home সমালোচনা সাহিত্য চন্দ্রগ্রস্ত আত্মার ছায়ায়: প্রিয় একটি কবিতার ব্যক্তিগত পাঠ ।। সুহৃদ শহীদুল্লাহ

চন্দ্রগ্রস্ত আত্মার ছায়ায়: প্রিয় একটি কবিতার ব্যক্তিগত পাঠ ।। সুহৃদ শহীদুল্লাহ

ও চাঁদ

 

যে চাঁদ মাস্তুলে বাড়ি খেয়ে ভেঙ্গে গ্যালো

যে চাঁদ সাগরে টুকরো টুকরো হ’য়ে

                                        ঝ’রে পড়লো

যে চাঁদ সমুদ্রের নিচে শুয়ে আছে

                               খন্ড বিখন্ড হয়ে

সে চাঁদ তুমি নও

তুমি তার প্রেতাত্মা


বাংলা ভাষায় দানবিক এক প্রতিভার জন্ম হয়েছিল বাংলাদেশের জন্মবছরেই। মাত্র ২৪ বছর ৫ মাস ১৮ দিন বাঁচার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তিনি। ১৯৭১ এর এক সোমবারে পৃথিবীতে এসে আরেক সোমবারে পৃথিবীকে বিদায় জানানোর সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি; ১৯৯৫-য়ে। এই সময়ের মধ্যে ছবি আঁকলেন, গদ্য লিখলেন, আসক্ত হলেন প্রেমে ও নানা নেশায় আর কবিতা লিখলেন। আর মৃত্যু রচনা করলেন নিজের। ‘কবিতার শহীদ’ বলে একটি কথা চালু আছে কবিতা-বাজারে। না, আমি অন্তত তাঁকে কবিতার শহীদ বলব না। বরং কবিতাকেই তিনি আঘাত করতে চেয়েছিলেন বারবার। কবিতা বরং তাঁর হাতে শহীদ হোক এরকমটা চেয়েছিলেন বোধ’য়। কবিতার ভাষায় যে পরিকল্পিত ভায়োলেন্স ছড়াতে চেয়েছিলেন তিনি, তার আর কী-ইবা উদ্দেশ্য থাকতে পারে? একদিকে ভায়োলেন্স অন্যদিকে পরিণতিহীন এক ভয়াল মর্বিডিটি এই দুই প্রাণের শত্রুকে নিয়ে কবিতা করতে চেয়েছিলেন তিনি। চূড়ান্ত আঘাত করেই তাকে বাঁচিয়ে তুলতে চেয়েছিলেন নতুন করে। তেমনই এক বিরল প্রতিভা কবি শামীম কবীর।

কিন্তু আমার আজকের প্রিয় কবিতা ‘ও চাঁদ’ আপাতভাবে শামীমের আর সব কবিতার মতো নয়। কবিতাটি শামীম কবীর লিখিত একটি অ-শামীম-কবীরীয় কবিতা। ছোট-বড়ো মিলে ৭ লাইনের ছোট কবিতা। ক্যাটলগিং দিয়ে শুরু হয়ে হঠাৎই শেষ হয়ে গেল ছোট এক নাটকীয়তা দিয়ে। কবিতার আগে কবিতার আইডিয়াটিই যেন প্রথম মাথায় এসেছিল তাঁর।

 

কবিতাটি ঘটতে থাকা একটা দৃশ্য-ক্রিয়ার ভেতর নিয়ে আসে পাঠকদের। একটি চাঁদ মাস্তুলে বাড়ি খেয়ে ভেঙে সাগরে টুকরো টুকরো হয়ে ঝরে পড়ে শুয়ে আছে খন্ড-বিখন্ড হয়ে। এই হচ্ছে দৃশ্য। আর শেষে বলা হচ্ছে যে, সে চাঁদ ‘তুমি’ নও, ‘তুমি’ তার প্রেতাত্মা। উপসংহারসহ সম্পূর্ণ ঘটনা এই। কবিতাতে একইসাথে দর্শক এবং কথকের ভূমিকা নিয়েছেন কবি। যেন যে জাহাজের মাস্তুলের বাড়ি ভেঙ্গে দিল চাঁদ, সেই জাহাজের ডেকে শুয়ে শুয়েই পুরো দৃশ্যটি দেখছিলেন কবি। ভেঙ্গে পড়া থেকে চাঁদের শুয়ে পড়া পর্যন্ত। কোথায় যাচ্ছিল কবির জাহাজ, নির্দিষ্ট কোনো গন্তব্য ছিল কিনা তার— ততটা স্পষ্ট নয়। যেমন স্পষ্ট নয়, যাকে চাঁদের প্রেতাত্মা বলছেন কবি, তিনি কে? বর্ণনা শুনে মনে হতে পারে এই পুরো দৃশ্য যেন কবি ও তিনি একসাথেই বসে দেখেছেন। তাই তাকেই সাক্ষী মেনে বলতে পারছেন কবি, যে, এই চাঁদ তুমি নও; তুমি তার প্রেতাত্মা কেবল?

 

গত কয়েক মাসে ডিজনি প্রযোজিত প্রায় ৭ মিনিটের একটি এনিমেশন ছবি দেখতে হচ্ছিল মেয়ে চন্দ্রাবতী ও ছেলে অভিনব’র সাথে। ওদের সাথে দেখতে দেখতে আমায়ও পেয়ে বসেছিল ফিল্মটি। পেয়েছিলাম স্বাধীন চলচ্চিত্রকার বন্ধু সৈয়দা নিগার বানুর সৌজন্যে। লা লুনা। এক শিশু, তার বাবা এবং বৃদ্ধ দাদা এই তিন চরিত্র লা লুনা নামের এক ডিঙিতে চেপে হাজির হয় এক শান্ত সমুদ্রে। প্রথমে মনে হবে কোনো এক অভিযানে এসেছে তারা এবং সেই অভিযানে শিশুটির আজ অভিষেক। প্রথা-মাফিক তার মাথায় টুপি পরিয়ে দেয়া হলো। তারপর সাথে থাকা আলোর একমাত্র উৎস হারিকেনটি নিভিয়ে দিয়ে ওরা অপেক্ষা করতে থাকে। এসময় যেন সমুদ্রের গর্ভ থেকে বের হয়ে আসলো গোলাকার এক বিশাল চাঁদ। পুরো আকাশ ও সমুদ্র আলোকিত হয়ে উঠলো তার হীরকদীপ্তিতে। শিশুটির তখন সবকিছুতে বিস্মিত হবার পালা। একটি অলৌকিক মইয়ে চেপে ওরা একে একে গিয়ে হাজির হলো সেই চাঁদের পিঠে। দেখা গেল যেভাবে আমরা সাধারণত কাগচের উপর একটানে তারা আঁকি তেমন আকৃতির সব আলাদা আলাদা তারা দিয়ে ঢাকা চাঁদের পিঠ। যেন হীরকখন্ড সব এবং প্রথমে মনে হতে পারে এই হীরকখন্ড নিতেই এসেছে ওরা। কিন্তু আসলে তা নয়। ওদের চন্দ্রকর্মী বলায় ঠিক হবে। কেননা টুকরো টুকরো তারাগুলোকে ঝাড়ু দিয়ে তাদের বিভিন্ন বিন্যাসে সাজিয়ে সময়ানুযায়ি চাঁদের আকার ঠিক রাখে ওরা। সে-অর্থে শিল্পীও বটে। শিশুটির কিভাবে কাজ করা উচিৎ এই নিয়ে বাবা এবং দাদা’র মধ্যে ব্যাপক মতবিরোধ এবং খুনসুটির ফাঁকে বিশাল একটি তারা এসে গেঁথে যায় চাঁদের বুকে। বাবা আর দাদা মিলে সেটিকে উপড়ানোর চেষ্টা বিফলে গেলে, শিশুটি একটি হাতুড়ি নিয়ে তরতর করে ওঠে যায় তারাটির সবচেয়ে উঁচুতে থাকা মাথায়— তারপর হাতুড়ির এক ঘা। অদ্ভুতভাবে তারাটি ভেঙ্গে পড়লে দেখা যায় সেটিও আসলে অনেক তারার সমাহার। প্রথমবারের মতো বয়স্ক চোখগুলোও বিস্ময়ে বিহ্বল হয়ে পড়ে চাঁদের ভেঙে পড়া দেখে। আর ভেঙে-পড়া অজস্র তারার টুকরোর আড়াল সরিয়ে শিশুটি এসে যোগ দেয় সেই বিহ্বলতার পরম্পরায়।

‘ও চাঁদ’ কবিতাটি পড়তে গিয়ে এই বিহ্বলতা কাজ করে আমার। মনে হয় এই দৃশ্য দেখছি শামীমের তরুণ কিন্তু প্রজ্ঞাবান চোখের তারার দিকে চেয়ে চেয়ে। এক লাইনেই এত স্বাভাবিকভাবে শামীম চাঁদটি ভেঙে দেন যে তা বিশ্বাস-অবিশ্বাসের প্রশ্ন এড়িয়ে আমাদের প্রশ্নহীন দর্শক হতে প্রণোদনা দেয়। বাকী দৃশ্যও তাই প্রশ্নহীন দেখতে থাকি আমরা। এই ফাঁকে আমাদের খেয়াল থাকে না যে কবি ২য় লাইনে বলছেন চাঁদ টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙে পড়ছে সাগরে, কিন্তু চতুর্থ লাইনে এসে আমরা শুনছি যে খন্ড-বিখন্ড হয়ে চাঁদ শুয়ে আছে সমুদ্রের নিচে। মাত্র ২ লাইনের ব্যবধানে একই জলাধার বোঝাতে সাগর এবং সমুদ্র এই দুই ভিন্ন শব্দ কেন ব্যবহার করেন শামীম? এই প্রশ্ন আমাদের মনে আসতে পারে তখন। চাঁদের খন্ড-বিখন্ড হয়ে শুয়ে থাকার দৃশ্যটাকে কী আরেকটু গুরু-গম্ভীর করে তুলতে চেয়েছেন তিনি? যেন চাঁদ শান্ত-সমাহিত হয়ে আছে ওখানে। পেয়ে গেছে তার সর্বশেষ গন্তব্য। তাই সাগর নয় সমুদ্র বলে ওর চূড়ান্ত শয়নকক্ষকে আরেকটু মর্যাদা দেয়া। পানিতে ডুবে মরাকে আমরা গাম্ভীর্য দিতে গিয়ে যেমনটি বলে থাকি, সলিলসমাধি? এইসব প্রশ্নের পাশাপাশি চূড়ান্ত যে প্রশ্ন আমাদের জন্য অপেক্ষা করে তা হলো শামীম কার সঙ্গে কথা বলছেন আসলে। কাকেই বা বলছেন চাঁদের প্রেতাত্মা? আর চাঁদ যদি না-ই বলবেন তাহলে কবিতার শিরোনামে তাকে আগেই কেন ও চাঁদ বলে ডাক দিয়ে রাখছেন তিনি? এই আপাত প্রেতাত্মা কী শামীমের হারানো প্রেম— যাকে একদা মনে হয়েছিল চাঁদের মতোই মায়াময় এবং অলৌকিক কিন্তু বাস্তবতার মাস্তুলের বাড়ি খেয়ে যে প্রেম ভেঙ্গে-চুড়ে ডুবে মরেছে অতল জলে? নাকি স্বয়ং প্রেমিকাই? ডুবে মরেছে অতল জলে? প্রেমের প্রসঙ্গেই মনে পড়ে আত্মপ্রেমের কথাও। শামীমের অনেক কবিতায় নার্সিসিজম প্রসঙ্গ হিসেবে এসেছে। যেকোনো কবিই যে ক্ষুদে এক নার্সিসিস্ট ঈশ্বর সেটাও মাথায় রাখতে হয় আমাদের। এই প্রেতাত্মাকে তাই মনে হয় শামীমের ক্রিয়েটিভ সেল্ফ; মনে হয় তার সৃষ্টিসত্তার সাথেই কথা বলছেন তিনি। নির্জনতার সমুদ্রে নিজের প্রতিভাকে আরো ভালোভাবে দেখতে গিয়েছেন তিনি। আর দেখতে দেখতে দেখে ফেলেছেন সুন্দরের সেই ভয়ঙ্কর বিন্দুও যা চোখে পড়লে ভেঙে পড়ে বাকী সব আয়োজন। বাকী সব ক্ষুদ্র মনে হয়— এমনকি নিজেকেও; নিজের প্রতিভাকেও। তাই যে প্রতিভাকে মনে হয়েছিল চাঁদ তা আর চোখের সামনে থাকে না। শুধু তার প্রেতাত্মার দিকে চোখ রেখে কাটিয়ে দিতে হয় বাকী জীবন। এই অসম্ভব ভার থেকে মৃত্যু ছাড়া আর কে-ইবা মুক্তি দিতে পারে আমাদের? আমাদের মনে পড়ে চীনা কবি লী পো কে। পানিতে চাঁদকে ধরতে গিয়ে ডুবে মরেছিলেন তিনি। মনে রাখতে হয়ে, শামীম কবির সমগ্র বইটিতে ‘ও চাঁদ’ কবিতার কয়েক পৃষ্ঠা আগেই ছাপা হয়েছে আরেকটি কবিতা।

যে চাঁদ মাস্তুলের ঘা’য়ে ঘা’য়ে ভেঙে যায়

তার জন্য এপিলোগ

——

 

THINGS ARE ALIVE

কিন্তু কোনো শব্দ নেই

পৃথুলতা নেই

দুই পাশে চাপা গোলকের মতো কমলাও নেই

কেবলি–

THINGS ARE ALIVE

 

আমি মনে করি জাহাজ আসছে

আর তার প্রলোগপ্রতিম

মাস্তুলের বাড়ি লেগে ভেঙ্গে যাচ্ছে চাঁদ

 

জাহাজের ছাদ নেই

ফোকরের মধ্যে দিয়ে দেখি

চন্দ্রাগত টুকরাগুলো আসমুদ্র জলে

একে একে ডুবে যায়– চন্দ্র বিভা লোপ পায়

. . . এইভাওে দূর থেকে গোলত্ব বুঝেছ

আর ঐ ভেঙ্গে যাওয়া চাঁদ ভাবছে

পৃথিবীতে থেকে গ্যালো— একমাত্র মাস্তুলের স্মৃতি

 

THINGS ARE ALIVE

 

কিন্তু ভ্রান্তভাবে ভেঙ্গে যাবার শব্দ নেই ক্যানো

 

THINGS ARE THEN NOT ALIKE

 

চাঁদ ভাবছে মাস্তুলই তো একমাত্র

স্মৃতিময় ঘাত

 

 

এই কবিতাটি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনায় না গিয়ে শুধু বলে রাখি সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র কবিতা হওয়া সত্ত্বেও এই কবিতাটিকে ‘ও চাঁদ’ কবিতাটির প্রলোগ হিসেবেও পড়তে পারি আমরা। যেন এই কবিতাটি না লিখলে শামীম ‘ও চাঁদ’ কবিতাটির কাছে পৌঁছাতে পারতেন না। আগে যে বলছিলাম ‘ও চাঁদ’ কবিতাটি অ-শামীম-কবীরীয় আসলে তার রহস্য এখানেই যে, শামীম-সুলভ চর্চাটি শামীম অপেক্ষাকৃত এই দীর্ঘতর কবিতাটিতে করে নিয়েছেন আগে-ভাগে আর তার পরের ধাপে উত্তীর্ণ হয়ে শামীম জন্ম দিয়েছেন আরো পরিণত ও শান্ত ’ও চাঁদ’ কবিতার। প্রসঙ্গত একটু বলে রাখা যেতে পারে যে, আমি যখন শামীম কবীর সমগ্র পড়তে যাই তখন শামীমের কবিতা নিয়ে এই এক টানাপোড়নে পড়ি। পুরো বইটি মনে হয় একটি হীরের খনি। পৃষ্ঠায় পৃষ্ঠায় পড়ে রয়েছে হীরকখন্ড যেমন পড়ে থাকে খনিতে। কিন্তু খনিতে পড়ে আছে বলেই খন্ডগুলি আরো বেশি করে দাবী করে তাদের কেটে-মেজে শিল্পের পরের ধাপে নিয়ে যেতে। যেখানে থেকে জন্ম নেবে সৌন্দর্যের অবিশ্বাস্য আলোক-রশ্মিরা। শামীমের জীবনের সংক্ষিপ্ততায় বাংলা কবিতা যে ক্ষতির সম্মুখীন হয় সেই ক্ষতিটি মূলত এই যে, হীরের-খনির এক আবিষ্কারক পাষাণ-খুড়ে বের করে আনা খন্ডগুলোকে সৌন্দর্যেরের পরে ধাপে আর নিয়ে যাওয়ার সময় পেলেন না। এই ক্ষতি আমাদের; সামগ্রিক বাংলাকবিতারও।

কবি শামীম কবীর আবিষ্কৃত হীরের খনির অন্যতম মূল্যবান খন্ড এই ‌‌’ও চাঁদ’ কবিতাটি। যাকে শুধু আবিষ্কার করেই ক্ষান্ত হননি কবি বরং বিভিন্ন ধাপে ধাপে ঘাম ও রক্তের বিনিময়ে তাকে তৈরি করেছেন নিরাভরণ জ্বলন্ত অলংকারে। নিজেকে শান্ত রেখে যা আলো ছড়ায় চারিদিকে।

 

‘ও চাঁদ’ কবিতাটির পাঠ আরো কতভাবে যে হতে পারে ভাবি মনে মনে। বিনয় মজুমদারের ’ভূট্টা সিরিজ’ মাথায় রাখলে ’ও চাঁদ’ এর আরেকটি পাঠ পাওয়া যেতে পারে। চাঁদ এর জায়গায় ভেবে নিন চাঁদের গুহা আর মাস্তুলের জায়গায় ভূট্টা। আর মনে রাখুন প্রায় যমজ কিন্তু দীর্ঘতর কবিতায় শামীম বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছেন থিংস আর এলাইভ। এবং শেষে বলছেন:

 

চাঁদ ভাবছে মাস্তুলই তো একমাত্র

স্মৃতিময় ঘাত

 

এই কবিতায় তখন সমুদ্রেরও আলাদা মানে এসে দাঁড়ায় আর সম্পূর্ণ কবিতাটি হয়ে দাঁড়ায় সঙ্গম-দৃশ্যের এক অলৌকিক দৃশ্য— সঙ্গমকালীন আন্দোলন আর পরবর্তী অপার্থিব নিঃশব্দতার উন্মোচনসহ।

 

কিন্তু শেষ করার আগে আমার মনে পড়ছে আরেকটি কবিতার কথাও। নাকি গান নাকি গীতিকবিতা? না, শামীম বা লী পো নন— এমনটি বিনয়ও নন। মনে পড়ছে তাঁকে যাকে অস্বীকার করতে চেয়ে চেয়ে বাংলাভাষি কবিকে জারি রাখতে হয় সৃজনের সব প্রচেষ্টা— রবীন্দ্র্র্রনাথ!

 

ও চাঁদ, চোখরে জলরে লাগল জোয়ার দুখের পারাবারে

হল কানায় কানায় কানাকানি এই পারে ওই পারে ॥

আমার তরী ছিল চেনার কূলে, বাঁধন যে তার গেল খুলে ;

তারে হাওয়ায় হাওয়ায় নিয়ে গেল কোন্ অচেনার ধারে ॥

পথিক সবাই পেরিয়ে গেল ঘাটের কিনারাতে,

আমি সে কোন্ আকুল আলোর দিশাহারা রাতে ।

সেই পথ-হারানোর অধীর টানে অকূলে পথ আপনি টানে,

দিক ভোলাবার পাগল আমার হাসে অন্ধকারে ॥

 

 

রবীন্দ্রনাথের ‘দিক ভোলাবার পাগল’ আর শামীমের ‘চাঁদের প্রেতাত্মা’ কি একই সত্তা? ভিন্ন দুই সময়ের দুই চন্দ্রগ্রস্ত, লুন্যাটিক কবি কি একই জোয়ারে ভাসতে ভাসতে দেখা পেয়েছিলেন সেই সত্তার? নিজেকে আপাতত এই প্রশ্নে ঝুলিয়ে রেখে শেষ করছি। প্রিয় পাঠিকা, আপনিও তো ভাবছেন। আপনার ভাবনা আমাদের জানান। শিখি কিছু।

 


(কবিতার বই: শামীম কবীর সমগ্র। দ্রষ্টব্য। ১৯৯৭)

 

লেখা সম্পর্কে মন্তব্য

টি মন্তব্য