home ই-বুক, উপন্যাস ধারাবাহিক উপন্যাস – তারাদের ঘরবাড়ি । অলোকপর্ণা । ১৯ পর্ব

ধারাবাহিক উপন্যাস – তারাদের ঘরবাড়ি । অলোকপর্ণা । ১৯ পর্ব

                                     তারাদের ঘরবাড়ি ১৯

 

“This is a professional call from me to you”

ইন্দিরা টের পায় তার গলা দিয় আওয়াজ বেরোচ্ছে না কোনো, পাশ থেকে রুবাঈ জিজ্ঞেস করে, “কি হয়েছে ইন্দিরা?”

ফোনের ওপাশ থেকে ভাস্বতী মুখার্জী বলে চলেন, “তোমার নম্বর আমি অপরেশের কাছ থেকে কিছুদিন আগে জোগাড় করেছি জানো নিশ্চয়, এবার কারণটা বলি, তুমি আমায় একটা মিথ্যে কথা বলেছিলে”

ইন্দিরা ভেবে পায় না কি মিথ্যে সে ভাস্বতী মুখার্জীকে বলেছিল।

ভাস্বতী বলেন, “তুমি বলেছিলে তোমার কবিতা ভালো লাগে না, তুমি কবিতা পড়ো না, মিথ্যে বলেছিলে, তাই তো?”

অনেক কষ্টে ইন্দিরার মুখ থেকে আওয়াজ বেরোয়, “হ্যাঁ, বলেছিলাম”

“ভেবেছিলে ভাস্বতী মুখার্জী জানবে না যে তার এক সন্তানের মধ্যে তার নিজের ধারা বইছে”

ইন্দিরা শিউড়ে ওঠে, বলে, “আমি ভেবেছিলাম এটা প্রফেশনাল কল”

“পালাচ্ছো? আচ্ছা, পালাও। ফালতু সময় নষ্ট করার ইচ্ছে আমারও নেই। একটা লেখা আমি পড়লাম কিছুদিন আগে,- রঞ্জিশ। কাঁচপোকার বসন্ত সংখ্যায়, তারপর খোঁজ নিয়ে জানলাম ওটা তোমারই লেখা। পদবী ব্যবহার করো না কেন? কুন্ঠা হয়?”

“না, আমার নামটুকুই আমাকে ধারণ করে, তাই”

“অহং?- ভালো, আগুন না থাকলে জ্বলবে কি করে, যাই হোক, খোঁজ করতে করতে তোমার সম্পর্কে আরো অনেক কিছু জানলাম”

ইন্দিরা বোঝে ভাস্বতী মুখার্জী কি ইঙ্গিত করছেন।

তিনি বলে চলেন, “যাই হোক, আমি জাজ করি না, মানুষ মানুষের মতো থাকুক, সেটাই শ্রেয়। কি বলো?”

অপমানে ইন্দিরার কান গরম হয়ে যায়, কিন্তু সে কিচ্ছু বলতে পারে না।

ভাস্বতী বলে চলেন, “অপরেশ, মৈত্রেয়, দাদা, ওরা সব জানে?”

“ওরা জানে কি না জানে সেটা আমাদের পারিবারিক ব্যাপার”, রাগে কাঁপতে কাঁপতে বলে ইন্দিরা।

“আচ্ছা, ভালো, তবে সময় নষ্ট করে লাভ নেই, এখন অবধি তোমার প্রকাশিত সমস্ত লেখা আমি পড়েছি, এবং অবাক হয়েছি, যা আমি সচরাচর হই না। এবং তারপর আমার মনে হয়েছে, এই লেখাগুলো সময় উপোযোগী কি না তা বিচার হওয়ার প্রয়োজন আছে”

সাময়িক বিরতি নেন ভাস্বতী, তারপর বলেন, “আমার বিশেষ বন্ধু, অরিন রায়, কাঁচপোকার সম্পাদক, উনি তোমার বই করতে আগ্রহী…”

ইন্দিরা বলে ওঠে, “আমি আগ্রহী নই”

“ভেবো না, কেউ জানবে না তুমি আমার মেয়ে। এবং প্রিভিলেজড”

“আমি আমার লেখা কাকে দেবো না দেবো সেটা আমার নিজের সিদ্ধান্তে হবে,”

“তোমার লেখা পড়ে মনে হয়েছিল তুমি বেশ ম্যাচিয়র, ভুল বুঝেছিলাম”

ইন্দিরার ইচ্ছে করে হাতের ফোন ছুঁড়ে ফেলে দিতে, সে পারে না।

ভাস্বতী বলেন, “নিজের সাথে যা ইচ্ছে তাই করো, যার সাথে ইচ্ছে শোও, ওসব আমিও এককালে করেছি, কিন্তু নিজের লেখার সাথে এমন কোরো না। ইন্দিরা, এবার তোমার মা হিসেবে বলছি, সবাই কিন্তু এই সুযোগ পায় না যা আমি তোমাকে দিচ্ছি,”

ইন্দিরা চুপ করে থাকে।

“শব্দ, শব্দের সাধনার প্রতি তোমায় দায়বদ্ধ থাকতে হবে, সেই সাধনা সিদ্ধি লাভ করবে যদি পাঠক তোমায় গ্রহণ করেন। মন দিয়ে শোনো, একটু বাদে অরিনের নাম্বার তোমায় মেসেজ করছি, যোগাযোগ কোরো”

ফোন কেটে যায়। শান্ত ঠাণ্ডা মাথায় ইন্দিরা সোফায় এসে বসে।

রুবাঈয়ের জিজ্ঞাসু চোখ দেখে বলে, “মা,- আমার বই করতে চান।”

রুবাঈ কিছু বলে না।

ইন্দিরাও চুপ করে বসে থাকে। নিজেকে ক্লান্ত লাগে তার খুব। শরীরে- মনে। হঠাৎ তার খেয়াল হয়, ‘রঞ্জিশ’ গল্পটা সে নিজে ‘কাঁচপোকা’য় পাঠায়নি, মা তবে কি করে পেলেন লেখাটা? মিথ্যে বললেন কি? ইন্দিরা কিছু ভেবে পায় না, মোবাইল তুলে নিয়ে সমিত দে’কে মেসেজ করে, “তুমি কি রঞ্জিশটা কাউকে পাঠিয়েছো?”

সাথে সাথে উত্তর আসে, “না তো, কি হয়েছে?”

ইন্দিরা জবাব দেয় না কোনো।

 

রাতের খাবার টেবিলে রুবাঈ- ইন্দিরা চুপচাপ বসে থাকে। কারোর না থাকায় যে শূন্যতা তৈরি হয় সেই শূন্যতা যেন তাদের সাথেই একই টেবিলে নৈশাহারে বসেছে, আর কাঁটা চামচ দিয়ে বেছে বেছে তাদের মধ্যেকার শব্দদের গিলে ফেলছে। প্লেট শূন্য হয়ে এলে রুবাঈ বলে, “কি করবে ভেবেছো?”

একটু আগে ফোনে আসা মেসেজে অরিন রায়ের নম্বরে চোখ রেখে ইন্দিরা জবাব দেয়, “কোনো প্রশ্নই ওঠে না।”

“মানে? আমি আনন্দীর ব্যাপারে বলছিলাম…”, রুবাঈ থমকে যায়।

ইন্দিরা শূন্য চোখে রুবাঈকে দেখে। কিছুক্ষণ পর বলে, “আজকাল আর হাল ধরে রাখতে পারি না রুবাঈ, গত বছর থেকে আমি শেষ হয়ে গিয়েছি।”

“সবাইকে চলে যেতে দিতে নেই ইন্দিরা, হাত পাতো…”

ইন্দিরা অবাক হয়।

“হাত পাতো…”

ইন্দিরা টেবিলের ওপরে হাত মেলে ধরে।

“তুমি তোমার গল্পের অপু নও, সেই যার হাতে কোনো রেখা ছিল না। দেখো,- তোমার হাতে জ্বলজ্বল করছে কয়েকটা লাইন”

“জানি রুবাঈ, শুধু আজকাল ক্লান্ত লাগে”

রুবাঈ চুপ হয়ে যায়। তারপর যেন নিশ্চিত হওয়ার জন্য বলে ওঠে, “ওকে ভালোবাসো?”

“ভালোবাসি”

“এভাবে ছেড়ে দিতে পারবে?”

“পারবো”

রুবাঈয়ের মুখে সুন্দর একটা হাসি ফুটে ওঠে।

 

 

 

সকাল সকাল কারোর উত্তেজিত স্বর শুনে ইন্দিরার ঘুম ভেঙে যায়, খেয়াল করতে সে বোঝে হলঘরে রুবাঈ আর হিরণের মধ্যে কথা কাটাকাটি চলছে। বিছানায় শুয়ে শুয়েই ইন্দিরা শুনতে পায় হিরণ বলছে, “আনন্দী কি অবস্থায় আছে, কি করছে, কোথায় কিভাবে থাকছে কোনো খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা করেছে ও?!”

উত্তরে রুবাঈ কিছু বলে, কিন্তু ইন্দিরার কানে তা পৌঁছোয় না।

“না এরকমভাবে সব কিছু ছেড়ে চলে যাবে কেন?! নিশ্চয়ই ওদের মধ্যে এমন কিছু হয়েছে যার ফলে আনন্দীকে চলে যেতে হল,- রাতারাতি!”

এর জবাবেও রুবাঈ কি বলে ইন্দিরা শুনতে পায় না।

“না আমার তো উত্তর চাই রুবাঈ, তুমি যতই ওকে আড়াল করার চেষ্টা কর না কেন, আনন্দী তো আমারও বন্ধু, কেন একজন স্বার্থপর, অহংকারী, দুঃখবিলাসী আর আত্মকেন্দ্রিক মানুষের জন্য তাকে একটা শহর ছেড়ে চলে যেতে হবে?!”

বিশেষণগুলো মনের মধ্যে খানিক নাড়াচাড়া করে ইন্দিরা, তারপর শুনতে পায়, “যদি কিছু হয়ে যায় আনন্দীর, দায় কে নেবে!”

নীলেশের কথাটা কানে ভাসে ইন্দিরা, একই প্রশ্ন তারও ছিল।

ইন্দিরা বিছানা ছেড়ে নামে না। তার হাত পা অসাড় হয়ে আসে। বাইরে থেকে সে শুনতে পায় হিরণ বলে চলেছে, “তুমি জানো আনন্দী কতটা Concerned ছিল ওকে নিয়ে? তুমি খালি ওর তরফটুকুই শুনে খুশি থাকো, আমি আনন্দীর দিকটা দেখেছি, আমি জানি। অকৃতজ্ঞ মানুষ! এবং লজ্জাহীন! এর পরেও কি করে তুমি ওর হয়ে কথা বলো রুবাঈ! কি করেছে ও আনন্দীর জন্য আজ অবধি! শুধু নিজের দুঃখ, নিজের বিষাদ, নিজের না পাওয়া, খালি নিজের, নিজের আর নিজের চিন্তা! সারা পৃথিবীটাই যেন ওকে প্রদক্ষিণ করছে। এতই আত্মমগ্ন! আর দেখ, এত কিছুর পরেও তুমি এসেছো, আর ও তোমাকে এই হলঘরে এখানে শুতে বলেছে। You should not stay here Rubai!”

কিছুক্ষণ কোনো সাড়া পাওয়া যায় না হলঘর থেকে। একটু পরে দরজার আওয়াজে ইন্দিরা বুঝতে পারে হিরণ চলে যাচ্ছে। ইন্দিরা স্থবিরের মত পড়ে থাকে বিছানায়।

একটু পরে দরজায় এসে দাঁড়ায় রুবাঈ, বলে, “সব শুনেছো নিশ্চয়ই?”

ইন্দিরা কিছু বলে না।

“এখন কেমন লাগছে শরীর” রুবাঈ এসে ইন্দিরার কপালে হাত রাখে।

ইন্দিরা বলে, “রুবাঈ, আমি নীলেশের ফোন নম্বরটা ওই নামে সেভ করলাম কেন?”

রুবাঈ কিছু বলে না, বিছানার পাশে রাখা চেয়ারে বসে পড়ে, “কি নামে সেভ করতে তবে?”

“না মানে, সেভই বা করলাম কেন?”

“কেন সেভ করলে?”

“নিরাপত্তাহীনতা?”

রুবাঈ জবাব দেয় না।

ইন্দিরা বলে, “আমি সত্যিই বড় আত্মকেন্দ্রিক রুবাঈ, নিজের বাইরে অবধি আমার দৃষ্টি পৌঁছোয় না। কাল নীলেশের সাথে আমি অত কথাই বা বললাম কেন? আমি কি মনে করি, নীলেশের কাছে, নীলেশের সাথে আনন্দী বেশি নিরাপদ?”

“হয়তো তুমি মনে করো, কিন্তু আনন্দী? সেও কি এটাই মনে করে?”

“জানি না রুবাঈ, জানার কথা মাথাতেও আসেনি, হয়তো আরো কিছুদিন ও থাকলে একটা সময় জানতে চাইতাম, বা হয়ত তাও চাইতাম না, ভুলে যেতাম। নিজেকে ছাড়া আমি সমস্তই ভুলে যাই রুবাঈ। আর মনে থাকে নম্বর, তারিখ, সাল। এসব মাইলফলক। আনন্দীর আগের জীবন আর আনন্দীর পরের জীবন, এই দুইয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে আছি। কোথাও যাচ্ছি না, স্বার্থপরের মত। অথচ আমার কোথাও যাওয়ার খুব প্রয়োজন! এই মুহূর্তেই!”

রুবাঈ চুপ করে ইন্দিরার দিকে তাকিয়ে থাকে।

ইন্দিরা বলে, “যদিও, she said not to search her”

“হ্যাঁ, search এর কথা বলেছে find এর কথা বলেনি কিন্তু”

“মানে?”

“Serendipity… না চাইতেই, না খুঁজতেই কিছু পেয়ে যাওয়া। ও কিন্তু এটা বলেনি যে, tell her not to ‘find’ me,”

“আমি বুঝতে পারছি না তুমি কি বলছো…”

“বুকে হাত রাখো ইন্দিরা, বা শরীরে, ওর রেশ এখনও তোমার মধ্যে আছে, খুঁজো না তাকে, আবিষ্কার করো। নিজের ভিতরে, নিজেকে ছাড়াও অন্য কাউকে,- আনন্দীকে, আবিষ্কার করো”

কি মনে হতে চোখ বুজে ফেলে ইন্দিরা আর তার নাকে আনন্দীর চুলের গন্ধ এসে পৌঁছোয়। অবাক হয়ে ইন্দিরা গন্ধটা বুকে ভরে নেয়। নিজের বোধকে পায়ের পাতা থেকে শুরু করে ঊরু, কোমর, বুক হয়ে মাথা পর্যন্ত নিয়ে যায় ইন্দিরা। একটা সময় সে টের পায় তার গোটাটাই আনন্দীর। তার গোটাটাই আনন্দী।

চোখ খুলতে সে দেখে রুবাঈয়ের মোবাইল তার মুখের সামনে ধরা। স্ক্রীনে ফেসবুকের নিউজ ফিডে নিয়ারবাই ফ্রেন্ডস-এ আনন্দীর নাম দেখা যাচ্ছে, আর নিচে লেখা আছে শহরের নাম,- হায়দরাবাদ।

 

বেলার দিকে ইন্দিরার ফোনে সমিত দে’র মেসেজ আসে, “শুনলাম তোর নাকি বই হচ্চে?”

মেসেজের জবাব লিখতে গিয়ে ধৈর্যচ্যুতি হয় ইন্দিরার, সে ফোনই করে বসে সমিতকে।

“কিরে লেখক হয়ে গেলি তো!”

“ইয়ার্কি কোরো না, কে এসব বলেছে তোমায়?”

“কে বলবে, ফেসবুকে পোস্টার পড়েছে, অরিন রায় বই করছে তোর”

“ভুল খবর, কোনো বই হচ্ছে না আমার”

“ও, আমি ভাবলাম তোর মা বুঝি মুখ তুলে চেয়েছেন তোর দিকে”

“আবার ইয়ার্কি! গতকাল ফোন করেছিলেন উনি, এই নিয়ে কথা বলেছেন, যদিও আমি না করেছি”

“আচ্ছা, তা একটা কতা বল, ক’টা লেখা আছে তোর হাতে, বই হবে তা দিয়ে?”

“হতে পারে, যদিও অনেক ঝাড়াই-পোঁছাই করতে হবে”

“আচ্চা, আমায় চট করে দিন পনেরোর মধ্যে পাণ্ডুলিপি তৈরি করে পাঠাতে পারবি?”

“কি করবে?”

“পাণ্ডুলিপি দিয়ে মানুষ কি করে? খাবো আর কি!”

“ধুর, খুলে বলো…”

“একটা মাঝারি প্রকাশনার সাথে যুক্ত হয়েছি ক’মাস হলো, তুই তো প্রেম করে বেড়াস তাই ফেসবুক পোস্টগুলো দেখিসনি”

“আবার ইয়ার্কি!”

“তোর বই অরিন রায়কে দিয়ে করাতে হবে না”

“করাবোও না”

“আমায় পাঠা, আমি দেখছি”

“বই-ই করাবো না… কে পড়বে আমার লেখা? আদৌ তা পাঠযোগ্য?”

“বিনয়বিলাস করিস না তো, যা বলছি কর, আমায় পাঠা, বাকিটা আমি বুঝে নোবো”

ফোন কেটে যেতে হলঘরে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে ইন্দিরা।

কিচেন থেকে বেরিয়ে এসে রুবাঈ জিজ্ঞেস করে, “তুমি কিন্তু আমায় এখনও বললে না হায়দরাবাদের টিকিটটা কাটবো কি না”

ইন্দিরার ফোন বেজে ওঠায় রুবাঈকে জবাব দেওয়া হয় না তার। বাড়ীর নম্বর দেখে ফোন রিসিভ করে ইন্দিরা।

“হ্যালো”

কিছুক্ষণ পর ওপাশ থেকে জবাব আসে, “একা আছিস?”

জয়তী! “তুমি আমার নম্বর পেলে কোথা থেকে?!”

“পিকলু দিল একটু আগে, বল, একা আছিস?”

জবাব দেয় না ইন্দিরা, বরং বলে, “তোমার দেওয়া আয়নাটা দেখলাম”

ওপাশ থেকে উচ্ছ্বাস শুনতে পায় ইন্দিরা, “তাই! দেখতে পেলি?”

“দেখতে পেলাম।”

“বেশ, এই নে পিকলুর সাথে কথা বল”

জয়তী সরে যায় ফোন থেকে, পিকলু আসে না।

ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করে ইন্দিরা। অনেকক্ষণ পর পিকলুর সাড়া পাওয়া যায়। সে কিছু বলার আগেই ইন্দিরা বলে, “ও চলে গেল আবার”

পিকলু চুপ করে শোনে।

ইন্দিরা বলে চলে, “আমি কি বরাবরই এমন আত্মকেন্দ্রিক, দাদা?”

প্রশ্নের জবাব দেয় না পিকলু, বলে, “সকালে রঞ্জনা এসেছিল”

থমকে যায় ইন্দিরা, “কি বলল?”

“একটা পত্রিকা দিয়ে চলে গেল”

কাঁচপোকা!- ইন্দিরা জানতে চায়, “কি পত্রিকা?”

“দেখিনি”

“কতক্ষণ ছিল?”

“অল্প”

“আর কিছু বলল?”

“না”

ইন্দিরা বোঝে এবার পিকলু শুধুই এক শব্দে উত্তর দেবে। তবু ইন্দিরা জিজ্ঞেস করে, “রঞ্জনা কেমন আছে দাদা?”

“ঠিক”

“জ্যেঠু? জয়তী?”

“ভালো”

“আর তুই?”

পিকলু ফোন রেখে দেয়।

 

ইন্দিরা ফোন রেখে সামনের দেওয়ালের দিকে তাকায়। দেওয়ালের ছবিগুলোর ওপর চোখ বুলিয়ে নিয়ে আবার সে ফোন হাতে নিয়ে হোয়াটসঅ্যাপে চলে আসে, আনন্দীর নম্বরে মেসেজ পাঠায়-

“আমি স্বার্থপর মানুষ। তবে কে-ই বা স্বার্থপর নয়। আজ অবধি সবাইকে চলে যেতে দিয়েছি। শুধু যাওয়ার আগে একবার মুখ ফুটে বলেছি, থেকে গেলেও পারতে। না তাতে কোনো বাধ্যবাধকতা ছিল না। আমন্ত্রণ ছিল, ভিক্ষা ছিল না। আমি যুদ্ধ পারি না আনন্দী। অথচ অভিমান পারি। আহম্মকের মতো। তোমার অভিমান আমায় ভাবায় না, কারণ আমি আত্মমগ্ন মানুষ। নিজে থেকে কেউ ভিতর অবধি হেঁটে না এলে আমার ভিতরটা শূন্যই থেকে যাবে। এটা কি আমার অহংকার নয়?

আমি তোমাকে নীলেশের দিকে ঠেলে দিতে পারি না। সে অধিকার আমার নেই। তবু অবচেতনে হয়ত ভেবে নিয়েছিলাম যে তোমায় ভালো রাখার সামর্থ ওর বেশি। ভালোবাসার?- জানি না। জানো কথায় কথায় রঞ্জনাকে একবার বলেছিলাম একদিন আমি রোম্যান্টিক একটা উপন্যাস লিখবো, কাকে নিয়ে জানি না। রঞ্জনা হেসেছিল। বিদ্রুপের হাসি। যার প্রেম শেষ হয়ে গিয়েছে, সে কি করে প্রেমের উপন্যাস লিখবে- এই চিন্তা ওকে হাসিয়েছিল। প্রেম কেন শেষ হয়ে যায় আনন্দী? প্রেম শেষ হয়, না মানুষ?

সেই থেকে আমার কোনো অধিকারবোধ নেই। তাই অতি সহজে সবকিছু ছেড়ে চলে যেতে পারি,- শহর, পরিবার, মানুষ। আমাকে টানে না কিছু। আমিও কাউকে টানি না। পুরোটাই মিউচ্যুয়াল একটা বোঝাপড়া। কিন্তু তুমি? তুমি আমায় ভাবাচ্ছো, নিজের দিকে ফিরে তাকাতে বাধ্য করছ, এত বছরের যে মিথ্যে স্থিরতা অভ্যাস করেছি আমি, তাকে প্রশ্ন করে উঠছি।

তাই তোমার অনুমতি চাইবো, তোমার কাছে আসার জন্য। কারণ বলপূর্বক কিছু আমি করতে পারি না। যতই দম আটকে আসুক, যতই জীবন একটা অন্ধকার গলি হয়ে উঠুক না কেন, তুমি না চাইলে তোমার কাছে আমি আসব না। যদিও প্রচণ্ড আসতে চাইবো। ভালবাসতেও চাইবো। কিন্তু আমার চাওয়াদের মুখ চেপে ধরে থাকবে আমাদের মাঝে পড়ে থাকা এই দূরত্ব।”

মেসেজ পাঠানোর ঠিক আগের মুহূর্তে ইন্দিরা খেয়াল করে আনন্দী অনলাইন এসেছে।

ইন্দিরা মেসেজটা পাঠিয়ে অপেক্ষা করে।

মিনিট তিনেক পর সে দেখে আনন্দী কিছু একটা টাইপ করছে, চুপ করে অপেক্ষা করে সে আনন্দীর প্রত্যুত্তরের জন্য। আনন্দী লিখে পাঠায়,

“আজ রাত ৮টায়,

করাচী বেকারি,

গাচ্ছিবৌলি,

কিছু কথা আমারও বলার আছে”

 

ইন্দিরা চট করে সময় দেখে, সকাল সাড়ে বারোটা, বাসে গেলে কোনোমতেই পৌঁছানো যাবে না। সে চট করে কিচেনে চলে আসে, রুবাঈ সেখানে স্যান্ড্যুইচ তৈরিতে ব্যস্ত।

“রুবাঈ, আমার অ্যাকাউন্টে তেমন টাকা নেই…”

শসা কাটতে কাটতেই রুবাঈ জিজ্ঞেস করে, “বাস না ট্রেন?”

“ফ্লাইট, আজ রাতেই পৌঁছোতে হবে, আমি তোমায় আগামী সপ্তাহে স্যালারি পেয়েই টাকাটা ট্রান্সফার করে দেবো”

হাতের ছুরি নামিয়ে রেখে হাসিমুখে ইন্দিরার দিকে ফেরে রুবাঈ, বলে, “তুমি তৈরি?”

ইন্দিরার ভয় হয়, সে বলে, “একেবারেই না।”



প্রথম পর্ব

লেখা সম্পর্কে মন্তব্য

টি মন্তব্য