যেখানে ঝরাপাতা নিজের শব্দে বন | হাসান রোবায়েত | পর্ব ২

যেখানে ঝরাপাতা নিজের শব্দে বন

 

 

যেহেতু দুই পক্ষের ঘটকালির মধ্য দিয়ে মা আর আব্বুর বিয়েটা হয় নি, তাই দাদুর পরিবারের কেউই সম্পর্কটা মেনে নিতে পারে নি অনায়াসে। বুবুর মনে হতো অবস্থা ভালো এমন ঘরে বিয়ে করলে বিপদের সময় তার বেয়াই বাড়ি ছেলের পাশে দাঁড়াতে পারতো। নানার অর্থনৈতিক অবস্থা তখন ক্ষয়িষ্ণুপ্রায়। পুলিশের চাকরি শেষে হাঁপানিতে বিপর্যস্ত তিনি। চার মেয়ের মধ্যে একজন তখনো অবিবাহিত। এক ছেলে ডিগ্রিতে পড়ছে। তার চিকিৎসাব্যয় আর সংসার চালাতে বিগত দিনের সমস্ত জৌলুশ মাকড়সার পুরনো জালের মতো ঝুলে আছে ধুলায়। 

মাকে নিয়ে আব্বু তখন শিউলি ফুপুর বাড়িতে। গ্রামের নাম মাজবাড়ি। সারিয়াকান্দি থানায়। কী বিরাট বাড়ি! খালের পাশেই অনেক উঁচুতে সার-করা ঘর। শূন্যতার মতো বিশাল ব্যাপ্তি নিয়ে ছড়িয়ে আছে উঠান। খালের পাড়ঘেঁষে আমকাঁঠালের গাছ। গরুর গোয়াল। মাঝে মাঝে প্রকাণ্ড গামারের গাছ। শুক্লপক্ষের চাঁদের মতো ফুপুদের আঙিনা। পেছনেই বাঁশঝাড়। কলতলায় একটা পরিত্যক্ত কুয়া। কত কত সাপের গল্প সেখানে প্রতিদিন খোলস ছেঁড়ে বেরিয়ে পড়ে লোকালয়ে। শিশুরা ভয় পায়। কৌতুহলে ঘুরে আসে আড়া। ধান-সরিষার খেত। ফুপুদের বাড়িতে গেলেই মনে হতো—যেকোনো স্থাপত্যের পরম সৌন্দর্য হলো শূন্যতা, স্পেস। 

ফুপা ছিলেন আব্বুর সবচেয়ে ভালো বন্ধুর মতো। শুধু আশ্রয়ই নয়, ৫ ফুট ৯ ইঞ্চির ওই মানুষটির ওপর জীবনের নানান বাঁকে ভরসায় এলিয়ে দেওয়া যায় নিজেকে। আব্বুর কঠিন সেই দিনগুলোতে ফুপু-ফুপার ভালোবাসাই ছিল শেষ জংশন। হুইসিল শেষ হয়ে গেলে যেখানে নামা যায় কপর্দকহীন, যেন একটু দূরেই যুগল কোনো মুসাফিরের জন্য তারা সাজিয়ে রেখেছেন সরাইখানা। ফুপার মা ছিলেন ধীর, স্থির স্বভাবের। চীনা দার্শনিকদের মতো। ফুটফুটে বয়সিনী এক নারী। আব্বু আর মাকে সামলে রেখেছেন বহুদিন।  

ফুলবাড়ি বাজারে ছিল আব্বুর ডিসপেনসারি। ফুলবাড়ি বাজার থেকে মাজবাড়ির রাস্তা ছিল কাঁচা। কখনো মিহিন ধুলা কখনো বিরান পাতারে খাঁখাঁ বিল। মাঝে মধ্যে দুই একটা বাড়ি, ধানখেত, সরিষা ও মুলার টাল। পায়ে হেঁটেই বেশি মানুষ গ্রামে ফেরে। সন্ধ্যার পরেই বিলগুলোতে ভর করে অশরীরী সৌন্দর্য। তখন কোথাও বকের ডানা ঝাপ্টাতেও নেমে আসতে পারে বিহ্বল শূন্যতা। আব্বুর ফিরতে ফিরতে অনেক রাত হতো। আমি মা’র পেটে। খুব শখ হয়েছিল মা’র ইলিশ মাছের। এ দেশে পোয়াতির খাবারের ইচ্ছা পরিবারের যে-কেউই পূরণ করতে চায়।

