home বই পরিচিতি পাণ্ডুলিপি করে আয়োজন — ‘কয়েক লাইন হেঁটে’ ।। রিমঝিম আহমেদ

পাণ্ডুলিপি করে আয়োজন — ‘কয়েক লাইন হেঁটে’ ।। রিমঝিম আহমেদ

কবিতা কখন থেকে লিখতে শুরু করেছি সে হিসেব জানি না আজও , তবে লিখতে শিখেছি যখন, (তৃতীয় শ্রেণিতে সম্ভবত) তখন থেকেই লেখার শুরু। স্কুলের খাতায়, ডায়রিতে…। সেই লেখাগুলো ছিল আমার মানুষবিচ্ছিন্নতার একমাত্র কৌশল সচেতনভাবে হোক বা অবচেতনে। আমাদের ছিল মাটির ঘর। মৃত মায়ের উদ্দেশ্যে কিছু বলতে ইচ্ছে হলে সে মাটির দেয়ালগুলোর সাথে বিড়বিড় করতাম। কতসময় কতজন দেখে ফেলেছে আমাদের (দেয়ালের নৈঃশব্দ্যও একপ্রকারের ভাষা নয় কি আমার কাছে!) এই বিড়বিড় করে কথা বলা! সংকোচে গুটিয়ে নিতাম পরক্ষণে। বাড়ির পাশেই পাহাড়ের ঢালু অংশটায় গ্রামের কবরখানা। নিচেই মায়ের কবর। কুরচিফুলের গাছের নিচে বসে মাকে লিখেছি হাজারো চিঠি। কেউ দেখেনি। আনাড়ি হাতের অক্ষরে ডায়েরি ভরেছে। তখন তো আমি নেহাতই বাচ্চা মেয়ে, চুলের ফিতে লাগাতে হলে, স্কুলের জামাটা নোংরা হলে কিংবা স্নানের সময় পিঠ ঘসে দিতে হলে মায়ের যে হাত, তাকে আমি ভীষণ মিস করতাম। এখনো করি। পার্থক্য এই, এখনকার পরিধিটা বিস্তৃত হয়েছে আরো। জায়গা করে নিয়েছে আরো অনেক কোলাহল। এখন কেবল নিজের সাথে নিজের কথা বলা। আমি কি কবিতা লিখি, নাকি নিজেকে লিখি? এই মীমাংসায়  যাওয়া হবে না কখনোই।

জীবন থেকে তো মানুষ পালাতে পারে না, সে কবি হোক, অথবা ব্যবসায়ী। জীবীকার প্রয়োজনীয়তা যখন অগ্রগণ্য হয়ে দাঁড়ায়, তখন পরিবার থেকে, সংসার থেকে পালালেও বাস্তবতা থেকে পালাতে পারিনি। প্রায় আড়াই বছরের একার জার্নি বারবার কবিতার গতিপথ বদলে দিয়েছে। ভেবেছি এক, হয়েছে আরেক। তখন কবিতাকে তার নির্দিষ্টের দিকেই যেতে দিয়েছি। বুঝতে পেরেছি ছন্দটা আমার সহজাত। স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি বলে জোর করে মাত্রা মেপে লিখতে হয়নি। চাইলেই সন্তানকে ছুঁতে না পারা, প্রিয় মানুষটির মুখ, জ্বরের ঘোরে কোন স্পর্শ কামনা, এবং না পাওয়া…। তারপর কিছুটা সয়ে যায়। সয়ে না যাওয়াগুলোই আমার কবিতা।  

সম্পর্কের প্রতি একপ্রকারের একনিষ্ঠতার ঝোঁক আছে আমার। কোন একটা নির্দিষ্ট সম্পর্কের প্রতি নিমগ্ন থাকাকালে, সে যদি বন্ধুও হয়, এবং তার সাথে যদি সম্পর্ক শীতল হয়, দুটো মানুষের মধ্যিখানে দূরত্বের পলি জমে তখন আমার ভেতর এক প্রকারের হাহাকার তৈরি হয়। সে হাহাকার বারবার আমাকে নিয়ে গেছে কবিতার দিকে। একলা মাঠে প্রবল রোদ্দুরস্নাত দুপুরের মতো কোন উত্তপ্ত মুহূর্তে আশ্রয়ের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে কবিতা। আত্মবিধ্বংসী বোধের পীড়ন, সেসকল রক্তাক্ত শব্দ, মুহূর্তের আনন্দের ফুলকি নিবিষ্ট হয়েছে কবিতায়।

একা থাকার দিনগুলোতে, মানে এখনও যেহেতু একাই থাকা হয়, প্রকটতর হয়ে উঠেছে নৈঃসঙ্গ, আত্মহত্যাপ্রবণতা, সে চেষ্টায় ব্রত হয়ে, এবং মৃত্যুযোগ থেকে ফিরে এসে প্রবলভাবে নিজের ভেতর গুটিসুটি ঢুকে পড়া, এমনকি ডিপ্রেশনের পিলগুলি, বন্ধুর ভান, মানুষের উপেক্ষা, তদুপরি কোন কোন ভালোবাসার মুহূর্ত এইসব অভিজ্ঞতালব্ধ জার্নি আষ্টেপৃষ্ঠে কবিতায় জড়িয়েছে । নিজেকেই লিখেছি উল্টেপাল্টে। সে সময়টায় কারো কথা, কোন একক বা বহুতক পাঠকের কথা মাথায় আসে না। কিন্তু, একার সংগীতও তো সমগ্রকে ছোঁয়! ছুঁয়ে গেলেই তা হয়ে ওঠে নৈর্ব্যক্তিক। আমার ধারণা, কবিতাগুলো একার গণ্ডি পেরিয়ে সমগ্রের কাছে যাবে।

‘কয়েক লাইন হেঁটে’ নামটা ভাবার আগেও কত কত নাম ভেবেছি! পরে এটাই চূড়ান্ত হল। কবি জয়ন্ত জিল্লুকে কৃতজ্ঞতা বইয়ের নাম বাছাইয়ে এগিয়ে আসবার জন্য।  আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার গল্প জড়িয়ে আছে এ নামের সাথে, হয়ত বলছি না, হয়তো কবিতাতে-ই সব বলা হয়ে যাচ্ছে । কিছু ঘটতে অনেকদূর যেতে হয় না মানুষের। কিছু তো থাকে অনিবার্য ভবিতব্য। এখানে দূরত্ব মূলত সময়। কয়েক পা হাঁটলে আমরা কারও দেখা পাই, পাশাপাশি হাঁটি, মনের কাছে পৌঁছই, ফের বিচ্ছেদের কাছে। সেটা যদি অভ্যাসও ধরে নিই, প্রতিদিনের জমে যাওয়া কয়েক লাইন আমাদের  উত্থানে যেমন ভূমিকা রাখে, তেমনি পতনেও, নিমজ্জিত করতে পারে অকূল পাথারেও। এই বইয়ের কবিতাগুলো মূলত আমার কয়েক লাইন হেঁটে নিজের কাছে ফিরে আসার আখ্যান। গত দুই বছরের  কিছুটা বেশি সময়ে অন্তর্গত সত্তায় ঠাঁই করে নেয়া প্রতিটি হাওয়ার নিঃশ্বাস, মানুষের মুখ, ফুল-পাখি-লতাপাতাবেষ্টিত নৈসর্গ যেমন জড়িয়ে আছে, আছে সে একাকী দাঁড়িয়ে থাকা চুনকামহীন চারতলা ভবনের জানালা, ওপারে মাঠ, অসাবধানে ঘরে ঢুকে পড়া চড়ুই, তার বের হওয়ার আকুতি, ডানায় সন্ধ্যেমাখা বাদুড়েরর দল, হাইওয়ে, চাকার ঘর্ষণ, কালোপিচ, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বাস্তুহারা হওয়ার বেদনা- আর খুব করে সমুদ্র। কয়েক লাইন হেঁটে জিরোবার একটা ব্যাপারও তো থেকে যায়, তাই নয় কি?  

‘লিলিথের ডানা ‘ আমার প্রথম বই। সবরকমের কবিতা-ই আছে সেটাতে। প্রথম বই দিয়ে নিজেকে জানান দেয়ার একটা সুক্ষ্মবাসনা ছিল। কিন্তু এবারের বইটা বাঁকঘুরে অন্যপথে চলার শুরু। জার্নি তো সুদূরের। এই বইয়ে টানা গদ্যের কোন কবিতা নেই। বাংলা ছন্দের প্রধান তিনটি শাখায় লেখা কবিতাগুলো ঠাঁই পেয়েছে এখানে। প্রথম ভাবনা ছিল, দীর্ঘ কবিতাগুলো দিয়ে বই করা হবে। পরে দীর্ঘকবিতা কয়েকটা রেখে, অন্যান্য কবিতার সাথে মিলিয়ে মলাটবন্দি হচ্ছে।

ঋণ শোধ করতে চাই না সেসব বন্ধুদের যারা আরো ঋণী করবে বলে পাশে আছে। কৃতজ্ঞ শব্দটাও খুব অপ্রতুল কোন কোন মানুষের ঋণ প্রকাশের জন্য। তাছাড়া, আমি তো ঋণীই থাকতে চাই…



             ‘কয়েক লাইন হেঁটে’ পাণ্ডুলিপি থেকে কবিতা

 

মানুষ, মাটিহীন

তোমাকে ডাকি না আমি, তোমার ভেতর থেকে শুধু
আমাকেই ডাকি, আয়! এই পাকচক্রে গলে হার
না দেখার অজুহাতে। সভ্যতার চারপাশে ধস
আমাদের পথ বাকি নেই আর, ফিরে তাকাবার

তোমার ভেতরে কবে আমাকেই গুঁজে দিয়ে আসি!
শূন্যতম বিন্দু থেকে রেখা টেনে কার কাছে যাই!
শিশুদের শব এই পথে পথে ছড়ানো রয়েছে
তাদের মাড়িয়ে যাই, ডিঙোবার সাহস তো নাই

ধর্মের শেকড় বাড়ে চুরি গেল সব এবাদত
দেশ নেই, রাষ্ট্র নেই, জলে-জলে বেহুলা-ভাসান
বারোমাস ভিক্ষা করে একফালি মাটির আস্বাদ
মানুষ বেড়ায় খুঁজে, চাঁদের আলোও আজ ম্লান
আমাকেই খুঁজি আজ তোমার ভেতর থেকে আমি
ভেবে নিয়ে পূত গঙ্গা অতল সমুদ্রে রোজ নামি।

 

 

কেউ একজন

ভাবছি এ অন্ধকার নয়, কুয়াশা
মশারি-টাঙানো ঘরে ইন্দ্রজাল মেলে আছে
স্বপ্ন নয়, মেঘের ভেতর শুয়ে আছি
নীলাভ্র বিছানাময় সাপ খেলা করে
রানি আর রাজা সাপ, তাদের মণিতে
চড়ুইপাখির ছায়া, অদূরে স্বর্গের নদী
কুয়াশার অন্তরালে কেউ একজন
দাঁড়িয়ে রয়েছে, তার একচোখে আমার পিতার লাশ
অন্য চোখে প্রণয়ের হাতছানি!

 

 

তপ্তশ্বাস

আমার নিশ্বাসে তুমি উড়ে যাচ্ছ, গাংচিল
আগামী বসন্তে এসো, রক্ত ও পায়েসে অন্নপ্রাশন হবেই

মিঠেপানি নদী ছেড়ে
বরফগলা সমুদ্র ছেড়ে
পাথরের পাহাড়ের দিকে
যেখানে ছড়িয়ে আছে প্রাচীন মানুষ
খুলি ও হাড়ের বন, আঙুল-খুইয়ে-আসা প্রেমিকের হাত
যার স্পর্শ থেকে বেড়ে ওঠে রক্তজবা ভ্রূণ

আমার নিশ্বাসে তুমি পুড়ে যাচ্ছ…

 

 

সাইকেল

সাইকেল চালানোর শখে মগ্ন ছেলেবেলা
টলোমলো পায়ে ঘুরে পৃথিবীর ভার
বেণুকে পড়ছে মনে, সাইকেলের কথা—
মিয়াজি বাড়ির সেই সরল উঠোন…

রানি মুখার্জিকে বেণু ভালোবেসেছিল খুব
নাচের ভঙ্গিতে তুলে রাখে মহাকাল

এখনও স্মৃতির ভাঁজে আধবোজা সেই দিন
সমস্ত মৌনতা ভেঙে ভেসে আসে যেন
সাইকেল-ঘণ্টাধ্বনি আর চাকার ঘূর্ণন
মাঠের ওপারে শুয়ে সারিবাঁধা শব
মগ্ন শিশুকাল ফেলে বেণু হেঁটে যায় ক্রমে
ছায়া নিয়ে পিছু হাঁটে অন্য কোনও শিশু

সংসার সন্তান আর বাটনা বাটার তোড়ে
উড়ুক্কু ঘুড়ির মতো ভোকাট্টা-শৈশব
হাঁড়ির বলয়ে রেঁধে ঘূর্ণিত বেদনা যত
কালশিটে পড়ে হাতে। চোখে সাইকেল…

তখনও কোথাও প্রিয় রাধাচূড়া যাচ্ছে ডুবে
খয়েরি রক্তের মতো তরল আঁধারে

 

 

জ্বর

ভোরবেলা জ্বর ডাকি
দুধের সরের মতো জ্বর
ঘন হয়ে আসে…

জ্বর হলে ঘোর আসে
ঘোরে চেপে আসে স্মৃতি
স্মৃতি, সরলা অতিথি
জানে না ভদ্রতা সেও
কেবল ছোঁয়ার লোভে
ঘন হয়ে বসে থাকে

 

লেখা সম্পর্কে মন্তব্য

টি মন্তব্য