home গল্প দাগ । মেহেদী উল্লাহ

দাগ । মেহেদী উল্লাহ

রমজান মাসের শেষ শুক্রবার। আছরের ওক্তের পরে। লোকাল বাসে চড়ে কাছে কোথাও যাচ্ছিলাম। বাসের পেছনের দরজা দিয়ে উঠে দাঁড়িয়েই থাকতে হলো, দরজার ধারেই, সিট খালি নাই।

বাইরে তাকিয়ে আছি। এবার চোখ ভেতরে আনতেই হলো। শেষ সারির একেবারে বাম পাশের সিটে এক যুবক কোরান শরীফ পড়ছে, মোবাইলে পিডিএফ থেকে। অনেকক্ষণ পর পর তাতে চোখ রাখছে, বোঝা যায় মুখস্ত পারেন। আমি তার মিষ্টি কণ্ঠের তেলোয়াত শুনছিলাম।

হঠাৎ একটা মসজিদের সামনে এসে বাস থামতে বাধ্য হলো, জ্যাম। বাইরে মুসল্লিদের বিভিন্ন সাইজের জুতা। দেখেই আমার বাল্যবন্ধু সুফিয়ানের কথা মনে পড়লো। ছোটবেলায় মসজিদের সামনের জুতাগুলো দেখিয়ে সে একদিন বলেছিল, ‘সাইজ অসমান হলেও এগুলো সমান মানুষদের জুতা।’ সুফিয়ানের এজাতীয় কথা বোঝার মত বয়স আমাদের ছিল না।

বাস ছাড়ল। একটু সামনে যেতেই দেখি দুটি সাইকেল মুখোমুখি। আরোহী একজন ব্যথা পেয়ে রাস্তায় শুয়ে পড়েছে। আমার আর সুফিয়ানেরও একবার এমন হইছিল। হা হা। ওর কপালের ডানপাশে ক্ষত হয়ে গেছিল। ক্ষতের মধ্যেই পরদিন স্যারের হাতে বেদম মার খেতে হয়েছিল ওকে। সুফিয়ান কোরানে হাফেজ, মাত্র সাত বছর বয়সে আর সেই কীনা ইসলাম শিক্ষা পরীক্ষায় পেয়েছে মাত্র চুয়ান্ন! ইসলাম শিক্ষার স্যার, এই খোটা দিচ্ছিলেন আর সুফিকে বেত দিয়ে পিটাচ্ছিলেন।

দুইদিন স্কুলে আসেনি সে। পরদিন এসেই আবার বাণী দিল,’ মানুষের কোনো স্বপ্নই পূরণ হয় না আসলে। যে স্বপ্নগুলো পূরণ হয়েছে ভেবে মানুষ খুশি হয় সেগুলো আসলে তার জীবন বিষয়ক তুচ্ছ ভাবনাই ছিল।’ স্কুলে আর আসেনি সে। নাইন ছেড়ে শুনেছি কোওমী মাদ্রাসায় ভর্তি হয়েছে।

যুবক কোরান তেলোয়াত করেই যাচ্ছে। আমি আবার মুগ্ধ হয়ে শুনছি। কিন্তু এবার আমাকে নামতে হবে। মুগ্ধতার জন্য ধন্যবাদ। তাই নামতে নামতেই কোনো কথা না বলে তাকে হাত ইশারায় বাই দিলাম। যুবক খেয়াল করল। সে পবিত্র কোরানের পাতা থেকে চোখ উঠিয়ে আমার দিকে তাকাল। আমার চোখে জল এসে গেল। সেও চোখের ইশারায় বাই বলল।তারপর হাতের পরশে টুপিটাকে ঠিক জায়গায় বসাল। আমাকে না চিনতে চিনতে!

বন্ধু আমার! আবু সুফিয়ান! কপালে দাগ। নামায পড়তে পড়তে, মাঝখানে। তারপাশেই ডানে আরেকটা ছোট দাগ, সাইকেলেরটা! নামতে গিয়ে জুতা ছিঁড়ে গেছে আমার। আবু সুফিয়ানের সমান হতে হলে আমাকে মসজিদে ঢুকতে হবে, তার জুতার পাশে আমারটা রেখে।

লেখা সম্পর্কে মন্তব্য

টি মন্তব্য