home সমালোচনা সাহিত্য কৌতূহল বুঝে উঠতে, এই পুস্তিকায় মুখ গুঁজতে হবে | সুপ্রিয় মিত্র

কৌতূহল বুঝে উঠতে, এই পুস্তিকায় মুখ গুঁজতে হবে | সুপ্রিয় মিত্র

২০০৭ সালের কথা। তখন ক্লাস এইট। হাতে হাতে ফোন থাকবে, এসবের বালাই–টালাই ছিল না। বাড়িতে আত্মীয়স্বজন আসলে, কিংবা এমনি কিছু কিনতে টিনতে পাঠালে, কিনে ফেরার পর খুচরো–খাচরা বাঁচলে পরে অপেক্ষায় থাকতাম, কখন মা–বাবা বলবে, ও তুই রেখে দে। জমা। আরেকটা হত মেলা আর পুজোর সময় ঠাকুমা–দিদার বখশিশ। তা এই নিয়ে ছিল আমার মতো ছেলেপিলেদের মফস্বল মধ্যবিত্ত বাড়ির অভিমানী পকেটমানি। এই নিয়েই ছিল গুলি খেলা, লাট্টু কেনা, ফুচকাবিলাস, সাইকেলের পাম্প দেওয়ার মস্তানি, বিশেষিনীর জন্য গ্রিটিংস কার্ড কেনার বুকের পাটা এবং এসটিডি বুথ–এর ভূত। এই শেষটিতে নেকনজর দিতে হয়। তখন চলছে স্টার প্লাসে ‘কউন বনেগা কড়োরপতি’। মধ্যবিত্তের স্বপ্নে কোটি টাকার স্বপ্ন গুঁজে দিতে জেনারেল নলেজের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব এবং ফোন অফ ফ্রেন্ড আস্তে আস্তে কুরেকুরে কানের মাথা খাচ্ছে। ‘ঘর পে বইঠকে লাখ রুপই কা সওয়াল’–এর প্রলোভনও নিশ্চয় সেসময়ের লোকজনদের মনে আছে। টিউশন থেকে ফেরার পথে জেরক্স করতে যেতাম শুভদার দোকানে। সেখানে ছিল এসটিডির বুথও। আর আমাদের ব্যাচে সমর তিনবার এইটেই ফেলুদা। ততদিনে তার গলা ভেঙে গিয়েছে এবং অ্যাডাম্স অ্যাপেল দিব্য নড়াচড়া করছে। রিসিভারে রুমাল চাপা দিয়ে একটু খাদের দিকে গেলেই সমর ছিল আমাদের পাড়ার অমিতাভ বচ্চন। আমাদের পকেটমানি খরচ করে বিনোদন নেওয়ার অন্যতম জায়গা ছিল এই গলা নকল করে বিভিন্ন নম্বর টিপে ফোন করা আর সমর বলবে– জি নমস্তে, মে অমিতাভ বচ্চন, কউন বনেগা করোড়পতি–সে বোল রাহা হুঁ। এই ডায়লগ আর তারপর, আপকা ভাসুরপো, পিসির নাতি, দাদাজি কা পোতি এসব সম্পর্ক যদি পারমুটেশন কম্বিনেশনে লেগে যায়, তবে কেল্লাফতে। বাকি আমাদের তখনও গলা ভাঙেনি। মেয়ের গলায় অসুবিধে হত না। তা এরকম বেশ ভালোই চলছিল। একবার হল কী, এরকম একটা ফোন আমরা টিউশন ফেরত বিনোদনের লাগি করতে লেগেছি, ফোন ধরলেন এক মাঝবয়স্কা। ‘জি নমস্তে..’ বলার পর মোটামুটি চলল খাতির। তারপর হটসিটে বসে আছে আপনার বোন মহিমা বলামাত্র, ওপারের ভদ্রমহিলা উত্তেজনায় চেঁচিয়ে বললেন– মানে, তুই কোথায় ছিলিস এতদিন মানু! তুই কোথায় আগে বল… আমরা তো আরও মজা পেয়েছি। এবং কী যে কপাল, মেয়ের গলায় কথা বলার পালা ছিল সেদিন নাড়ুর। নাড়ু যা তুক লাগাচ্ছে, তাক হয়ে মহিলা ক্রমশ বিহ্বল হয়ে পড়ছেন। কয়েক সেকেন্ডের গল্প। তারপরই হঠাৎ হাউহাউ করে কান্নায় ভেঙে পড়লেন– মানু, তুই এভাবে ফোন করলি, আর আজকের দিনে… এত অভিমান তোর? তুই যে বেরোলি, আর ফিরলি না। মাকে কাল আমি আর তোর দাদা দাহ করে ফিরলাম, যা হোক টাকা যা হোক জিতেছিস, এবার চলে আয়। তারপর ‘আমাকে দে আমাকে দে’ বলতে বলতে শোনা গেল সেই দাদা এগিয়ে আসছেন ল্যান্ডফোনের দিকে। আর এক মুহূর্ত দেরি না করে ঝুপ করে নাড়ু ফোনটা রেখে দিল। রাখতে না রাখতেই ফোন এল সেই নম্বর থেকে। শুভদা ধরতেই ‘মানু প্লিজ, মানু…’ ওই শেষ। আমাদের বিনোদনের ইতি এবং নীতিমূলক শিক্ষা ওখানেই সাঙ্গ হল। এই ভয়ংকর স্মৃতি আমাদের বন্ধুমহলে আজও তাড়া করে ফেরে। অলোকপর্ণার ‘দাস্তানগো’ পড়তে গিয়ে, প্রথম পাতা ওল্টাতে না ওল্টাতে এই দাস্তান স্মৃতির গুমঘর থেকে ঝাপটা মেরে বেরিয়ে এল। লেখা শুরু হচ্ছে এইভাবে–

‘একবার একটা ফোন এসেছিল।

অচেনা নম্বর।

রিসিভ করতে ওপার থেকে বৃষ্টির আওয়াজ শোনা গেল। খানিক হ্যালো করার পরেও বৃষ্টি কমল না।’

ক্রমশ কথা এদিকে এগোয় যে, একদিন বৃষ্টির গলা থেমে নেমে এল অন্যদিক থেকে ‘হ্যালো’, কিন্তু সেই গলা সেই চরিত্রেরই। পাঠ করতে গিয়ে এই উপরোক্ত প্রতিক্রিয়ার কথা না বললে নিজের সঙ্গে বেইমানি হত। ‘দাস্তানগো’ দুই চরিত্রের কথোপকথনের গতিময়তায় বয়ে যাওয়া ছিন্নবিচ্ছিন্ন কিছু গল্প, ঘটনা, দুর্ঘটনা ও কল্পনার মলাটবন্দি ছটফটানি। কথোপকথনের ক্রমশ চলনে জানা যায়, নরমাল হরফের বক্তা একজন নারী, কিন্তু আরেক বক্তার নারী না পুরুষ সেকথা বোঝা যায় না স্পষ্টভাবে। কিন্তু সেটা বড় কথা নয়। প্রতিক্রিয়া মোক্ষণের পর, ক্রমশ সমালোচনার দিকে আনত হওয়ার আগে একটা ঘোষণা করে দেওয়া ভাল, যেহেতু, বর্তমান বাংলা সাহিত্য মার্কেটে সমালোচনার ভাব নিয়ে কিয়দ ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হয়েছে বলে আমার ধারণা। ‘ভালো লাগল’, ‘এইখানটা অসাধারণ’, ‘এইখানটা জাস্ট ছুঁয়ে গেল’ এই কথাগুলোর সঙ্গে, এইগুলো কেন হল, তার বিশ্লেষণ, পরিশ্রমের কাজ ফুরিয়ে গেছে আজকাল দেখা যায়। ‘খারাপ লাগল’ তো বলাই যায় না, নয়তো সদ্ভাব বজায় রাখার ব্যাপার আছে। এই স্বভাব তৈরি হয়েছে, কারণ কেন ভালো লাগল এবং কেন খারাপ লাগল, সে নিয়ে যুক্তি ও আবেগের লড়াই, যা পাঠক জেনেবুঝে নিজেকে চিরে ফাঁক করতে করতে এগোয়, সে সময় আর নেই, বা দিতে রাজি নয়। ফলত, ‘সমালোচনা’–র নামে ‘লাইক, লাভ, ওয়াও’ রিঅ্যাক্টের কলমপ্রক্ষেপণ বলা ভালো। কিন্তু, আমি সে–পথে হাঁটতে নারাজ, কারণ অলোকপর্ণা নিজেই চেয়েছে আমি কিছু বলি। এবং লিখতে গিয়ে আমি আরও খুঁতখুঁতে হব। এবং, এ লেখা আমি লিখছি মানে, এখানে আমার ব্যক্তিবিন্যাস থাকবে, সেটাই স্বাভাবিক। তাই কথার মাঝে আত্মপক্ষ–উদ্দীপনের হেতু ‘আমার মনে হয়’, ‘আমার ধারণা’–মূলক কথাগুলো আমি এড়িয়ে যাব সচেতনভাবে, আর যদি লিখি, তা বলার খাতিরেই বলা। তারপর, সেকথা যদি ব্যক্তিবিন্যাসের ঊর্ধ্বে পৌঁছায়, তখন এই বক্তব্যের সর্বজনীনতা নিয়ে এই লেখার পাঠক বিচার করে নেবে। যে কোনও লেখার ক্ষেত্রেই যা খাটে।

এই সূত্রকে ধরেই ‘দাস্তানগো’–র পাঠপ্রতিক্রিয়ার প্রথম কথা– প্রথম পৃষ্ঠার প্রথম বাক্য থেকে শেষ পৃষ্ঠার শেষ লাইন অবধি, এই ব্যক্তিবিন্যাস ও সর্বজনীনতার ইমব্যালেন্স প্রবলভাবে লক্ষণীয়। দু’জনের কথোপকথনে যে যে কথা উঠে আসে, তা কখনও পরিচিত, কখনও নিজের, কখনও শোনা বা জানা, কখনও দেখা এবং পড়া– এই নিয়ে চলে। তাহলে কী বাদ গেল? এমনকিছু যা নতুন মনে হবে। যা আগে শুনিনি, পড়িনি। সেই নতুন কথা কমে আসছে, এই দশক বা শতকের ক্রাইসিস অর্থাৎ ফান্ডামেন্টাল নতুন রূপ–এর অভাবকে বাদ দেওয়া যদি হয়, তবে পড়ে থাকে– দেখার ধরন। লেখক কীভাবে দেখছেন, কতটা পেঁচিয়ে কিংবা কতটা সরল তাঁর দেখা, এবং সেখান থেকে কোনদিকে তাঁর দেখা উত্তরণ পাচ্ছে এই ব্যাপারে গোটা লেখা জুড়ে ধোঁয়াশা রেখে গিয়েছে অলোকপর্ণা কিংবা ধোঁয়াশাটা ও নিজেই সরাতে পারেনি।

কথোপকথনের আগুপিছু জুড়ে রয়েছে অনেকানেক টুকরো টুকরো ঘটনা। এক কথা থেকে, আরেক কথায় যেতে যেতে তা পাঠক পড়তে পারছে এবং সেই কথোকথনের একজন নীরব শ্রোতা হয়ে বসে আছে দু’জনের মুখের দিকে চেয়ে। কিন্তু কথোপকথনের মজা হল, আমরা যখন কারও কাছে কোনও গল্প শুনি, সেই গল্পের স্থান–কাল–পাত্রর কোনওটা যদি অচেনা হয় বা চেনা হয়, তবে আমরা নিজেদের মতো একখান জগৎ বানিয়ে সেই কথাকারকে দেখতে থাকি। কথোপকথন ততই ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠে দুইভাবে– যত সেখানে নিজের এই ভাবিত জগতের স্পেস ও কথাকারের স্পেস সমাপতিত হতে থাকে। এবং দ্বিতীয়ত, কথাকারের দৌড়ের সঙ্গে শ্রোতার ভাবনার দৌড়ে অল্পবিস্তর ফারাক থাকলেও, সেই ফারাক যখন সময়ের সঙ্গে প্রায় একই ব্যবধান বিরাজ করে। অর্থাৎ স্পেস জরুরি। পরিমাণমতো। খুব দূরে গেলে মহাজাগতিক নিয়মেই ছিটকে যেতে হবে, খুব কাছে এলে সংঘর্ষের সম্ভাবনা। তাই কাছে আসতে গেলে দূরে থাকতে হবে এমন কিছু ভারী, যা দূরে থাকার সুবাদে জ্বালাতে পারে না, কিন্তু ভারী হওয়ার মাধ্যাকর্ষণ দূর থেকে এসে শিথিল হয় এবং