home ই-বুক, উপন্যাস ধারাবাহিক উপন্যাস – তারাদের ঘরবাড়ি । অলোকপর্ণা । ১৫ পর্ব

ধারাবাহিক উপন্যাস – তারাদের ঘরবাড়ি । অলোকপর্ণা । ১৫ পর্ব

                                         তারাদের ঘরবাড়ি ১৫

 

আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আছে ইন্দিরা গত আধঘণ্টা ধরে। নিজের চোখের দিকে তাকিয়ে আছে।

“কেমন দেখতে আমায়?” নিজেকে প্রশ্ন করে ইন্দিরা।

নিজের উন্নত নাক, পাতলা ঠোঁট, ভরাট গাল, আর সাধারণ চোখ দেখে ইন্দিরা। রঞ্জনা খুব একটা ভুল কিছু বলেনি, নিজেকে আপাদমস্তক সাধারণ বলে মনে হয় ইন্দিরার। ভারতীয় উপমহাদেশে ছোট চুল ছাড়া আলাদা করে খেয়াল করার মত ইন্দিরার চেহারায় কোনো বিশেষত্ব নেই। তবু কেন আনন্দীরা আসে? ইন্দিরার মন সাথে সাথে জবাব দেয়, “চলে যাওয়ার জন্য।”

গুনগুন করে “রঞ্জিশ হি সহি” গেয়ে ওঠে ইন্দিরা। তারপর আয়না থেকে ধীরে ধীরে নিজেকে সরিয়ে এনে বিছানায় মেলে দেয়। চোখ বোজে ইন্দিরা। ঝট করে একটা মুখ সরে যায় চোখের সামনে থেকে। ইন্দিরা চমকে তাকায়। পাশে পড়ে থাকা সেলফোন তুলে ফেসবুক খুলে একটা প্রোফাইলে চলে আসে সে। সমুদ্রের ছবি। অচেনা এক মানুষ দাঁড়িয়ে আছে আরব সাগরের সামনে। মুখে ঝকঝকে হাসি, চোখে চকচকে সানগ্লাস। কি মনে হতে ইন্দিরা ফ্রেন্ড রিকোয়েস্টটা অ্যাক্সেপ্ট করে নেয়। মেসেজ বক্সে সিস্টেম জেনারেটেড মেসেজ আসে। “Start a conversation…” নিজের মনে ইন্দিরা বলে ওঠে, “Am I masochist?”

ইন্দিরা ইনবক্সে লেখে, “তুই আমার কে ছিলি মনে আছে তোর?”

কিছুক্ষণ লাইনটার দিকে তাকিয়ে থেকে ব্যাকস্পেস বাটন প্রেস করে ইন্দিরা, লাইন মুছে যাওয়ার পরেও বাটনটা ছাড়ে না সে, যেন চাইলেই আরো কত কি মুছে দেওয়া যায়, যেন আরো কিছু মুছে দেওয়া বাকি। কিছু লেখা হয় না ফাঁকা ইনবক্সে। ফেসবুক ছেড়ে কলার লিস্টে ফিরে এসে শেষ আননোন নম্বরটা সেভ করে ইন্দিরা, লেখে, “Nilesh,- Anandi’s Fiance”। আরো কিছুক্ষণ আনকোরা নম্বরটার দিকে তাকিয়ে থেকে হেসে উঠে সে নিজের মনে বলে, “I am definitely a masochist.”

সেলফোন নিজের পাশে ফেলে রেখে চোখ বুজে ফেলে ইন্দিরা চৌধুরী। টের পায়, গলা থেকে বুক অবধি সেই কবেকার কষ্টটা -বন্ধু কষ্টটা আটকে আছে।

 

 

আলোময় ঘরে বড় টেবিল ঘিরে জনা ছয় দক্ষিণ ভারতীয় মধ্যবয়সী মানুষ বসে আছেন। টেবিলের মাঝখানে রাখা তিনকোনা যন্ত্রে পৃথিবীর অপর প্রান্ত থেকে কিছু মানুষের কথা ভেসে আসছে। যার খুব অল্পই ইন্দিরার বোধগম্য হচ্ছে। নিজের অজান্তে চোখ লেগে আসে ইন্দিরার। হঠাৎ করে চোখ খুলে সে দেখে টেবিলের উল্টোদিক থেকে, তার জীবনের প্রথম টিম লিড সরাসরি তাকিয়ে আছেন ইন্দিরার দিকে। চেয়ারে সোজা হয়ে বসে ইন্দিরা। দেওয়ালের প্রোজেকশনের দিকে চোখ রাখে। নীল পর্দা, তাতে বিভিন্ন ডাটা ফিল্ড, কিছু একটা বিষয়ে গম্ভীর কথোপকথন চলছে। তার মাঝখানে বসে ইন্দিরার আবার চোখ লেগে আসে। ব্যাগ থেকে জলের বোতল বের করে জল খায় সে। সমস্ত ব্যাপারটার বিন্দু-বিসর্গ না বুঝতে পারার ফলে ইন্দিরা অস্থির হয়ে ওঠে। মিনিট কুড়ি পর সাময়িক বিরতি নেওয়া হলে সে কফি খেতে উঠে পড়ে।

এক কাপ কফি অর্ডার দিয়ে ইন্দিরা দেখে তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন শিবপ্রসাদ বোম্মানা, মধ্যবয়স্ক টিম লিড। ইন্দিরা দূরত্ব বজায় রেখে কফি কাপ তুলে নেয়।

“কেমন লাগছে?” শিবপ্রসাদের প্রশ্নে চমকে ওঠে ইন্দিরা, জবাব দেয়, “ভালো”

“প্রথম প্রথম বুঝতে অসুবিধা হবে, তবু মন দিয়ে শুনতে হবে, ঠিক আছে?”

মাথা নেড়ে ইন্দিরা সম্মতি জানায়।

“চলো”

মিটিং রুমের দিকে পা বাড়ায় তারা দুজনে। মিটিং রুমে ঢোকার ঠিক আগে শিবপ্রসাদ থমকে দাঁড়ান। ইন্দিরাও দাঁড়িয়ে পড়ে। ইন্দিরার দিকে ফিরে শিবপ্রসাদ বলেন, “আর ঘুম পেলে ওয়াশরুমে গিয়ে চোখে জল দিয়ে আসবে।”

ইন্দিরার আগে শিবপ্রসাদ মিটিং রুমে ঢুকে যান।

 

 

“কেমন লাগছে?” ইন্দিরা দেখে লাঞ্চ টেবিলে উলটো দিকে বসে রুবাঈ আগ্রহ ভরে তার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে।

“কিছুই বুঝতে পারছি না… কি হচ্ছে কেন হচ্ছে, কেউ বুঝিয়ে বলারও নেই”

“আমারও একই অবস্থা, আনন্দীদের কাজ কেমন হচ্ছে কে জানে… কিছু বলল?”

প্লেট থেকে চামচে খাবার তুলতে তুলতে জানতে চায় ইন্দিরা, “কে?”

“আনন্দী…?”

কোনো জবাব দেয় না ইন্দিরা। চুপচাপ খেয়ে চলে।

“সব ঠিক আছে তো ইন্দিরা?”

মাথা না তুলেই ইন্দিরা জবাব দেয় “হ্যাঁ।”

রুবাঈ তাকিয়ে থাকে তার দিকে, কিন্তু আর কিছু জানতে চায় না।

 

 

দিন শেষ হতে কাউকে কিছু না জানিয়ে ফোন স্যুইচ অফ করে অফিস থেকে বেরিয়ে আসে ইন্দিরা। বাস স্টপে এসে দাঁড়িয়ে থাকে কিছুক্ষণ, তারপর কি মনে হতে হাঁটতে শুরু করে। শহরের অদ্ভুত হাওয়ায় ধুলো, কাগজের ঠোঙা, গাছের পাতা আর ইন্দিরার চুল উড়ছে। বৃষ্টির গন্ধ কাছে দূরে। ইন্দিরা আকাশের দিকে তাকায়। বোঝে কাছেই কোথাও বৃষ্টি নেমেছে। চোখ বুজে বৃষ্টির গন্ধ নেয় ইন্দিরা। কেউ একজন তাকে ধাক্কা দিয়ে চলে যেতে ইন্দিরার খেয়াল হয়, তার চারপাশে সবাই নিজের মত দৌড়ে চলেছে। একা ইন্দিরা দাঁড়িয়ে, ভিড়ের মধ্যে একা।

