home গদ্য দেলোয়ার হোসেন মঞ্জু এবং একরাত্রির ব্লগীয়-কলহ | নির্ঝর নৈঃশব্দ্য

দেলোয়ার হোসেন মঞ্জু এবং একরাত্রির ব্লগীয়-কলহ | নির্ঝর নৈঃশব্দ্য

কবি দেলোয়ার হোসেন মঞ্জু সামহয়্যারইন ব্লগে এসেছিলেন ২০০৮ সালের মাঝামাঝিতে, গেওর্গে আব্বাস নামে। তারপর স্বনামে আরেকটা ব্লগ খুলেছিলেন নিজের বইপত্রের কবিতা পোস্ট করার জন্যে। এবং তিনি আশঙ্কা করছিলেন দেলোয়ার হোসেন মঞ্জু নামে অন্য কেউ আইডি বানিয়ে যদি তার শত্রুরা আজেবাজে পোস্ট দেয়, তবে তিনি বেকায়দায় পড়ে যাবেন। বলাবাহুল্য, তার বন্ধুদের মধ্যেই অনেকে তার শত্রু হয়ে গিয়েছিলো সেইসময় ব্লগে নানা কারণে। আর আমরা এর আরো বেশ কিছুদিন আগে ব্লগে এসেছিলাম। মানে বাঙলাব্লগের শুরুর দিকেই। তাই নতুন কেউ এসে এঁকাবেঁকা মন্তব্য করলে আমরাও ছেড়ে কথা বলতাম না। তো মঞ্জুভাইও গেওর্গে আব্বাস নামে এসে এঁকাবেঁকা মন্তব্য করছিলেন। কিন্তু তিনি কয়েকদিনেই ধরা পড়ে গেলেন। তারপর তিনি আরো কয়েকটা নিকে এলেন। কিন্তু অন্যরা ঠিক ধরতে না পারলেও আমি ধরে ফেললাম। তাই তিনি ঝগড়ার মুডে থাকলেও আমি তাকে সমীহ করে কথা বলতাম। তার কথা বলার টোনে অথরিটি থাকতো। যেটা মেনে নেয়া আমার মতো অনেকের পক্ষে সম্ভব নয়। কিন্তু মঞ্জু ভাইয়ের অদ্ভুত ক্ষমতা ছিলো কাউকে সমস্ত ক্যাপচার করে ফেলার। কারণ তার পার্সোনালিটি, জানাশোনার পরিধি ছিলো ব্যাপক ও বিস্তারিত।

মঞ্জু ভাইয়ের অন্যান্য আইডিও আমি ধরে ফেলতে পারতাম, তাই তিনি বলতেন আমার ঘ্রাণশক্তি কুকুরের মতো। তিনি শরিফ রহমান, দাবিড় দয়াল, ডল, হিটার, প্রভ৭১, রশিদ খান ইত্যাদি নামে আইডি খুলে সেইসব আইডি থেকে সদলবলে এসে ঝাপিয়ে পড়তেন বলা যায়। রাত্রিবেলা হতো এইসব ব্লগীয়-কলহ, দাম্পত্যকলহ-টাইপ। তো সেইরকম একরাত্রিতে কবি লাবণ্য প্রভার ব্লগে একটা কবিতাপোস্ট’র মন্তব্যের ঘরে মঞ্জু ভাইয়ের সঙ্গে ঝগড়ার মতো হয়ে গেলো। সেই পোস্ট খুঁজে পেলাম সম্প্রতি।

লাবণ্য প্রভা ‘চিহ্নস্থানে নামে’ একটা কবিতা পোস্ট করেন ২৯ মার্চ, ২০০৯ রাত ১২ টা ১৫ মিনিটে। নিচে সামহয়্যারইন ব্লগ থেকে নিয়ে সেই পোস্ট কপি করে নিচে দিলাম। সম্পাদনা বলতে বানান ঠিক করলাম আর অহেতুক স্পেস, ডট, ইমোটিক্স, হাই-হ্যালো, ডল-হিটার আইডির অহেতুক কমেন্ট। আর অন্যদের কমেন্ট ফেলে দিয়ে কেবল মঞ্জু ভাই আর আমার কথাবার্তা রাখলাম। সেইদিন মঞ্জু ভাই কথা বলেছিলেন তার ‘শরিফ রহমান’ আইডি থেকে।

 

নদীতীরে বসিয়াছে উট আর ফড়িংয়ের সভা

শ্যামল সুন্দরে দেখি খানকায়ে লাবণ্য প্রভা

….

 

এ-রজনী বাকলবিলাসিনী

বাজুর বাঁধন খুলে কেবলই ভাসে কাজলি পরান

 

চোখের পদ্মে স্থিরতম

কালি ও কলঙ্ক আমার, পাকুড়ের ঘ্রাণ

 

আমারে বলিয়ো বন্ধু আসমান আর জমিনের ফারাক

ভুলের সায়রে ডুবে যাই, তুলে আনি মাটির তবক

এ কোন ভ্রমের নগরে তোমার চোখে চোখে চারুলিপি, নীলাদ্র নিবেশ

 

 

বেদীমূলে নৃত্যরত অগ্নি ও জলের কোরক

আনন্দসংগীত বাজে মৃত্যু সহচরে, মন্দিরে মন্দিরে

বায়ুর বিভ্রমে জেনে নিই আমার সাকিন.. .

 

প্রাণবন্ধু হে

এমন বিদায়ের দিনে প্রতিপন্থে কলঙ্ক বুনে দিয়ো, মাঝে মাঝে মাটির চারা

 

শব্দ ও কাফনের দেশে মৎস্যেরা মৌনবান আজ

মৃতজ্যোৎস্নায় সারি সারি জেগে ওঠে সরালের বন

ধুলির অরণ্যে সন্ধ্যা নামে

বেড়ালের ডানা দীর্ঘ দীর্ঘ…

 

আমি ও বলেছি তারে

কেউ আসবে না রতিপুস্পদিনে

কেউ আর বলবে না এমন কলঙ্করাতে বলে দিতে চাঁদের বয়স…

 

এই কবিতা পড়ে আমি প্রথমে যে মন্তব্য করেছিলাম, সেটা পোস্টের লেখক মুছে দিয়েছিলেন কিংবা কোনোভাবে গায়েব হয়ে গিয়েছিলো। কী মন্তব্য করেছিলাম ঠিক মনে করতে পারছি না। খুব সম্ভবত তিনি প্রথম বা শূন্যদশকের কবি হিসেবে কবিতা লিখলে কবিতায় শব্দের প্রয়োগের ক্ষেত্রে কেমন সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে সেই বিষয়ে বলেছিলাম।

তো আমার সেই মন্তব্য পড়ে মঞ্জু ভাই প্রতি-মন্তব্য করলেন, ‘নির্ঝর নৈঃশব্দ্য, আমি নিজে জানি আমি একটা মূর্খ, কিন্তু আপনের মতো মূর্খ আমি কম দেখছি ভাই। ‘বলিয়ো’ শব্দ কী করে দশকীয় শব্দ হলো, একটু শ্রীচরণ ধূলি দিয়া জানায়া যাইয়েন। ‘বলা’ ক্রিয়া পদ, নিবেদন অর্থে ‘বলিয়ো’; এই শব্দ কেমনে নব্বই দশকীয় এবং সর্বোপরি অর্থোডক্স হইলো আর নতুন কইরা কী করন যায় প্রেসক্রিপশন দিয়েন। জমিনকে না হয় ল্যান্ড বললাম, আসমান-জমিনকে স্কাই এবং ল্যান্ড বললাম, প্রাণবন্ধুকে মাই বেবি বা ডার্লিং, ক্রিয়াপদ গুলানরে কী করবো? আপনে মহাত্মা বলছেন … অর্থোডক্স, অর্থোডক্স। ভাল থাইকেন। কোনো কিছু বলার আগে মাথা খাটায়েন। …’

আমি বললাম, ‘মহাত্মা, শরিফ রহমান, আমি এই পোস্টের লেখক এবং কবি’র সাথে কথা বলতে চাইছিলাম প্রকৃত প্রস্তাবে। কিন্তু নেহায়েত আপনি যেহেতু ঢুকে পড়লেন, কী আর করা। আপনাকে অশেষ ধন্যবাদ আপনি অন্তত একটা ফাঁক উন্মোচন করেছেন আমার মন্তব্যের। “বলিও” পদের ক্ষেত্রে আপনার সাথে আমি একমত। এইটি আমি ইচ্ছে করেই উল্লেখ করেছি এইভাবে। আমি জানতাম, কবি কথা না বললেও আপনি আসবেন, কিন্তু শরিফ রহমান হিশেবে আশা করিনি। আপনি স্বমূর্তি ধারণপূর্বক আমাকে চড় কষে কথাটা বুঝিয়ে দিলেও আমার কোনো আপত্তি নেই। কেননা পৃথিবীর সমস্ত মানুষ যেমন আমার শিক্ষাগুরু তেমন আপনিও।

এইপোস্টে যে ডল+হিটার+দাবিড় দয়াল=১-এর পুতুলনাচ দুর্ঘটিত(!) হয়ে গেলো তার ইতিকথা আমি নিশ্চিত জানি। আশা রাখি আপনিও জানেন। যাই হোক এরা যে একই দেহ তিনটি প্রাণ মিলে পোস্টে কবিতার পরিবেশ নষ্ট করলো সেই প্রসঙ্গে আপনার গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য আশা করছি।

আমার মন্তব্য আমি আমার অভিমত ব্যক্ত করেছি। কবি খণ্ডন করতেই পারেন। এটা তার প্রথম অধিকার। আমার কাছে পুরো কবিতার ঢঙটাই নব্বই দশকীয় মনে হয়েছে। আপনার মতো কবিতার দশকবিচার আমিও সমর্থন করি না, তবে তা ব্যাপক অর্থে। কিন্তু দশক বিচার একটা কারণে জরুরী, কারণ কবিতা হয় কালকে সৃষ্টি করে, নয়তো কাল কবিতা সৃষ্টি করে। আপনার পূর্বাপর জ্ঞান এবং জানাশোনা সম্পর্কে আমি অবগত।

