home ভিনদেশি সাহিত্য ওগডেন ন্যাশের কবিতা ।। ভূমিকা ও অনুবাদ: জিললুর রহমান

ওগডেন ন্যাশের কবিতা ।। ভূমিকা ও অনুবাদ: জিললুর রহমান

ওগডেন ন্যাশ: রম্য কবিতার রাজা

আমেরিকান কবি, নাট্যকার ও চিত্রনাট্য লেখক ফ্রেডরিক ওগডেন ন্যাশের জন্ম ১৯০২ সালে, এবং মৃত্যু ১৯৭১ সালে।

ন্যাশ তার পাঠকদের সারা জীবনভর আকর্ষণ করেছেন মানব-প্রকৃতি ও মানবিক দুর্বলতা বিষয়ে তাঁর লেখার ভেতরের বিদ্রুপাত্মক দৃষ্টিভঙ্গির জন্য। তার অন্য লোকের বাচ্চাদের আচরণ, সামাজিক আসক্তি ও অসুস্থতা সম্পর্কে কামড় বসানো ব্যাঙ্গাত্মক রসিকতা আর সংবেদনশীলতা তাকে স্পর্শকাতর বিষয়ে আলতোভাবে পা ফেলতে সাহায্য করেছে। তার অনন্য স্টাইলের বৈশিষ্ট্য হলো ব্যাকরণ ও বানান রীতির প্রতি স্বেচ্ছাচারী অবজ্ঞা। আর তার অবলীলায় শব্দের ভুল বানান পদ্যকে সুতীক্ষ্ণ করার জন্য। যখন তার অপ্রচলিত পদ্যের ধরণ তাকে সিরিয়াস কবির স্ট্যাটাস দিতে অস্বীকার করে, তখন কিন্তু ন্যাশ রয়ে যান শতাব্দীর সবচে’ বেশি পঠিত ও ঊদ্ধৃত কবি হিসেবে।

হাল্কা পদ্যের জন্য সুপরিচিত এই আমেরিকান কবি – ফ্রেডরিক ওগডেন ন্যাশ; তার মৃত্যুকালে নিউইয়র্ক টাইমস লিখেছে “তার হাস্যরসাত্মক পদ্য আর তার সাথে অপ্রচলিত ছড়া তাঁকে দেশের সবচেয়ে বিখ্যাত কৌতুকপূর্ণ কবিতার রচয়িতা হিসেবে পরিচিতি এনে দিয়েছে।” ন্যাশ ৫০০-রও বেশি কৌতুক রসাত্মক পদ্য লিখেছেন।

তাঁর শ্রেষ্ঠ কবিতার মোট ১৪টি ভলিউম প্রকাশিত হয়েছে ১৯৩১ থেকে ১৯৭২ সালের মধ্যে।

তিনি একটি সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্ম নেন। তাঁর কোনো পূর্বপুরুষের নামেই টেনেসিতে ন্যাশভিল শহরের নাম রাখা হয়। হার্ভার্ড কলেজে ভর্তি হলেও ওগডেন এক বছরের মাথায় পড়া ছেড়ে দেন।

নিউইর্য়ক এ জন্মের পর ন্যাশ বেডে উঠেন পূর্ব তীরে, কারণ তার বাবার আমদানী-রফতানী ব্যবসা তার পরিবারকে প্রদেশ থেকে প্রদেশে ঘুরিয়ে নেয়। তিনি ১৯২০-২১ সালের মধ্য নিউপোর্টের সেন্ট জর্জ স্কুল, রোড আইল্যাণ্ড এবং হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ নেন।  তারপর একদিন যখন আয় করতে বাধ্য করা হয়, ন্যাশ অনেক ঘাটেই ঘুরেছেন।

কিছুদিন ওয়াল স্ট্রিটে কাজ, স্কুল শিক্ষকের কাজ ও কপি রাইটারের কাজ শেষ করে ১৯২৫-এ পাবলিশিং হাউস ডাবল ডে তে মার্কেটিং বিভাগে চাকরি নেন। বিজ্ঞাপনের ভাষা লিখতে গিয়ে তাঁর কাব্যকণ্ঠ মূর্ত হয়ে ওঠে। ‘মারে পাহাড়ে বসন্ত আসে’ (Spring comes to Murray hill) এভাবেই রচিত হয়। পরে দ্য নিউইয়র্কার পত্রিকায় ১৯৩০-এ প্রকাশিত হয়।

ন্যাশের কবিতা প্রথম প্রকাশিত হয় নিউইয়র্কে ১৯৩০ সালে। প্রথম কাব্য সংকলন কঠিন পথ (Hard lines) ১৯৩১ সালে প্রকাশ পায়।

