মুম্বাইয়ের গ্রাফিতি আর্টিস্ট টাইলরের সাক্ষাৎকার | ভাষান্তর : তন্ময় হাসান

টাইলর ইন্ডিয়ান আর্টিস্ট, গ্রাফিতি আর্টিস্ট। মুম্বাইয়ের। তার কাজে ব্যাঙ্কসির প্রভাব আছে বলা হয়। এ কারণে তাকে মুম্বাই ব্যাঙ্কসিও ডাকা হয়। ব্যাঙ্কসি দ্বারা প্রভাবিত হলেও, ব্যাঙ্কসি থেকে টাইলর যা যা নিছেন, তাকে ইন্ডিয়ার রাজনৈতিক-সামাজিক অবস্থা প্রেক্ষাপটে প্রাসঙ্গিক বানায়া  নিছেন উনি। এই বানায় নেয়াটাও পলিটিক্যাল কাজ এবং জরুরিও। অন্যান্য দেশের চাইতে এমন কি অন্যান্য পাশের দেশের চাইতেও ইন্ডিয়ার সাথে আমাদের রিয়েলিটিটা তো কাছেরই। তা রাজনৈতিক-সামাজিক দুই দিক থেকেই। তাই অন্য দেশের অন্য একজন আর্টিস্টের চাইতে টাইলরে আমরা আগ্রহটা বেশিই পাবো। তো দেখা যাক, টাইলরকে।

 ভাইস ম্যাগাজিনকে দেয়া এ ইন্টারভিউটা অনুবাদ করেছেন তন্ময় হাসান। তন্ময়কে ধন্যবাদ।


ইন্ডিয়ার মত দেশে পলিটিক্যাল গ্রাফিতি আর্টিস্ট হওয়াটা কেমন?  

স্যাটায়ার হিসেবে কোন দেয়ালে প্রধানমন্ত্রীর ছবি দেখছেন? দেখার কথা না। কারো সেই সাহস নাই। কিংবা সেইটাকে কেউ গুরুত্বপূর্ন মনে করে না। আমি ব্যাপারটাকে অন্যভাবে দেখি।

আপনার কাজগুলাকে কী বলা যায়?  প্রোটেস্ট আর্ট, পলিটিক্যাল আর্ট নাকি  দেয়ালে দেয়ালে এনার্কির প্রচার?

সবগুলার মিশ্রণ। পলিটিক্যাল কাজ করতেছি মাস কয়েক হবে। তার আগে আমি সামাজিক বিষয় নিয়ে কাজ করছি যেমন ক্যাপিটালিস্ট, যুদ্ধ, দারিদ্রতা এবং লোভ; কিন্তু কখনো পলিটিক্যাল ছিলাম না। এ বছর নির্বাচনে ব্যাপারটা পাল্টাইছে, ইন্ডিয়া কোনদিকে যাবে সেই ব্যাপারটাও।

 

২০১৯ এর নির্বাচন কীভাবে আপনাকে বদলাইছে? 

আমার উপলব্ধি হইলো আমার আশেপাশে কিছু মানুষ দেশ নিয়ে একটা র্যাডিক্যাল ধারণা রাখে, যেইটা আমার থেকে বেশ ভিন্ন। আমি অবাক হইছি, কারণ তারা সবাই ছিলো শিক্ষিত, কেউ কেউ বিখ্যাত সব বিজনেস স্কুলে পড়া, দেশ-বিদেশ বেড়ানো, তাও কিছু সেনসিটিভ বিষয়ে তাদের অভিমত ছিলো কষ্টদায়ক। আমার কী করা উচিত? আমার কী বসে থেকে মেনে নেয়া উচিত না কি এ বিষয়ে কিছু করা উচিত? আর্ট আপনাকে একই সাথে খানিক আনন্দ আর খানিক অস্বস্তির মধ্যে ফেলে দিবে, এইটাই তার উদ্দেশ্য। আমি আরো বিশ্বাস করি যে, তথ্য প্রযুক্তির কল্যাণে প্রায় সবারই সব বিষয়ে একটা মতামত আছে। টিভি, নিউজপেপার, রেডিও, সোশ্যাল মিডিয়া, এমনকি মেইলের স্প্যামেও ফরোর্য়াড হয় প্রোগাপান্ডাগুলা, যা মূলত ব্রেইনওয়াশ। আর এই প্রোগাপান্ডার বিরুদ্ধে লড়াই করতে আপনার দরকার, সত্য কথা বলতে পারছে এমন স্ট্রিট আর্ট।

পলিটিক্যাল কাজগুলা কি আপনার করা বাকি কাজগুলা থেকে আলাদা, যেখানে সোশ্যাল বিষয় নিয়ে বেশি বলা হইসে?

আমি সচেতনভাবে রাজনীতি থেকে দূরে থাকতাম এবং আমার সবসময় মনে হইছে আমি মজা পাইতেছি কি না এটাই বড় বিষয়। গত কয়েক বছরে আমার উপলব্ধি হইলো যে আমি দেশকে প্রচণ্ড ভালোবাসি আর এই ভালোবাসা থেকে নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা মনে হইতে থাকলো।

আমার কথা শুনে আমার প্রতি হাসাটা স্বাভাবিক কিন্তু ইতিহাসের কথা না আমাদের অনুপ্রাণিত করা? যেমন ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে, সবাই যে যার জায়গা থেকে যতটুকু সম্ভব করছি। বর্তমান অবস্থাটাও ওইরকমই। জালিয়ানওয়ালাবাগের মত বড় ঘটনা হয়তো নাই কিন্তু আমাদের আশেপাশে আন্দোলনগুলা আর তার ইস্যুগুলা দেখেন। এইটারে আমার স্বাধীনতা বলে মনে হয় না। এই বিষয়টা নিয়ে কিভাবে না বলে থাকি।

পলিটিক্যাল আর্ট করা কী ভয়ের? বিশেষত এই সময়ে যখন মানুষের সহনশীলতা নাই বললেই চলে।

শুরু তো করেছিলাম গ্রাফিতি দিয়ে। সেটাও বেশ একটা বিপ্লবী চিন্তা। পরীক্ষামূলকভাবে কয়েকটা দেয়ালে এঁকে দেখবো ভেবেছিলাম। কিন্তু প্রত্যেক বছর পার হওয়ার সাথে সাথে আমি আমার করা কাজগুলা নিয়ে সর্তক হই। কি আঁকছি তা নিয়েও। নিজেকে দায়বদ্ধ হইতে হবে,  নাইলে এসব অর্থহীন। যদি দায়বদ্ধ না হইতাম তাহলে আপনার সাথে এইখানে কথা বলতাম না অবশ্যই।

এমন সোজাসাপ্টা পলিটিক্যাল বক্তব্য প্রকাশের চ্যালেঞ্জিং অংশ কোনটা? 

আমি আমার তিন নম্বর পলিটিক্যাল কাজটা করতেছি, যেখানে মোদি আর রাহুলের মধ্যে একটা ‘টাগ অফ ওয়ার’ দেখা যায়।  কাজটা আমি বাসায় বসে অনলাইনে খুব আরামেই করতে পারতাম। কিন্তু আমি নিজের একটা নতুন রাস্তা তৈরি করতে চাই। স্যাটায়ার হিসেবে কোন দেয়ালে প্রধানমন্ত্রীর ছবি দেখছেন কখনো? দেখার কথা না। কারো সেই সাহস নাই কিংবা কেউ সেইটা প্রয়োজন বোধ করে না। আমি ব্যাপারটাকে অন্যভাবে দেখি। প্রধানমন্ত্রীকে ভালোবেসে আঁকা যাবে না? এই কাজটা করে বিনা পারমিশনে গ্রাফিতি আঁকার নিয়মটা ভাঙছি আমি।আবার আমাদের দেশের আইনে আছে যে দেশের প্রধানের ছবি, মানচিত্র, পতাকা এগুলা নির্দিষ্ট নিয়মেই আঁকতে হবে। ভাঙন (ডিসইনট্রেগেশন)  নামে যে ছবিটা নির্বাচনের কয়েক সপ্তাহ আগে করেছি, তাতে এইসব আইনই ভাঙা পড়েছে। কিন্তু সত্যি বলতে আমার মন খুব খারাপ হইতো যদি কেউ এটা আমার আগে করে ফেলতো।

 

আপনার চিন্তার বিষয় কি এতোটুকুই? 

ভাক্তদের (হিন্দু জাতীয়তাবাদী হিসেবে চিহ্নিত করে) হাতে মাইর খাওয়ার একটা সম্ভবনা আছে। পার্টি অফিস যাইতে যাইতে যদি আমাকে এইসব আঁকাআঁকি করতে দেখে? কপাল জোরে মোদি-রাহুলের ছবিটা শেষ করতে পেরেছি। দুইজন সাংবাদিক এটার ছবি তুলে টাইমস অফ ইন্ডিয়া আর ওয়াশিংটন পোস্টে ছাপান। এটা সোশ্যাল মিডিয়াতে কয়েকটা লাইকের চেয়ে ভালো। বিনা পয়সায় নিউজ হওয়াটা এখন সৌভাগ্যের, যেখানে প্রায় সব নিউজই পেইড। 

একজন অচেনা আর্টিস্ট যে পলিটিক্যাল আর সোশ্যাল বিষয়গুলা নিয়ে ক্রমশ ভীষণভাবে আলোচিত হয়ে উঠছে,  সে বিবেচনায় আপনি কি মুখোশের আড়ালে থাকা সুপারহিরো নাকি আমজনতা? 

এইটা আমজনতার কাজ। সুপারহিরোর মত ফিল আমি পাই যদিও। যেমন মন চায় তেমনই আঁকি, ভয় পাই না আমি। বনের সিংহ কখনো দেখে না সে কাকে শিকার করছে আর কোথায় করছে। 

যখন আইনটা ভাঙছো, মনোযোগ দিয়ে ভাঙ্গো। সিস্টেমরে ফাঁকি দেয়া এতো সহজ না, ধরা পড়া খুব সহজ। চোর ধরা পড়লে, গল্পটা গতানুগতিক হয়ে যায়। পালানোর গল্প সবসময়ই অইটার চেয়ে ভালো। 

অনলাইনে ট্রল হইছেন কখনো? 

যে সেলিব্রেটিরা আমার ছবিতে লাইক-কমেন্ট কিংবা শেয়ার করসেন, তারা আমার ভাগের অনেক ট্রল নিজের দিকে টাইনা নিছেন। আনুশকা মাচান্দা আমার ‘জে শ্রী রাম’ ছবিটা শেয়ার দিছেন, সাথে মাহেশ ভাট, রানা আইয়ুবও।  গালিগালাজ, ট্রল এদের দিকেই বেশি গেছে। কমেন্টগুলা দেখে নিজেরে ভাগ্যবান মনে হইছে যে এগুলা আমার দিকে না, অন্তত এবার! 

আপনি কী এই ঘৃণার মুখোমুখি হওয়ার জন্য এখন প্রস্তুত? 

স্ট্রিট আর্টিস্ট হওয়ার একটা সমস্যা হইতেছে, একটা পর্যায় পার হবার পর কিছুই আর তেমন গায়ে লাগে না। জীবন তার গতিতে নতুন নতুন ভাঁজ খুলবে। আমি আমার পক্ষ থেকে ঘৃণা এড়ায়ে যাওয়ার চেষ্টা করে যাবো। কখনো কখনো অবশ্য মেনে নেয়াটাও একটা অপশন। 

আপনি কী সত্যিই নির্ভীক? নাকি বিপ্লবের রোমান্টিসিজমে ভুগছেন? 

