home কবিতা গুচ্ছ কবিতা ।। তানভীর আকন্দ

গুচ্ছ কবিতা ।। তানভীর আকন্দ

ভ্রম

স্বচ্ছ জলের বুকে বিদ্ধ করেছ তুমি
রূপোলি ছুরির ঝিলিক,

কে যেন নেমে আসে মাঠে, দুই হাত প্রসারিত—
গাছের সবুজ পাতা ঢেকে গেল রূপোর চাদরে,
কোথায় ফুলের ঘ্রাণ!

স্বচ্ছ জলের বুকে বিদ্ধ করেছো তুমি
কালো বর্শার ফলা,

কে যেন উড়ে গেল দূরে, ধূসর পালক
খসে যায়, তার উড্ডয়নের স্মৃতিরূপে পড়ে থাকে
পালকের নীল ছায়া!

 

 

জিপসি হাওয়ার গান

একি এক ভীষণ গোলাপ,
জরাগ্রস্থ কৌতুহলে
পথ থেকে পথে ঘুরে মরে।

আহা! পাতারা কেমন করে সুরহীন বাঁশি হয়ে যায়!

হরিণের পথ আছে অবারিত, খোলা-
বিনিদ্র বনের মাঝে
বৃক্ষের ক্রন্দন, উড়ে যায়
জল থেকে জলহীনতার সীমানায়।
আহা! ফুলেরা কেমন করে প্রণয়ের সুরভি ছড়ায়!

 

 

ফ্রান্সিসকো তারেগার প্রতি

গোলাপের নির্জনতা বুকে টেনে নাও,

পাহাড়ি ঝর্নার সুরে—সিক্ত হাওয়ায়

ভুলে যাওয়া গানে গানে, অশ্রুজলে

বিশ্রুত জীবনের কথকতা…

 

যে রাতে স্বপ্ন দেখো তুমি,

সেইসব আদিম অরণ্য আর পথের ইশারা

ডেকে ডেকে চলে যায় দূরে,

ফিরে আসে পিঁপড়ের ঢিবি আর

বাতাসে দুলতে থাকা আঙুর লতায়
মিশে থাকা প্রণয়ের সমস্ত নির্যাস,

 

আকাশের পেয়ালায় প্রজাপতি তার

রঙিন পাখনা ডুবিয়ে তৈরি করছে মদ,

 

আর শুধু বাতাসের ক্রন্দন বাজে

গাছে গাছে, পাতায় পাতায় তুমি

লিখে রাখো সেইসব নাম,

বহুদিন পর অবসরে কেবলই যাদের

মনে পড়ে যায়…

 

 

বিপন্ন ঘুঙুর

মৃত্যুর ভেতর বাহিরে আসা যাওয়া করে আমাদের
অবিভক্ত কররেখা,
কোথায় রেখেছো তবে আগ্রাসী আঙুলের শোভা?
যতোনা বেজেছে বেহালা সুরে
তারচেয়ে বেশি কম্পন তুলে ফিরে গেছে
বদ্ধ দরজার ওইপাশে;

পালকের কোমলতা ঘেটে খুঁজে আনি
পরাজিত উষ্ণতা কিছু—এই প্রেম, দেহের আঙিনাভরে
নেচে গেছে কতকাল, পড়ে আছে বিপন্ন ঘুঙুর
কার পায়?

যেন স্মৃতির দূরত্ব থেকে ফিরে আসে,
আনমনে, বাতাস ঝাপটে দিচ্ছে জানালায়—
পর্দার ওইপাশে ক্ষণে ক্ষণে দৃশ্যমান,
আমরাও সাজিয়ে নিচ্ছি আমাদের বিগত প্রেমের ইতিহাস!

যেন দৃষ্টির অগোচরে দৃশ্যও নিছক অস্তিত্বহীন হয়ে পড়ে…

 

 

নস্টালজিয়া

এলাচের সুঘ্রাণ নিয়ে মাঠে—ইঁদুরের
দেহের মতন আর্দ্র মাটিতে
হেলে পড়ে চাঁদ,
শীর্ণ পাতার ফাঁকে ভেসে যায়
পরিযায়ী মেঘ,
বাতাসের সেকি আর্ত, করুণ সুরে সুরে
আমাদের অস্থি ও ত্বকে
আঙুল বুলিয়ে যায় স্মৃতি,
কাকে আর ডাকবো বলো?
বহুদিন আগে মরে গেছে,
শুকনো ঘাসের উপর ফেলে রেখে গেছে তার
গুনগুন গান—সেইসব একান্ত সেরেনাদ!

তবু বারবার ফিরে আসে চাঁদ—জ্যোৎস্নায়
সঞ্চিত প্রেমের আলিঙ্গন!
আহা প্রেম,
তুমিও অকারণ শুধু ফিরে ফিরে আসো,
কোথাও হারিয়ে গেলে রিকশার বেল
আমাদের ঠোঁটে রেখে যাও
একটুকু স্পর্শের আকুলতা…

 

 

চক্র

আমাকেও লুকিয়ে রাখো, সময়ের ক্ষুব্ধ পরম্পরায়,
তারই ঘূর্ণন পথে কেন্দ্রগামী ত্বরণের টানে যেই ব্যাসার্ধ
ধরে রাখে বৃত্তের প্রকৃত চারণভূমি—
তার মাঝে আরও কিছু অনর্থক নৃত্য দেখি,
দেখি চক্রাকারে ফিরে আসে রাত্রি ও দিন,
অথবা ঘড়ির ডায়ালে কেউ রেখে দেয় বিভাজন,
আমাদের হস্তরেখার মতো থেমে যায় সহসাই, অতঃপর
সেও এক প্রতীক্ষা হয়ে থাকে
শুধু একবার পঠিত হবার ছদ্মবেশী কৌশলে!

 

 

হরপ্পা

আবার ঘনিয়ে আসে হাওয়া, দুরন্ত-দুর্বার
হরপ্পার বিরান নগরে—কতোটা সংশয়ে
একবার ভূগর্ভে বিলীন যে নগরী, জেগে উঠে—
পাথরের বুক চিড়ে হাক দেয় সুপ্রাচীন
অন্ধকারে, আরও একবার বিস্মৃত সিন্ধুর ধারে।

ধূসর প্রাসাদে আছে ঘুমহীন প্রবাল-প্রাচীর,
জ্বলে যেই তারা আজ আকাশের কোণে,
যেন এক সান্ধ্য আভরণ, সহস্র বৎসর কাল
আয়ু বুঝি ফুরিয়েছে তার, আর্দ্রকণ্ঠে গান
তাই বুঝি আজ এই রাতে, এই নীরব ভ্রুকুটি
ক্ষণিক অমোদে নাচে যুগল চোখের মাঝে।

স্পন্দন ও স্থিতি ছেড়ে যতদূর যাওয়া যায়
যতদূর গড়িয়েছে চাকা, সময়ের স্তব্ধ পথ বেয়ে
বিস্তৃত বিভ্রম ছেড়ে মল্লিকা নির্যাসে—
আঙুল ডুবিয়ে তবে সেইটুকু পথ দেব পাড়ি,
তখন জলের টানে শীতল আবেশে ভর করে
রঙিন মাছের মতো কোনও এক আলো
মধ্যাহ্ন রোদের সোনালি জঠর ভেঙে

পড়বেনা এসে তবে চোখের উপরে?

 

 

লিবিডো

সমুদ্র পেড়িয়ে এসে, অন্ধ এক প্রজাপতি যেন—

এইসব রাত্রির ঝোপের উপরে ঝাপটে দিচ্ছে ডানা

ছুটে যাচ্ছে চতুর্দিকে অতর্কিত বাতাসের আহত গুঞ্জন,

যেদিকে তাকাই দেখি এই রূপোলি প্রান্তর জুড়ে

পড়ে আছে শামুকের বেশে ঝাঁকে ঝাঁকে শত লিবিডো কাঁকর…

 

 

ক্লেয়ার দে লুন

ছায়ার শরীর জুড়ে ছায়া—এক গভীর প্রতীতি,

সুরের পেয়ালাভরে তুলে নাও অবিনাশী মৃত্যুর জঙ্গম,

তার থেকে কিছু দূরে অন্ধ ময়ূর সে এক—

শবের স্থিরতা নিয়ে পার হয়ে যায় নৃত্যের ভঙ্গিমা

যেন চন্দ্রালোকে আজ আর কোনো কথা বাকি নেই,

কেবলই পুঞ্জিত পেখমের তলে ঢেউ কেটে কেটে চলে

রাশি রাশি দিকভ্রান্ত ফেনা,

সমুদ্র উল্লাসে ভেসে যেতে থাকে আয়ুহীন মাছেদের

নীলাভ্র সজল চোখে…

 

 

রাত্রি

দূরাগত রাত্রি এই, যেন ঝিনুকের আবৃত খোলস—
সাগরের অশেষ বিস্তারে সঞ্চারিত মৃত্যু তার,
নীল জোছনার ধারে নেচে যায় ভ্রম আর বিদ্বেষ,
পেয়ালা প্রপূর্ণ হয় রক্তলাল কুয়াশায়— কুমারি মৃগের

অপূর্ণ আস্বাদে,

যেন মৃৎ থেকে পাতা— সমস্ত ভুবন জুড়ে

এই এক গান শোনা যায়।

আঁধারের আলেখ্য অজানা, অনর্গল বাজিয়ে চলেছে

জলের মৃদঙ্গ এক, তবু ভয়— জাল ফেলে কারা আজ তুলে নেয়

পরাজিত সুর? নিভে গেলে সমস্ত প্রদীপ— আঁধারে বিভোর,

দেহের উষ্ণতা টেনে জেগে থাকি আরও কিছুদূর…

লেখা সম্পর্কে মন্তব্য

টি মন্তব্য