home গদ্য বাংলা কবিতা ও রক মিউজিক ।। উপল বড়ুয়া

বাংলা কবিতা ও রক মিউজিক ।। উপল বড়ুয়া

                                                 উৎসর্গ : তুমুল রকার রূম্পা হাওলাদারকে

 

ছোটবেলায় আমরা তখন মাটিতে বসে ১৪ ইঞ্চি নিপ্পন সাদাকালো বিটিভির দিকে হা করে তাকিয়ে থাকতাম। শুক্রবার বা এমনি অন্য কোন দিবস উপলক্ষ্যে বিটিভির বদান্যতায় জনপ্রিয় বিভিন্ন অনুষ্ঠান যেমন হানিফ সংকেতের ইত্যাদি, আব্দুন নূর তুষারের শুভেচ্ছা বা  আজকাল ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানের মতো কমেডি ও হাফ কালচারাল অনুষ্ঠান ছিল জনপ্রিয়তার তুঙ্গে। স্বাধীনতা পরবর্তী মানুষ গ্রামের দিকে তখন বিটিভির উছিলায় হালকা-পাতলা শহুরে কালচারের সাথে পরিচিত হচ্ছে। তখন গ্রামে গ্রামে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন ছিল। তারা দলবদ্ধ হয়ে এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে বা উপজেলা বা জেলা শহরে বিভিন্ন সময় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করতে যেত। পরবর্তীতে বিটিভি চলে আসাতে অর্ধ-নব্বই সালের পরে তা ধীরে ধীরে লোপ পেতে থাকে। অর্থাৎ কালচার তৈরি হয় আরেক কালচারকে ধীরে ধীরে গ্রাস করে। তো, তখন বিটিভিতে ইত্যাদি, শুভেচ্ছায় মাঝেমধ্যে আজম খান, জেমস, হাসান, মাইলস, এলআরবি, প্রমিথিউস পারফর্ম করতেন। পারফর্ম করার চেয়ে বলা যায় শিল্পী স্টেজে দাঁড়িয়ে আছে আর পর্দায় দেখা যাচ্ছে ধারণকৃত ভিডিও। আইয়ুব বাচ্চুর ‘ঠিকানা শুধু এক সমাধি/সাড়ে তিন হাত মাটি’, জেমসের ‘মা’ , আজম খানের ‘সময় এখন বর্ষাকাল/হরিণ খামচায় বাঘের গাল’ বা মাইলসের ‘জন্মদিন’ আমি প্রথম শুনি বিটিভির স্টেজে। আরেকটা গান খুব হিট হয়েছিল ঐসময়। বড় ভাইরা আড্ডা দিতে দিতে গাইতো খুব। ‘এই দেশে এক শহর ছিল/শহরে এক রাস্তা ছিল/ রাস্তার ধারে এক বাড়ি ছিল/ বাড়ির নাম এলোমেলো।’ ইত্যাদিতেই প্রথম প্রচার হয়েছিল গানটা। তখন রক বা পপ উপলব্ধির বয়স নয়। অনেক পরে মিউজিক পাগলদের আড্ডায় এবং ইন্টারনেটের বদান্যতায় আমরা জেনেছি গানের জনরা সম্পর্কে। তো, তখন আমাদের আশেপাশে যারা একটু বয়স্ক লোক থাকতো তারা তেমন একটা রক মিউজিক পছন্দ করতো না। বলতো, মাইয়াদের মতো চুল লম্বা লোকজন, ডাইলখোর, খালি চিৎকার মারে (ড্রাগের ক্ষেত্রে তখন ডাইল অত্যন্ত জনপ্রিয়)। গানের ‘গ’ বোঝে না। মাঝেমধ্যে তারা ভল্যিয়ম কমিয়ে দিত। না হলে ঠেলে তুলে দিত। দেশে তখন রক মিউজিকে তোলপাড়। গ্রামে ঢুকতেছে ধীরে। বিটিভির রুচি নিয়ে। কবিতা বহুদূর।

বাংলাদেশে রক মিউজিক একটা সময় ডাউনটাউন থাকলেও পরবর্তীতে তা ছড়িয়ে পড়ে মফস্বল থেকে গ্রামে। এবং এত এত বাধা সত্ত্বেও বাংলার রাবীন্দ্রিকরা রক মিউজিককে দাবায়া রাখতে পারে নাই। রবীন্দ্রসঙ্গীত/নজরুলসঙ্গীত আপনি খুব চালিয়ে দিতে পারবেন যত্রতত্র। এমনকি ফিল্মি গানও। কিন্তু রক মিউজিক বা আমরা যারা জানতাম ‘ব্যান্ড’ তা যেখানে-সেখানে স্টার্ট সম্ভব ছিল না। তার কারণ, মানুষ মনে করতো, একদল উচ্ছেন্নে যাওয়া পোলাপাইন যেমন খুশি তেমন বাজিয়ে গান করতেছে টাইপের। কিন্তু রক মিউজিক বা বাংলা ব্যান্ড; তার মিউজিক থেকে শুরু করে ভাষাগত দিক দিয়ে ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। রাবীন্দ্রিক বলয় ভেঙে ত্রিশের কবিকূল যেমন বাংলা কবিতায় আলাদা ব্যঞ্জনা নিয়ে আসার পক্ষপাতী ছিলেন তেমনি বাংলার রক মিউজিশিয়ানরা প্রথম থেকেই চেয়েছেন শ্রোতাদের কান তৈরি করে দিতে। সেই বলার স্বরটা আপনার হয়তো মনে হবে চিৎকার। কিন্তু ‘রেললাইনের ঐ বস্তিতে/জন্মেছিল একটি ছেলে/মা তার কাঁদে/ ছেলেটি মরে গেছে/হায় আমার বাংলাদেশ…’ তখন এসব কথাবার্তা কেবল আবেগসর্বস্ব হয়ে দাঁড়ায় না; একটা বিপ্লব ও নতুন প্রজন্মের স্তম্ভ হয়ে দাঁড়ায়।

বাংলায় রক মিউজিক জন্মলগ্ন থেকেই মানুষের সমালোচনা সয়ে আসছে। পাশ্চাত্য অনুকরণে বা পাশ্চাত্য ইন্সট্রুমেন্ট নিয়ে গান করার কারণে বা পাশ্চাত্য কালচার ফলো করার কারণে এখনো বাংলার রকাররা; বাংলার হ্যাডভ্যাঙ্গাররা মানুষের গালি শোনেন। মিউজিকের আসলে কোন দেশ নেই। তার অজস্র উদাহরণ আনা যায়। রবি ঠাকুরের গানে বা নজরুলের গানে কি বিদেশী প্রভাব নাই? গান তো গানই। কালচারও পাল্টায় ধীরে ধীরে। তবে রকের ভেতরে যে আগুন বা আন্দোলন তাকে কি অস্বীকার করা যাবে?

পঞ্চাশ থেকে সত্তর দশক পর্যন্ত অর্থাৎ কবি শহীদ কাদরী থেকে রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বা হেলাল হাফিজ যে প্রেম দ্রোহ নাগরিক চেতনা-আবেগ ও গণবিপ্লবী কবিতা লিখে জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন, পরবর্তীতে বাংলা রক মিউজিক সেই জনপ্রিয়তায় ভাগ বসায়। ভাগ বসায় বলতে মিউজিক প্রেম-দ্রোহের জায়গাটা নিয়ে নেয়। ধরেন, গিটার, ড্রামস, কি-বোর্ড নিয়ে গীতিকবিতায় বসিয়ে দেয়া হয়েছে সুর। এবং এটাও বুঝতে হবে বাংলা রক মিউজিক ও বাংলা কবিতা সাংঘর্ষিক নয় বরং তারা পরস্পরের আত্মজ। জেমসের জন্য লেখা লতিফুল ইসলাম শিবলীর ‘প্রিয় আকাশী’, কবি শামসুর রাহমানের ‘সুন্দরীতমা’ কিংবা ফিডব্যাক লাইন আপের মাকসুদের গাওয়া গীতিকবিতা ‘মনে পড়ে তোমায়/মনে পড়ে অপারগতায়’ এসব আদতে যতটুকু গান ততটুকুই কবিতা। আশি এবং পরে নব্বই দশকের বাংলা কবিতা যখন ফেলে আসছে তার বর্ণনামূলক/ন্যারেটিভ ঢঙ তখনই কিন্তু তৈরি হচ্ছে বাংলা রক গানের ন্যারেটিভ স্টাইলের লিরিক। বাংলা কবিতাও এখন যেমন আরও শহরকেন্দ্রিক, কম্পেক্টেনেসের ভেতর যাত্রা করেছে তেমনি বাংলা রক মিউজিকেও সেই ধারার প্রকাশ বোঝা যাচ্ছে। মানে, “আমার শৈশবের মত দামী, আমার কান্না জড়ানো গান,/মাথা উচু সেইন্ট গ্রেগরী আমার, সময়ের টানে ম্লান ।/আমার পরিচিত লাস্ট বাস, আমার ভাঙ্গাচোরা নিঃশ্বাস,/ব্রাদার চার্লসের চুইংগাম, আমার রক্ত আমার ঘাম,/আমার লাস্ট বাসে বাড়ি ফেরা, মাথা তুলবার তাড়া,/আমার জাহাজের পাটাতন, ছেড়া নোঙর, ছেড়া মন,/ছেড়া নোঙর…” এসব লিরিক যেমন আপনি বিশ বছর আগের রক জেনারেশনের কাছে চিন্তা করতে পারেননি তেমনি এখন হয়তো ‘হৃদয় জুড়ে যত ভালবাসা’, `ঐ দূর পাহাড়ের ধারে দিগন্তেরই কাছে/নিঃসঙ্গ বসে একটি মেয়ে/গাইছে/আপন সুরে, বা `বসে আছি একা/কাঁচা রোদ বিকেলে উদাস/বৃষ্টি শেষে রূপালী আকাশ’ এর মতো গান তৈরি হবে না।

লেখা সম্পর্কে মন্তব্য

টি মন্তব্য