যেখানে ঝরাপাতা নিজের শব্দে বন | হাসান রোবায়েত | পর্ব ৭

যেখানে ঝরাপাতা নিজের শব্দে বন

 

৭  

মাথায় বইগুলো ছাড়া কিছুই ছিল না আর। মীর আলমকে ডেকে আমার বই দেখাই। গড়গড় করে বাংলা পড়ি। বইয়ের মধ্যে ময়ূরের পালক আর পেন্সিলের কাঠ রাখতাম আমরা। ভাবতাম, কাঠগুলো খেয়ে খেয়ে বাচ্চা হয় পালকের। হতোও মনে হয়। চিরল পালকগুলোর গোড়ায় ছোট ছোট পালক গজাতো। 

 

প্রতিদিন স্কুলে আসতাম। আসার সময় মা আট আনা এক টাকা করে দিতো। রোজ রোজ দিতো না। টিফিন হলেই দৌড়ে যেতাম সন্দেশ আর আইস্ক্রিমের দোকানে। কোনোদিন কটকটি আর চানাচুর কিনতাম। টিকটিকির ডিমের মতো গোল গোল মিষ্টির দানা পাওয়া যেত ম্যাচের বাক্সের মতো প্যাকেটে। উপরে নায়ক-নায়িকাদের ছবি। সবাই ভাগ করে খেতাম আমরা। সবচে ভালো লাগতো বাংলা বই। যেদিন নতুন বই পেতাম নাক ডুবিয়ে ঘ্রাণ নিতাম। ঈদ ঈদ লাগতো আমার। প্রথমেই বাংলা পড়ে শেষ করতাম। কবিতার পর কবিতা। যেন হাজার হাজার কনকচূড়ার ফুল ফুটে থাকতো পাতায় পাতায়। মৌরীর খেত আর অপার শরিষাবনের রং ম ম করতো অক্ষরে। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে ছবি দেখতাম। একটা লম্বা বোয়াল মাছের লেজে দাঁড়িয়ে আছে ভোদর আর আমারই মতো ছোট্ট একটা মেয়ে। মাছটার মুখে নৌকা। চোখ বন্ধ করে পড়তাম—আয়রে আয় টিয়ে নায়ে ভরা দিয়ে। একটু চুপ হলেই চুলার পাড় থেকে মা বলতো—না নিয়ে গেল বোয়াল মাছে তাই না দেখে ভোঁদড় নাচে। পরেরটুকু পড়তাম আমি। 

 

এখান থেকে অনেক দূরে/ যদি আমি যেতাম উড়ে/ প্রজাপতির মত/ কেমন মজা হত।/ এসব পড়তে পড়তে আমি আমাকেই দেখতে পেতাম। মার চোখ এড়িয়ে শ্যালোমেশিনের ঘর পার হয়ে হাঁটতে হাঁটতে চলে যাচ্ছি কালিতলার হাটে। আমার অনেক দূর ছিল ওই কালিতলার জামগাছ অব্দিই। কিন্তু যেখানেই যাই ধরমপুরের জন্য মন পুড়তো আমার। নানান ব্রিজ-সাঁকো-কালভার্ট পেরোনোর পর মনে হতো— 

 

আমাদের ছোট গ্রাম মায়ের সমান,

আলো দিয়ে, বায়ু দিয়ে বাঁচাইছে প্রাণ৷

মাঠ ভরা ধান তার জল ভরা দিঘি,

চাঁদের কিরণ লেগে করে ঝিকিমিকি৷

আম গাছ, জাম গাছ, বাঁশ ঝাড় যেন,

মিলে মিশে আছে ওরা আত্মীয় হেন৷ 

 

কোথাও যেতে ইচ্ছা করতো না আর। বইয়ের পাতায় আমাদের ছিল কাজলা দিদি। দিঘির পাড়ে ঠিক তেমনই বাঁশবাগান। সন্ধ্যা হলে কাজলা দিদি পড়তাম। মাকে শুনিয়ে শুনিয়ে পড়তে হতো আমাদের। দিদির মতো ফাঁকি দিয়ে আমিও যদি লুকাই গিয়ে/ তুমি তখন একলা ঘরে কেমন করে রবে/। এই দুই লাইন পড়লে ভীষণ মন খারাপ হতো আমার। তখনো বুঝতাম না দিদি কোথায় চলে গেছে। সে কি আমাদেরই মতো সফেদা গাছের নিচ দিয়ে বিশ্বরোড পার হয়ে শিশিরের দেশে চলে গেছে! যেখান থেকে আর ফিরতে পারবে না। তার মা কি তার জন্য রাত-দুপুরের খাবার নিয়ে বসে আছে! যেভাবে মা বসে থাকে আমার জন্য! মাঝে মাঝে আমারও মনে হতো সাবান ফ্যাক্টরির ওই রাস্তায় গিয়ে কাজলা দিদিকে খুঁজে আসি। হয়তো গরুর গাড়ির পিছে পিছে সে-ও চলে গেছে নিরুদ্দেশে। আবার ওখানেই ফিরে আসবে সে। কতদিন ভাবতাম, আমি যখন আরেকটু বড় ক্লাশে উঠবো তখন হয়তো পড়বো কাজলা দিদি ফিরে এসেছে। কিন্তু শিশিরের দেশ পার হয়ে যে চলে যায় সে তো ফিরে আসে না কোনোদিন। সেসব বোঝার বয়স আমার তখনো হয় নি। মাঝে-মধ্যেই জমজ কবর দেখিয়ে মীর আলমকে বলতাম—’ছোট মানুষেরা অনেক দিন পর মরে যায়।’ যদিও সে ভুল আমার ভেঙেছিল স্বপ্না আপার শিশুটা মরে যাবার পর। 

