home দর্শন কনফুসিয়াস ফ্রম দ্য হার্ট । ইউ ড্যান । বাংলায়ন : নাঈম ফিরোজ । তৃতীয় অধ্যায়ঃ প্রথম পর্ব

কনফুসিয়াস ফ্রম দ্য হার্ট । ইউ ড্যান । বাংলায়ন : নাঈম ফিরোজ । তৃতীয় অধ্যায়ঃ প্রথম পর্ব

                                যাত্রা: পৃথিবীর পথে পথে

 

আধুনিক পৃথিবীতে, ইমেইল ও মেসেজ আদান-প্রদানের মাধ্যমে হাজার মাইল দূরে থেকেও আমরা মানুষের সাথে সার্বক্ষণিক সংযোগ বজায় রাখতে পারি, তথাপিও কেন জানি নিজের প্রতিবেশীদের জানার জন্য আমরা কোন চেষ্টাই করি না। আগের যেকোন সময়ের চাইতে অধিক হারে মানুষের প্রতি আমাদের আচরণ ক্রুর হয়ে উঠেছে। এই বিভ্রান্তিকর জটিল পরিবেশে আমরা অন্যের সাথে কেমন ব্যবহার করতে পারি? যখন আমাদের সাথে কেউ অন্যায্য ব্যবহার করে তখন আমাদের কেমন প্রতিক্রিয়া দেখানো উচিত? আমাদের খুব নিকটজনের সাথে দৈনন্দিন ব্যবহারে কোন কোন নীতিগুলো আমাদের প্রয়োগ করতে হবে?

       সমাজে আমাদের কী আচরন করতে হবে এবং একজন বিনয়ী মানুষ হতে হলে আমাদের কী কী করতে হবে তার জন্য কনফুসিয়াস আমাদেরকে অনেকগুলো নিয়ম-নীতি প্রদান করেছেন। প্রাথমিকভাবে এই নিয়ম-নীতিগুলোকে শক্ত, দুঃসাধ্য মনে হতে পারে। কিন্তু আদতে তা বিস্ময়করভাবে কোমল।

       সহজ কথায় বলতে গেলে, তিনি আমাদেরকে এমন সব নিয়ম-নীতি প্রদান করেন, যা আমাদের কার্যাবলিকে নিয়ন্ত্রণ করেন এবং ঠিক কোন মাত্রায় আমরা এসব নীতিকে পরিপালন করবো তা নির্ধারণ করে দেয়।

       আমরা প্রায়শই নিজেদেরকে জিজ্ঞেস করি, আমাদের কী করা উচিত এবং কী করা উচিত না; কী ভালো আর কী মন্দ।

       সত্যিকার অর্থে এসব প্রশ্নসমূহের জিজ্ঞাসাকালে ভাল-মন্দ, উচিত-অনুচিত, হ্যাঁ-না এরকম খুব সাধারণ শ্রেণিকরণের নিরিখে জিজ্ঞাসিত প্রশ্নের সমাধা সম্ভব না। আমরা যখন কোন কার্য সমাধা করতে যাই, এবং তা ঠিক যতদূর অব্দি আমরা করি, সেসবের একটা প্রত্যক্ষ প্রভাব থেকে যায় আমরা কী উপায়ে একটা কাজ সম্পন্ন করবো তার উপরে। কনফুসিয়াস মূলত জোরারোপ করেন একটি কাজ আমরা করতে গিয়ে ঠিক কত দূর যাবো তার উপরে। কোন কাজ করতে গিয়ে খুব বাড়াবাড়ি করা কিংবা যতটুকু করা দরকার ততটুকু না করা দুটোই যতটা সম্ভব পরিহারযোগ্য। যদিও কনফুসিয়াস মমত্ব ও উদারতার জয়গান গেয়েছেন, তথাপি তিনি বিশ্বাস করতেন না যে আমাদের জীবনে চলার পথে অস্বাভাবিক আচরণকারী ব্যক্তিগণের ভুলসমূহকে ক্ষমা করে দেবো।

       কেউ তাঁকে একবার জিগ্যেস করেছিলেনঃ ‘এই প্রসঙ্গে আপনার অভিমত কী যে,“কোন আঘাতের বিপরীতে সমুচিত জবাব দাও”?’

       কনফুসিয়াস উত্তর দিয়েছিলেনঃ ‘কোন আঘাতের বিপরীতে সোজাসুজিভাবে প্রত্যাঘাত ফেরত দিন কিন্তু ভালো কিছুর জবাবে ফেরত দিন ভালো কিছুই’ এই কথাটি শুনতে আমরা হয়তো প্রস্তুত ছিলাম না, কিন্তু অন্যের কাছে কী গ্রহনযোগ্য তা সম্পর্কে সচেতনতা একজন সত্যিকারের  junzi  এর প্রধান পরিচায়ক।

এই ক্ষেত্রে কনফুসিয়াস মানুষের মর্যাদাকে স্বীকৃতি প্রদান করেন।

তবে, কনফুসিয়াস অবশ্যই হিংসার বদলে জিঘাংসা প্রয়োগে সায় দেন নি। যদি আমরা আমাদের বিরুদ্ধে সংঘটিত অন্যায়ের বিরুদ্ধে সার্বক্ষনিকভাবে রুষ্টচিত্তে লড়াই করে যাই তবে আমরা এমন এক সর্বনাশা দুষ্টচক্রের মধ্যে নিপতিত হব, যা থেকে বেরিয়ে আসা হবে অকল্পনীয়। এতে করে আমরা আমাদের নিজেদের সুখকেই কেবল বিসর্জন দিবো না, আমাদের ভবিষ্যত বংশধরদের সুখকেও জলাঞ্জলি দেবো ।

       হিংসার বিপরীতে আদরনীয় গুণের প্রয়োগ যদি আমরা করতে যাই তবে তাও হবে বাস্তবতাবর্জিত। আপনার প্রতি যারা ঘোরতর অন্যায় করেছিলেন যদি আপনি আপনার হৃদয়ের বিশালতা ও দয়াময়তা অকাতরে তাদের জন্য বিলাতে থাকেন, তবে তাও হবে নিতান্ত অপচয়।

       এর বাইরেও একটি তৃতীয় আচরণ সম্ভব, তা হচ্ছে আপনার সঙ্গে যাই ঘটুক না কেনো তার প্রতি শান্ত মনে, পরিশুদ্ধ মননে, ন্যায়ানুগ দৃষ্টিতে, খোলা মনে এবং উচ্চ আদর্শে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করা- যা অতীব উচ্চ নৈতিক চরিত্রের অভিজ্ঞান।

       এরই ধারাবাহিকতায়, কনফুসিয়াস গুরুত্ব আরোপ করে বলেন যে, আমাদের আবেগ-অনুভূতি ও মেধাবৃত্তি সেসব স্থানেই প্রয়োগ করা উচিত যেটা তার জন্য প্রকৃত অর্থেই যথার্থ।

       আজকাল প্রত্যেকেই মূল্যবান সম্পদ অপচয় এড়াতে চাইছেন, তথাপিও আমাদের শরীরের ভেতর থেকে কী পরিমাণ শক্তি অপচয় হয়ে যাচ্ছে কিংবা কী পরিমাণ আত্মিক চেতনা রহিত হচ্ছে তার হিসেব আমরা কেউ রাখি না। আজকের দিনের পার্থিব উন্নতি এবং জীবন স্পন্দনের ক্রমবর্ধমান গতি যেকোন ব্যাপারেই আমাদের দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করছে। তবুও আমাদের জীবনযাপনের শ্রেষ্ঠ পন্থাটি বেছে নিতে হবে, যে পন্থাটি সত্যিই আমাদের একান্ত নিজের ভেতর থেকে পরিশ্রুত।

       আমাদের জীবনে আমরা প্রায়শই কতগুলো পরিস্থিতি অবলোকন করিঃ

       হয়তো কোন বাবা-মা তাদের সন্তানদের প্রতি খুবই যত্নশীল কিন্তু তারপরও তাদের মধ্যে দূরত্ব তৈরী হচ্ছে। হয়তো খুব কাছাকাছি দুই বন্ধু মানিকজোড় কিন্তু দিন শেষে তারা একে অন্যকে আঘাত দিচ্ছেন। একজন ব্যক্তি হয়তো তার উপরস্থ সহকর্মী ও কলিগদের সাথে নিকট সম্পর্ক বজায় রাখবার সর্বাত্মক চেষ্টা করে যাচ্ছে কিন্তু দিন শেষে কাঙ্ক্ষিত ফল পাচ্ছে না।

       এসব কেন হচ্ছে ?

       কনফুসিয়াস বিশ্বাস করতেন যে, মানুষে-মানুষে অতি দূরত্ব কিংবা অতি মাখামাখি কোনটাই আদর্শ ব্যবহার নয়। তার মতে ‘সম্পর্কে অতি দূরে চলে যাওয়া অতি কাছে যাওয়ার মতই খারাপ’। একসাথে কাজ করতে চায় এমন দুটো মানুষের জন্য খুব নিকট সন্নিহিতি কোন আদর্শের জায়গা নয়।

       তাহলে আমরা কীভাবে ‘ভালো’ সম্পর্ক স্থাপন করতে পারি?

       কনফুসিয়াসের ছাত্র Ziyou বলেনঃ ‘গুরুর সাথে অতিউৎসাহী আচরণ করলে আপনি ছোট হতে পারেন। বন্ধুর সাথে অতিউৎসাহী আচরণ করলে আপনি বিচ্ছিন্ন হতে পারেন। অন্য কথায় যদি আপনি সবসময় আপনার উপরস্থ ব্যক্তিবর্গের সাথে কাজ থাকুক আর না থাকুক মেলামেশা করতে থাকেন, তবে আপনি তাদের কাছের মানুষ হয়তো হয়ে উঠবেন ঠিকই কিন্তু তারা অচিরেই আপনাকে ছোট করবে।

       একইভাবে আপনি যদি আপনার বন্ধুদের সাথে খুব বেশি মাখামাখি করেন, হয়তো আপাত দৃষ্টিতে মনে হবে আপনি আপনার বন্ধুদের সঙ্গে এক ধরনের অচ্ছেদ্য বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন, কিন্তু জেনে রাখবেন আপনাদের বন্ধুত্বের ভাঙ্গন খুব বেশি দূরে নয়।

       একটি ছোট গল্প আছে যা এ বিষয়ে কিছুটা আলোকপাত করে। এক সময় এক দল শজারু ছিল যাদের ছিল ধারালো মেরুদণ্ড, যারা উষ্ণ থাকার জন্য শীতকালে খুব কাছাকাছি থাকতো। তারা জানতো না পরস্পর থেকে কতটুকু দূরে থাকা উচিত। একটু দূরে থাকাতে তারা পরস্পরকে উত্তাপ দিতে পারতো না। তাই তারা কাছাকাছি আসা শুরু করলো। তখন তাদের ধারালো মেরুদণ্ড একে অন্যকে খোঁচানো শুরু করলো। তারা দূরে দূরে সরে যেতে লাগলো। দূরে সরে যেতে যেতে তারা আরো বেশি ঠাণ্ডা অনুভব করতে লাগলো। এমন ‘কাছে আসা দূরে সরা’ করতে করতে তাদের নিজেদের সঠিক অবস্থান খুঁজে পেতে অনেকটা সময় লেগে গেলো এবং এভাবে তারা নিজেদের আঘাত না করেও পরস্পরকে উষ্ণ রাখবার একটা যুৎসই উপায় খুঁজে নিলো।

       বর্তমান চীন দেশে বড় বড় শহরে একান্নবর্তী পরিবারে পুরোনো বাড়িগুলি সব ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে এবং সেখানে বহুতল ফ্ল্যাটবাড়ি নির্মান করা হয়েছে। সেসব দিন চলে গেছে যখন কোন পরিবার  Dumpling  বানাতো এবং তাদের সকল প্রতিবেশীদের মধ্যে বিলিয়ে দিতো। এবং সবাইকে একসাথে  উঠোনে জড়ো হয়ে নববর্ষ উদযাপন করতেও আর দেখা যায় না। যেখানে বাচ্চাদের ও বড়দের আলাদা আলাদা টেবিলে আপ্যায়নের ব্যবস্থা থাকতো। বর্তমানে একই ভবনে পাশাপাশি ফ্ল্যাটে তিন বা চার বছর একটানা থাকার পরও অনেকেই একে-অন্যকে এমনকি চেনেও না।

       কারণ আমাদের চারপাশে বসবাসরত মানুষের সাথে আমাদের সম্পর্ক অনেকটা শীতল হয়ে গেছে এবং অন্যদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে যাওয়াটা আমাদের জন্য ভীষণ কঠিন একটা কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে আমাদের যে গুটিকয়েক বন্ধু থাকে তাদের উপর চাপটা বেড়ে যায়। আপনি হয়তো ভাবছেনঃ আমার প্রিয় বন্ধুটি আমাকে আরেকটু ভালো ব্যবহার উপহার দিতে পারতো। তবেই আমি আমার মতো করে আরেকটু ব্যবহার তাকে উপহার দেবো। আপনি হয়তো এও ভাবছেনঃ আপনার যদি পারিবারিক সমস্যা থেকে থাকে কিংবা আপনার বন্ধুর সাথে তা মিলে যায় তবে সে কেন তা আপনাকে জানাচ্ছে না, তবে তা আপনিও তাকে সাহায্য করতে পারতেন। হয়তোবা তার সমস্যা সমাধানে মধ্যস্থতাও করে দিতে পারতেন! আমাদের মধ্যে অনেকেই এভাবেই ভাবে কিন্তু আমাদের Ziyou এর কথা শোনা উচিত; অতি নিকটবর্তী হলে সম্পর্কের ক্ষতিই হয়। তবে আমাদের বন্ধুদের সাথে কীরুপ ব্যবহার করা উচিত?

Zigong একবার তার শিক্ষককে জিজ্ঞাসা করেছিলো এই প্রশ্ন। গুরু কনফুসিয়াস তাকে বলেছিলেনঃ ‘তাদেরকে তোমার সামর্থ্যরে সেরাটা দিয়ে পরামর্শ দাও। এবং সঠিকভাবে দিক নির্দেশনা দাও। কিন্তু যেখানে সাফল্যের কোন আশাই আর অবশিষ্ট নেই সেখানে থেমে যাও’। যখন আপনি কোন বন্ধুকে ভুল করতে দেখেন, তখন তাকে সচেতন করবার জন্য আপনি আপনার সেরাটা করবেন। এবং তাদেরকে সুমতি দিয়ে পথনির্দেশ করবেন। কিন্তু তারা যদি আপনার কথা না শোনে, তাদেরকে গোল্লায় যেতে দেবেন। খুব বেশি কথা বাড়াবেন না। বাড়ালে আপনি আপনার নিজের পিঠে আঘাতের জন্য একটা রড প্রস্তুত করছেন ধরে নেবেন। তাই ভালো বন্ধুদের জন্য সম্পর্কের সীমারেখা খুব জরুরী। বেশি বেশি সবসময় ভালো কিছু নয়। (চলবে)


ভূমিকা বা প্রথম পর্ব

লেখা সম্পর্কে মন্তব্য

টি মন্তব্য