কাছে এসে আছড়ে পড়ার অভিকেন্দ্র বলকেও সে প্রশমিত করে। অন্য এক দূরত্ব আরেক নৈকট্যকে পুষ্টি দেয়। অলোকপর্ণা এই ভারী ও হালকা বস্তুকে জায়গামতো বসিয়ে এই পুস্তিকার মধ্যে যথাযথ সৌরলোকের ব্যালান্সড মডেল বানাতে গিয়ে বারবার অঙ্ক ভুল করেছে। এক ঘটনা থেকে আরেক ঘটনায় যাওয়ার আগে–পরে যে স্পেসের দরকার হয়, তা ও যেন ভুলে গেল বেমালুম। এবং যেতে গেলেও তার ট্রনজিশনের যে একটা মসৃণতা থাকতে হয়, তা বারবার বিচলিত হয়ে বন্ধুর হয়ে উঠেছে রীতিমতো চড়াই–উতরাইয়ের মতো। বৃষ্টির কথোপকথনের যে কথা পূর্বে বলেছি, সেখান থেকে জাম্পকাট হয়ে কথা চলে যায় এক কাজিন– দূর সম্পর্কের ব্যাপারে। আগের বৃষ্টির কথা কেন আমাকে পড়তে হল এই জায়গায় আসার জন্য, এর কোনও উত্তরণ পাই না। এই মুদ্রাদোষ লেখার অধিকাংশ জায়গায়। জাম্প এবং জাম্প এবং জাম্প। ট্র‌্যাজেডি, ট্র্যাজেডি, ট্র‌্যাজেডি। দূর সম্পর্কের সেই দাদা থেকে জাম্প হয়ে নিজেকে আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে রেখে বেমালুম মাথা থেকে শুরু করে ছেঁটে যাওয়া এবং ছেঁটে যাওয়া ততক্ষণ, যতক্ষণ না শুধু দুটো পায়ের পাতা পড়ে থাকে, তারপর একদিন ডানপা ডানদিকে চলে যায় আর বাঁপা বাঁদিকে। সেখান থেকে জাম্প করে লিখতে বসার সঙ্গে তুলনা। আত্মপ্রতিকৃতির তুলনা এবং আয়নার অনেকক্ষণ ধরে আলোচনার মধ্যে থাকা, আমাকে ভাবতে খানিক জায়গা দেয়। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই তা লাফ মারে স্বপ্নের দিকে। সেখানে লুকোচুরি খেলা চলছে। নিজের বড়বেলার সঙ্গে নিজেরই ছোটবেলার। এবং সেখান থেকে লুকোতে গিয়ে, লুকিয়ে থাকতে থাকতেই একজন মরে পচে গিয়েছে। এতক্ষণ কথার মধ্যে কোনও আচমকা মৃত্যু ছিল না। এখানে ছোটবেলার সঙ্গে বড়বেলার লুকোচুরির দৃশ্যকল্পের জাম্পের মাঝে জুড়ে বসল মৃত্যু। কয়েক লাইন যেতে না যেতেই এল ভিন্ন এক ঘটনার আবাহন। যার সঙ্গে পূর্বোক্ত কথোপকথনের সরাসরি বা পরোক্ষ কোনও যোগাযোগ থাকে না।

