home কবিতা ‘জেল রোডের প্রেমগীতি’ থেকে কবিতা | আহমেদ মুনির

‘জেল রোডের প্রেমগীতি’ থেকে কবিতা | আহমেদ মুনির

বসন্তের ভাঙা গান
 
কিছু গান পড়ে আছে মাঠে
পুরোনো তোরঙ্গে
কিছু গান দেশান্তরী আজ
কিছু গান প্রতিবেশীর উঠোনে
ভাঙা করোগেট টিনে
কিছু গান পড়ে আছে
পুরোনো দিনের ভাঁজে।
 
তবু ধানখেতে যাই
ধানখেত থেকে মাঠে
মাঠে মাঠে পড়ে আছে
গীতবিতানের গাছ
কিছু গান জীবাশ্ম জ্বালানি হয়ে জ্বলে।
এই সব ভেবে সমস্ত বেহালা
বাদকের কাছে ফিরে আসে।
সুর তো বরফ
তবু গান গায় কারা?
এক চম্পাতলী থেকে
আরেক চম্পাতলীতে
ঘুরে গেছে সুর
এক গিটারের কাছ থেকে
আরেক গিটার তবু কত দূর!
 
 
 
 
যুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে ভেবে
 
যুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে ভেবে
কতকাল আগে
গান গেয়ে উঠেছিল পাখি
মাটি খুঁড়ে দেখি তার তীরবিদ্ধ
শরীরে এখনো রয়ে গেছে
সুরের বেদনা।
এই বেদনার পথ ধরে
হেঁটে গেছে দেশান্তরী মানুষের দল
এক যুদ্ধ থেকে আরও এক যুদ্ধে
যুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে ভেবে।
 
স্মৃতির আপেল তার বীজ
ছড়িয়েছে ঝিরির কিনারে
ঝিরির কিনারে এসে তবু
জল স্পর্শ করার আগেই
যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে।
 
এই ইতিহাস লেখা হয়ে গেছে কবে
আবারও কি লেখা হবে,
যুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে ভেবে লেখা হবে!
বালির গভীরে কবে
শিকড় ছড়াল গাছ
যুদ্ধ থেমে গেছে ভেবে।
আর জলের আড়ালে মাছ,
মাছের ভেতরে মাছ হয়ে
আমাদের সব উচ্চারণ ঘিরে
তখন শব্দের জন্ম হয়েছিল
যুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে ভেবে।
 
 
দুই.
 
শূন্যে ছুড়ে দেওয়া এই কথাগুলো
পুলসিরাতের পুল পার হয়ে
কী করে পৌঁছাবে তোর কাছে!
যুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে ভেবে
যে গান বেজেছে বেহালায়
তার সুর পড়ে যাচ্ছে নিচে
পুলসিরাতের নিচে
দাউ দাউ আগুনের মধ্যে ।
তবু ঠান্ডা শেওলার মতো
লেগে আছি নিজেরই শরীরে
ঘুমন্ত সন্তান পাশে,
তার চুলে হাত রেখে
তোর সঙ্গে কথা বলি
যুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে ভেবে।
 
 
তিন.
 
ঢের কথা হলো আমাদের শীতে,
ঢের কথা হলো বসন্ত বাতাসে
যখন বরফ গলছিল আর
চেস্টনাট গাছে বাসা বাঁধা
কোকিল গলায় রক্ত তুলে ডাকছিল।
তখন তো যুদ্ধ থেমে গেছে ভেবে
আমাদের পুকুর ঘাটের অন্ধকার
মুঠো করে দেখিয়েছিলাম তোকে।
আর সেই অন্ধকার থেকে
একটা জিন তার লম্বা হাত বাড়িয়ে দিয়েছে
আমাদের ঘুমের ভেতর।
বোবায় ধরেছে আমাদের
ডাকছি কেবলই পরস্পরকে
যুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে ভেবে।
 
 
চার.
 
বধির হাওয়ার কাছে তবু তুই বল
কী কী রান্না করেছিস আজ
তোরও কি কলঘরে পড়ে টুপ টাপ জল?
যুদ্ধ শেষ হয়ে গেলে
যুদ্ধের বরফ তবু থেকে যায়
আরও একটা যুদ্ধ হবে বলে!
সেই বরফ সরিয়ে তোর দিকে দেখি,
সুপারি বাগানে যাই
অথচ সুপারি বাগান উজাড় হয়ে গেছে কবে
তবু একদিন ছিল, এই কথা ভেবে যাই,
সুপারির খোসা ছাড়িয়ে ছাড়িয়ে দেখি
ভেতরে কঠিন ফল, নরমের ভেতরে কঠিন
তারও ভেতরে নরম বেদনার সাদা শাঁস।
 
 
পাঁচ.
 
এখন তো অ্যাসফল্টের সুপারি গাছে
ছেয়ে গেছে সমস্ত শরীর
দাঁড়াতে পারি না তবু যেতে হচ্ছে
ঘূর্ণি বাতাসের পিছু পিছু
এক যুদ্ধ থেকে আরেক যুদ্ধের দিকে।
এক পরিহাস শেষে শুরু হয়
আরও এক পরিহাস
খুঁজতে খুঁজতে তবু
এত দূর এসেছ টেলেমেকাস,
যুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে ভেবে!
 
 
 
 
কোনো এক সকাল
 

ধারালো লোহার ফলা গেঁথে আছে মৃত্তিকায়, মাংসে। হাড়ের ভেতরে সেই ব্যথা নিয়ে পড়ে আছে ভোরের পৃথিবী। জানালার বাইরের মেহগনি গাছটাও কী বাতাসে ভাসিয়েছে চালক বিহীন ড্রোন বীজ! এত যুদ্ধ কখন লেগেছে চারদিকে, টের পাওয়ার আগেই ভোর হলো। অথচ কী ভীষণ প্রেমের অভিজ্ঞতা হয়েছিল গতরাতে ঘুমের ভেতর। ভোরের আলোয় সে সব এখন বিছানার গায়ে ময়লা দাগের মতো সেঁটে গেছে। বিষাক্ত তীরের বেগে ছুটে আসে খবরের ধ্বনি। ভোরের বেতার কোথাও বাজছে কাছে। এত যুদ্ধ আজ পৃথিবীতে, সকালের লিঙ্গটাও কী তাই তর্জনীর মতো খাঁড়া হয়ে আছে!



জেলরোডের প্রেমগীতি
আহমেদ মুনির
প্রকাশক: কবিতাভবন
প্রচ্ছদ: শিবু কুমার শীল
দাম: ১৩৪ টাকা

লেখা সম্পর্কে মন্তব্য

টি মন্তব্য