home ই-বুক, দর্শন ক্যাপিটালিজম অ্যা গোস্ট স্টোরি ।। অরুন্ধতী রায় ।। ভূমিকা ও অনুবাদ: মূর্তালা রামাত ও শারমিন শিমুল ।। তৃতীয় পর্ব

ক্যাপিটালিজম অ্যা গোস্ট স্টোরি ।। অরুন্ধতী রায় ।। ভূমিকা ও অনুবাদ: মূর্তালা রামাত ও শারমিন শিমুল ।। তৃতীয় পর্ব

সাম্প্রতিককালে মাইনিং-এর সাথে জড়িত বৃহৎ কর্পোরেশনগুলো শিল্প-সাহিত্যের প্রতি ঝুঁকে পড়েছে। চলচ্চিত্র, শিল্পকলার প্রতিষ্ঠা, এবং সাহিত্য উৎসবে তাদের পৃষ্ঠপোষকতার হিড়িক ১৯৯০ এর সুন্দরী প্রতিযোগিতার আবেশময় জায়গা দখল করে নিয়েছে। সম্প্রতি ভেদান্ত নামের একটি প্রতিষ্ঠান প্রাচীন দংগ্রিয়া কণ্ড গোষ্ঠীর আদি বাসস্থানের কেন্দ্রস্থল থেকে বক্সাইট ওঠানোর জন্য খোঁড়াখুঁড়ি শুরু করেছে। এই খোঁড়াখুঁড়িকে কেন্দ্র করে ভেদান্ত, চলচ্চিত্রের ছাত্রদের জন্য “সুখ সৃষ্টি” নামের একটি চলচ্চিত্র প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছে যার মাধ্যমে তরুণ চলচ্চিত্রকারদের টেকসই উন্নয়নের বিষয়ে চলচ্চিত্র তৈরি করতে বলা হয়েছে। ভেদান্তের ট্যাগলাইন হচ্ছে “সুখের খনন”। অন্যদিকে জিন্দাল গ্রুপের রয়েছে একটি সমসাময়িক শিল্প বিষয়ক পত্রিকা। এই পত্রিকা ভারতের কিছু খ্যাতিমান শিল্পীকে (যারা স্বভাবতই স্টেইনলেস স্টিল নিয়ে কাজ করে) সহায়তা দেয়। তেহেলকা নিউজউইক থিংক ফেস্টিভ্যালের প্রধান পৃষ্ঠপোষকের মধ্যে রয়েছে এস্সার। এই উৎসবের প্রধান আকর্ষণ ছিল সারা পৃথিবী থেকে আসা বিশিষ্ট চিন্তাবিদদের “হাই অকটেন বিতর্ক”। বিশ্বখ্যাত স্থপতি ফ্রাঙ্ক গেহরি এই বিতর্কে অংশ নিতে উৎসবে উপস্থিত হয়েছিলেন। (এ সবই ঘটেছে গোয়াতে। সেখানে তখন সাংবাদিক এবং সমাজকর্মীরা খনি শিল্পের বিরাট সব বেআইনী কেলেঙ্কারি ফাঁস করে দিচ্ছেলেন। ফলে বাস্তার এলাকায় ক্রমশ প্রকাশ্য হয়ে ওঠা যুদ্ধে এস্সারের ভূমিকা স্পষ্ট হয়ে উঠছিল।) টাটা স্টিল এবং রিও টিনটো ( অতীতের বহু ঘৃণ্য কার্যকলাপের ইতিহাসের সাথে এই প্রতিষ্ঠানটির নাম জড়িয়ে আছে) ছিল জয়পুর সাহিত্য উৎসব (ল্যাটিন নাম: দর্শন সিং কনস্ট্রাকশন জয়পুর লিটারেরি ফেস্টিভ্যাল) এর প্রধান পৃষ্ঠপোষকদের মধ্যে অন্যতম। শিল্প সমালোচকদের মাধ্যমে দেয়া বিজ্ঞাপনে এই সাহিত্য উৎসবকে “পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সাহিত্য সভা” হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেয়া হয়। এই উৎসব কাভার করতে আসা সাংবাদিকদের জন্য তৈরি প্রেস ছাউনিটির ব্যয়ভার বহন করে টাটা কোম্পানির “কৌশলগত ব্র্যান্ড ম্যানেজার” হিসাবে দায়িত্ব পালনকারী প্রতিষ্ঠান “কাউন্সিলেজ” । পৃথিবীর অনেক উল্লেখযোগ্য এবং উজ্জ্বল লেখক জয়পুরের এই উৎসবে একত্রিত হয়ে ভালোবাসা, সাহিত্য, রাজনীতি, এবং সুফিকাব্য আলোচনা করেছেন। কেউ কেউ আবার সালমান রুশদী’র বাক্ স্বাধীনতার অধিকার রক্ষার খাতিরে তার নিষিদ্ধ বই “দি স্যাটানিক ভার্সেস” থেকে পড়ে শুনিয়েছেন। প্রতিটি টিভির