home বাংলাদেশের সমকালীন ছোটগল্প সংখ্যা কবি ও নিষ্ঠুর রাজকন্যা ।। রাতুল পাল

কবি ও নিষ্ঠুর রাজকন্যা ।। রাতুল পাল

দীর্ঘক্ষণ ধরে এক যুবক নির্জন এই সুউচ্চ পাহাড়ের কিনারে দাঁড়িয়ে আছে একাকী, চেয়ে আছে নিচের খাঁদের দিকে—যেখানে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে একটি মৃতদেহের স্তূপ। মৃতদেহগুলির মধ্যে দু-একটির শরীরের মাংস এখনও অবশিষ্ট আছে, আর বাকিগুলি সম্পূর্ণরূপে পরিণত হয়েছে কঙ্কালে।

আকাশে তীব্র শব্দ করে বিদ্যুৎ চমকে ওঠে আচমকা, কিন্তু যুবককে সামান্যতম বিচলিত মনে হয় না তাতে। দীর্ঘ নিস্তব্ধতার পর সহসা এরূপ শব্দের পরও যুবক একটি বারের জন্যও তাকায় না আকাশের পানে, তার দৃষ্টি নিবদ্ধ শুধু নিচের খাঁদের দিকে। মৃতদেহগুলির দিকে তাকিয়ে যুবক শুধু মনে মনে বলে, ‘‘তোমরাও কি আমার মতো এভাবে অপেক্ষা করেছিলে?’’

যুবকের প্রতীক্ষার প্রহর শেষ হয় একটু বাদেই। সে দেখতে পায় পাহাড়ের নিচে অাঁকাবাঁকা পথ ধরে একটি সুসজ্জিত ঘোড়ার গাড়িতে চেপে এগিয়ে আসছে সম্পূর্ণ কালো পোশাকে মোড়া একজন মানুষ। দেহের গড়ন দেখে সে যে নারী, তা সহজেই অনুমান করা যায়। ঘোড়ার গাড়িটিতে চালকসহ আরও অবস্থান করছে দুজন ভয়ঙ্কর দর্শন প্রহরী।

ঘোড়ার গাড়িটি এসে দাঁড়ায় পাহাড়ের পাদদেশে। গাড়ি থেকে নেমে আসে কালো পোশাক পরিহিতা সেই নারী, আস্তে আস্তে সে পাহাড় কেটে বানানো সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে থাকে।

এই কি সেই নিষ্ঠুর রাজকুমারী? এই কি সেই অহংকারী নারী, যে নিজের রূপের জন্য এতই গর্বিত যে, সর্বক্ষণ নিজেকে ঢেকে রাখে কালো কাপড়ের আবরণে?যুবক ভাবে।

যুবক অবাক চোখে তাকিয়ে রয় রাজকুমারীর দিকে। কী অপরূপ তার দেহকাঠামো! কী মোহময় তার পদচালনা! ক্ষণিকের জন্য আড়ষ্ট হয়ে যায় যুবক, শুধু ভাবতে থাকে যাকে কালো কাপড়ে ঢাকা অবস্থাতেই দেখলে মুগ্ধ হতে হয়, সত্যিই সে না কত সুন্দর! এতদিন ধরে যুবক রাজকুমারীর এই অহংকারকে যুক্তিহীন ভেবে এসেছিলো মনে মনে, কিন্তু এখন মনে হচ্ছে এমন অহংকার রাজকুমারীকেই মানায়।

অহংকার তো সুন্দরীর অলংকার, তার মাত্রা একটু বেশি হলেও অসহনীয় নয়। কিন্তু নিষ্ঠুরতা? তার পিছনে কী যুক্তি থাকতে পারে? তবে যুবক জানে, রাজকুমারীর এই নিষ্ঠুরতার সূত্রপাত ওই অহংকার থেকেই। যুবক যে নিজেই আজ হয়ে যেতে পারে সেই নিষ্ঠুরতার নির্মম শিকার! পরবর্তী কিছু মুহূর্তের উপরই নির্ভর করছে যুবকের জীবন-মৃত্যু। সে যে রাজকন্যার পাণিপ্রার্থী!

যুবকের আগে রাজকন্যার পাণিপ্রার্থী হয়ে এসেছে অনেকেই, এবং তাদের প্রত্যেকের স্থান হয়েছে পাহাড়ের নিচে ওই খাঁদে। একে একে এসেছে তারা আর বাড়িয়ে গেছে খাঁদে পতিত মৃতদেহের সংখ্যা। গত অর্ধযুগ ধরে রাজকন্যা তার জীবনসঙ্গি খুঁজে চলেছে, কিন্তু খুঁজে পায়নি কাউকে; এবং ব্যর্থ পাণিপ্রার্থীদের হত্যা করেছে খাঁদে ফেলে।

রাজকন্যা পাহাড়ের উপর উঠে প্রহরীদের দূরে দাঁড়াতে বলে, এবং যুবকের কাছাকাছি এসে বলে,

তুমি কি আমার পাণিপ্রার্থী সেই কবি?

রাজকন্যা, আমি কবি শুধু সেই মুহূর্তেই, যখন আমি কাব্য রচনা করি; অন্য কোনো সময় নয়। কাব্যরচনার সময়টুকুবাদে আমি সবার মতো সাধারণ মানুষ।

যাই হোক, তুমি সব জেনেশুনে এখানে এসেছো তো?

হ্যাঁ, আমি সব জেনে বুঝেই এসেছি এখানে। আপনাকে মুগ্ধ করতে পারলে আপনি আমায় জীবনসঙ্গি করবেন, আর ব্যর্থ হলে নিক্ষেপ করবেন ওই খাঁদে।

হ্যাঁ, এটাই আমার প্রথম ও প্রধান শর্ত। গত ছয় বছর ধরে আমি তাই করে চলেছি। এই রাজ্যে এই নির্বাচন পদ্ধতি আইন বহির্ভূত নয়। আর কথা বাড়িও না। পারলে তোমার কাব্য দিয়ে আমায় মুগ্ধ করো…

রাজকুমারী, আপনি আজ্ঞা দিলে আপনাকে একটি প্রশ্ন করতাম।

আমি এখানে অযথা সময় নষ্ট করতে আসিনি। রাজমহলের বাইরে আমি বেশিক্ষণ শাকতে পছন্দ করি না। অতি দ্রুত তোমার প্রশ্ন শেষ করো।

আপনাকে ধন্যবাদ, রাজকুমারী। আমার প্রশ্ন হল আপনি নিজেকে সর্বদাই এই কালো পোশাকের আড়ালে কেন ঢেকে রাখেন ? আপনি অপরূপ সুন্দরী, তা আমি জানি। আবার এও জানি, যা সুন্দর তা স্বপ্রকাশিত। সৌন্দর্য তো আড়ালে থাকার জন্য নয়। গোলাপ যদি গর্বিত হয়ে কুঁড়ি অবস্থাতেই থেকে যেত, তাহলে আমরা কি বঞ্চিত হতাম না? সৌন্দর্য যদি চাপা পড়ে থাকে, সে তো দুনিয়া ও নিজের- উভয়ের প্রতিই অবহেলা।

তোমার এই যুক্তি সব কিছুর জন্য প্রযোজ্য হলেও, আমার ক্ষেত্রে নয়। আমার সৌন্দর্য সবার জন্য নয়। আমি আমাকে চিনি, যে কারো চেয়ে ভালো করে চিনি। আমি সাধারণের জন্য এই জগতে আসিনি। আমি সাধারণ নই, এবং সাধারণ নই আমার সৌন্দর্যের কারণে। আমার কাছে অধিকারের প্রশ্ন সবার আগে। সাধারণ মানুষ আমায় দেখার অধিকার রাখে না, তারা দেখলে আমি আমার অসাধারণত্ব হারাবো। আমায় দেখার জন্য আমার মতো অসাধারণ হতে হবে- কোনো না কোনো ভাবে।

রাজকুমারী, অধিকারের ক্ষুদ্র আওতায় সুন্দরকে ফেলা কি যৌক্তিক? জগতের সকল সুন্দরের উৎস এই যে আমাদের জীবন, তা কি আমরা কোনো অধিকার বলে পেয়েছি? যে আমরা পৃথিবীর বুকে কখনোই ছিলাম না, তাদের কি অধিকার থাকতে পারে এ-অমূল্য জীবনযাপনের? সুন্দরের আলোয় সবাই আলোকিত হয়, তাতে তার নিজের কোনো হানি ঘটে না। বনের মাঝে যে ময়ূরের অবাধ বিচরণ, কেউ দেখে ফেলার পর কি তার পেখমের রঙ কখনো ধূসর হয়ে গেছে? সাধারণ মানুষের যদি সুন্দরকে দেখার অধিকার না থাকে, তাহলে তাদের বেঁচে থাকারও অধিকার নেই। আমার কথায় দোষ নেবেন না। আপনি সুন্দরী, অহংকার আপনার সাজে। তবে পৃথিবীর সব সুন্দরই যদি নিজেকে এভাবে লুকিয়ে রাখতো, তাহলে মানুষের বেঁচে থাকাই দায় হত। যে বৃদ্ধ আগামীকাল পৃথিবী ছাড়বে, সেও চায় মৃত্যুর আগে সুন্দর কোনো কিছুর দ্বারা ক্ষণিকের জন্য পুলকিত হতে…আপনি নিজেকে সব কিছুর চেয়ে আলাদা ভাবছেন। কিন্তু একটিবার ভাবুন, আপনি নিজেকে আলাদা ভাবছেন শুধুমাত্র সৌন্দর্যের মাত্রার কারণে, অন্য কোনো কারণে নয়। বিশ্বের সব সুন্দর প্রকাশিত হতে পারলে, আপনিও…

কবি, তুমি কিন্তু এখনো আমায় দেখোনি। দেখলেই বুঝতে পারবে তোমার যুক্তির অসারতা। আমার সৌন্দর্যের মুখোমুখি হলে তুমি বুঝবে আমি কেন নিজেকে আড়াল রাখি।

আমি আপনাকে এখনো দেখিনি, সে কথা ঠিক। কিন্তু সব ঝিনুকে মুক্তা না থাকলেও, কিছু কিছু ঝিনুককে দূর থেকে দেখলেও মন কেন জানি বলে দেয় তাতে মুক্তা আছে। আমি জানি, এই বিশ্বে আজকের প্রবল বিশ্বাস কাল মুখ থুবড়ে পড়ে। কিন্তু তারপরও বাঁচতে গেলে কিছু জিনিসকে সত্য ধরে বাঁচা ছাড়া কোনো উপায় নেই, রাজকুমারী। কবিকে যেমন বিশ্বাস করতে হয় সত্য সুন্দর, তেমনি সুন্দরের অবাধ প্রকাশকেও সত্য ধরে নিতে হয় তাকে।

তোমার এই যুক্তিতর্ক দেখে আমি অবাক হচ্ছি। অনেকেই এসেছে আমার পাণিপ্রার্থী হয়ে, কিন্তু কেউ এভাবে তর্ক করেনি। সবাই এসেছে আর তারা যে বিষয়ে পারদর্শী, তা প্রদর্শন করে আমায় মুগ্ধ করতে চেষ্টা করেছে। কিন্তু কেউ পারেনি, কেউ না; এবং পূর্বশর্ত অনুযায়ী তাদের প্রত্যেককে ওই নিচের খাঁদে ফেলে হত্যা করা হয়েছে। দূরে দাঁড়ানো ওই দু’জন প্রহরীকে ডাকলেই ওরা টেনে নিয়ে গিয়ে ফেলে দেবে তোমাকেও…

রাজকুমারী, তাদের কি কোনো দোষ ছিলো? আমি পূর্বেই শুনেছি আপনার প্রত্যেক পাণিপ্রার্থীকে হত্যা করা হয়েছে, কিন্তু সঠিক কারণ কেউ বলতে পারেনি। আমি নিজেও ভেবে পাইনি। কেন এ-নিষ্ঠুর বিধান?

হা হা…তুমি এটাও জানো না? তারা কেউই বিনা কারণে মৃত্যুবরণ করেনি। মৃত্যুর আগে তারা এমন কিছুর অভিজ্ঞতা লাভ করে, যার যোগ্য তারা নয়। তাই তাদের জন্য মৃত্যুই শ্রেয়। এই পাহাড়ের উপরে আলাপচারিতার এক পর্যায়ে আমি প্রত্যেক পাণিপ্রার্থীকে আমার এই কালো পোশাক উন্মোচিত করে নিজেকে দেখাই। কিন্তু যেহেতু তারা আমার মন জয় করতে পরবর্তীতে ব্যর্থ হয়, আমি তাদেরকে হত্যা করার আদেশ দিই। পৃথিবীর বুকে আমার রূপ দর্শন করেছে অথচ আমার যোগ্য নয়, এমন কারো অস্তিত্ব আমি রাখবো না। তাদের মৃত্যু না হলে ফিরে গিয়ে তারা জনে জনে আমার রূপের গল্প করবে, হয়তো অন্য কোনো নারীর সাথে আমার তুলনাও করবে- আমি সহ্য করবো না এসব। যাই হোক, তুমি কি ভয় পাচ্ছো, কবি? যথেষ্ট সাহসী না হয়ে আমার সামনে আসা ঠিক নয়।

রাজকুমারী, কবিরা আজন্ম কৌতূহলী। কবির যদি কৌতূহল না-ই থাকে, তাহলে সে কাব্য লিখবে কী করে? আর যারা সেই কাব্য পড়বে, তারাই বা পড়বে কোনো কৌতূহলে? আমি এসেছি আমার কৌতূহলের কারণে। জনে জনে আপনার কথা শুনে আমি নিজেকে আটকে রাখতে পারিনি। আমায় যদি বলা হয়, সুবিশাল কোনো মরুভূমি পার হলে আমি অজানা-অদেখা কোনো কিছুর দেখা পাবো, আমি সেখানেও নির্দ্বিধায় ছুটে যাবো, যেমন এসেছি আপনার কাছে। আমরা তো মৃত্যুর পরোয়া করতে শিখিনি, রাজকুমারী। আমার কাছে আপনি এক তীব্র কৌতূহল। আমার জীবনের দামেও যদি যে কৌতূহল নিবারিত হয়, তাহলেও আমার চেয়ে সুখী কেউ হবে না।

তোমরা কবিরা অদ্ভুত সব কথা বলো। যদিও তোমার সব কথা আমি কখনোই মানবো না, তারপরও ক্ষণিকের জন্য নিজেরও মনে হতে থাকে যেন আমি মেনে নিয়েছি। পাণিপ্রার্থী হয়ে আমার কাছে বিখ্যাত সব সঙ্গীতশিল্পী, চিত্রশিল্পী, যোদ্ধা, সুদর্শন যুবকেরা এসেছে; কিন্তু তারা কেউ কখনো আমায় আমার কৃতকর্মের বিরুদ্ধে কিছু বলে বা করে আমায় মানাতে পারেনি। তুমি ক্ষণিকের জন্য হলেও পারছো।

আপনি আজ্ঞা না দিলে আমার কিছুই বলা হতো না, রাজকুমারী। কিছু কথা বলতে দেবার জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। তবে আমার আরেকটি প্রশ্ন ছিলো, হত্যা করার আগে আপনি নিজেকে কেন একবারের জন্য উন্মোচিত করেন আপনার পাণিপ্রার্থীদের সামনে? কেনো তাদের বুকে আকাঙ্ক্ষার দীপ জ্বালান, যে দীপ ক্ষণিক বাদেই আপনি নিজেই নিভিয়ে ফেলেন নির্মম ফুৎকারে?

যারা আমার কাছে আসে, আর তাদের নিজ নিজ শৈলী দ্বারা আমায় কিছুটা হলেও মুগ্ধ করতে সমর্থ হয়, আমি তাদের পৌরুষত্ব মেপে দেখি নিজেকে উন্মোচন করে। আমি জানি, আমায় দেখলে পৃথিবীর যে কোনো মানুষ মুগ্ধ হবে। তবে কেউ যদি আমায় দেখে মুগ্ধ হয়ে হতজ্ঞান হয়ে পড়ে, তাহলে তার পৌরুষত্ব কোথায়? আমি পুরুষের চোখে কামনা দেখতে ভালোবাসি, তবে সে কামনা হবে সংযমের কঠোর বাঁধনে আবদ্ধ। যারা আমার সামনে এসেছে এবং আমার রূপ দেখেছে, তাদেরকে খুব অসহায় মনে হয়েছে আমার। অনেককে আমি নির্বাকও হয়ে যেতে দেখেছি। যে আমায় দেখলে অসহায় বোধ করে, সে আমার জীবনসঙ্গি হবে কী করে?…আমি তোমার সামনেও এখন এই কালো পোশাক ত্যাগ করবো…

কিন্তু আমি তো আমার শৈলী এখনও প্রকাশ করিনি, রাজকুমারী। আমি তো আপনাকে আমার রচিত কোনো কাব্যও শোনাইনি।

তোমার কথাই তো কাব্যের মতো, কবি।

রাজকুমারী আরও কিছুটা এগিয়ে আসে যুবক কবির কাছে। কবি আরও একবার খাঁদের মৃতদেহগুলির দিকে চেয়ে দৃষ্টি ফেরায় রাজকুমারীর দিকে। রাজকুমারী ধীরে ধীরে তার মাথা থেকে পা অব্দি পরিহিত কালো বসন খুলে ফেলে, অনাবৃত হয় অতি চাকচিক্যময় ও রাজকীয় পোশাক পরিহিতা অভূতপূর্ব এক নারীমূর্তি।

অপূর্ব রাজকুমারী! আপনি অপূর্ব! আজ আপনাকে দেখে দীর্ঘ-প্রচলিত একটি উপমা মিথ্যা প্রমাণিত হয়ে গেলো। মানুষ সুন্দরী রমণীদের দেখে বলে, ‘‘তুমি কবির কল্পনার মতো সুন্দর’’; কিন্তু আপনাকে দেখে আজ সে-ধারণার যৌক্তিকতা নিয়ে আমি সন্দিহান হয়ে পড়েছি। আমি শত শত নারীমূর্তির ছবি এঁকেছি মনে মনে, তাদের উদ্দেশ্য করে কাব্য রচনা করেছি বহু; কিন্তু আমার স্বীকার করতে কোনো দ্বিধা নেই, আপনি আমার কল্পিত যে কোনো নারীমূর্তির চেয়ে বেশি মনোহর…এই বিশ্ব হাজার হাজার ব্যর্থ কবিতে পরিপূর্ণ। আমার তাদের জন্য দুঃখ হচ্ছে। তারা যদি একটি বার, মাত্র একটি বার আপনার দর্শন পেতো, তাহলে তাদের কবি জীবন সার্থক হতো। তাদের কাব্য-ভূমি অনাবাদি জমির মতো পড়ে রয় শুধু রূপ-বৃষ্টির অভাবে। আপনার এ-রূপ বৃষ্টিতে বৃষ্টিতে প্লাবন আনতো তাদের কাব্যে। কিন্তু হায়! তাদের সেই সৌভাগ্য হয়নি…

কাব্য সৃষ্টির চেয়ে আমার কাছে আমার মর্যাদার মূল্য অনেক বেশি। আমার প্রশংসা সবাই করুক আমি তা কখনোই চাইনি, কখনো চাইবোও না। আমি প্রশংসা, গুণগান শুনতে চাইবো শুধুমাত্র আমার যোগ্য জীবনসঙ্গির কাছে, আর কারো কাছে নয়। আমাকে পেতে চাইলেও যেমন যোগ্য হতে হবে, প্রশংসা করতে চাইলেও যোগ্য হতে হবে।

রাজকুমারী, আপনি ভুলে যাচ্ছেন মানুষের সীমাবদ্ধতা আছে। আপনার জীবনসঙ্গি হবে মাত্র একজন। আর একার পক্ষে এ যে সম্ভব নয়! সূর্যালোকের বন্দনা কি কেউ একা করতে পেরেছে? নদীর কুলকুল ধ্বনি শুনে এই বিশ্বে কি শুধু একটি গানই রচিত হয়েছে? নাকি হয়েছে হাজারো হাজারো? রাজকুমারী, আপনার জীবনসঙ্গি যে হবে, তার অবস্থা হবে প্রচুর হীরকখন্ডে ভরপুর কোনো প্রচন্ড ভারী বোঝার বহনকারীর মতো।

কবি, আমি রাজকন্যা, রাজবংশীয় রক্ত আমার শরীরে বয়ে চলেছে। পরাজয় আমি সহ্য করতে পারি না; কিন্তু আমি বুঝতে পারছি তোমার কথার কাছে আমি হেরে যাচ্ছি বারবার। স্বীকার করতেই হবে, এই হেরে যাওয়া আমায় ক্ষুব্ধ করছে না। এই পরাজয় নিরস যুক্তিতর্কের কাছে পরাজয় নয়। তোমার কথার আবেদনের কাছে সহজ সমর্পণ করতে চাইবে যে কেউ।

রাজকুমারী, জয় পরাজয়ের কথা আমি ভাবি না। আমি আমার সত্যের কাছে সমর্পিত; আর হয়তো ওই সত্যই আমার ভিতর থেকে তার চিরশাশ্বত আবেদন সৃষ্টি করে অন্যকে সমর্পণের পথ দেখায়।

তোমার কথায় মুগ্ধ না হয়ে সত্যিই পারা যায় না, কবি।

মুগ্ধতায় মুগ্ধতায় আজ এ-প্রান্তর উচ্ছ্বলিত হয়ে উঠছে। আমাতে মুগ্ধ আপনি, আপনাতে আমি। আকাশের দিতে তাকান, রাজকন্যা। দেখুন, সে কেমন আপনার কালো বস্ত্রের মতো মেঘ সরিয়ে এই পৃথিবীকে দেখার সুযোগ করে দিয়েছে নিজেকে। দেখুন, দেখুন… আকাশ আর মাটি কেমন আমার-আপনার মতোই আলাপচারিতায় মেতে উঠেছে।

কিন্তু কবি, তোমার মুখমন্ডলে তো মুগ্ধতার কোনো ছাপ দেখছি না আমি। পূর্বের পাণিপ্রার্থীরা কেউ কেউ বিবশ হয়ে গেছে, আবার কেউ বা উন্মাদের মতো চঞ্চল হয়ে উঠেছে আমায় দেখে। তোমার ভেতর কোনো অস্বাভাবিকতাই দেখছি না আমি। আমি মানি, সংযম পৌরুষত্বের অন্তর্ভুক্ত, কিন্তু তাই বলে কি মুগ্ধতার কিছুটা দৃশ্যমান লক্ষণ থাকবে না?

রাজকন্যা, আমি সৌন্দর্যের পূজারী। আমার এ-পূজা সুন্দরকে ক্রমান্বয়ে আপন করে নেবার পূজা। সুন্দর তো আমার কাছে অচেনা কিছু নয়, যে তাকে দেখে আমি বিমূঢ় হয়ে যাবো! কাব্যের সাধনা দিয়ে আমি সুন্দরকে আপন করে নিয়েছি। সুন্দর আমার কাছে চিরচেনা, পার্থক্য হবে শুধু তার মাত্রায়। আমি আপনায় দেখে মুগ্ধ হয়েছি, চকিত হইনি।

তোমার কথা আরও শুনে যেতে মন চাইছে। কিন্তু ওদিকে যে সন্ধ্যা নেমে এলো, আমার দ্রুতই রাজমহলে ফিরে যেতে হবে। কবি, তুমি আগামীকাল রাজমহলে এসো। তোমাকে আমার অনেক বলার আছে, কিন্তু এখন কিছু বলবো না। শুধু এটুকু বলতে পারি, তোমায় দেখে আমি বিস্মিত হয়েছি।

সে কি, রাজকন্যা? আজ তো তবে ইতিহাস রচিত হলো। পূর্বে কেউই তো এখান থেকে জীবিত ফিরে যেতে পারেনি। আমিই কি তবে প্রথম…? আপনি আপনার সিদ্ধান্ত সম্বন্ধে নিশ্চিত তো, রাজকন্যা? আপনি এখন আমায় মুক্ত করে দিচ্ছেন?

হ্যাঁ, কবি। তুমিই প্রথম যে এখান থেকে জীবিত ফিরে যাচ্ছো। তবে কাল অবশ্যই রাজদরবারে এসো।

রাজকন্যা, তবে আপনি কি বলতে চাইছেন, আমি আপনার নির্বাচন প্রক্রিয়ায় উত্তীর্ণ হয়েছি? হা হা…আমার তো কোনো কাব্যই বলা হল না এখনো।

নির্বাচনের দায়িত্ব তো আমার, কবি। আমার রায়ই তো এখানে শেষ কথা।

তবে আমারও একটি শেষ কথা আছে। আপনার রাজমহলে আমার কখনোই যাওয়া হবে না! এভাবে জীবনসঙ্গি পাওয়া যায় না, রাজকুমারী। নির্বাচনের মতো কৃত্রিম প্রক্রিয়া দিয়ে জীবনের কিছু প্রয়োজন মেটে মাত্র, আর কিছু নয়। আপনি হয়তো আমার প্রতি কিছুটা মোহিত হয়েছেন, কিছুটা মুগ্ধ হয়েছেন। কিন্তু মুগ্ধতার সৈকত থেকে প্রেমের তীরে যাত্রার পথে আমরা অনেকেই হয়ে পড়ি ক্লান্ত, এ আরও বড়ো কঠিন পরীক্ষা! সময় ও ধৈর্যের শিখায় দহনের পর মোহের যদি কিছু অবশিষ্ট থাকে, তাই হলো প্রেম, রাজকুমারী। তাই-ই প্রেম। তাছাড়া, আমি খাঁদে পতিত ওই মৃতদের কী জবাব দেবো? হয়তো তাদের মধ্যে কেউ সত্যিই আপনাকে ভালোবাসতে চেয়েছিলো। হায়! প্রত্যেকে তারা প্রতিযোগী। আপনাকে পাবার কোনো শর্ত থাকলে হয়তো তারা আমরণ শত্রু হয়ে নিজেদের ভিতর লড়ে  যেতো। কিন্তু হায়! কী নিরুপায়-অসহায় হয়ে আজ তারা একে অপরের উপর শরীর রেখে শুয়ে আছে চিরকালের জন্য। মানুষ হিসেবে প্রতীকি প্রতিবাদ করে এখন আমার কর্তব্য ছিলো আপনারই সামনে স্বেচ্ছায় এই খাঁদে ঝাঁপ দিয়ে প্রাণ ত্যাগ করা, কিন্তু আমি তা পারছি না। আজ যে অমূল্য অভিজ্ঞতা লাভ করলাম আমি, তা আমার কাব্যের উৎকর্ষতার জন্য একান্ত প্রয়োজন। কবি ও মানুষ হিসেবে আমার সামনে আজ যে ভিন্ন ভিন্ন দায়িত্ব, তার মাঝে আমি কবির ভূমিকাকে বেছে নিয়ে মনুষ্যত্বের কাছে সলজ্জ হয়ে মাথা নোয়াচ্ছি। রাজকন্যা, আমাকে এখন যেতে হবে…

কিন্তু তুমি এভাবে…

রাজকন্যা, আমি জানি একজন নারী হিসেবে আপনি চিরকালীন নারীসত্তার অবিনশ্বর বৈশিষ্ট্য হেতু আকুলতা দেখাবেন; কিন্তু আমি এও জানি, আপনার সে আকুলতা আভিজাত্যের নাগপাশে আবদ্ধ। আমায় ব্যাকুল ভাবে ফেরার অনুরোধ করার যে ইচ্ছা, তার অনুভূতি আপনার কাছে এতই নতুন যে, তাকে প্রকাশ করার ভাষাও আপনার কাছে নেই। আপনি হয়তো একদিন ঠিকই জীবনসঙ্গি খুঁজে পাবেন, কিন্তু খাঁদের ওই মৃত দেহগুলির অশ্রুত হাহাকার আর আমার অকস্মাৎ প্রস্থান সম্মিলিত হয়ে বৈধব্যের রূপ ধারণ করে আপনার মাঝে রয়ে যাবে চিরকাল। বিদায়, রাজকন্যা…

কবি পাহাড় থেকে দ্রুত পায়ে নিচে নামে আসে। তাকে অনুসরণ করে রাজকন্যাও ধীর পায়ে আনমনে এগিয়ে আসে কিছুদূর। প্রহরীরা রাজকন্যাকে কালো পোশাকে আবৃত না দেখে বিস্মিত হয়, এবং মুগ্ধদৃষ্টিতে তাঁর দিকে তাকিয়ে থাকে নিষ্পলক ভাবে। রাজকন্যা তাকিয়ে রয় শুধু কবির পথের দিকে; কিন্তু কবি ফিরে তাকায় না একটি বারের জন্যও। রাজকন্যা তবুও তাকিয়ে রয় দিগন্তে পড়ন্ত সন্ধ্যার ধূসর আঁধারে কবি বিলীন না হওয়া পর্যন্ত।

লেখা সম্পর্কে মন্তব্য

টি মন্তব্য