কী সেই ঘটনা?

‘–আমাদের বাড়ির পিছনে আলোরা থাকত। বাজারে বড় দোকান ছিল ওদের। বসন্তকালে শীতলাপুজো হত। সারা পাড়া ঝেঁটিয়ে খিচুড়ি আর লাবড়া খেতে যেত। একবার খিচুড়ির বিরাট ড্রামে কুকুর পড়ে গেছিল। কাউকে জানতে দেওয়া হয়নি। একবছর পাড়ার কোনও বউয়ের পেট হল না।

–কেন?

–পাড়ায় কথিত আছে, একবছর ধরেই নাকি ডগি স্টাইলে পিছন মেরে গেছে কুকুর–খিচুড়ি খেয়ে।’

এরপর কী কথা হচ্ছে সেখানে যাওয়ার আগে, খানিক এই জাম্প নিয়ে বলে দেওয়া দরকার। পাঠকের প্রশ্ন হতে পারে– কেন? বারবার এই জাম্প, এই অ্যাড্রেনালিন রাশ, এই চমকে ওঠা, এই ‘সহসা এলে কী এ ভাঙা জীবনে’ সুলভ পাঠের উচকিতভাব থাকতে পারে না?

আমার উত্তর– হ্যাঁ পারে, অবশ্যই পারে। কিন্তু, রোজ খবরের কাগজে ধর্ষণ, শ্লীলতাহানি, চুরি, ডাকাতির কথা মানুষকে ক্লান্ত করে দেয়। কিছুদিন পর এই খবরের ঘনঘটা গা সওয়া হয়ে যায়। শরীরের সঙ্গে, চোখের সঙ্গে, ভাবনার আতরাঙ্গির সঙ্গে তার অভ্যেস হয়ে যায়। নিয়ম যেমনভাবে কখনও বিচলিত করে না। বারবার দুর্ঘটনা, একসময় ঘটনার অন্তর্গত হয়ে যায় যেভাবে। বারবার মিথ্যে যেভাবে বৈশিষ্ট্য হয়ে ওঠে, বারবার সত্য যেভাবে বোরিং হয়ে যায়। এবং সর্বোপরি, বারংবার প্রাকৃতিক দুর্যোগ কোনও স্থানের আবহাওয়ার পূর্বাভাসে যেমন আর বলা হয় না। চেরাপুঞ্জির মানুষ পকেটে রুমালের মতো যেমন ছাতা নিয়ে বেরোয়। পাঠ জুড়ে ভালো ভালো ভাবনা, সেই ভাবনার তুমুল দৃষ্টিভঙ্গি, চরিত্রের ছটফটানি যেই না প্রলুব্ধ করতে শুরু করে, ভাবনার গলা খুশখুশ করে, শ্বাসকষ্ট হয়, ওমনি না ওমনি আরেকটা ঘটনার দিকে, আরেকটা ভাবনার দিকে এগিয়ে যায়। একটা ছটফটানি, আরেকটা ছটফটানির দিকে এগোয়। ফলত, কোনও ছটফটানিই বাঁচে না। একজন আরেকজনকে সঙ্গীহীন করতে করতে এগোয়। প্রত্যেকটা নতুন ঘটনার কাছে পৌঁছে মনে হয়, এটা তো ভয়ংকর। সেই ভয়ংকরতাকে আস্বাদন করার ফুরসত পেতে না পেতেই আরেক দিকে চলে যায়, এবং কারণহীন, অভিমুখহীন সেই যাওয়া।

এবার প্রশ্ন হতে পারে– কেন? এমন কি হতে পারে না যে, কারও জীবন এমনই আরেক ছটফটানি থেকে আরেক ছটফাটানির দিকে বারবার চলে গিয়েছে আর দিকভ্রষ্ট করাই তার লক্ষ্য?

উত্তর– হ্যাঁ অবশ্যই পারে। কিন্তু, সেই ছটফটানি একজন পাঠকের হবে, সেই যন্ত্রণা পাঠকের যে হবে, তা বুঝে উঠতে, তা পাঠকের শরীরে প্রবেশ করতে সময় দেওয়া যে বিপুল জরুরি। আমার ভয় করছে, আমার গলা শুকিয়ে যাচ্ছে, আমার জল তেষ্টা পাচ্ছিল গলা শুকিয়ে, এবং শেষমেশ আমি গলা শুকিয়ে তেষ্টায় মরে গেলাম। এই গোটা জার্নিটায় আমার কষ্টের আভাস আমি কতটুকু দিতে পারলাম? কতটুকু জায়গা দিলাম আমি পাঠককে, আমিও বা পাঠকের গলা টিপে ধরার সময় দিলাম কই নিজেকে? অর্থাৎ, আমার ভয় করছিল। তার আগে কী করছিল, এবং ভয়ের পর কী কী হচ্ছে, গলা শুকিয়ে যাওয়ার পর তাকে ভেজানোর জন্য আমি কী কী উপায়ে জল খোঁজার চেষ্টা করেছিলাম, আমি যে শেষমেশ মরে গেলাম, তার আগে বেঁচে ওঠার জন্য কতখানি নাছোড় ছিলাম আমি– সেটাই আমার গল্প। তার ছোট ছোট ডিটেলে আমার চরিত্র ফুটে ওঠা, আমার ভালো গুণ–খারাপ গুণ জেগে ওঠা, আমার হতে চাওয়া এবং না হয়ে ওঠার নিজের প্রতি মাৎসর্য্য… এই বলে ওঠাগুলো না থাকলে, একটাই ভালো দিক থাকে– পাঠকের ভাবনার স্পেস বেড়ে যায়। সে যা কিছু ভাবে ওই ভয়–তৃষ্ণা–মৃত্যুকে যে কোনও বিন্দুতে ফেলে যেমনভাবে খুশি লাইন টানতে পারে।

লুকোচুরির সেই ঘটনার কথাই যদি ধরে নেওয়া যায়।

‘–যাকে অপেক্ষা করতে বলা হয়েছিল, সে অপেক্ষা করতে করতে করতে করতে মরে গিয়ে পচে গলে গেছে।

–সেই চোর?!

–হ্যাঁ।

–তারপর!

–আঁতকে উঠে দেখলাম সেটা আর কেউ নয়, আমিই। আমাকেই ছাদে অপেক্ষা করতে বলা হয়েছিল। আর ঘুম ভেঙে গেল।

–মৃত্যুভয়ে?

–না, অনিচ্ছাকৃত খুন করে ফেলায়… পুলিশের ভয়ে।’

আঁতকে উঠে দেখা গেল, সেই চরিত্রই, যে বক্তা, যে কিনা মরে গেছে। কিন্তু এই ঘটনার শুরুতেই তো বলা যে, তার ছোটবেলার সঙ্গে বড়বেলার লুকোচুরি। বাকিদের মুখ দেখা যায়নি। তাহলে মরল কে বড়বেলা না ছোটবেলা? আঁতকে ওঠা কাকে দেখে, কোন কারণে? পরিষ্কার হয় না। এবং তার নিষ্পত্তি করতে না করতেই ঘুম ভেঙে যায়। কেন? খুন করে ফেলার ভয়ে এবং পুলিশের ভয়ে। এই দুইজনের ভয় পুরোপুরিভাবে কেউ কাউকে কমপ্লিমেন্ট করে না সর্বাগ্রে। আইনের ধরপাকড়ের আগে বিবেক ও পাশাপাশি লোকের থেকে পালানোর যে আঁকুপাঁকু জ্বলে ওঠে, সেই দিকের নাকানিচোবানি দেখতে না দেখতেই ‘আলোর বাড়ির’ প্রসঙ্গ চলে আসে। বড়বেলার সঙ্গে ছোটবেলার লুকোচুরি– এমন এক জটিল স্বপ্নালু বিষয়কে গতি ও জীবন দিতে না দিতেই পাঠক তাকে কয়েক লাইনে মরে যেতে দেখল।

নিজের সঙ্গে নিজের লড়াই, নিজেকে বারবার মৃত্যুমুখে দেখা, অন্যের মৃত্যুতে নিজেকে জড়িয়ে ফেলার নিম্নচাপ সমস্ত কথোপকথন জুড়ে বিদ্যমান। সেখানে এই সময়ের ডিপ্রেশন, মানুষের প্রগাঢ় অস্থিরতার ধ্রুপদীহীনতা, তার ডিকনস্ট্রাকটিভ এবং ডেস্ট্রাক্টিভ ওরিয়েন্টেশন বারংবার উঠে আসে। কিন্তু উঠে আসে কেবল বক্তব্য হয়ে। কেবলই ঘটমানতার উচ্ছ্বাস ছত্রে ছত্রে। এর ভিতরে যুক্তিবাদিতা ও আবেগের মিশ্রণ কতখানি রয়েছে বা নেই, তা বিচার করার আগে, বন্ধু হিসাবে অলোকপর্ণার লেখনির উপর খানিক বিরক্তি প্রকাশ পায় ‘আলোর বাড়ি’–তে খিচুড়ির ড্রামে কুকুর পড়ে যাওয়া প্রসঙ্গে। সেখানে জানা যায় না কুকুরটি বাঁচে না মরে যায়, এবং সেটাই খাওয়ানো হয়। কিন্তু ‘কথিত আছে’ এই ‘ও যে বলল সত্যি কথা, তাহলে কি আমারই ভুল?’–মার্কা উক্তির অবতারণা আসে এমন যে, একবছর ধরে সবাই নাকি ডগি স্টাইলে পিছন মেরে গেছে কুকুর–খিচুড়ি খেয়ে। প্রথমত, কুকুরের আত্মা কীভাবে প্রবেশ করল যে শুধু ‘ডগি’ স্টাইলই মনে রইল, এবং এই অবান্তর যুক্তিহীন আবেগবিচ্যুত বক্তব্যের আনয়ন, পাঠের মেজাজ চটকে দেয়। সেখানে কমিক রিলিফের জায়গা যদিও বা থাকে, তা ফল্‌স জোক হয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে। আর ভাবনার অস্থিরতা তো বাদই দেওয়া গেল। এই বিরক্তিকে শান্ত করে পরের পাতায় যেতে দেখা যায়, আলোর বাড়িতে সুখের থাকা, কোনওদিন কোনও ঝগড়া–ঝামেলা বা চিৎকার শুনতে না পারার কথা বলে ওঠে ওই বক্তাই। বাড়িতে কোনও ঝামেলা হতেই টিভি চালিয়ে দেওয়া হত এবং ভলিউম বাড়িয়ে দেওয়া হত ঝামেলার তীব্রতা অনুযায়ী। আলোর মা আলোর ভাই মারা যাওয়ার পর টিভি চালিয়ে দিল, আলোর রেজাল্ট ভাল হয়নি, তিনটে বিষয়ে ফেল, ঘরে এসে টিভি চালিয়ে দিল– কিচ্ছু হল না। বেশ। তারপর? এই কথা বলার জন্য খিচুড়ির গল্প দেওয়া কেন? টিভির সঙ্গে মানুষগুলোর চিৎকার বা আবেগ সংযমের সম্পর্কই বা কীভাবে জড়িত, সেদিকে প্রক্ষেপিত হয় না আর… ঘটনা আরেকদিকে চলে যায়।

 এই আচমন চলেইছে। লেখার মধ্যে মাঝেমাঝেই ‘?!’ চিহ্নের ব্যবহার বড় অহেতুক না কি ইচ্ছাকৃত প্রশ্ন জাগে। এই যতিচিহ্নের স্থান কেবল ‘ইনবক্স’–এ রয়েছে। তার কারণ, সেখানে কথার তোড়ে রয়েছে কথা চালিয়ে যাওয়ার তাড়া। প্রশ্নবোধক এবং বিস্ময়সূচক চিহ্নের সমাপতিত ব্যবহারের ব্যাখ্যা এমন, যা লেখা থেকেই তুলে দিলাম–

‘–বয়স থাকতে একটা দাতব্য চিকিৎসাকেন্দ্র খুলেছিলাম বন্ধুরা মিলে।

–সমাজসেবা?!

–ওই আর কি…’

দ্বিতীয় কথার সম্পূর্ণ নির্যাস হতে পারে এমন– ‘সমাজসেবা? মানে, ঠিক বুঝলাম না!’ কিংবা ‘ বলো কী! সমাজসেবা?’ এরকমই কিছু একটা নিশ্চয়। মেসেজ যখন দুজন লিখছে, তখন তা দুজনেরই, কিন্তু বই আকার এবং সাহিত্যরূপের সঙ্গে কিছু বৈপরীত্য নিশ্চয় রয়েছে কথাকে লিখে ওঠায়। মৌখিক সাহিত্য এবং লেখসাহিত্য দুটো কখনও কখনও এক হতে পারে বটে, কিন্তু মোটেই একত্র করা তাদের যায় না। এইটুকু অনুবাদ না থাকলে চরিত্র হারায়, বলে আমার একান্ত ধারণা। এবার, লেখক অলোকপর্ণা কোনও পরীক্ষা–নিরীক্ষা করেছে কি না, তা লেখকই বলতে পারেন।

এই উধৃতির মধ্য দিয়েই এক জায়গায় পৌঁছই–

‘–অসুখ কীভাবে ওষুধ হয়ে যায়… তাই না?

–ঠিক।

–আজকাল খুব ক্যাথারসিস হয় জানো,

–রোমহর্ষ?’

‘ক্যাথারসিস’ শব্দটি এরপর আরও অনেকবার আসা–যাওয়া করে লেখার পরবর্তীতে। কিন্তু ‘ক্যাথারসিস’ আর ‘রোমহর্ষ’ কি এক? ক্যাথারসিস–এর বাংলা তর্জমা ‘ভাব মোক্ষণ’। অ্যারিস্টটল তাঁর কাব্যতত্ত্বে ট্র‌্যাজেডির লক্ষ্য সম্বন্ধে বলেছিলেন যে, নাটকীয় উপস্থাপনায় এমনসব ঘটনাবলী থাকবে যা দর্শকচিত্তে উদ্রেক করবে ‘pity’ অর্থাৎ করুণা এবং ‘fear’ অর্থাৎ ভয়, যাদের সম্মিলিত পরিণামে অনুভূতিমালার ‘মোক্ষণ’ ঘটবে। দর্শক এক শান্ত, স্বাস্থ্যকর মানসিক ভারসাম্যে উপনীত হবে। এই জার্নির মধ্যে ঘাম দেওয়া, কেঁদে ফেলা, গা চুলকনো, যে কোনও মুদ্রাকেই ধরে নেওয়া যেতে পারে। লোম খাড়া হওয়া তার এক ‘বাই পার্ট’ বলা যেতে পারে।

অ্যারিস্টটলের কথাকে এনে বলি, অলোকপর্ণার এই লেখায় ট্র‌্যাজেডিধারায় যে ক্যাথারসিস বা মোক্ষণ বা purgation–এর জন্য দর্শকের কথা বলেছেন, তার মানে দর্শকের আসনের কথাও ভেবেছিলেন। অর্থাৎ স্পেস ছিল। কিন্তু, কোথায় গিয়ে এই স্পেসটাই পাঠক বারবার হারাচ্ছে, যেখানে বইটি বিরতিহীন এবং তারচেয়ে বড় কথা ভাবনার জায়গায় নিরবচ্ছিন্ন থেকে পড়ে যাওয়ার জায়গা প্রায় হারিয়ে ফেলি মাঝেমধ্যে। অথচ, প্রত্যেকটা ট্র‌্যাজেডি, প্রত্যেকটা ঘটনা এক–একটা উপন্যাসের খসড়া। প্রত্যেকটা ভাবনা যন্ত্রণার একটা একটা দিক খুলে উত্তরণের কথা বলতে উদগ্রীব, শুধু তাদের একটু খেলতে দিতে হত। পাঠক কিছু যে ভাববে, এবং ভুল বা ঠিক ভাববে, এইটুকু শ্বাস নেওয়ার সময় দিতে না দিতেই বক্তার কোনও একজন সিদ্ধান্তে চলে আসে কিংবা প্রসঙ্গ পাল্টে দেয়। কিন্তু এটা করে, শুধুমাত্র দুই বক্তার কোনও একজন হয়ে উঠতেই পারত, তার কথায় উঠতে বসতে, মানতে চলতে পারত পাঠক। তা হতেও পারল না, কারণ, প্রসঙ্গ বারবার দিক বদলালো। চরিত্রের কড়ে আঙুল ধরার সুযোগও হল না।

‘চাঁদ আমায় আহত করে, চন্দ্রাহত।’ এমন এক প্রবল উক্তির পর ‘পূর্ণিমা’ শব্দের যারপরনাই ভুল বানান, পাঠককে চন্দ্রাহত করে নিশ্চিত। এই অবহেলার দিকটিও বইয়ের ক্ষেত্রে তুলে ধরার। লোম খাড়া হয়, ‘খাঁড়া’ হয় না– এই ভুলচুক তেমন কিছু বড় কথা না হলেও, অস্বস্তি দেয় অকারণ।

দুর্ঘটনার এবং ট্র‌্যাজেডির হন্যে হয়ে এপাশ–ওপাশ করার মধ্যে, এই ইমব্যালেন্স কেন ইমব্যালেন্স, তার নির্মাণে এই কথা বলতে হয়– ‘ট্র‌্যাজেডির একটি বিশেষ সুবিধে হল যে, স্বল্পদৈর্ঘ্যের মধ্যেই ট্র‌্যাজেডি তার উদ্দেশ্য সিদ্ধ করতে পারে। যা বিস্তারিত এবং বিচ্ছুরিত, তার চেয়ে যা সংহত এবং ঘনীভূত, তার আবেদন অনেক বেশি।’ ঘনীভূত করতে গিয়ে খানিক বিচ্ছুরিত হয়ে গেল এই পুস্তিকা। সংহত করতে গিয়ে বিস্তারিত হল তার দিকবদল ও স্থৈর্যহীনভাব। পাঠক লেখকের দূরদৃষ্টি চায়, আর চায় উত্তরণের রাস্তার আভাস। লেখকের ভাবনায় তখন দর্শন প্রস্ফুটিত হয়। একজন মানুষ জীবনে অনেক কষ্ট করল ও পেল, কিন্তু তা থেকে কোনও রাস্তা খুঁজল না। তার কষ্ট পাওয়ার আনন্দ অর্থাৎ ট্র‌্যাজেডি দেখে নিজেই নিজের জীবনের দিকে তাকিয়ে নিজের জীবনের দর্শক হয়ে মোক্ষণ পাবে কি? এই প্রশ্ন আমায় এই পুস্তিকা শেষ করার পর খানিক কুরেকুরে খাচ্ছে।

এত ভালো ভালো লাইন, ভাবনা, আইডিয়া, স্বপ্ন কেবল বসে থাকে। সম্ভাবনাময়। জেঁকেজুঁকে। একটু আলগা করলে লেখকের যে দেখা, তা আরও গাঢ় হত। কিন্তু এই বই, কেউ যদি চায়, লেখকের এক ভাবনা থেকে বাহিত হয়ে আরেক লেখার কাছে বেমালুম পৌঁছে যেতে পারে বেমালুম। তার সঙ্গে, অলোকপর্ণার উপন্যাস, গদ্য, গল্পের যে নিয়মিত পাঠক– তার কাছে, যে অলোকপর্ণাকে জানতে চায়, নিজের ইচ্ছেমতো অলোকপর্ণার ভাবনার মস্তিষ্ক ধরে নাড়িয়েচাড়িয়ে দেখতে চায়, তার কাছে ‘দাস্তানগো’ অলোকপর্ণার ভাবনা–অভিধান, ভাবনা–কোষ। এই বইচারা আমায় অলোকপর্ণার অন্যান্য লেখা, অতীতের এবং আগামীর দুই কালের লেখাকেই আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি ও কৌতূহল দিয়ে চলেছে।

সেই কৌতূহল বুঝে উঠতে, এই পুস্তিকার পাতায় মুখ গুঁজতে হবে, যা ট্রেনে–মেট্রোয়–বাসে যেতে যেতে পড়তে একটুও অসুবিধে হবে না।

 



দাস্তানগো

লেখক- অলোকপর্ণা

প্রকাশক- আঙ্গিক (কলকাতা)

মুদ্রিত মূল্য- ৫০ টাকা।

লেখা সম্পর্কে মন্তব্য

টি মন্তব্য