সেদিন রাতে আব্বু ইলিশ মাছ কিনে একই গ্রামের দলুর হাতে দিল, মাছটা আম্মাকে পৌঁছে দিতে। রাত তখন আট বা সাড়ে আট হবে। হাটের ভীড় থেকে দলু যখন মাজবাড়ির দিকে যাচ্ছে দুই-একজন সঙ্গে যারা ছিল তারাও ততক্ষণে নেই আর। সে একা। ঘুটঘুটে অন্ধকার। গ্রামে পোঁছাতে আরও প্রায় মিনিট লাগবে। কাছে পিঠে কোথাও কোনো বাড়ি-ঘর নেই। মানচিত্রের রেখার মতো আঁকা-বাঁকা পথ। অনেক দূরের কোনো গাছ থেকে ভেসে আসছে অন্ধ পেঁচার ডাক। যে কারোরই গা শিরশির করার জন্য পেঁচার ডাকটাই হতে পারে মোক্ষম। দলু সাহসী মানুষ। বিড়ি ধরিয়ে ভাঙা ভাঙা সুর কাটতে কাটতে হেঁটে যাচ্ছে সে। হঠাৎ বৃষ্টির মতো মনে হলো তার। আকাশে অনেক তারা। হাসি পেল। এমন তারার রাতে কে কোথাও বৃষ্টি দেখেছে, ভাবছিল সে। আরও কিছু দূর হাঁটার পরেই গা শিউরে উঠলো তার। দেখতে পেলো—রাস্তাটা যেখানে বাঁক নিয়েছে সেখানে দুই পাশে বড় দুইটা ডোবা। সেখানে উথাল-পাথাল করছে পানি। আর কারা যেন ডোবা থেকে পানি ছিটাচ্ছে তার দিকে। হাতের ইলিশ মাছটা তখন জ্যান্ত হয়ে লাফাতে শুরু করেছে। কী প্রবল টান! বাম পাশের ডোবার দিকে হেলে পড়েছে দলু। বুঝতে আর বাকি থাকলো না কিছু। ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লা মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ’, দোয়া-দরুদ পড়তে পড়তে দৌড়াতে লাগলো সে। বড় বড় গাছের অন্ধকার পার হয়ে সোজা ফুফুর বাড়িতে। মা’র হাতে মাছ দেওয়ার পর সব ঘটনা খুলে বললো। বাড়ির সবাই নিষেধ করলো ওই মাছ খেতে। 

রাতে আব্বু বাড়ি ফিরে মাকে ইলিশ মাছ কেমন ছিল জিজ্ঞাসা করাতে মা উত্তর দিল—খাই নি তো। আব্বু আশ্চর্য হয়ে বললো—কিসোক? আন্দো নি? তখন,  মা বিলের কথা খুলে বললো আব্বুকে। ঘটনা শোনার পর আব্বুর জেদ তখন পঞ্চমে। ওই মাছই খেতে হবে। এসব ভূতটুতের কথায় বিশ্বাস নেই তার। আম্মা তো কিংকর্তব্যবিমূঢ়। একে একে ফুপু-ফুপা-ফুপার মা আরো কয়েকজন এসে নিষেধ করলো মাছ খেতে। ওই মাছ খেলে পেটের বাচ্চার অর্থাৎ আমার ক্ষতি হতে পারে, মর্মে সাবধানও করে দিল। কিন্তু আব্বু কারো কথা শোনে না। খেতেই হবে। এই অ-ন্যায্য গোয়ার্তুমির ফলে কেউ আর কিছু বললো না। যে যার ঘরে চলে গেলে মা সেদিন ইলিশ মাছটা ভয়ে ভয়েই খেয়েছিল।           

সেই রাতেই মাতৃজলে সাঁতার কাটতে কাটতে আমিও হয়তো টের পেয়েছিলাম চারদিক হাওয়ায় ভাসানো ওই উথালপাতাল ঢেউ। তাই হয়তো শান্ত অন্ধকারে বিলের উপর কচুরিপানার দাম, কলমির নুয়ে পড়া বেগনি ফুল, গভীর মাছের রঙ আমাকে এখনো কাঁপিয়ে যায় মমতায়। জোনাকিরা যখন রাত্রির অন্ধকার চাদরকে গুটিয়ে নিয়ে টিপটিপ উড়ে যায় কোথাও আমি হয়তো সে আলোর পিছে পিছে ছোট্ট এক রুহ হয়ে ভাসতে থাকি। সে দিনের বিল আর মাছপ্রিয় আত্মাদের সাথে অনেক কালের বন্ধন আজো বয়ে বেড়াই মুগ্ধ শিশুর মতো। 


প্রথম পর্ব

লেখা সম্পর্কে মন্তব্য

টি মন্তব্য

%d bloggers like this: