home আলাপচারিতা ‘বেড়ে ওঠা ভাষা-ভূগোলের একটা দায় থাকে, মায়ের দুধের মতো’ – ফারাহ্ সাঈদ

‘বেড়ে ওঠা ভাষা-ভূগোলের একটা দায় থাকে, মায়ের দুধের মতো’ – ফারাহ্ সাঈদ

দ্বিতীয় দশকের কবিদের ধারাবাহিক আড্ডায় দশম পর্বে মধ্যমণি ছিলেন ফারাহ্ সাঈদ। ফারাহ্’র বসবাস ক্যালিফোর্নিয়ায়। কিন্তু ছোটবেলায় শুরু করা লেখালেখি ছাড়েননি। বাংলা ভাষায় কবিতা এবং গল্প লিখে যাচ্ছেন। তার কবিতার ভাষা, বিষয় এবং সিনট্যাক্স অনেকাংশেই অভিনব। সে কারণেই বাংলা কবিতায় ফারাহ্ সাঈদ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারেন। ফারাহ্’র সঙ্গে এই আড্ডা দেবার প্রধান কারণ এটিই। তার বই প্রকাশ হয়েছি তিনটি। কবিতার দুটি, গল্পের একটি। এই আড্ডার মাধ্যমে নিশ্চয়ই সাহিত্যিক ফারাহ্ সাঈদকে অনেকটাই বোঝা সম্ভব। ফারাহ্’র সঙ্গে আড্ডা দিয়েছেন রুহুল মাহফুজ জয়, মারুফ আদনান, হাসান রোবায়েত, মোস্তফা হামেদী, হুজাইফা মাহমুদ ও হাসনাত শোয়েব।



শিল্প, সঙ্গীতের কোন দেশ নেই। পৃথিবীর সব মাটি-রোদ-ছায়া তার নিজের। ধ্বনিকে পৌঁছে দেয়াই তার কাজ, ভাষা বাহকমাত্র ।


রুহুল মাহফুজ জয়: কৈশোর পেরনোর আগেই বিদেশ বিঁভুইয়ে আপনি। ইউরোপ-আমেরিকার মাটি-বাতাস-পানিতে বেঁচে থেকে বাংলা কবিতাকে কিভাবে আঁকড়ে ধরলেন?
ফারাহ্ সাঈদ: মাতৃভাষার প্রতি দরদ। আমার মাঝে চিরকালের যে অনুরাগ সেটাই হয়তো কারণ। ইংরেজি এখনও ভিনদেশের ভাষা, কিছু লেখা যায়, আমারো আছে, নিজেকে সম্পূর্ণ প্রকাশ করা যায় না। আর দুটো ভাষার টোনই আলাদা। আমার প্রথম এবং শেষ প্রত্যাদেশ হয়ত বাংলাতেই।
জয়: লেখালেখিটা কখন শুরু করেছিলেন, কিভাবে?
ফারাহ্: স্কুলে। বাড়িতে অনেক বই ছিল, কিছু পড়তাম। লিখতাম যা খুশি। বড়দের, শিক্ষকদের অনুপ্রেরণা পেতাম।
জয়: আপনি সম্ভবত উদয়ন স্কুলে পড়েছেন। ফুলার রোড, বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা কোন প্রভাব রেখেছে?
ফারাহ্: হ্যাঁ তা তো বটে, আমাদের টিচার ছিলেন ফেরদৌসী মজুমদার, খালেদা হাবিব, শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী, খুশি কবিরের মত মানুষ। এইসব মানুষের আশেপাশে থাকা ও তাঁদের সঙ্গটা একটা বিশাল প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছিলো।
জয়: ইংল্যান্ডে বহু বছর ছিলেন। সেখানকার সাহিত্যচর্চা সম্পর্কে জানতে চাই। যদিও আপনার অনেক কবিতায় আমি লেট নাইনটিজের ঢাকাকে ফিল করতে পারি।
ফারাহ্: ইংল্যান্ডের স্মৃতিতে শুধুই ইংরেজি নয়, ওখানে আসলে ইউরোপের অন্যান্য ভাষার সাহিত্য নিয়ে কাজগুলো ফলো করতাম। বন্ধুদের বিশাল আড্ডা। আমি ওয়ার্ডসওয়ার্থের ভক্ত ছিলাম। আসলে এটা বাড়ির প্রভাব। পরিবারে আলাপ হতো তাঁর কবিতা নিয়ে। গিয়েছিলাম উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থের বাড়ি ডোভ কটেজে। গিয়ে আর ফিরে আসতে ইচ্ছে হয়নি, ওখানে শুধু রোমান্টিকতা নয় বরং একটা জীবন আছে, এখনো যা অনুভব করা যায়।
জয়: মেসবা আলম অর্ঘ্যও তো উদয়নে ছিলেন মনে হয়। ওই সময়ে তার সাথে পরিচয় ছিল?
ফারাহ্: না, অর্ঘ্যকে পেলাম ‘কৌরবে’। তবে পরিচয় হবার পর স্কুল আর কবিতা নিয়ে কথা হয়েছে অনেক। আমার পছন্দ হয় ওর লেখা।
জয়: আপনি তো ভারতে গিয়ে ক্ল্যাসিক্যাল শিখতেন। আপনার কবিতাও মিউজিকের অনুষঙ্গে ভরপুর। গানের চর্চাটা আছে এখনো?
ফারাহ্: সংগীতের হাতেখড়ি বাংলাদেশে। ছোটবেলায়। মা গান করতেন, বোনরাও। তবে তখন অনেক ফাঁকিবাজ ছিলাম। কার্টুন দেখার জন্য গানের ক্লাস মিস করতাম। বিদেশে এসে আবার শুরু। কিছুদিন সেতার শিখেছি পণ্ডিত কিশোর চক্রবর্তীর কাছে। গানটাও আমাকে কবিতার মতো টানে। মিলেমিশে যায়, সুর-তাল-লয়ে সেটাই হয়ত কবিতায় আসে বারবার।
জয়: ‘শিশু নামের হেলান দেয়া ইহুদি গাছটি বড় হতে থাকে’। ‘হিব্রু’ কবিতায় এই ইহুদি গাছটিকে আপনি কী ইঙ্গিত করেছেন?
ফারাহ্: কবিতায় পাজেল পাঠক যে যেভাবে ভাঙতে চায়। কোন একটা ট্রান্সফরমেশনের পর নিজের মাঝে একটা নতুন ‘আমি গাছ’ এর চারার জন্ম, তারপর তার বেড়ে ওঠা, এমন কিছুও হতে পারে।
জয়: আপনার কবিতায় ঘুরেফিরে কফি এসেছে। মনে হয় কফি খুব প্রিয়। ইস্তানবুল সংক্রান্ত কোন কফিস্মৃতি আছে নাকি? যে স্কুলঘর তুমুল ইস্তানবুল হতে চায়?
ফারাহ্: হা হা হা। এই শীতের দেশগুলোতে কফি তো জীবন। দানা দানা কফি যেনো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে মনবারান্দায়। ইস্তানবুলে যাইনি আমি। অনেক দেশ দেখা হলো, ওখানে যাবো একবার। হঠাৎ কেউ এমন উসকে দেয় যে এক কাপ কফির ধোঁয়ায় আপনি নিমিষেই চলে যান ইস্তানবুলের কোন দরজায়, গম্বুজ কিংবা মিনারে। এমনি তো হয়! স্কুল নিয়ে আমার কবিতায় অনেক কথা, এখনো সেই স্কুলের ছাত্রীই আছি, নস্টালজিক, ঘোর লাগা সেই জীবন!
জয়: পুকুর লাফাচ্ছে লাফাক! বৃষ্টির ফোঁটা পুকুরে পড়ে যে লাফ দ্যায়, সেটাই কি? কবিতাটায় আমি অবশ্য যৌনতারও গন্ধ পাই।
ফারাহ্: লিবিডোকে আড়ালে রাখে কোনো কোনো কবি আবার কেউ কেউ রাখেও না। আমি দুই এর মাঝেই আছি। যখন যা ইচ্ছা হয়। তবে এখানে ‘বৃষ্টির ফোঁটা’য় পুকুর লাফাচ্ছে ঠিক তা নয়, নিজের মাঝেই পুকুরের উঠানামা। আমার আরেকটি পছন্দের এলিমেন্ট পুকুর।
জয়: থকথকে আলো নামলেই আত্মাহুতির সাধ এখনো কী জাগে?
ফারাহ্: চিরকাল, আমৃত্যু। এটা আসলে ব্যক্তির চিরকালীন প্রবণতা। অনুভূতিপ্রবণ মানুষকে সারাক্ষণ আত্মহত্যা তাড়িয়ে বেড়ায় । তবে এটা অম্ল-মধুর একটা সম্পর্ক। এই যে জোছনা আর আত্মাহুতি।
জয়: লিফটে কয়েকছত্র মেঘ তুলে দেবার চিত্রকল্পটা দারুণ লাগে। আচ্ছা, আপনার কবিতার অনিকেতটা কে, তার কি রক্ত-মাংসের অস্তিত্ব আছে?
ফারাহ্: ধন্যবাদ। এটা দার্জিলিং-এর একটা স্মৃতিময় কবিতা। অনিকেত একজন স্ট্রেনজার, তার নামটা যতদূর মনে পড়ে। যদিও লিফট ছিলো না সেটা, একটা উঁচু-নিচু রাস্তা। সে একটা মাউথঅর্গান নিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলো। কুয়াশায় হারিয়ে যায় অনিকেত।
জয়: আপনার ‘পিশপাশ বানাবে মা’ কবিতাটা আমার খুব মন খারাপ করায়, ফারাহ্!
ফারাহ্: লিখতে গিয়ে আমারও। যদিও কোন ভাই নেই আমার। এমন সোজাসাপ্টা কিন্তু গভীর হয়ে আছে এই ভাই হারানোর ফলিংটা, যা আমি নিজেও অনুভব করি।
মারুফ আদনান: কেমন আছেন?
ফারাহ্: আছি এই তো! আপনি?
মারুফ: আমি ভালো। আপনার সাথেও আমার প্রথম আলাপ।
ফারাহ্: আলাপ হয়েছে। এই যে আমার আপনার কবিতারা, ছবিগুলো কথা বলে।
মারুফ: আপনার বই পড়েছি। ভালো লেগেছিলো। ঠিক বলেছেন। এভাবেই আমাদের একরকম আলাপ সবসময় হয়।
ফারাহ্: প্রীত হলাম।
মারুফ: আচ্ছা। জানলাম আপনি বেশ কিছু দেশে ঘুরাফেরা করেছেন। ভ্রমণ বা ভৌগলিক স্থানান্তর লেখার উপর প্রভাব রাখে আমরা জানি। এই যে মাল্টিডাইম্যানশনাল এক্সপেরিয়েন্স তা থেকে নির্বাচনের ব্যাপারটা কেমন?
ফারাহ্: নির্বাচন বলতে বিষয় নির্বাচন? কবিতা, গল্পের?
মারুফ: হ্যাঁ। বা কোন কোন এক্সপেরিয়েন্স?
ফারাহ্: ভীষণ প্রভাব আছে। আমি কোথায়, কখন, কিভাবে আছি। সেখানে কোন লেখার শুরু হয়। তবে শেষটা হতে পারে অন্য কোথাও। ভৌগোলিক রেখায় থেমে থাকে না শব্দের ঘোর। কবিতা, গল্পের নিজেদেরও একটা জার্নি আছে। তবে এয়ারপোর্টগুলো খুব বিষণ্ণ কর ফেলে আমাকে, লিখি তখন। কবিতার জন্ম হয়।
মারুফ: দেশ পরিবর্তনে নিশ্চয়ই রাজনীতির পট চেঞ্জ হয়, তাতে কবিতায় তার প্রভাবটা কেমন?
ফারাহ্: রাজনীতির প্রভাব আছে লেখকদের মাঝে, তাদেও লেখায় উঠে আসে সময়ের কথা। পৃথিবীর সব দেশেই। কবি-সাহিত্যিক-লেখক প্রগতিশীল হবারই কথা, তবে হিপোক্রেট নয়। প্রেসিডেন্ট নিক্সনের জাদুঘরে ‘ওয়াটার গেট স্ক্যান্ডাল” এর দলিল পড়ার দর্শক বেশি থাকলেও আমার মতো কিছু মানুষ আছে যারা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে তার সেই সময়ের লেখা চিঠিগুলো পড়ি। মিসেস ক্যাথিরিন নিক্সনকে লেখা।
মারুফ: আমাদের যে পলিটিকাল ক্রাইসিস সেটা কি ওখানে থেকে বোঝেন?
