গ্রাফিতি নিয়ে কয়েক ছত্র | সিলভিয়া নাজনীন

গ্রাফিতি কেবলই শিল্প না। এটি একটি বিশেষ ইঙ্গিতপূর্ণ ভাষা। এবং এই ভাষার সঙ্গে কমিউনিকেট করতে খুব বেশি বেগ পোহাতে হয় না। এই ভাষা কখনো শুধু একটিমাত্র সিম্বল, কখনো একটি শব্দ, কখনো একটি বাক্য, অথবা কখনো নিছক একটি নাম্বার বা ডিজিট দিয়েই পরিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

কষ্টে আছি আইজুদ্দিন

বাংলাদেশের গ্রাফিতি প্রসঙ্গে বলতে গেলে, শুরুতেই যে কথাটি স্বীকার করে নিতে হয় তা হলো, বাংলাদেশে গ্রাফিতির নিজস্ব ইতিহাস বলতে কিছু নেই। এখানে দেয়ালচিত্র আর শ্লোগান লেখার প্রচলন আছে। এবং তা অনেক আগে থেকেই আছে। প্রধানত বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় অঞ্চলগুলোতে বিভিন্ন রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠন রাষ্ট্রের শাসন-ব্যবস্থার প্রতি অনাস্থা, বা বিরোধী অবস্থান প্রকাশ করতে গিয়ে কিছু ছবি আর কিছু শ্লোগানধর্মী কথা দেয়ালে লিখে থাকে, আমাদের রাজনৈতিক সিনারিওতেও এসব কথার গুরুত্ব থাকে কম-বেশি— আমাদের নাগরিকরাও সেসবে একাত্ম হয়, এবং আমরা মূলত এই রাজনৈতিক দেয়ালচিত্রগুলোকে গ্রাফিতি আকারে বুঝে নেই বা ধারণা করি। দেয়ালচিত্রকেই কি আমরা গ্রাফিতি বলবো কিনা, এক্ষেত্রে এই প্রশ্নটা থেকেই যায়।

দেয়ালচিত্রকেই গ্রাফিতি বুঝবার এই ধারণা সম্ভবত নব্বইয়ের দশকে দেশের দেয়ালে দেয়ালে একটি বিশেষ ’চিকা মারা’র ঘটনা থেকে উঠে এসেছে। ‘কষ্টে আছি আইজুদ্দিন’- বাক্যটি তখন শহরে আলোড়ন তুলেছিল। কারণ এই ‘কষ্টে থাকা’ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা নেহায়েত কম ছিল না।

 

খ.

মৌলিকভাবে গ্রাফিতির ইতিহাস খুঁজতে গেলে আমাদের প্রথমে যেতে হয় প্রাগৈতিহাসিক যুগের গুহাচিত্রের কাছে। যেখানে পৃথিবীর প্রথম দিককার চিত্রাবলী আঁকা হয়েছিল! যেহেতু গ্রাফিতি দেয়াল বা প্রাচীর জাতীয় সারফেসে আঁকা শিল্প, সে হিসাবে আমরা গ্রাফিতির ধারণাকে বিস্তৃত করি গুহার দেয়াল পর্যন্ত। পরবর্তীকালে প্রাচীন রোমান এবং গ্রিকদের দেয়ালগুলোতে দেখা যায় গ্রাফিতি, যেখানে তারা তাদের নাম লিখে রেখেছিল বিভিন্ন কায়দায় আর সঙ্গে প্রতিবাদী সব কবিতা। যার উদাহরণ আমরা দেখেছি ধ্বংস হয়ে যাওয়া নগরী পম্পেই-তে।

স্যাফাইটিক (Safaitic) ভাষায় লিখিত শিলা

এছাড়াও দক্ষিণ সিরিয়া, পূর্ব জর্ডান কিংবা উত্তর সৌদি আরবে স্যাফাইটিক (Safaitic) ভাষায় লিখিত কিছু শিলা বা পাথরের সন্ধান পাওয়া গিয়েছে এবং সেখান থেকেই ধারণা করা হয়, গ্রাফিতি থেকে ঐ স্যাফাইটিক ভাষার উৎপত্তি হয়েছে।