সবচেয়ে বেশি কী করবে? আমাকে মারতে আসবে!  আমি ওদের লিস্টে প্রথম না, আবার শেষও না।  সাহস শব্দটা থেকে আমি যে শিক্ষা নিছি, সেটা হচ্ছে এটা প্রচণ্ডরকম সংক্রামক। 

আরো পলিটিক্যাল হয়ে উঠবেন সামনে? 

পলিটিকস তো একটা নেশা। এর আলোচনার শেষ নাই। আপনার অংশগ্রহণ আছে, ইগোও : আপনার মনে হয় যে আপনার বিশ্বাসটাই সত্য কিন্তু আসলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হইলো একটা ব্যালেন্সে আসা। 

আর্ট আমি নিজের জন্য বানাই, কিন্তু তার পেছনে সুনির্দিষ্ট চিন্তা থাকে। কোন কিছুই খুব বেশি ভালো না।

মানুষরে নারাজ কইরা ফেলার ভয় আছে তাইলে আপনার? 

মানুষরে নারাজ কইরা তোলাই আমার প্রথম উদ্দেশ্য কিন্তু সেটা সহীহ তরিকায়। মাথামোটা আচরণের কারণে আমি বিপদে পড়তে চাই না।  আমার পরা টি শার্টটা দেখেন (টি-শার্টে লেখা, “আই ওয়ান্ট দিজ গর্ভনমেন্ট টু বি ক্রিটিসাইজড, ক্রিটিসিজম মেকস ডেমোক্রেসি স্ট্রংগার) আমি এই ধরনের বার্তা সবার মধ্যে ছড়ায়ে গণতন্ত্রকে আরো শক্ত অবস্থানে নিয়া যাইতে চাই।

লেখা সম্পর্কে মন্তব্য

টি মন্তব্য

%d bloggers like this:
মুম্বাইয়ের গ্রাফিতি আর্টিস্ট টাইলরের সাক্ষাৎকার | ভাষান্তর : তন্ময় হাসান | শিরিষের ডালপালা । সাহিত্য ওয়েবজিন

মুম্বাইয়ের গ্রাফিতি আর্টিস্ট টাইলরের সাক্ষাৎকার | ভাষান্তর : তন্ময় হাসান

টাইলর ইন্ডিয়ান আর্টিস্ট, গ্রাফিতি আর্টিস্ট। মুম্বাইয়ের। তার কাজে ব্যাঙ্কসির প্রভাব আছে বলা হয়। এ কারণে তাকে মুম্বাই ব্যাঙ্কসিও ডাকা হয়। ব্যাঙ্কসি দ্বারা প্রভাবিত হলেও, ব্যাঙ্কসি থেকে টাইলর যা যা নিছেন, তাকে ইন্ডিয়ার রাজনৈতিক-সামাজিক অবস্থা প্রেক্ষাপটে প্রাসঙ্গিক বানায়া  নিছেন উনি। এই বানায় নেয়াটাও পলিটিক্যাল কাজ এবং জরুরিও। অন্যান্য দেশের চাইতে এমন কি অন্যান্য পাশের দেশের চাইতেও ইন্ডিয়ার সাথে আমাদের রিয়েলিটিটা তো কাছেরই। তা রাজনৈতিক-সামাজিক দুই দিক থেকেই। তাই অন্য দেশের অন্য একজন আর্টিস্টের চাইতে টাইলরে আমরা আগ্রহটা বেশিই পাবো। তো দেখা যাক, টাইলরকে।

 ভাইস ম্যাগাজিনকে দেয়া এ ইন্টারভিউটা অনুবাদ করেছেন তন্ময় হাসান। তন্ময়কে ধন্যবাদ।


ইন্ডিয়ার মত দেশে পলিটিক্যাল গ্রাফিতি আর্টিস্ট হওয়াটা কেমন?  

স্যাটায়ার হিসেবে কোন দেয়ালে প্রধানমন্ত্রীর ছবি দেখছেন? দেখার কথা না। কারো সেই সাহস নাই। কিংবা সেইটাকে কেউ গুরুত্বপূর্ন মনে করে না। আমি ব্যাপারটাকে অন্যভাবে দেখি।

আপনার কাজগুলাকে কী বলা যায়?  প্রোটেস্ট আর্ট, পলিটিক্যাল আর্ট নাকি  দেয়ালে দেয়ালে এনার্কির প্রচার?

সবগুলার মিশ্রণ। পলিটিক্যাল কাজ করতেছি মাস কয়েক হবে। তার আগে আমি সামাজিক বিষয় নিয়ে কাজ করছি যেমন ক্যাপিটালিস্ট, যুদ্ধ, দারিদ্রতা এবং লোভ; কিন্তু কখনো পলিটিক্যাল ছিলাম না। এ বছর নির্বাচনে ব্যাপারটা পাল্টাইছে, ইন্ডিয়া কোনদিকে যাবে সেই ব্যাপারটাও।

 

২০১৯ এর নির্বাচন কীভাবে আপনাকে বদলাইছে? 

আমার উপলব্ধি হইলো আমার আশেপাশে কিছু মানুষ দেশ নিয়ে একটা র্যাডিক্যাল ধারণা রাখে, যেইটা আমার থেকে বেশ ভিন্ন। আমি অবাক হইছি, কারণ তারা সবাই ছিলো শিক্ষিত, কেউ কেউ বিখ্যাত সব বিজনেস স্কুলে পড়া, দেশ-বিদেশ বেড়ানো, তাও কিছু সেনসিটিভ বিষয়ে তাদের অভিমত ছিলো কষ্টদায়ক। আমার কী করা উচিত? আমার কী বসে থেকে মেনে নেয়া উচিত না কি এ বিষয়ে কিছু করা উচিত? আর্ট আপনাকে একই সাথে খানিক আনন্দ আর খানিক অস্বস্তির মধ্যে ফেলে দিবে, এইটাই তার উদ্দেশ্য। আমি আরো বিশ্বাস করি যে, তথ্য প্রযুক্তির কল্যাণে প্রায় সবারই সব বিষয়ে একটা মতামত আছে। টিভি, নিউজপেপার, রেডিও, সোশ্যাল মিডিয়া, এমনকি মেইলের স্প্যামেও ফরোর্য়াড হয় প্রোগাপান্ডাগুলা, যা মূলত ব্রেইনওয়াশ। আর এই প্রোগাপান্ডার বিরুদ্ধে লড়াই করতে আপনার দরকার, সত্য কথা বলতে পারছে এমন স্ট্রিট আর্ট।

পলিটিক্যাল কাজগুলা কি আপনার করা বাকি কাজগুলা থেকে আলাদা, যেখানে সোশ্যাল বিষয় নিয়ে বেশি বলা হইসে?

আমি সচেতনভাবে রাজনীতি থেকে দূরে থাকতাম এবং আমার সবসময় মনে হইছে আমি মজা পাইতেছি কি না এটাই বড় বিষয়। গত কয়েক বছরে আমার উপলব্ধি হইলো যে আমি দেশকে প্রচণ্ড ভালোবাসি আর এই ভালোবাসা থেকে নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা মনে হইতে থাকলো।

আমার কথা শুনে আমার প্রতি হাসাটা স্বাভাবিক কিন্তু ইতিহাসের কথা না আমাদের অনুপ্রাণিত করা? যেমন ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে, সবাই যে যার জায়গা থেকে যতটুকু সম্ভব করছি। বর্তমান অবস্থাটাও ওইরকমই। জালিয়ানওয়ালাবাগের মত বড় ঘটনা হয়তো নাই কিন্তু আমাদের আশেপাশে আন্দোলনগুলা আর তার ইস্যুগুলা দেখেন। এইটারে আমার স্বাধীনতা বলে মনে হয় না। এই বিষয়টা নিয়ে কিভাবে না বলে থাকি।

পলিটিক্যাল আর্ট করা কী ভয়ের? বিশেষত এই সময়ে যখন মানুষের সহনশীলতা নাই বললেই চলে।

শুরু তো করেছিলাম গ্রাফিতি দিয়ে। সেটাও বেশ একটা বিপ্লবী চিন্তা। পরীক্ষামূলকভাবে কয়েকটা দেয়ালে এঁকে দেখবো ভেবেছিলাম। কিন্তু প্রত্যেক বছর পার হওয়ার সাথে সাথে আমি আমার করা কাজগুলা নিয়ে সর্তক হই। কি আঁকছি তা নিয়েও। নিজেকে দায়বদ্ধ হইতে হবে,  নাইলে এসব অর্থহীন। যদি দায়বদ্ধ না হইতাম তাহলে আপনার সাথে এইখানে কথা বলতাম না অবশ্যই।

এমন সোজাসাপ্টা পলিটিক্যাল বক্তব্য প্রকাশের চ্যালেঞ্জিং অংশ কোনটা? 

আমি আমার তিন নম্বর পলিটিক্যাল কাজটা করতেছি, যেখানে মোদি আর রাহুলের মধ্যে একটা ‘টাগ অফ ওয়ার’ দেখা যায়।  কাজটা আমি বাসায় বসে অনলাইনে খুব আরামেই করতে পারতাম। কিন্তু আমি নিজের একটা নতুন রাস্তা তৈরি করতে চাই। স্যাটায়ার হিসেবে কোন দেয়ালে প্রধানমন্ত্রীর ছবি দেখছেন কখনো? দেখার কথা না। কারো সেই সাহস নাই কিংবা কেউ সেইটা প্রয়োজন বোধ করে না। আমি ব্যাপারটাকে অন্যভাবে দেখি। প্রধানমন্ত্রীকে ভালোবেসে আঁকা যাবে না? এই কাজটা করে বিনা পারমিশনে গ্রাফিতি আঁকার নিয়মটা ভাঙছি আমি।আবার আমাদের দেশের আইনে আছে যে দেশের প্রধানের ছবি, মানচিত্র, পতাকা এগুলা নির্দিষ্ট নিয়মেই আঁকতে হবে। ভাঙন (ডিসইনট্রেগেশন)  নামে যে ছবিটা নির্বাচনের কয়েক সপ্তাহ আগে করেছি, তাতে এইসব আইনই ভাঙা পড়েছে। কিন্তু সত্যি বলতে আমার মন খুব খারাপ হইতো যদি কেউ এটা আমার আগে করে ফেলতো।

 

আপনার চিন্তার বিষয় কি এতোটুকুই? 

ভাক্তদের (হিন্দু জাতীয়তাবাদী হিসেবে চিহ্নিত করে) হাতে মাইর খাওয়ার একটা সম্ভবনা আছে। পার্টি অফিস যাইতে যাইতে যদি আমাকে এইসব আঁকাআঁকি করতে দেখে? কপাল জোরে মোদি-রাহুলের ছবিটা শেষ করতে পেরেছি। দুইজন সাংবাদিক এটার ছবি তুলে টাইমস অফ ইন্ডিয়া আর ওয়াশিংটন পোস্টে ছাপান। এটা সোশ্যাল মিডিয়াতে কয়েকটা লাইকের চেয়ে ভালো। বিনা পয়সায় নিউজ হওয়াটা এখন সৌভাগ্যের, যেখানে প্রায় সব নিউজই পেইড। 

একজন অচেনা আর্টিস্ট যে পলিটিক্যাল আর সোশ্যাল বিষয়গুলা নিয়ে ক্রমশ ভীষণভাবে আলোচিত হয়ে উঠছে,  সে বিবেচনায় আপনি কি মুখোশের আড়ালে থাকা সুপারহিরো নাকি আমজনতা? 

