home চিত্রকলা জয়নুল : অন্য চোখে ।। রাজীব দত্ত

জয়নুল : অন্য চোখে ।। রাজীব দত্ত

১৯৪৩ সাল। কলকাতা শহরকে ঘিরে না খাওয়া মানুষের ভীড়। সেই ভীড় দেখে একজন সোমনাথ হোড়, একজন চিত্তপ্রসাদের মতোই প্রচণ্ড আলোড়িত হন জয়নুল। মফস্বল থেকে আসা এই শিল্পীর মধ্যে এই মানবসৃষ্ট দূর্ভিক্ষ খুব স্বাভাবিকভাবেই গভীর প্রভাব ফেলে। তিনি মোটা, দৃঢ় রেখায় সেই “প্রভাব’কে আঁকলেন। কালো কালিতে। সেইসব ছবি নিয়ে যখন অই সময়ের কমিউনিস্ট পার্টি প্রর্দশনীর ব্যবস্থা করল, তাদের মুখপত্রে ছাপল। পুরো ভারতের লোকজনই শিল্পীকে চিনলেন। মানলেন এই শিল্পীর বুভুক্ষু মাানুষজন অন্তত পত্রিকার নিছক অলঙ্করণ না, আরো অনেক কিছু। তারাও শিল্পীর মতোই মফস্বলের ছিলেন। বাধ্য হয়েই এই কেন্দ্রে ছুটে এসেছেন। টিকতে পারেননি। ছিটকে পড়েছেন। কিন্তু শিল্পী যেন এই মানুষগুলোকে দিয়েই কেন্দ্রে প্রবেশের দরজা পেয়ে গেলেন। যা অই সময়কার পরিবেশে একটু কঠিন ছিল বৈকি। কঠিন ছিল বলেই তৎকালীন বাঙালি মুসলমানরা পাকিস্তান চেয়েছে। চেয়েছে কেন্দ্র জুড়ে থাকতে। পেছনে ইংরেজদের রাজনীতিও পুরনো কথাই। সবাই সবার স্বার্থ দেখবে এটাই স্বাভাবিক। ফলে দেশ ভেঙেছে। বাঙালি মুসলমানের নেতারা ভাঙা দেশের একটির কেন্দ্রের দখল পেয়েছে। দখল পেয়েই যে যার অবস্থানকে পোক্ত করতে ব্যস্ত হয়ে গেছে। শিল্পী জয়নুল তখন সাথে পেয়েছেন কামরুল, সফিউদ্দিনদের। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের শিল্পীদের মধ্যে অন্যতম এই দুজনের একজনও এখানকার ছিলেন না। অই বাংলার। তারাও কেন্দ্রাকর্ষণে এইখানে এসেছিলেন। জয়নুল এই মুসলমান শিল্পীদের নিয়ে বখতিয়ার খিলজির মুসলমান বিজয় এঁকে পথ প্রশস্ত করলেন। পূর্ব পাকিস্তানের নেতাদের এই ‘আর্ট’ও অই বাংলার সাথে ‘কালচারাল ডিগনিটি’ প্রতিযোগিতার অংশ ছিলো। ১৯৪৮ সালে তাদের সর্বোচ্চ পোষকতায় জয়নুল প্রতিষ্ঠা করলেন আর্ট কলেজ। কেন্দ্রে স্থাপিত হলেন এবং ক্রমশ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লেন প্রান্ত থেকে। আমরা জয়নুলের কাছ থেকে দড়ি ছেঁড়া গরু, কাদায় আটকানো গরুর গাড়ি পেলাম, পেলাম মই দেয়া, নৌকা-নদীসহ সাঁওতাল দম্পতি, চাকমা নর-নারীদের। এসব বিষয় অবননীন্দ্র পরবর্তী শিল্পীদের অনেকেরই পছন্দের বিষয়। বিশেষ করে আদিবাসীরা। কিন্তু এক রামকিংকর বাদে তাদের সবটাই উপর থেকে দেখা। জয়নুলসহ সবাই তাদের খোঁপার রক্ত রাঙা ফুলই দেখেছেন শুধু। রহু চণ্ডালের হাড় কিংবা সিধু-কানুর মৃত্যু দেখেননি।। ফলে একপেশে হয়ে গেছে। একজন পর্যটকের দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখা ময়ুরাক্ষী, ময়ুরাক্ষীর পারের মানুষ। অন্য কিছু নয়। এভাবে একজন জয়নুল ক্রমশ প্রান্তছিন্ন একজন হয়ে ওঠেন। প্রান্তছিন্ন বলেই বায়ান্নের ভাষা আন্দোলন, যেখান থেকে এই জাতির নিজের দিকে তাকানোর শুরু। যার মূল্য পরিশোধ করতে হয়েছে রক্তে। যেখানে প্রথম ঢাকার কেন্দ্র আর প্রান্তের লোক একজায়গায় এসে মিশেছে। অভিন্ন স্বার্থে। ভাষা আন্দোলনের শহীদদের স্মরণে হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত সংকলনে যখন মূর্তজা বশীর, বিজন চৌধুরীরা ছবি আঁকছেন, আমাদের ম্যাডোনা ৪৩’র জয়নুলকে যদি ইতিহাস খোঁজে, খুব কি অযৌক্তিক হবে? এদিকে বায়ান্নের ধারাবাহিকতায় বাষট্টি, উনসত্তর পেরিয়ে যখন একাত্তর আসে, একজন কৃষক, মজুর অথবা পাড়ার মসজিদের ইমামের কাছে যে দায়ের আশা করেছে দেশ, একজন শিল্পীর কাছ থেকেও তার বেশি কিছু চায়নি। হ্যাঁ, আমাদের বিভিন্ন স্বাধিকার আন্দেলনকে ঘিরে দেয়ালে দেয়ালে ভরে ওঠা বিভিন্ন মুর‌্যালের কথা মনে আছে। আমরা সেইসব পোস্টারগুলোও ভুলিনি। মনে আছে কামরুল হাসান ‘এই জানোয়ারদের হত্যা করতে হবে’ পোস্টারটা এঁকে নিজে গিয়ে শহীদ মিনারে টাঙিয়ে দিয়েছিলেন। অনেক শিল্পীর যুদ্ধে যাওয়া এবং শহিদ হওয়ার ঘটনাও আমাদের জানা। কিন্তু সেই জয়নুল কই? জয়নুলের কাদায় আটকানো গরুর গাড়ি, তাকে সর্বস্ব দিয়ে তোলার চেষ্টা, কিংবা গরুর প্রচন্ড শক্তিতে বাঁধন ছেঁড়ার চেষ্টা বাঙালির সমস্ত আন্দোলনকেই প্রতীকায়িত করে বটে, কিন্তু সেই তিরিশ লক্ষ শহিদের রক্ত, নারীদের সম্ভ্রম বিসর্জনের ক্ষতে আক্রান্ত জয়নুলকে আমরা পাই কি?
একজন জয়নুলের এই চরিত্র প্রচলিত মধ্যবিত্ত-চরিত্রের বেশি কিছু নয়। এই স্বাভাবিক। এইভাবেই মফস্বল থেকে আসা চরিত্ররা নগরকে কেন্দ্র করে কেন্দ্রিভূত হয় এবং পূর্ব নির্ধারিত এক লড়াইয়ে নেমে পড়ে। টিকে থাকার লড়াই। যারা টিকে যায় তারা সবলে আঁকড়ে ধরে কেন্দ্রকে। ফলে যে প্রান্ত থেকে তারা আসে তাকে ছাড়তেই হয়। যা থাকে তা নিছক স্মৃতি। জয়নুলের কাছে এই স্মৃতি বুড়িগঙ্গার, কখনো বুড়িগঙ্গার পাড়ের মানুষের। যাদেরকে জয়নুল কখনোই ছেড়ে আসতে পারেননি। অন্তত মানসিকভাবে। কিন্তু এই মানুষের সাথে ক্যানভাসের সমঝোতা করতে গিয়ে বারবার তিনি দ্বিধায় ভুগেছেন। না পেরেছেন ইউরোপিয় আঙ্গিককে নিজের