ফারাহ্: হ্যাঁ। অন্তর্জালের এ যুগে সেটা সেকেন্ডের মাঝেই। তবে বোঝা বা আপনি জানতে চাইতে পারেন পারটিসিপেট করার কথা। সেটা থেকেই দূরে নই আমি ও আমরা। ক্রাইসিসে আমাদের অনেকেরই কিছু করার ক্ষমতা থাকে, সদিচ্ছাটাই বড় কথা, ডিসটেন্স নয়।
মারুফ: আমার কেমন জানি মনে হলো, আপনার লেখায় সেভাবে এখানকার পলিটিকাল ক্রাইসিসের ভেতর থেকে যে অস্তিত্বহহীনতা খুব একটা আসেনি। দরকার নাই যদিও। আপনার কথাটা একেবারেই ঠিক।
ফারাহ্: আমার নতুন কবিতার বইতে যদিও তেমন কোন কিছু নেই। আসলে এটা অনেকটা সেই সময়ের মানসিক অবস্থার উপর নির্ভর করে। প্রথম কবিতার বইতে ছিল কিছু। তার মাঝে একটি কবিতা হলো “চর জব্বর”।


কাজী নজরুলকে কি আপনি অনুবাদ-কবি বলবেন? তাঁর লেখায় ফার্সি, আরবি যেভাবে দেখা দেয়! 


মারুফ: আচ্ছা।
ফারাহ্: আমি এই ক্রাইসিসগুলোকে টুকরো টুকরোভাবে দেখি, বুঝতে সুবিধা হয়। কেন, কোথায়, কী করে তৈরি হলো।
মারুফ: ‘আপনার কবিতার ভাষা সরল, তবে বুনন সরল নয়।’ পাঠক হিসেবে এমন ধারণায় আপনার প্রতিক্রিয়া জানতে চাইছি। যদিও সরলতা বা জটিলতা কবিতার কোন সমস্যা না।
ফারাহ্: কবি নিজের অজান্তেই বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ ব্যবহার করে থাকেন কবিতায়। আপনি তো ছবি আঁকেন, জেনে থাকবেন কিউবিজম শিল্পের যে ধারা তার কিছুটা কাছাকাছি। পাঠকের যে যার মতো দেখবেন, পড়বেন। এটা যদিও আমার কথা, অন্য কবিদের হয়তো অন্য।
মারুফ: তা ঠিক। আমরা যা জানি আর যা দেখছি তার ফিলোসফিকাল পার্থক্যের জায়গা থেকেই কিউবিজম।
ফারাহ্: আমি সেটা ইনজয় করি যখন পাঠক অন্যভাবেও দেখতে ও ভাবতে পারে, আমার ভাবনার বাইরে হলেও।
মারুফ: কবিতায় এমনও হয়, আমার জানা আর কবিতার ইমেজ ভিন্নভাবে আসছে।
ফারাহ্: একেবারে, আমি ছবি আঁকি, আজকাল আর সময় হয় না, ডুডলিং হয়! তো ছবি আঁকা আর কবিতা তৈরিতে কি এমন তফাৎ বলুন। সবই তো সারফেসের ওপর নৃত্য! ছুরি, কলম, রং পেন্সিলের হোলি, আবার তাতে সাদা কাগজেরও মায়া আছে! হা হা হা।
মারুফ: আচ্ছা, কবিতায় চিত্রকল্পের ধরনে তো প্রকৃতির প্রভাব থাকে। বাংলার প্রকৃতি আর আপনার আশপাশের দৃশ্য যেহেতু এক নয়, চিত্রকল্প নির্মাণে কি কোন সমস্যা হয়?
ফারাহ্: বাংলার প্রকৃতি ও তার সুরের বসবাস আমার মাঝে এতটাই গাঢ়, যাকে অস্বীকার করে কবিতা লিখতে পারি না, বলতে পারেন মোহাবে মরুভূমির কাছে থাকলেও চর জব্বরে আছি বলেই মনে হয়। এটা শেকড়ের টান।
মারুফ: ছোট কবিতা লিখে কি আপনি আরাম পান? কারণ জানার ইচ্ছা।
ফারাহ্: বড় কবিতা খুব বেশি নেই আমার, কোন কারণ নেই এর পেছনে। কবির তৃষ্ণা ফুরোয় না কোনদিন। কবিতা শেষ হবার পরও।
হাসান রোবায়েত: আপনার বইয়ের নাম বেশ আনপ্রেডিক্টেবল এবং সুন্দর। যেমন ‘পৃথিবীর নিচুছাদ প্রেম’। আমি গত মেলায় অনেককেই দেখেছি আপনার বইটার নাম পড়েই বইটা কালেক্ট করতে চেয়ে ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছেন। এমন নাম ঠিক কিভাবে নির্বাচন করেন?
ফারাহ্: ‘পৃথিবীর নিচুছাদ প্রেম’ আমার একটি কবিতার নাম। আর এই বইয়ের কবিতাগুলো অনেকটাই এই নামের অর্থের সঙ্গে মিলে যায়। পাঠক যারা কিনেছেন বই তারা কি পৃষ্ঠা উল্টে দেখেননি! লেখক আনিসুল হকও আমার বইটি হাতে নিয়ে প্রথমে নামটা নিয়ে জানতে চেয়েছিলেন! আমার মাঝে মাঝে মনে হয় এটা একটা উপন্যাসের নাম হতে পারতো। ‘পৃথিবীর নিচুছাদ প্রেম’ এর মানে আসলে এক কথায় বলা কঠিন। ঘনিষ্ঠ এক ছাদ যেখানে দুজন মানুষের ভালোবাসা ছাড়া আর পাবার কিছু নেই, অনেকটা নিশ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়া বা মৃতপ্রায় প্রাণের আকুতি, বেঁচে থাকার।
রোবায়েত: যাই হোক। লেখক আনিসুল হকের অবশ্য আমার কাছে আলাদা গুরুত্ব নাই। আপনার কিছু কিছু ইমেজ আমার বেশ লাগে। যেমনঃ ‘নাকফুলটি/ তখনও ক্লান্ত সেমিকোলন।’ ‘চাঁদের স্বরচিত ফাটল’। আপনার টেক্সটে ইমেজ কিভাবে ধরা দেয়? মানে, আপনার থট প্রসেস সম্বন্ধে জানতে চাইছি।
ফারাহ্: আনিসুল হকের ‘মা’ পড়েছি বলেই গুরুত্ব আছে।
রোবায়েত: সেটা অবশ্যই আপনার ব্যাপার। আমি গোর্কির মা পড়েছি বলেই গুরুত্ব নাই।
ফারাহ্: ম্যাক্সিম গোর্কির মা আমার জীবনের প্রথম বই। ওইটুকু বয়সে (ক্লাস ফোরে সম্ভবত) সেটা বুঝতে না পারলেও পরে হয়েছে বোঝাপড়া। থটপ্রসেস সম্পর্কে বলি এবার। অনেক ভীড়ের মাঝে, কোলাহলেও আমার একা থাকার একটা প্রবণতা আছে। তখন অনুভূতিগুলো তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায়। ক্রাফটম্যানশিপের সঙ্গে ইনটিউশন আর যাপিত জীবন, এইসব মিলেই কবিতা জন্মে।
রোবায়েত: আপনার কবিতা আমার প্রিয়। সেটা এই জন্য যে আপনি আলাদা করে ভাবতে পারেন। মেলোড্রামাটিক না অনেক ক্ষেত্রেই। কিন্তু কিছু কিছু ব্যাপারে আমার ক্রিটিক আছে। যেমন আপনার ভাষা মাঝেমাঝে কেমন ডিসটিউনড লাগে। এইটা আপনি কীভাবে দেখেন?
ফারাহ্: আত্মার কথা শুনি, নিজেকে শুনি। কবিতায় যার কিছু কিছু ছিটেফোঁটা আসে। সঙ্গীতের ঘরানা আলাদা হয়তো আমাদের, আপনার আমার। কার মনে কিভাবে সেই সুর বাজে তা কেবল ঈশ্বর জানেন। “স্ট্রিম অব কনসাসনেস” মানুষভেদে ভিন্ন হতেই পারে। টিউনড ব্যপারটা নিয়ে আমার কিছু বলার আছে। পাঠকের ভাবনার জায়গাটা এতো বড়, আমার মাঝেমাঝে মনে হয় যে একজন লেখককেও সে ছাড়িয়ে যায়। তো নিজেকে কখনো কখনো ডিসটিউনড করা ভাল, আমি পাঠক হিসেবে এভাবে ভাবি, তারপর অন্য কিছু, নতুন কিছু গ্রহণ করা।
রোবায়েত: বাংলা ভাষার নিজস্ব ফ্লুয়িডিটি আছে, বাক্যে তার সুরের নিজস্ব অভিযোজন ক্ষমতা আছে। যা প্রথাগত মিউজিক থেকে একদম আলাদা। অন্তত আমার তাই মনে হয়। আপনি কি বাইরে থাকার কারণে এই ভাষার ইনার মিউজিককে মিস করেন?
ফারাহ্: দেশ মানে আমি। আমিই বাংলাদেশ। ভেতর-বাহির কী আসলে? মানুষ নিজেই ভাষা তৈরি করে নেয়। এখানে ভুলে যাওয়া বলে কিছু নেই। মিউজিক্যাল মাইন্ড শুধু কাব্যে নয় গল্প উপন্যাসও প্রখরভাবে কাজ করে আমার। অন্ধের হাতি দেখার গল্পটা আমার প্রায় মনে হয়, তবে পজেটিভ অর্থে। একটি কবিতাকে পাঠক যে যেই পাশ থেকে যেমনভাবে দ্যাখে, সেটা তার জন্য উপভোগ্য হলেই হলো। কবির সঙ্গে তা মিলে যেতে হবে এমন কথা নয়।
রোবায়েত: আমার কিন্তু দ্বিমত আছে। নিজের জনগোষ্ঠীর থেকে যখন আপনি দূরে থাকবেন তখন তাদের প্রতিদিনকার ভাষা-ব্যবহারে যে পরিবর্তন হয় ধীরে ধীরে তা আপনি মিস করবেন অনায়াসে। ঠিক এইখান থেকেই শুরু হয় ভাষার থেকে দূরত্ব। যে দূরত্ব আপনাকে ক্রমশ অনুবাদের দিকে নিয়ে যেতে পারে। যে কারণে আপনার টেক্সটের ব্যাপারে আমার এমন অবজার্ভেশন। সম্ভবত মাইকেল এই দূরত্ব চাননি বলেই ভারতবর্ষে ফিরে এসেছিলেন। তো, এমন ফিরে আসার ইচ্ছা আছে কি?
ফারাহ্: ভাষার থেকে দূরত্ব? দেশের মাটিতে থেকেই অনেকের সেটা তৈরি হচ্ছে, হতে পারে! রোবায়েত, আপনি যে সমাজে এখন বসবাস করেন, তার কতটা আপনার কবিতায় আছে? আপনি কিন্তু এড়িয়ে যান। নিজের একটা ভাষা, স্বর তৈরি করেন। একজন লেখকের মাঝে অনেক সেগমন্ট থাকে, তার নিয়ন্ত্রণ সে নিজেই করে। কিছুটা ভিনদেশি যেমন ইংরেজি তাতে মিশে গেলেও সেটা কবিতার জন্যই প্রযোজ্য ছিল! কাজী নজরুলকে কি আপনি অনুবাদ-কবি বলবেন? তাঁর লেখায় ফার্সি, আরবি যেভাবে দেখা দেয়! বাংলা বলে কথা, আজন্ম ভালোবাসি যারে। ফিরে যাবো কেন, আমি আছি বাংলাতে, ওখানেই।


জীবনানন্দের মতো বলতে হয় ‘আমার মতন কেউ নাই আর।’ তারপরও আমি অজ্ঞাতই থেকে যাবো হয়তো।


রোবায়েত: আমার অবজার্ভেশনটা আরেকটু ক্লিয়ার করি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেশের বাইরে অল্প বয়স থেকে থাকলে নিজের ভাষায় বেশ কিছু ব্যাপার ঢুকে পড়ে। চিন্তা-প্রক্রিয়ায় অধিকাংশ সময়েই দেখা যায়, মাতৃভাষায় কোনো বাক্য আসে প্রথমত বিদেশি ভাষা থেকে অনুবাদ হয়ে। আমি আসলে এই প্রসেসটাকেই ‘অনুবাদ’ বলেছি। এবং এতে করে মাতৃভাষায় কিছুটা হেরফের হয়, বৈচিত্র্যও তৈরি হয়। আপনার কিছু টেক্সটে যে ডিসটিউনড বাক্য আছে [আমার পাঠে] সেটার পেছনে কী কারণ থাকতে পারে?
ফারাহ্: আমি বাইরে থাকলেও যেইসব শহরগুলোতে ছিলাম, সেগুলো ছিলো বাঙালি-অধ্যুষিত। আমার বাংলা চর্চা কোথাও কোন ছেদ পড়েনি। এটা আসলে পরিবেশ-পরিস্থিতি ও মানুষের নিজের ওপর নির্ভর করে। আপনি জেনে থাকবেন হয়তো যে প্রবাসে একটা বিরাট সংখ্যা আছে আমাদের নিজস্ব জনগোষ্ঠীর। ভাষা-ব্যবহার, আচার-স্বভাবে সবাই বাঙালি, একটা বড় শহরে আমার বসতি। লাইফস্টাইলের সঙ্গে খাপ খেয়ে গেছে। বলা যায় বাঙালি-অধ্যুষিত এলাকাগুলো আসলে দেশের বাইরে এক একটি গ্রাম। খুব বেশি দূরত্ব তৈরির সুযোগ হয় না এখানে।
রোবায়েত: আপনার প্রথম বইটা আমার পড়া হয়নি। কিন্তু ফেসবুকে ঐ বইয়ের কিছু লেখা শেয়ার দিয়েছিলেন আপনি। সেগুলো পড়ে বেশ অবাক হইছিলাম। একদম শুরু থেকেই আপনি আলাদা টেক্সট লিখছেন। তো, শুরু থেকেই কিভাবে এমন আলাদা হলেন?
ফারাহ্: আপন ভুবনে লতায়-পাতায় জড়িয়ে ছিলাম। কবিতা এই এক মাধ্যম যা আমাকে, আমার ভেতরটাকে প্রকাশ করার সুযোগ করে দেয়। ভাষা নির্মাণ করে মানুষ নিজেই, লালন করে ভেতর ভেতর। তবে অদ্ভুত এক ব্যপার হলো আমি দলিল লেখক হতে চেয়েছিলাম, সেই ছোটবেলা থেকে! বাংলা কবিতায় আমার কাজ হয়তো সামান্য কিছু। তবু জীবনানন্দের মতো বলতে হয় ‘আমার মতন কেউ নাই আর।’ তারপরও আমি অজ্ঞাতই থেকে যাবো হয়তো।
রোবায়েত: ফেসবুকে মাঝেমাঝেই এমন আলাপ তুলতে দেখা যায় অনেককেই যে ‘বাংলা-কবিতায় উল্লেখযোগ্য তেমন নারী [কবির জেন্ডার হয় কি হয় না সে আলাপে যাবো না] কবি নাই। শুরুতে অনেককেই দেখা যায় ভালো লিখতে তারপর দুম করেই তারা হারিয়ে যান। আপনার কী মনে হয়, কেন?
ফারাহ্: শুরু তো বেশ আগেই হয়েছে, টিকে আছি কিনা আমার পাঠকেরাই ভালো বলতে পারবে। নারী লেখক বলে আমাকে কোথাও দেখা হয় না ওভাবে, কবিতা ছাড়াও আমার গল্প, মুক্তগদ্যে আমি সম্ভবত সেই ‘নারীসুলভ’ বা তেমন লিখিনি। হয় না আমার। মানুষ, এটাই আমার পরিচয়। নারী-পুরুষ বলে আলাদা কিছু নয়, টিকে থাকাটা তার নিজের ওপর, নিজস্ব স্বর, ভাষাকে মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়া, এ অনুরণন যতটা দূর থেকে শোনা যায়, সেই লক্ষ্যে!
রোবায়েত: আপনি বলছেন, ‘তারপরও আমি অজ্ঞাতই থেকে যাবো হয়তো।’ এমন আক্ষেপের কারণ কী? আপনি কি কোনো সিন্ডিকেশনের দিকে আঙুল তুলছেন নাকি অন্য কিছু?
ফারাহ্: না সিন্ডিকেশনের প্রশ্নই আসে না! এটা সম্ভবত কবিদের একটা আক্ষেপ, যা প্রায়শই তারা বলে থাকেন। একটা হাহাকার থাকেই। বিষন্নতার সে এক জাদু, শিল্প যেমন সৃষ্টি হয় আবার বার বার কী এক না-পাওয়ার দিকে ধাবিত করে!
মোস্তফা হামেদী: কেমন আছেন?
ফারাহ্: ভালো আছি। আপনি?
হামেদী: আছি ভালো। কিছুটা ক্লান্ত। ঢাকা গিয়েছিলাম জরুরী কাজে। ফিরলাম মাত্র। যাই হোক, কবিতা নিয়ে আলাপ করা যাক। কার কার কবিতা পড়ছেন ইদানিং?
ফারাহ্: তেমন বিশেষ কিছু নয়। কিছুটা মন্দাক্রান্তার কবিতা পড়ছিলাম। পড়ার দিকটা আমার একটু অন্যরকম। আমি খুব খেয়ালি আসলে।
হামেদী: কার কবিতা?
ফারাহ্: কবি মন্দাক্রান্তা সেন।
হামেদী: আচ্ছা। বাংলাদেশের সমসাময়িক কবিতা (দুই হাজার পরবর্তী) সম্পর্কে আপনার অবর্জাভেশন/ মূল্যায়ন কী?
ফারাহ্: নতুনদের কাজ ভালো, বেশ ভালো। এমনটা বলা হচ্ছে তুলনামূলকভাবে পশ্চিমবঙ্গ থেকে অনেকটাই এগিয়ে। সেটা ভাষা, টেকনিক বা অন্য অনেক দিক থেকে। আর আন্তর্জাতিক কবিতার সঙ্গে তুলনা করলে সেটাও ভালোর দিকেই। বৈচিত্র্যময়। একটা কারণ আমার মনে হয় যে আমাদের দেশে চর্চা বা সাহিত্য পড়াশুনা অন্তর্জালের কারণে ও পরিবেশের কারণে অনেকটা এগিয়ে। তবে আন্তর্জাতিকভাবে আমাদের এই ভাষা, এই সাহিত্যকে তুলে ধরতে, পৌঁছে দিতে সমসাময়িক কাজের অনুবাদ হওয়াটা খুব জরুরি বলে মনে করি। সাহিত্যের মূল স্রোতের সঙ্গে মিলে যেতে এর বিকল্প আর কী আছে!
হামেদী: তারপরও তো অনেকে পশ্চিমবঙ্গের কবিদের সার্টিফিকেট পেলে ধন্য হয়ে যান। এ ধরনের প্রবণতা ঢাকার সাহিত্যকে নানাভাবেই প্রভাবিত করছে। কী মনে হয় আপনার?
ফারাহ্: দেখুন এটার একটা ইতিহাস তো আছে যা আমাদের সবার জানা, তাও বলছি। বাংলা সাহিত্যে অনেক শিল্পকর্মের জন্ম ও লালন হয়েছে পশ্চিমবঙ্গে। হয়েছে পূর্ববঙ্গেও। তবে এখন আর সেই কথা বলা ঠিক হবে না। এটা হলো হীনমন্যতায় ভোগার ফল। কোন সার্টিফিকেটে ধন্য হবার সময় নয়। পশ্চিমবঙ্গের প্রাদেশিক ভাষা বাংলা, যেভাবেই হোক সেটার একটা প্রভাব তাতে আছেই। সেদিক থেকে ভেবে দেখলে বাংলাদেশের রাষ্ট্রভাষাতেই আমাদের সাহিত্যচর্চা, যেখানে ভাষার আত্মমর্যাদা ও চেতনা প্রখরভাবে কাজ করে।
হামেদী: জাতীয়তাবাদের সাথে সাহিত্যের সম্পর্কে আপনি কীভাবে দেখেন? আন্তর্জাতিক সাহিত্য এইরূপ কোনো ধারণায় বিশ্বাস করেন কিনা?
