বিশ্বসাহিত্যের পাঁচটি অনুগল্প | ভাষান্তর: তন্ময় হাসান

পঞ্চম অধ্যায় – আর্নেস্ট হেমিংওয়ে

সকাল সাড়ে ছয়টায় মন্ত্রীসভার ছয়জন মন্ত্রীকে গুলি করা হয় হাসপাতালের পাশে দেয়ালে। সামনের আঙিনায় ছোপ-ছোপ গর্তে কাদা-পানি,  গত রাতের বৃষ্টি থেইকা। মরা পাতাগুলা ভিজা অবস্থায় উঠান পার করতে পারতেছে না বাতাস থাইকাও। ঢাইলা বৃষ্টি হইতেছে চারিদিকে। হাসাপাতালের সব দরজায় গালা লাগানো। মন্ত্রীগো মইধ্যে একজনরে টাইফয়েডে ধরছিলো।  দুইজন সৈনিক যায়ে তারে ধইরা ধইরা নিচে বয়ে আনলো। দেয়ালের সাথে লোকটারে দাঁড় করানোর চেষ্টা চলতেছিলো, কিন্তু সে বারবার কাদা-পানিতে বইসা পড়ে। বাকী পাঁচজন ভদ্দরলোকের মতই দেয়ালের সাথে দাঁড়ায়ে ছিলো।  অফিসার যে ছিলো, সৈনিকগুলারে ডাইকা বলে এতো চেষ্টার তো কিছু দেখতেছি না। 

প্রথম রাউন্ড গুলির পর অসুস্থ লোকটা হাঁটুর উপর মাথা রেখে কাদার মধ্যে বসেছিলো।

 

বিধবা হবার প্রথম বছর – জয়েস ক্যারেল ওয়েটস

আমি নিজেরে জিন্দা রাখছি।

 

ছাইড়া দাও – ফ্রান্জ কাফকা

খুব ভোর,  রাস্তাগুলা মরুভূমির মতো শূন্য আর পরিষ্কার। আমি স্টেশনের দিকে হাঁটতেছি। পথেই টাওয়ারে যে বড় ঘড়ি লাগানো আছে তার সাথে সময় মিলাইতে গিয়া দেখি আমি যতটা ভাবছিলাম তারচে বেশি দেরি হইয়া গেছে। এইটা আমার মাথার মধ্যে ঢুকতেই আমি রাস্তা সম্পর্কিত স্বল্প জ্ঞান হারায়ে ফেললাম। স্বল্প বলতেছি কারণ,  শহরে তুলনামূলক নতুন আমি, সব রাস্তা এখনো চিনে উঠতে পারি নাই। কপাল জোরে একজন পুলিশ দেখলাম রাস্তার ওইপারে খাড়ানো, দৌড়ায়ে তার কাছে গেলাম। দম নিতে-নিতে তার কাছে স্টেশন যাবার রাস্তা শুনতে চাইলাম। সে হাসলো আর বললো, “আমার কাছে স্টেশনে যাবার রাস্তা শুনতে চাও? ” আমি বললাম হ্যাঁ, নিজে থেকে তো খুঁজে পাচ্ছি না। “ছাইড়া দাও! ছাইড়া দাও!” বলে সে একটা ইডিয়টের মতো মুখ ঘুরায়ে নিলো, যারা নিজেদের হাসির সাথে একা থাকতে চায় তাদের মতো। 

 

টেইলর সুইফট – হিউজ বেম স্টেইনবার্গ

তুমি প্রেমে পড়ছো; খুব জোস, ফোনে কি সব নাড়া দিয়া অনলাইন অর্ডার করলা, পরের দিন তোমার বাড়িতে পৌঁছায় দিয়া গেলো টেইলর সুইফটের ক্লোন। বেমানান হইতে যাবে কেনো? এইটাই তো সবকিছু যা তুমি চাইতা! তাকে কাছে পাইয়া তোমার মুখে সুখ লেগে আছে। সে সব গানও পারে, আর গায় শুধু তোমার জন্য। তোমার টেইলর সুইফটকে ঘুম পাড়ায়ে (তাড়াতাড়ি, কারণ কালকে গুরুত্বপূর্ণ দিন), উঁকি দিলা মিস রোসেনব্লেটের বাগানে। সেখানে দেখলা তোমার বেস্ট ফ্রেন্ড টিনা, যার কাছে আছে তিনটা টেইলর সুইফট, তারা সবাই মিলে পার্টি করছে। একটা টেইলর সুইফট সুইমিং পুলে, একটা সিংহাসনের মতো চেয়ারে বসে আছে, একটা টেইলর সুইফটের তো ডানাও আছে। হিংসায় ভরে উঠলো তোমার বুক, মাথা জ্বালা করা শুরু করলো। তুমি দেখলা টিনা তো টেইলর সুইফটদের পাত্তাই দিচ্ছে না, একটার সাথে সেক্স করতে ব্যস্ত। এতো চিল্লাচিল্লি তোমার আর ভালো লাগে না, বমি আসে, ঘেন্না হয়।  তুমি এখন টেইলর সুইফটকে ঘৃনা করো। 

 

ভাঁড়ের যুদ্ধ – মিয়া কাউতো

একবার দুই জোকার নিজেদের মধ্যে ঝগড়া করছিলো।  মানুষ দাঁড়াইতো আর অবাক হয়ে তাদের দেখতো। 

– কি হইছে?  তারা প্রশ্ন করতো।

– কেন? দুই ভাঁড় ঝগড়া লাগাইছে। 

কেইবা তাদের পাত্তা দিবে? আর পাত্তা দেবার আছেই কি? ঝগড়াই ছিলো পাগলের। আবোল-তাবোল। পুরোদিন তারা ঝগড়া করে কাটিয়ে দিলো।

 

পরেরদিন সকালে তাদেরকে আবার দেখা যায় একই অবস্থায় একে-অপরকে কথায় হারাবার চেষ্টা। পথচারী যারা হেঁটে যাচ্ছিলো, তারা অবাক হয়ে তাদের ঝগড়া দেখতো। পারফর্মেন্স ভেবে কেউ-কেউ কয়েকটা পয়সাও ছুঁড়ে দিতো।

তৃতীয় দিনে ঝগড়া হাতাহাতিতে পরিনত হইলো। ঘুষি, লাথি সবই চলতে শুরু করলো। বাচ্চারা ভীষণ মজা পাইলো, কেউ-কেউ অনুকরণের চেষ্টাও করলো। বিনোদনের প্রতিদান হিসেবে বাচ্চারা তাদের পকেট মানিও দিয়ে দিলো। 

 

চার নম্বর দিনে তাদের মুখে মারের দাগ ফুটে ওঠা শুরু করলো। অল্প রক্তও বাইর হচ্ছিলো। বাচ্চারা ভয় পাইলো, তাদের বাপ-মা আশ্বস্ত করলো যে এইটাও নাটকেরই অংশ।

পঞ্চম দিনে, একটা জোকারের হাতে দেখা গেলো লাঠি, তার সুবিধা নিয়ে মাথায় একটা বাড়ি দিতেই খসে পড়লো লাল নীল রঙের নকল চুল। ক্ষেপে দিয়ে অপরজন একটা ব্যাট জোগাড় করলো আর চালাতে শুরু করলো। পথচারীর মধ্যে একজন ব্যাটের বাড়ি খেয়ে পড়ে গেলো আর কিছুক্ষণ পর মারাও গেলো। 

 

মানুষ কথা বলাবলি শুরু করলো। কেন কিভাবে ইত্যাদি ইত্যাদি। দুই দলে ভাগ হয়ে গেলো সবাই। দুই জোকারের দল ভারী হতে থাকায় আরো মানুষ আহত হতে শুরু করলো। লোকের মুখে চলতে থাকলো দুই ভাঁড়ের ভাঁড়ামোর গল্প। সবাই খুব হাসলো। কেউ-কেউ নিজে গিয়ে ঘটনার সত্যতা পরীক্ষা করে আসলো; আর যারা গিয়েছিলো সবাই ফিরে আসে নিজেদের মতন সত্য নিয়ে। এই মতের অনৈক্য থেকে পাড়াগুলা আলাদা হতে শুরু করলো। কেটে গেলো দুই সপ্তাহ।

 

বিশতম দিনে হঠাৎ গুলির আওয়াজে সবাই চমকে ওঠে। সব বয়সের মানুষের মধ্যে পায়চারী করে ভয় ঢুকে পড়লো। কেউ জানে না কে চালিয়েছে এই নামহীন গুলি। সবাই যে যার মত সুরক্ষা কবজ তৈরি করতে থাকলো। গুলি বাড়তে থাকলো, ফলত শহরজুড়ে বাড়তে থাকলো মৃতের সংখ্যা। পুরো শহর তখন রণক্ষেত্র।

 

পরের মাসের শুরুতে  শহরের প্রায় সবাই হয় মারা পড়েছে নয়তো পালিয়ে গেছে। সেদিন সকালে দুই জোকার মুখোমুখি বসলো।  ছেঁড়া জামা, শরীরের বিভিন্ন ক্ষত বেয়ে রক্ত চুঁইয়ে পড়া খুব ভালো করে দেখে নিলো।  হঠাৎ এই ধ্বংসস্তুপে শোনা গেলো অট্টহাসি।  হাতে হাত মিলিয়ে জোকাররা কুড়িয়ে নিলো সব কয়েন আর হাসতে থাকলো। তারপর এই পরিত্যক্ত শহর ছেড়ে তারা চলে গেলো।  চলে গেলো নতুন শহরের খুঁজে।

শেয়ার করুন

লেখা সম্পর্কে মন্তব্য

টি মন্তব্য

%d bloggers like this: