নদীর নামের চেয়ে সুন্দর কিছু নেই | কৌস্তুভ শ্রী

১।

ইরামতি,
আজকে লিখে আনব আমাদের সেই বানোয়াট গল্পটা। সমস্ত সত্যে পুড়ে গেলে মিথ্যা তখন জলের মতো, সহজ। শহরের রাস্তা আমাদের নদীতে এনে ফেলেছে। আমরা এখন সাঁতার শিখে নেব। ঘুরে-ঘুরে, লাল শৈবালের ডাকনাম কৃষ্ণচূড়া। আজকেই লিখে আনব আমাদের সেই বানোয়াট গল্পটা। নদীর নামে নাম দিয়ো তার। আগের জীবনে নদীর নামের চেয়ে সুন্দর কিছু ছিল না।
ইতি
ইছামতি

 

২।

আমি এখন ঘুমিয়ে যাব। পৃথিবীর প্রতিটা দুর্ভাগ্য-দিনের আগে মানুষ যেভাবে অজান্তে ঘুমায়।
পানির নিচে বিদ্যুৎ চমকায় না বৃষ্টিতে। আলোর চমকে বারবার কারো মুখ ভেসে ওঠে না। তবু তুমি সামনে থেকো। আমি এখন ঘুমিয়ে যাব। বৃষ্টিতে। যদিও এখানে বৃষ্টি নেই। তবু তুমি সামনে থাকো।

এখানে কোন আলো নইে। অন্ধকারও নেই তাই। এখানে কী আছে ইরামতি! প্রতিটা দুঃসহ দিনের আগে মানুষ যেভাবে নিশ্চিন্তে ঘুমায়। সেই ঘুম। আমি ঘুমিয়ে যাব। আমাকে ডেকো না। সামনে থেকো। এই বৃষ্টিতে, যদিও এখানে বৃষ্টি নেই। তবু, কীসের যেন চমকে চমকে তোমার মুখ ভেসে উঠবে, আমার কখনো জানা হবে না।
ইতি
ইছামতি

 

৩।

ইরামতি,
তুমি তো জানো। আমি ফিরে এসেছি। জলজ বেলায়। পুড়ে-পুড়ে ফিরে এসেছি। কোন এক ভ্রূণে। এখানে তুমি আছো। আরো কেউ।
কিছু হাঁস উঁকি দিয়ে গেল। ওদের আমি দেখেছি আগেও। হেরে গিয়ে হারিয়ে গেছে।
তুমি তো জানো, আমার কিছুই মনে নেই। এখানে অথবা অন্য কোথাও আমি একা ছিলাম। হঠাৎ মনে পড়া বীভৎস গরম দুপুর। আমার কিছুই মনে নেই।
ইরামতি,
মানুষ হারিয়ে গেলে ডুবুরি হয়ে যায়। তারপর পানির নিচে বটের মতো পাতা, ডুমুরের মতো ফল দেখেও কাউকে কিচ্ছু বলে না। সেসব নিয়ে উঠে আসে না কোনদিন। উপর থেকে আলো আসে। ঘোলা কাচের চেয়ে বেশি কিছু নয়। এখানেই সব শুরু হয়ে শেষ হয়ে গেল। যাক।

 

৪।

আমাকে দরজা ভেঙে বের করা হয়ছেলি। ‘ঘুমন্ত’।
অথচ একবার যদি কেউ কানেকানে ডাকতো, আমি কি জাগতাম?

তোমার মৃদু-মৃদু ডাকে ঘুম ভাঙে, ইরামতি। হুড়মুড় শব্দ ছাড়া সকাল হয়নি বহুদিন। আমাকে কেউ নাম ধরে ডাকেনি। মুখের কাছে ফিসফিসিয়ে নাম। শুনিনি।

আগের জীবনে যারা কাঁদে, এ জীবনে তারা ডাকনামে ডাকে, এ জীবনে তারা ঘুমের কাছে আসে। আমার কাছে। একটা টলটলে প্রিয় মুখ ভেসে ওঠে তারপর। সেই মুখ আঁজলে নিয়ে মুখে-চোখে মেখে ঘুম ভাঙতে হয়।

সেই জীবনের মতো হেসে উঠলে, হাওয়ায় মিলিয়ে যাবে না এখন। আমাদের ছোট-ছোট যাপন নুড়ি পাথরের মতো টুপটাপ পানিতে ডুবে-ডুবে ঢেউ তুলবে। সেই ভাল, ইরামতি?

 

৫।

মনে আছে বসন্তে কেমন অলিগলি থেকে সমস্ত ফুলগাছ এসে বড় রাস্তায় সারি বেঁধে দাঁড়াতো আমাদের চোখের কাছে?
এখানে নেই। আমাদের সব থেকে সুন্দর দিন আমরা কাদের কাছে রেখে এসেছি, ইরামতি!
বৃষ্টিতে যারা বেঁচে ওঠে, পানিতে ডোবালে মরে যায়।

আর বৃষ্টিতে যারা মরে যায়?

 

৬।

পৃথিবীতে এখন শীতকাল। পৃথিবীতে এখন ধোঁয়া রোদ। শিউলি ফুলের শব্দে রাত ঝরে পড়ে এখন।
আমরা সেসব কিছুই মনে রাখিনি। তবু আমাদের ফিরতে কি ইচ্ছে করে, ইরামতি?

সমুদ্রশৈবালের গন্ধে ভরে গেছে তোমার চুল। আমারও। আমাদের ঝাপসা চোখে একে-অপরকে স্পষ্ট দেখি। আমাদের কোথাও ফিরতে ইচ্ছা করে না।
শুধু তোমার গায়ের গন্ধ শিউলি ফুলের হোক। আমারও।

 

৭।

পৃথিবীর সমস্ত ছোট দিন শেষ হয়ে গেছে। চোখের পলকে চলে যাওয়া দিন। চলে গেছে। দূরের কোন নদী থেকে হাওয়া আর বালু এসে ভরে যেতো তোমার মুখ। আর আমার চোখে এসে পড়তো আমারই চোখের ঝরে পড়া পাতা। আমাদের চুলের জটের ভেতরে আটকে যেতো আঙুল। আমাদের শরীর থেকে জন্ম নিতো রঙিন পোশাকের পাখা। দূরের কোন নদীর হাওয়া এসে। আমাদের দিন চোখের পলকে কেটে যেতো।
ইরামতি,
পৃথিবীর সমস্ত ছোট দিন হারিয়ে গেছে। কোথাও কোন নদী নেই। বালুতে শুধু শহুরে কুকুরের গন্ধ। কোন হাওয়া নেই কোথাও। রঙিন জামার পাখা নেই। সব ঝরে গেছে। এমনকি আমাদের পায়ের পাতার কাছেও কিছু জমা নেই। চলে গেছে উবু হয়ে কোলে তুলে নেয়ার মতো স্নেহ-মুখ।
আমাদের কাছে এখন শুধু একটা নদীর সমান দৈর্ঘ্য নিয়ে দিন জেগে আছে। একটা চাঁদ অথবা অন্ধকারের নিচে, দিনের বুকের চর জেগে আছে। চরের বুকে একটা চাঁদ অথবা অন্ধকারের নিচে আমরা জেগে আছি। আর পৃথিবীর সমস্ত দুঃসংবাদ আমাদের উপর নেমে আসছে।
মৃত্যুসংবাদ পাওয়া পিঁপড়ার মতো আমরা পৃথিবীর দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। কাউকে কিচ্ছু বলিনি। শুধু চলে যেতে দেখেছি আকাশ থেকে নীল, গাছ থেকে পাতা আর পৃথিবী থেকে সমস্ত সুসংবাদ।
ইরামতি,
আমার ভীষণ ইচ্ছে করে সকলের কানের কাছ গিয়ে বলি, পৃথিবীর সকলেরই প্রিয় কোন ফুল ছিল।
ইতি
ইছামতি

 

৮।

সবকছিু ঘোলা হয়ে গেছে। এই কি তবে জলের দিকে যাওয়া? মাটির জীবনে ডুবে গেলে জলের জীবনে ভেসে ওঠা যায়। আমি কি তবে তোমার দিকে যাচ্ছি?

আমার একটা প্রিয় গাছ ছিল। তেরো বছর বয়সে, আমার পড়ার জানালার বাইরে, একটা লিলি ফুলের ঝোপ ছিল। ঘরে বসে থাকলে বাতাসে কোন-কোন ফুলের মুখ আর সবেথেক মৃদু সুগন্ধ আমার কাছে আসতো। আমাদের বাড়িটা পরিত্যক্ত হবার দশ বছর পরে গিয়ে দেখি, হারিয়ে গেছে। আমাকে ডুবিয়ে নিয়ো। আমি যেন শৈবালের আড়ালে তাকে পাই৷

সবকিছু ঘোলা হয়ে গেছে। মাটিতে ডুবে গেছে আমার প্রিয়মুখ; যাকে আমি বাঁচিয়ে রাখতে চেয়েছিলাম আমার পাশে। আমার কাছে রয়ে গছেে তার ওষুধের কাপ আর প্লাস্টিকের বল৷ আমার কাছে রয়ে গেছি আমি। আমি তোমার দিকে যাচ্ছি। আমাকে ডুবিয়ে নিয়ো। আমি যেন প্রবালের আড়ালে তাকে পাই৷

এই তবে মাটি থেকে জলের দিকে যাওয়া। আমি যেন ওই জীবনের আড়ালে এই জীবন পাই৷

 

৯।

ইরামতি,
দূরে যাওয়াকে পড়ে যাবার মতো মনে হয়। কাছে আসাকেও।

 

১০।
একটা বড় পৃথিবীতে কতগুলো জীবনের ভিড়ে আমার একটা ছোট জীবন ছিল। সেখানে আমি মানুষ ভালবেসেছি। গাছ নদী ফুল পাখি পথ ভালবেসেছি। গরু ছাগল হাঁস মুরগি কুকুর ভালবেসেছি। সেখানে আমি মানুষ ঘৃণা করেছি।

ছোট জীবনে আমি কেঁদেছি। হেসেছি অনেক। থমকে গেছি। হেঁটেছি অনেক। ছুটে গেছি কারো দিকে। ফিরে এসেছি অনেক। জানালা খুলেছি। দরজা বন্ধ করেছি কত। মানুষের বুকে গিয়ে চুমু খেয়েছি কত। ছাদের সিঁড়িতে। পড়ে গেছি। উঠে দাঁড়িয়েছি অনেক। চোখ তুলে তাকিয়েছি প্রিয় মুখের দিকে। চোখের দিকে, ঠোঁটের দিকে। মুখ ফিরিয়ে নিয়েছি অনেক। একা মাঠ। বসে থকেছি। জ্বরে পুড়ে-পুড়ে সেরে উঠেছি অনেক।
মানুষ ভালবেসে কবর দিয়েছি প্রিয়মুখ। মানুষ ঘৃণা করে কবর দিয়েছি প্রিয়মুখ।

ট্রাকের চাকায় থেঁতলে গেছে উৎসবের ফুল। ফুলের লাশ মাড়িয়ে ছুটে গেছি বেঁচে থাকা অথবা মরে যাওয়ার দিকে।
ছুটে গেছি ফিরে আসার দিকে। ভালবেসেছি ঘৃণা করব বলে!

আমার পায়ের নিচে কারো লাশ হাজার বছর ধরে মাটিচাপা পড়ে আছে। তার উপরে আমার জীবন অর্থাৎ মৃত্যুৎসব।
ইরামতি, আমাদের জন্মমুর্হূত আমাদের মনে নেই। আমাদের মৃত্যুস্মৃতি থাকবে তো?



কৌস্তুভ শ্রী

জন্ম ১৯৯১ সালের ১ জানুয়ারি, রাজশাহীতে। পেশায় স্থপতি। স্থাপত্যবিদ্যা পড়েছেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে। বর্তমানে ঢাকায় কর্মরত।

প্রকাশিত গ্রন্থ: মহাপ্রয়ান সড়ক (২০১৭, চৈতন্য)

প্রকাশিতব্য গ্রন্থ: নদীর নামের চেয়ে সুন্দর কিছু নেই (২০২০, চৈতন্য)

সম্মাননা: শালুক সাহিত্য পুরস্কার ২০১৯

শেয়ার করুন

লেখা সম্পর্কে মন্তব্য

টি মন্তব্য

%d bloggers like this: