা খোঁজা। এই অভ্যাসটা আমাকে আরো আতঙ্কিত করে তুলতেছিলো। আমি যদি ওষুধ না খাইতাম কিংবা কোথাও গেলে ওষুধ না নিয়ে যাইতাম, নিজেকে অক্ষম মনে হইতো আর যেকোন সময় ফেটে পড়ার সম্ভবনা তো থাকতোই। অধিকন্তু এই ক্যাপসুলগুলা আন্তঃসংবেদনশীলতাকে অধিক হারে বাড়ায় দিলেও, বর্হিউদ্দীপনা আত্নভূত করার শক্তি বিলিন করে দেয়। সত্যিকারে আমি ভীষণভাবে চাইতাম বাস্তবতার কাছে ফিরতে কিন্তু বাস্তবতাকে অতুলনীয়রকম অযৌক্তিক মনে হইতো। যেই মুহূর্তে আমার মনে হইলো আমি ক্যাপসুলগুলার ওপর নির্ভরশীল হয়ে যাইতেছি, আমি তা নেয়া ছেড়ে দেই। তাই যখন তুমি আমার কাছে বাস্তবতা কতটা অযৌক্তিক, অর্থহীন এই গল্প শুনাইতে আসো, আমার মধ্যে আর হিংসা কাজ করে না, বিন্দুমাত্র। আমি আমার মানসিক অবস্থার ওপর বিশ্বাস রেখে আবার সেই ভাঙ্গনের মধ্যেই রয়ে গেলাম। গতকাল যখন আমার মনে হইতেছিলো আমি আবার অতলে ডুবে যাচ্ছি, কিন্তু এইটা আমার মনে হইছে  বেঁচে থাকার সবচেয়ে দক্ষ আর নিপুন রাস্তা। 

 

 

০৬.০৮.২০১৫

 

মাথা তুলি, আবার নামাই।

সূর্যকে কখনো কখনো সূর্য মনে না হইলেও গোঁ ধরে

আমার দিকে স্ফুরিত হয়।

রাস্তা কখনো কখনো রাস্তা মনে না হইলেও

আমাকে সে তার কাছে ফিরায় নিতে চায়।

 

   

 

২৪.০৯.২০১৫

 

একরাতে ঘরে গিয়ে বিছানায় শুই আর পুরা ঘর হয়ে ওঠে জেলের সেল। চাঁদের আলো লোহার গ্রিলের মধ্যে দিয়ে এসে দেয়ালে তার ছায়া ফেলছিলো। আমার বোধগম্য হচ্ছিলো না কোনোভাবেই কিভাবে নিজেকে জেলের মধ্যে নিয়ে আসলাম? হঠাৎ মনে হইলো প্রত্যেকবার ঘর থেকে বের হইলে তা হলো বিশ্রাম আর মনোরঞ্জন। বাইরে যাওয়ার ভয় আমার সার্বক্ষনিক থাকে কিন্তু সিদ্ধান্ত নিলে, আমি তাতে অনড় থাকার চেষ্টা করি। আমার অসুস্থতা কখনোই বন্ধুদের সামনে দেখাই না। যদিও এই হাস্যকর স্নায়ুচাপ, সংশয়, আতঙ্ক কিংবা অবসাদ প্রচুর চেষ্টা করে তাদের জানান দেওয়ার, আমি মাথার মধ্যে প্রটোকল সাজায় নিছি এর সাথে লেনদেন করার জন্য।

 

কিন্তু যতই সাবধান এবং সর্তক আমি থাকি না কেনো, অনেক সময় এই বাধ টিকে না।  বন্ধুদের তুমুল নাচ দেখে মনে হয় আমার দ্বারা আর হবে না। আমি একটা ভেজা কম্বলের মত, ভয় পাই যে কখন বন্ধুরা আমার এই অবস্থা দেখে ফেলবে -আমার নার্সিসিজম- আমি কত করে চেষ্টা করি যে আমার চারপাশে যা হচ্ছে তাতে আগ্রহ প্রকাশ করতে কিংবা অংশগ্রহণ করতে কিন্তু এইসব প্রফুল্লিত মুহূর্ত যখন আসে, আমার ভেতর থেকেই আরো দূরে ঠেলে দেয়, যেনো এই আলো আমার গায়ে না ছোঁয়, আমার উপর স্ফুরিত না হয়। আমি একা দাঁড়ায়ে আছি, একটা কফিনের ভেতর। তখন গান যেগুলো সবাই শোনে আর আমি যেগুলো শুনি তা আর এক মনে হয় না। আমি যেগুলো শুনি তা এতো বিষণ্ণ কেনো? সব শব্দই মনে হয় গীত। আমি নিজেরে বলি নিশ্চয় আমি বেশি মদ্যপ অথবা আমার ঘুম কম হয়েছে। 

 

 

বাথরুমে পালায়ে এসে কাঁদি।

 

কিছুক্ষণ যাবার পর, বাথরুমের দরজায় যখন মানুষ বাড়ি দেয়, তখন আমি কি বলছি বা তারা কি বলছে না বুঝেই চিল্লাই। শব্দ আস্তে আস্তে কমে গেলে আমি শান্ত হই। টয়লেটের দিকে মাথা নিচু করে দেখলে মনে হয় যেনো কুয়ার ওপর বসে আছি। কুয়ার নিচ থেকে আমার নাম ধরে ডেকেই যাচ্ছে; থামার কোনো নাম নাই। প্রথমে একজন, আস্তে আস্তে তা কয়েকজনের কোরাস, হইতে পারে এটা প্রতিধ্বনি। এবং এই সময়ে, এর মধ্যে মাথা ডুবায় দেওয়া ছাড়া অন্য কিছু আমি চিন্তা করতে পারি না। সব জায়গাই নরক। অন্যের কষ্টকে কেউই সত্যিকারে রূপ দিতে পারে না, তাই কেউই সত্যিকারে সান্ত্বনা দিবার পারে না।

 

 

০৪.০৫.২০১৬

 

একবার বসে পড়লে আর দাঁড়াতে পারি না। বিছানায়, সোফায়, টয়লেটে, সিঁড়িতে, ফ্লোরে- শুধুই বসে আছি- জানি নি এতে আমি খুশি কিনা- কিংবা দুখী- ভেতর ভেতর আমি নিজের সাথে মধ্যস্থতা করছি। বিষয়বস্তু অনেক চিন্তামগ্নই, যেমন আমার উঠে বসা উচিত নাকি শুয়ে থাকা।

 

বেশিরভাগ সময় এই শুয়ে থাকাই নির্বাচিত হয়।

 

দূর থেকে দেখলে মনে হবে যেনো আমি পড়ে গেলাম। কয়েক সেকেন্ডেই আমি ধূসরাভ এবং দুর্বল বোধ করি। শান্ত বিলের মত মসৃণ আমার চেহারা, ঠান্ডা হাওয়া বয়, মুখের বলিরেখাগুলা ঢেউয়ের মত খেলে ওঠে। কিভাবে তোমারে বোঝাবো যে এই অনুভূতি কতটা বাস্তব লাগে?  আমি হাত বাড়ায়ে বিলের পানি ধরতে যাই। আমি বুঝতে পারি ফোঁটায় ফোঁটায় পানি বয়ে চলে যাচ্ছে শরীর থেকে। এবং হাড়েরা পর্যন্ত নরমে পরিণত হচ্ছে। তুমি যদি আমাকে দেখো, তাইলে আমাকে “প্রাণী”, “মানুষ” অথবা “জীব”-এর মত বিশেষ্য ব্যবহার করতে পারবা না। তোমাকে ব্যবহার করতে হবে “গাদা”, “তীর”, “তীরভূমি”। শূন্যের চেয়েও কমে নাইমা আসছি আমি,  শূন্যের থেকে ভালো।

 

আমার কেমন লাগছে এইটা না বলাই ভালো। আমার লাগে যে তুমি এইটা নিয়ে যাইয়া ভণ্ডামির প্রচারে ব্যবহার করবা আর এমনভাবে দেখাবা যেনো তোমার জন্য একটা পারফরম্যান্স তৈরি করে আনছি।

 

 

সত্যি যেইটা, এমনিতেও এই অনুভূতি প্রকাশের জন্য ঠিকঠাক শব্দ আসলে নাই। আসলে, আমি একটা নতুন ভাষা আবিষ্কার করতে শুরু করছি। কিন্তু মহৎ এই আবিষ্কার আমি প্রায়শ ভুলে যাই কারণ এরা কোনো যুক্তির মধ্যে পড়ে না বিশেষ। প্রত্যেকদিন আমি ভুলে যাওয়া ও আবিষ্কার কিংবা শূন্যতা আর সৃষ্টির মধ্যে আটকায় থাকি। কিন্তু সংগ্রামে প্রচুর শক্তি প্রয়োজন, এতোই বেশি পরিমাণে প্রয়োজন যে আমি জানি আমাকে তা ছেড়ে দিতে হবে। আমি পরিণতির সাথে নিজেকে অভ্যস্ত করে তুলছি, একটা ছক্কা ছুঁড়ে দেওয়ার মত যে প্রতিবার একই সংখ্যা দেখায়।  এইটা শুধুমাত্র সময় পার হইলে বোঝা যায় যে আসলে তার সব পৃষ্ঠে একি সংখ্যা ছিলো।

 

এই ঘরে আমার সবচেয়ে পরিচিত হইতেছে মাথার উপর থাকা অল্প একটু ছাদ। এইটাই আমার আকাশ, একটা শাদা আকাশ, যে আকাশ আবহাওয়ার ধার ধারে না, সে পরিষ্কার হোক বা ঝড়োই হোক না কেনো। আমার একবার ভ্রম হইছিলো যে উপরতলায় যারা থাকে, তারা হয়তো ঈশ্বর। আমি অবাক হইছিলাম এটা ভেবে যে তাদেরও অ্যার্লাম লাগে। ভেবেছিলাম তাদের কিসের সময়ের স্বল্পতা? ব্যক্তিগতভাবে আমার এমন কিছু ছিলো না যেটা সময় দেখাতে পারে।  আমি প্রতিদিন অন্ধকারে ঢিল ছুঁড়ে দেই শুধু, তবে মোক্ষম কোনো প্রতিধ্বনি এখনো পাই নি।

যদি জীবন একটা তলা ছাড়া কুয়ো হয় আর আমি তাতে ঝাপ দেই, এই পইড়া যাওয়া কি একধরনের ওড়া না?

 

 

১৮.০৭.২০১৬

 

যখন আমার অবস্থা খারাপ হয় তখন মনে হয় কে যেনো দূরবীন দিয়া আমার গতিবিধি দেখতেছে। যেকোন সময় আমাকে মেরে ফেলা হতে পারে। যাই দেখি মনে হয় যেনো অস্ত্র। জানালার বাইরে গাছের পাতা মনে হয় ক্ষুর, টেবিলের উপর চামচ মনে হয় ডার্ট। হাতে কোকের বোতল মনে হয় গ্রেনেড। আমার এইটা খাওয়া বা পান না করাই উত্তম। একটা চেয়ারে বসি আর মনে হয় যেনো খুলে পড়ে যাচ্ছে সব। সোফায় গিয়ে শুইলে মনে হয়,  বশ্যতা স্বীকার করে নিলো। আমি চলে যেতে চাই, কিন্তু প্রত্যেক সিঁড়িই কোন চূড়ার অতট, প্রত্যেক ধাপ এক একটা পাতাল।

 

আমি রাস্তা পর্যন্ত পৌঁছাই, কিন্তু সব পথচারীকে মনে হয় ফুলদানী, কাল্পনিক আকার আর সাইজের। আমি একটা ফুলের তোড়া কিনতে চাই যেনো তাদের মুখে একটা করে ফুল গুঁজে দিতে পারি। যদিও আমি জানি এটা করলে পৃথিবী হঠাৎ সুন্দর হয়ে উঠবে না। হাতুড়িই আমার জন্য ভালো। কাউকে মেরে ফেলা একটা ফুলদানি ভাঙার মতই সহজ। জাগতিক বিষয়াদি খুব সহজেই মানুষকে মারতে পারে – আমারে মরার ক্ষমতা তো অবশ্যই আছে, আমাকে আকারহীন তরজমা কইরা নিলে।

 

ইনসোমনিয়াক রাতে আমার শরীর ভরা থাকে প্রবল শক্তিতে। এই শক্তি আমাকে নিয়ন্ত্রন করে, কিছু করতে দেয় না, কিছু চাইতে দেয় না। একটা ঘড়ি কানের ওপর রাখি আর হার্টবিটের সাথে সেকেন্ডের কাটার ঠিকঠিক শব্দ মিলাইবার চেষ্টা করি। ক্ষেত্র বিশেষে এই পদ্ধতি পরিত্রাণ আইনা দিলেও, অন্য সময়গুলাতে এটা আমাকে মনে করায় দেয় যে, সময় একটা পথ আর সেখানে আমরা শক্তিহীন।

 

রাতগুলা অনেক সময় অতিপ্রাকৃতিক রকমের চুপচাপ আর কখনো প্রচণ্ড শব্দে আলোড়িত। যখন চুপচাপ লাগতেছে তখন মনে হবে তুমি একাই বেঁচে আছো এই পৃথিবীতে আর যখন শব্দময় তখন মনে হয় যেনো পৃথিবীর একমাত্র মৃত ব্যক্তি তুমি। অন্ধকারের মধ্যে স্তুপ হয়ে পড়ে থাকলে, আশেপাশের সব আলো জ্বলে ওঠে আর অন্ধকার পার করে আলোর কাছে গেলে আকাশ কালো হয়ে যায়। আমার কেন সন্দেহ থাকবে না যে আলো- স্বর্গ থেকে আসা কোন প্রাণবন্ত বজ্র নয়?

 

 

যেইটাই হোক, তুমি কখনো সুবিচারে বিশ্বাস করো নাই। তোমার সব অঙ্গে পাথর বেঁধে ঝাপ দিতে চাও নদীতে। তোমার সবসময় মনে হয় পৃথিবী আর তোমার মধ্যে কোন পরত আছে – কুয়াশায় ঘেরা, কিংবা কাচের তৈরি, কখনোবা দেয়াল, কখনোবা পাহাড়। মাঝে মাঝে এই প্রলেপ একটার বেশি। দুইটা-তিনটা। নিঃসঙ্গতা দেখতে অনেকটা পুকুরের মধ্যে চাঁদের শ্রান্ত ছায়া। তুমি এইটা ভালোবাসতে চাও কিন্তু তোমার আঙ্গুলগুলো বাধ্য করে সর্পিল ঢেউ সৃষ্টি করতে।

 

অনেকের সাথে কথা বলে যেটা বুঝলাম যে এগুলা তাদের কাছে পরিচিত নয়।

 

জীবন এরকম না, জীবন আসলে এরকম যে- সংক্ষেপে তুমি যেভাবে চাইবা তা কখনো তেমন নয়। ঠিক যেমন ধরো তোমার একটা সিগারেট খাইতে ইচ্ছা করছে কিন্তু তোমার কাছে তা নাই।  যখন সিগারেট পাইলা তখন লাইটার নাই। লাইটার জোগাড় করলা কিন্তু তাতে আর আগুন জ্বলে না। আগুন জ্বালাইতে সক্ষম হইতে হইতে তোমার আর সিগারেট খাওয়ার ইচ্ছা নাই।

 

একঘেয়েমি এবং বেদনা একটা মানুষের প্রাত্যহিক অবস্থা। সুখ আর ভাগ্য এতোটা না। উন্মাদনা ক্লান্তি আনে আর আরাম আনে শঙ্কা। অদৃষ্টবাদ বোধহয় এইখান থেকে যাওয়ার শ্রেষ্ঠ আর একমাত্র পথ।

 

 

১৯.০৭.২০১৬

 

ইনসমনিয়াক যে রাতগুলা কাটে, তখন আমি চোখ বন্ধ করলে অসংখ্য উপায়ে আত্মহত্যার কল্পনা আমার মাথার ভেতর ঘুরপাক খায়। ভয় পেয়ে, ঘরে ধারালো যা কিছু আছে সবকিছু লুকায় ফেলি একটা ড্রয়ারে। একটা কাঁচি আছে যেইটা এই ড্রয়ারে আঁটে না। আমি জানালা দিয়ে কাঁচিটা ছুড়ে ফেলে দেই, সাথে ড্রয়ারের চাবিও। বিছানায় শুয়ে ঘামতে থাকি, জ্বর আসে, ঠান্ডা লাগে, তারপরও ঘামতে থাকি। আমার মনে হয় আমার শরীর দিয়ে রক্ত পড়ছে, প্রত্যেকটা হাড় নরম হয়ে আসছে আর রক্ত ঝরছে যেনো সদ্য কাটা মাংস। আমার শরীর একটা আস্ত ক্ষত। আমার উচিত এখন বিছানার সাইজের একটা ওষুধ গিলে ফেলা।

 

 

১৭.০৯.২০১৬

 

সাম্প্রতিককালে নিজেকে শান্ত রাখার নতুন উপায় পাইছি। পড়ে গেলে এবং ব্যথা পাইলে ডিপ্রেশনের সাথে সমতায় আসা যায়। প্রত্যেকবার যখন আমি মাটিতে পইড়া যাই, একদম সোজা হয়ে শুয়ে থাকি যেনো পথচারী বা কোনো গাড়ি আমার উপর দিয়ে যাইতে পারে সেই সুবিধার্থে। সচেতনতা আর অনুমান করার ক্ষমতা তখন তুলনার চেয়েও বাইড়া যায়। এমনকি জ্ঞান কিংবা স্মৃতিও উজ্জ্বল হয়ে উঠে। সব গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাই প্রাণবন্ত যতক্ষণ একজন মানুষ এটা নিয়ে বিস্তৃতভাবে আলোচনা করতে পারে।

 

তখন ১৯৯৭ সাল,  জায়গা ছিলো জেলের ভিতর। বোয়াশান বলেছিলো, এইখানে থেকে বের হতে পারলে, মানুষ মারবো। বিশ বছরের জেল দিলে বের হয়ে আবার মানুষ মারবো। যাবৎজীবন দিলে, ভালো থাকার প্রতিজ্ঞা করে বের হবো কিন্তু পূর্ণবয়স্ক মানুষ মারার জন্য আমার বয়স তখন অনেক হয়ে যাবে। তখন আমি কিন্ডারগার্ডেনে যাবো মারতে।

 

আমি সবসময় গুলির শব্দ শুনতে পাই। 

 

শুরুতে ভয় লাগতো, কিন্তু এখন অভ্যাস হয়ে গেছে। কেউ একজন হাতুড়ি নিয়ে আমার মাথায় পেরেক গেঁথে দিচ্ছে। এইটা একটা নির্মাণাধীন জায়গা, আমার মাথা। কেউ এইখানে দানব-সমান আকাশচুম্বী বাড়ি তৈরি করতেছে অনেকদিন ধরে, তাও শেষ হয় নাই। 

 

ঘর-বাড়ি ছাড়া অনেক মানুষ আমার মাথার ভেতর বসবাস করে। তাদের কান্না আমাকে ঘুমাইতে দেয় না, ঘর থেকে বাইর হইতে দেয় না। ঘরের মধ্যে জেগে থাকাটাই আমার জন্য পারফেক্ট। কারণ যখনই বাইরে যাওয়ার জন্য জামা পড়ি, খুব খুঁতখুঁতে, আয়নার সামনে গিয়ে মনে হয় নিজের শেষকৃত্যে যাচ্ছি- চমৎকার এবং অন্ধকারাচ্ছন্ন। প্রত্যেক গন্তব্যই আমাকে ওই মেমোরিয়াল হলের মত মনে হয়। নিজের শোক প্রকাশে যাচ্ছি আমি।

 

 

 

আমি ভয়ও পাই যে বাইরে বাহির হইলে শুনে ফেলবো “তোমাকে দেখে তো খুশি-খুশি লাগছে, তুমি ক্যামনে ডিপ্রেসড?”, “তোমার ডিপ্রেশনের তো কোন কারণ দেখি না, আমাকে দেখো আমি কতটা ডিপ্রেসড”, “তুমি একটা ভণ্ড”। এইসব কথা আমার মাথার মধ্যে চলমান কথার চেয়েও বেশি আতঙ্কিত করে তোলে আমাকে। কোনো সামাজিক পরিস্থিতিতে দুইয়ের বেশি মানুষ থাকলে আমি হয় অতিরিক্ত কথা বলছি আর না হয় একদম কথা বলছি না। মানুষের মিথ্যা বর্ণনা আমাকে আরো অতলে ডুবায় দেয়।

 

অনেক বছর হলো আমি নিজেই নিজের সমস্যা প্রতিকারের চেষ্টা জারি রাখছি। আপাতদৃষ্টিতে একজন মনে হইলেও, আমি ডাক্তার আবার আমিই রোগী। কখনো ডাক্তার রোগীকে দেখতে আসে আর কখনো রোগী ডাক্তারকে। আমার জীবন এখন একটা পূর্নাঙ্গ হাসপাতাল, একেক দিন একেক ওয়ার্ডে পড়ে থাকি আমি। বাইরের মানুষ ভেতরে আসতে পারে না, আর আমিও বাইরে যাইতে পারি না।


তন্ময় হাসান কবি, অনুবাদক

শেয়ার করুন

লেখা সম্পর্কে মন্তব্য

টি মন্তব্য

%d bloggers like this: