home আলাপচারিতা কবি হাসনাত শোয়েবের সঙ্গে আট কবির আলাপচারিতা ।। দ্বিতীয় পর্যায়

কবি হাসনাত শোয়েবের সঙ্গে আট কবির আলাপচারিতা ।। দ্বিতীয় পর্যায়

দেখো, যে কেবল ভালো কবিতা লিখবে বলে আসে, শুধু কবিতা লিখেই সে কাটিয়ে দিতে পারে। রাজনীতি ডিফেন্ড করা তার লক্ষ্য না। তার রাস্তা আলাদা। কিন্তু তুমি যখন রাজনীতি করবে বলেই আসো, তখন কেবল ভালো কবিতা দিয়ে তা আটকানো সম্ভবত সম্ভব না।


শিমন

দশক বিভাজনের দরকার আছে বলে মনে করো কি? থাকলে কেন?

শোয়েব

দশক দিয়ে সময়টা বোঝা যায়, প্রবণতাও। সেইটা আসলে গুরুত্বপূর্ণ কিছু না। আমাদের এখানে দশক নিয়ে মাতামাতিটাই বেশি হয়। পুরাই বেদরকারি।

শিমন

আর এই বেশি মাতামাতির কারণে দশকওয়ালারা দশক পেরনোর পরেই অতিদ্রুত পাঠকের মনোযোগের বাইরে চলে যান হয়তো

শোয়েব

হতে পারে।

শিমন

‘কবিতার রাজনীতি’ বলে একটা মোটামুটি নন অ্যাকাডেমিক টার্ম আছে। আইনের ভাষায় বলা যায় ‘ডি ফ্যাক্টো’, নট ‘ডি জ্যুর’। অর্থাৎ অন্তর্নিহিত অস্তিত্বশীল ব্যাপার আরকি। তুমি বিশ্বাস করো?

শোয়েব

বিশ্বাস অবিশ্বাস না। এইটা ফ্যাক্ট। অবশ্যই আছে। কখনো কখনো তা নোংরাও হয় বটে।

শিমন

শুধু ভাল কবিতা দিয়ে কি এই ‘কবিতার রাজনীতি’ ডিফেন্ড করা সম্ভব?

শোয়েব

দেখো, যে কেবল ভালো কবিতা লিখবে বলে আসে, শুধু কবিতা লিখেই সে কাটিয়ে দিতে পারে। রাজনীতি ডিফেন্ড করা তার লক্ষ্য না। তার রাস্তা আলাদা। কিন্তু তুমি যখন রাজনীতি করবে বলেই আসো, তখন কেবল ভালো কবিতা দিয়ে তা আটকানো সম্ভবত সম্ভব না।

শিমন

বিশেষ কোন পেশার সঙ্গে কবিতা লেখা সাংঘর্ষিক হয়ে উঠতে পারে কি, কিংবা কবিতাবান্ধব পেশা আসলে কী হতে পারে?

শোয়েব

সাংবাদিকতা বিশেষ করে সাহিত্যপাতা সম্পাদনা ব্যক্তির মৌলিক সাহিত্যকে দারুণভাবে ক্ষতি করে বলে আমার ধারণা। আর বান্ধব পেশা হচ্ছে তোমার বাপের ভাড়ার ঘর থাকা। তাইলে নিশ্চিন্তে কবিতা লেখা যেতে পারে।

শিমন

একগামিতা তো এক ধরণের প্রকৃতিবিরুদ্ধতা এবং রুদ্ধতা। এরকম রুদ্ধ সম্পর্ক কবির জন্য কতোটা স্বাস্থ্যকর?

শোয়েব

আমার তা মনে হয় না। আর এইটা ব্যক্তিরূচির বিষয়। কবিতার সাথে সম্পর্কিত না।

শিমন

তোমার একটা বেশ আলাদা রকম ভাষাশৈলী তৈরী হয়েছে বলে মনে হয়। ভোকাবুলারি মিথ আর ভৌগোলিক অনুষঙ্গ একটা বড় কারণ এর পেছনে। আবার তোমার প্রথম বই ‘সূর্যাস্তগামী মাছ’ এর ‘চুম্বকক্ষেত’ কবিতাটিও উল্লেখ করা যায়। শেষটা এরকম- ‘প্রতিটি সাগরের কাছাকাছি একটা চুম্বক্ষেত থাকা ভালো। পৃথিবীর কোনো চুম্বকই এখন আকর্ষণ করে না’। এই অপার্থিব চুম্বকের অপেক্ষাই তোমার কবিতার গূঢ় মদ বোধহয়।

শোয়েব

আমিও তেমনটাই ভাবতে পছন্দ করতে পারি সম্ভবত। কেউ এরকম বললে ভালোও লাগে, তাই তোমার কথাটা কমপ্লিমেন্ট হিসেবেই নিলাম।

শিমন

কনকের ব্যাপারে তুমি কিছু বলবে না বলেছো। আমার মনে হয় ঈশ্বর যে কারণে মোজেসের সঙ্গে তাঁর ভাই হারুণের শক্তি সংযোজিত করেছিলেন এমন এক কারণেই ‘কনক’ তোমাতে সম্মিলিত হয়েছে, হচ্ছে।

শোয়েব

আমি কিবা বলতে পারি!  তবে তোমার ভাবনায় আমি প্রীত হইলাম।


ওইসব আমি তেমন পড়ি নাই। সাহিত্য সমালোচনা পড়তে গিয়ে আমার ঘুম আসে। ফেলে দিছি।


হামেদী

কবিতার জন্য পাঠক কতটা জরুরি?

শোয়েব

পাঠক ভালো জিনিস। কিন্ত পাঠক ভেবে কবিতা লেখাটা ভালো জিনিস না।

হামেদী

সমালোচনা সাহিত্য সৃজনশীলতাকে প্রভাবিত করতে পারে কি না? একটা টেক্সট এস্টাব্লিশমেন্টের ক্ষেত্রে সমালোচনা সাহিত্যের ভূমিকাকে আপনি কীভাবে বিবেচনা করবেন?

শোয়েব

সমালোচনা এখানে হয় না। যা হয় কেবল পিঠ চাপড়ানো নয়তো খারিজ। এগুলো দিয়ে সাহিত্যের কোন লাভ নাই।

হামেদী

বাংলা ভাষায় সমালোচনা সাহিত্যের দীর্ঘ ঐতিহ্য আছে।আমি ঐ দিকে ইঙ্গিত করেছি। আজাইরা সমালোচনা নিয়ে আমার আগ্রহ নাই।

শোয়েব

ওইসব আমি তেমন পড়ি নাই। সাহিত্য সমালোচনা পড়তে গিয়ে আমার ঘুম আসে। ফেলে দিছি।

হামেদী

ওকে। টেক্সটকে বয়ে বেড়ান কে? সাধারণ পাঠক না বোদ্ধা সমালোচক?

শোয়েব

সে পাঠক যার কথা আপনি কখনো জানতে পারবেন না।

রোবায়েত

শোয়েব, এই ধরনের পাঠককে আমি বলি পরাপাঠক।

শোয়েব

ওইটাই আসল পাঠক।

হামেদী

সাহিত্য চর্চার ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের ভূমিকাকে আপনি কীভাবে দেখেন? মানে মিডিয়া, বিশ্ববিদ্যালয়, একাডেমি এইগুলা সাহিত্যের জন্য কতটা জরুরি?

শোয়েব

মোটেই জরুরি না। ওইগুলা জাস্ট ইউজলেস জিনিস সাহিত্যচর্চার জন্য।

হামেদী

সমাজ ও রাষ্ট্রে কী ধরনের পরিবেশ সাহিত্যের জন্য সহায়ক বলে মনে হয়?

শোয়েব

সমাজে ক্রাইসিস থাকলে সাহিত্য চর্চা ভালো হয়। নানা ভ্যারিয়েশন আসে।

হামেদী

রাষ্ট্রে শিল্পী-সাহিত্যিকদের জন্য আলাদা কোনো পল্লীর দরকার আছে কিনা? আপনি সদস্যপদ গ্রহণ করবেন কিনা ঐরকম কোনো সুযোগ পাইলে?

শোয়েব

নাহ। ঐরকম কোন পল্লীর দরকার নাই। এসবে সাহিত্যের কোন লাভ নাই।

ফয়সাল

আগে বলেন কেমন আছেন? মেলার অভিজ্ঞতা কেমন?

শোয়েব

নানা প্যারায় আছি। তবে মেলার অভিজ্ঞতা ভালোই

ফয়সাল

নাইস। আমার অবশ্য মেলাকে খুব প্রাণহীন লেগেছে। বাংলা একাডেমিকে খুব দায়সারা মনে হয়। আপনার কি ধারণা এই একাডেমি বাংলা সাহিত্যের কোন উপকারে আসছে বা ভবিষ্যতে আসবে?

শোয়েব

একধরনের উপকার হচ্ছে আমার আপনার বই হচ্ছে। মানুষ আসতেছে কিছু কিছু। এটুকু লাভ মেনে নিয়েই বলছি পরিস্থিতি দিনদিন খারাপের দিকে যাচ্ছে। ভবিষ্যত আরো খারাপ দেখছি।

ফয়সাল

আপনার এই উত্তরের সূত্র ধরেই একটা কথা জানতে চাই। সাহিত্যের সাথে রাজনীতির সংযোগ কেমন দেখেন? কবিদের কি রাজনৈতিক দায়িত্ব বা সংযোগ থাকা জরুরী? আপনার কবিতায় রাজনীতিকে আপনি কিভাবে ডিল করেন?

শোয়েব

একজন সাধারণ মানুষের যতটুকু থাকা দরকার, কবিরও থাকবে। এখানে কবি রাজনৈতিক দায়িত্ব পালন করবেন কিনা সেটা একান্তই ব্যক্তিগত ব্যাপার। কবিতা ভালো হওয়ার সাথে রাজনীতির সম্পর্ক সামান্যই। তবে থাকাটা জরুরি না। আমার কবিতাতে রাজনীতি থাকলেও তা খুব প্রচ্ছন্ন।

ফয়সাল

আমার অবশ্য স্টান্সটা ভিন্ন, আমি ধারণা করি একজন কবির রাজনীতি ও সমাজ সচেতনতা আবশ্যক। যাই হোক, সেটা আমার চিন্তা আপনাকে চাপায়ে দেয়ার কিছু নাই।

শোয়েব

সচেতনতা সবার থাকা উচিত। একা কবির থাকবে ব্যাপারটা তা না।

ফয়সাল

হ্যাঁ, তা ঠিক। কিন্তু অধিকাংশ মানুষই তো সচেতন না। কবিদের সেই অধিকাংশের মাঝে পড়া যায় না ভাবি আরকি। এইবার একটু আপনার নতুন বই নিয়ে কথা বলি। এইটা নিয়ে অনেকেই অনেক কথা বলে ফেলছেন আপনার সাথে, কোশ্চেন রিপিট হয়ে গেলে বইলেন আরকি।

শোয়েব

আচ্ছা 

ফয়সাল

বই নিয়ে কথা বলতে যেয়ে আমি কিছু বেসিক কোশ্চেন যদি করি, একটু চাঁছাছোলা, আপনি কি রাগ করবেন?

শোয়েব

নাহ। হয়তো উত্তর দেবো না। তবে রাগ করব না।

ফয়সাল

হাহা ওকে, রাগ লাগলেও বলতে পারেন, সংযত হওয়ার চেষ্টা থাকবে।

শোয়েব

হা বলেন। 

ফয়সাল

এটা করার পিছনে কারণটা বলে রাখি। যে ভাষাটার আপনি চর্চা করছেন এইটার অনেক ফাঁদ আছে, এই ভাষার, ভঙ্গিমার এবং পদ্ধতির। এবং হরহামেশাই এর ফাঁদে তরুণ কবিদের পড়তে দেখা যায়। তো আমার মনে হয়েছে তা নিয়ে একটা আলোচনা হইতেই পারে।

শোয়েব

আপনি সরাসরি প্রশ্ন করতে পারেন। আমি কিছু মনে করব না।

ফয়সাল

প্রথম যে কথাটা, আপনার লেখার মাঝে আমি অনেক অটোমেটিক রাইটিং দেখি, মানে পড়ার সময় মনে হয়। এগুলা কি অটোমেটিক রাইটিং নাকি এগুলো অনেক ড্রাফটিং এবং কাটাছেঁড়ার মাঝ দিয়ে যায়?

শোয়েব

নাহ। আমার লেখা প্রথমবাবার লেখার পর তেমন কোন এডিট হয় না বললেই চলে। দুয়েকটা শব্দ এদিক-ওদিক হতে পারে এর বেশি না

ফয়সাল

আচ্ছা এমনটাই মনে হচ্ছিলো আমার।

শোয়েব

সেইটাই

ফয়সাল

এরকমের কারণটা কি? মানে কাটা-ছেড়া করতে চান না কেন?

শোয়েব

ভালো লাগে না। একটা লেখা শেষ করা এমনিতেই অনেক প্যারার। তাকে নিয়ে আবার এডিট! দরকার মনে করি না।


কবিতাকে বোঝার জন্য থিয়োরি ইউজ করতে মন চায় না। আমি থিয়োরি দিয়ে ভাবি সিনেমা, মিউজিক এসব। কারণ এগুলা আমি চর্চা করি না। যেটা চর্চা করি সেখানে নবিস থাকতে চাই। আর নিজের ক্রিয়েশনের বিষয়ে এনার্কিস্ট না হলে নতুন কিছু সম্ভবনা।


ফয়সাল

কবিতা সম্পর্কে আমার একটা ব্যক্তিগত ধারণা আছে। সেটায় একটা মূল সূত্র মনে হয়, কবিতার ট্রিম হওয়া, কম্প্যাক্ট হওয়া। একদম প্রয়োজন ছাড়া কোন শব্দের উপস্থিতি না থাকা। সে জায়গা থেকে আপনার কিছু বাক্য, কবিতা আমি নিতে পারছিলাম না। যেমন ধরেন “ব্যক্তিগত আর্মেনিয়ান হাওয়াই গিটার”। গিটার শব্দটাকে কোয়ালিফাই করার জন্য আরো তিনটা শব্দ হাজির হলো। এইটা কি আসলে কোন ভ্যালু এড করলো কবিতায়?

শোয়েব

আমার কাছে করছে ত। আপনার কাছে নাও করতে পারে। কম্প্যাক্ট জরুরি , তবে আমার বইয়ের কবিতাগুলার জন্য ডিটেলিং আরো বেশি জরুরি ছিলো। কারণ এখানে ব্যক্তি আমি ও আমার লাইফ ছড়িয়ে আছি। এই আর্মেনিয়ান হাওয়াই গিটার আমি ছুঁয়ে দেখেছি, এইটা আমি ফিল করি। এবার পাঠকের জন্য না করলেও করতে পারে।

ফয়সাল

আই এম এগ্রিইং টু ডিসএগ্রি 

শোয়েব

হা হা হা

ফয়সাল

এই ব্যাপারটা অবশ্য পাঠে ধরা পড়তেছিলো। যে এই বইটা একটা ব্যক্তিগত ব্যাপার। আমি সাধারণত ভীষণ ব্যক্তিগত ব্যাপারগুলো লিখতে অনেক ঝামেলায় পড়ি। বাহুল্য দোষ চলে আসে মনে হয়। অনেক কঠিন একটা কাজ আমার ধারণা।

শোয়েব

অবশ্য আমার এগুলা লিখতে ভালোই লাগে। বাহুল্য চলে আসে এটা মানি। কোথাও কোথাও এটা জরুরিও মনে হয়। বাহুল্য সবসময় খারাপ ভাবতে চাই না।

ফয়সাল

কবিতার ব্যাপারে ভাস্কর সম্ভবত বলেছিলেন তার শয়নযানে, যে কবিতার লাইনে লাইনে আপাত দূরত্ব থাকলেও অনেক গভীরে যেয়ে একটা সংযোগ থাকতে হয়। এই বিষয়টাকে আপনি কিভাবে দেখেন, আপনার কবিতা এগুলো কিভাবে ডিল করে?

শোয়েব

আমি এসব ডিলই করি না। আমার কবিতা নিয়ে এসব থিয়োরিটিক্যাল আলোচনা পড়ে বা মেনে কবিতা লিখতে ভালো লাগে না। যা মন চায়, যেভাবে মন চায় লিখতে ভালো লাগে।

ফয়সাল

আচ্ছা, হতেই পারে, কোন সমস্যা নাই।

শোয়েব

আমি এভাবে ভাবি কিংবা কিছুই ভাবি না আর কি।

ফয়সাল

লাস্ট থিওরিটিক্যাল প্রশ্ন তাহলে। আপনার কবিতার একটা ডিফাইন করে দেয়ার টেন্ডেন্সি আছে। আই মিন অমুক মানে তমুক, এটা মানে সেটা। একটা নতুন অর্থ জুেড়ে দেয়া শব্দের সাথে, বাক্যের মাঝে। এইটা কেন?

শোয়েব

আমি আসলে নিজেকে নিজেই এক্সপ্লেইন করি এভাবে। মানে নিজেকে বিশ্বাস করানোর চেষ্টা আর কি। আরেকটু কনফিডেন্ট হওয়াও।

রোবায়েত

শোয়েব, আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ এর কবিতা পড়ছো? ‘আমি কিংবদন্তির কথা বলছি’ এই লেখাটা?

শোয়েব

পড়ছি। অনেক আগে

রোবায়েত

‘হাওয়াই গিটার’ কবিতার একটা লাইন আছে ‘আমি কিংবদন্তির কথা বলছি’র সাথে প্রায় মিলে যায়।

‘তাঁর পিঠে রক্তজবার মত ক্ষত ছিল।’ এইটার সাথে।

‘আমার সারা পিঠে রক্তকরবীর শেষ দৃশ্য এঁকে দিয়েছিলি’

তোমার কী মনে হয়?

শোয়েব

নাহ। রোবায়েত এটা মিল মনে হচ্ছে না। দুইটার টোনও সম্পূর্ণ আলাদা। তোমার মনে হলে সেটা কাকতালীয়। এটার কথা আমার মাথায় ছিলো না

রোবায়েত

ফয়সাল ভাইয়ের কী মনে হচ্ছে? যে লাইনটা কোট করলাম ঐটা আর শোয়েবের লাইনটার ব্যাপারে?

ফয়সাল

আমার কাছে এই দুটো লাইনকে একরকম মনে হয় নাই আসলে রোবায়েত।

হামেদী

আমার মনে হয় আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর লাইনটাতে মিনিং নির্দিষ্ট।কিন্তু শোয়েবের লাইনটা অনেক বেশি মুক্ত।নানা কিছু কল্পনার সুযোগ আছে।হয়তো ‘পিঠ’ আর ‘রক্তকরবী’র কারণে এক মনে হতে পারে।কিন্তু দুইটার অভিমুখ আলাদা।

রোবায়েত

আমার অবশ্য হইছিল রক্ত আর পিঠ শব্দটার কারণে। পরে ভেবে দেখলাম, রবি ঠাকুরের রক্তকরবীর শেষ দৃশ্য ব্যাপারটাকে আলাদা করে ভাবায়।সো, এইখানেই শোয়েব আলাদা হয়ে ওঠে।

ফয়সাল

সেটাই, রক্তকরবী আর শোয়েবের অনুষঙ্গ আলাদা

ফয়সাল

সবাই তো পছন্দের কবির কথা জানতে চায়, আমি একটু উলটা করে বলি। বাংলা সাহিত্যের কিছু তালেবর কবি আছেন, যেমন জীবনানন্দ, রবীন্দ্রনাথ, বিনয় , শক্তি, ভাস্কর ইত্যাদি। বা হাল আমলে মাসুদ খান, মজনু শাহ, সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ ইত্যাদি। এরকম কার কার কবিতা ভালো লাগে না? এবং কেন লাগে না?

শোয়েব

রবীন্দ্রনাথ, ভাস্কর, অগাস্টিন গোমেজ অত পছন্দ না। কিছু কিছু ভালো লাগে তাদের। ঠিক পছন্দ যে অর্থে তেমন না। বাকি নামগুলা খুবই পছন্দের

ফয়সাল

আমি নামগুলো জাস্ট বুঝানোর জন্য বললাম। এর বাইরেও হতে পারে। আমি জানতে চাইছিলাম এরকম হাই প্রোফাইল কারো কবিতার ধারাকে আপনি ডিজওউন করেন কিনা? এবং করলে কেন করেন?

শোয়েব

আপনি স্পেফিসিক বলেন আমি উত্তর দিচ্ছি। মানে আপনি কারটা শুনতে চাচ্ছেন?

ফয়সাল

স্পেসিফিক কারো না। আমি আসলে আপনার প্রসেসটাকে ধরতে চাচ্ছি। আপনি যেহেতু থিয়োরিটিক্যাল আলোচনায় যাচ্ছেন না এই জন্য একটু ব্যাকাত্যাড়া ভাবে চেষ্টা করলাম আরকি!

রোবায়েত

আমিও ঐ জন্যই প্রশ্নটা করছিলাম। হা হা


আমার কাছে পৃথিবীর সবচে বড় রকস্টার হলো জেমস। এর ওপরে কোন সত্য নাই। আমি বাংলা রক মিউজিক ধারণ করি। আমি নয় বছর ব্যান্ড করছি। বেজ গিটার বাজাইছি। ব্যাপক সেক্রিফাইস করছি। সেইটা ফেইল করছে। কিন্তু আমার এই জার্নিটাই আমাকে রকস্টার হইতে প্রভাবিত করে।


ফয়সাল

আই মিন কোন ধরনের কবিতা আপনার ভালো লাগে? কোনটা লাগে না? এই ভালো লাগা না লাগার পেছনে কার্যকারণ কি? শুধু আমার এমন মনে হয় বা লাগে আসলে খুব পিছলে যাওয়া আন্সার হবে।

শোয়েব

জীবনানন্দ, বিনয়, উৎপল, মজনু শাহ, সিকদার আমিনুল হক, মান্নান সৈয়দ এদের ভালো লাগে।এই ধরনের কবিতার সাথে আমি নিজেকে রিলেট করতে পারি। আর একটা বিষয় হলো কবিতাকে বোঝার জন্য থিয়োরি ইউজ করতে মন চায় না। আমি থিয়োরি দিয়ে ভাবি সিনেমা, মিউজিক এসব। কারণ এগুলা আমি চর্চা করি না। যেটা চর্চা করি সেখানে নবিস থাকতে চাই। আর নিজের ক্রিয়েশনের বিষয়ে এনার্কিস্ট না হলে নতুন কিছু সম্ভবনা। আমার মত আর কি! সবার জন্য নাও হতে পারে। সেজন্য আমি কবিতা বিষয়ক গদ্য পড়ি না । বোরিং লাগে, টেস্ট নষ্ট হয়।

রোবায়েত

আমি একটা প্রশ্ন করি। ইন্ডিয়ান ক্লাসিক মিউজিক কেমন লাগে?

শোয়েব

জোস লাগে। আমি নিয়মিত শুনি। কারো কারো ইন্টার্ভিউ অনুবাদও করছি।

রোবায়েত

কিন্তু তুমি তো হইতে চাও রকস্টার? এইটা কেন?

ফয়সাল

আমার তো মনে হয় উল্টা, যেটা চর্চার জায়গা সেখানে তো আর্সেনালে সব ধরনের গোলা বারুদের মজুদ রাখা চাই

শোয়েব

নাহ। ফয়সাল ভাই। আমার মনে হয় না। আমি কবিতা লিখতে আসছি, যুদ্ধ করতে আসিনি।

ফয়সাল

আবারো আই বেগ টু ডিফার। উইথ অল ডিউ রেস্পেক্ট আরকি 

শোয়েব

(রোবায়েতের উত্তর) শুনো আমি সব ধরনের মিউজিক শুনে বড় হইছি। এমনকি কমার্শিয়াল হিন্দি সিনেমারর গানও আমার ভালো লাগে, আবার ধরো ড্রিম থিয়েটার, জিম মরিসন, বব ডিলান, অঞ্জন দত্ত কিংবা সিস্টেম অব ডাওন এরাও আমার পছন্দের। কিন্তু আমার কাছে পৃথিবীর সবচে বড় রকস্টার হলো জেমস। এর ওপরে কোন সত্য নাই। আমি বাংলা রক মিউজিক ধারণ করি। আমি নয় বছর ব্যান্ড করছি। বেজ গিটার বাজাইছ। ব্যাপক সেক্রিফাইস করছি। সেইটা ফেইল করছে। কিন্তু আমার এই জার্নিটাই আমাকে রকস্টার হইতে প্রভাবিত করে।

রোবায়েত

আচ্ছা, জেমসের গানগুলো ঐ রকম ফাটাফাটি লিরিক আর বাজানো ছাড়া হইতো! মানে ধরো, যারা জেমসের গানের লিরিক লিখছেন, তার সঙ্গে বাজাইছেন তাদের কথা কেন বলা হয় না! সব ক্রেডিট একলাই গোজ টু জেমস! এইটা কী মনে হয় তোমার?

শোয়েব

জেমস জেমসই। জেমসের গান জেমসের গান। কি ছাড়া কি হইতো সেইটা অবান্তর। সে হয়ছে মানে তার হইছে।

রোবায়েত

আমার সেইটা মনে হয় না। তার সাথে যারা বাজাইছে তারাও মোস্ট ইমপরট্যান্ট। আর এইটা যেহেতু ব্যান্ড তাই একলা হওয়ার চান্সই নাই। সঙ্গীতের এই ব্যাপারটা খুবই ফালতু যে সব ক্রেডিট গায়কের কাছে যায়।বাকিরা মনে হয় ধইঞ্চা!

ফয়সাল

আমার মনে হয় জেমসের একটা পার্সোনা আছে যেইটার মেজর ইম্প্যাক্ট পড়ছে। বাকি মেম্বাররা ঐটার সাথে কুলায়ে উঠতে পারে না।

শোয়েব

রোবায়েত এটা তারা জানে। জেনেই আসে। আমি বেইজ গিটার বাজাতাম আমার ভালো লাগা থেকে। এইটা ব্যান্ডের সবচেয়ে আন্ডারস্টিমিট হওয়া ইন্সট্রুমেন্ট। তুমি যা ভাবো তারা তা ভাবে না। এইটা একটা প্রেমের ব্যাপার ইনস্ট্রুমেন্টসের সাথে।


সংগীতের একটা ধারা তৈরি হইতে কিছু কার্যকরণ লাগে। যে কারণে আমাদের ব্যান্ড হইছে। বাংলা ব্যান্ড এশিয়ায় অন্যতম। কারণ, রকের জন্য যে হাহাকার মুক্তিযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর সেই গ্রাউন্ড তৈরি হয়ছিলো। নয়তো হতো না।


রোবায়েত

ব্যান্ড মিউজিকে, আফটার অল সব মিউজিকেই আসলে গায়কেরই পার্সোনা দেখানোর সুযোগ বেশি ফয়সাল ভাই। আর আমি কিন্তু দলের সদস্যদের ডেডিকেশন বা চাওয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলিনি শোয়েব। আমি কইতে চাইছি, একলা মিউজিকে কিছু করা প্রায় অসম্ভব।

ফয়সাল

সুমন তো আবে বেজ দিয়াই রকস্টার, ইন্সট্রুমেন্টের চেয়ে প্যাশনটাই বরং বড় পাওয়ার আই গেস।

শোয়েব

সেটা জেনেই তারা ব্যান্ড করে যে, সবার সমান সেলেব্রিটিশিপ হয় না।

ঐডাই ফয়সাল ভাই। প্যাশনটাই ব্যাপার।

রোবায়েত

গজল শোনো শোয়েব?

শোয়েব

শুনি অনেক সময়। জগজিৎ সিং আমার পছন্দের আর উস্তাদ সুজাত হুসেন খান।

রোবায়েত

একটা ভিন্ন প্রশ্ন করি।

শোয়েব

ওকে

রোবায়েত

এই যে ধরো, উর্দু আর হিন্দিতে এত গজল হইলো বাংলায় সেইটা কেন হইলো না বলে তোমার মনে হয়?

শোয়েব

ওদের লালন হয় নাই, পল্লীগীতি হয় নাই যে কারণে, সেই একই কারণে। সবার সব হবে এমন না। সংগীতের একটা ধারা তৈরি হইতে কিছু কার্যকরণ লাগে। যে কারণে আমাদের ব্যান্ড হইছে। বাংলা ব্যান্ড এশিয়ায় অন্যতম। কারণ, রকের জন্য যে হাহাকার মুক্তিযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর সেই গ্রাউন্ড তৈরি হয়ছিলো। নয়তো হতো না। আমার ধারণা আর কি।

রাসেল

এই উত্তরটা চরম হইছে!

রোবায়েত

ওদের লালন হয় নাই এ কথাটা নিলাম না। ওদের বুল্লে শাহ হইছে। প্রায় একই ধরনের। তারপর ধরো, পাকিস্তানি, রাজস্থানি ফোক তো ব্যাপক। আর আমার প্রশ্নটার আরেকটা গ্রাউন্ড আছে। ক্লাসিক মিউজিকের ব্যাপক চর্চা যারা করছেন। গুরু লেভেলের যারা তাদের অনেকেই কিন্তু বাংলার লোক। তাইলে সেই ঘরানাটা এইখানকার হওয়া সত্ত্বেও কেন গজল বা ক্লাসিক ঘরানা এইখানে বিকশিত হইলো না!

শোয়েব

ফোক আমেরিকাতেও আছে। ওদেরও পিট সিগার আছে। সেইটা ব্যাপার না। ক্লাসিক্যাল মিউজিক মূলত দরবারী সংগীত। এখানে দরবার বসত না। ওইখানে বসত। চর্চাটা ওখানে ঘিরেই হইছে। ওইটা তাদের মাটি থেকে হইছে। এখানে হতে গেলে কিছু কার্যকারণ লাগতো, সেগুলা তৈরি হয় নাই। তাই এখানে অন্যকিছু চর্চা হয়ছে, ক্লাসিকাল মিউজিক হয় নাই। সামনে হলেও হতে পারে যদি কার্যকারণ সম্পর্ক তৈরি হয় আর কি । আর একটা কথা হলো লালন আর বুল্লে শাহ মোটেই একধরনের বলে আমি মনে করি না।

রোবায়েত

ক্লাসিক মিউজিকের জন্য যে সময় আর ডেডিকেশন প্রয়োজন সেইটা এখানকার শিল্পিরা খুব একটা দেন না। নতুন একটা দেশ যখন হইলো, যার সব কিছুই রাইজিং, সেখানে সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়লো নিজের স্ট্যাব্লিশমেন্ট নিয়ে। দ্রুত প্রাপ্তির আকাঙ্ক্ষা কইতে পারো। যার জন্য শর্টকাট রাস্তার দিকেই বেশি ঝুঁকে পড়লো। আর মিডিয়া পাব্লিকের নার্ভ নিয়া যেহেতু ব্যবসা করে তারাও আর ক্লাসিক ব্যাপাররে প্রোমোট করলো না। আর ভাষাও এইখানে একটা বিরাট ব্যারিয়ার তৈরী করে। মিডলক্লাসের ভাষা, তারপর ধরো তিরিশের আধুনিকতা এইসব মিলে গজলের জন্য যে নম্র ভাষাটার প্রয়োজন সেইটাও কেউ চর্চা করলো না। সব মিলিয়েই এখানে ঐদিকে আর যাওয়া হই নাই।

শোয়েব

এইটা ফ্যাক্ট। ডেডিকেশন সবকিছুর জন্য লাগে। যদি সুপ্রিম কিছু হইতে হয়। আমি শুনছিলাম, কোন এক গিটারিস্ট (নাম ভুলে গেছি) দিনে আঠার ঘণ্টা পায়ে গিটার রেখে গিটার বাজাত বলে পরে পা কেটে ফেলতে হইছিলো। বালছাল ক্লাসিক্যাল মিউজিক এখানেও অনেকে করে। সুপ্রিম সবাই হতে গেলে ডেডিকেশন মাস্ট। সেটা যেখানেই হোক না কেনো। তবুও তোমার কথার সাথে কিছুটা এগ্রি করি।

রোবায়েত

বড়ে গোলাম আলী খাঁর এমন সাধনার কথা পড়েছিলাম এক জায়গায়।

অদ্ভুত সেইটা।

শোয়েব

তাই ওনি বড়ে গোলাম আলী। ইনফেক্ট অনেকেই। কিন্তু হয় নাই একরমও অনেক। যাদের কথা তুমি আমি জানি না।

রোবায়েত

উনি নাকি পাহাড়ে রেওয়াজ করতেন ১৬/১৭ বছর বয়সে। প্রতিধ্বনি শুনে ঠিক করতেন সুর লাগতেছে কিনা! ভাবো একবার!

শোয়েব

এইসব জোস। আসলে গ্রেট হইতে গেলে এইটা লাগে। এইটা শুধু ক্লাসিকাল মিউজিক বলে না। সব স্কুলেই সমানভাবে প্রযোজ্য। নয়তো জীবনানন্দও ট্রামে চাপা পড়ত না।

জয়

এই যে স্কুল অব থট, স্কুল অব রাইটিং এই দুইটা জিনিস আমাদের দেশে কতখানি আছে বলে মনে হয়?

শোয়েব

স্কুল অব থট বলে কিছু এখানে নাই। রাইটিং আছে কিনা নিশ্চিত না।

জয়

স্কুল অব থট না থাকলে রাইটিং আগাবে কি কইরা?

আর কেন নাই?

শোয়েব

আগাইতে পারে। রাইটিং নানাভাবে হতে পারে। থট আগাইতে হলে প্রসেসিং লাগে, কনক্রিট একাডেমী লাগে। এখানে একাডেমীগুলো মেধাহীন। হবে কেমনে। ভুল বললাম?

রোবায়েত

কিন্তু তুমি তো একাডেমিরে পাত্তা দিতে চাও না!

শোয়েব

নাই বলেই পাত্তা দিই না। ঠিকঠাক একাডেমি থাকলে আমিও যেতাম।


চলবে

লেখা সম্পর্কে মন্তব্য

টি মন্তব্য