ক্যামেরায় এবং সংবাদপত্রের ছবিতে, উৎসবের বক্তাদের পেছনের পটভূমিকায় খুবই সহৃদয় ও সদাশয় পৃষ্ঠপোষকের মতো আবছাভাবে ঝুলে থাকা টাটা স্টিলের লোগোটি (এবং সেই সাথে তাদের ট্যাগলাইন- স্টিলের চাইতে মূল্যবোধ শক্তিশালী)  পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিল। উৎসবের আয়োজকেরা আমাদের জানালেন যে রক্তপিপাসু মুসলিম জনতাই হলো বাক্ স্বাধীনতার সম্ভাব্য শত্রু, যারা কীনা উৎসবে উপস্থিত স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের ওপরেও হামলা চালাতে পারে। (আমরা সবাই দেখেছি যে মুসলমানদের বিরুদ্ধে ভারতীয় সরকার এবং পুলিশ নিতান্তই অসহায়।) এ কথা ঠিক যে, দেওবন্দের দারুল উলুম মাদ্রাসার  কট্টর ইসলামী শিক্ষার পক্ষ থেকে এই উৎসবে সালমান রুশদীকে আমন্ত্রণ জানানোর প্রতিবাদ করা হয়েছিল। হ্যাঁ, উৎসবের জায়গায় কিছু সংখ্যক ইসলামবাদী সমবেত হয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছে এবং অবিশ্বাস্য হলেও এ কথা সত্য যে, উৎসবের নিরাপত্তা রক্ষার জন্য কেন্দ্র সরকার কোন ব্যবস্থাই গ্রহণ করেনি। এর কারণ হচ্ছে, উৎসবের এই পুরো নাটকটি ইসলামী মৌলবাদের সাথে যতোটা জড়িত, ঠিক ততোটাই আবার গণতন্ত্র, ভোট ব্যাংক, এবং উত্তর প্রদেশ (ইউপি) নির্বাচনের সাথেও জড়িত ছিল। তবে ইসলামী মৌলবাদের বিরুদ্ধে  বাক্ স্বাধীনতার যুদ্ধটাই কেবল বিদেশী পত্রিকায় খবর হিসেবে ছাপা হওয়ার যোগ্যতা পেয়েছে। এ খবর ছাপা হওয়াটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল, সন্দেহ নেই। কিন্তু অরণ্যের যুদ্ধে এই উৎসবের পৃষ্ঠপোষকদের ভূমিকা, মৃতদেহের পাহাড় জমে যাওয়া বা কারাগারগুলো বন্দী মানুষে ভরে যাওয়ার খবর নিয়ে পত্রিকায় তেমন কোন রিপোর্ট ছাপা হলো না! “অবৈধ কার্যকলাপ রোধকারী আইন” এবং “ছত্রিশগড়ের বিশেষ জননিরাপত্তা আইন” যেগুলোর মাধ্যমে যে কোন সরকারবিরোধী কাজ, এমনকী “চিন্তা-ভাবনা” কেও জ্ঞাতব্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করা যাবে- তা নিয়েও কোন খবর প্রকাশিত হলো না। কিংবা লোহানদিগুদায় টাটা স্টিল প্লান্টের বাধ্যতামূলক প্রকাশ্য শুনানীর খবর- এলাকাবাসীর অভিযোগ অনুযায়ী এই শুনানী প্রকৃতপক্ষে সশস্ত্র বাহিনীর সুরক্ষায় ভাড়া করে আনা জনা পঞ্চাশেক দর্শকের উপস্থিতিতে লোহানদিগুদা থেকে কয়েকশ মাইল দূর জগদলপুরের কালেক্টরের অফিসের উঠানে অনুষ্ঠিত হয়- সেটাও কোন গুরুত্ব পেল না। এই সব ঘটনার ব্যাপারে কোথায় ছিল বাক্ স্বাধীনতা? কালিঙ্গানগরের কথাও কিন্তু কেউ উল্লেখ করেনি। ভারতীয় সরকারের অপ্রিয় বিষয়- যেমন শ্রীলঙ্কার যুদ্ধে তামিলদের গণহত্যায় সরকারের গুপ্ত ভূমিকা, অথবা সম্প্রতি আবিষ্কৃত কাশ্মীরের অজ্ঞাত কবরের সারি- এসব নিয়ে কাজ করে যাওয়া সাংবাদিক, শিক্ষাবিদ বা চিত্রনির্মাতাদের ভারত সরকার যে ভিসা দেয়নি বা বিমানবন্দর থেকে সরাসরি ফেরত পাঠিয়ে দিয়েছে, তা নিয়েও কেউ কোন কথা বলেনি।

কিন্তু আমাদের মতো পাপীদের মধ্য থেকে প্রথম ঢিলটি ছুঁড়বে কে? আমি নই, আমার রুজি রোজগার আসে কর্পোরেট প্রকাশনা সংস্থা থেকে। আমরা সবাই টাটা স্কাই এর অনুষ্ঠান দেখি, আমরা টাটা ফোটন দিয়ে ইন্টারনেট চালাই, আমরা টাটা ট্যাক্সিতে চড়ি, টাটা হোটেলে থাকি, টাটার তৈরি বোনচায়নার কাপে টাটা চা-এ চুমুক দেই, এবং টাটা স্টিলের চামচ দিয়ে চা নেড়ে নেই। টাটা বইয়ের দোকান থেকে আমরা টাটার বই কিনি। “হাম টাটা কা নমক খাতে হ্যাঁয়।” আমরা টাটায় অবরুদ্ধ।

যদি “নৈতিক শুদ্ধতার” হাতুড়ির আঘাত, পাথর ছোঁড়ার যোগ্যতা মাপার মানদণ্ড হয়, তবে বলতে হবে যে  সেইসব মানুষ যাদের মুখ ইতোমধ্যেই বন্ধ করে দেয়া হয়েছে, তারাই এ কাজের যোগ্য। প্রচলিত ব্যবস্থার বাইরে যারা অবস্থান করছে; যেমন অরণ্যের অপরাধীরা কিংবা যারা প্রচলিত ব্যবস্থার প্রতিবাদ জানিয়ে  আসছে তাদেরকে নিয়ে কখনো কোন খবর প্রকাশিত হয় না। অধিকারচ্যুত ভদ্রলোক, যারা এক আদালত থেকে আরেক আদালতে মামলা নিয়ে দৌঁড়াচ্ছে, অপরাধের চাক্ষুস প্রমাণ দিচ্ছে, সাক্ষী হচ্ছে, সংবাদে তাদেরও কোন কথা আমরা দেখি না।

কিন্তু সাহিত্য উৎসব আমাদেরকে আহা-উহু করা মুহূর্ত উপহার দিয়েছে।  অপরাহ্ পর্যন্ত এই অনুষ্ঠানে এসেছিলেন। অপরাহ্ বলেছেন, তিনি ভারতকে ভালোবেসে ফেলেছেন, এখানে তিনি বারবার আসবেন। অপরাহ্’র এই কথায় আমরা  দারুণ গর্বিত হয়েছি!

চমৎকারিত্বে ঠাসা শিল্প আয়োজনের এ এক হাস্যকর পরিসমাপ্তি।

যদিও এখন কর্পোরেট সমাজসেবার সাথে টাটার সংশ্লিষ্টতার প্রায় একশ বছর পার হয়েছে। টাটা বিভিন্ন ক্ষেত্রে বৃত্তি প্রদান করে, তারা কিছু চমৎকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও হাসপাতালও চালায়, তথাপি ভারতীয় কর্পোরেশনগুলো মাত্র কিছুদিন হলো বিশ্ব কর্পোরেট সরকারের উজ্জ্বল জগত স্টার চেম্বার তথা “ক্যামেরা স্টিল্লাটা”-তে আমন্ত্রিত হয়েছে। এই জগতটি এর প্রতিপক্ষের জন্য মারণঘাতী হলেও,  এটি এতোটই শৈল্পিক যে এর অস্তিত্বও সবসময় বোঝা যায় না।

এই রচনার পরবর্তী অংশটুকু কারো কারো কাছে কঠোর সমালোচনা  বলে  মনে হতে পারে। অন্যদিকে, প্রতিপক্ষের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করার ঐতিহ্য বজায় রেখে বললে এই রচনাটিকে পুঁজিবাদের রক্ষকদের দূরদৃষ্টি, নমনীয়তা, পরিশীলিত মনোভাব, এবং অটল সংকল্পের প্রতি সাধুবাদ জানানোর প্রচেষ্টা হিসাবেও পড়া যায়।

কর্পোরেট সমাজসেবার মনোমুগ্ধকর ইতিহাস যা সমসাময়িক কালের স্মৃতি থেকে এখন মুছে গেছে, তা বিংশ শতাব্দীতে যুক্তরাষ্ট্রে শুরু হয়। মিশনারি পন্থাকে সরিয়ে দিয়ে উত্তরাধিকার শক্তিতে শক্তিমান হয়ে পুঁজিবাদ (এবং সাম্রাজ্যবাদ) এর সম্প্রসারণের রাস্তা খোলার জন্য এবং এ প্রক্রিয়া রক্ষণাবেক্ষণের কাজে সুরক্ষা দেবার বাসনায় কর্পোরেট সমাজসেবার আবির্ভাব ঘটে।যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠিত এ ধরণের প্রথম দিককার প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ছিল কার্নেগি কর্পোরেশন। কার্নেগি স্টিল কোম্পানির মুনাফার অর্থ থেকে ১৯১১ সালে প্রতিষ্ঠানটি গড়ে ওঠে। এছাড়াও আছে রকফেলার ফাউন্ডেশন যা স্ট্যান্ডার্ড অয়েল কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা ডি. রকফেলারের মাধ্যমে ১৯১৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। এরাই হলেন সে সময়কারর টাটা এবং আম্বানি।

রকফেলার ফাউন্ডেশনের কাছ থেকে অর্থনৈতিক সাহায্য-সহযোগিতা পেয়ে গড়ে উঠেছে এমন কিছু প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আছে জাতিসংঘ, সিআইএ, দি কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্স (সিএফআর), নিউইয়র্কের কিংবদন্তীতুল্য মিউজিয়াম ফর মডার্ন আর্ট, এবং অবশ্যই নিউইয়র্কে অবস্থিত রকফেলার সেন্টার ( যেখানে দিয়াগো রিভিয়েরার দেয়ালচিত্র ভেঙে ফেলতে হয় কারণ ছবিটিতে মজা করে পুঁজিবাদীদের প্রত্যাখ্যান এবং বিজয়ী লেলিনের ছবি ফুটিয়ে তোলা হয়েছিল; এই ভাঙভাঙির সময় আমেরকিান জনগণের বাকস্বাধীনতা ছুটি নিয়েছিল)।

রকফেলার হচ্ছেন আমেরিকার প্রথম বিলিওনিয়ার এবং পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী মানুষ। তিনি ছিলেন আব্রাহাম লিঙ্কনের সমর্থক, দাসপ্রথা এবং মদ্যপান বিরোধী একজন মানুষ। তিনি বিশ্বাস করতেন, ঈশ্বর নিজের হাতে তাকে এতো অর্থ প্রাচুর্য  দিয়েছেন, এবং এর জন্য তিনি কৃতজ্ঞ।

নিচে “স্ট্যান্ডার্ড ওয়েল কোম্পানি” নামে পাবলো নেরুদার প্রথম দিককার একটা কবিতা তুলে দেয়া হলো:

নিউইয়র্ক থেকে আসা তাদের নাদুস নুদুস
সম্রাটেরা হলো মায়াবী মুখের আততায়ী
মিষ্টি হেসে তার কিনে নেয় সিল্ক, নাইলন, সিগারস
ছোটখাট স্বৈরশাসক আর একনায়কদের।

তারা কেনে দেশ, মানুষ, সমুদ্র, পুলিশ, সভাসদ
দূরবর্তী এলাকা যেখানে কৃপণের স্বর্ণ সঞ্চয়ের মতোই
দরিদ্ররা মজুত করে তাদের শস্য-
স্ট্যান্ডার্ড ওয়েল তাদের ঘুম ভাঙ্গায়
উর্দির আদলে পোশাক পরিয়ে বলে দেয়
কোন ভাইটি তার শত্রু।
প্যারাগুয়েনরা তাদের যুদ্ধ লড়ে
আর জঙ্গলে মেশিনগান হাতে
বিধ্বস্ত হয় বলিভিয়ানরা।
এক ফোঁটা খনিজের জন্য নিহত হন একজন রাষ্ট্রপতি
হাজার বিঘা জমি মর্টগেজের জন্য
এক নশ্বর নতুন সকালে আলোময় দ্রুত এক মৃত্যুদণ্ডের জন্য,
চিন্তার শক্তিকে ভয় দিয়ে থামিয়ে দেয়ার জন্য,
পাতাগোনিয়ায়, নাশকতাবাদীদের ঠেকাতে নতুন একটি কারাগার তৈরির জন্য,
একটি বিশ্বাসঘাতকতার জন্য, খনিজে খোদাই
চাঁদের নিচে বিক্ষিপ্ত গোলাগুলি জন্য, রাজধানীতে মন্ত্রীসভায় একটি সুক্ষ
পরিবর্তনের জন্য, তেলের ঢেউয়ের মতো
ফিসফাস তোলার জন্য আর
আবারও আক্রমণের জন্য, তুমি দেখবে
কিভাবে স্ট্যান্ডার্ড ওয়েলের চিঠিগুলো মেঘের ওপর ঝলকায়,
সমুদ্রের ওপর, তোমার বাড়িতে
ঝলমল করে তাদের কর্তৃত্ব।

কর্পোরেট স্নেহধন্য ফাউন্ডেশনগুলো যখন যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম আত্মপ্রকাশ করতে থাকে, তখন এগুলোর আয়ের উৎস, আইনগত ভিত্তি, ও জবাবদিহিতার অভাব নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়। সাধারণ মানুষেরা মনে করতো কোম্পানিগুলোর হাতে যদি এতোই উদ্বৃত্ত অর্থ থেকে থাকে, তবে তাদের শ্রমিকদের বেতন আরো বাড়িয়ে দেয়া উচিত। (ওই সময়ে, এমনকি আমেরিকাতেও মানুষ এমন ক্ষুব্ধ মত প্রকাশের সাহস রাখতেন।) এসব ফাউন্ডেশনের আইডিয়া, যা এখন খুবই মামুলি ব্যাপার, সে সময় তা ছিল ব্যবসায়িক উদ্ভাবনী ধ্যান ধারণার একটি ব্যাপক অগ্রগতি। হিসাব বহির্ভূত বিপুল সম্পদের সমারোহ, অথচ ট্যাক্স দেয়ার আইনি কোন বাধ্যবাধকতা নেই- জবাবদিহিতার পুরোপুরি ঊর্ধ্বে, সম্পূর্ণ অস্বচ্ছ- অর্থনৈতিক সম্পদকে রাজনৈতিক, সামাজিক, ও সাংস্কৃতিক মূলধনে পরিণত করে ফেলার এবং অর্থকে ক্ষমতায় পরিণত করার আর কোনো সহজতর উপায় আছে কি? মুনাফার সামান্য একটি অংশ ব্যবহার করে পুরো বিশ্বকে নাচানোর এই পদ্ধতির চেয়ে ভালো কোনো রাস্তা মহাজনদের জানা আছে কি? বিল গেটস নিজেই স্বীকার করেছেন, তিনি কম্পিউটার সম্পর্কে খুব সামান্যই জানেন। তারপরও তিনি কেবল যুক্তরাষ্ট্রের নয়, সমগ্র বিশ্বের সরকারগুলোর শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ও কৃষিনীতি প্রণয়ন করে যাচ্ছেন, কীভাবে সম্ভব?

বছরের পর বছর ধরে মানুষ যখন দেখল যে, ফাউন্ডেশনগুলো সত্যিকার অর্থে ভালো কিছু কাজ (গণপাঠাগার পরিচালনা, রোগ নির্মূল) করছে তখন তাদের কাছে কর্পোরেশন এবং তাদের দানে পরিচালিত ফাউন্ডেশনগুলোর মধ্যকার সরাসরি সম্পর্কের বিষয়টি ক্রমশ অস্পষ্ট হতে শুরু করলো। অবশেষে এই অস্পষ্টতা একসময় পুরোপুরি মুছে যায়। আর এখন, যারা নিজেদের বামপন্থী মনে করে, তারাও এদের উপঢৌকন গ্রহণ করতে লজ্জা পায় না।

১৯২০-এর দশক নাগাদ, মার্কিন পুঁজিবাদ কাঁচামাল ও বৈদেশিক বাজারের জন্য বাইরের দিকে নজর দেয়া শুরু করে। ফাউন্ডেশনগুলোর বৈশ্বিক কর্পোরেট পরিচালনার আইডিয়া তখনই চালু হয়। ১৯২৪ সালে রকফেলার ও কার্নেগি ফাউন্ডেশন যৌথভাবে কাউন্সিল অব ফরেন রিলেশন্স (সিএফআর) গঠন করে।  আজকের দুনিয়ায়, এটি পররাষ্ট্রনীতি সংক্রান্ত সবচেয়ে ক্ষমতাধর প্রেশার গ্রুপ হিসেবে পরিচিত। পরবর্তীকালে এই গ্রুপ ফোর্ড ফাউন্ডেশনের মাধ্যমেও আর্থিক সাহায্যপুষ্ট হয়। ১৯৪৭ সাল নাগাদ সদ্য গঠিত সিআইএ’কে সিএফআর সমর্থন দিতে শুরু করে এবং এর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে থাকে। সময়ের সাথে সাথে, যুক্তরাষ্ট্রের ২২ জন সেক্রেটারি অব স্টেটকে সিএফআর-এর সদস্য হিসেবে রাখা হয়। জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার জন্য গঠিত ১৯৪৩ সালের স্টিয়ারিং কমিটিতে সিএফআর-এর সদস্য ছিল পাঁচজন এবং এখন যেখানে জাতিসংঘ নিউইয়র্ক সদর দফতর  দাঁড়িয়ে আছে, ওই জমিটি কিনতে জে.ডি রকফেলারের দেয়া অনুদানের পরিমাণ ছিল ৮.৫ মিলিয়ন  ডলার।

১৯৪৬ সাল থেকে বিশ্বব্যাংকের যে ১১ জন প্রেসিডেন্ট হয়েছেন- যারা প্রত্যেকে নিজেকে দরিদ্র মানুষের মিশনারি হিসেবে উপস্থাপন করেছেন- তারা সবাই ছিলেন সিএফআর-এর সদস্য। (একমাত্র ব্যতিক্রম ছিলেন কেবল জর্জ উডস। তবে তিনি ছিলেন রকফেলার ফাউন্ডেশনের ট্রাস্টি এবং চেস-ম্যানহাটন ব্যাংকের ভাইস-প্রেসিডেন্ট।)

‘ব্রেটন উডস’ এর কনফারেন্সে বসে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ সিদ্ধান্ত নেয় যে, বিশ্বের রিজার্ভ মুদ্রা হওয়া উচিত মার্কিন ডলার। এছাড়াও তারা সিদ্ধান্ত নেয়, বিশ্বপুঁজিতে অবাধ অনুপ্রবেশের লক্ষ্যে বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডকে সার্বজনীন ও আদর্শিক করার জন্য ‘মুক্তবাজার ব্যবস্থার’ প্রচলন করা একান্ত জরুরী। নিজেদের বাণিজ্যিক লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য তারা সুশাসন প্রতিষ্ঠায় (যতক্ষণ নিয়ন্ত্রণকারীর ভূমিকায় থাকবে তারাই), আইনের শাসনের ধারণা বিকাশে (আইন প্রণয়নে তাদের পরামর্শ থাকবে), এবং শত শত দুর্নীতি বিরোধী কর্মসূচিতে (যে সঙ্কীর্ণব্যবস্থা তারা নিজেরাই কায়েম করে) প্রচুর অর্থ ঢালতে থাকে। এসব কিছু করার পর, বিশ্বের সবচেয়ে অস্বচ্ছ ও জবাবদিহিতাহীন এই দুটি সংগঠনই আবার, পৃথিবীর অপক্ষোকৃত দরিদ্র দেশগুলোর সরকারের কাছ থেকে স্বচ্ছতা আর জবাবদিহিতা দাবি করে!

(চলবে)

দ্বিতীয় পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

গ্রন্থ: ক্যাপিটালিজম অ্যা গোস্ট স্টোরি
লেখক: অরুন্ধতী রায়
অনুবাদক: মূর্তালা রামাত ও শারমিন শিমুল

[বইটি বাংলা ভাষায় ধারাবাহিক প্রকাশ হতে থাকবে; প্রতি শুক্রবার।]

লেখা সম্পর্কে মন্তব্য

টি মন্তব্য