 

‘গ্রাফিতি’ শব্দটি ইতালীয় শব্দ গ্রাফিয়াটো “Graffiato” থেকে এসেছে। যার অর্থ আঁচড় কেটে কেটে লেখা বা আঁকা। বিশ্বশিল্পের ইতিহাসে ‘গ্রাফিতি’ শব্দটি একটি নকশা যা কোনকিছুর উপরে স্ক্র্যাচ (Scratch) করে বা আঁচড় কেটে লেখা বা আঁকা হয়েছে এমন শিল্পকর্ম বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। প্রত্নতাত্ত্বিকগণ পম্পেইয়ের ধ্বংসাবশেষের বিশ্লেষণে ধারণা দিয়েছিলেন যে, এখানকার দেয়ালের শিলালিপিসমূহ স্ক্র্যাচের মাধ্যমে করা হয়েছিল; আর তাই এই ‘গ্রাফিতি’ শব্দটি প্রথম সেসময়েই তৈরি হয়েছে।

প্রাচীন গ্রীক নগরী এফেসাসে-তে পাওয়া চিত্র

যদিও তখনকার যুগে পাওয়া ঐ গ্রাফিতিসমূহ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সেগুলো বেশিরভাগই আঁকা হয়েছিল ব্রোথেলের বিজ্ঞাপন হিসেবে। আর প্রাচীন গ্রিক নগরী এফেসাসে (Ephesus) পাওয়া গ্রাফিতির ধরনটিকেই আধুনিক গ্রাফিতি বলে উল্লেখ করা যেতে পারে।

 

গ.

বর্তমান সময়ে আঁকা গ্রাফিতির তুলনায় সেসময়ের গ্রাফিতিগুলো আরো বেশি অর্থপূর্ণ এবং ভিন্ন ভিন্ন ধারায় বিস্তৃত ছিল। সেখানে সামাজিক ও রাজনৈতিক চিন্তা-ভাবনার প্রতিফলন যেমনভাবে ছিলো, তেমনই প্রেম-ভালবাসার বহিঃপ্রকাশও ছিল। কবিতা লেখার বেশ চল ছিলো সেসময়ের গ্রাফিতিতে। ভিসুভিয়াসের অগ্ন্যুৎপাতের আগে পম্পেই নগরীতে সংরক্ষিত গ্রাফিতি থেকে নভেলিয়া প্রিমিজেনিয়া (Novellia Primigenia) নামের এক অসম্ভব সুন্দরী গণিকার উপস্থিতি সম্পর্কে আমরা জানতে পারি। যা আজকের দিনের প্রেক্ষাপটে অনেকটা ‘বিজ্ঞাপনী’ মডেলিংয়ের সঙ্গে মিলে যায়।

নভেলিয়া প্রিমিজেনিয়াকে নিয়ে লেখা কিছু কবিতার সন্ধান আমরা পেয়েছি। প্রাপ্ত এই লেখাগুলোয় কোনো নাম না থাকায় লেখকদের পরিচয় বা অবস্থান নিশ্চিতভাবে জানা যায় না, তবে অন্তত ছয়জন লেখক নভেলিয়া প্রিমিজেনিয়াকে নিয়ে পম্পেই-এর দেয়ালে দেয়ালে গ্রাফিতি করেছিলেন, সেটার প্রমাণ পাওয়া যায়। তাদের কিছু লেখার বাংলা করলে এরকম দাঁড়াবে :

 

১.

নুসেরিয়ার হে, প্রিমিজেনিয়া তোমাকে জানাই শুভেচ্ছা। যদি আমি হতে পারতাম সেই রত্নপাথর (নামাঙ্কিত আঙটি- যা তোমাকে দিতে চাই) খানিক সে সময়ের জন্য, যখন তুমি কোনো চিঠিতে তোমার সিল এঁটে দিতে (সেটাকে) মুখের কাছে নাও আর তখন আমিও যেন দিতে পারি জমিয়ে রাখা আমার প্রতিটা চুমু, তোমার ঐ ঠোঁটে প্রতিবার।

ভেনাস অঞ্চলের রোমান গেটের কাছে নুসেরিয়াতে, আমি খুঁজছি নভেলিয়া প্রিমিজেনিয়াকে।

 

২.