এইটা আমজনতার কাজ। সুপারহিরোর মত ফিল আমি পাই যদিও। যেমন মন চায় তেমনই আঁকি, ভয় পাই না আমি। বনের সিংহ কখনো দেখে না সে কাকে শিকার করছে আর কোথায় করছে। 

যখন আইনটা ভাঙছো, মনোযোগ দিয়ে ভাঙ্গো। সিস্টেমরে ফাঁকি দেয়া এতো সহজ না, ধরা পড়া খুব সহজ। চোর ধরা পড়লে, গল্পটা গতানুগতিক হয়ে যায়। পালানোর গল্প সবসময়ই অইটার চেয়ে ভালো। 

অনলাইনে ট্রল হইছেন কখনো? 

যে সেলিব্রেটিরা আমার ছবিতে লাইক-কমেন্ট কিংবা শেয়ার করসেন, তারা আমার ভাগের অনেক ট্রল নিজের দিকে টাইনা নিছেন। আনুশকা মাচান্দা আমার ‘জে শ্রী রাম’ ছবিটা শেয়ার দিছেন, সাথে মাহেশ ভাট, রানা আইয়ুবও।  গালিগালাজ, ট্রল এদের দিকেই বেশি গেছে। কমেন্টগুলা দেখে নিজেরে ভাগ্যবান মনে হইছে যে এগুলা আমার দিকে না, অন্তত এবার! 

আপনি কী এই ঘৃণার মুখোমুখি হওয়ার জন্য এখন প্রস্তুত? 

স্ট্রিট আর্টিস্ট হওয়ার একটা সমস্যা হইতেছে, একটা পর্যায় পার হবার পর কিছুই আর তেমন গায়ে লাগে না। জীবন তার গতিতে নতুন নতুন ভাঁজ খুলবে। আমি আমার পক্ষ থেকে ঘৃণা এড়ায়ে যাওয়ার চেষ্টা করে যাবো। কখনো কখনো অবশ্য মেনে নেয়াটাও একটা অপশন। 

আপনি কী সত্যিই নির্ভীক? নাকি বিপ্লবের রোমান্টিসিজমে ভুগছেন? 

সবচেয়ে বেশি কী করবে? আমাকে মারতে আসবে!  আমি ওদের লিস্টে প্রথম না, আবার শেষও না।  সাহস শব্দটা থেকে আমি যে শিক্ষা নিছি, সেটা হচ্ছে এটা প্রচণ্ডরকম সংক্রামক। 

আরো পলিটিক্যাল হয়ে উঠবেন সামনে? 

পলিটিকস তো একটা নেশা। এর আলোচনার শেষ নাই। আপনার অংশগ্রহণ আছে, ইগোও : আপনার মনে হয় যে আপনার বিশ্বাসটাই সত্য কিন্তু আসলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হইলো একটা ব্যালেন্সে আসা। 

আর্ট আমি নিজের জন্য বানাই, কিন্তু তার পেছনে সুনির্দিষ্ট চিন্তা থাকে। কোন কিছুই খুব বেশি ভালো না।

মানুষরে নারাজ কইরা ফেলার ভয় আছে তাইলে আপনার? 

মানুষরে নারাজ কইরা তোলাই আমার প্রথম উদ্দেশ্য কিন্তু সেটা সহীহ তরিকায়। মাথামোটা আচরণের কারণে আমি বিপদে পড়তে চাই না।  আমার পরা টি শার্টটা দেখেন (টি-শার্টে লেখা, “আই ওয়ান্ট দিজ গর্ভনমেন্ট টু বি ক্রিটিসাইজড, ক্রিটিসিজম মেকস ডেমোক্রেসি স্ট্রংগার) আমি এই ধরনের বার্তা সবার মধ্যে ছড়ায়ে গণতন্ত্রকে আরো শক্ত অবস্থানে নিয়া যাইতে চাই।

লেখা সম্পর্কে মন্তব্য

টি মন্তব্য

%d bloggers like this: