home ই-বুক, উপন্যাস ধারাবাহিক উপন্যাস – তারাদের ঘরবাড়ি । অলোকপর্ণা । সমাপ্তি পর্ব

ধারাবাহিক উপন্যাস – তারাদের ঘরবাড়ি । অলোকপর্ণা । সমাপ্তি পর্ব

                                তারাদের ঘরবাড়ি  ২০

 

অনেক সময় এমন মনে হয় না, এই শেষবারের মতো কিছু হচ্ছে জীবনে? এই শেষবারের মতো বাড়ি ছাড়লেন, এই শেষবারের মতো ছেলেবেলা গলি দিয়ে চলে গেল হেঁটে হেঁটে, এই শেষবার দেখলেন প্রিয় পোষ্যর মুখ, বা অতি প্রিয় কোনো ঘ্রাণ, এই শেষবার। শেষবার পেলব রোদ্দুর ছড়িয়ে পড়ছে আপনার ও আপনার প্রথম প্রেমিকের মুখে, শেষবার প্রাণপণ শুনলেন রান্নাঘর থেকে মায়ের গুণগুণ, শেষবারের মতো ছুঁয়ে থাকলেন প্রিয় হাত, তারপর সময় হতে ছেড়েও দিলেন। শেষ দেখা দিয়ে আকাশের নীলে উড়ে উড়ে হারিয়ে গেলো গ্যাস বেলুনটা।

হাওয়াশহরের বিমানবন্দরে বসে ইন্দিরা অনুভব করে, যেন এই শেষবার সে কোথাও চলেছে, যেন হাওয়াশহর ছেড়ে তার এই যাওয়া শেষবারের মতো, যদিও সে জানে তাকে ফিরে আসতে হবে এখানেই, কিন্তু সেই ফেরা এই ইন্দিরার নয়, অন্য কোনো ইন্দিরা, অন্য কোনোভাবে এখানে ফিরে আসবে। নিজের একটা মৃত্যু পরখ করতে করতে ইন্দিরা টের পায় এতক্ষণ যে অস্থিরতা, যে চাঞ্চল্য, যে অনিশ্চয়তা তাকে ঘিরে ধরেছিল, তা আর নেই। গভীর একটা শ্বাস বুকে ভরে ইন্দিরা চারপাশে তাকায়, তার চারপাশের মানুষেরা কাউকে ছেড়ে অন্য কারোর কাছে চলেছে।

ফ্লাইট ডিলে হওয়ায় ইন্দিরা মানুষ দেখতে শুরু করে। এবং গত দশ বছরের অভ্যাসবশত আন্দাজ করার চেষ্টা করে চলে, এইসব মানুষদের গল্পগুলো ঠিক কি রকম? লাল স্লিং ব্যাগ হাতে মেয়েটি, যে ট্যাব হাতে ইন্দিরার সামনে বসে আছে, ইন্দিরা জানে সে কোনো জনপ্রিয় রিয়ালিটি শো-তে মগ্ন, মেয়েটির জুতো দেখে সে আন্দাজ করে সেই জুতো তাকে কোথায় কোথায় নিয়ে গিয়েছে, মেয়েটির ব্যাগ, চুল, হাতের ঘড়ি, পোষাক সবকিছু দেখে ইন্দিরা মেয়েটির গল্প সম্পর্কে একটা সিদ্ধান্তে আসে, সে মনে মনে বলে, “একমাত্র সন্তান, বাবা বন্ধুর মতো, অধিকারবোধ অত্যন্ত প্রখর, তাই বাবার পাশে মা’কে মেনে নিতে কষ্ট হয়, কিন্তু বৃষ্টি ভালোবাসে। বৃষ্টির শব্দ শুনলে চুপ হয়ে গিয়ে কি যে ভাবে, তা সে নিজেও জানে না।”

একটু দূরের উদ্বিগ্ন চেহারার একজন মানুষ ইন্দিরার দৃষ্টি আকর্ষণ করে, মানুষটার ক্লান্ত চোখ, বারবার হাতে হাত ঘষার মুদ্রাদোষ, কাঁধের ব্যাগ, পুরোনো হাতঘড়ি, তাকে ঘিরে থাকা হাতের কাঁচাপাকা লোম ইন্দিরাকে গল্প বলে, “ইনি অনিন্দ্য দে বা তন্ময় সরকার হতে পারেন। বাড়িতে বৃদ্ধা মা থাকা আবশ্যক, স্ত্রী সবসময় বিভিন্ন কারণে অসন্তুষ্ট, সন্তান ওনাকে আদর্শ হিসেবে দেখে না, দেখেওনি কোনোদিন, হেরে যাওয়া বা লড়াই করে গড়পরতা হয়ে থাকা একজন মানুষ। বিয়েতে কেউ একজন “দুনিয়া কাঁপানো দশ দিন” উপহার দিয়েছিল ওনাকে। এখন উদ্বিগ্ন কেন? মায়ের অসুখ? হতে পারে, আর তার সাথেই এই প্রথম বিমানবন্দরে এসেছেন উনি। এই প্রথম উনি বিমানযাত্রী। দ্রুত অসুস্থ মায়ের কাছে পৌঁছানোটা মূল লক্ষ্য। এই গল্পটা বিমানযাত্রার সময় খুব ঘোরতর কোনো অপমানজনক ঘটনায়, যেমন অন্যের আসন দখল করে বসে থাকা, সীটবেল্ট বাঁধতে না পারা, উড়ানকালে অসম্ভব ভয় পেয়ে কঁকিয়ে ওঠা সমেত আরো অনেক কিছুতে গিয়ে শেষ হতে পারে। বা হয়তো ল্যান্ড করার আগে জানালা দিয়ে নীচের পৃথিবী দেখে মুগ্ধতায় উনি মুহূর্তের জন্য ভুলে যাবেন যে ওনার মায়ের অসুখ, স্ত্রী নানা কারণে সবসময় অসন্তুষ্ট এবং সন্তান কোনোদিনও ওনাকে আদর্শ বলে মনে করবে না। আর গল্পটা ঠিক সেইখানেই শেষ হবে।”

বুক ভরে শ্বাস নেয় ইন্দিরা। আর সাথে সাথে তাকে চমকে দিয়ে তার ফোনে একটা নোটিফিকেশন আসে। ফেসবুক খুলে ইন্দিরা দেখে চকচকে চেহারার সানগ্লাস পরা কেউ একজন আরব সাগরের সামনে দাঁড়িয়ে তাকে মেসেজ পাঠিয়েছে, এবং তাতে লেখা, “কেমন আছিস?” কিছুটা শূন্যস্থানের পরে আরো লেখা, “তুই আমার কে ছিলি মনে আছে তোর?”

ইন্দিরা কিছুক্ষণ লেখাটা দেখে, তারপর টাইপ করে, “ঠিক এই মুহূর্তে ভালো আছি।”

প্রশ্ন আসে আরও, “কোথায় থাকিস এখন? কি করিস?”

ইন্দিরা জবাব দেয়, “আপাতত একটা এয়ারপোর্টে বসে আমাদের সেই গল্প বলার খেলাটা খেলছিলাম”

প্রশ্ন আসে, “একা একা?”

ইন্দিরা জবাব দেয়, “একা একা”

ওপাশ থেকে মেসেজ আসে, “আমাদের ব্যালকনিতে এমন কত গল্পের কবর পড়ে আছে, মনে আছে তোর? লিখবি সেসব?”

ইন্দিরা জবাব দেয়, “তোদের ওই ব্যালকনিটাই একটা গোটা গল্প। লিখবো সবই, যখন সময় হবে।”

ওপাশ থেকে কোনো জবাব আসে না।

ইন্দিরা প্রশ্ন করে, “তুই খেলিস গল্প বলার খেলাটা কখনো?”

উত্তর আসে, “না, ভালো লাগে না, সময়ও নেই, ছেলে হাঁটতে শিখে গেছে, সারাক্ষণ চোখে চোখে রাখতে হয়”

ইন্দিরা লেখে, “ও”

তারপর তাকিয়ে থাকে ছোট্ট ‘ও’ টুকুর দিকে। পায়েলের ছেলেটাকে কি এই ছোট্ট ‘ও’ এর মতই দেখায়? খুব সংক্ষিপ্ত যার অস্তিত্ব, অথচ প্রচণ্ড ভর। ইন্দিরার খেয়াল হয় বিগ ব্যাং-এর একদম আগে এই বিশ্ব অবিকল এরকমই ছিল, সংক্ষিপ্ত অথচ ভরসর্বস্ব। ছোট্ট ‘ও’-টার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ইন্দিরার হঠাৎ মনে পড়ে, সেদিন ঠিক এতটুকু বলে থেমে গিয়েছিল রঞ্জনাও। উত্তরের অপেক্ষা করতে করতে ইন্দিরা যখন উঠে চলে আসবে ভেবেছিল, ঠিক তখনই রঞ্জনা জিজ্ঞেস করেছিল, “আমায় একবারও আটকাবি না?!”

 

হঠাৎ কি মনে হতে দ্রুত নিজেকে ফিরিয়ে এনে চেয়ার ছেড়ে উঠে ইন্দিরা সামনের স্যুভেনিয়রের দোকানে ঢুকে যায়। একটু পরে একটা পোস্টকার্ড হাতে নিয়ে বেরিয়ে আসে। বোর্ডিং শুরু হতে ঠিক যখন পনেরো মিনিট বাকী তখন ইন্দিরা ব্যাগ থেকে পেন বার করে পোস্টকার্ডে লিখতে শুরু করে,

“মৃত্যুর দু’দিন আগে পিসি জানিয়েছিল, তুমি ওনাকে এককথায় চলে যেতে দিয়েছিলে। উনি চলে যাওয়ার পরে কখনো তুমি ওনার কাছে যাওনি, একবারের জন্যেও বলোনি ফিরে আসতে। উনি কি তাই ফিরলেন না, বাবা?”

এতটা লিখে ইন্দিরা সামনের দিকে তাকায়, দেখতে পায় ছোটবেলার পিকলু ছাদে ছাদে ঘুড়ি ওড়াচ্ছে, আর একটু দূরে বসে পোষা বিড়াল গঙ্গু রোদে ঝিমোচ্ছে। সে আবার লিখতে শুরু করে, “এই যে দূরত্ব, আমার-তোমার, মায়ের সাথে আমাদের, আমার সাথে আরো কিছু মানুষের, তা তো অভিমান ছাড়া আর কিছু নয়। অভিমান এমনই এক দূরত্ব যাকে পার করে কোনো আলো এসে পৌঁছোয় না এক মানুষ থেকে আরেক মানুষে। মানুষেরা একে অপরের অন্ধকারে থাকতে থাকতে সেই দূরত্ব সয়ে ফেলে, ঠিক যেমন অন্ধকার কিছু সময় পর চোখে সয়ে যায়। মানুষ অন্ধকারেই সব দেখতে শুরু করে, মানুষ টের পায় যে সব কিছুরই নিজস্ব আলো হয়। এভাবেই দূর থেকে অভিমানী মানুষ শুধু নিজের অভিমানটুকু দেখে। আর কঠোর হয়ে আসে। নিজের প্রতি, পারিপার্শ্বিকের প্রতি, আমাদের মা আজ ঠিক যেমন। অথচ সময়মতো তুমি ওনার কাছে একবার গিয়ে দাঁড়ালে… না তোমায় দোষারোপ করছি না। অভিমান তো তোমার মতোই আমারও প্রিয়। ঔদাসীন্যও।” ইন্দিরা আবার সামনের দিকে তাকিয়ে দেখতে পায়, জয়তীর এলো চুল তেল দিয়ে যত্ন করে বেঁধে দিচ্ছে পিসি আর জয়তী দুলে দুলে গাইছে,

“এ পরবাসে রবে কে হায়!

কে রবে এ সংশয়ে সন্তাপে শোকে ॥

হেথা কে রাখিবে দুখভয়সঙ্কটে–

তেমন আপন কেহ নাহি এ প্রান্তরে হায় রে ॥”

পোস্টকার্ডে লেখার জায়গা প্রায় শেষ হয়ে আসছে দেখে ইন্দিরা আরো ছোট করে লেখে, “বাবা, আমাদের চিন্তাধারা এক বিন্দুতে না মিললেও আমরা যদি সমান্তরালে বয়ে যাই… যদি পাশাপাশি বয়ে যেতে পারি… তুমিই তো ছোটবেলায় অঙ্ক করাতে করাতে বলেছিলে, দুটো সমান্তরাল রেখা অসীমে গিয়ে মেশে। অসীম কি অনেকটা দূর, বাবা?”

বোর্ডিং শুরু হতে এবং পোস্টকার্ডে লেখার জায়গা শেষ হয়ে যেতে ইন্দিরা বোর্ডিং-এর লাইনে এসে দাঁড়ায়। হাতের পোস্টকার্ডটা যত্ন করে ব্যাগে ভরে রাখে।

 

 

যেন কয়েক সহস্রাব্দ পর সে আনন্দীকে দেখছে, অযত্নলালিত চুল, ফোলা চোখের পাতা, বিভ্রান্ত দৃষ্টি দেখে তার বুঝতে অসুবিধা হলো না আনন্দীর অ-সুখ কতখানি। করাচী বেকারির এক চেয়ারে, আনন্দীর ঠিক উল্টোদিকে বসে আরো মাটিতে মিশে যেতে থাকলো ইন্দিরা।

“নীল তোমার নম্বর পেল কি করে?”

পঞ্চমবার আনন্দীর এই প্রশ্নের জবাব সে দেয়, “আনন্দী,- আমি জানি না।”

আনন্দী স্থির দৃষ্টিতে ইন্দিরার দিকে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ। তারপর বলে, “তুমি আমাকে ওর ফোনের কথা জানাওনি কেন?”

ইন্দিরার মুখ থেকে যন্ত্রের মতো জবাব বেরিয়ে আসে, “আমার মনে হয়েছিল নীলেশের ফোনের কথা জানতে পারলে তুমি চলে যাবে”, কিছুটা বিরতি দিয়ে কথাটা শেষ করে ইন্দিরা, “আমাকে ছেড়ে।”

“কেন এরকম মনে হল তোমার?” চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে আনন্দী।

“পুনেতে তোমার সাথে ও কি করেছিল তা আমি জানতাম। আর…” চুপ করে যায় ইন্দিরা।

“আর?”

“আমার মনে হয়েছিল তোমায় ভালো রাখার ক্ষেত্রে ওর যোগ্যতা আমার চেয়ে বেশি”

টেবিলে অপার নিস্তব্ধতা নেমে আসে।

“তবে আমি তোমার সাথে জড়ালাম কেন?” আনন্দীর প্রশ্নে চমকে ওঠে ইন্দিরা।

“মানে?”

“মানে, আমার ভালো থাকা না থাকার ব্যাপারে তোমার আশঙ্কা বা নীলের সিদ্ধান্ত-ই সব, তাই তো?”

ইন্দিরা জবাব দিতে পারে না।

আনন্দী বলে চলে, “আমার নিজস্ব চাহিদা নেই কোনো? আমি কিভাবে থাকতে চাই, কার সাথে থাকতে চাই তা নীলের অধিকারবোধ এবং তোমার আত্মবিশ্বাসহীনতা ঠিক করে দেবে?”

আনন্দীর প্রশ্নের সামনে অসহায় বোধ করে ইন্দিরা। উত্তরহীনতা তাকে বিব্রত করে তোলে। একসময় সে বলে, “আমাদের একসাথে থাকাটা সহজ নয় আনন্দী,”

সাথে সাথে আনন্দী বলে ওঠে, “তুমি কি মনে করেছো, জীবন এমনিতে খুব সহজ?”

“তা বলছি না,”

“তবে? দুজন বিসমকামী মানুষের জীবন কি কেক ওয়াক? শাশ্বত আনন্দ পেতে তুমি কজনকে দেখেছো? চূড়ান্ত ত্যাগী মানুষ ছাড়া আনন্দ,- আসল আনন্দকে ছুঁতে কে পেরেছে? আর আমি, তুমি, কেউ মহামানব নই। আমাদের কাম আছে, মোহ, লোভ, ক্রোধ, মাৎসর্য এবং মদ সর্বস্ব আছে, বেশ ভালো মাত্রাতেই আছে। কাজেই, যেকোনোভাবেই জীবন আসুক না কেন, তা নিরবিচ্ছিন্ন আনন্দময় হবে না কখনো।”

“কিন্তু আনন্দী, সমাজ দুজন বিসমকামী মানুষের প্রতি বেশি দয়াশীল”

“মানছি, আবার এটাও জানো তো, দুজন মানুষ সমকামী না বিসমকামী তা দিয়ে সমাজের আসলে কিছু ছেঁড়া যায় না, যতক্ষণ না তারা সমাজের স্বার্থে আঘাত করছে”

“তবু এই দেশে সে সম্পর্কের একটা নাম আছে, আমারা কি আনন্দী? আমি তোমার কে হই, বা তুমি আমার কে?”

“রঞ্জনার সময় তো এসব ভাবোনি, এখন কেন ভাবছো? নীলের সাথে আমার একটা বিকল্প জীবনের সম্ভাবনা আছে বলে?”

ধরা পড়ে যায় ইন্দিরা, সে ধীরে ধীরে বলে, “তোমার প্রতি তার অধিকারবোধ ভারতীয় সামাজিক ব্যবস্থায় সংগত, আমার প্রতি তোমার বা তোমার প্রতি আমার কোনো অধিকারবোধ থাকতে নেই এখানে। রঞ্জনার কোনো নীলেশ ছিল না কোনোদিন, সমাজের এবং সামাজিক সবকিছুকে সে শুরু থেকেই লাথি মেরে এসেছে। আর আমারও কোনো পিছুটান তৈরি হয়নি কোনোদিন, শিকড়হীন জীবনে আমি অভ্যস্ত।”

“তবে হায়দরাবাদ ছুটে এলে কেন? শুধুমাত্র অপরাধবোধের তাড়নায়?!”

আনন্দীর চোখ থেকে নজর সরিয়ে নেয় ইন্দিরা।

“আমার দিকে তাকাও ইন্দিরা, আমার প্রতি তোমার মোহ নেই কোনো? টান?”

ইন্দিরা নিজেকে লুকিয়ে ফেলতে চায়।

আনন্দী বলে চলে, “সত্যি করে বলো, এই মুহূর্তে তুমি আমাকে ছুঁতে চাইছো না? আমি এই গোটা মানুষটা তোমার সামনে বসে আছি… তাকাও আমার দিকে!”

ধরে আসা গলায় ইন্দিরা বলে, “ওরা… হিরণ জানলে আমাদের সাথে সম্পর্ক রাখবে না কোনো”

“হিরণ কিছুটা আন্দাজ করেছে, এবং তারপরেও ও নিয়মিত আমার খবর রেখেছে”

ইন্দিরা অবাক হলেও বলে চলে, “মঞ্জুনাথ জানতে পারলে অ্যাপার্টমেন্টটা রাখতে দেবে না”

“মঞ্জুনাথের শুধু মাস গেলে টাকাটা দরকার”

পাল্টা যুক্তি খুঁজে পায় না ইন্দিরা, সে বলে, “অফিসে…”

ইন্দিরাকে থামিয়ে দিয়ে আনন্দী বলে, “অফিসের ডাইভার্সিটি ক্লাবের মেম্বারদের সাথে কয়েক সপ্তাহ আগে আমি আলাপ করেছি, এবং এইসব পলিসি সম্পর্কে যা যা জানার সব জেনেছি…”

অতি কষ্টে বিস্ময় চেপে রেখে ইন্দিরা বলে, “তোমার বাবা, মা…”

ইন্দিরা টের পায় আনন্দী থমকে গেছে, ইন্দিরা টের পায় আনন্দী খুব চেষ্টা করছে তার এই প্রশ্নটার জবাব দেওয়ার, কিন্তু এর উত্তর তার কাছে নেই। আনন্দীকে খুব অসহায় দেখতে লাগায় ইন্দিরার ভিতরটা মুচড়ে ওঠে। টেবিলের উপর জড়ো করে রাখা আনন্দীর হাত দুটোর উপর আলতো করে নিজের হাত রাখে ইন্দিরা। আনন্দী চমকে তাকায় ইন্দিরার দিকে, যেন ইন্দিরার প্রশ্নের জবাব পেয়েছে, এমনভাবে আনন্দী বলে, “যখন আমার জ্বর হবে, বা প্রচণ্ড ডিপ্রেশন, সারারাত আমার পাশে থাকবে না তুমি?”

ইন্দিরা টের পায় একটা কান্না কোথা থেকে যেন উঠে আসছে তার ভিতরে, সে বলে, “থাকবো”

“সব উঁচু-নিচু পথ ওঠানামা করার সময় আমার হাত ধরে থাকবে না?”

ধরে আসা গলায় ইন্দিরা বলে, “থাকবো”

“ধারালো ছুঁরি হাতে জীবন শেষ করে দিতে চাইলে আমাকে ফিরিয়ে আনবে না?”

“আনবো”

“প্রচণ্ড মন খারাপে, হঠাৎ কোনো বাইক ধার করে এনে আমার সাথে লং ড্রাইভে যাবে না?”

“যাবো”, জবাব দিতে দিতে ইন্দিরার চোখ থেকে জলের ফোঁটা এসে পড়ে টেবিলের উপর।

“অভিমানে, ক্ষোভে সব ছেড়ে দিয়ে চলে গেলে আমায় খুঁজে বের করে ফিরিয়ে নিতে আসবে না?”

অস্ফুটে ইন্দিরা বলে, “আসবো”

“আর যদি অন্য কাউকে ভালো লাগে কোনোদিন, অন্য কারোর প্রেমে পড়ি, হাত ধরে ফিরিয়ে আনবে না আমায়?”

ইন্দিরা চুপ করে আনন্দীর দিকে তাকিয়ে থাকে।

“কি হল, বলো!” অধৈর্য হয়ে জানতে চায় আনন্দী।

রঞ্জনার গলা কানে বেজ ওঠে ইন্দিরার, “আমায় একবারও আটকাবি না?!”, ইন্দিরার চোখে ভেসে ওঠে মাইসোর শহরে মহিষাসুরের মূর্তির নিচে বছর পাঁচেকের পিকলুকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন অপরেশ। ভাস্বতী মুখার্জী তাঁর পাশে দাঁড়ানো।

আনন্দীর চোখে চোখ রেখে ইন্দিরা জবাব দেয়, “ফিরিয়ে আনবো।”

ইন্দিরা টের পায় আনন্দী শক্ত করে তার হাত দুটো চেপে ধরছে। করাচী বেকারির ভিতর একটা সন্ধ্যে ছলছল করে ওঠে।

 

“হাত কাটলো কি করে?”, মিনিট দুই পর আনন্দীর প্রশ্নে সম্বিত ফেরে ইন্দিরার।

সে দেখে গতকাল সকালে হুইস্কির বোতল খুলতে গিয়ে কেটে ফেলা বুড়ো আঙুলটা ধরে আছে আনন্দী।

অল্প হেসে সে বলে, “বিষণ্ণতা এসেছিল, এবারের মতো গুরুদক্ষিণা নিয়ে ফিরে গেছে।”

ইন্দিরার হাতের ক্ষতয় এমনভাবে আঙুল বুলিয়ে দেয় আনন্দী, ইন্দিরার মনে হয় যেন নিরাময় হল।

সে জিজ্ঞেস করে, “তোমার ট্রান্সফার লেটার পেয়ে গেছ?”

“না, পাইনি”

“আচ্ছা”, একটু দমে যায় ইন্দিরা।

“ওরা বলেছে, প্রবিশন পিরিয়ডে উইদাইট অ্যানি প্রপার রিজন ট্রান্সফার করা হয় না।”

মুখ তুলে তাকায় ইন্দিরা, খুশিতে তার চোখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।

 

 

ডিটিডিসির অফিসটায় ঢুকে ব্যাগ থেকে পোস্টকার্ড বার করে ইন্দিরা। ঠিকানা, ফোন নম্বর লিখে কার্ডটা জমা দিতে গিয়েও থেমে যায়, অফিসের কর্মচারীর হাত থেকে কার্ডটা ফিরিয়ে নিয়ে উল্টে দেখে, সে লক্ষ্য করেনি, পোস্টকার্ডের ছবিটা মহিষাসুরের,- মাইসোর শহরের বিখ্যাত চামুন্ডা পাহাড়ের বিরাট মহিষাসুরের মূর্তির, যার নিচে বছর সাতাশ আগে অপরেশ এসে দাঁড়িয়েছিলেন স্ত্রী- সন্তানসহ। যার ঠিক তিন বছরের মাথায় অপরেশের স্ত্রী অপরেশকে ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন। পোস্টকার্ডটা জমা দিয়ে ইন্দিরা ডিটিডিসির অফিসের বাইরে এসে দাঁড়ায়।

দেখে তার সামনে, রাস্তার ওপারে এসে দাঁড়িয়েছে একটা সাদা বাস, মহাজাগতিক এক সাদা বাস। বাসের কাছে নিজের লাগেজ নিয়ে আরো অনেক যাত্রীর সাথে দাঁড়িয়ে আছে আনন্দী, অপেক্ষা করছে তার জন্য, তার সঙ্গে হাওয়াশহরে ফিরে যাওয়ার জন্য। ইন্দিরাকে দেখে হাতছানি দিয়ে ডাকে আনন্দী।

রাস্তা পার করে আনন্দীর কাছে যাওয়ার আগে ইন্দিরা একবার আকাশের দিকে তাকায়। যেন সে জানত, এমন সহজভাবে দেখে, বাসটা যেখানে দাঁড়িয়ে আছে… বাসটা যেখানে এসে দাঁড়িয়েছে, তার ঠিক উপরে, বহূদূরের কালো আকাশে, জ্বলজ্বল করছে এই পৃথিবীর একটিমাত্র ধ্রুবতারা।


প্রথম পর্ব

লেখা সম্পর্কে মন্তব্য

টি মন্তব্য