ভালোবেসে নরকেও যাওয়া যায়। আমি তো যাই পানশালায়

বিকৃত করে দিতে তার (ভেনাসের) কোমর আর ভাঙতে তার পাঁজরের হাড়

ভেঙে দিতে পারে যে আমার কুসুম কোমল মন

আমি কেন পারব না তার মাথা ফাটিয়ে রক্তাক্ত করে দিতে

 

৩.

বিন্দু বিন্দু শিশির ভিজিয়ে দেয় মন

সুগন্ধি ফুলেরা গন্ধ ছড়াতে ছড়াতে

আসে দখিনা বাতাস হয়ে

জুঁই আর শাপলা

নাচে যেন বাসন্তি রোদে

সোনারঙা ঐ নারীর

আড়চোখের তাকানি দেখে

ওলোট-পালট হয়ে গেল আমার চিন্তার খনি

স্বর্গ নিজেও পারতো না আমায় এমন সুখ দিতে

এ যেন অপ্সরা- স্বয়ং সে নিজে

পাঁচশ লোকের ভিড়ে কেবল আমিই দেখছি তাকে

 

৪.

প্রিয় বাড়িওয়ালা, আপনার বলা মিথ্যাগুলোই

না জানি আবার কাল হয়ে দাঁড়ায় আপনার জন্যই

 

আপনি নিজেই খেয়ে নিন

আপনার নিজের বিশুদ্ধ ওয়াইন যতো আছে

যদি না আপনি সেসবও

বিক্রি করতে চান আপনার অতিথিদের কাছে

(পম্পেই-য়ে পাওয়া কিছু গ্রাফিতি)

 

ঘ.

আধুনিক বা সমসাময়িক গ্রাফিতি ১৯৬০-এর দশকের প্রথমদিকে আমেরিকার ফিলাডেলফিয়াতে শুরু হয়। এরকম আমরা জানতে পারি। আর ষাটের দশকের শেষদিকে সেটা নিউইয়র্কে পৌঁছে যায়। ৭০-এর দশকে এই আধুনিক গ্রাফিতির ধারণা বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে, তখন লোকেরা শহর জুড়ে দেয়ালে দেয়ালে এই শিল্পফর্মটির অবাধ ব্যবহার শুরু করে।

৭০-এ ট্রেনে করা গ্রাফিতি

এক পর্যায়ে, সত্তরের দশকে ওখানে পাতাল ট্রেনের জানালা দিয়ে বাইরের দৃশ্য দেখতে পারাটাই অস্বাভাবিক হয়ে পড়ে, কারণ ট্রেনের সব জানালাই স্প্রের রঙে রঙিন হয়ে যায়। তবে এই তথ্যটাও বেশ মজার যে, প্রথমদিকে ’ট্যাগার্স’ স্ট্রিট গ্রুপগুলো তাদের এলাকা বা অঞ্চলকে চিহ্নিত করতে কিংবা আধিপত্য তৈরি করতে এই কাজগুলো করেছিল। এই গ্রুপগুলোর প্রত্যেকটিরই আলাদা আলাদা নাম ও সিম্বল ছিল, যা শহরের আনাচে-কানাচে তারা এঁকে বেড়াতো।

বার্লিন দেয়ালে করা গ্রাফিতি

ওই সময়েই ’গ্রাফিতি’ শব্দটি দ্য নিউইয়র্ক টাইমস এবং ঔপন্যাসিক নরম্যান মেলার প্রথম ব্যবহার করেন। আধুনিক কনটেক্সটে। একটা সময় পর নিউইয়র্কের আর্ট গ্যালারিগুলো গ্রাফিতি কিনতে শুরু করে, আর তখন এটা একটা শিল্পবস্তু হিসেবেও বিবেচিত হতে থাকে।

যদিও একইসঙ্গে নিউইয়র্কের তৎকালীন মেয়র জন লিন্ডসে গ্রাফিতির বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিলেন, আর এই নিষেধাজ্ঞার পক্ষে যুক্তি ছিলো- কেননা গ্রাফিতি করা হতো ট্রেনের বডি, রাষ্ট্রীয় কিংবা ব্যক্তিগত সম্পত্তির উপর। মেয়র জন লিন্ডসে গ্রাফিতির বিস্তার ঠেকাতে এমনকি শাস্তি ও জরিমানার বিধানও করেছিলেন।

৮০-এর দিকে করা গ্রাফিতি

এর ফলস্বরূপ, ৮০-এর দিকে গ্রাফিতিকে ফাংশন করতে হলে আরো একটু আড়ালে যেতে হয়। দেখা যায়, তখনকার অনেক প্রতিষ্ঠিত গ্রাফিতি শিল্পীই ট্রেনের পরিবর্তে গ্রাফিতির ক্যানভাস হিসেবে বিল্ডিংয়ের দেয়াল বা ছাদ ব্যবহার করতে শুরু করেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই প্রতিবন্ধকতাগুলোই মূলত গ্রাফিতিকে আরো বেশি করে নিষিদ্ধ শিল্প-কর্মকাণ্ডের দিকে উসকে দেয়।

 

ঙ.

বাংলাদেশে সমসাময়িক কালের অর্থাৎ নব্বই থেকে বর্তমান সময়ের রাজনৈতিক অবস্থার প্রেক্ষিতে একধরনের দেয়ালচিত্র, যা কখনো রোমান্টিসিজম, আবার কখনো বিদ্রুপ বা ব্যঙ্গাত্মকরূপে হাজির হয়েছে। এই সকল দেয়ালচিত্রে কখনো ছবি আঁকা হয়, কখনো একটা শব্দ বা বাক্য, আবার কখনো প্রতীক ব্যবহৃত হয়।

বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার কিশোর গ্যাংগুলোও অনেক সময় শহরের দেয়ালে তাদের উপস্থিতির কথা জানান দেয়। সেক্ষেত্রে তারা স্প্রে পেইন্ট দিয়ে তাদের গ্যাংয়ের নাম বা সুনির্দিষ্ট কোন সাইন অঙ্কন করে। নামের ক্ষেত্রে যদিও বাংলা আমরা এখনো দেখতে পাইনি। ইংরেজিতেই সেসব লেখা হয়।

গ্রাফিতির বৈশিষ্ট্যসমূহ নিয়ে মতৈক্যে পৌঁছানো সম্ভব নয় এই মুহূর্তে। তবে গ্রাফিতি সবসময়ই সময়ের প্রয়োজনে, একধরনের নিষিদ্ধ শিল্পকর্ম হিসেবে সামনে আসে। একবিংশ শতকে গ্রাফিতিকে সাধারণ চোখে দেখবার পথ নেই। কারণ যখনই শিল্পকর্মের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রের সমালোচনা করা হয়, তখন তা নিষিদ্ধ হিসেবে সাব্যস্ত। আর এখানেই গ্রাফিতির গুরুত্ব।

শিল্পী তার প্রতিবাদকে খুব মিনিমাল আর্টের মধ্য দিয়ে উপস্থিত করেন, যা সাধারণের সঙ্গে কমিউনিকেটিভ। শাসক যখন বিক্ষুব্ধ হয়, তখনই শিল্পীর সার্থকতা। এখান থেকে দেখলে বাংলাদেশের গ্রাফিতি যদিও এখন পর্যন্ত তেমন কোনো অবস্থান তৈরি করতে পারেনি, অন্তত আশির দশকের নিউইয়র্কের গ্রাফিতি-কালচারের সঙ্গে যেটাকে মার্জ করা যায়, তথাপি বাংলাদেশেও গত দুই-তিন বছরে কিছু গ্রাফিতি তৈরি হয়েছে, শহরের আনাচে-কানাচে আমরা সেগুলো দেখতে পাচ্ছি।