ফারাহ্: এককভাবে না হলেও, এর একটা প্রভাব আছে। চেতনা ও বোধের। দেখুন রাজনীতি, সমাজনীতি কোন না কোনভাবে কিন্তু শিল্পের, সাহিত্যের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে। আপনি জেনে থাকবেন এখনও ইংরেজি সাহিত্যের মান নিয়ে কথা হলেই সর্বপ্রথম বিবেচনায় থাকে ইংল্যান্ড। তবে একটা কথা আমার প্রায় মনে হয়, ডঃ মুহম্মদ শহীদুল্লাহর। তিনি বলেছিলেন যেদিন ওয়াক্লিক ল্যাটিন ছেড়ে ইংরেজি ভাষায় বাইবেল অনুবাদ করলেন, ইংরেজদের ভাগ্যলক্ষ্মী সুপ্রসন্ন হলো!
হামেদী: একজন কবি যে ভাষা-ভূগোলে বেড়ে ওঠেন, কবিতায় তাকে রিপ্রেজেন্ট করা কতটা জরুরি? নাকি কবির সুনির্দিষ্ট কোনো’ দেশ/ভূগোল থাকতে নেই?
ফারাহ্: বেড়ে ওঠা ভাষা-ভূগোলের একটা দায় থাকে, মায়ের দুধের মত। কিন্তু এখানেই শেষ নয়। শিল্প, সঙ্গীতের কোন দেশ নেই। পৃথিবীর সব মাটি-রোদ-ছায়া তার নিজের। ধ্বনিকে পৌঁছে দেয়াই তার কাজ, ভাষা বাহকমাত্র ।
হামেদী: অভিযোগ আছে, আধুনিক বাংলা সাহিত্য ইউরোপীয় নন্দন ও শিল্পান্দোলন দ্বারা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত। বাংলা সাহিত্য এই লিগ্যাসির বাইরে নিজস্ব সুর, স্বর ও চিহ্ন তথা নন্দনের উপর দাঁড়ানোর কোনো সম্ভাবনা দেখেন কি?
ফারাহ্: সেটা থেকে বাংলা সাহিত্য বেরিয়ে এসেছে অনেক আগেই। অস্বীকার করার নয় যে ইউরোপীয় সাহিত্যের প্রভাব ছিলো। তবে সেটা সারা বিশ্বের সাহিত্যেই ছিল। বাংলার রূপ-স্বর-গন্ধ এতটাই আলাদা ও প্রখর, যে তার নিজের তাল-লয়ে আপন মহিমায় নিজের অবস্থান শক্ত করে নেয়। তাকে ইউরোপের দিকে তাকাতে হবে না। কারণ তার আছে সমৃদ্ধ মধ্যযুগ।
হামেদী: মধ্যযুগের সাথে এক ধরনের বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়েছে আধুনিককালে এসে। সমৃদ্ধ মধ্যযুগ থাকার পরেও আধুনিক কবিরা বারবারই ইউরোপকে নমস্য হিসেবে দেখেছেন। সেখান বেরিয়ে আসার চেষ্টা অত জোরালো নয় এখনও সম্ভবত।
ফারাহ্: ইউরোপকে নমস্য বা গুরুত্ব দেয়ার ব্যপারটা মজ্জাগত, হয়তো কিছুটা থেকে গেছে। দাসত্ব থেকেই বোধহয়। শুধু সাহিত্যে নয়, সব ক্ষেত্রেই। দেখুন, সাহিত্যের গতিপথ একদিনে পরিবর্তন হয় না। সময়ের সাথে সাথে সেটা পরিবর্তন হবে হয়তো। অপেক্ষা করতে হবে আরো কিছুকাল। হাসান রোবায়েতের এখনকার কবিতা, যা বাংলার ঐতিহ্য বলেই মনে হয়। সুতরাং ইউরোপ একদিন হয়তো আর সেভাবে থাকবে না। কবি হাসান রোবায়েত, আমরা সত্যি গর্বিত।
হামেদী: যাই হোক, শেষ প্রশ্ন। গোড়ায় আপনি বলছিলেন, এখন অনেক ভালো কাজ হচ্ছে। সমসাময়িকদের মধ্যে কার কার কাজ আপনাকে মুগ্ধ করে?
ফারাহ্: একটা কথা বলে রাখি। আমি আসলে খুব মনোটনাস হয়ে যাই, নিজের লেখায়, এমন কি পাঠক হিসেবেও অন্যেও লেখা পড়েও। কবিতার ক্ষেত্রেও তাই হয়। ভিন্ন ঘরানার লেখা পছন্দ হয়, যাদের একে অন্যের সঙ্গে কোন মিল নেই। নতুন-পুরোনো মিলিয়ে বলতে পারি সব্যসাচী সান্যাল, ইমতিয়াজ মাহমুদ, দেলোয়ার হোসেন মঞ্জু, আন্দালীব, গল্পে-তানিম কবির, মোজাফফর হোসেন প্রমুখ। শাহ মাইদুল ইসলাম আর হুজাইফা মাহমুদের কবিতা নিয়ে আমি আশাবাদী। কবি নির্ঝর নৈঃশব্দ্য-এর কবিতাও দেশ-ভাষার আবহ নিয়ে, ভাল লাগে। আর একজন আছেন কবিতার রকস্টার, হাসনাত শোয়েব। কবিরাও উন্মাদ হয় আমরা জেনে গেছি, ভালো লাগে এই বেঁচে থাকা!
হুজাইফা মাহমুদ: কিছুক্ষণ আগে আপনি ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর একটা কথা কোট করেছিলেন, সেটা আমি বুঝি নাই। একটু ব্যাখ্যা করে বলবেন? মানে ওয়াক্লিক ল্যাটিন ছেড়ে ইংরেজিতে বাইবেল অনুবাদ করায় ইংরেজের ভাগ্যলক্ষ্মী সুপ্রসন্ন হয়েছিল কিভাবে!
ফারাহ্: এটা ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মতামত, দেখুন ধর্ম এমন একটা বিষয়, যার দ্বারা কোটি মানুষের কাছে পৌঁছে যাওয়া সহজ। আর ইংরেজিতে তার অনুবাদ, প্রচার তারপর বলতে পারেন প্রসার সেই অর্থে।
হুজাইফা: আচ্ছা। বুঝলাম। আপনি তো একজন মাল্টিট্যালেন্টেড মানুষ। কবিতা, গল্প, নাটক, চিত্রশিল্প, আরও অনেক দিকেই আপনার পদচারণা আছে। আপনার সাথে শিল্প-সাহিত্যের অনেক বিষয় নিয়েই আলাপ চলতে পারে। আপনি নিজে কোন বিষয়ে বেশি আগ্রহবোধ করেন!
ফারাহ্: নিজের ভেতর অনেক সেগমেন্ট থাকে। যখন যা চলে আসে কলমে, তাই লিখি। কমার্শিয়াল কাজও করার ইচ্ছা আছে। এই ধরনের কাজে কিছু চ্যালেঞ্জ থাকে। সৃজনশীলতাকে দমিয়ে রাখবার চ্যালেঞ্জ! তবে সেটা সব কমার্শিয়াল কাজের ক্ষেত্রে ঠিক নয় যদিও।
হুজাইফা : ইদানিং কী লিখতেছেন?
ফারাহ্: গানের লিরিকস নিয়ে কিছু কাজ করছি। গিরিশ চট্টোপাধ্যায় গাইবেন। রাগ-মিশ্রিত সঙ্গীত করেন তিনি। গল্পে মাতাল হয়ে আছি। লিখছি, তবে বইটা এবার আসবে না বোধহয়। আর টেলিভিশনে নাটকের জন্য লেখা। উপভোগ করছি!


আমাকে উন্মাদ বলা যেতে পারে! কোলাজের ছোপ ছোপ দাগ! ইনটিউশন, ইলিউশন কাজ করে। এটা মনোটনাস মাইন্ডেরও একটা বহিঃপ্রকাশ।


হুজাইফা: লেখালেখির ক্ষেত্রে আপনি পাঠকের ব্যাপারটা কিভাবে দেখেন? তাদেরকে বিবেচনায় রাখেন, নাকি সম্পূর্ণ নিজের মতো করেই লেখেন? প্রশ্নটা সিলি হলেও, আমি একটা জিনিস বুঝতে চাইছি। যে কারণে অনেককেই প্রশ্নটা করি!
ফারাহ্: বোধের স্তর পাঠকভেদে ভিন্ন, আমি সেদিকে যাই না। এলিয়টের কবিতাকেও প্রলাপ বলা হয়েছিলো কোথাও কোথাও। শিল্পীরা নিজের মাধুর্যকে শানিত করে, নিজস্ব স্বর পৌঁছে দেয় পাঠকের কাছে। স্নায়ুযুদ্ধ হয় নিজের সঙ্গে, ভাষাকে কী করে লেপ্টে ফেলা যায় শব্দ, ধ্বনিতে। পাঠক কীভাবে আস্বাদন করবেন তার অপেক্ষায় থাকে না প্রকৃত শিল্পকর্ম।
হুজাইফা: যথার্থ বলেছেন! আপনার কবিতার ব্যাপারে আমার একটা অবজার্ভেশন আছে। সেটাকে সংক্ষেপে যদি বলি তাহলে বলতে হয়, আনপ্রেডিক্টেবল। আপনার শব্দচয়ন, দৃশ্যনির্মাণ, বোধের বয়ান, সবকিছুকেই আমার কাছে আনপ্রেডিক্টেবল মনে হয়। এটা আমি ইতিবাচকভাবেই দেখছি, এবং এটা আসলে আপনার একটা সাইনমার্কও হতে পারে! আপনার ভাবনার জগৎটা রিড করা মুশকিল ব্যাপার। পাঠকের সামনে যা দেবেন তা নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয় আরকি! এমনকি আপনার বইয়ের নামটাও আনপ্রেডিক্টেবল। এটার অর্থ ধরতে আমার বহুদিন লেগেছে! হা হা হা।
ফারাহ্: অনেকটাই ঠিক। আমাকে উন্মাদ বলা যেতে পারে! কোলাজের ছোপ ছোপ দাগ! ইনটিউশন, ইলিউশন কাজ করে। এটা মনোটনাস মাইন্ডেরও একটা বহিঃপ্রকাশ। শূন্যতা থেকে যে কোন সঙ্গীত তৈরি হয় তাকে নিজের মধ্য বড় হতে দেয়া! এটাই আমার কবিতা, আমার জগৎ! বাড়িতে অন্যান্য অনেক বই ছিল, সাহিত্যের। রুশ কিছু বই পেয়েছিলাম। আইনের বই, পুরোনো দলিল এইসব পড়ে পড়ে আমার দিন কাটতো, ক্লাস ফোর-ফাইভের দিকে। সম্ভবত ওখান থেকেই আমার গদ্য লেখার প্রতি ঝোঁক তৈরি হয়। দলিল-দস্তাবেজ মাথায় পেরেকের মতো ঢুকে আছে! তবে আমি কিন্তু দলিল লেখক হতে চেয়েছিলাম! খুব কী দূরে সরে গেছি?
হুজাইফা: না, দূরে সরে যান নাই। অবচেতনার দলিল লেখতেছেন কবিতা আর গল্পে! আমার পাঠাভিজ্ঞতা দিয়ে আপনার কবিতাকে কোন ছাঁচ বা ঘরানায় ফেলতে পারি না। সব ঘরানাকেই একসাথে দুমড়ে-মুচড়ে চলে যান! বরং গল্পগুলোর ক্ষেত্রে বলা যায়, এসবে অনেকটা জাদুবাস্তবতার প্রভাব লক্ষ্যণীয়! আপনার নিজেকে কারো দ্বারা প্রভাবিত মনে হয়েছে কখনো?
ফারাহ্: কোন লেখকের প্রতি মুগ্ধতার সীমানা পেরোতে চাই না আমি। প্রভাবিত না হয়ে পড়াই মূল উদ্দেশ্য। জাদুবাস্তবতা তো আছেই। তাও নিজের চারিপাশ, নিজস্ব স্বরে থাকি, কথা বলি, অনেকটা প্রার্থনার মত। শুধু জীব নয়, জড়ের সঙ্গেও তুমুল মিথস্ক্রিয়া হয় আমার! সেটা উপভোগ্য!
হাসনাত শোয়েব: একটা জায়গায় দেখলাম আপনি কবিতাকে ইউরোপ থেকে মুক্ত করার কথা বলছেন। আমার প্রশ্ন হচ্ছে, কবিতাকে ইন্টেনশনালি ইউরোপ থেকে মুক্ত করার এই মিশনারি কাজ আদৌ দরকার আছে কিনা? যেখানে প্রযুক্তি পুরো বিশ্বকে ছোট করে এনেছে এবং এক করার কথা বলছে?
আর কবিতা তো ব্যক্তির একান্ত ভালো লাগার বা বোঝাপড়ারর বিষয়। অন্তত, আমার কাছে। সেক্ষেত্রে সেটি আঞ্চলিক নাকি বৈশ্বিক সেই বিবেচনা কতটুকু গুরুত্বপূর্ণ? একটা কবিতা ভালো না লাগলেও শুধু আঞ্চলিক বলে আমি কেন পড়বো?
ফারাহ্: প্রথমত শিল্পে, সাহিত্যে সঙ্গীতে পূর্ব ও পশ্চিম খুবই ডিসটিঙ্কট, সম্পূর্ণ আলাদা পরিচয় বহন করে। সেটা অস্বীকার করার কোন উপায় নেই। কবি মোস্তফা হামেদীর প্রশ্ন ছিল “বাংলা সাহিত্য ইউরোপীয় নন্দন ও শিল্পান্দোলন দ্বারা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত। বাংলা সাহিত্য এই লিগ্যাসির বাইরে নিজস্ব সুর, স্বর ও চিহ্ন তথা নন্দনের উপর দাঁড়ানোর কোনো সম্ভাবনা দেখেন কি? ”
আমি মনে করি বাংলাসাহিত্য আপন মহিমায় নিজের অবস্থান শক্ত করে নিয়েছে। এর মানে কিন্তু ইউরোপীয় ও অন্যান্য পশ্চিমাসাহিত্য থেকে বিচ্ছিন্নতা নয়। সৃজনশীল মানুষ যেকোনভাবেই নিজেকে প্রকাশ করতে পারেন, কবি-সাহিত্যিকের চারণক্ষেত্র সারাবিশ্ব। গার্সিয়া মার্কেসের কথাই ধরুন, পৃথিবী কতশত ভাষায় তাকে অনুবাদ করা হয়েছে, নানা বর্ণ-গোষ্ঠির মানুষ তাকে পড়ছে। কিন্তু কোন এক নির্ঘুম রাতে আমার কল্পনায় মার্কেস সালভেসা (বিয়ার) খেয়ে সারারাত গলির মোড়ে গিটার হাতে গান গাইছেন, স্প্যানিশে! এই আমুদে ছন্নছাড়া ল্যাটিনো জীবনকে আমার ঈর্ষা হয়। অবশেষে মানুষ তাঁর শেকড়ের ভাষায় কথা বলে, কাঁদে, গান গায়, ছবি আঁকে সেই মাটির রূপ-রস-গন্ধের ছুরিতেই।
তবে আগেই বলেছিলাম যে, আন্তর্জাতিকভাবে বাংলা ভাষা (বা পৃথিবীর অন্য যেকোন ভাষা) ও তার সাহিত্যকে তুলে ধরতে, বিশ্বে পৌঁছে দিতে সমসাময়িক কাজের অনুবাদ হওয়াটা খুব জরুরি, সাহিত্যের মূলস্রোতের সঙ্গে মিলে যেতে এর বিকল্প আর কিছু নেই।
শোয়েব: আপনার প্রথম বইয়ের মানে বই হিসেবে প্রকাশ হওয়ার পর সম্ভবত আমিই প্রথম পাঠক। কারণ, আমি তখন সেই প্রেসে উপস্থিত ছিলাম আপনার সেই বইয়ের কবিতাগুলা আমাকে নতুন একটা কিছুর স্বাদ দিয়েছে। যা একেবারেই অভিনব। আমি পুরো বইটি সেখানে বসেই শেষ করেছিলাম। আপনার কবিতাগুলো ছিলো একেবারেই নতুন অভিজ্ঞতা আমার জন্য। সেখানে আমি একটা ইনসেন বিউটি দেখেছি নাম থেকে শুরু করে সবকিছুতে। অনেককে আমি এই বই পড়তেও দিয়েছিলাম। কিন্তু আপনার দ্বিতীয় বইয়ে একই সিগনিচারটা অনেক গুছানো মনে হয়েছে, কিছুটা সতর্কও। এইটা কি ইচ্ছাকৃত? নাকি ফাকিং ম্যাচিউরিটি ধরে নেব? যেটা আপনি না চাইলেও আসছে।
ফারাহ্: এটা আমার পরম পাওয়া যে আমার খুব পছন্দের একজন কবি আমার প্রথম পাঠকই নন বরং ইনসেন বিউটিকে খুঁজে পেয়েছিলেন! আপ্লুত আমি। ঐন্দ্রজালিক কোন ক্ষমতা আমার নেই। আশ্চর্য এক শূন্যতার বেড়াজালে ডুবে থাকা মানুষ আমি। শূন্যতা থেকেই কাব্যময়তা। খুব সহজেই মনোটোনাস হয়ে যাই। অস্থির এক সময় পার করি! দ্বিতীয় কবিতার বই ‘পৃথিবীর নিচুছাদ প্রেম’ এমন কোন এক অস্থির আবদ্ধ সময়। এখনও ভাঙছি-গড়ছি নিজেকেই। হোঁচট খেতে খেতে একটা ভাষা হয়তো আমার তৈরি হয়েছে। কিন্তু সে ভাষার মুলমন্ত্রই ‘বদলে যাও, ভেঙে ফেলো পুরোনো দালান, কন্ঠস্বর’। পাঠক কি আর জানে বেঁচে থাকার জন্য অক্সিজেনের খোলা জানালা নয়, বরং কারও কারও কবিতার করিডোর খুলে নিতে হয়।
শোয়েব: আরেকটা প্রশ্ন হচ্ছে, আপনি নাটকের জন্য গল্প লিখছেন। সেক্ষেত্রে এটাকে অন্য মাধ্যমগুলো থেকে কিভাবে আলাদা করবেন? এর সুবিধা-অসুবিধাগুলো কী?
ফারাহ্: আগেই বলেছিলাম কমার্শিয়াল কাজে সৃজনশীলতাকে দমিয়ে রাখবার একটা চ্যালেঞ্জ থাকে! তবে কিছু ব্যতিক্রম আছে। বাংলাদেশের নাটকে ভাল কাজের অনেক সুযোগ থাকা সত্ত্বেও নতুনদের টিকে থাকবার জন্যে খুব লড়তে হয়। আমি আশাবাদী ভবিষ্যতে নিজের সিগনেচার কিছু গল্পকে নাট্যরূপ দেয়ার। ২০০৮ এ আমার লেখা প্রথম নাটকটি মঞ্চস্থ হয়েছিল। দর্শকের তাৎক্ষনিক অনুভূতির রেশ পাওয়া ছাড়াও অভিনয়শিল্পীদের নিবিষ্টতা সত্যি উপভোগ করার মতো। টেলিভিশন নাটকে কোটি মানুষের কাছে পৌঁছে যাওয়া ছাড়াও বিশ্বায়ন ও আকাশ-সংস্কৃতির বর্তমান আগ্রাসন থেকে কিছুটা হলেও নিজেদের অবস্থান দৃঢ় করবার দায়বদ্ধতা থেকেও নিজেকে বাংলা নাটকের সঙ্গে যুক্ত রাখতে চেয়েছি।

লেখা সম্পর্কে মন্তব্য

টি মন্তব্য