মতো করে আত্তিকরণ করতে,( যে আঙ্গিকভাষায় সফিউদ্দিন আহমেদরা নিজেদের প্রকাশ করছেন, কিবরিয়ার মতো তা সম্পূর্ণ বিমূর্ত না), আবার যে আঙ্গিকে দূর্ভিক্ষকে এঁকেছেন, অথবা নবান্নের স্ক্রল, তাতেও তিনি ঠিক স্বস্তি পাচ্ছিলেন না। তিনি চেয়েছিলেন টেপা পুতুলের আঙ্গিকের সাথে নিজের প্রকাশভঙ্গিকে মিলিয়ে আলাদা স্বর নির্মাণ করতে। আমরা জানি- নিম্নবর্গীয় সংস্কৃতির প্রতি তার আগ্রহ ছিল। তিনি তাদের অনেক ধরণের পুতুল, কাঁথা ইত্যাদি সংগ্রহ করেছেন। সংগ্রহশালা করেছেন। আধুনিক মানুষ যা করে, সেই মতোই । তার ‘লোকজ সংস্কৃতি (অপর সংস্কৃতি)’ প্রীতি বাহ্বাও পেয়েছে, কিন্তু যা হয়েছে তা রীতিমতো উপরিতলসর্বস্বই থেকে গেছে। শুধুই উপরিতলসবর্স্ব বলেই তিনি তার নিজস্ব স্বরকে বয়ে নিয়ে যেতে পারেননি। খেই হারিয়েছেন বারবার। উপনিবেশিকতা চায় তার উপনিবেশের মধ্যে হীনমন্যতা বীজ রেখে যেতে। যে হীনমন্যতা দ্বারা তার উপনিবেশ আক্রান্ত হয়। প্রথমত নিজেকে খুঁজে নিতে, পরবর্তীতে দাঁড় করাতে গিয়ে সে দিশা হারায়। পথ খুঁজে পায় না সহজে। আমাদের এই ভূখন্ডও এর বাইরে নয়। আমরা অজন্তা আবিষ্কার করেছি ইংরেজদের দিয়ে। আমরা ‘বেঙ্গল স্কুল’ বানিয়েছি। ‘ওরিয়েন্টাল’ আর্ট বানিয়েছি। কখনো লোকজ (অপর) শিল্পের নির্ভেজাল কপি করে আর্ট, আর্ট বলে চেঁচিয়ে পাড়া মাথায় তুলেছি। কখনো ঠিক তার উল্টোটা। ইউরোপের কুকুরকে ঠাকুর ভেবে মন্দিরে ঢুকিয়েছি। প্রথম যে রবীন্দ্রনাথ এসবের উপরে উঠতে পেরেছিলেন, তাকে নিয়েও দ্বিধার অন্ত ছিল না। কবি রবিকে আমাদের শিল্পী হিসেবে মানতে তাকে বিদেশ ঘুরে আসতে হয়েছে। এইভাবে হীনমন্যতার শেকড় ক্রমশ গভীরেই ঢুকেছে। দেশভাগের পরে বাঙ্গালি মুসলমান শিল্পীদের মধ্যে এ সমস্যা আরো দ্বিগুণ হয়ে দাঁড়ায়। একদিকে মুসলমান নেতাদের হঠকারী রাজনীতি, আরেকদিকে ধর্মীয় পশ্চাদপদতা। একজন কবি-সাহিত্যিকের চেয়ে তাদের পথটা আরো আঁধারে ছিলো। এইখানে একজন শামসুর রাহমানকে শুধু একজন জীবনানন্দের ছায়ার বাইরে এসে দাঁড়ানোটা নিয়েই ভাবতে হয়েছে। পথ তৈরিই ছিলো। কিন্তু একজন জয়নুলকে নিজের পথ নিজেকেই যেমন তৈরি করতে হয়েছে; সাথে সাথে হাঁটার শক্তিটুকুও খুঁজতে হয়েছে এইখানে-ওইখানে। ফলে যতটুকু এগোনোর কথা ততটুকুতে আমরা তাকে পাইনি।