 

আমাদের তখন নুরু ছিল, পুসি ছিল, আয়েশা ও শফি ছিল। দুপুরের ঘুম ফাঁকি দিয়ে ওদের মতো আমরাও বাগানে খেলতে যেতাম। মাটির ছোট ছোট পাতিল ছিল, ছিল নয়ড়া আর বাটি। কলার ঢোঙা কেটে মাথায় ছোত্তর বেঁধে নানান বাজার করতাম। দোকান ছিল আমাদেরই। কলমির ফুল, ইটের গুঁড়া, খোয়া এসব ছিল দোকানের পণ্য। সুপারির কাণ্ডে যে অংশটুকু চামড়ার মতো ওই অংশ দিয়ে দাড়িপল্লা বানাতাম। পেপসি সেভেন আপের মুখা, কাঁঠাল পাতা ছিল মুদ্রা। হাটবাজার করে মাটির চুলায় রান্না করতাম আমরা। তারপর এ ওর বাড়িতে দাওয়াত খেতে যেতাম। বড়রা দেখতে পেলে শরম পেতাম খুব। 

 

স্কুলে আমার বন্ধু ছিল কালে। পুরনো কিশমিশের মতো কালো ছিল ও। ডানপিটে খুব। পড়ায় মন ছিল না। গাছে উঠতে ভালোবাসতো। সাপের লেজ ধরে বনবন করে ঘুরাতো। একবার ও আমাকে স্কুল পালিয়ে পুব দিকের রাস্তা ধরে কোন এক জঙ্গলের ভেতর নিয়ে গেল। চারদিকে ঝোপঝাড়। ময়না কাঁটার গাছ। বড় বড় তালগাছে কচি তাল ঝুলে আছে। নিচে আটাশরির গাছ। ধূসর শাদা ফল পেকে মধুতে টইটম্বুর। ও মুখে দিয়ে বললো—খায়া দ্যাক কী মিষ্টি! আমি বললাম—’এগ্লে খালে মানুষ পাগল হয়া যায়’। ও বললো—’হামি তো ম্যালা দিন থেকেই খাই তে কি পাগলা হয়া গেছি!’  সাহস পাই আমি। আটাশরির মধুফল ভালো লাগে আমার। এদিকে কেউ আসে না মনে হয়। গড়ের একদম নিচে একটা ছোট্ট ঘর, ভাঙা। কেউ থাকে বলে মনে হয় না। সুনসান। দুই একটা পাখি ডাকছে মধ্যদুপুরে। বাঁশের ঝাড়ে একটা বাঁশের সাথে আরেকটা বাঁশ গায়ে-গায়ে লেগে কড়ড়ড়ড় কড়ড়ড়ড় শব্দ করছে। গা ছমছম করা আওয়াজ। কেবল পুরনো কবর। আমি ভেবে পাই না এমন আড়া-জঙ্গলে কারা এসে কবর দেয়। এ সময় হু হু করে গরম। কিন্তু এখানে ঠান্ডা চোখের মতো বাতাস। কালে আমাকে বলতে থাকে—’ই যে কব্বরগুলো দেখিচ্চুনে এগ্লে ম্যালা দিন আগেকার। এই মানষেরা এখন জ্বিন হয়া গ্যাছে। উ যে আড়ার মদ্যে যে শেমুলের গাছ ওডের উপরে থাকে এরা’। বলেই খিলখিল করে হাসতে থাকে। ঠিক সে সময়ে কোথাও একটা ঘুঘু ডেকে ওঠে। ভরাট গলায় কুউউউউউউউ কুউউউউউ করে বাকতে থাকে ঘুঘু। আমার পশম পর্যন্তও চমকে ওঠে। 

 

কালের মাথায় কী যেন ভর করেছে তখন। ‘যে আস্তা দিয়ে আলেম না হামরা?’ ও সম্মতি চায় ওর কথায়। আমি চুপ থাকি। ‘কয়েক মাস আগে ওই আস্তাত-ই একটা ঘটনা ঘটছে। অ্যাক ভ্যানআলা আত্তিরে বাড়িত যাচ্চিল বুচ্চু! ম্যালা আত তখন। হামাগেরে স্কুলের ওইদিক দিয়েই আসিচ্চিলো। যখন মনে কর উ যে ওই শড়ের গাছের কাছে আচ্চে।’ আমার দিকে তাকিয়ে ইশারায় একটা ঝুপড়ি গাছ দেখায় সে। পুরাতন শ্যাওড়া গাছ। ঝমঝমে অন্ধকারাচ্ছন্ন পাতা। ‘ওটি আসে যেই থামছে, দ্যাখে একটা মানুষ শাদা কাফনে বান্ধা মরা নিয়ে দাঁড়ে আছে। মানুষটা ভ্যানআলাক কয়, সামনের গাঁও পন্ত পৌঁচে দিবের। ভ্যানআলা যাবার চায় না, ট্যাকার নোভ দ্যাকায়। ম্যালা কেঁচালের পর মরা সুদ্দে মানুষটা ভ্যানোত ওটে। আর কয় আপনে খালি ভ্যান চলাবেন, পিছনের দিকে তাকাবেন না। ইংকে কোরে ম্যালাখানি যাবার পর ভ্যানঅলা খালি কড়মড় আওয়াজ পায়। সন্দে কোরে পিছনের দিকে যেই তাকাছে, দ্যাকে যে ওই মানুষটার মুখের মদ্দে কাফনের কাপড় আর অক্ত লাগে আছে মুখোত। ভ্যানআলা ভ্যান থুয়ে দৌড় দেয়। বাড়িত যায়া আগ্নের মদ্দে ধপ্পাস করে পড়ে যায়। ওর মুখ দিয়ে খালি ফ্যানা বার হচ্চিল তখন। কয় দিন পরেই ভ্যানআলাডা মরে যায়।’  

 

এমন কথা এর আগেও শুনেছি আমি মইনুল ভাইয়ের কাছ থেকে। কিন্তু কালের মুখে এই ভর দুপুরে এইসব কথা যেন পাতার শনশন শব্দেও প্রতিধ্বনিত হতে থাকে। কালেকেই ভয় পেতে শুরু করি। তখন আর মানুষ মনে হয় না ওকে। কালে উল্টা করে গাছ থেকে নামতে পারতো। স্কুলের পাশেই ওদের বাড়ি। ওখানে অনেক দিনই তেঁতুল গাছ থেকে উল্টা করে নামতে দেখেছি আমি। ওর মিশকালো শরীরকে ভূতের শরীর বলে মনে হতে থাকে। ‘কালে, চল স্কুলোত যাই’। ও বলে—’তাল পাড়মু, নরম শাঁস হছে তালোত’। আমি বলি—’আরেক দিন পারিস, বাড়িত দেরি কোরে গেলে মা মারবি হামাক’। আমার কথায় ভ্রুক্ষেপ করে না ও। একা একাই বলতে থাকে, বাড়ির পিছনে কোন এক ছাইয়ের গাঁদায় গত বছর তালের আঁটি ফেলে রেখেছিল। ওগুলোর মধ্যে এখন ঘিয়ে রঙের শাঁস হয়েছে। বাড়ি ফিরে দা দিয়ে কাটবে। তারপর শক্ত শাঁসগুলো ছরতা দিয়ে কেটে কেটে খাবে। আমাকেও খাওয়াবে নাকি। আমি বারবার যেতে বলি ওকে। এক সময় রাজি হয়। গড় থেকে নিচে নামতে থাকি আমরা। ছোট্ট ঘরটিতে কে একজন রান্না করছে। বেড়ায় ইউরিয়ার বস্তাভর্তি হাঁসের ফউরা। দূরের হাটে গিয়ে বেঁচবে হয়তো। লোকটাকেও ভয় হতে থাকে আমার। 

 

গড়ের উপর যে কথাগুলো শুনেছিলাম সেসব হয়তো সত্য নয়। মানুষের মুখ থেকে মুখে একদিন হাওয়া-বাতাসের উপর ভর দিয়ে কুমড়া ফুলের রেণু হয়ে সেসব ছড়িয়ে গেছে লোকমুখে। এক গাঁয়ের মেয়েরা অন্য গাঁয়ের বউ হয়ে শাড়ি ও নাকফুলের সাথে সাথে এসব উপকথাও নিয়ে গেছে যুগে যুগে। নিড়ানির সময় কৃষকেরা ফসলের কানে কানে আদিম এই গল্পগুলিও ছড়িয়ে দিয়েছে ভিউয়ে। মানুষের কণ্ঠে আরও পুষ্ট হয়েছে সেসব। শিশুরা নানীর কাছে মার কাছে রাতের অন্ধকারে শুনে শুনে মনে রাখে সব। একদিন তারাও মহাশূন্যের স্তব্ধতায় হারিয়ে যায় কিন্তু তুলসীর পাতায়, শরের গাছের ছায়ায় প্রত্যেকটি উপকথাই থেকে যায়। আরও জীবন্ত হয়ে অন্য শিশুদের কাছে গচ্ছিত হয় ধীরে। সিন্ধু ও ইউফ্রেটিস তীরে, মিশর ও ফিনিশিয় গ্রামে এভাবেই জেগে থাকে পৃথিবীর ধরমপুর।


৬ষ্ঠ পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন          

 

 

লেখা সম্পর্কে মন্তব্য

টি মন্তব্য

%d bloggers like this: