home প্রবন্ধ রবীন্দ্রচেতনা — বিধি না, ব্যাধি | অনন্যা সিংহ

রবীন্দ্রচেতনা — বিধি না, ব্যাধি | অনন্যা সিংহ

আমরা বাঙালিরা কেবল রাবীন্দ্রিক রসে চর্বিত, জারিত এবং প্লাবিত হই মাত্র, কাজেই বাঙালির বরাবরই রবীন্দ্রনাথকে মানুষ হিসেবে কম আর দেবতা হিসেবে বেশি দেখার একটা প্রবণতা রয়েছে। আমি এই মানুষ-দেবতার প্যারাডক্স বা কূটাভাস নিয়ে আমার ব্যক্তিগত ভাবনা ব্যক্ত করতে চাই। তাই প্রথমেই আমি বড্ড ব্যক্তিগত রবীন্দ্রনাথকে টেনে আনব, অবশ্যই তার প্রেমিকাদের প্রেক্ষিতে, কারণ শিল্পীর সাথে তার প্রেমিকার যে সম্পর্ক তার চেয়ে ব্যক্তিগত জায়গা বোধহয় এই ব্রহ্মাণ্ডে আর দুটি নেই।

      এইবার আমরা একটা গল্প শুনি….”এক যে ছিল রানু// তার ছিল দাদা ভানু” — কিন্তু কারা এই রানু আর ভানু? কি কি-ই বা তাদের গল্প?

       বড় মেয়ে মারা গিয়েছেন, ভারাক্রান্ত অবস্থায় রবীন্দ্রনাথের সাথে প্রথম দেখা রানুর। রানুর তখন ১৪ আর রবীন্দ্রনাথ ষাটের কাছাকাছি। প্রথম দেখাতেই একে অপরের প্রতি অনুরক্ত হয়ে পড়েন। অবশ্য পরস্পরের মধ্যে চিঠি চালাচালি আরম্ভ হয়েছিল এর বেশ কিছু বছর আগেই। প্রথম দেখা, ভালো লাগা, প্রথম পরস্পরকে আঁকড়ে ধরার ইচ্ছে (লিটেরাল এবং মেটাফোরিক্যাল দুই অর্থেই); অন্তত লেডি রানু মুখার্জির আত্মকথা তাই-ই বলে। আর তারপর এই বিধি ভাঙ্গা সম্পর্ক এগিয়ে গিয়েছে তথাকথিত সামাজিকতাকে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দেখিয়ে, চিঠিপত্রে রয়েছে তার ঝলক। এখানে আমি তাই তাদের মধ্যে আদান-প্রদান করা চিঠিপত্রের কিছু অংশ তুলে ধরতে চাই যা থেকে বোঝা যায় যে রানু ও রবীন্দ্রনাথের চিঠিতে রাখঢাক গুরু গুর– এর কোনো চেষ্টা ছিল না। যেমন,  ‘অনেক আদর নিও, অনেক চুমু দিও।’

আরেক জায়গায় রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন– ‘তুমি আমাকে রবি বাবু বলে ডেকো না, ওটা সবার জন্য। তুমি আমাকে ভানু দাদা বলতে পারো, যদিও ভানু নামটি খুব সুখশ্রাব্য নয়, তবুও একসময় আমি ওই নামটি নিজেকে দিয়েছিলাম’।

আবার আরেকটি চিঠিতে পাই– ‘তুমি আমাকে কবি দাদাও বলতে পারো। এক যে ছিল রবি সে গুণের মধ্যে কবি’। এখানে একটা কথা বলা দরকার, রবীন্দ্রনাথ কিন্তু সে সময় সমস্ত পাবলিক স্ফেয়ার-এ নিজেকে কবি বলতে কুণ্ঠা বোধ করতেন, তিনি বলতেন; ‘আমি কবি কিনা জানি না, আমি জীবনকে বোঝার চেষ্টা করি, কবিতা হয় কিনা জানি না’।  কিন্তু এই চিঠিতে তিনি যখন নিজের গুণের স্বীকৃতি নিচ্ছেন তখন বুঝতে হবে সম্পর্কটা কতটা ব্যক্তিগত, গভীর ও তীব্র।


পুজো যেমন সবসময়ই সুবিধাজনক হয় (যেখানে ভক্ত সবসময়ই অপারচুনিস্ট), রবীন্দ্রভক্তিও ঠিক তাই-ই।


         এই ব্যক্তিগত সম্পর্কটিকে আমরা যদি শুধু স্নেহের একটি নিছক মিষ্টি সম্পর্ক ধরে নেই, তাহলে আমরা খুব ভুল করে থাকবো। সাধারণত ধরা হয়ে থাকে যে দুটো অসম বয়স্ক মানুষের মধ্যে শুধু স্নেহের মিষ্টি সম্পর্ক থেকে থাকে। কিন্তু রানু আর ভানুর সম্পর্ক এরূপ কোন রকম ‘ ডিসকোর্স’ না মেনে খুব স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠা লতা-পাতার মতো পরিণতির দিকে এগিয়ে গিয়েছিল। তাই এই পর্বের চিঠিগুলিতে আমরা পেতে শুরু করি তাদের একসাথে স্নান করার ইচ্ছা কিংবা পরস্পরকে জড়িয়ে বসে থাকার ইচ্ছার কথা। এক জায়গায় রানু বলছে যে ‘আমাদের সত্যিকারের বিয়ে তো হয়ে গেছে’ — এই ‘সত্যিকারের বিয়ে’ শব্দটি অত্যন্ত ব্যঞ্জনা বয়ে আনে। আমরা এটাকে সেক্সুয়াল ইনোয়েন্ড হিসেবে ধরে নিতে পারি কিংবা এটা কোন গভীরতম অবস্থান অথবা বিনয় মজুমদার কথিত সেই বিশুদ্ধ দেশের কথাও হতে পারে, যেখানে বাইরের পৃথিবীর প্রবেশ নিষিদ্ধ।

        এই চিঠিপত্রগুলির সময় থেকেই শান্তিনিকেতনে ফিসফাস গুজগাজ শুরু হয়ে যায়। রানুর মা রানুকে রবীন্দ্রনাথ থেকে আলাদা করতে চাইলে রবীন্দ্রনাথ রানুর মাকে জানান, রানুর জীবনের একমাত্র কেন্দ্র উনি নিজে, আর এই কেন্দ্রটি যদি না থাকে তবে রানুর অস্তিত্বের কোন মানে থাকবে না। তাই রানু যেখানেই যাক রানুর সাথে ওনার যোগাযোগ না থাকলে রানুর অস্তিত্বে সংকট দেখা যাবে। এর সাথে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কথাও জানান যে, রানু না থাকলে ওর খানিক কষ্ট হবে কিন্তু অস্তিত্বের সংকট আসবে না, কারণ রানু তার অনেকগুলি কেন্দ্রের মধ্যে একটি কেন্দ্র।

       এরপর রবীন্দ্রনাথ রানুর সাথে যোগাযোগ কমিয়ে দেন। রানুর কাছ থেকে ভানু দাদার নামে অসংখ্য চিঠি আসতো বটে কিন্তু রানুর ভানু দাদা কোন রকম সাড়া দিতেন  না। এই সময় আর্জেন্টিনায় থাকাকালীন ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো রবীন্দ্রনাথের জীবনে ভয়ঙ্কর প্রভাব ফেলতে শুরু করেন। এই সময় রানু তার আদরের ভানু দাদার খবর পেত একমাত্র খবরের কাগজে। ১৯২৪ এর নভেম্বরে রানু তার সাধের ভানু দাদাকে শেষ চিঠিটি লেখে, ‘ আমি আপনার কে ভানু দাদা?.. ভানু দাদা আপনিই তো কতবার বলেছেন যে আমাদের সত্যিকারের বিয়ে হয়ে গেছে… আমি সেই সময়গুলো… যখন আপনার একেবারে কাছে বসে গল্প করতুম, সেই সময়গুলো ভাবতে পারি না। বুক টনটন করতে থাকে। এত কষ্ট হয় কিন্তু তবু বারবার ভাবতে ইচ্ছে করে।’ সে আরো জানায় ‘আমি কাউকেই বিয়ে করবো না – আপনার সঙ্গে তো বিয়ে হয়ে গেছে। ভানুদাদা, আপনি হয়তো মানবেন না কিন্তু আমি মানি…. মনে মনে জানব যে একদিন আমি ভানু দাদার সমস্ত আদর পেয়েছি।… আমার সমস্ত শরীর ছেয়ে যে আদর আমার মনকে ভরে দিয়েছিল, সে ভাবনাটুকু কেড়ে নেবার সাধ্য এ পৃথিবীতে কারোর নেই, ভানু দাদা আপনারও না…’  ১৯২৫-এর জুন মাসে এই চিঠির কয়েক মাস পরই রানুর বিয়ে হয়ে গেল স্যার রাজেন্দ্রলালের ছেলে স্যার ধীরেন মুখোপাধ্যায়ের সাথে। শ্বশুর স্যার রাজেন্দ্রলালের কড়া নির্দেশে রবীন্দ্রনাথের সাথে সম্পর্ক প্রায় ছিন্ন করতে বাধ্য হলেন রানু। ১৯৩৭-এ স্যার রাজেন্দ্রলোলের মৃত্যুর পর রবীন্দ্রনাথের কাছে ফিরে এলেন রানু, কিন্তু তখন সবই কেমন জড়িয়ে গেছে, রবীন্দ্রনাথের আর মাত্র ৪ বছর বাকি।


জানলা খোলা থাকবে, দইওয়ালা হাঁক পেরে যাবে, আমরা অমলকে নিয়ে আহা-উহু করব– কিন্তু পাহাড় টপকে রাজার চিঠি হাতে কেউই অমল হতে পারব না। এটাই আমাদের রবীন্দ্রভক্তির ট্র্যাজি–কমেডি।


       এবার আমরা ফ্ল্যাশব্যাকে চলে যাবো অনেক আগে আর একটি মেয়ের কথাতে, যার নাম কাদম্বরী। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্ত্রী কাদম্বরী দেবী ছিলেন রবীন্দ্রনাথের প্রথম যৌবনোদ্গমের সাক্ষী। সম্পর্কটি সাহচর্যের হলেও কোনো বিধি না মেনে এগিয়ে গিয়েছিল সেই বিপদজনক জায়গায়, যেখানে থাকে শুধু পুড়ে যাওয়া আর শিল্প। স্বাভাবিকভাবে শিল্পী রবীন্দ্রনাথ পুড়েছিলেন তার শিল্পের মধ্য দিয়ে আর কাদম্বরীকে পুড়তে হয়েছিল আক্ষরিক অর্থে বিষের জ্বালায়। সেখানেও রবীন্দ্রনাথকে আমরা ঠাকুর হিসেবে নয়, বরং ভীষণ রক্ত-মাংসের শিল্পী হিসেবেই পাই।

         এই আলোচনাগুলি থেকে আমি যে প্রতিপাদ্য বিষয়ে উপনীত হতে চাইছি, তা হল রবীন্দ্রনাথ সামাজিক বিধিকে চিরটাকালই বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দেখিয়েছেন, কখনোই মানেননি; যার সাহিত্য প্রতিফলন আমরা পাই ‘তাসের দেশ’ এ। যেখানে উনি দেখিয়েছেন বিধি কিভাবে নিষ্প্রাণ সমাজ তৈরি করে যেখানে নিয়ম ছাড়া আর কিছুই থাকে না। চিড়িতন, রুইতন সবাই নিয়ম বিধি মেনে চলে, সেখানে যখন রাজপুত্র আসছে তখন সেখানে বইছে বিধি ভাঙার হাওয়া, তার ফলে কিন্তু ভালোবাসার ভ্রমর আসছে গুনগুনিয়ে। ‘রক্তকরবী’ তে এটাই আমরা পাচ্ছি আরেকটু ব্যঞ্জনাময় হিসেবে, যেখানে দেখছি সবাই খনির ভেতর এক অদৃশ্য রাজার বাঁধনে যন্ত্রের মত যাপন করে চলেছে জীবন। কিন্তু সেখানেও নন্দিনীর উপস্থিতি আর রঞ্জনের সম্ভাব্য আবির্ভাব শেষমেষ বিধিকে ভেঙ্গে ফেলতে পারছে। আর বিধি যে কি ভয়ঙ্কর, তা বোঝা যায় বিশু পাগলার কথায়— ‘ একদিকে ক্ষুধা মারছে চাবুক, তেষ্টা  মারছে চাবুক, ওরা জ্বালা ধরিয়েছে, বলছে কাজ কর। একদিকে বনের সবুজ মেলেছে মায়া, তারা নেশা ধরিয়েছে, বলছে ছুটি।’

         তিনি বারবার ছুটি পেতে চেয়েছেন এই শৃঙ্খলায়িত বিধি থেকে। অথচ আমরা আমাদের চিরাচরিত প্রথা মেনে,  সারা জীবন বিধিভাঙা এই মানুষটিকে করে তুলেছি এক বিধি আর এই বিধি এক ব্যাধির সৃষ্টি করেছে যার নাম ‘রাবীন্দ্রিক চেতনা’। এই ব্যাধির ফলে আমরা রবীন্দ্রনাথ নামক মানুষটিকে ভুলে গিয়ে জনৈক ‘ঠাকুর’–কে পুজো করতে থাকি, ফলে তার স্থান হয় কেবল সাজানো তাকে। এই প্রসঙ্গে আমরা উৎপল দত্তের “সূর্যশিকার”–এর কথাগুলি বলতে পারি.. ‘আমাদের দোষ হলো আমরা শ্রদ্ধা করতে পারি না, ভক্তিতে গদগদ হয়ে পূজা করতে পারি।’ আর পুজো যেমন সবসময়ই সুবিধাজনক হয় (যেখানে ভক্ত সবসময়ই অপারচুনিস্ট), রবীন্দ্রভক্তিও ঠিক তাই-ই। তাই আমরা রবীন্দ্রনাথে গদগদ হলেও কখনও মনে করি না পরীক্ষাতে ফার্স্ট, সেকেন্ড, থার্ড রবীন্দ্রনাথের কাছে কোনো মানে আনতো না। আমরা পড়াশোনা করি একটি নিখাদ চাকরি পাওয়ার উদ্দেশ্যে, অহেতুক আনন্দ পাওয়ার পড়াতে আমরা ভারি বিমুখ। আমরা ক্যাম্প ফায়ার করে রবীন্দ্রচর্চার কথা ভাবতে পারি, কিন্তু রবীন্দ্রনাথের পল্লী সচেতনতা গ্রহণে আমাদের মন অক্ষম। তাই অন্যান্য ঠাকুর দেবতার মতো রবীন্দ্রনাথের উদ্দেশ্যে আমরা নৈবেদ্য চাপাই, কিন্তু কেউই আমরা “পূজারিণী” কবিতার শ্রীমতি নামক পূজারিণী হওয়ার ক্ষমতা রাখি না।

      সুতরাং, জানলা খোলা থাকবে, দইওয়ালা হাঁক পেরে যাবে, আমরা অমলকে নিয়ে আহা-উহু করব— কিন্তু পাহাড় টপকে রাজার চিঠি হাতে কেউই অমল হতে পারব না। এটাই আমাদের রবীন্দ্রভক্তির ট্র্যাজি–কমেডি।


তথ্যসূত্র:

পত্রাবলী, অষ্টাদশ খণ্ড

রানু ও ভানু, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

   

 

লেখা সম্পর্কে মন্তব্য

টি মন্তব্য