বাংলাদেশের গ্রাফিতি বিষয়ে মানস চৌধুরী’র ইন্টারভিউ

মানস চৌধুরী। লেখক, শিক্ষক, গায়ক, অভিনেতা এবং আরো অনেক কিছু। বেশ কয়েক বছর আগে সুবোধ গ্রাফিতিটা পপুলার হয়ে উঠলে, মানস চৌধুরী সুবোধ নিয়ে একটা ইন্টারভিউ দেন কোনো একটা টিভি চ্যানেলে। ভিডিও ইন্টারভিউ। অই ইন্টারভিউতে গ্রাফিতি নিয়ে ওনার চিন্তা-ভাবনাগুলো ছিল বেশ ইন্টারেস্টিং। অইটা দেখে  ওনাকে একদিন প্রস্তাব দিই এই ইন্টারভিউর। উনিও রাজি হয়ে যান। মেইলে প্রশ্ন পাঠাই। নানান ব্যস্ততার পরও, অবাক করে দিয়ে দ্রুতই উনি প্রশ্নগুলার উত্তর পাঠায় দেন, ফিরতি মেইলে। ওনাকে তখন একটা সময়ও দিছিলাম। বলছিলাম যে দ্রুতই আমরা ইস্যুটা পাবলিশ করতেছি। কিন্তু কথা রাখতে পারি নাই। নানাবিধ কারণেই তা সম্ভব হয়ে উঠে নাই। এ জন্য ওনার কাছে দুঃখিত। আশা করি এইবার আমরা সত্যই সত্যই পাবলিশ করতে পারবো। ধন্যবাদ মানসদাকে, এই উদ্যেগের সাথে থাকার জন্য।

— রাজীব দত্ত 


সম্প্রতি ‘সুবোধ’ নামে একটা গ্রাফিতি পপুলার হয়েছে। এর আগে এখানে তো গ্রাফিতির পপুলারিটি এভাবে ছিল না। এর আগে থেকে এখানে চিকা মারার অভ্যাস চালু ছিল। চিকাকে কি এখানকার গ্রাফিতি বলা যাবে? বা গ্রাফিতিকে কি এখানকার চিকা বলা যাবে?

মানস চৌধুরী: যাকে গ্রাফিতি বলা হয়ে থাকে, সেই সংজ্ঞা ধরে আগালে এখানে অবশ্যই গ্রাফিতি জনপ্রিয় ছিল না। কিন্তু আরেকটা বিষয় হলো গ্রাফিতি, কিংবা সুবিধার্থে যদি ব্যঙ্গাত্মক দেয়ালচিত্র বলি, সেগুলোর চর্চাই ছিল খুব সীমিত। স্বাধীন বাংলাদেশে বরং এরশাদের সময়টাকেই সীমিত আকারে গ্রাফিতি-চর্চার কাল বলা যায়। চর্চাটা কেন দাঁড়ায়নি, সেটা বিশ্লেষণ নিশ্চয়ই করা যায়। অন্য কোনো এক সময়ে বিশদ করার ভরসায় এটুকু বলতে চাইব যে ঢাকা মহানগরের সামগ্রিক শিল্প-সংস্কৃতি-সাহিত্যের মুডের সঙ্গেই তা সম্পর্কিত। আমি প্রায়শই বোঝানোর জন্য যাকে ‘আর্টকালচারওয়ালা’ বলে থাকি, সেই মহলটা, শিথিল এক মোর্চা হিসাবে দেখলে গড়ে বেরসিকভাবে বিকশিত হবার ইতিহাস আছে। কিন্তু আসলেই এই প্রসঙ্গে বিশদ করার দরকার পড়বে। তবে এক্ষেত্রে নানান বামপন্থী সংগঠনের দেয়ালচিত্র আঁকার অভ্যাসটা একদম যায়নি; বরং গত ২/৪ বছরে মধ্যবর্তী একটা সুপ্তদশা ডিঙিয়ে আবারো বিকশিত হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশ, জাহাঙ্গীরনগরের কিছু দেয়াল, রাজশাহী ও অন্যান্য ক্যাম্পাসেও হয়েছে সেসব। এখানেও, সংজ্ঞায়িত গ্রাফিতির ব্যঙ্গধর্মিতা গুণগতভাবেই অনুপস্থিত। একটা দুটো ব্যতিক্রম বাদ দিলে এগুলো রূপকাশ্রয়ী ‘সিরিয়াস’ চিত্রকর্ম যেগুলোতে ‘শৃঙ্খল’ ‘গণতন্ত্র’ ‘প্রগতি’ ইত্যাদি রূপকায়িত করার চেষ্টা থাকে। শ্লেষ বা ব্যঙ্গ খুব অল্প চিত্রের উপজীব্য। ‘সুবোধ’ সিরিজও কিন্তু কাব্যধর্মী; শ্লেষের চেয়েও হাহাকার সেখানকার মুখ্য স্বর।

চিকাকে এখানকার গ্রাফিতি, কিংবা উল্টোটা, বলার একটা সংজ্ঞা-সঙ্কট থেকে যায়। চিত্রধর্মিতার অভাব। তবে নামকরণ তো প্রায়শই একটা অনুকরণ-তৎপরতা। সারা বিশ্বেই। একজন দুইটা ছক্কা মারার পর একজন ক্রিকেটারকেও “বাংলাদেশের টেন্ডুলকার” বলার উচ্ছ্বাস (তথা হীনমন্যতা) লক্ষ্যণীয়। ফলে কাকে কী নামে ডাকা হবে, একটা নির্দিষ্ট সময়কালে ডাকা হয়ে থাকে, সেগুলো নিয়ে আমার বিশ্লেষণ কাজ করে; দুর্ভাবনা নয়। কোনো সংজ্ঞারই শর্তসাপেক্ষ থাকা ছাড়া উপায় নেই। যদি গ্রাফিতির একটা শর্ত হয় চিত্রধর্মিতা তাহলে চিকা গ্রাফিতি নয়। আবার যদি গ্রাফিতিতে আমি শ্লেষ-ব্যঙ্গ অবধারিতভাবে দেখতে চাই, তাহলে ‘সুবোধ’-কেও ধরেবেঁধে রাখতে হবে এই বর্গে। আমার পছন্দ হবে সংজ্ঞাতে ন্যূনতম ও শিথিল মনোযোগ দেয়া। দেয়াল-শ্লোগান তথা চিকাকে গ্রাফিতির বৃহত্তর বর্গে রাখলে ও না-রাখলে ভিন্ন ভিন্ন আলাপ করা সম্ভব। আপাতত না-রাখতে চাইছি আমি। তবে একটা সূ্ত্র এভাবে রাখতে পারি: যে শ্লোগান বা মুখ্যবক্তব্য আপনি অবিকল রাজনৈতিক-প্রচারপত্র কিংবা প্রবন্ধে পান তাকে দেয়ালে দেখে গ্রাফিতি সাব্যস্ত না-করা সকলের জন্যই সুবিধাজনক হবে। যদি চিত্রধর্মিতাও বাদ দিতে চান, তাহলেও অন্তত গ্রাফিতি আশ্রয় করবে তাই যা আপনি প্রচারপত্রে পাননি। 

‘সুবোধ’কে কীভাবে দেখেন আপনি? ‘সুবোধ’ এত পপুলার হয়ে ওঠার কী কারণ?

মানস: আগের প্রশ্নে মৃদুভাবে বলেছিলাম; বছর দুয়েক আগে একটা ভিডিও-সাক্ষাৎকারেও খানিক বিশদ বলেছিলাম যেটা অল্প কিছু মানুষ ইউট্যুবের কল্যাণে দেখেছেন। ‌‘সুবোধ’ একটা রোম্যান্টিক প্রকল্প। এর মুখ্য স্বর শ্লেষ-ব্যঙ্গের বিপরীতে অপ্রাপ্তিবোধ আর বেইনসাফের হাহাকার। কিন্তু এসব বলার মাধ্যমে ‘সুবোধ’-এর বৌদ্ধিক-সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক গুরুত্ব লাঘব করার কোনো দূরবর্তী ভাবনাও আমার নেই। বরং একে অত্যন্ত অল্প সময়ে অত্যন্ত শক্তিশালী বার্তাবাহী হিসাবে আমি দেখে থাকি। আমি কেবল এর সারবত্তার বিষয়ে বলছিলাম। এখানে মুখ্য নায়ক একজন পুরুষ যাঁর বয়স ২৫ থেকে ৫০ যা কিছুই হতে পারে, দৃশ্যগতভাবে চিন্তা করলে। আর তিনি এই নগরজীবন, এই ‘ব্যবস্থা’ থেকে বারবার মুক্তি পেতে চাইছেন যেখানে ‘পালানোর’ ভাবনাটি উচ্চারিত। দৃশ্যগত কিছু অটুট ধারাবাহিক লক্ষণ আছে, মোটিফ, যেমন কমলা রঙের সূর্য কিংবা খাঁচা বা কারাগারের গরাদ। আমি ‘সুবোধ’-এর স্বর বুঝবার প্রচেষ্টাতে বললাম এই সিরিজটি রোমান্টিক; গণতন্ত্রের আকাঙ্ক্ষাবাহী তো বটেই।

আগারগাঁও, ঢাকা

‘সুবোধ’ পপুলার হবার অন্তত দুটো কারণ আমি পাই। প্রথমটি অবধারিত, দ্বিতীয়টি কম-উচ্চারিত। ‘সুবোধ’ চিত্রমালা স্পষ্টতই বিদ্যমান বেইনসাফির বিপক্ষে বার্তা দেয়। সেটাই মুখ্য কারণ পপুলার হবার। আঁকার গড় শৈলীও নিপুণ। ফলে দৃশ্যগতভাবে তা নজরও কেড়েছে। শহরে বাছাই করা জায়গাগুলোও খুব স্ট্র্যাটজিক। উপরন্তু, যা বলছিলাম, চিত্রধর্মী প্রতিবাদ বা আপত্তির চর্চার অত্যন্ত কম ইতিহাসের মধ্যে ‘সুবোধ’ আচমকা আকর্ষণ তৈরি করারই কথা। কিন্তু দ্বিতীয় কারণটির গুরুত্বও আমি সমুন্নত রাখতে চাইব। ঢাকায় বিশেষভাবে, এবং বাংলাদেশেই সাধারণভাবে, ‘সুবোধ’-এর আবির্ভাবের আগের বছরগুলো দেয়ালগুলোতে মূলত পণ্যের উৎপাত ছিল। অমুক সাবান, তমুক সিমেন্ট, ঢেউটিন ইত্যাদি। এর বাইরে, অবশ্যই সরকারি অনুচর সংগঠনগুলোর একচ্ছত্র বাণীমালা, প্রায়শই ভুলভাল বানানে। সিমেন্ট-সাবান-জর্দা-শ্যাম্পুর ওই বিজ্ঞাপনগুলোও ইদানীংকালে রঙচঙে বেখাপ্পা রকমের উজ্জ্বল হয়ে উঠছিল। একজন লাল আর সাদা দিয়ে দর্শক চোখে খোঁচাখুঁচি করছেন তো, অন্যজন কালো আর হলুদ দিয়ে করা শুরু করলেন। সকল স্ফীতির মতো দেয়ালে এই অত্যচারমূলক রঙের ব্যবহার খোদ পণ্যের অত্যাচারের থেকেও আমি অন্তত বড় করে দেখতে শুরু করেছিলাম। ‘সুবোধ’ এই লাগাতার অত্যাচারের মধ্যে দৃষ্টিসীমাতে একটা নতুন দৃশ্যপ্রস্তাব করেছিল। সেটাও খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলে আমি মানি। আমার কৌতূহল ছিল, এখন ‘সুবোধ’কালের প্রথম অধ্যায় অতিক্রান্ত হবার পরও কৌতুহলটা আছে যে, কোথাও কোনো পণ্য-বিজ্ঞাপনের দেয়ালে ‘সুবোধ’-এর নির্মাতারা পাল্টাচিত্রণ করেছিলেন কিনা। কিংবা সরকারী অনুচর সংগঠনের কোনো দেয়াল লিখনের উপরে। আমি অবশ্যই এই পাল্টাচিত্রণকে জরুরি বলে সাব্যস্ত করে, কিংবা এর থেকে এর গোপন চিত্রকরদের ‘বিপ্লবাত্মকতা’র মাপজোক নিতে এই প্রসঙ্গ নিয়ে ভাবিনি। আমার কৌতুহলই, যাতে আমি তাঁদের কার্যক্রমের একটা রূপরেখা বুঝতে পারি। আমি যতদূর লক্ষ্য করেছিলাম, তাতে কোনো গুরুতর পাল্টাচিত্রণ বা ‘দখল’-এর উদাহরণ পাইনি। সেরকম উদাহরণ থাকলে আমাকে দয়া করে জানাবেনও। ফলে, আমি বলতে চাইছি, সমাজ-নগর ও রাষ্ট্রের বিধিব্যবস্থাতে আপত্তি করা ছাড়াও, অসাংঘর্ষিকভাবে দেয়ালে ভিন্নতর দৃশ্যপ্রস্তাব করার কাজটাও ‘সুবোধ’ করেছে।

সম্প্রতি হেলমেট বাহিনী বা সহমতভাই নিয়ে ঢাকা ভার্সিটি বা তার আশপাশে কিছু গ্রাফিতি হয়েছে। যা কর্তৃপক্ষ মুছে দিতে বাধ্য হয়েছে। আবার সোশ্যাল মিডিয়ার কারণে ‘দুধ চা খেয়ে গুলি করে দিব’ এরকম গ্রাফিতিও পপুলার হয়েছে, যা আপাত অ্যাবসার্ড বা স্যাটায়ার টাইপের। যা দিয়ে টিশার্ট হতেও দেখা যাচ্ছে। এরকম গ্রাফিতি আর আশির দশকের কষ্টে আছে আইজুদ্দিন’র সাথে আপনি কীভাবে মিলান?

মানস: ‘কষ্টে আছে আইজুদ্দিন’ বরং আমার কিছুক্ষণ আগে বলা ‘রোমান্টিক’ ‘সিরিয়াসধর্মিতা’র ভাল উদাহরণ। আমার যদি ঠিক মনে পড়ে থাকে, তাহলে ‘কষ্টে আছে আইজুদ্দিন’-এর সমসাময়িককালে ঢাকার রাস্তায় দীর্ঘ বিবরণী চক দিয়ে লিখতে থাকা এক চিত্রকর-লেখককে পাওয়া যায়। আমি জানি না তিনি বেঁচে আছেন কিনা; কিংবা কোথায় আছেন। কিন্তু আমি জানি যে তাঁর সঙ্গে বিশেষ কথা বলা যেত না। তিনি কথ্যমাধ্যমে বিশেষ কিছু যোগাযোগ করতেন না; বরং চক দিয়ে দীর্ঘ দীর্ঘ কথা দীর্ঘ পথ জুড়ে লিখতে থাকার একটা অসম্ভবপ্রায় কাজ করতেন ঢাকাতে। ‘আইজুদ্দিন’ প্রচারকেরা যদি গোপন তৎপর হয়ে থাকেন, তিনি ছিলেন প্রকাশ্য আবার জনারণ্যেও অজ্ঞাত। আমি এগুলোকে এক কাতারে রাখতে চাইব। এটা ঠিকই যে সমাজমনোগত যথেষ্ট বিশ্লেষণ এই কারিগর বা শিল্পীদের হয়নি, তা ‘আইজুদ্দিন’ প্রচারকবৃন্দ হোন, বা ওই চকওয়ালা। কিন্তু আমি মিলাতে পারি নানানভাবেই। এমনকি, ‘সুবোধ’-এর বছর কয়েক আগে মুখ্যত উচ্চমধ্যবিত্ত এলাকাগুলোতে ছিটানোরঙ দিয়ে দেয়ালে কিছু কথাবার্তা যে লেখা হতো, প্রবণতা হিসাবে নানান শর্তে ও সংজ্ঞায় সেসবগুলোকে সম্পর্কিত করে আলাপ করা বা ভাবনা করারই আমি পক্ষে। সেসব স্প্রে-দেয়াললিখনে প্রায়শই পুরুষালি যৌনাত্মক বার্তা দেয়া থাকত। চিত্রমাধ্যম, চিত্রভাবনা, চিত্রবিচার ইত্যাদি বিষয়ে ক্যাটাগরি করা অনেক তুড়ি-মেরে চর্চার মতো বিষয় নয়। এখনো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে চারুকলার ডিগ্রিগুলো দেয়া হয় মাধ্যম ধরে ধরে, চিন্তন ধরে নয়; এমনকি পাঠ্যসূচিবিন্যাসও প্রায় ওরকম আকাটা। তাহলে দেয়াল বা রাস্তা বা সাইবারস্পেস মাধ্যম ধরে-ধরে আমাদেরও আলাপ না-করতে পারার কারণ নেই।

হেলমেট বাহিনী কিংবা সহমত ভাই ব্যঙ্গ করে যা কিছু আঁকাআঁকি হয়েছে তা খুব সহজবোধগম্যভাবেই গ্রাফিতি। আর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের যে ব্যস্ততার সঙ্গে তা মুছতে হলো, তাতেও একে কার্যকরী কোনো ‘শিল্প’মাধ্যমই ভাবতে হবে। তবে যাকে পাশ্চাত্যে নিউ-মিডিয়া বলা হয়ে থেকে ছিল, তার যথেষ্ট পরিচয় ঢাকায়

হতে না হতেই তামাম বিশ্বে যেভাবে সাইবারনির্ভর যোগাযোগপ্রণালী গড়ে ওঠে তাতে আমাদের নানান সতর্কতার বা ভাবনা পদ্ধতি রূপান্তরের সুযোগ ও প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। চিত্রকলা, শিল্পকলা, সাহিত্য ইত্যাদি নানাবিধ দীর্ঘকালের “প্রতিষ্ঠিত” বর্গগুলোর দুড়দাড় পুনর্গঠন হয়েছে। ফলে সাইবারস্পেসের প্রবণতাগুলোর নামকরণ করতে হলে দেয়ালচিত্র বা সড়কচিত্রের বর্গ ধরে না-আগানোই বিচক্ষণ মনে হবে আমার।

কিন্তু এখানে আমি অন্য একটা বিষয়ে বলতে চাই। ঢাকা বা বাংলাদেশ সাধারণভাবেই চিত্রকর্মে এবং ব্যঙ্গে (আমি দুই একাকার করছি না; চিত্রকরদের শ্লেষাত্মক হতেই হবে তেমন আবদার থেকেও বলছি না) বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ কোনো অঞ্চল নয়। বাস্তবে, দিল্লি বা লাহোর শহরের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর লোকজনের চর্চার সঙ্গে তুলনা করলেই আমাদের সামগ্রিক “ছবি-আঁকার” হালহকিকত আমরা টের পাব। তার মধ্যে শ্লেষাত্মক ছবি ও বাণী দুয়েই আমাদের উদ্বেগ করার মতো ঘোরতর অযোগ্যতা লক্ষ্য করা যায়। কিশোর গ্রেফতার হবার বহু বছর আগে থেকেই ঢাকায় কার্টুন কোনো লাগাতার প্রকাশভঙ্গি নয়। বরং কম লোকে ব্যঙ্গচর্চা করেন বলেই কিশোর প্রমুখ আরো একঘরে হয়ে আছেন। বিষয়টা কিশোরের দুর্দান্ত স্কিলের কেবল নয়, কিংবা বাংলাদেশের বিদ্যমান ধড়পাকড়ের পরিবেশ। আমাদের শ্লেষাত্মক চর্চা ভীষণ দুর্বল। এখানকার ‘শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি’কর্মীরা মোটের উপর ভাবগাম্ভীর্য, গুরুগম্ভীরতা ও রোমান্টিক-কাব্যময়তার প্রশিক্ষণে কয়েক প্রজন্ম কাটিয়েছেন। কেন ও কীভাবে তা নিয়ে আবার বিশদ আলাপ লাগবে, হয়তো ইতিহাসবিদগণের সাহায্য লাগবে আমার। 

খুলশী, চট্টগ্রাম

সাম্প্রতিক সময়ে চিকা কমে গেছে মনে হচ্ছে। এখানকার প্রধান যে বাম ছাত্র সংগঠনগুলো, যাদের চিকা মারার দীর্ঘ ট্রাডিশন ছিল। তাদেরও চিকা মারার প্রবণতা অনেককম। এর সমাজ-রাজনৈতিক কারণ কী হতে পারে?

মানস: প্রথম ও প্রধান কারণ একদম সহজ। দেয়ালগুলোতে খোলা-মালিকানা নেই। বাম সংগঠনগুলোর তো একদমই নেই। চারটি ধারার বা ধরনের ধাক্কা দেয়া হয়েছে দেয়াল থেকে বামবাণী সরানোর জন্য। কিছু স্কুল-কলেজ, বিশেষত বেসরকারী, ‘মহত্ত্ব’ ও ‘সাহিত্য’ মার্কা কিছু বাণী নিজেরা লিখে দেয়ালগুলো দখল নিলেন। আরেকটা ধারা হলো, অপেক্ষাকৃত বনেদীরা দেয়াল-লিখন মানা করে ‘আইনী’ ধরনের সতর্কতা বার্তা দিলেন। অনেকটা প্রস্রাব মানা করার মতো করেই। এগুলো এরশাদের ক্ষমতা হস্তান্তরের পরের প্রবণতা বলা চলে। আরেকটা ধারা হলো, ওই নিষেধাজ্ঞার দেয়ালগুলো ‘আইনসিদ্ধ’ভাবে ভাড়া নিয়ে চিপস, সিমেন্ট, আলকাতরা বানানো প্রতিষ্ঠানগুলো উজ্জ্বল রঙে বিজ্ঞাপন করতে শুরু করলেন। এটার কথাই আগেরবার বলছিলাম। তিনটি ধারার সঙ্গে যুক্ত হলো, এর বাইরে কিছু দেয়াল সরকারের অনুচর সংগঠনগুলো বাণী প্রচারের জন্য দখল করল। এসব বাণীর মধ্যে এমনকি ‘অমুক ভাইকে তমুক ভাইয়ের শুভেচ্ছা’ ধরনের বিস্ময়কর বার্তাহীন বাণীও রয়েছে। শেষোক্ত দখলকে কেবল দেয়াল-দখল হিসাবে দেখলেই চলবে না। এটাকে দেখতে হবে ওই দেয়ালে বামপন্থী সংগঠনগুলোর কোনো তৎপরতার বিরুদ্ধে শারীরিক আঘাত করার হুমকি পর্যন্ত একটা সংকেত হিসাবে। ফলে বিদ্যমান স্বৈর পরিমণ্ডলে বামপন্থীদের দেয়ালের পরিসর সঙ্কুচিত হয়ে এসেছে।

এর বাইরে যে কারণটা অপেক্ষাকৃত সূক্ষ্ম সেটার দিকেও আমি নজর দিতে বলব। রাজনৈতিক তৎপরতার পুরান যে বাণীনির্ভর চর্চাগুলো ছিল, নানানভাবেই কর্মীরা সেগুলোর সীমানা কিংবা প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে ভাবছেন। এমন নয় যে, নতুন কালে ও নতুন বাস্তবতায় রাষ্ট্রব্যবস্থা ও বিশ্বব্যবস্থা, সরকার ও তার পেটোয়া বাহিনীগুলোকে কীভাবে মোকাবিলা করা যাবে তার সহজবোধ্য রাস্তা সবাই দেখতে পাচ্ছেন; কিন্তু ভাবনাগুলো জারি আছে। ফলে যদি কোনো সংগঠনের কর্মী এখন শারীরিক আঘাতের ঝুঁকিসমেত দেয়াললিখনের পরিবর্তে, কিছুকালের জন্য, সাইবারস্পেসে তাঁদের বার্তাগুলো দিতে থাকেন, সেটাকে একটা পদ্ধতিগত বিষয় হিসাবেই দেখি আমি।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

আরেকটা বিষয় হচ্ছে বাম সংগঠনগুলোর চিকা’র যে টেকস্ট আর সুবোধের যে টেক্সট তার মধ্যে খুব একটা ফারাক নেই, মোটা দাগে গ্রাফিতির চিত্রগত যে ভাষা, তার সাথেও দূরত্ব কম মনে হয়েছে। আপনার কী মত?

মানস: এবারে আমি অন্তত সহমত হব তা আপনি আমাকে নিয়ে তামাশা করলেও। আমার আলাপে এই অঞ্চলের বৌদ্ধিক-সাংস্কৃতিক বিকাশের যে ধারণায়ন হাজির করছিলাম, বা আরো নিখুঁতভাবে বললে, মধ্যবিত্তীয় বৌদ্ধিক-সাংস্কৃতিক বিকাশ, তাতে ভাবগাম্ভীর্য ও কাব্যিকতা কেন্দ্রীয়। এটা একটা পরিস্থিতি যা আসলে অনেক সূক্ষ্ম গবেষণা-তদন্তের দাবিদার। কয়েকটা মুখ্য চিন্তাপ্রত্যয় বা কনসেপ্ট ধরে আমরা দেখতে পাব যে বাম সংগঠনগুলোর ও ‘সুবোধ’ চিত্রকরদের টেক্সট বা বীক্ষণ আসলে কমবেশি একাকার – ‘প্রগতি’, ‘মুক্তি’, ‘আলো’, ‘অন্যায়’, ‘কষ্ট’, ‘মানবিকতা’, ‘মহত্ত্ব’, ‘দায়’; আরেকটু মনোযোগ দিলে আরো কয়েকটা বের হতে পারে। এটা এক হিসাবে তো খুবই আনন্দের অনুভূতি আমার জন্য যে ‘সুবোধ’-এর নির্মাতাদেরকে আমি বামপন্থী তৎপরতার অংশ হিসাবে দেখতে পাচ্ছি। তবে বসে বসে ভাবনাচিন্তা করার যেহেতু আমার সময় আছে – মানে আমাদের চাকরিতে তো আর কোদাল চালাতে হয় না – সেই অর্থে বলছি, আমি এসব প্রত্যয়ের কালোত্তীর্ণ প্রশ্নাতীত সর্বজনগম্য অটুট রাজনৈতিক অর্থ আছে বলে ধরে নিতে পারি না। এগুলো দুনিয়াতে ব্যাপক আলোচিত, তার থেকেও বেশি নিন্দিত, তাও না বলার কারণ নেই যে এসব প্রত্যয় ও ধারণায়ন অবসোলিট পর্যায়ে গেছে। কিংবা আমি বলতে চাই যে, এসব প্রত্যয় আনমনে এমন ভারী সব ‘মহত্ত্বধর্মিতা’ আশ্রয় করে ফেলেছে যা মর‍্যালিস্ট পাটাতনে ক্রিয়া করার ঝুঁকিতে আছে। শব্দসমূহকে নির্দিষ্ট কালে কেটেছিঁড়ে খোলতাই না করে নিলে তা নারায়ণ-শিলার মতো বিমূর্ত ও ভক্তিভারে জর্জরিত হয়ে পড়তে পারে। যিনি তাঁর বিরুদ্ধে জুলুম থেকে পরিত্রাণ চান, তিনি তা ‘মানবিক’ কারণে কিংবা ‘প্রগতি’র পথে যাবার জন্য চান না, এই জুলুম তাঁর জীবন হারাম করে দিয়েছে বলে চান। প্রত্যয়ের পুনঃপাঠ সহজেই ‘পোস্টমডার্ন’ বলে সাব্যস্ত হয়ে থাকে। আর তাতে দীর্ঘদিনের সংগঠনকারী বামপন্থীরা বিরক্ত হয়ে থাকেন।

তবে বাংলাদেশের বাইরে বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে গ্রাফিতি সততই সংগঠনকারী বামপন্থীদের বোঝাবুঝির সমান্তরালে বিকশিত হয়েছে তা নয়। বৈশ্বিক বামপন্থী সংগঠনগুলোও বহুবিধ। আবার গ্রাফিতিও বহুবিধ। বরং, কেউ কেউ বলতে চাইবেন গ্রাফিতিতে সংগঠন না-করিয়ে ‘এনার্কিস্ট’রা অধিক সম্পৃক্ত। এগুলো বিস্তর ও সূক্ষ্ম সব স্থানিক প্রবণতার সঙ্গে সম্পর্কিত করে দেখা লাগবে সম্ভবত।

বাংলাদেশের মেইনস্ট্রিম যে আর্ট বা তাদের যে দেয়ালচিত্র, বিভিন্ন জায়গায় বিশেষ করে চারুকলাগুলার আশপাশে দেখা যায়, তার সাথে গ্রাফিতি-চিকার সর্ম্পকটা কেমন আপনার কাছে?

মানস: চারুকলার আশপাশে যা হয়ে থাকে তার লিগ্যাসিকে অরাজনৈতিক বলব না, কিন্তু গ্রাফিতির গ্রাহ্য বা কাঙ্ক্ষিত চর্চা থেকে তা যোজন দূরে। অরাজনৈতিক যে না- সাব্যস্ত করলাম তার একটা ইতিহাস আছে। লক্ষ্য করেছেন নিশ্চয়ই, চারুকলার আশপাশের দেয়ালচিত্রগুলোর একটা মুখ্য অন্তঃসার হলো লোকচিত্রের সাথে সংযোগস্থাপন। চিত্রকলার ডিগ্রিপ্রদানকারী শাস্ত্রের মধ্যে পাশ্চাত্যীয় চিত্রকলার প্রতি যে প্রশ্নাতীত ভক্তি; পাঠ্যসূচি প্রণয়নের যে ঔপনিবেশিক ইতিহাস; পাঠ্যসূচিকে অপরিবর্তনীয় রাখার যে আমলাতান্ত্রিক স্থবিরতা (এবং ঔপনিবেশিক মনোগড়ন) তাতে দেয়ালের ওই ছবিগুলোকে সুষ্পষ্ট দরকষাকষি হিসাবে দেখতে হবে। সেটা কোনো শিক্ষার্থীর দল আঁকুন; আর তাঁদের সঙ্গে কোনো শিক্ষক-শিক্ষিকা যুক্ত থাকুন। অন্য ভাষায় বললে, কারিকুলামের মধ্যে যে রদবদলগুলো তাঁরা করলেন না, বা পারলেন না, বা চাইলেন না, বা আলসেমি করলেন, বা পক্ষ-বিপক্ষ তর্কের মধ্যেই শিক্ষাবর্ষ শেষ হয়ে গেল, সেগুলোর একটা প্রদর্শনী তাঁরা করছেন দেয়ালে। রাজনীতিটা সেখানে আছে।

আবার অন্যভাবে দেখলে, এই প্রদর্শনীটা প্রতিপক্ষীয় নয়, বা নাই আর, বরং জাতীয়তাবাদের নয়া-নয়া চেহারার উদ্ভাস ঘটানোর সঙ্গে সম্পর্কিত। জাতীয়তাবাদের সেইসব অংশ যেখানে ‘লোকজ’কে জাদুঘরীয় (তাই মৃত) বিবেচনা করে হলেও অন্তর্ভুক্তির বিবেচনা রাখে, সেই অংশের সঙ্গে সংশ্রব করা হয় এসব দেয়ালচিত্রে। তবে ৬০-এর দশকের পাকিস্তান রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে লড়াই, আবার ৮০-র দশকের সামরিক শাসনবিরোধী লড়াইয়ের তা প্রকল্পও বটে। ফলে, এসব পরিবেশন-প্রদর্শনকে পরিপ্রেক্ষিতের বাইরে রাখার সুযোগ নেই। ৮০ বা ৬০ দশকে যা ছিল শাসককে দেখানো ‘দেখো, তুমি যা চাও না, তা আমি করি’ যেসব মোটিফকে আশ্রয় করে বিকশিত হয়েছিল; সেই একই মোটিফের এখনকার প্রদর্শনের অর্থ হতে পারে ‘মানবি না? মানায়া ছাড়ব কী আমাদের হাজার বছরের ঐতিহ্য/পরিচয়’। মোটিফ যে তার পরিপ্রেক্ষিতের বাইরে ভোঁতামাল তা আমাদের সেমিওলজিতে ডিগ্রি ছাড়াই বুঝতে পারার কথা। আপনার প্রশ্ন থেকে আমি সরিনি। আবার একবাক্যে বলার বদলে ভাবনাপ্রবাহটি রাখতে চেয়েছি।

ওগুলো গ্রাফিতির চরিত্র ধারণ তো করেই না, বরং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ‘লোকপ্রীতি’র অধিক জাতীয়তাবাদের হুমকিমূলক আর্কাইভে পরিণত হয়ে পড়েছে। 

আর্টিস্ট: ক্রো-কাক, চারুকলা ইন্সটিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

টাকার গায়ে লেখা বা পাবলিক টয়লেটের দেয়ালে বা পার্কে, বাসের সিটে যে লিখালিখি এগুলোকে কি গ্রাফিতি বলা যায়?

মানস: এটা একটা দারুণ জায়গা। তবে সেই গোড়ার সতর্কতাটাই আবার হাজির করতে চাইব। নামকরণ কী হবে তা নিয়ে আমরা শক্ত হয়ে বসে থাকলে প্রকরণগত বৈশিষ্ট্যগুলো নিয়ে মনোযোগ পাতলা হয়ে যেতে পারে। গ্রাফিতির অনুগ্রাহী যাঁরা তাঁরা নিশ্চয়ই আপনি যেসব উৎপাদ নির্দেশ করলেন সেগুলোকে গ্রাফিতি নামকরণে না-রাখতে চাইতে পারেন। মাত্র কিছুকাল আগেও ‘মিস্ত্রী’ শব্দটার মধ্যেই, ‌‘কারিগর’-এর মধ্যে তো বটেই, শৈলী-দক্ষতা-কল্পনার স্বীকৃতি ছিল। কাঠমিস্ত্রী 

বা রাজমিস্ত্রী যে ময়ূর খোদাই করলেন বলেই ‘শিল্পী’ তা নয়, বরং তাঁর সামগ্রিক কর্মসম্পাদন-সংগঠনের স্বীকৃতি ঐ শব্দ ধারণ করতে পারত। পারত কি? হ্যাঁ পারত, যদি শব্দটির প্রবক্তা/উচ্চারক ঐ মামুলি পেশা-ইতিহাসটুকু ও প্রশিক্ষণ-পরম্পরাটুকু মনে রেখে শব্দটা উচ্চারণ করতেন। আজকে আপনি পাশে উকিল-ব্যারিস্টার আর ইতিহাসের হালিখানেক অধ্যাপক রেখেও যদি ‘মিস্ত্রী’ শব্দটি উচ্চারণ করেন, এর মধ্যে আর ‘শিল্পী’ বা ‘রূপকার’ সত্তা ভরে দিতে পারবেন না। বর্গ ও প্রত্যয়ের এই জীবনচক্র আছে, রাজনৈতিক লড়াই আছে। তেমনি, হিটলার মানুষ মারতেন বলে তাঁর চিত্ররস/পেইন্টি-এপ্রিসিয়েশন এর আরেকটা নাম দেয়া যায় না যাতে হত্যাকারী নন এমন ‘খাঁটি’ চিত্ররসিকদের থেকে তাঁকে আলাদা করা যায়। এসব সঙ্কট আপনি আমি এক খোঁচায়, এক আলাপে নিষ্পত্তি না করলেই মঙ্গল হবে।

যে কারণে আমি এটাকে দারুণ জায়গা বললাম, সেটা এর প্রকরণগত বৈশিষ্ট্যের কারণে। ঢাকার কিছু উচ্চমধ্যবিত্ত অঞ্চলে দেয়ালে ছিটারঙ দিয়ে যে চর্চাগুলো হতো, টাকা বা টয়লেটের চর্চাগুলোর সঙ্গে তা সামঞ্জস্যপূর্ণ। এর সবগুলোতেই (পুরুষের) যৌনবাসনা ঘোষণা করার বার্তা থাকে। ঘোষণা বললাম বটে, অনেক ক্ষেত্রেই তা উদ্দীষ্টের জন্য হুমকি হিসাবে পঠিত হতে পারে। টাকার কারুকাজে একটা বাড়তি দিক আছে যা টয়লেট বা বনানীর দেয়ালে তেমন পাওয়া যায় না। সেটা হলো ফোন নম্বর দেয়া। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ফোন নম্বরটা বেশুমার তমিজ ও আকুতিসমেত দেয়া হয়ে থাকে (প্লিজ কল করেন)। তবে সাধারণত নিস্পৃহ নম্বর প্রদান ঘটে থাকে। পাবলিক টয়লেটে কখনো ফোন নম্বর দেখিনি তা বলব না। কিন্তু একটা হেটারোসেক্সুয়াল পরিমণ্ডলে টাকা ও টয়লেটের লিঙ্গভেদ যে এক নয় তা মানবেন নিশ্চয়ই। টাকা নানারকম লিঙ্গের হাতেই পড়তে পারে। কিন্তু তেমন গুরুতর বিপর্যয় না হলে টয়েলেট দ্বিলিঙ্গবিশিষ্ট। কিন্তু তারপরও কমন-টয়লেট বা টয়লেট সিরিজগুলোর (যেমন লাইন দিয়ে রেলের টয়লেট) যেখানে অভিন্ন প্রবেশপথে একবার দুবার ফোন নম্বর আমার চোখে পড়েছে।

চিত্রকর্মের ক্ষেত্রে একটা গুরুতর পার্থক্য টাকা, টয়লেট ও বনানী দেয়ালে আছে। প্রাক-সুবোধ স্প্রে চর্চায় ঢাকাতে আমি খুব মূর্ত ছবি দেখেছি বলে মনে করতে পারি না। একটা বা দুটো জায়গায় ‘শিশ্ন’ আঁকার চেষ্টা হয়েছে আমি মনে করতে পারি। চিত্রশৈলী বাদ দিলেও, ওগুলোর পাশের হরফগুলো ঠিক ইংরাজি-জাননেওয়ালা স্প্রে-চিত্রকরদের বলে মনে হয়নি। টাকায়, পক্ষান্তরে, চিত্রকর্ম করার জায়গাই কম থাকে। আগে টাকায় বাঘের জলছবির উপর সাদা অংশটা চিত্রকর্মযোগ্য ছিল, এখন সেটাও অত সাদা নেই। টাকাতে আগের তুলনায় চিত্রকর্ম ও বাণী দুই-ই কমে আসছে তা বলতে পারি। সম্ভবত মনিটরিং বেড়েছে। টয়লেট-বাস-পার্কেরগুলোতে এই চর্চার গুরুতর মাত্রাবদল হয়নি সম্ভবত। এগুলোর নাম যদি গ্রাফিতি দিতে চানই, আমি গ্রাফিতির জঁরাভাগ করার পক্ষে। আমি তাহলে গ্রাফিতির মধ্যকার একটা অণুবর্গ বা সাবসেটে রাখতে চাইব। যদি নামটাও আমাকেই দিতে বলেন তাহলে, একাডেমিক স্বাদ রাখতে চাইলে, দিতে পারি “মেইল সেক্সুয়াল ড্রাইভ/ফ্যান্টাসি গ্রাফিতি” বা বাংলায় হবে “পুরুষের যৌনতাড়না/কল্পনা দেয়ালচিত্র”। আর যদি আপামর গ্রামদেশীয় ভাষারাজ্যের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন, তাহলে বলব “পুরুষের চ্যাগানো গ্রাফিতি”। 


মানস চৌধুরী

আদাবর। ২৭ মার্চ ২০২১

">

x

x

x

x

x

লেখা সম্পর্কে মন্তব্য

টি মন্তব্য

%d bloggers like this:
বাংলাদেশের গ্রাফিতি বিষয়ে মানস চৌধুরী’র ইন্টারভিউ | শিরিষের ডালপালা । সাহিত্য ওয়েবজিন

বাংলাদেশের গ্রাফিতি বিষয়ে মানস চৌধুরী’র ইন্টারভিউ

মানস চৌধুরী। লেখক, শিক্ষক, গায়ক, অভিনেতা এবং আরো অনেক কিছু। বেশ কয়েক বছর আগে সুবোধ গ্রাফিতিটা পপুলার হয়ে উঠলে, মানস চৌধুরী সুবোধ নিয়ে একটা ইন্টারভিউ দেন কোনো একটা টিভি চ্যানেলে। ভিডিও ইন্টারভিউ। অই ইন্টারভিউতে গ্রাফিতি নিয়ে ওনার চিন্তা-ভাবনাগুলো ছিল বেশ ইন্টারেস্টিং। অইটা দেখে  ওনাকে একদিন প্রস্তাব দিই এই ইন্টারভিউর। উনিও রাজি হয়ে যান। মেইলে প্রশ্ন পাঠাই। নানান ব্যস্ততার পরও, অবাক করে দিয়ে দ্রুতই উনি প্রশ্নগুলার উত্তর পাঠায় দেন, ফিরতি মেইলে। ওনাকে তখন একটা সময়ও দিছিলাম। বলছিলাম যে দ্রুতই আমরা ইস্যুটা পাবলিশ করতেছি। কিন্তু কথা রাখতে পারি নাই। নানাবিধ কারণেই তা সম্ভব হয়ে উঠে নাই। এ জন্য ওনার কাছে দুঃখিত। আশা করি এইবার আমরা সত্যই সত্যই পাবলিশ করতে পারবো। ধন্যবাদ মানসদাকে, এই উদ্যেগের সাথে থাকার জন্য।

— রাজীব দত্ত 


সম্প্রতি ‘সুবোধ’ নামে একটা গ্রাফিতি পপুলার হয়েছে। এর আগে এখানে তো গ্রাফিতির পপুলারিটি এভাবে ছিল না। এর আগে থেকে এখানে চিকা মারার অভ্যাস চালু ছিল। চিকাকে কি এখানকার গ্রাফিতি বলা যাবে? বা গ্রাফিতিকে কি এখানকার চিকা বলা যাবে?

মানস চৌধুরী: যাকে গ্রাফিতি বলা হয়ে থাকে, সেই সংজ্ঞা ধরে আগালে এখানে অবশ্যই গ্রাফিতি জনপ্রিয় ছিল না। কিন্তু আরেকটা বিষয় হলো গ্রাফিতি, কিংবা সুবিধার্থে যদি ব্যঙ্গাত্মক দেয়ালচিত্র বলি, সেগুলোর চর্চাই ছিল খুব সীমিত। স্বাধীন বাংলাদেশে বরং এরশাদের সময়টাকেই সীমিত আকারে গ্রাফিতি-চর্চার কাল বলা যায়। চর্চাটা কেন দাঁড়ায়নি, সেটা বিশ্লেষণ নিশ্চয়ই করা যায়। অন্য কোনো এক সময়ে বিশদ করার ভরসায় এটুকু বলতে চাইব যে ঢাকা মহানগরের সামগ্রিক শিল্প-সংস্কৃতি-সাহিত্যের মুডের সঙ্গেই তা সম্পর্কিত। আমি প্রায়শই বোঝানোর জন্য যাকে ‘আর্টকালচারওয়ালা’ বলে থাকি, সেই মহলটা, শিথিল এক মোর্চা হিসাবে দেখলে গড়ে বেরসিকভাবে বিকশিত হবার ইতিহাস আছে। কিন্তু আসলেই এই প্রসঙ্গে বিশদ করার দরকার পড়বে। তবে এক্ষেত্রে নানান বামপন্থী সংগঠনের দেয়ালচিত্র আঁকার অভ্যাসটা একদম যায়নি; বরং গত ২/৪ বছরে মধ্যবর্তী একটা সুপ্তদশা ডিঙিয়ে আবারো বিকশিত হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশ, জাহাঙ্গীরনগরের কিছু দেয়াল, রাজশাহী ও অন্যান্য ক্যাম্পাসেও হয়েছে সেসব। এখানেও, সংজ্ঞায়িত গ্রাফিতির ব্যঙ্গধর্মিতা গুণগতভাবেই অনুপস্থিত। একটা দুটো ব্যতিক্রম বাদ দিলে এগুলো রূপকাশ্রয়ী ‘সিরিয়াস’ চিত্রকর্ম যেগুলোতে ‘শৃঙ্খল’ ‘গণতন্ত্র’ ‘প্রগতি’ ইত্যাদি রূপকায়িত করার চেষ্টা থাকে। শ্লেষ বা ব্যঙ্গ খুব অল্প চিত্রের উপজীব্য। ‘সুবোধ’ সিরিজও কিন্তু কাব্যধর্মী; শ্লেষের চেয়েও হাহাকার সেখানকার মুখ্য স্বর।

চিকাকে এখানকার গ্রাফিতি, কিংবা উল্টোটা, বলার একটা সংজ্ঞা-সঙ্কট থেকে যায়। চিত্রধর্মিতার অভাব। তবে নামকরণ তো প্রায়শই একটা অনুকরণ-তৎপরতা। সারা বিশ্বেই। একজন দুইটা ছক্কা মারার পর একজন ক্রিকেটারকেও “বাংলাদেশের টেন্ডুলকার” বলার উচ্ছ্বাস (তথা হীনমন্যতা) লক্ষ্যণীয়। ফলে কাকে কী নামে ডাকা হবে, একটা নির্দিষ্ট সময়কালে ডাকা হয়ে থাকে, সেগুলো নিয়ে আমার বিশ্লেষণ কাজ করে; দুর্ভাবনা নয়। কোনো সংজ্ঞারই শর্তসাপেক্ষ থাকা ছাড়া উপায় নেই। যদি গ্রাফিতির একটা শর্ত হয় চিত্রধর্মিতা তাহলে চিকা গ্রাফিতি নয়। আবার যদি গ্রাফিতিতে আমি শ্লেষ-ব্যঙ্গ অবধারিতভাবে দেখতে চাই, তাহলে ‘সুবোধ’-কেও ধরেবেঁধে রাখতে হবে এই বর্গে। আমার পছন্দ হবে সংজ্ঞাতে ন্যূনতম ও শিথিল মনোযোগ দেয়া। দেয়াল-শ্লোগান তথা চিকাকে গ্রাফিতির বৃহত্তর বর্গে রাখলে ও না-রাখলে ভিন্ন ভিন্ন আলাপ করা সম্ভব। আপাতত না-রাখতে চাইছি আমি। তবে একটা সূ্ত্র এভাবে রাখতে পারি: যে শ্লোগান বা মুখ্যবক্তব্য আপনি অবিকল রাজনৈতিক-প্রচারপত্র কিংবা প্রবন্ধে পান তাকে দেয়ালে দেখে গ্রাফিতি সাব্যস্ত না-করা সকলের জন্যই সুবিধাজনক হবে। যদি চিত্রধর্মিতাও বাদ দিতে চান, তাহলেও অন্তত গ্রাফিতি আশ্রয় করবে তাই যা আপনি প্রচারপত্রে পাননি। 

‘সুবোধ’কে কীভাবে দেখেন আপনি? ‘সুবোধ’ এত পপুলার হয়ে ওঠার কী কারণ?

মানস: আগের প্রশ্নে মৃদুভাবে বলেছিলাম; বছর দুয়েক আগে একটা ভিডিও-সাক্ষাৎকারেও খানিক বিশদ বলেছিলাম যেটা অল্প কিছু মানুষ ইউট্যুবের কল্যাণে দেখেছেন। ‌‘সুবোধ’ একটা রোম্যান্টিক প্রকল্প। এর মুখ্য স্বর শ্লেষ-ব্যঙ্গের বিপরীতে অপ্রাপ্তিবোধ আর বেইনসাফের হাহাকার। কিন্তু এসব বলার মাধ্যমে ‘সুবোধ’-এর বৌদ্ধিক-সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক গুরুত্ব লাঘব করার কোনো দূরবর্তী ভাবনাও আমার নেই। বরং একে অত্যন্ত অল্প সময়ে অত্যন্ত শক্তিশালী বার্তাবাহী হিসাবে আমি দেখে থাকি। আমি কেবল এর সারবত্তার বিষয়ে বলছিলাম। এখানে মুখ্য নায়ক একজন পুরুষ যাঁর বয়স ২৫ থেকে ৫০ যা কিছুই হতে পারে, দৃশ্যগতভাবে চিন্তা করলে। আর তিনি এই নগরজীবন, এই ‘ব্যবস্থা’ থেকে বারবার মুক্তি পেতে চাইছেন যেখানে ‘পালানোর’ ভাবনাটি উচ্চারিত। দৃশ্যগত কিছু অটুট ধারাবাহিক লক্ষণ আছে, মোটিফ, যেমন কমলা রঙের সূর্য কিংবা খাঁচা বা কারাগারের গরাদ। আমি ‘সুবোধ’-এর স্বর বুঝবার প্রচেষ্টাতে বললাম এই সিরিজটি রোমান্টিক; গণতন্ত্রের আকাঙ্ক্ষাবাহী তো বটেই।

আগারগাঁও, ঢাকা

‘সুবোধ’ পপুলার হবার অন্তত দুটো কারণ আমি পাই। প্রথমটি অবধারিত, দ্বিতীয়টি কম-উচ্চারিত। ‘সুবোধ’ চিত্রমালা স্পষ্টতই বিদ্যমান বেইনসাফির বিপক্ষে বার্তা দেয়। সেটাই মুখ্য কারণ পপুলার হবার। আঁকার গড় শৈলীও নিপুণ। ফলে দৃশ্যগতভাবে তা নজরও কেড়েছে। শহরে বাছাই করা জায়গাগুলোও খুব স্ট্র্যাটজিক। উপরন্তু, যা বলছিলাম, চিত্রধর্মী প্রতিবাদ বা আপত্তির চর্চার অত্যন্ত কম ইতিহাসের মধ্যে ‘সুবোধ’ আচমকা আকর্ষণ তৈরি করারই কথা। কিন্তু দ্বিতীয় কারণটির গুরুত্বও আমি সমুন্নত রাখতে চাইব। ঢাকায় বিশেষভাবে, এবং বাংলাদেশেই সাধারণভাবে, ‘সুবোধ’-এর আবির্ভাবের আগের বছরগুলো দেয়ালগুলোতে মূলত পণ্যের উৎপাত ছিল। অমুক সাবান, তমুক সিমেন্ট, ঢেউটিন ইত্যাদি। এর বাইরে, অবশ্যই সরকারি অনুচর সংগঠনগুলোর একচ্ছত্র বাণীমালা, প্রায়শই ভুলভাল বানানে। সিমেন্ট-সাবান-জর্দা-শ্যাম্পুর ওই বিজ্ঞাপনগুলোও ইদানীংকালে রঙচঙে বেখাপ্পা রকমের উজ্জ্বল হয়ে উঠছিল। একজন লাল আর সাদা দিয়ে দর্শক চোখে খোঁচাখুঁচি করছেন তো, অন্যজন কালো আর হলুদ দিয়ে করা শুরু করলেন। সকল স্ফীতির মতো দেয়ালে এই অত্যচারমূলক রঙের ব্যবহার খোদ পণ্যের অত্যাচারের থেকেও আমি অন্তত বড় করে দেখতে শুরু করেছিলাম। ‘সুবোধ’ এই লাগাতার অত্যাচারের মধ্যে দৃষ্টিসীমাতে একটা নতুন দৃশ্যপ্রস্তাব করেছিল। সেটাও খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলে আমি মানি। আমার কৌতূহল ছিল, এখন ‘সুবোধ’কালের প্রথম অধ্যায় অতিক্রান্ত হবার পরও কৌতুহলটা আছে যে, কোথাও কোনো পণ্য-বিজ্ঞাপনের দেয়ালে ‘সুবোধ’-এর নির্মাতারা পাল্টাচিত্রণ করেছিলেন কিনা। কিংবা সরকারী অনুচর সংগঠনের কোনো দেয়াল লিখনের উপরে। আমি অবশ্যই এই পাল্টাচিত্রণকে জরুরি বলে সাব্যস্ত করে, কিংবা এর থেকে এর গোপন চিত্রকরদের ‘বিপ্লবাত্মকতা’র মাপজোক নিতে এই প্রসঙ্গ নিয়ে ভাবিনি। আমার কৌতুহলই, যাতে আমি তাঁদের কার্যক্রমের একটা রূপরেখা বুঝতে পারি। আমি যতদূর লক্ষ্য করেছিলাম, তাতে কোনো গুরুতর পাল্টাচিত্রণ বা ‘দখল’-এর উদাহরণ পাইনি। সেরকম উদাহরণ থাকলে আমাকে দয়া করে জানাবেনও। ফলে, আমি বলতে চাইছি, সমাজ-নগর ও রাষ্ট্রের বিধিব্যবস্থাতে আপত্তি করা ছাড়াও, অসাংঘর্ষিকভাবে দেয়ালে ভিন্নতর দৃশ্যপ্রস্তাব করার কাজটাও ‘সুবোধ’ করেছে।

সম্প্রতি হেলমেট বাহিনী বা সহমতভাই নিয়ে ঢাকা ভার্সিটি বা তার আশপাশে কিছু গ্রাফিতি হয়েছে। যা কর্তৃপক্ষ মুছে দিতে বাধ্য হয়েছে। আবার সোশ্যাল মিডিয়ার কারণে ‘দুধ চা খেয়ে গুলি করে দিব’ এরকম গ্রাফিতিও পপুলার হয়েছে, যা আপাত অ্যাবসার্ড বা স্যাটায়ার টাইপের। যা দিয়ে টিশার্ট হতেও দেখা যাচ্ছে। এরকম গ্রাফিতি আর আশির দশকের কষ্টে আছে আইজুদ্দিন’র সাথে আপনি কীভাবে মিলান?

মানস: ‘কষ্টে আছে আইজুদ্দিন’ বরং আমার কিছুক্ষণ আগে বলা ‘রোমান্টিক’ ‘সিরিয়াসধর্মিতা’র ভাল উদাহরণ। আমার যদি ঠিক মনে পড়ে থাকে, তাহলে ‘কষ্টে আছে আইজুদ্দিন’-এর সমসাময়িককালে ঢাকার রাস্তায় দীর্ঘ বিবরণী চক দিয়ে লিখতে থাকা এক চিত্রকর-লেখককে পাওয়া যায়। আমি জানি না তিনি বেঁচে আছেন কিনা; কিংবা কোথায় আছেন। কিন্তু আমি জানি যে তাঁর সঙ্গে বিশেষ কথা বলা যেত না। তিনি কথ্যমাধ্যমে বিশেষ কিছু যোগাযোগ করতেন না; বরং চক দিয়ে দীর্ঘ দীর্ঘ কথা দীর্ঘ পথ জুড়ে লিখতে থাকার একটা অসম্ভবপ্রায় কাজ করতেন ঢাকাতে। ‘আইজুদ্দিন’ প্রচারকেরা যদি গোপন তৎপর হয়ে থাকেন, তিনি ছিলেন প্রকাশ্য আবার জনারণ্যেও অজ্ঞাত। আমি এগুলোকে এক কাতারে রাখতে চাইব। এটা ঠিকই যে সমাজমনোগত যথেষ্ট বিশ্লেষণ এই কারিগর বা শিল্পীদের হয়নি, তা ‘আইজুদ্দিন’ প্রচারকবৃন্দ হোন, বা ওই চকওয়ালা। কিন্তু আমি মিলাতে পারি নানানভাবেই। এমনকি, ‘সুবোধ’-এর বছর কয়েক আগে মুখ্যত উচ্চমধ্যবিত্ত এলাকাগুলোতে ছিটানোরঙ দিয়ে দেয়ালে কিছু কথাবার্তা যে লেখা হতো, প্রবণতা হিসাবে নানান শর্তে ও সংজ্ঞায় সেসবগুলোকে সম্পর্কিত করে আলাপ করা বা ভাবনা করারই আমি পক্ষে। সেসব স্প্রে-দেয়াললিখনে প্রায়শই পুরুষালি যৌনাত্মক বার্তা দেয়া থাকত। চিত্রমাধ্যম, চিত্রভাবনা, চিত্রবিচার ইত্যাদি বিষয়ে ক্যাটাগরি করা অনেক তুড়ি-মেরে চর্চার মতো বিষয় নয়। এখনো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে চারুকলার ডিগ্রিগুলো দেয়া হয় মাধ্যম ধরে ধরে, চিন্তন ধরে নয়; এমনকি পাঠ্যসূচিবিন্যাসও প্রায় ওরকম আকাটা। তাহলে দেয়াল বা রাস্তা বা সাইবারস্পেস মাধ্যম ধরে-ধরে আমাদেরও আলাপ না-করতে পারার কারণ নেই।

হেলমেট বাহিনী কিংবা সহমত ভাই ব্যঙ্গ করে যা কিছু আঁকাআঁকি হয়েছে তা খুব সহজবোধগম্যভাবেই গ্রাফিতি। আর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের যে ব্যস্ততার সঙ্গে তা মুছতে হলো, তাতেও একে কার্যকরী কোনো ‘শিল্প’মাধ্যমই ভাবতে হবে। তবে যাকে পাশ্চাত্যে নিউ-মিডিয়া বলা হয়ে থেকে ছিল, তার যথেষ্ট পরিচয় ঢাকায়

হতে না হতেই তামাম বিশ্বে যেভাবে সাইবারনির্ভর যোগাযোগপ্রণালী গড়ে ওঠে তাতে আমাদের নানান সতর্কতার বা ভাবনা পদ্ধতি রূপান্তরের সুযোগ ও প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। চিত্রকলা, শিল্পকলা, সাহিত্য ইত্যাদি নানাবিধ দীর্ঘকালের “প্রতিষ্ঠিত” বর্গগুলোর দুড়দাড় পুনর্গঠন হয়েছে। ফলে সাইবারস্পেসের প্রবণতাগুলোর নামকরণ করতে হলে দেয়ালচিত্র বা সড়কচিত্রের বর্গ ধরে না-আগানোই বিচক্ষণ মনে হবে আমার।

কিন্তু এখানে আমি অন্য একটা বিষয়ে বলতে চাই। ঢাকা বা বাংলাদেশ সাধারণভাবেই চিত্রকর্মে এবং ব্যঙ্গে (আমি দুই একাকার করছি না; চিত্রকরদের শ্লেষাত্মক হতেই হবে তেমন আবদার থেকেও বলছি না) বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ কোনো অঞ্চল নয়। বাস্তবে, দিল্লি বা লাহোর শহরের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর লোকজনের চর্চার সঙ্গে তুলনা করলেই আমাদের সামগ্রিক “ছবি-আঁকার” হালহকিকত আমরা টের পাব। তার মধ্যে শ্লেষাত্মক ছবি ও বাণী দুয়েই আমাদের উদ্বেগ করার মতো ঘোরতর অযোগ্যতা লক্ষ্য করা যায়। কিশোর গ্রেফতার হবার বহু বছর আগে থেকেই ঢাকায় কার্টুন কোনো লাগাতার প্রকাশভঙ্গি নয়। বরং কম লোকে ব্যঙ্গচর্চা করেন বলেই কিশোর প্রমুখ আরো একঘরে হয়ে আছেন। বিষয়টা কিশোরের দুর্দান্ত স্কিলের কেবল নয়, কিংবা বাংলাদেশের বিদ্যমান ধড়পাকড়ের পরিবেশ। আমাদের শ্লেষাত্মক চর্চা ভীষণ দুর্বল। এখানকার ‘শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি’কর্মীরা মোটের উপর ভাবগাম্ভীর্য, গুরুগম্ভীরতা ও রোমান্টিক-কাব্যময়তার প্রশিক্ষণে কয়েক প্রজন্ম কাটিয়েছেন। কেন ও কীভাবে তা নিয়ে আবার বিশদ আলাপ লাগবে, হয়তো ইতিহাসবিদগণের সাহায্য লাগবে আমার। 

খুলশী, চট্টগ্রাম

সাম্প্রতিক সময়ে চিকা কমে গেছে মনে হচ্ছে। এখানকার প্রধান যে বাম ছাত্র সংগঠনগুলো, যাদের চিকা মারার দীর্ঘ ট্রাডিশন ছিল। তাদেরও চিকা মারার প্রবণতা অনেককম। এর সমাজ-রাজনৈতিক কারণ কী হতে পারে?

মানস: প্রথম ও প্রধান কারণ একদম সহজ। দেয়ালগুলোতে খোলা-মালিকানা নেই। বাম সংগঠনগুলোর তো একদমই নেই। চারটি ধারার বা ধরনের ধাক্কা দেয়া হয়েছে দেয়াল থেকে বামবাণী সরানোর জন্য। কিছু স্কুল-কলেজ, বিশেষত বেসরকারী, ‘মহত্ত্ব’ ও ‘সাহিত্য’ মার্কা কিছু বাণী নিজেরা লিখে দেয়ালগুলো দখল নিলেন। আরেকটা ধারা হলো, অপেক্ষাকৃত বনেদীরা দেয়াল-লিখন মানা করে ‘আইনী’ ধরনের সতর্কতা বার্তা দিলেন। অনেকটা প্রস্রাব মানা করার মতো করেই। এগুলো এরশাদের ক্ষমতা হস্তান্তরের পরের প্রবণতা বলা চলে। আরেকটা ধারা হলো, ওই নিষেধাজ্ঞার দেয়ালগুলো ‘আইনসিদ্ধ’ভাবে ভাড়া নিয়ে চিপস, সিমেন্ট, আলকাতরা বানানো প্রতিষ্ঠানগুলো উজ্জ্বল রঙে বিজ্ঞাপন করতে শুরু করলেন। এটার কথাই আগেরবার বলছিলাম। তিনটি ধারার সঙ্গে যুক্ত হলো, এর বাইরে কিছু দেয়াল সরকারের অনুচর সংগঠনগুলো বাণী প্রচারের জন্য দখল করল। এসব বাণীর মধ্যে এমনকি ‘অমুক ভাইকে তমুক ভাইয়ের শুভেচ্ছা’ ধরনের বিস্ময়কর বার্তাহীন বাণীও রয়েছে। শেষোক্ত দখলকে কেবল দেয়াল-দখল হিসাবে দেখলেই চলবে না। এটাকে দেখতে হবে ওই দেয়ালে বামপন্থী সংগঠনগুলোর কোনো তৎপরতার বিরুদ্ধে শারীরিক আঘাত করার হুমকি পর্যন্ত একটা সংকেত হিসাবে। ফলে বিদ্যমান স্বৈর পরিমণ্ডলে বামপন্থীদের দেয়ালের পরিসর সঙ্কুচিত হয়ে এসেছে।

এর বাইরে যে কারণটা অপেক্ষাকৃত সূক্ষ্ম সেটার দিকেও আমি নজর দিতে বলব। রাজনৈতিক তৎপরতার পুরান যে বাণীনির্ভর চর্চাগুলো ছিল, নানানভাবেই কর্মীরা সেগুলোর সীমানা কিংবা প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে ভাবছেন। এমন নয় যে, নতুন কালে ও নতুন বাস্তবতায় রাষ্ট্রব্যবস্থা ও বিশ্বব্যবস্থা, সরকার ও তার পেটোয়া বাহিনীগুলোকে কীভাবে মোকাবিলা করা যাবে তার সহজবোধ্য রাস্তা সবাই দেখতে পাচ্ছেন; কিন্তু ভাবনাগুলো জারি আছে। ফলে যদি কোনো সংগঠনের কর্মী এখন শারীরিক আঘাতের ঝুঁকিসমেত দেয়াললিখনের পরিবর্তে, কিছুকালের জন্য, সাইবারস্পেসে তাঁদের বার্তাগুলো দিতে থাকেন, সেটাকে একটা পদ্ধতিগত বিষয় হিসাবেই দেখি আমি।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

আরেকটা বিষয় হচ্ছে বাম সংগঠনগুলোর চিকা’র যে টেকস্ট আর সুবোধের যে টেক্সট তার মধ্যে খুব একটা ফারাক নেই, মোটা দাগে গ্রাফিতির চিত্রগত যে ভাষা, তার সাথেও দূরত্ব কম মনে হয়েছে। আপনার কী মত?

মানস: এবারে আমি অন্তত সহমত হব তা আপনি আমাকে নিয়ে তামাশা করলেও। আমার আলাপে এই অঞ্চলের বৌদ্ধিক-সাংস্কৃতিক বিকাশের যে ধারণায়ন হাজির করছিলাম, বা আরো নিখুঁতভাবে বললে, মধ্যবিত্তীয় বৌদ্ধিক-সাংস্কৃতিক বিকাশ, তাতে ভাবগাম্ভীর্য ও কাব্যিকতা কেন্দ্রীয়। এটা একটা পরিস্থিতি যা আসলে অনেক সূক্ষ্ম গবেষণা-তদন্তের দাবিদার। কয়েকটা মুখ্য চিন্তাপ্রত্যয় বা কনসেপ্ট ধরে আমরা দেখতে পাব যে বাম সংগঠনগুলোর ও ‘সুবোধ’ চিত্রকরদের টেক্সট বা বীক্ষণ আসলে কমবেশি একাকার – ‘প্রগতি’, ‘মুক্তি’, ‘আলো’, ‘অন্যায়’, ‘কষ্ট’, ‘মানবিকতা’, ‘মহত্ত্ব’, ‘দায়’; আরেকটু মনোযোগ দিলে আরো কয়েকটা বের হতে পারে। এটা এক হিসাবে তো খুবই আনন্দের অনুভূতি আমার জন্য যে ‘সুবোধ’-এর নির্মাতাদেরকে আমি বামপন্থী তৎপরতার অংশ হিসাবে দেখতে পাচ্ছি। তবে বসে বসে ভাবনাচিন্তা করার যেহেতু আমার সময় আছে – মানে আমাদের চাকরিতে তো আর কোদাল চালাতে হয় না – সেই অর্থে বলছি, আমি এসব প্রত্যয়ের কালোত্তীর্ণ প্রশ্নাতীত সর্বজনগম্য অটুট রাজনৈতিক অর্থ আছে বলে ধরে নিতে পারি না। এগুলো দুনিয়াতে ব্যাপক আলোচিত, তার থেকেও বেশি নিন্দিত, তাও না বলার কারণ নেই যে এসব প্রত্যয় ও ধারণায়ন অবসোলিট পর্যায়ে গেছে। কিংবা আমি বলতে চাই যে, এসব প্রত্যয় আনমনে এমন ভারী সব ‘মহত্ত্বধর্মিতা’ আশ্রয় করে ফেলেছে যা মর‍্যালিস্ট পাটাতনে ক্রিয়া করার ঝুঁকিতে আছে। শব্দসমূহকে নির্দিষ্ট কালে কেটেছিঁড়ে খোলতাই না করে নিলে তা নারায়ণ-শিলার মতো বিমূর্ত ও ভক্তিভারে জর্জরিত হয়ে পড়তে পারে। যিনি তাঁর বিরুদ্ধে জুলুম থেকে পরিত্রাণ চান, তিনি তা ‘মানবিক’ কারণে কিংবা ‘প্রগতি’র পথে যাবার জন্য চান না, এই জুলুম তাঁর জীবন হারাম করে দিয়েছে বলে চান। প্রত্যয়ের পুনঃপাঠ সহজেই ‘পোস্টমডার্ন’ বলে সাব্যস্ত হয়ে থাকে। আর তাতে দীর্ঘদিনের সংগঠনকারী বামপন্থীরা বিরক্ত হয়ে থাকেন।

তবে বাংলাদেশের বাইরে বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে গ্রাফিতি সততই সংগঠনকারী বামপন্থীদের বোঝাবুঝির সমান্তরালে বিকশিত হয়েছে তা নয়। বৈশ্বিক বামপন্থী সংগঠনগুলোও বহুবিধ। আবার গ্রাফিতিও বহুবিধ। বরং, কেউ কেউ বলতে চাইবেন গ্রাফিতিতে সংগঠন না-করিয়ে ‘এনার্কিস্ট’রা অধিক সম্পৃক্ত। এগুলো বিস্তর ও সূক্ষ্ম সব স্থানিক প্রবণতার সঙ্গে সম্পর্কিত করে দেখা লাগবে সম্ভবত।

বাংলাদেশের মেইনস্ট্রিম যে আর্ট বা তাদের যে দেয়ালচিত্র, বিভিন্ন জায়গায় বিশেষ করে চারুকলাগুলার আশপাশে দেখা যায়, তার সাথে গ্রাফিতি-চিকার সর্ম্পকটা কেমন আপনার কাছে?

মানস: চারুকলার আশপাশে যা হয়ে থাকে তার লিগ্যাসিকে অরাজনৈতিক বলব না, কিন্তু গ্রাফিতির গ্রাহ্য বা কাঙ্ক্ষিত চর্চা থেকে তা যোজন দূরে। অরাজনৈতিক যে না- সাব্যস্ত করলাম তার একটা ইতিহাস আছে। লক্ষ্য করেছেন নিশ্চয়ই, চারুকলার আশপাশের দেয়ালচিত্রগুলোর একটা মুখ্য অন্তঃসার হলো লোকচিত্রের সাথে সংযোগস্থাপন। চিত্রকলার ডিগ্রিপ্রদানকারী শাস্ত্রের মধ্যে পাশ্চাত্যীয় চিত্রকলার প্রতি যে প্রশ্নাতীত ভক্তি; পাঠ্যসূচি প্রণয়নের যে ঔপনিবেশিক ইতিহাস; পাঠ্যসূচিকে অপরিবর্তনীয় রাখার যে আমলাতান্ত্রিক স্থবিরতা (এবং ঔপনিবেশিক মনোগড়ন) তাতে দেয়ালের ওই ছবিগুলোকে সুষ্পষ্ট দরকষাকষি হিসাবে দেখতে হবে। সেটা কোনো শিক্ষার্থীর দল আঁকুন; আর তাঁদের সঙ্গে কোনো শিক্ষক-শিক্ষিকা যুক্ত থাকুন। অন্য ভাষায় বললে, কারিকুলামের মধ্যে যে রদবদলগুলো তাঁরা করলেন না, বা পারলেন না, বা চাইলেন না, বা আলসেমি করলেন, বা পক্ষ-বিপক্ষ তর্কের মধ্যেই শিক্ষাবর্ষ শেষ হয়ে গেল, সেগুলোর একটা প্রদর্শনী তাঁরা করছেন দেয়ালে। রাজনীতিটা সেখানে আছে।

আবার অন্যভাবে দেখলে, এই প্রদর্শনীটা প্রতিপক্ষীয় নয়, বা নাই আর, বরং জাতীয়তাবাদের নয়া-নয়া চেহারার উদ্ভাস ঘটানোর সঙ্গে সম্পর্কিত। জাতীয়তাবাদের সেইসব অংশ যেখানে ‘লোকজ’কে জাদুঘরীয় (তাই মৃত) বিবেচনা করে হলেও অন্তর্ভুক্তির বিবেচনা রাখে, সেই অংশের সঙ্গে সংশ্রব করা হয় এসব দেয়ালচিত্রে। তবে ৬০-এর দশকের পাকিস্তান রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে লড়াই, আবার ৮০-র দশকের সামরিক শাসনবিরোধী লড়াইয়ের তা প্রকল্পও বটে। ফলে, এসব পরিবেশন-প্রদর্শনকে পরিপ্রেক্ষিতের বাইরে রাখার সুযোগ নেই। ৮০ বা ৬০ দশকে যা ছিল শাসককে দেখানো ‘দেখো, তুমি যা চাও না, তা আমি করি’ যেসব মোটিফকে আশ্রয় করে বিকশিত হয়েছিল; সেই একই মোটিফের এখনকার প্রদর্শনের অর্থ হতে পারে ‘মানবি না? মানায়া ছাড়ব কী আমাদের হাজার বছরের ঐতিহ্য/পরিচয়’। মোটিফ যে তার পরিপ্রেক্ষিতের বাইরে ভোঁতামাল তা আমাদের সেমিওলজিতে ডিগ্রি ছাড়াই বুঝতে পারার কথা। আপনার প্রশ্ন থেকে আমি সরিনি। আবার একবাক্যে বলার বদলে ভাবনাপ্রবাহটি রাখতে চেয়েছি।

ওগুলো গ্রাফিতির চরিত্র ধারণ তো করেই না, বরং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ‘লোকপ্রীতি’র অধিক জাতীয়তাবাদের হুমকিমূলক আর্কাইভে পরিণত হয়ে পড়েছে। 

আর্টিস্ট: ক্রো-কাক, চারুকলা ইন্সটিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

টাকার গায়ে লেখা বা পাবলিক টয়লেটের দেয়ালে বা পার্কে, বাসের সিটে যে লিখালিখি এগুলোকে কি গ্রাফিতি বলা যায়?

মানস: এটা একটা দারুণ জায়গা। তবে সেই গোড়ার সতর্কতাটাই আবার হাজির করতে চাইব। নামকরণ কী হবে তা নিয়ে আমরা শক্ত হয়ে বসে থাকলে প্রকরণগত বৈশিষ্ট্যগুলো নিয়ে মনোযোগ পাতলা হয়ে যেতে পারে। গ্রাফিতির অনুগ্রাহী যাঁরা তাঁরা নিশ্চয়ই আপনি যেসব উৎপাদ নির্দেশ করলেন সেগুলোকে গ্রাফিতি নামকরণে না-রাখতে চাইতে পারেন। মাত্র কিছুকাল আগেও ‘মিস্ত্রী’ শব্দটার মধ্যেই, ‌‘কারিগর’-এর মধ্যে তো বটেই, শৈলী-দক্ষতা-কল্পনার স্বীকৃতি ছিল। কাঠমিস্ত্রী 

বা রাজমিস্ত্রী যে ময়ূর খোদাই করলেন বলেই ‘শিল্পী’ তা নয়, বরং তাঁর সামগ্রিক কর্মসম্পাদন-সংগঠনের স্বীকৃতি ঐ শব্দ ধারণ করতে পারত। পারত কি? হ্যাঁ পারত, যদি শব্দটির প্রবক্তা/উচ্চারক ঐ মামুলি পেশা-ইতিহাসটুকু ও প্রশিক্ষণ-পরম্পরাটুকু মনে রেখে শব্দটা উচ্চারণ করতেন। আজকে আপনি পাশে উকিল-ব্যারিস্টার আর ইতিহাসের হালিখানেক অধ্যাপক রেখেও যদি ‘মিস্ত্রী’ শব্দটি উচ্চারণ করেন, এর মধ্যে আর ‘শিল্পী’ বা ‘রূপকার’ সত্তা ভরে দিতে পারবেন না। বর্গ ও প্রত্যয়ের এই জীবনচক্র আছে, রাজনৈতিক লড়াই আছে। তেমনি, হিটলার মানুষ মারতেন বলে তাঁর চিত্ররস/পেইন্টি-এপ্রিসিয়েশন এর আরেকটা নাম দেয়া যায় না যাতে হত্যাকারী নন এমন ‘খাঁটি’ চিত্ররসিকদের থেকে তাঁকে আলাদা করা যায়। এসব সঙ্কট আপনি আমি এক খোঁচায়, এক আলাপে নিষ্পত্তি না করলেই মঙ্গল হবে।

যে কারণে আমি এটাকে দারুণ জায়গা বললাম, সেটা এর প্রকরণগত বৈশিষ্ট্যের কারণে। ঢাকার কিছু উচ্চমধ্যবিত্ত অঞ্চলে দেয়ালে ছিটারঙ দিয়ে যে চর্চাগুলো হতো, টাকা বা টয়লেটের চর্চাগুলোর সঙ্গে তা সামঞ্জস্যপূর্ণ। এর সবগুলোতেই (পুরুষের) যৌনবাসনা ঘোষণা করার বার্তা থাকে। ঘোষণা বললাম বটে, অনেক ক্ষেত্রেই তা উদ্দীষ্টের জন্য হুমকি হিসাবে পঠিত হতে পারে। টাকার কারুকাজে একটা বাড়তি দিক আছে যা টয়লেট বা বনানীর দেয়ালে তেমন পাওয়া যায় না। সেটা হলো ফোন নম্বর দেয়া। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ফোন নম্বরটা বেশুমার তমিজ ও আকুতিসমেত দেয়া হয়ে থাকে (প্লিজ কল করেন)। তবে সাধারণত নিস্পৃহ নম্বর প্রদান ঘটে থাকে। পাবলিক টয়লেটে কখনো ফোন নম্বর দেখিনি তা বলব না। কিন্তু একটা হেটারোসেক্সুয়াল পরিমণ্ডলে টাকা ও টয়লেটের লিঙ্গভেদ যে এক নয় তা মানবেন নিশ্চয়ই। টাকা নানারকম লিঙ্গের হাতেই পড়তে পারে। কিন্তু তেমন গুরুতর বিপর্যয় না হলে টয়েলেট দ্বিলিঙ্গবিশিষ্ট। কিন্তু তারপরও কমন-টয়লেট বা টয়লেট সিরিজগুলোর (যেমন লাইন দিয়ে রেলের টয়লেট) যেখানে অভিন্ন প্রবেশপথে একবার দুবার ফোন নম্বর আমার চোখে পড়েছে।

চিত্রকর্মের ক্ষেত্রে একটা গুরুতর পার্থক্য টাকা, টয়লেট ও বনানী দেয়ালে আছে। প্রাক-সুবোধ স্প্রে চর্চায় ঢাকাতে আমি খুব মূর্ত ছবি দেখেছি বলে মনে করতে পারি না। একটা বা দুটো জায়গায় ‘শিশ্ন’ আঁকার চেষ্টা হয়েছে আমি মনে করতে পারি। চিত্রশৈলী বাদ দিলেও, ওগুলোর পাশের হরফগুলো ঠিক ইংরাজি-জাননেওয়ালা স্প্রে-চিত্রকরদের বলে মনে হয়নি। টাকায়, পক্ষান্তরে, চিত্রকর্ম করার জায়গাই কম থাকে। আগে টাকায় বাঘের জলছবির উপর সাদা অংশটা চিত্রকর্মযোগ্য ছিল, এখন সেটাও অত সাদা নেই। টাকাতে আগের তুলনায় চিত্রকর্ম ও বাণী দুই-ই কমে আসছে তা বলতে পারি। সম্ভবত মনিটরিং বেড়েছে। টয়লেট-বাস-পার্কেরগুলোতে এই চর্চার গুরুতর মাত্রাবদল হয়নি সম্ভবত। এগুলোর নাম যদি গ্রাফিতি দিতে চানই, আমি গ্রাফিতির জঁরাভাগ করার পক্ষে। আমি তাহলে গ্রাফিতির মধ্যকার একটা অণুবর্গ বা সাবসেটে রাখতে চাইব। যদি নামটাও আমাকেই দিতে বলেন তাহলে, একাডেমিক স্বাদ রাখতে চাইলে, দিতে পারি “মেইল সেক্সুয়াল ড্রাইভ/ফ্যান্টাসি গ্রাফিতি” বা বাংলায় হবে “পুরুষের যৌনতাড়না/কল্পনা দেয়ালচিত্র”। আর যদি আপামর গ্রামদেশীয় ভাষারাজ্যের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন, তাহলে বলব “পুরুষের চ্যাগানো গ্রাফিতি”। 


মানস চৌধুরী

আদাবর। ২৭ মার্চ ২০২১

">

x

x

x

x

x

লেখা সম্পর্কে মন্তব্য

টি মন্তব্য

%d bloggers like this: