রুম্মানা জান্নাতের কবিতা

মিস করিসিনট্যাক্সের বাইরে, তোমাকে

[উৎসর্গ- তোমাকে জন্মদিনে, যে আমাকে দেখিয়েছিল গোল গোল ভাষা!]

১.

আয়নার ওইপাশে খোলা ছাদ—

দুইটা পাখি বসে আছে। 

 

তাদের আমি স্বপ্নে ওড়াতে চাই

 

আর শুনি, আয়নার মধ্যে ছোট কিঁচকিঁচ ডাক ঝন-ঝন করে ভেঙ্গে পড়ছে ! 

 

২.

এই দুপুর কিংবা প্রতিটা দুপুর তুরাগ নদীর দিকে তাকিয়ে থাকতে পারি। তীব্র হুইসেল ঠেলে ছোট জাংলায় লাউপাতা, বেড়া ভাঙা খেতের মধ্যে ঘোলা পানি ঢুকে যাচ্ছে। তোমাকে সব কথাই বলতে পারি। কিন্তু কেন বলবো? এমন সন্দেহের ভারে একটা তিল তোমার শরীরে ফুটলো কি না আমি জানি না। শুধু তোমার বাড়ন্ত চুলের আঠায় আঙুল আটকে যাওয়ার ভয়ে আমার স্বপ্ন ভেঙে যাচ্ছে! 

এই বিকাল কিংবা প্রতিটা বিকাল আমি ঘুমিয়ে থাকতে পারি। কিন্তু মোঘল সাম্রাজ্যের যেকোন চরিত্রের গলিতে আমার হাঁটতে ভালো লাগে। ‘আনলাকি থার্টিন’—এ বসে ভাগ্যকে আমার সবুজ নহরের দেশ মনে হয়। যেখানে একটাই ঘর, ভুলে যাওয়া গানের মতোন সত্য। যে বাস শাহবাগে যাবে না কখনোই তার সবথেকে নরম গদি আমরা দখল করে রাখবো দিনের পর দিন। আর কবরস্থানে ঘুরতে যাওয়ার তারিখ আমরা শুধু ক্যালেন্ডারেই দাগ টেনে রাখবো। 

এই সন্ধ্যা কিংবা প্রতিটা সন্ধ্যা এভাবেই বসে থাকতে পারি। মনে পড়তে পারে, ওভারব্রিজ, লাফ না দিয়েই চলন্ত বাসের ছাদে নিজেকে দেখতে পাওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে আলো জ্বলে উঠছে। আরেকটু এগোলে, পলিতে মোড়ানো রিক্সায় তোমার নিঃশ্বাস এমন ঘন হয়ে আসছে যেন পৃথিবীতে আর কখনো বৃষ্টি নামবে না। নীল পলিথিনের প্রয়োজন এই মোড় ঘোরার সাথে ফুরিয়ে যাবে। এই সন্ধ্যায় একটা যৌনমুখর কবিতা লিখতে পারি। কিন্তু বাংলা সিনেমায় কেঁপে ওঠা ফুলের ধারণা তুমি ভাঙছো না কেন ?

 

৩.

কখনো হঠাৎ, ফাঁকা বারান্দা, রেলিংয়ের ফাঁক দিয়ে তাকিয়ে থাকি। দুটো পাখি আমাকে চিনতে না পেরে জায়গা বদল করে। এই মগ্ন আর কামনাহীন চেয়ে থাকা যেন একটা বৃষ্টির ফোঁটা অনেকক্ষণ ধরে পড়ছে শুধু স্মৃতির মতো অজস্র ছড়িয়ে পড়ার ভয়ে ভাঙছে না। আমাদের হাতের যৌথ রেখা থেকে যে হরিণটা পালিয়ে যাচ্ছে, আমরা তার পিছে কতদূর দৌড়ে যাব?  

কখনো হঠাৎ, টিপটিপ গোসলখানা, বিকাল আর দুপুরের মাঝ বরাবর বাষ্পের আয়না মুছে রাখি। তোমার চোখের মতো আলো এসে পড়ছে কোমরের বাঁকে। ঝর্নার নকল শাওয়ারে শরীরের বুদবুদ, নাভিতে তোমার আঙুল যেন মেঘনার উথলানো ঢেউয়ের মতো আছড়ে পড়ছে। আলো থেমে যায়। ভাঁপ ওঠা শীতের মতো আমাদের রং মিলিয়ে যাচ্ছে আয়নার ওইপাশে। 

কখনো হঠাৎ, পাশ ফেরা ঘুম, দোমড়ানো ব্যথার মতো একটা কুকুর ডেকে ওঠে। একটা স্বপ্নের মধ্যে আরেকটা স্বপ্ন পরিচিত ভঙ্গিমায় ঢুকে যায়। নানান বয়সের বিকাল আমাদের ডেকে নিয়ে যায় ভুলোলাগা বাঁশবনী আড়ার অন্ধকারে। পরস্পরের ঘ্রাণ আমরা আলাদা করতে পারি না। শুধু দীর্ঘ রাতের কল্পনায় আমরা ঘুমিয়ে থাকি ভেঙে যাওয়া নাকফুলটার মতোন। 

 

৪.

কোনো বাস আমাদের নিয়ে যেতে পারছে না শুক্রবার বিকালে। নদীর ওইপাশে আধ ডোবা খেত, টিনের ঘর। মাটির ঢিপিতে সাবলীল সন্ধ্যা নামে। দরজা খোলা রেখে, পা ছড়ায়া তারা কথা বলছে। মনে হয়, পর্দায় সেলাই করা ফুল থেকে একটা রাত উদয় হবে খসড়া চিঠিতে। তুমি পরিচিত সম্বোধনের আড়ালে- আমাকে কোন শব্দে রাখো?  

কান্নার উদগত এই রাত্রি, চাঁদকে ঢাকা দিয়ে একটা শাড়ি কাঁপছে। আমি বসে-বসে পিঁপড়ার সাড়ি ভেঙে দেই। আর স্বপ্নের মধ্যে শ্বাসরন্ধ্রে হুল ফুটানো একটা সন্ধ্যা আমাকে তাড়িয়ে নিয়ে যায়। ফুল, লতা-পাতা আর দুইটা মুখোমুখি পাখি ছাড়াই ছাদটা ভিজে যাচ্ছে।

এমন ঝমঝম শব্দ

আমাদের তাকিয়ে থাকা ফ্রেমের ময়লা ধুয়ে দাও!

 

৫.

একদিন খুব দাঁড়িয়ে থাকা বৃষ্টি হলো। অভ্যাস নাই। স্যান্ডেলের উঁচু গোঁড়া রাস্তায় ফেলে আসলাম। 

 

তোমাকে সেকথা বলি নি। 

 

কুকুরের কামড়ে মরে যাওয়া মেয়েটা। নীরবে কোরান খতম দিয়েছি। 

 

তখন ছোট। শনিবারে রাত হলো না।

হাসনাহেনা।

খোলসে সাপের মণি না পেয়ে কেঁদেছি।

 

জোড়া শাপলার বিলে পাঁচ কয়েনের নৌকা ভেসে যাচ্ছে।

 

সন্ধ্যায় দেখা হলো।

শুমশাম।

আমাদের চুমুর উপর ফকিরটা আলো ঢেলে দিলো। 

 

সাঁতার ছাড়াই গা পুড়ে গেল তাপে। মা’র আধপেটা স্কুলে ঘন্টা পড়লো না। 

 

কেউ ডাকছে না। আমাদের যৌথ স্বপ্ন আলাদা ঘরে ভেঙে পড়ছে।

 

চাল ধোয়া পানির মতো মাস গড়িয়ে যাচ্ছে শুধু।

 

৬.

একদিন দেয়াল থাকবে। শাদা পলেস্তারা।

যৌথ ছবি টাঙাবো। আমাদের।

 

লিখেছ, ‘দেখা হোক ভিড়ে’। একা।

 

তাড়া খাওয়া দুপুর। জাম কুড়ালাম।

সারাবেলা।

বাড়িতে ধানমুখী বাতাস থেমে আছে।

 

তোমাকে দেখেছি। ভাঁটফুলে, বিষ পিঁপড়ার কামড়ের মতো মৃদু। হঠাৎ।

 

তখনো বোশেখ। আমাদের মাঝখানে একটা চেয়ার। ফুলের উপর বাজ পড়ছে। জানালার ওইপাশে নদী চমকালো। 

 

যদি খুব দেখতে চাও ডানা—

 

বক আঁকা শিখেছি। এক পায়া। 

আর কিছু না।

 

৭.

সারা ঘরে এখন চিঠি- পড়া আলো। কপাটে বাতাস থেমে গেছে।

একশো তিন দিন শুয়ে থেকেছি। জন্মানোর অনুভূতিহীন। দেখেছি, জমজ বৃষ্টির ফোঁটাও আলাদা ভঙ্গিতে ভাঙে।

রাতেই শুধু সবিস্তারে দিনের কথা ভাবি। প্রতিদিন একই গামছা ক্লান্তিহীন শুকায়। মানুষের উল্লাসে পাখির বাসার দিকে ঢিল ছুঁড়ে দেই। 

তখন স্কুল ছুটি। তখন সারাদিন ধরে বিকাল। রেডিয়োর নব থেকে আপার মুখ খুল নিয়েছি। তবু তুলা ফেটে যায়। সন্ধ্যার সানাই, বাড়িতে অতিরিক্ত শামিয়ানা ঝোলে। 

তোমাকে বলেছি, দূরপাল্লার ট্রেন। শরীরে জলের মতো রাখো। 

বলেছি, প্রেম আর কতটুক। সমূহ ছলনা তোমার নামে দস্তখত করে দেই।

 

৮.

একটা ফোটা- ফুল বারান্দা ঘুম আর অভ্যস্ততার দিকে তাকিয়ে থাকে। বুঝি বহুব্রীহি সমাসের মতো অন্য এক অর্থের ভ্রমণ থেমে আছে।

 

নিজেদের বলেছি অনেকবার, আমাদের ভালো লাগতে পারতো—

 

অর্গানিক সমাণুতা

 

লোহার ঘনত্বে জমে থাকা রজনীগন্ধার একক বর্গক্ষেত্র !

 

যাকে ভালোবাসি ভেবে ক্রমে ক্রমে সবুজ করেছি পাতা, সেই অন্ধকারে দেখি বুক সমান দাঁড়িয়েছে নদী।

 

সারাদিন পারাপারের নৌকা। মাঝির ষোল আনা জীবন না দেখাই থেকে গেছে তবু। 

 

শোনো, আমাদের সরলতা নিয়ে মরে যাওয়া পাখিটার নাম আমরা বলবো না কখনো !

 

৯.

ভদ্রাবতী নদী এসে পড়ে। 

এই বিস্তারিত মাসে— 

ভেসে থাকা নৌকার গন্তব্যের মতো নিজেকে ছলনা শেখাই  

 

নমলা ভোর ধরে প্রস্তর হাঁটার পর দেখি

সাপে-কাটা সৈনিকের মৃত্যুর উপর চিরল বাতাস বইছে। 

 

কচুরি ফুলের ছায়ায় 

আমাদের দেখা হওয়ার তারিখ দুলতে থাকে। 

 

দূরের সারিবদ্ধ পাকুড় নিকটে পাখি খাওয়া ফলের সমান পরিচিত লাগে। 

 

তোমাকে শোনাবো বলে, হাঁটুজল খেত থেকে মাছের ডুবন্ত ভঙ্গিমা তুলে আনি। 

 

১০.

তোমার সাথে একেকটা মুহূর্ত যায়—

মনে হয়, আঁচলে বাঁধা শেষ পয়সাটাও দিয়ে দিতে হচ্ছে !

শেয়ার করুন

লেখা সম্পর্কে মন্তব্য

টি মন্তব্য

%d bloggers like this: