home প্রবন্ধ কি লিখি; কেন লিখি? (অহম ও অশ্রুমঞ্জরী — নির্মাণ ও অন্যান্য প্রসঙ্গ) ।। অনুপম মণ্ডল

কি লিখি; কেন লিখি? (অহম ও অশ্রুমঞ্জরী — নির্মাণ ও অন্যান্য প্রসঙ্গ) ।। অনুপম মণ্ডল

অনুপম মণ্ডল। কবি। তার দ্বিতীয় কবিতার বই ‘অহম ও অশ্রুমঞ্জরী’ প্রকাশ হতে যাচ্ছে। কবিতাগুলোর নির্মাণ একটা বিষয় বটে; অনুপম এই লেখায় নিজের লেখার কারণ অনুসন্ধান করেছেন। যাকে বলা যায় নিজেকে খোঁজা বা আত্মানুসন্ধান। নিজেকে কৈফিয়ত দেয়া নিশ্চয় সাধারণ কিছু নয়।



মৌলিক চাহিদার বাইরে যদি কোন বস্তু সমরূপ চাহিদা সৃষ্টি করতে পারে তবেই কি তাকে আমরা শিল্পবস্তু বলবো? এক ক্ষুধার্তকে যদি অন্নের স্থলে পিকাসোর ছবি দান করা হয় তবে সে তার কি মুল্য নির্ধারণ করবে? যদি ছবিটার সঠিক মূল্য সম্পর্কে তাকে ওয়াকিবহাল করা হয়, তবু…… আমার ধারণা ছবিটার স্থলে সে অন্নই পেতে চাইবে। অন্নের থেকে তার কাছে সুন্দর আর কিছুই হতে পারে না। সেই হেতু আজকের এই অবক্ষয়ের পিছনে আমাদের দীনতাকেই দায়ী করতে চাই। জানালার বাইরে একটা বৃক্ষ, দিনমান তার হলুদ পাতাগুলো ঝরিয়ে চলেছে। একটু পাশ ফিরলেই এই দৃশ্য চোখে পড়ে, কিন্তু আলস্য, দারিদ্রতা আমাদের পাশ ফিরতে দিচ্ছে না।

 

যেভাবে নির্মিত হয় আঁধারের স্বরঃ

যখন কেউ বলেন ‘শিশিরের শব্দের মতন সন্ধ্যা নামছে’ তখন এই অনুভূতির সম্মুখে দাঁড়িয়ে কেবলি মনে হয়- এ যেন মৌনতার সাধনা, সাধুর ধ্যানের গভীরে যে অখণ্ড নীরবতার জন্ম, এ তারই অনুসন্ধান, একটা পরিত্যক্ত দীঘি, চারপাশে অজস্র গাছ, লাল আর হলুদ পাতা ঝরে ঝরে পড়ছে। আর রাখালেরা গাভীদের নিয়ে… দিনের শেষ আলোয় ভিজে যাচ্ছে সবকিছু। বাক্য যদি তাকে ধারণ করতে পারে, তবে, তাকেই নৈঃশব্দের নির্মাণ বলা যেতে পারে।

ধরা যাক কোন সুর, যা শান্ত, স্তব্ধ, নিথর শুয়ে আছে যেন… ভেতরে অজস্র রাগ-রাগিনির বিচ্ছুরণ। আমাদের জাগরণের মধ্যে যে অবচেতনের লিংক সদা ঘুমন্ত, তার সাথে এক ধরনের কম্যুনিকেশানের চেষ্টা। একটা আলো, নরম অথচ তীব্র, আমাদের যাবতীয় বোধগম্যতাকে পেরিয়ে, অন্য কোন এক দুর্বোধ্যতার দিকে এগিয়ে চলেছে। ঐ আলোটির নির্মাণই গেঁথে তোলে আঁধারের স্বর।

 

নিদ্রার ভাষাঃ

রাস্তায় যেতে দেখি কিছু ঘাস, তার গলা অব্দি জলে ডুবে ঠায় দাঁড়িয়ে রয়েছে। মাঝে বাতাস এসে কাঁপাচ্ছে তাকে। তবু স্থানচ্যুত করতে পারছে না। কেননা, তার শেকড় মাটিতে প্রোথিত। ঘাসের উপরটা দেখেও সত্যটা বুঝে নেয়া যায়।  কল্পনা করতে শেখা।

কুমোর বা ভাস্কর গল্পছলেও তৈরি করে ফেলে হাড়ি, প্রতিমা। এ হলো অনুশীলন। যে প্রকারে পাখি, একটু একটু করে উড়তে শেখে। রুচিটা আগেই তৈরি হয়, আস্তে আস্তে… তারপরে একাগ্রতা।  ভাষাটা এইভাবেই গড়ে ওঠে।

 

অলিভ পাতার পাশেঃ

কর্ণের রথের চাকা মাটিতে ঢুকে গেছে। সে প্রাণপণ ঐ চাকা ভুমির উপরে ওঠানোর চেষ্টা করে চলেছে।  সম্মুখে দেখা যায়, অর্জুন। গাণ্ডীব হাতে দাঁড়িয়ে রয়েছে। ভাবি, কেউ যদি এই দৃশ্যের বর্ণনা করতে চান, তবে তার ভাষা কিরূপ হবে। যদি কেউ বৃক্ষের পাতা আঁকতে নীল আর আকাশ আঁকতে সবুজ রঙের প্রধান্য দেন, তবে ফিগারটা কেমন দেখাবে। লক্ষ্যভেদ করতে গেলে জ্যা-টাকে টেনে আনতে হয়। তো এই জ্যায়ের পূর্ব ও পরবর্তী অবস্থা দুই মিলেই আমার কাছে তার ক্ষেত্র।

 

আঁধার নিভে আসেঃ

‘মানুষের সৃষ্টি করা শিল্পকে বুঝতে যদি সাধনার দরকার এটা বুঝি, তবে সৃষ্টিকর্তার এই সৃষ্টি রচনার ভিতরে ও বাইরের রহস্য বুঝে চলার জন্যে শিল্পী-মানুষকে কতখানিই না সাধনা করতে হয়’।  এই প্রশ্ন অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর তুলেছিলেন। শিল্পস্রষ্টা হচ্ছে ঈশ্বর ও মানুষের মাঝে সম্পর্ক স্থাপনকারি এক তৃতীয় ব্যক্তি বিশেষ, যিনি সৃষ্টি রহস্যের একটা বিশেষ রূপ আমাদের সম্মুখে উন্মোচন করেন।

 

সন্ধ্যা নামার পরেঃ

প্রতিমা তৈরির আগেই তার একটা কাঠামো তৈরি করা হয়। তারপর উপযুক্ত মাটি খুঁজে এনে তার উপর প্রলেপ দেয়া, মাটি শুকিয়ে গেলেই রং টানা হয়। কবিতা নির্মাণের কৌশল আমার কাছে এমনই। যখন অনুভূতি চাপ প্রয়োগ করছে, কবিকে তখন শব্দের অন্বেষণ করতে হয়। তারপর একটু একটু শব্দ গেঁথে কবিতার কাঠামো নির্মিত হয়ে থাকে।

তবে ব্যতিক্রম যে নাই তাও বলা যায় না। কখনও শব্দ বা বাক্য, দৃশ্য বা ইমোশান তৈরি করে ফেলে।

তবু ওই যে রসের ধারা, ওই সুন্দর, তার সাথে অসুন্দর মিলিয়ে অপরূপের দিকে যাত্রা তবু তৃষ্ণা মিটছে কই? মূলত এইটাই প্রকৃতির নিয়ম। এবং শেষ পর্যন্ত এইটাই মানুষের নবতর শিল্পকৌশল সৃষ্টির প্রেরণা দিয়ে চলেছে। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কিছু কথা টেনে শেষ করছি……

“এই যে প্রকৃতির অকাট্য নিয়ম, একে অতিক্রম করে পরিপাট্যে পরিছন্নতা পূর্ণতা দেওয়া এবং পরিপূর্ণ সুন্দরকে প্রত্যক্ষ রূপ দেয়া কোন আর্টিস্টের দ্বারা সম্ভব হয়নি এ পর্যন্ত, হবেও না কখনও। অপূর্ণ সৌন্দর্য আশা জাগাচ্ছে পূর্ণতার মানুষের মনে। এই পর্যন্ত হল মানুষের শিল্প রচনার কৌশল।”

লেখা সম্পর্কে মন্তব্য

টি মন্তব্য