আমি শূন্যের কবিতাকে ন্যারেটিভ হিসেবে দেখি। কবি লাবণ্য প্রভার ক্ষমতা অসীম। কিন্তু যখন দেখি তিনি শব্দের মোহে ঘুরপাক খাচ্ছেন, তখন অন্য অনেকের মতো ‘অসাধারণ’, ‘অনবদ্য’ জাতীয় কমেন্ট করে তাকে আত্মরতিয়ান্ধ করে দিতে বাঁধে। তিনি আমাদের সময়ের কবি। যদি তিনি বলেন এইসব কবিতা তার বিশ বছর/পনেরো বছর আগে লেখা, তবে আমি ক্ষমাপ্রার্থনা করে নিষ্ক্রান্ত হবো। পোস্টে অবস্থিত কবিতা অবশ্যই ভালো। কিন্তু তার কবিতা হিসেবে ভালো নয়। তার স্বকীয়তা কোন জায়গায়?

আমি আসমানকে অবশ্যই স্কাই লিখতে বলিনি। আমি হলে আকাশই লিখতাম। আকাশ শব্দ আমার দৈনন্দিন ব্যবহার্য। সেহেতু বাক্য প্রয়োগ করলে বাক্যটি শব্দপ্রধান হয়ে উঠে না। এই যে আসমান-জমিন ফারাক নিয়ে আপনার অভিমত, তা প্রমাণ করে দিলো আপনি আমার চেয়ে একদাগ বেশি বোঝেন। তবে কেনো দাদা ভূমিকা করে বলতে গেলেন আপনি মূর্খ? আর আপনি যে আমাকে মূর্খ অভিধা দিলেন, তা আমি মাথা পেতে নিলাম। মঙ্গলম।’

আমার কথার পিঠে মঞ্জু ভাই বললেন, ‘নির্ঝর নৈঃশব্দ্য, বাংলাভাইয়ের বিচার শুরু কইরা নিজই দেখি সিদ্ধান্ত দিয়া দিছেন। আপনেতো ভয়ংকর। ‘ফাঁক উন্মোচন করেছেন আমার মন্তব্যের ’ ফাঁক নাই , পুরা উন্মুক্ত… জলাশয়ের মতো। ডল+ হিটার+ দাবিড় দয়াল= ১ কোবতে আলুচোনা না কইরা হাতদেখা শুরু করেন । চপটওয়ার নেন। ‘পোস্টে কবিতার পরিবেশ নষ্ট’ আপনে করছেন । যা অলোচনা একখান দিচেন , বাচ্চাদেরও আরামাবো। হাসিও পাইতে পারে। মহাত্মা, মহাত্মা, মহাত্মা, মহাত্মা, মহাত্মা, মহাত্মা, মহাত্মা,  প্রেসক্রিপশন দেন। বিদ্যা গ্রহণ কোরি।

‘কে কোন সময়ের কবি, কার কী ক্ষমতা আমাগ এ নিয়া ঘাড়ব্যথা নাই। পইড়্যা আরামায়ছে… এই যা । আপনে যে বাংলাভাইগিরি মন্তব্য দিলেন পইড়্যা রাগাইছে । যা বলছেন লাইনে লাইনে…’

এরপর আমি বললাম, ‘শরিফ রহমান, আমি সারেন্ডার। আপনার সাথে মন্তব্যে মেজাজ বুঝতে পারলাম। আমি সবিনয় দুঃখিত।’

সঙ্গে পোস্টের লেখকের উদ্দেশে বললাম, ‘কবি লাবণ্য প্রভা…, এই পোস্টে আপনি আমার পূর্ববর্তী দুইটি এবং এই কমেন্ট মুছে আপনার পোস্টকে “নাপাকি-আজাদ” করুন।  আমি আবার কমেন্ট করছি।’

তারপর আমি উক্ত পোস্টে নিচের কমেন্ট দিয়ে মানে মানে সটকে পড়লাম—

‘এমন বিদায়ের দিনে প্রতিপন্থে কলঙ্ক বুনে দিয়ো, মাঝে মাঝে মাটির চারা

এমন বিদায়ের দিনে প্রতিপন্থে কলঙ্ক বুনে দিয়ো, মাঝে মাঝে মাটির চারা’

 

মারহাবা, মারহাবা। খুব হাসিন হ্যায় ইয়ে শায়ের।’

 

তারপর ডল আর হিটার এসে একার্থে আমার শ্লীলতাহানি করে ‘চলিয়া গেলো’। সেই দিনের সেই ঝগড়া চলেছিলো বাঙলাদেশ সময় রাত্রি বারোটা থেকে পরদিন সকাল আটটা অবধি।

মঞ্জুভাইয়ের স্বভাব ছিলো কবিতা-লেখক, গদ্য-লেখকদের নানাভাবে বাজিয়ে দেখা। ফলত অনেকের সঙ্গে তার সম্পর্ক নষ্ট হয়েছে। কিন্তু আমার সঙ্গে হয় নাই। আই লাভ মঞ্জু ভাই।

লেখা সম্পর্কে মন্তব্য

টি মন্তব্য