home ভিনদেশি সাহিত্য জেন গল্প | অনুবাদঃ উপল বড়ুয়া

জেন গল্প | অনুবাদঃ উপল বড়ুয়া

বাংলা ভাষার অনেক লেখকের হাত ধরে জেন গল্পের অনুবাদ হয়েছে; পূর্বে। সাহিত্যের খবরাখবর যারা অল্প-স্বল্প রাখেন তাদের কাছে জেন গল্প প্রায় পরিচিত। সুতরাং নতুন করে যারা জানতে চান বা আরো অধিক জানার আগ্রহ থাকলে নিশ্চয় গুগলে গিয়ে ‘zen stories’ লিখলে দুনিয়াটা উন্মুক্ত হবে। আমিও গুগলে গল্পগুলো পড়েছি। আর বিভিন্ন সময়ে কয়েকটা অনুবাদের প্রচেষ্টা চালিয়েছি। জানা মতে, এই পর্য্ন্ত নয়টা জেন গল্প অনুবাদ করেছিলাম কিন্তু কোন কারণে দুইটার খোঁজ পাচ্ছি না। হয়তো ভবিষ্যতে আপনাদের জন্য বা আমার জেন প্রেমের তেষ্টা থেকে আরো কিছু অনুবাদ করবো এবং বিস্তারিত লেখার চেষ্টা করবো। আপাতত এইটুকু…

— উপল বড়ুয়া


বোধোদয়

এক শিক্ষার্থী একদা তার শিক্ষকরে জিজ্ঞেস করল, ‘গুরু, বোধোদয় মানে কি?’
গুরু উত্তর দিল, ‘যখন ক্ষুধার্ত, তখন খাওয়া। যখন ক্লান্ত, তখন ঘুমানো।’

 

কঠিন কাজ

মার্শাল আর্ট শেখার জন্য এক শিক্ষার্থী গেল গুরুর কাছে এবং আন্তরিকভাবে জানাইল, ‘প্রভু আমি আপনার মার্শাল আর্টের খুবই অনুরক্ত একজন। আমার কতদিন লাগতে পারে মার্শাল আর্ট শিখতে?’

মার্শাল আর্ট গুরু ভাবলেশহীন মুখে উত্তর দিল, ‘দশ বছর।’

খুবই অধৈর্য হয়ে শিক্ষার্থী আবার জানাইল, ‘কিন্তু প্রভু, আমি খুব দ্রুত মার্শাল আর্ট শিখে আপনার মতো একজন গুরু হইতে চাই। শেখার জন্য আমি খুব কঠিনভাবে লেগে থাকব। এবং দিনে দশ বা তারও অধিক ঘণ্টা ধরে আমি প্রত্যেকদিন অনুশীলন করবো। তখন শিখতে কতদিন সময় লাগবে প্রভু?’

গুরু কিঞ্চিৎ ভাবলেন। তারপর বললেন, ‘বিশ বছর।’

 

যদি ভালোবাসো, মুক্ত চিত্তেই বাসো

কুড়িজন ভান্তে বা ভিক্ষু এবং একজন ভিক্ষুণী, ভিক্ষুণীর নাম ইশুন, নির্দিষ্ট একজন জেন প্রভুর কাছে ধ্যান অনুশীলন করছিল।

মুণ্ডিত মস্তক এবং শাদা চীবর পরিহিত অবস্থায়ও ইশুন ছিল অত্যন্ত সুন্দরী। ফলে যা হয়, ভিক্ষুদের কয়েকজন গোপনে পড়ে গেল তার প্রেমে। একটা ব্যক্তিগত সাক্ষাতের অনুরোধ জানিয়ে ভিক্ষুদের একজন তাকে একটা চিঠি লিখল।

ইশুন চিঠির কোন উত্তর দিল না। তো পরের দিন জেন প্রভু একুশজনের দলটার প্রতি একটা বক্তৃতা দিলেন। যখন বক্তৃতা শেষ হলো, ইশুনের সুপ্ত মন জেগে উঠল। যে ভিক্ষু তাকে উদ্দেশ্য করে চিঠি লিখেছিল, ইশুন তাকে সম্ভাষণ করে বলল, ‘যদি তুমি আমাকে সত্যিই খুব ভালবেসে থাকো, তবে আমার কাছে আসো এবং এখনই আলিঙ্গন করো।’

 

কল্পলোকে

আমাদের ইশকুল মাস্টারের অপরাহ্ণে সবসময় ভাতঘুম দেয়া অভ্যাস। গুরু সোয়েন শাকুর শিষ্য সংশ্লিষ্টদের মতন। আমরা বাচ্চারা তাঁকে জিজ্ঞেস করি কেন তিনি ভাতঘুম দেন এবং তিনি আমাদের বোঝান যে, ‘প্রাচীন মুনি-ঋষিদের সাক্ষাতের জন্য আদতে আমি কল্পলোকে বিচরণ করি, যেমনটা করতেন আমাদের জ্ঞানী কনফুসিয়াস।’ যখন ঘুমাতেন তখন তিনি ঘুমের স্তরে গিয়ে প্রাচীন জ্ঞানী-মুনিদের সাথে সাক্ষাৎ করতেন এবং পরে তাঁর শিষ্যদের সেসব কথা বলতেন।

এটা ছিল চূড়ান্তপর্যায়ের একটা গরম দিন তাই আমরা কয়েকজন তন্দ্রাচ্ছন্ন হলাম। আমাদের এই হাল দেখে মাস্টার মশাই তিরস্কার শুরু করলেন। আমরা জানালাম, ‘কনফুসিয়াস যে রকম করতেন তদ্রুপ আমরাও কল্পলোকে প্রাচীন মুনিদের সাথে সাক্ষাৎ করতে গিয়েছিলাম।’

মাস্টার মশাই জিজ্ঞেস করলেন, ‘তবে ঋষিদের কাছ থেকে কি বার্তা এসেছে?’ আমাদের একজন উত্তর দিল, ‘প্রাচীন ঋষিদের সাথে সাক্ষাৎ করার জন্য আমরা কল্পলোকে গিয়েছিলাম এবং তাঁদের জিজ্ঞেস করলাম—আমাদের ইশকুল মাস্টার প্রতিদিন আপনাদের সাথে সাক্ষাৎ করতে আসে কিনা, কিন্তু ঋষিগণ জানালেন তাঁরা ঐরকম কোন শিষ্যকে কখনো দেখেনি।’

 

বিচার

ধরে নেন, বহু বৎসর পূর্বে একটা বয়স্ক কৃষক আছিল যে কিনা মাঠে মাঠে তার শষ্য ফলাইতো। তো একদিন তার খেদমতের ঘোড়াটা গেলো পলাইয়া। এমন সংবাদ শুনে তার নিকট পড়শীরা আইলো দেখা করতে। ‘খুব খারাপ ভাগ্যরে ভাই’, পড়শীদের করুণা বর্ষণ শুরু হইলো।

কৃষক শুষ্ক বদনে সায় দিলো, ‘সম্ভবত।’

পরের সকালে তার পলাইয়া যাওয়া ঘোড়াটা ফিরে আইলো, সাথে নিয়ে আইলো আরও তিনটা বুনো তাগড়া ঘোড়া। তার পড়শীরা কইলো, ‘কতো চমৎকার।’

কৃষক শুষ্ক বদনে সায় দিলো, ‘সম্ভবত।’

পরের দিন, অ-পোষ মানা ঘোড়াগুলার উপর চড়তে যাইয়া নীচে পড়ে তার পোলার পা ভাইঙ্গা গেলো। পড়শীরা আবার সমবেত হইয়া কৃষকের কাছে আইসা তার ভাগ্যরে দোষ চাপাইয়া তাহাদিগের করুণা দেখাইতে লাগলো।

কৃষক শুষ্ক বদনে উত্তর দিল, ‘সম্ভবত।’

তার পরের দিন, বাধ্যতামূলকভাবে সেনাবাহিনীতে ভর্তি করানোর জন্য গ্রামে সেনাবাহিনীর অফিসাররা তরুণ পোলাপাইনদের বাছাই করতে আসলো। কৃষকের পোলাটার ভাঙা পা দেইখা অফিসাররা তারে আর ধরে নিয়া গেলো না। পড়শীরা দেইখা কৃষকরে অভিনন্দন জানাইতে আসলো আর বলতে লাগলো ভালো জিনিসগুলা কিভাবে প্রতিভাত হয় তা নিয়ে।

কৃষক শুষ্ক বদনে বলল, ‘সম্ভবত।’

 

কর্দমাক্ত রাস্তা

তানজান এবং ইকিদো একদা কর্দমাক্ত রাস্তা ধইরা হাঁটতেছিলেন। তখনো প্রচণ্ড বৃষ্টি ঝরতেছে। একটা মোড়ে এসে, উনারা দেখা পাইলেন রেশমী কিমানো ও কোমরে শার্সি বাঁধা এক মনোরম রমণীর। রমণীটা পিচ্ছিল রাস্তা পার হইতে পারতেছিল না।

‘এদিকে আসেন’, তানজান রমণীটাকে বললেন। রমণীটিকে দুই বাহুতে তুলে তিনি কর্দমাক্ত রাস্তা পার কইরা দিলেন।

সেই রাতে আবাসিক মন্দিরে না পৌঁছা পর্যন্ত ইকিদো মুখ বন্ধ করে রইলেন। কিন্তু নিজেরে বেশিক্ষণ কথা না বলে থেকে বিরত রাখতে পারলেন না। তিনি তানজানকে উদ্দেশ্য করে বললেন, ‘আমরা ভিক্ষুরা রমণীদের সংস্পর্শে যাই না। বিশেষ করে তরুণী এবং সুন্দরীদের কাছে। এইটা আমাদের জন্য বিপদজনক। আপনি কেন ঐ কাজ করছিলেন?’

‘আমি রমণীটাকে ঐখানে নামিয়ে রেখে আসছি। আপনি কি এখনো তারে বহন কইরা চলেছেন?’ তানজান বললেন।

 

চাঁদ চুরি করা যায় না

পর্বতের তলে ছোট্ট এক কুঁড়ে ঘরে রয়োকান নামে এক জেন গুরু সাধারণ জীবন যাপন করতেন। এক সন্ধ্যায় এক চোর এলো তাঁর কুঁড়ে ঘরে এবং বুঝলো চুরি করার মতো কিছুই নেই।

গুরু রয়োকান বাইরে থেকে ফিরে দেখেন ঘরে চোর। সঙ্গে সঙ্গে তিনি ছিঁচকে চোরটাকে পাকড়াও করে বললেন, ‘আপনি হয়তো অনেক দূরের পথ পাড়ি দিয়ে এখানে এসেছেন। এবং আপনার খালি হাতে যাওয়া উচিৎ নয়। অনুগ্রহ করে আমার পরিহিত পোশাক আপনি উপহার স্বরূপ নিয়ে নিন।’

এমন ঘটনায় চোর তো কিংকর্তব্যবিমূঢ়। সে পোশাকটা নিলো এবং তড়িমরি করে পালাল।

গুরু রয়োকান নগ্ন বসে রইলেন। আর চাঁদের দিকে মুখ করে গভীরভাবে ভাবতে লাগলেন, ‘অসহায় লোকটা, আহা, তাকে যদি এই সুন্দর চাঁদটাও দিয়ে দিতে পারতাম।’

লেখা সম্পর্কে মন্তব্য

টি মন্তব্য