home আলাপচারিতা পবিত্রকুমার সরকারের সাক্ষাৎকার ।। আলাপকারী: পাবলো শাহি

পবিত্রকুমার সরকারের সাক্ষাৎকার ।। আলাপকারী: পাবলো শাহি

বিজেপি সংখ্যাগুরু হিন্দুদের দলে টানতে চাইছে। এজন্য তারা মমতা ব্যানার্জীর বিরুদ্ধে ‘মুসলিম তোষণ’ এর অভিযোগ এনেছে। এছাড়া ভারত- বাংলাদেশ সীমান্তে অনুপ্রবেশের প্রচার তো আছেই। ভবিৎষতের পক্ষে এ প্রচার রাজনৈতিক কারণে বিপদজনক।



ভারতের প্রখ্যাত সাংবাদিক ও প্রবন্ধকার পবিত্রকুমার সরকার। পূর্বতন সোভিয়েত ইউনিয়ন, চেকোশ্লোভাকিয়া ও জার্মানিতে তাঁর পেশাগত অভিজ্ঞতা অর্জন। নেলসন ম্যান্ডেলা, ইন্দিরা গান্ধি, রাজীব গান্ধি, ড. মনমোহন সিংহ, শেখ হাসিনা-সহ দেশ বিদেশের বিশিষ্ট রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সঙ্গে নানান সময়ে মুখোমুখি হয়েছেন। ১৯৯৮ সালে বঙ্গবন্ধু যমুনা সেতু উদ্বোধনে আন্তর্জাতিক সাংবাদিক দলের (মার্ক টালির) সঙ্গে আসেন বাংলাদেশ সফরে। ২০০৩-এ দিল্লিতে আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট পার্টিগুলোর বৈঠক কভার করেন। ১৯৬৭ সালে রাজনৈতিক আন্দোলনে অংশ নিয়ে পুলিশের মারে গুরুতর জখম হন। বাহান্ন বছর ধরে সাংবাদিকতা পেশায় যুক্ত; আনন্দবাজার, টেলিগ্রাফ, যুগান্তর, আজকাল, বর্তমান, পরিচয়-সহ নানা পত্রিকায় লিখেছেন। বর্তমানে দৈনিক কালান্তরের সম্পাদকমণ্ডলীর কার্যনির্বাহী সভাপতি। ‘পূর্ব পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ’ (১৯৭১) ও ‘সম্পাদক: রবীন্দ্রনাথ’(২০০৩) তাঁর  বহুপঠিত গ্রন্থ।

১৩ জুন পবিত্রকুমার সরকারের সঙ্গে কথা হয় তাঁর কলকাতার সল্টলেকের বাড়িতে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন—  ড. পাবলো শাহি।



পাবলো শাহি: ১৯৯৮ সালে যমুনা সেতু উদ্বোধনে আন্তর্জাতিক সাংবাদিক দলে আপনিও আমন্ত্রিত হয়েছিলেন। এছাড়া বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে ১৯৭১-এ আপনার ‘পুর্ব পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ’ পুস্তিকা সাড়া জাগিয়েছিল। বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের জন্য আপনি নিজে উদ্যোগ নিয়ে কলকাতায় অর্থসংগ্রহ করেছেন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ক’রে। একাত্তরের সেই অনুষ্ঠানে কবি সাংবাদিক আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী, কাজি সব্যসাচী, সুচিত্রা মিত্র প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন- আপনিও উপস্থিত ছিলেন কালান্তরের দেশবরেণ্য সাংবাদিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসবেত্তা হিসাবে। আপনি না থাকলে ইতিহাস ও রাজনীতির এই গুরুত্বপূর্ণ কালখণ্ডের অনেক তথ্য আমাদের অজানা থেকে যেত। আল্লা বক্সকে দিয়ে শুরু করি।

পবিত্রকুমার সরকার: ভারতীয় উপমহাদেশে স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাস চর্চা করতে হলে সিন্ধ প্রদেশের বীর শহিদ আল্লা বক্সের কথা প্রথমেই উল্লেখ করতে হবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত তিনি এক বিস্মৃতপ্রায় ব্যক্তিত্ব। অথচ অখণ্ড ধর্মনিরপেক্ষ ভারতবর্ষের  পক্ষে দৃঢ়ভাবে দাঁড়াবার কারণে ১৯৪৩-এর ১৪ মে মুসলিম লিগের ভাড়াটে গুণ্ডাদের হাতে তিনি খুন হন। স্বাধীন ভারতে সাম্প্রদায়িকতা রোধে অনশন করে ১৯৪৮-এর ৩০ জানুয়ারি গান্ধিজি হিন্দু সাম্প্রদায়িক সংগঠন আরএসপন্থী লাথুরাম গডসের গুলিতে নিহত হন। ভারত মহাত্মাজির এই আত্মদান দিবসকে শহিদ দিবস রূপে পালন করে। অনুরূপভাবে বাংলাদেশে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের মদতপুষ্ট ষড়যন্ত্রীদের হামলায় ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে নৃশংসভাবে নিহত হন বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশের জাতির জনক শেখ মুজিবর রহমান। গোটা বাংলাদেশে মুজিবের শহিদ মৃত্যু শ্রদ্ধায় স্মরণ করা হয়। কিন্ত আল্লা বক্স পাকিস্তানবিরোধী ছিলেন। সে দেশে তিনি ব্রাত্য, আর ভারত ও বাংলাদেশে তিনি যেন অশ্রুতপ্রায় নাম। উল্লেখ করা যেতে পারে ১৯৩৮-৪০ ও ১৯৪০-৪২ তিনি দু‘দফায় সিন্ধ প্রদেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। আসলে মুসলিমদের একটি প্রভাবশালী অংশ যে ভারতভাগের বিরোধী ছিলেন, সেটা জানানোই হয় না। আজ যারা ভারতে শাসন ক্ষমতায় রয়েছে সেই বিজেপি দল মনে করে, প্রচার করে ভারতভাগের জন্য মুসলমানরা দায়ী, স্বাধীনতা এনেছে মূলত হিন্দুরাই। ওরা আল্লা বক্সের কথা ভুলেই থাকবে। তার চেয়েও বড় কথা, ১৯২১ সালে আহমেদাবাদে কংগ্রেস অধিবেশনে কবি ও বিশিষ্ট পণ্ডিত মওলানা হজরত মোহানি-ই প্রথম ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতার প্রস্তাব আনেন। সেটি প্রায় গৃহীত হচ্ছিল। কিন্ত গান্ধিজির প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপে সেটি শেষ পর্যন্ত গৃহীত হয়নি।

পাবলো শাহি: আব্দুল গাফ্ফার খান ওরফে সীমান্ত গান্ধি বিষয়ে এখন ইতিহাস নিশ্চুপ, তাঁকে এই হিংসা ও অপরাজনীতির ডামাডোলময় সময়ে তুলে আনা দরকার।

পবিত্রকুমার সরকার: গাফ্ফার বা বাদশা খান নিয়ে ইতিহাস নিশ্চুপ নয়। বিশ্বের নানান প্রান্তে এই মানুষটিকে নিয়ে চর্চা হচ্ছে এবং আজকের দুনিয়ায় তাঁর প্রাসঙ্গিকতা বেশি বেশি করে অনুভূত হচ্ছে। এই তো কয়েক বছর আগে আমেরিকার শিশুপাঠ বইতে বাদশা খানকে বিশ্বের ২৬ জন সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তির দলে স্থান দেওয়া হয়েছে। তাঁকে নিয়ে তথ্যচিত্র বানানো হয়েছে। আমার মতে তাঁর মত এত বড় রাজনৈতিক নেতা এ উপমহাদেশে জন্মায়নি ভারতের গান্ধিজি, বাংলাদেশের মুজিবুর রহমানকে মাথায় রেখেই বলছি। বাদশা খান ১৮৯০ সালে জন্মেছিলেন, ১৯৮৮ সালে মারা যান ৯৮ বছর বয়েসে। তারপর অন্য শতাব্দী শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে তিরিশ বছর কেটে গেছে। কিন্তু তিনি পাহাড়ের মত অটল রয়েছেন। জীবনের ৫৪টা বছর তাঁর কারাগারে বা ঘরবন্দি অবস্থায় কেটেছে। মৃত্যুর সময়ও গৃহবন্দি ছিলেন। দক্ষিণ আফ্রিকার নেলসন ম্যান্ডেলা ২৭ বছর জেলে ছিলেন। বাদশা খান তাঁর সমতুল্য নেতা— এই অশান্ত পৃথিবীতে শান্তির দূত। সবচেয়ে বড় কথা যে পাকিস্তান তাঁকে জীবদ্দশায় যথাযোগ্য সন্মান দেয়নি, সেখানেও তিনি আজ অনাদ্রিত।

পাবলো শাহি: বাংলাদেশের তথাকথিত নির্বাচন ও ভারত সরকারের সমর্থন নিয়ে কিছু বলুন। বিগত দশ বছর বাংলাদেশে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লিগের সরকার চলছে। এই সরকার রাজনৈতিক সমর্থন …

পবিত্রকুমার সরকার: কখনও কখনও মৌলবাদী শক্তির সঙ্গে আপস করলেও এটি মূলত গণতান্ত্রিক সরকার। জঙ্গিবাদ দমনে এই সরকারের সাফল্য প্রশ্নাতীত, বিশেষ করে কট্টর মৌলবাদীদের অনেককে বিচার প্রক্রিয়ায় এনে ফাঁসিতে ঝুলিয়েছে। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে দেশে অনেকখানি স্থিতিশীলতা এসেছে— শিশু মৃত্যুর হার কমেছে, কৃষি উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি ঘটেছে, জীবনযাত্রার মানও বেড়েছে। কিন্তু আওয়ামী লিগ কেন কৌশলে সংসদীয় নির্বাচনকে পূর্ণ প্রতিনিধিত্বমূলক করতে দ্বিধাগ্রস্ত? ২০১৪ এর সংসদীয় নির্বাচন বেগম জিয়ার বিএনপি বয়কট করেছিল এবং এতে আওয়ামী লিগ লাভবান হয়েছিল। দেখে-শুনে মনে হয়েছিল, এ ব্যাপারে ভারত সরকারের প্রছন্ন সমর্থন ছিল। কারণ আওয়ামী লিগ ভারতের স্বাভাবিক মিত্র বলে পরিচিত। কিন্তু বারবার সংসদ নির্বাচন এড়িয়ে গেলে একদলীয় স্বৈরতান্ত্রিক শাসন কায়েম হতে পারে। যার সুযোগ কিন্ত মিলিটারি নিতে পারে। নির্বাচনে সবসময় একদল জিতবে এটা ভাবা কোনমতেই উচিত নয়। ২০১৮-র বাংলাদেশ সংসদ নির্বাচন ৩১ অক্টোবর— ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে হবে, আশা রাখি। ভারত সরকারেরও এটা মানা উচিত।


যারা ভারতে শাসন ক্ষমতায় রয়েছে সেই বিজেপি দল মনে করে, প্রচার করে ভারতভাগের জন্য মুসলমানরা দায়ী, স্বাধীনতা এনেছে মূলত হিন্দুরাই। ওরা আল্লা বক্সের কথা ভুলেই থাকবে। তার চেয়েও বড় কথা, ১৯২১ সালে আহমেদাবাদে কংগ্রেস অধিবেশনে কবি ও বিশিষ্ট পণ্ডিত মওলানা হজরত মোহানি-ই প্রথম ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতার প্রস্তাব আনেন।


পাবলো শাহি: বিশ্বময় মিডিয়ার সন্ত্রাস ও রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস এখন গ্লোবাল পৃথিবীর প্রাণকাণ্ড- যা মনুষ্যত্ব বিকাশে হুমকি হয়ে দেখা দিয়েছে। কলকাতা ২৪, আনন্দ, দৈনিক যুগশঙ্খ, দৈনিক জাগরণ সাম্প্রদায়িক উস্কানিমূলক সংবাদ পরিবেশন করছে বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। অনেকেই মনে করেন এর পেছনে অর্থ ও রাজনৈতিক সম্পর্ক আছে?

পবিত্রকুমার সরকার: বিষয়টি জটিল ও সর্বব্যাপক। এক কথায় শেষ করা সম্ভব নয়। একথা অস্বীকার করা যায় না যে, মানবসভ্যতার অগ্রগতি ও বিকাশে মিডিয়ার সার্বিক অবদান রয়েছে। সংবাদপত্র, বেতার, দূরদর্শন ছাড়িয়ে এখন স্যোশাল মিডিয়ার দাপট। বৃহৎ পুঁজিচালিত বড় বড় সংবাদপত্র, বৈদ্যুতিন মাধ্যম কিছুদিন আগে পর্যন্ত মনোজগৎকে নিয়ন্ত্রণ করত ও কনসেপ্ট মেকিংয়ে বড় ভূমিকা নিত। এখনও তা-ই করে, বিশেষ করে লাতিন আমেরিকা ও এশিয়া-আফ্রিকার দেশগুলোতে। কিন্তু স্যোশাল মিডিয়ার আবির্ভাবে সত্যকে জানা সহজ হয়েছে। তবে এতে জল মিশে থাকে, কেউ কেউ উড়ো খবর ছড়িয়ে মানুষের মন বিষিয়ে দিচ্ছে, সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ছড়াচ্ছে। এ ব্যাপারে সতর্ক হতে হবে। স্যোশাল মিডিয়ার যুক্তিবাদী ভাবনা প্রকাশ করে বাংলাদেশে ব্লগাররা কী বিপদেই না পড়েছেন! ধর্মীয় মৌলবাদীদের হাতে অভিজিৎ বায়-সহ সাম্প্রতিক শাহজাহান বাচ্চুর মতো অনেকেই তো জীবন দিলেন। সরকার ও প্রশাসন একটু কঠোর হলে এই বিপদ মোকাবিলা করা সহজ হত। অনুরূপ যুক্তিবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতার পক্ষে দাঁড়িয়ে ভারতেও তো কমজন প্রাণ দেয়নি— নরেন্দ্র দাভলকর, গোবিন্দ পানসারে, কালদুর্গি, সাংবাদিক গৌরী লঙ্কেশ ও অতি সম্প্রতি কাশ্মীরের জনপ্রিয় সাংবাদিক সুজাত বুখারি। এরা প্রচলিত ধর্মীয় মৌলবাদ ও রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের শিকার। এতো গেল একটা দিক। অন্য দিক হচ্ছে— সংবাদপত্র ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার অর্থ হচ্ছে মিডিয়া মালিকের স্বাধীনতা। মিডিয়া মালিক আবার সাধারণত পুঁজিতন্ত্র— সমাজতন্ত্রের ও কর্পোরেট পুঁজির পরিপোষক। গোটা লাতিন আমেরিকায় এরা সাম্রাজ্যবাদবিরোধী গণঅভ্যুথানের প্রত্যক্ষ বিরোধী ও প্রতিরোধী। বহুদিন আগে কিউবার বরেণ্য নেতা ফিদেল কাস্ত্রো ‘সমতাভিত্তিক আন্তর্জাতিক তথ্য ব্যবস্থা’র ডাক দিয়েছিলেন। প্রকৃত গণতান্ত্রিক ও মানবিক সংবাদ মাধ্যমের জন্য সেটাই জরুরি।

পশ্চিম বাংলার সংবাদপত্রগুলি ১৯৬৪-৬৫ সালের পর থেকে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ও প্ররোচনামূলক সংবাদ প্রকাশ করে না। এ ব্যাপারে একটা অলিখিত বোঝাপড়া আছে। সাধারণভাবে ও সংকুচিত অর্থে ওরা ধর্মনিরপেক্ষতা ও গণতন্ত্রের পক্ষে দাঁড়ায়। তবে কয়েকটি বৈদ্যুতিন মাধ্যম, দৈনিক যুগশঙ্খ, দৈনিক জাগরণ জাতীয় কাগজ হিন্দুত্ববাদী দল বিজেপির রাজনৈতিক লাইন প্রচার করে থাকে। বহুল প্রচারিত বাংলা দৈনিক বা সাপ্তাহিকগুলির মধ্যে ইদানিং বর্তমান কিছুটা হলেও বিজেপির রাজনৈতিক ও আদর্শগত অবস্থান সমর্থন করছে। কিন্তু ওই কাগজটি ধর্মীয় মৌলবাদ ও জঙ্গি-আনার পক্ষে নয়। কয়েক মাস আগে পশ্চিমবঙ্গের কয়েকটি জেলায় রাজনৈতিক উস্কানির ফলে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাজনিত পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল। দুর্ভাগ্যজনক, চার/পাঁচ জন মারা যায়। সংবাদমাধ্যম ও পত্রিকাগুলি উত্তেজনা প্রশমনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল।

এ প্রসংঙ্গে একটা কথা বলতে হচ্ছে, পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্টের ৩৪ বছর (১৯৭৭-২০১১) শাসনে ও তৃণমূল সরকারের ৭ বছর (২০১১-২০১৮) শাসনে সাম্প্রদায়িকতা, জাত-পাতে বিপদ ও সংঘাত দেখা দেয়নি। বামফ্রন্ট সরকারের ভূমি সংস্কারের ফলে সংখ্যালঘু মুসলমানরা অনেকটাই উপকৃত হয়েছিল। বর্তমান মমতা ব্যানার্জীর সরকার মুসলমানদের সামাজিক সুযোগ-সুবিধা অনেকটা বাড়িয়ে দিয়েছে। মুসলিমরা মূখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জীর পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে। এই সুযোগে বিজেপি সংখ্যাগুরু হিন্দুদের দলে টানতে চাইছে। এজন্য তারা মমতা ব্যানার্জীর বিরুদ্ধে ‘মুসলিম তোষণ’ এর অভিযোগ এনেছে। এছাড়া ভারত- বাংলাদেশ সীমান্তে অনুপ্রবেশের প্রচার তো আছেই। ভবিৎষতের পক্ষে এ প্রচার রাজনৈতিক কারণে বিপদজনক। এ বাংলায় বিজেপি যেন-তেন প্রকারে প্রধান শক্তি হতে চাইছে।

পাবলো শাহি: আপনি বলেছেন সংবিধানগতভাবে দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র বাংলাদেশ। ১৯৭৬ সালে ইন্দিরা গান্ধি যখন প্রধানমন্ত্রী, তখন জরুরী অবস্থা ঘোষণা হয়— তারপর ভারতীয় সংবিধানে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ কথাটি যুক্ত হয় (৪২তম সংবিধান সংশোধনী) আপনার এই বক্তব্যের সূত্র ধরে প্রশ্ন করি, ভারত ও বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এখন  কোন পর্যায়ে?

পবিত্রকুমার সরকার: ভারতে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্ব চার বছরের বিজেপি সরকারের আমলে ভারতের প্রথাগত সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি অনেকটাই বিপন্ন। ধর্মনিরপেক্ষতা নামক মহান আদর্শ পরিহাসের বিষয় হয়েছে। গো হত্যার মিথ্যে অপবাদে নিরীহ মানুষ পিটিয়ে মারা হচ্ছে। কোনো বিচার হচ্ছে না। এ এক ভয়ংকর অবস্থা।

বাংলাদেশে উল্টো চেহারা। সেখানে ধর্মনিরপেক্ষতা ও গণতন্ত্র সুনিশ্চিত করার চেষ্টা হচ্ছে সরকারি উদ্যোগে। সংখ্যালঘু হিন্দুরা একেবারে নির্ভয় নয়। তবে একটু হলেও পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে, কারণ সে দেশে সংখ্যালঘুর সংখ্যা একটু বেড়েছে। দু’দেশের মধ্যে সামাজিক- সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানও ভাল। তিস্তা জলবণ্টন নিয়ে একটা সমস্যা আছে ঠিকই। সমস্যাটা জটিল ও দুই দেশেরই স্বার্থসংশ্লিষ্ট। তবে আলোচনা করে একটা সমাধান পাওয়া যাবে আশা রাখি।

পাবলো শাহি: বাংলাদেশের জাতীয় উৎসব পয়লা বৈশাখ, যার কেন্দ্রভূমিতে রয়েছে মঙ্গল শোভাযাত্রা। আর একুশে ফেব্রুয়ারি যার মনোভূমিতে শহিদবেদীতে পুষ্প অর্পণ, শহিদ মিনারের মনুমেন্ট তৈরি  হয়েছে মা আর তার দুই ধারে ছেলে-মেয়ে রেখে। ভারতীয় আদিবাসী মায়ের অনুকৃতি থেকে। ভারতে বিশেষত পশ্চিমবঙ্গে এই ধরনের উৎসব কেন প্রাণ পায়নি এখনও? আপনার অভিমত।

পবিত্রকুমার সরকার: বাংলাদেশের পয়লা বৈশাখের এই মঙ্গল শোভাযাত্রার মত এমন অসাম্প্রদায়িক ও লোক উৎসব ভারতীয় উপমহাদেশে আর একটিও আছে বলে মনে হয় না। একুশে ফেব্রুয়ারি নিয়ে নতুন করে আর কি বলব? একটি ভাষা আন্দোলন- একটি স্বাধীন, সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্ম দিল— বিশ্বে আর কোনও নজির আছে কি? এখন তো একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। আমার শ্লাঘার কারণ একটাই, ১৯৭২-এর একুশে ফেব্রুয়ারি কলকাতায় ভাষা দিবসের প্রথম শোভাযাত্রা সংগঠনে আমি উদ্যোগী ছিলাম। জনসহায়ক সমিতি আয়োজিত রাজা রামমোহন রায় সরণির সেদিনের অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন কালোত্তীর্ণ কবি-সাংবাদিক আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী। সভাপতি ছিলেন মধ্যকলকাতার জননেতা প্রয়াত ভূপেন্দ্র কুমার দে।

বর্তমানে একুশে ফেব্রুয়ারি নানান অনুষ্ঠান, আলোচনা হয়। এসপ্লানেড বা সিধু কানহু ডহরের কার্জন পার্কে ভাষাশহিদ উদ্যান হয়েছে। তবে উদ্বেগের বিষয় পশ্চিমবঙ্গে, বিশেষ করে শহরতলীতে বাংলা ভাষা অনেকটাই অসামাজিক হয়ে গেছে। বহুদিন আগেকার সিদ্ধান্ত সত্ত্বেও সরকারি কাজেই পুরাপুরি বাংলা ব্যবহার হয় না। এই যখন পরিস্থিতি সেখানে প্রাণের অাবেগে পয়লা বৈশাখের সাজ- শোভাযাত্রা হবে ভাবাই যায় না। যদিবা কোথাও কেউ করে থাকে, সেটা আনুষ্ঠানিকতামাত্র। প্রাণের যোগ নেই।


বাংলা সাহিত্যের কারিগর ছিলেন- বৌদ্ধ, মুসলমান, খৃষ্টান। এতে সংস্কৃতঘেষা হিন্দু পণ্ডিতদের স্থান ছিল না। বরং বাংলা ভাষাকে পণ্ডিতিস্তর থেকে নামিয়ে সাধারণের কথ্যভাষায় পরিণত করেছিলেন হুসেন শাহ-সহ মধ্যযুগের  সুলতানরাই।


পাবলো শাহি: পশ্চিমবাংলায় বাঙালি মুসলমানরা পিছিয়ে আছেন শিক্ষা-সংস্কৃতি-অর্থনীতিতে। ভারতীয় সংবিধানে ৩০-এ ও ৩০-বি ধারা অনুসারে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় মিশনারি স্কুল খুলতে পারে। সরকারের এর দায়ভার গ্রহণের কথা। ৭৪টি খৃষ্টান মিশনারি স্কুল আছে। কিন্তু মুসলিমদের জন্য সে ধরনের মিশনারি খোলার উদ্যোগ পূর্বতন কংগ্রেস, বামফ্রন্ট সরকার ও বর্তমান মমতা সরকার নেয়নি?

পবিত্রকুমার সরকার: পশ্চিমবঙ্গে সংখ্যালঘু মুসলমানদের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। এখন এক-তৃতীয়াংশ ছাড়িয়ে গেছে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও অনুকুল পরিবেশ না থাকলে এটা সম্ভব নয়। তবু বলব এই রাজ্যে মুসলিমরা শিক্ষা-দীক্ষা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সরকারি কর্মসংস্থানে হিন্দুদের চেয়ে অনেকটাই পিছিয়ে। বামফ্রন্ট সরকারের সময় প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ অধ্যাপিকা জয়তী ঘোষ একটা সমীক্ষা করেন। তিনি তাঁর রিপোর্টে এই অনুন্নয়নের সমস্যাটা তুলে ধরেন। তারপর ১৪ বছর কেটে গেছে। পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও পূর্ণগত বদল হয়নি। তবে শিক্ষা-দীক্ষায় মুসলিম ছাত্রীদের অগ্রগতি চোখে পড়ার মত। প্রতিযোগিতা পরীক্ষাগুলোতেও মুসলিম ছাত্র-ছাত্রীরা সফল হচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গে মাদ্রাসা শিক্ষা এগিয়ে নিতে পূর্বতন বামফ্রন্ট সরকারই বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছিল। এজন্য ফিকোযাই কমিটি গড়া হয় এবং তাদের রিপোর্ট কার্যকর হয়। রাজ্যে বর্তমানে ৬২১টি সরকারঘোষিত মাদ্রাসা আছে; যার ছাত্র-ছাত্রী সংখ্যা অন্তত ৪১ হাজার। এগুলোর শিক্ষক-শিক্ষিকাদের বেতনসহ সব দায়দায়িত্ব সরকার গ্রহণ করেছিল। বর্তমান সরকারও তাই করছে। এ বাদে স্বীকৃতিবিহীন অন্তত হাজার দশেক খারিজি মাদ্রাসা আছে। রাজ্যে ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলতে বাধা নেই বলে এটা সম্ভব হচ্ছে। 

পাবলো শাহি: আমি মূলত ইংলিশ মিশনারি স্কুলের কথা বলতে চেয়েছি। মাদ্রাসা থেকে পাশ ছাত্র-ছাত্রীদের পশ্চিম বাংলার বিশ্ববিদ্যালয়গুলি ভর্তি নিচ্ছে না? তাছাড়া সাচার রিপোর্ট নিয়ে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য একরকম প্রকাশ্যেই বিরোধিতা করেছেন। আর মমতা এ প্রসঙ্গটি এড়িয়ে যান। ইংরেজি মিশনারি স্কুলে পড়তে না পারলে মুসলিম সমাজ কী করে পশ্চিমবঙ্গের অর্থাৎ ভারতের জাতীয় কর্মকাণ্ডে অবদান রাখবে? সংখ্যালঘু যুব ফেডারেশন নেতা মো. কামরুজ্জামান সম্প্রতি এক পথসভায় জানিয়েছেন যে, পশ্চিম বাংলার বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগেও এই বিধি মানা হচ্ছে না, এ বিষয়ে বলুন।

পবিত্রকুমার সরকার: অবশ্য তথ্য-পরিসংখ্যান সবসময় প্রকৃত বাস্তবতা তুলে ধরে না। সরকার স্বীকৃত মাদ্রাসাগুলো থেকে পাশ করা ছাত্র-ছাত্রীদের এ রাজ্যের কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ঠাঁই পাওয়া কঠিন হয়। ইংলিশ মিডিয়াম আইসিএসসি বা কেন্দ্রিয় সিবিএসসি পাশ করা ছাত্র-ছাত্রীরা কিন্তু এ ব্যাপারে বিন্দুমাত্র অসুবিধা ভোগ করে না। মাদ্রাসার ছাত্র-ছাত্রীদের প্রতি যে একটা উপেক্ষার মনোভাব রয়েছে, তা দিনের আলোর মত সত্য। বিগত চল্লিশ বছরে পশ্চিমবঙ্গের চড়া বেতনের মিশনারি স্কুলগুলোর ছাত্র-ছাত্রীরা ইংরেজি বলতে পারার দৌলতে বিশেষ সুবিধাভোগী হয়ে উঠেছে। চাকরি-বাকরি ও উচ্চশিক্ষা ও সামাজিকতায় কলকাতার বাংলা মিডিয়াম স্কুলগুলি উঠে যাচ্ছে। বাংলা মিডিয়ামে পড়ুয়ারা দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক— বাংলা ভাষা যেন নিজভূমে পরবাসী। এরপর মাদ্রাসার ছাত্র-ছাত্রীরা, তারা প্রায় শ্রেণিহীন; কোনো গোত্রেই পড়ে না। রাজ্যের শিক্ষা ক্ষেত্রে এভাবে ‘এলিটিস্ট’ ক্লাস সৃষ্টি হচ্ছে। পূর্বতন বামফ্রন্ট সরকার ও বর্তমান তৃণমূল সরকার— এ ব্যাপারে উদাসীন।

পাবলো শাহি: বাংলা সাহিত্যের সূতিকাগার অসাম্প্রদায়িক। বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যদের- শবরি, ডোমনি কথার চর্চাপদ। মুসলিম, খৃষ্টান, হিন্দু— এই সব স্রোতধারায় বাংলা সাহিত্য স্নাত। এ ব্যাপারে আপনার অভিমত কি?

পবিত্রকুমার সরকার: বাংলা ভাষা সংস্কৃত ভাষার গর্ভজাত হলেও হাজার বছরের পুরনো বাংলা সাহিত্যেও নির্মিত হয়েছে সর্ব ধর্মের এক তুলনারহিত সমন্বয়ে। এ বড় গৌরবের কথা। বাংলা ভাষার প্রথম সাহিত্য চর্যাপদ ৮৪ জন বৌদ্ধ হীনযানপন্থী সিদ্ধচার্যদের লেখা। এটি একেবারেই দলিত সাহিত্য— ব্রাত্য মনের কথা। বাংলায় প্রথম আখ্যানকাব্য ‘সতী ময়না ও লোরচন্দ্রানী’ লিখেছিলেন চট্টগ্রামের মুসলিম কবি দৌলত কাজি সপ্তদশ শতকের প্রথম অর্ধে। আর কৃপার শাস্ত্রের অর্থ-ভেদ নামে বাংলায় প্রথম মুদ্রিত গদ্য গ্রন্থের লেখক ছিলেন পর্তুগিজ পাদ্রি স্যানুয়েল দা আস্সুম্পসাও। ১৭৪৩ সালে লিসবন শহরে বইটি ছাপা হয়েছিল। বাংলা উপন্যাস বলতে ভবানিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়, তারক গঙ্গোপাধ্যায় ও বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় প্রমুখের নামই উঠে আসে। কিন্তু প্রথম বাংলা উপন্যাসের লেখিকা ছিলেন কলকাতা নিবাসী ইংরেজ মহিলা হানা ক্যাবেরিন মুলেন্স। ১৮৫২-য় তার খৃষ্ট ধর্মের উপদেশমূলক কাহিনী ‘ফুলমনি ও করুণার বিবরণ’। তারও আগে প্রথম বাংলা ব্যাকরণ ইংরেজিতে লিখেছিলেন ন্যাথানিয়েল ব্রাসি হ্যালহেড সাহেব— ‘অ্যা গ্রামার অফ বেঙ্গলি ল্যাংগোয়েজ’(১৭৭৮)। তাহলে কি দেখা গেল? বাংলা সাহিত্যের কারিগর ছিলেন- বৌদ্ধ, মুসলমান, খৃষ্টান। এতে সংস্কৃতঘেষা হিন্দু পণ্ডিতদের স্থান ছিল না। বরং বাংলা ভাষাকে পণ্ডিতিস্তর থেকে নামিয়ে সাধারণের কথ্যভাষায় পরিণত করেছিলেন হুসেন শাহ-সহ মধ্যযুগের  সুলতানরাই। আচার্য দীনেশচন্দ্র সেন তা দেখিয়ে গেছেন।


pablo. shahi 1965 @ gmail. com

লেখা সম্পর্কে মন্তব্য

টি মন্তব্য