সাথে সাথে সাদা দরজাটার কথা মনে পড়ে ইন্দিরার, কেন কে জানে। সকালে ঘুম থেকে ওঠার পরে আরো একবার এসে দরজায় হাত রেখেছিল ইন্দিরা। দরজাটা তখনও বন্ধ ছিল, ভিতর থেকে। কোনো রকমে নিজের জন্য খাবার বানিয়ে স্নান করে অফিসের জন্য বেরিয়ে পড়েছিল সে, একপ্রকার পালিয়ে এসেছিল, সাদা ওই দরজাটার থেকে। কারণ সে জানে না, যদি হঠাৎ করে দরজাটা খুলে যায়, তার কি বলা উচিৎ, কি করা উচিৎ। নিজেকে ওই বন্ধ দরজার থেকে দূরে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে ইন্দিরা। যেখানে গেলে ওই দরজাটার কথা, গতকাল রাতের কথা তার আর মনে থাকবে না। “মনে না রাখা” আর “ভুলে যাওয়া”র মধ্যে যতটা ফাঁক থাকে, ঠিক ততটা ব্যবধান হেঁটে এসে দাঁড়িয়ে পড়ে ইন্দিরা। আকাশ থেকে এক ফোঁটা জল এসে পড়ে তার কপালে। বৃষ্টি নামল। হঠাৎ ঝমঝম করে বৃষ্টি নামায় রাস্তায় যারা যারা ছিল সবাই আশ্রয় খুঁজতে আশেপাশের দোকানে ঢুকে পড়ে। ইন্দিরা কোথাও যায় না। ফুটপাথে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভিজে চলে। হঠাৎ তার মনে হয় কেউ একজন যেন এসে দাঁড়িয়েছে তার ঠিক পিছনে। পিছু ফিরতে ইন্দিরা দেখে ছাতা মাথায় ফুটপাথে দাঁড়িয়ে আছে আনন্দী। ইন্দিরা তার থেকে এক পা পিছিয়ে এসে দাঁড়িয়ে পড়ে। আনন্দীর দৃষ্টি তাকে নিজের জায়গায় আটকে রেখে দেয়, আর দূরে যেতে দেয় না। নিজেকে লুকোতে প্রবল বর্ষণে ঝাপসা হয়ে যাওয়া চশমাটা খুলে মোছার চেষ্টা করে ইন্দিরা, কিন্তু তার খেয়াল হয় সে আপাদমস্তক ভিজে গিয়েছে, চশমার কাঁচ মোছার জন্য গায়ে শুকনো কোনো কিছু নেই। আনন্দী এগিয়ে আসে ইন্দিরার দিকে, কিছু না বলে তার হাত থেকে চশমাটা নিয়ে নিজের ওড়না দিয়ে মুছে আবার ইন্দিরার হাতে ফেরত দিয়ে দেয়। চুপচাপ চশমাটা চোখে পরে ইন্দিরা। আর দেখে আনন্দী তার ছাতাটা বন্ধ করে ব্যাগে ভরে নিচ্ছে। ব্যাগে ছাতা ভরা হলে আনন্দী ফিরে তাকায় ইন্দিরার দিকে। ইন্দিরা কিছু না বলে, ফুটপাথে নিজের পাশে আনন্দীর হাঁটার জায়গা তৈরি করে দিয়ে হাঁটতে শুরু করে। বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে আনন্দী হাঁটতে শুরু করে ইন্দিরার পাশাপাশি। হাওয়াশহরের বৃষ্টিতে নিঃশব্দে আশরীর ভিজতে ভিজতে তারা এগিয়ে চলে। অ্যাপার্টমেন্টের কাছাকাছি চলে আসতে হঠাৎ নিজের হাতে একটা স্পর্শ টের পায় ইন্দিরা। বোঝে আনন্দীর নরম আঙুল তার হাত ছুঁয়ে দিচ্ছে। হাত সরিয়ে নেয় ইন্দিরা। তবু আনন্দী জোর করে আবার ইন্দিরার হাত ধরে। একটু জোরেই এবার নিজের হাত ছাড়িয়ে নেয় ইন্দিরা। সাথে সাথে আনন্দী তার হাত ধরে নিয়ে জনমানবহীণ রাস্তায় দাঁড়িয়ে পড়ে। ইন্দিরাও থেমে যায়।

“তুমি শুনতে পাও না, না?” হাতটা না ছেড়েই বেশ জোরে প্রশ্নটা করে আনন্দী। বৃষ্টির আওয়াজ পার করে তা ইন্দিরার কানে এসে পৌঁছোয়। ইন্দিরা দেখে আনন্দী হাঁপাচ্ছে। নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করতে করতে সে জবাব দেয়, “ভুল শুনি, ভুল বুঝি।”

“এটা ভুল নয়”, আনন্দী জবাব দেয় ইন্দিরার চোখে চোখ রেখে।

“তাহলে কি এটা আনন্দী? দরজাটা খুলেছিলই বা কেন আর বন্ধই বা কেন হয়ে গেল?!” ইন্দিরা জানতে চায়।

“তুমিও তো নক করোনি একবারের জন্যেও… অথচ… you have the key, you always had the key!” মাথা নিচু করে আনন্দী।

ইন্দিরা তাকিয়ে থাকে আনন্দীর দিকে। বৃষ্টিতে ভিজে গিয়ে কিছু চুল তার কপালে লেপ্টে আছে। আঙুল দিয়ে আনন্দীর কপাল থেকে ভেজা চুলগুলো সরিয়ে দেয় ইন্দিরা। আনন্দী চমকে মুখ তুলে তাকায়। ইন্দিরা দেখে তার চোখ ছলছল। ইন্দিরার বুকে মোচড় দিয়ে একটা ব্যথা খেলে যায়। একটু এগিয়ে এসে পায়ের আঙুলে ভর দিয়ে আনন্দীর বৃষ্টি ভেজা কপালে ঠোঁট ছোঁয়ায় ইন্দিরা। কয়েক সেকেন্ড পর নিজেকে সরিয়ে আনতে সে দেখে আনন্দীর দুচোখ বন্ধ। কি অপূর্ব সেই চোখের পাতা! ভারি, ঘন পালকে ঘেরা, ভেজা ভেজা, তৃপ্ত দুটো চোখের পাতা। ইন্দিরা অবাক হয়ে দেখতে থাকে।

 

 

মেঘলা ঘরে একে অন্যের সামনে এসে দাঁড়ায় ইন্দিরা ও আনন্দী। টেবিলে রবীন্দ্রনাথের ছবির কাঁচে তাদের ছায়া পড়ে। আনন্দী মনে মনে বলে, “What if we don’t talk…”

ইন্দিরা মনে মনে জবাব দেয়, “We don’t need to, পৃথিবীর সমস্ত সুন্দর, সমস্ত আনন্দ- অব্যক্ত। শিশুর হাসি, সকালের রোদ, গ্যাস বেলুনের উপরে উঠে যাওয়া, শীতের দুপুর, বাজপাখির ডানায় খেলে যাওয়া হাওয়া,- সব মূক, যা সুন্দর। জানো আমি সব লিখে ফেলতে চেয়েছিলাম”

আনন্দী মনে মনে জানতে চায়, “সব?”

আনন্দীর ঠোঁটের ভাঁজে হাত রাখে ইন্দিরা, “এই যে এই হালকা কার্ভটা, তোমার নিচের ঠোঁটে, এত নরম, অথচ প্রবল অস্তিত্বময়, কিভাবে লিখবো একে? বা ধরো…” আনন্দীর কাঁধ থেকে এলোমেলো চুলের গোছা সরিয়ে ঠোঁট রাখে ইন্দিরা, মনে মনে বলে, “জ্যোৎস্না পিছলানো কাঁধ… পুরোনো গলির মত আপন গলা ও ঘাড়…” আনন্দীর ঘাড়ে ঠোঁট ছোঁয়ায় ইন্দিরা।

“আর?”, আনন্দীর ঘন নিঃশ্বাস এসে লাগে ইন্দিরার কাঁধে।

মনে মনে বলে চলে ইন্দিরা, “উত্তাল সাপের মত চুল, ওহ, ওরা আমায় অন্ধ করে দেবে আর একটুও যদি তাকিয়ে থাকি, আর…” চোখ বুজে ইন্দিরা গভীর শ্বাস নিয়ে আনন্দীর ঘন চুলে হাত রাখে, “এই গন্ধটা… প্রিয় বইয়ের গন্ধের মত কি প্রচণ্ড নেশাময়…”

মনে মনে আনন্দী জানতে চায়, “আর?”

আনন্দীর চোখে চোখ রাখে ইন্দিরা, ধীরে ধীরে আনন্দীর মধ্যে হেঁটে চলে আসে, “এই যাতায়াত… যেভাবে পাখি সুর্যের দিকে উড়ে যায়, যেভাবে আগুনের কাছে এসে পড়ে শ্যামাপোকা, যেভাবে অবসাদগ্রস্থ মানুষটি ছাদের রেলিং বরাবর শেষের দিকে হেঁটে যান, যেভাবে শিশু মায়ের দিকে প্রথমবার এগিয়ে চলে, যেভাবে শেষবার মাঠে নামেন সর্বকালের সেরা কোনো খেলোয়াড়, অনায়াস এবং অসহ্য… এই যাতায়াত…”

ইন্দিরাকে কাছে টেনে নেয় আনন্দী। ভেজা জামাকাপড় লেপ্টে যায় একে অন্যের সাথে। ঠান্ডা দুটো শরীর আলো হয়ে যায়, ইন্দিরার জামার বোতামে হাত রাখে আনন্দী, আনন্দীর ওড়না সরিয়ে দেয় ইন্দিরা। একের পর এক আবরণ সরিয়ে ফেলে, দেরি করে রাত নামা শহরের কনে দেখা আলোয় একে অপরের দিকে তাকায় তারা। চোখ ঝলসে যায় ইন্দিরার। একটা বিরাট নদী, রোষে ফুলে ফুলে উঠছে তার সামনে, অথচ সাঁতার জানা নেই তার। চোখ বন্ধ করে নদীতে নেমে আসে ইন্দিরা। ঠান্ডা জলোচ্ছ্বাসে তার সারা গায়ে কাঁটা লেগে যায়, ছিটকে সরে আসার চেষ্টা করে সে, কিন্তু আনন্দী তাকে চারদিক থেকে জাপটে ধরে নেয়। নিজের অস্তিত্ব ধীরে ধীরে ছেড়ে চলে যায় ইন্দিরাকে, একা ইন্দিরা, শুধু ইন্দিরা দাঁড়িয়ে থাকে, আর তার চারপাশটা আনন্দী হয়ে যায়। বিছানায় মাথার বালিশে লেগে যায় তাদের ভিজে চুল। ইন্দিরার গলায় ঠোঁট রাখে আনন্দী, মনে মনে বলে, “এখান থেকেই তো গান করো তুমি… যেদিন ক্লাসে ‘রঞ্জিশ হি সহি’ গেয়ে উঠেছিলে, আমি চুপ হয়ে গেছিলাম। তোমার যে শোক তোমার একার, তার মুখোমুখি একদিন আমায় বসতে দেবে ইন্দিরা?”

চোখ বুজে আসে ইন্দিরার, মনে মনে সে বলে, “দেবো, কিন্তু…”

“কিন্তু?”

“সে বড় দুর্বোধ্য… আমিই বুঝি না তাকে”

“আমি বুঝে নেবো”, ইন্দিরার বুকে নেমে আসে আনন্দী আর আনন্দীর স্রোত, ইন্দিরা আরও ডুবে যায়।

ইন্দিরা মনে মনে প্রশ্ন করে, “আমাকে কেমন দেখতে আনন্দী? আমাকে তুমি কেমন দেখো?”

ইন্দিরার বুকে ডান হাতের পাতাটা রাখে আনন্দী, বলে, “আয়নার মত, তোমার মধ্যে আমি আমার সবটা দেখতে পাই”

“আমি কি তবে সবকিছু ফিরিয়ে দিই, আলো, ছায়া, ছোঁয়াচ ঠিকরে চলে যায় সবকিছু?… আমার ভিতরে কি তবে কিছুই আসে না…”

আনন্দী মনে মনে জবাব দেয়, “আমি এসেছি তো… আসিনি আমি ইন্দিরা?”

দপ করে কাছেই কোথাও একটা আগুন জ্বলে ওঠে, ইন্দিরা মনে মনে বলে, “কেন এসেছ তুমি? তুমিও কি চলে যাবে না? তুমিও কি আরেকটা হেমন্তকাল নও?”

ইন্দিরার বুকে মুখ রাখে আনন্দী, ইন্দিরা আর কিছু ভাবতে পারে না। আর কিছু চাইতে পারেনা সে, কোনো জবাব, কোনো দুয়া, কোনো অধিকার, কিছুই চাওয়ার থাকে না ইন্দিরার। সে নিজেও এক নদী হয়ে যায়। আনন্দীর ঢেউ এসে তাকে ভাসিয়ে নিতে থাকে। সবশেষে তীরের বালিতে এসে ঠাঁই হয় তাদের। নিজেদের গায়ে অজস্র ঝিনুক নিয়ে শুয়ে থাকে তারা। আনন্দীর ঘুমের মত নরম বুকে মাথা রাখে ইন্দিরা। শোনে তার বুকের ভিতর থেকে কি ভীষণভাবে ধক্‌ ধক্‌ করে উঠছে প্রতিটা মুহূর্ত, হঠাৎ প্রবলভাবে বর্তমানে নিজেদের আটকে রাখতে চেষ্টা করে ইন্দিরা। দাঁতে দাঁত চেপে আনন্দীকে ধরে থাকে সে। যেভাবে জুয়াড়ি নিজের জান বাজি রাখে, যেভাবে ফায়ারিং স্কোয়াডে আদর্শে ভর করে এসে দাঁড়ান বিপ্লবী জননায়ক, যেভাবে বেপরোয়া হাওয়ায় টিকে থাকে একলা মোমবাতি, সেইভাবে নিজেকে বিলিয়ে দিয়ে আনন্দীকে আগলে থাকে ইন্দিরা। (চলবে)



চতুর্দশ পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন

লেখা সম্পর্কে মন্তব্য

টি মন্তব্য