বইটি পেয়েছিল মারাত্মক সাফল্য। ১ম বছরেই ৭ বার পূনর্মুদ্রণ হলো। আর ন্যাশ ডাবল ডে-এর চাকরিটা ছেড়ে দিলেন। একই বছরেই তিনি বিয়ে করলেন ফ্রান্সিস রাইডার লিওনার্ডকে। তাদের দুটো সন্তানও আসে। ন্যাশ পুরোপুরি নিজের নেখালেখিতে নিবিষ্ট হবার আগে ১৯৩২ সালে নিউইয়র্কার এর পক্ষে কাজ শুরু করেন।

ন্যাশের ক’টি খুব পরিচিত লাইন এমনতরো- 

“Candy / is dandy, / But liquor / is quicker” (ক্যাণ্ডি / মানে ড্যাণ্ডি, / তবে লিকার / দ্রুততর)

তাঁর কবিতায় একটা প্রবল এন্টি-এস্টাবলিশমেন্ট ধারা আছে, যা পরে অনেক আমেরিকানের কণ্ঠে প্রতিধ্বনিত হয়েছে, বিশেষত ডিপ্রেশনের কালে। ন্যাশ খুব গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন মার্কিন সামাজিক জীবনকে। আর উপর্যুপরি আঘাত করেছেন ধর্মীয় নৈতিকতা আর রক্ষণশীল রাজনীতিবিদদের।

তার কাজকে অপরাপর সমকালীন ব্যাঙ্গকার ডরোথি পার্কার, রবার্ট বেঞ্চলে এবং এইচ এল মেনক্বেন এর সাথে। তিনি নিয়মিত রেডিও-টিভিতে কাব্যপাঠ করে ও বক্তব্য রেখে প্রচুর দর্শক শ্রোতার মন জয় করেছেন। এমজিএম-এর জন্য ন্যাশ ৩টি টিভি নাটকও লেখেন। এসজে পেরেলম্যান এর সাথে ১৯৪৩-এ লেখেন ভেনাসের একটু ছোঁয়া (One touch of Venus) যা ব্রডওয়েতে তুমুল জনপ্রিয় ছিলো। ১৯৫০-এ ন্যাশ শিশুতোষ লেখায় মন দেন। এর ফলশ্রুতিতে ১৯৬২-তে প্রকাশ পায় মেয়েরা অবলা (Girls are Silly)।

উল্লেখযোগ্য প্রকাশনা:

Everyone But Thee and Me (Little, Brown and Company, 1962)
Girls Are Silly (Franklin Watts, 1962)
Verses From 1929 On (Little, Brown and Company, 1959)
Versus (Little, Brown and Company, 1938)
I’m a Stranger Here Myself (Little, Brown and Company, 1938)
Hard Lines (Simon & Schuster, 1931)


ওগডেন ন্যাশ এর ৫টি কবিতা

জামাইদের জন্য বাণী

তোমার বিয়েথা চাঙা উদ্বেল রাখতে
প্রেমের কাপে, ভালোবেসে –
যখন ভুলভাল করো, মেনে নাও;
যখন যথার্থ তুমি, খামোশ!

 

নীলমাছি

আদম
তারও আছিল তারা
 
(আদমের আগেও নীলমাছি ছিলো)

 

সতর্ক বারতা

ওক পাখিটির কথা ভাবো
লুপ্তপ্রায়, কারণ সে ভুলেছে উড়া
আর সে কেবল হাঁটতেই পারে
 
মানুষকে ভেবে দেখো, যে কিনা
আবার নিশ্চিহ্ন হতেই পারে
কেননা সে ভুলে গেছে কি করে হাঁটে, আর
সে উড়তে শিখেছে চিন্তা করার আগেই

 

দেখো, বার্ধক্য সুন্দর

জ্যাকসনভিলে মানুষ আজীবন থাকে,
আর সেন্ট পিটারসবার্গে, টাম্পাতেও,
তবে তুমি বেঁচে থাকবে না দাদা হওয়ার জন্য।
দাদাত্ব পাবার জন্য বেশি প্রতিযোগিতাও নেই, লাগেও না তেমন কিছুই –
শুধু বেঁচে থাকো, তোমার বাচ্চার একটা বাচ্চা হবার জন্য।
ঠিক সেই সময় থেকেই তোমার দুই কাঁধের দিকে তাকানো শুরু করে দাও-
কারণ কখনো নিজেকে তিরিশ বছর ছোট মনে হবে, কখনওবা তিরিশ বেশি।
এখন থেকেই বুঝতে শুরু করে দাও
কে কতো জড়তার উচ্চ শিখরে পা দেয়।
সে যা-ই হোক দাদাদাদীদের সবটুকুতেই মজা,
নেই তো মাথায় দায়িত্বের কোনো বোঝা।
এ হলো সে প্ররোচক ছেঁড়া মিথ্যা মাকড়সার জাল।
কারণ সকলেই ভালেবাসে তেমন শিশুকে
যার জন্য কোনো মাথাব্যথা নেই,
আছে কেবল মজা আর মজা।
তবে আমি নির্বোধ ছাড়া তো আর
কাউকে ভাবি নে; অথবা এক হাবাগোবা,
যারা বিশ্বাস করে যে তাদের বাচ্চারা শিশুটিকে পেলেতুলে বড় করবে।
কাজেই তোমাকে ব্যক্তিগতভাবে
দেখভাল করা চাই নাতির পেশাবের কাঁথা
থেকে জাইঙ্গা, আর বোতল থেকে চামচ তক্।
আর তুমি তো জানো, তোমার বাচ্চার ঘুর্ণিঝড়
থেকে বেরিয়ে আসার মতো বুদ্ধি নেই।
দাদা হবার জন্য তোমাকে
চিরজীবী হতে হবে নাতো, তবে যদি চাও
চিরজীবী হবে – হয়ো না চতুর।
যদি তুমি পৌঁছুতে চাও
পথের শেষ প্রান্তে আকাটা গলাটা নিয়ে, তবে
কখনো বলতে যেও না –
“দাদা হতে আমার আপত্তি নেই
যতো ঘৃণা কেবল দাদীকে বিয়ে করতেই”।।

 

কলম্বাস

একদা এক ইতালিয়ান ছিলো,
আর কিছু লোক তাকে ভাবতো ইতর বদমাশ,
কিন্তু সে গোসসা হতো না তাতে
কারণ অন্যরা তাকে অসাধারণ ভাবতো।
 
আর সে বললো পৃথিবী গোলাকার
এবং সকলে অবিশ্বাসের শোর তুললো।
আর সে গেল ফার্দিন্যান্ড এর কাছে
কিছু টাকা ধার চাইতে, কিন্তু ফার্দিন্যান্ড তাকে বলে,
আমেরিকা হচ্ছে জঙ্গলের ভেতরে এক পাখি
বললো সে, বড় জোর পাবে বার্ডিন্যান্ড।
কলম্বাসের মেধাও ছিলো উর্বর, মোটেও তা নিরস ঊষর নয়
তার মনে পড়ে ফার্দিন্যান্ড বিবাহিত,
আর ভাবে, এমন কোনো বৌ নেই যে উল্টা বুঝে না।
কারো কর্তা যদি কিছুকে অবাস্তব ভয়ঙ্কর আইডিয়া মনে করে,
তবে সে তাকেই ধরে নেবে ভালো কিছু।
তাই রুমালে সুগন্ধী মেখে উপসাগরের রাম আর সাইট্রোনেলার
সে দেখা করতে গেল ইসাবেলার সাথে;
আর তাকে খুব সুন্দর লাগছিল, মোটেও হাবাগোবা লাগে নি
এবং ইসাবেলা বললো, যদিও মুখ মিলছে না
সুগন্ধটা খুব পরিচিত।
আর কলম্বাস টু শব্দটি করলো না
সে কেবল বলে, আমি কলম্বাস –
পনের শতকের এডমিরাল, সাহসী অভিযাত্রী। আর
যেমন সে ভেবেছিলো, ললনার মেজাজ বেশ নমনীয়। সে বলে, এখানে রইলো আমার স্বর্ণালঙ্কার, আর সে তো গ্রাচির মা কর্ণেলিয়ার মতো অনুদার ছিলো না,
সে দেখায় নি তার বাচ্চাদের, সে তুলে দিতে চায় স্বর্ণালঙ্কার – যা ছিল অনেক অনেক দামি।
কলম্বাস বলে, কেউ সূর্যাস্ত দেখিয়ে দেয়, আর কেউ করে অভিনয়।
সে তার জন্য জলযাত্রা করে।
সে আমেরিকা আবিষ্কার করেছে।
আর সে কারণে, তারা তাকে জেলে ভরে দিলো।
শৃঙ্খল তাকে চাবকে গেছে।  আর ভিন্ন কারো নামে আমেরিকার নাম রেখেছে।
কলম্বাসের এই করুণ পরিণতি প্রতিটি শিশুর কাছে, প্রতি ভোটারের কাছে তুলে ধরা চাই।
কারণ এর ভেতরে আছে খুব গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক উপদেশ, তা হলো
আবিষ্কারক হয়ো না, বরং প্রমোটার হও।

 


অনুবাদক পরিচিতি:

জিললুর রহমান
লেখালেখি আশির দশকের শেষার্ধ থেকে।
 
কাব্যগ্রন্থ:
অন্যমন্ত্র (১৯৯৫)
শাদা অন্ধকার (২০১০)
 
প্রবন্ধ:
উত্তর আধুনিকতা : এ সবুজ করুণ ডাঙায় (২০০৩)
অমৃতকথা (২০১০)
 
অনুবাদ:
আধুনিকোত্তরবাদের নন্দনতত্ত্ব : কয়েকটি অনুবাদ (২০১০)

লেখা সম্পর্কে মন্তব্য

টি মন্তব্য