এইখানে জয়নুলের সাথে তার সহযাত্রী সফিউদ্দিন- কামরুল- সুলতানকেও আমরা তুলনায় টানতে পারি। জয়নুলের মতো সফিউদ্দিন অতোটা সামাজিক ছিলেন না। মিশতেনও কম। তাই জয়নুলের মতো অতো আলো কোনোসময়ই তার গায়ে পড়েনি। কিন্তু নিজের পথে তিনি অবিচলই ছিলেন। দ্বিধায় দুলেননি। এগিয়ে গেছেন সামনে। নিজস্ব গণ্ডির ভেতর থাকার পরও বায়ান্ন, একাত্তরকে নিয়ে ছবি এঁকেছেন। এড়িয়ে যেতে পারেননি। কামরুলেরও নিজেকে খুঁজে নিতে দেরি হয়নি। নিজেকে খুঁজে নিয়েই সবকিছুর সাথে সবরকমভাবে নিজেকে সম্পৃক্ত রেখে গেছেন। গুরুসদয় দত্তের ব্রতচারী আন্দোলনেও যেমন ছিলেন, মুকুলের মাহফিলেও ব্যস্ত ছিলেন। কিউবিক ধাঁচের সাথে কালী ঘাটের রেখাকে মিশিয়ে দিয়ে উন্মুক্ত বুকের নারীদের যেমন এঁকেছেন, মঞ্চে বসে বসে ‘দেশ আজ বিশ্ব-বেহায়ার খপ্পরে’ও এঁকেছেন। কী বিষয়, কী আঙ্গিক কোনোটাতেই কোনো দৌদুল্য তার উপর ভর করেনি। কিন্তু তারপরও তার নায়র, পল্লীবঁধু ইত্যাদি জয়নুলের মতোই স্রেফ রোমান্টিকতায় আক্রান্ত। উপরিতল থেকে নেমে আসতে পারেননি। জয়নুলের পুরো বিপরীত স্বভাবের ছিলেন সুলতান। জয়নুল যেখানে গ্রাম থেকে নগরে থিতু হয়েছেন, সুলতান সেখানে পৃথিবীর বিভিন্ন শহরকে রেখে ফিরে এসেছেন প্রত্যন্ত নড়াইলে। একজনের বন্ধু জসীমউদ্দিন-আবাসউদ্দীনের মতো কেন্দ্রের চরিত্র (আমরা জসীমউদ্দিনের নামের আগে বসিয়েছি পল্লীকবি, আরেকজনকে ডেকেছি পল্লীগায়ক; দুজনেই শহরে থাকতেন), আরেকজনের সঙ্গী গ্রামের অখ্যাত, অপরিচিত কয়েকজন প্রান্তজন এবং কিছু জীবজন্তু। কিন্তু দুজনেরই বিশেষ মিল, দুজনই একই শ্রেণির মানুষকে এঁকেছেন। কিন্তু ভিন্ন আঙ্গিকে। যেখানে জয়নুলের আঁকা মানুষ বাস্তব ঘেঁষা, পরে পুতুলের ঢঙে সরল, গলা লম্বা ইত্যাদি; অন্যদিকে সুলতানের মানুষ বাস্তব ছাড়িয়ে আরো দুরে, পেশীবহুল। তারা একা না অতো, সংঘবদ্ধ। কিন্তু অনেক নির্লিপ্ত। প্রথম বৃক্ষ রোপনের পেশীবহুল, দৃঢ় লোকটিকে আমরা মনে করতে পারি। তার প্রবল শক্তিমত্তার কতটুকু তার চেহারায়? অদ্ভূত এক বিষণ্নতার ছায়া কি তার মুখ জুড়ে না? যা দর্শককেও সংক্রমিত করে।(তবে এই নির্লিপ্ততা কিংবা বিষণ্নতা উপনিবেশজাত হীনমন্যতাবোধাক্রান্ত না, হয়তো সুলতানের নিঃসঙ্গতারই ফসল)। জয়নুলে যেখানে ব্যক্তি প্রধান, সুলতানে সেখানে সংঘ। জয়নুলে যেখানে বায়ান্নো, একাত্তর তেমন প্রভাবই নিয়ে আসে না, সেখানে মুক্তিযুদ্ধের কারণেই প্রবল জঙ্গমতা নিয়ে সুলতান ক্যানভাসে ফিরে আসেন। তার স্বপ্নের কৃষকদের আঁকেন। সুলতানের এই স্বপ্নের রঙের কতটুকু জয়নুুলে?

রাজীব দত্ত
কবি, চিত্রশিল্পী, গদ্যকার

লেখা সম্পর্কে মন্তব্য

টি মন্তব্য