এই গ্রাফিতিগুলো প্রধানত বাংলাদেশের আলোড়ন তোলা কিছু ঘটনাকে হাইলাইট করে। যেই ঘটনাগুলো বর্তমান বাংলাদেশ সরকারের ছত্র-ছায়াতেই ঘটতে পেরেছে। এবং গ্রাফিতিগুলোতেও সেই মেসেজটা ভালোভাবে প্রতীয়মান। গ্রাফিতিগুলো একটু দেখে নেওয়া যাক-

 

১. মাইকেল চাকমা কোথায়

আদিবাসিদের সঙ্গে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের নিপীড়নমূলক আচরণ নতুন কিছু না। অনেক আগে থেকেই এটি চলে আসছে। এর বিপরীতে, আদিবাসিদের তরফে এবং বাংলাদেশের চিন্তাশীল নাগরিকেরাও যে কমবেশি প্রতিবাদ করেছিলেন, সেটিও আমাদের জানা। তার মধ্যেই, মাইকেল চাকমার গুম হবার ঘটনা ঘটে। গ্রাফিতিটিতে সেই মাইকেল চাকমার সন্ধান চাওয়া  হচ্ছে।

২. জাস্টিস ফর আবরার

বুয়েটে হওয়া নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনা, যেটিকে আমরা ‘আবরার হত্যাকাণ্ড’ হিসেবে জানি, গ্রাফিতিটি সেটাকে কেন্দ্র করে। যেহেতু হত্যাকাণ্ডটি ঘটেছিল ইউনির্ভাসিটির ক্ষমতাচক্রের সরাসরি অংশগ্রহণে, ফলে এর বিচার হওয়ার বিষয়টাও যথেষ্ট সন্দেহপূর্ণ ছিলো। গ্রাফিতিটিতে একইসঙ্গে বাংলাদেশের বিচার কাঠামোকেও নির্দেশ করা হচ্ছে।

৩. আই  অ্যাম অভিজিৎ

গত কয়েক বছরে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সবচাইতে ভয়ংকর ঘটনাগুলোর মধ্যে ‘অভিজিৎ হত্যাকাণ্ড’ একটি। অভিজিৎ রায়ের হত্যাকাণ্ডের আগে ও পরে তখন একই ধরনের আরোও কয়েকটি কিলিং বাংলাদেশে সংঘটিত হয়েছিলো। দুঃখজনক বিষয় হলো, এই হত্যাকাণ্ডগুলোর পিছনে দায়ী ছিলো নিপাট ‘জ্ঞানচর্চা’। যেই জ্ঞানচর্চা মৌলিকভাবে সকল অন্ধতাকে দূরীভূত করতে চায়।

এই গ্রাফিতির আর্টিস্ট খুব সহজেই বিষয়টি খোলাসা করতে চাইছেন যে, যদি জ্ঞানচর্চার জন্যই আমাকে হত্যা হতে হয়, তবে সেটাকে আমি সাধুবাদই জানাবো। অভিজিতের পথই আমার পথ, আর তুমি তোমার কাজ চালিয়ে যাও।

৪. জালিমতন্ত্র নিপাত যাক

একটি শিশু তার কাধে একটি কুকুর বহন করে নিয়ে যাচ্ছে। ভালোভাবে দেখলে হয়তো বোঝা যাবে, কুকরটিরও এই কিশোর ছাড়া আর কেউ নাই। সর্বোপরি এই শক্তিহীন দু’টি জীবকে কার ভয়ে এভাবে দৌঁড়াতে হচ্ছে? এই প্রশ্নটা রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের কাছেই এগজিসটেনশিয়াল।

 

৫. ডিএসসিসি তুই খুনী

কুকুর হত্যার বিষয়টা বাংলাদেশের জন্য একটি অবাক করা ঘটনা ছিলো। আমাদের অনেকের কারণেই পরিষ্কার ছিলো না কেনো হত্যার মতো একটি ভয়ংকর কাজ কাউকে করতে হচ্ছে। পরবর্তীতে নানামুখী প্রতিবাদের ফলে সেটি বন্ধ হয়েছিলো। এরকম ভেবে নেওয়া যুক্তিসঙ্গত যে, সেসময়ে এই গ্রাফিতি-করাও ওসব  হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলো।

৬. কায়দা করে বেঁচে থাকো

অনেক দিন ধরেই সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের দেয়ালে দেয়ালে লেখা ছিল ‘কায়দা করে বেঁচে থাকো’। অর্থাৎ বেঁচে থাকার কৌশল অবলম্বন করো। এমনটা না হলেই ধরা খেয়ে যেতে তুমিও। সে তুমি যে-ই হও না কেন? পরবর্তীতে এ লেখার সাথে কার্টুনিস্ট আহমেদ কিশোরের প্রতিকৃতি যুক্ত হলে বিষয়টি আরো অর্থবহ হয়ে ওঠে। কিশোরের ঘটনা আমরা সংবাদ মাধ্যমের বরাতে জানি, কার্টুন করার অপরাধে তার ওপর রাষ্ট্রীয় এক মহাখড়গ নেমে এসেছিলো। যদি কিশোর কার্টুন না করে, বরং নাম না জানা কোন শিল্পী হতেন, এবং গ্রাফিতি করতেন, তাহলে হয়তো (ধরা পড়ার আগ পর্যন্ত) তার ‘কায়দা’ করা হতো, এবং স্বাচ্ছন্দ্যে ‘বেঁচে থাকা’ও হতো।

 

বাংলাদেশে রিমাণ্ড একটা আলোচিত শব্দ। আইনিভাবে শব্দটির যথেষ্ট অপরিহার্যতা থাকলেও সেটার যে কোন মিস-ইউজ হয় না, এমনটা বলা যায় না। দেশে অনেক সময় রাজনৈতিক কারণে বা ক্ষমতার অপব্যবহারের ফলে অতি-নিরপরাধ বা শুভবোধসম্পন্ন মানুষকেও রিমান্ডের রুমের বাস্তবতার (পারতঃ অর্থে পাশবিকতার) সম্মুখীন হতে হয়েছে। এ নিয়ে বিভিন্ন সময় শুভবোধসম্পন্ন মানুষেরা প্রতিবাদ ও বিভিন্ন বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করে, যার উপস্থিতি গ্রাফিতিতেও পাওয়া যায়। এরকম আরেকটা গ্রাফিতি আছে যেখানে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী রবীন্দ্রনাথের দিকে বন্দুক তাক করে রেখেছে। আবার সেই রবীন্দ্রনাথকেই আরেক গ্রাফিতিতে উলঙ্গ করে বলা হচ্ছে ‘হেইট দিজ ড্রেস’।

 

চ.

পাশের দেশ ভারতের রাজধানী দিল্লি কিংবা মুম্বাইয়ের মতো প্রধান প্রধান শহরগুলো স্ট্রিট আর্টের ব্যবহার আরো সুন্দর হয়ে উঠছে। কলকাতার স্ট্রিট যদিও গ্রাফিতির জন্য খুব একটা বিখ্যাত না, তবে বিগত কয়েক বছরে সেই ধারণার অনেকটা পরিবর্তন হয়েছে। সরু গলি থেকে প্রশস্ত রাস্তা, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস থেকে পরিত্যক্ত গ্যারেজ, নানান রেস্টুরেন্টের অন্দরসজ্জায়; স্প্রে থেকে জলরঙ এমনকি পেন্সিলে করা স্কেচও কলকাতার দেয়ালগুলোকে আকর্ষণীয় করে তুলেছে। আর কলকাতায় প্রায়শঃ লেনিন, বিবেকানন্দ অথবা গান্ধীর মতো বিখ্যাত প্রতিকৃতিগুলো কোন রকম প্রতিবাদ ছাড়াই গ্রাফিতির মধ্য দিয়ে উপস্থিত হয়ে যায়।

মিসিং গার্লস গ্রাফিতি

এছাড়া নারী পাচার রোধ ও এ সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়াতে শিল্পী লীনা কেজরিওয়াল কলকাতায় M.I.S.S.I.N.G. নামের একটি প্রকল্প করেন যা স্ট্রিট আর্টের অভ্যন্তরীণ হলেও যথেষ্ট কার্যকররূপে প্রতীয়মান হয়েছে বিগত কিছু বছরে। যদি আপনি কলকাতায় সে সময় গিয়ে থাকেন তবে সেগুলো আপনি অবশ্যই দেখে থাকবেন। যেমনটা দেখে থাকবেন কয়েক বছর আগে ঢাকায় আর কলকাতায় করা সুবোধের গ্রাফিতিগুলো, যেখানে চলমান সমাজ-রাজনীতিকে প্রতিঘাত করার মনোভাব প্রকাশ পায়। পশ্চিমবঙ্গের আইন অনুসারে সরকারি দেয়াল বা স্থানকে সংরক্ষিত করে রাখা যায় না আর গ্রাফিতিতে যেহেতু তাই করতে হয়, ফলে কলকাতায় গ্রাফিতি করা আইনত অবৈধ।

সমকামের পক্ষে করা একটি গ্রাফিতি

অন্যদিকে, ভারতীয় আদালত সমকামকে বৈধ ঘোষণা করে যখন সমকামী আইন পাশ করে, সে সময়টায় ভারতের রাস্তায় সমকামের পক্ষে করা গ্রাফিতি সবার নজর কাড়ে। যদিও পরবর্তীতে সে আইন বাতিল ঘোষণা করে দেশটির তৎকালীন সরকার।

 

ছ.

গ্রাফিতি শিল্প (art) নাকি ভ্যান্ডালিজম (vandalism) তা নিয়ে বিতর্ক আছে এবং বিভিন্ন দেশে গ্রাফিতি করাকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে বিবেচনা করা হয়। সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বের অনেক দেশ গ্রাফিতিকে বৈধ করেছে, যদিও সেটা শর্তসাপেক্ষে। যেমন- ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরো, সেখানে রিও প্রশাসন কিছু বাছাই- এবং তালিকাবদ্ধ- সরকারি ভবন ছাড়া অন্যান্য প্রকাশ্য স্থানে গ্রাফিতি করার অনুমতি দিয়ে বাণিজ্যিক, যৌনরসাত্মক, জাতীয়তাবাদী কিংবা বৈষম্যবাদী গ্রাফিতির প্রতি নিষেধাজ্ঞা জারি রেখেছে। তেমনি নিউইয়র্ক সিটির একজন কাউন্সিলর পিটার ভ্যালোন গ্রাফিতি সম্পর্কে বলেন, ‘গ্রাফিতি শিল্প হতে পারে যতক্ষণ না এটার দ্বারা কারও সম্পত্তি বিনষ্ট করা হচ্ছে, অন্যথায় এটা অপরাধ বলেই বিবেচ্য থাকবে’। আবার সিরিয়ায় গ্রাফিতি সর্ম্পকে একটা প্রবাদ আছে, যেখানে গ্রাফিতিকে উন্মাদের আবর্জনা বলে অভিহিত করা হয়; যদিও, সিরিয় আন্দোলনে দেয়ালে করা ঐ গ্রাফিতিই হয়ে ওঠে মুক্তবাকের অন্যতম হাতিয়ার।

অন্যদিকে, বার্লিন-ভিত্তিক গ্রুপটি রিলাইম ইওর সিটি’র সদস্য ফেলিক্স এর মতে, ‘গ্রাফিতি শিল্পীরা একটি শহরকে বিজ্ঞাপনদাতাদের হাত থেকে পুনরুদ্ধার করে। এটা (গ্রাফিতি) স্বাধীনতার প্রতিনিধিত্ব করে যা শহরকে করে তোলে আরও প্রাণবন্ত’। কেননা গ্রাফিতি একই সময়ে দৃশ্যপটের একঘেয়েমি দূর করে সমাজ-রাজনীতি ও বিভিন্ন বিষয়ের ওপর আলোকপাত করতে পারে। যার মাধ্যমে শিল্পীরা সহজেই কোনকিছুর কাউন্টার দিতে পারে।

x

x

x

x

x

লেখা সম্পর্কে মন্তব্য

টি মন্তব্য

%d bloggers like this: